গল্পঃ ভয়ংকরের মুখোমুখিঃ সুমন মিশ্র


এক


ভগবতপুর কুমির প্রকল্প দেখার জন্য আমরা চার বন্ধু যখন লঞ্চ থেকে নামলাম তখন নদীতে জোয়ার শেষে সবে ভাটা শুরু হয়েছে। ঘাট থেকে নদীতে নেমে যাওয়া কংক্রিটের সিঁড়ির বেশিরভাগটাই তখনও জলের তলায়। যে ক’টা ধাপ থেকে জল সবেমাত্র নেমেছে সেখানে জমে আছে ভেজা পলির আস্তরণ। প্রতিটি ধাপের দুই ধারে জমে আছে শ্যাওলা আর গুগলির স্তর। বাতাসে একটা জোলো গন্ধ। সুন্দরবন ভ্রমণের এটা ছিল আমাদের দ্বিতীয় দিন। গতকাল থেকে কোন নদী ছেড়ে কোন নদীতে ভেসে চলেছি জানি না। আসলে পুরো সুন্দরবন জুড়েই তো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদী, খাল আর খাঁড়ির জল-জালিকা। প্রতিমুহূর্তে বদলে যাচ্ছে আশেপাশের দৃশ্য। কখনও জঙ্গল ঘন, কখনও হালকা। আমরা মুহূর্তগুলোকে অক্লান্তভাবে ক্যামেরায় বন্দী করে চলেছি। তবে মন যেন কিছুতেই ভরছে না, সব সময় আরও চাই, আরও চাই ভাব। গহন অরণ্য, বিস্তৃত নদী, ভয়ংকর রহস্যময় এই সুন্দরবন।
ভগবতপুর আসার পথে এক নদীর বাঁকে লঞ্চের হেল্পার ছেলেটা একটা দ্বীপের দিকে আঙুল তুলে বলল, “এসব আগে জলদস্যুদের আখড়া ছিল, দাদা। ঘন জঙ্গল আর সাপখোপে ভরা এইসব জায়গায় গা ঢাকা দেওয়ার সুবিধা তো, তাই। এখন অবশ্য ওসব আপদ নেই।” বলেই একটা সরল হাসি হাসল। যেন সত্যি সত্যি সে কথাটা বিশ্বাস করে এবং আমাদেরও সেটা বিশ্বাস করাতে চায়।
বাকিদের কথা জানি না, তবে আমার গায়ে কাঁটা দিল কথাটা শুনে। জলদস্যু! হ্যাঁ, শুনেছিলাম সেইসব জলদস্যুদের গল্প কিছু কিছু। আচমকা আক্রমণ করে, অপহরণ করে মৎস্যজীবীদের। সত্যিই কি তারা আর নেই? বলা তো যায় না, হয়তো তারা নির্মূল হয়নি এখনও, হয়তো কোণঠাসা হতে হতে তারা পিছিয়ে গেছে আরও দুর্গম কোনও এলাকায়। সত্যিই কি কোনও বিপদ নেই?
কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য সেসব দুশ্চিন্তা মন থেকে বিদায় নিয়েছিল। যত চারপাশটা দেখছিলাম ততই মুগ্ধতা বেড়ে চলেছিল। কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে বন্য প্রকৃতির বুকে হারিয়ে গিয়ে কিছুটা মানসিক প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। তারপরও মনে একটা খচখচানি থেকে গিয়েছিল, জঙ্গল, নদী ছাড়াও সুন্দরবনে যেটা রয়েছে সেই জীববৈচিত্র্যর সিকি ভাগের দর্শনও আমাদের ভাগ্যে জোটেনি। বাঘ-কুমির দূরে থাক, একটা গরুও চোখে পড়েনি রামগঙ্গা থেকে বেরোনোর পর। যদিও নানান রকম পাখি চোখে পড়ছে। বেশ কয়েক প্রজাতির মাছরাঙা ইতিমধ্যে ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। বাঘ দেখার উচ্চাশা আমাদের ছিল না, কিন্তু একটা কুমির বা হরিণও যদি চোখে পড়ত।
ভগবতপুরের লঞ্চ ঘাট থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে কুমির প্রকল্পের দিকে। রাস্তাটা বেশ উঁচু। সেটা দু’পাশে ঢালু হয়ে নেমে গেছে একটা কর্দমাক্ত জমিতে। তার জায়গায় জায়গায় এখনও জল জমে আছে। যেখানে জল নেই সেইসব জায়গায় কাদার ভিতর থেকে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে ম্যানগ্রোভের শেকড়। ভরা জোয়ারে এসব জায়গা হয়তো জলের নিচে থাকে। পাশে ঘন জঙ্গল। এমন রাস্তা দিয়ে পথ চলতে দিনের বেলাতেও বুকটা ঢিপঢিপ করে। ইটে বাঁধানো আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছনো গেল আসল গন্তব্যে। পথে পড়েছে দু’পাশের ঘন জঙ্গল, অচেনা পাখির ঝাঁক আর একটা কংক্রিটের সেতু যার অনেক নিচে একটা সরু খাল, মূলত জোয়ারের জলে পুষ্ট হয় সেটা। ভাটা শুরু হওয়ায় জল ধীরে ধীরে নেমে গেছে। থকথকে কাদার মাঝে সরু আঁকাবাঁকা জলের ধারা নিয়ে সেটা যেন একটা ঘুমন্ত অজগর।


দুই


“রাবিশ! এই টিকটিকির সাইজের কুমির দেখতে এতদূর এলাম?” প্রকল্পে পৌঁছে অতনু রীতিমতো বিরক্ত।
একা একা গুমরানো ওর ধাতে নেই। দলের বাকিরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে গেছে, অগত্যা সামনে পেয়ে আমাকেই শোনাচ্ছে। আমার কিন্তু বেশ লাগছিল। নোনা জলের কুমিরের সংরক্ষণ ও তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। দুটো বিশাল আকারের কুমির আলাদা এনক্লেভে রাখা আছে। তাছাড়া আরও অনেকগুলো ছোটো এনক্লেভ। প্রতিটাতেই বেশ কিছু ছোটো কুমির রাখা। সেগুলো মাঝের ছোটো জলাধারকে ঘিরে রোদ পোহাচ্ছে। কুমিরগুলোর বয়স অনুযায়ী হয়তো এনক্লেভ আলাদা করা হয়েছে। অন্তত দেখে তাই মনে হচ্ছে। একটা জায়গায় দেখলাম কুমিরের অনেক ডিমও রাখা, সব মিলিয়ে বেশ নতুন অভিজ্ঞতা। তবে অতনু একদমই খুশি নয়। সংখ্যার হিসাবে অনেক কুমির এখানে থাকতে পারে, কিন্তু আসলে তো সেগুলো বাচ্চা। সুন্দরবনের সেই ভয়ংকর মৃত্যুদূত বলে এদের কল্পনা করা যায় না। অতনু ভেবেছিল খোলা জলাশয়ে বা পুকুরে হয়তো কুমির দেখবে, তাই সে একটু বেশিই হতাশ। এখানে আসার আগে জায়গাটা সম্পর্কে সামান্য পড়াশোনা করায় অমন কাল্পনিক ছবি আমার মনে অবশ্য ছিল না।
“এর থেকে আলিপুর চিড়িয়াখানায় বেটার কুমির দেখা যায়। পণ্ডশ্রম।” অতনু বলেই চলেছে।
এইরকম অবস্থায় আমি যেটা ভালো পারি সেটাই করলাম, চুপ করে থাকলাম। আমি জানি অতনু যখন রেগে যায় তখন সে কারও কথা শোনে না। উলটে আমি যদি এখন কিছু বোঝাতে যাই তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
“এগুলোকে এখানে আপনাদের মনোরঞ্জন করার জন্য রাখা হয়নি, মিস্টার। কুমির প্রকল্প মানে বোঝেন? বুঝলে এসব কথা বলতেন না।” একটা অত্যন্ত রুক্ষ কণ্ঠস্বর কানে যেতেই চমকে তাকালাম আমরা দু’জন।
যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। এমনিতেই অতনুর গলা শুনে আশেপাশের কিছু পর্যটক আমাদের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। এখন দেখছি একজন মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথাবার্তা শুনেওছেন।
বেশ বয়স্ক একজন মানুষ, বিদেশি। মাথায় হালকা কোঁকড়ানো সাদা চুল। গায়ের রং আগে হয়তো ফর্সাই ছিল, কিন্তু রোদে পুড়ে তা এখন ঈষৎ তামাটে। সামনে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদেরই পাশে। গায়ে একটা চাদর জড়ানো, যদিও তেমন কিছু ঠাণ্ডা নেই এখন। বিদেশি হলেও সাহেব বাংলাটা কাজ চালানোর মতো বলতে পারেন দেখলাম। হয়তো অনেক কাল এখানে আছেন।
“আলিপুর চিড়িয়াখানা আর সুন্দরবনের জঙ্গলে একটা বেসিক ডিফারেন্স রয়েছে। ওখানে এরা শুধুই দ্রষ্টব্য আর আপনারা দর্শনার্থী। কিন্তু এখানে এরা খাদক, আমরা খাদ্য। পরিবেশটা সম্পূর্ণ আলাদা।”
লোকটার তির্যক মন্তব্যের লক্ষ্য যে অতনু তা আমি বুঝতেই পারছি। আকাশে মেঘ জমছিল, এখন ঠাণ্ডা হাওয়াও দিচ্ছে। সেই ঠাণ্ডা হাওয়ায় হোক বা খাদ্য-খাদকের কথায় একটা শিরশিরানি টের পেলাম শরীরে।
লোকটা টুরিস্ট নয়। কারণ, তাহলে বাংলাটা এত রপ্ত হত না। বন দফতরের কেউ হবেন কি? নাহলে কোনও বিশেষজ্ঞ হতে পারেন। শুনেছিলাম সাম্প্রতিক কালে প্রকল্পের মান উন্নয়নের জন্য এখানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এনে ওয়ার্ক শপের ব্যাবস্থা করা হচ্ছে। অন্য সময়ে হয়তো উপেক্ষা করতাম এমন আগন্তুকের কথা, কিন্তু এই লোকটার কণ্ঠস্বরে না জানি কী আকর্ষণ ছিল। শুনতে লাগলাম তিনি আর কী বলেন।
এবার তিনি চাদরের ভিতর থেকে ডানহাতটা বের করলেন। আঙুল দিয়ে একটা এনক্লেভের দিকে দেখালেন। দুটো বড়ো কুমিরের মধ্যে একটা ওখানেই আছে। এটাই হয়তো সবচেয়ে বড়ো। মড়ার মতো পড়ে আছে।
“ইউ আর লাকি ইয়ং ম্যান যে ওটা এনক্লেভের মধ্যে রয়েছে। সুন্দরবনের জলে জঙ্গলে বাঘ আর কুমিরের সামনে পড়লে ব্যাপারটা একেবারেই সুখকর হয় না। দু’দিনের জন্য ঘুরতে এসে তোমরা আফসোস করো কুমির-বাঘ কিছু দেখতে পেলাম না। আর যারা রোজ এখানে বেঁচে থাকার জন্য লড়ে চলেছে, তারা চায় আজ যেন তাদের আর দেখা না পাই। এমন হাজার গল্প ছড়িয়ে আছে সারা সুন্দরবন জুড়ে। মৃত্যুর গল্প। স্বজন হারানোর গল্প। ভালোভাবে কান পাতলেই দেখবে আকাশে বাতাসে ভাসছে হাহাকার।”
তাঁর কড়া কথায় আমরা বেশ অপ্রস্তুতে পড়েছিলাম। তার প্রতিফলন বোধ হয় আমাদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল। ভদ্রলোক ব্যাপারটা হয়তো বুঝেই গলার স্বর কিছুটা তরল করলেন, “সরি মাই বয়, আমি একটু বেশি রুডলি কথা বলেছি হয়তো তোমাদের সাথে। বাট টুরিস্টদের এধরনের মন্তব্য আমাকে খুব বিব্রত করে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা আরও বাড়ানো দরকার। আমি এডওয়ার্ড, কুমির বিশেষজ্ঞ। বাড়ি সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। লাস্ট তিরিশ বছর ইন্ডিয়াতেই আছি।” বলেই করমর্দনের জন্য তিনি হাত বাড়ালেন।
আমরা দু’জনেও নিজেদের পরিচয় দিলাম। অতনু প্রথমে লোকটার কথায় বেশ রেগে গিয়েছিল। দেখেছিলাম তার কানদুটো লাল হয়ে গেছে, কিন্তু বয়স্ক মানুষ বলে হয়তো কিছু বলে উঠতে পারছিল না। এখন দেখলাম গম্ভীরভাবেই করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। মিঃ এডওয়ার্ডের শেষ কয়েকটা কথায় তার রাগ কিছুটা পড়েছে মনে হল। যথাসম্ভব গম্ভীর থাকলেও এখন তার চোখে মুখেও বেশ কৌতূহলের ছাপ।
“আপনি সুন্দরবনে কতদিন ধরে আছেন?” অতনু তার গলার স্বর খানিক তরল করে জিজ্ঞাসা করল।
“একটানা থাকিনি। সিডনি, চেন্নাই আর সুন্দরবনের মধ্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে থেকেছি। সিডনিতে থাকা বলতে বছরে একবার দেশে ফেরা কিছুদিনের জন্য। বাকি সময় ভারতেই।”
“আপনার জানা আছে এরকম কোনও ঘটনার কথা?’’
“ইউ মিন ক্রকোডাইল অ্যাটাক?”
“ইয়েস।”
ভদ্রলোক বললেন, “অনেক ঘটনাই জানি। তবে তোমরা যদি শুনতে চাও, তাহলে একটা বিশেষ ঘটনার কথা বলতে পারি।”
“বলুন।” অতনু নির্বিকারভাবে বললেও আমি জানি সে মনে মনে বেশ উত্তেজিত।
আমি বেশ উত্তেজনা অনুভব করছিলামーবন্য পরিবেশে যদি এমন একটা গল্প শোনা যায়, তাহলে মন্দ কী।
“হুম, সেই কুমিরটাও হয়তো এতটাই বড়ো ছিল, অথবা এর চেয়ে কিছুটা বড়ো।” লোকটা আনমনে বিড়বিড় করলেন, “খবরটা পেপারে বেরিয়েছিল, বাট খুব ছোটো করে। ইয়ার নাইন্টিন নাইনটি সেভেন, মান্থ অক্টোবর।”
তিনি তাঁর গল্প শুরু করলেন।


তিন


ব্রিটেনের এক বন্যপ্রাণ বিষয়ক মাসিক পত্রিকার হয়ে একটা দল সেবার সুন্দরবনে এসেছিল। দলটা মোটামুটি পাঁচ-ছয়জনের। সবার পরিচয় না হলেও চলবে, আপাতত তিনজনের কথা বলি। প্রথমজন মাইক, টিমের মধ্যে যাকে বলা চলে মূল আকর্ষণ। ফর্সা, উচ্চতা ছয় ফুট এক, বয়েস ত্রিশ কি বত্রিশ, অত্যন্ত সাহসী ও উদ্যমী। সে ছিল টিমের ক্যামেরাম্যান, জলে জঙ্গলে পারফেক্ট স্ন্যাপের জন্য সে জান লড়িয়ে দিতেও পিছপা হত না। এর আগে আফ্রিকাতে বেশ কিছু ডকুমেন্টরি শুট করে এসেছে। দ্বিতীয় জন টম, কুমির বিশেষজ্ঞ, মাইকের বড়ো ভাই, আগে ন্যাশানাল জিওগ্রাফির সাথে কিছুদিন যুক্ত ছিল। সে তখন চেন্নাইতে একটি কুমির প্রকল্পে কাজ করছিল। মাইক যখন শুনল তাকে ইন্ডিয়ায় কাজ করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে ফোন লাগাল তার দাদাকে। টম কিন্তু শুধুমাত্র ভাইকে সঙ্গ দিতেই কিছুদিনের ছুটি নিয়ে এসেছিল, পত্রিকার সাথে তার কোনও যোগ ছিল না। তৃতীয় জন স্টিফেন। সে ছিল টিমটার লিডার। এছাড়া লেখালেখির যা কাজ তাকেই করতে হত। একজন লোকাল গাইডও যোগাড় হল, নাম সুন্দর। মাইক মজা করে বলত, ‘বনের নামে সুন্দর, নাকি সুন্দরের নামে বন বুঝতে পারছি না।’
পত্রিকার উদ্দ্যেশ্য ছিল মূলত সুন্দরবনের মানুষ, তাদের জীবন জীবিকা, বন্য প্রাণーএসবের উপর তথ্য সংগ্রহ করে কয়েক কিস্তিতে ছাপবে।
প্রথম দু’দিন দলটা পাথরপ্রতিমা ব্লকের রামগঙ্গায় কাটাল। ভোরবেলা পুরো টিমটা লঞ্চে করে বেরিয়ে পড়ত। তারপর সারাদিন নদীতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো, ছবি তোলা, সুন্দরবনকে চেনার সামান্য চেষ্টা। খুব যে সুবিধা হল তা কিন্তু নয়। তারা ঠিক করল যে ডকুমেন্টরির কাজটা খুব ভালো হবে যদি সুন্দরবনের মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে কিছুদিন কাটানো যায়। ফেল কড়ি, মাখো তেল। সুন্দরের গ্রাম ছিল জঙ্গলের পাশেই। সাহেবদের কাছ থেকে আগাম নিয়ে সে-ই সব ব্যবস্থা করে দিল। নিজেদের গ্রামে দুটো বাড়ি খালি করে সাহেবদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হল।
প্রথম কয়েকদিন মন্দ কাটল না। গ্রামের মানুষদের রোজকার জীবন, তাদের হার না মানা লড়াই, সবকিছুর খুঁটিনাটি যোগাড় করল স্টিফেন আর মাইক। মাইকের উৎসাহ কোনও তরুণকেও হার মানাবে। কখনও বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলছে, কখনও স্টিফেনের সাথে ডকুমেন্টরির কাজ চালাচ্ছে, তো কখনও টমের সাথে বেরিয়ে পড়ছে আশপাশের গ্রাম দেখতে। সুন্দরকে নিয়ে একদিন গ্রামের ধারে জঙ্গলের পাশ থেকেও ঘুরে এল। ফিরল হাঁটু অবধি কাদা মেখে। দেখেই স্টিফেন রীতিমতো রাগারাগি শুরু করল। স্বাভাবিক, টিমের সবার দ্বায়িত্ব সবসময়ই লিডারের।
“মাইক, তোমার কাছ থেকে এতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ আশা করিনি। আমি পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছিলাম যে টিমের কেউ একা একা জঙ্গলের কাছে যাবে না। তোমার কিছু হলে সেটার জন্য আমিই রেস্পন্সিবল থাকব সেটা হয়তো তুমি জানো। যখন তখন যা খুশি বিপদ হতে পারে, টিমের সাথে-সাথেই তোমার থাকা উচিত। এখানে চিকিৎসা পরিষেবাও তো নিজের চোখে দেখলে, ক’টা হসপিটাল আছে? সাপে কাটল, নাকি বাঘে কামড়াল ডাজ নট ম্যাটার, মরতে বসা লোকটাকে নদী পেরিয়ে ওপারে যেতে হবে, তারপর চিকিৎসা। তোমার এই অবস্থা কী করে হল, ক্যান ইউ এক্সপ্লেইন?”
মাইক কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেসে উঠল, “স্টিফেন, আজ যা ছবি তুলেছি সেটা একবার দেখলে তোমার সব রাগ জল হয়ে যাবে। বাঘের পায়ের ছাপ, একদম টাটকা।”
“হোয়াট!”
“হ্যাঁ সাহেব, বাঘটা বোধহয় সকালের দিকে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে খাঁড়ির পাড়ে এসেছিল। গ্রামের উত্তরে যে খাঁড়িটা আছে তার ওপারে পায়ের ছাপ পড়েছে। তবে খাঁড়িটা পেরিয়ে এপারে আসেনি।” সুন্দর বলল।
“তার মানে ছবি তুলতে তুমি... আর সুন্দর, তুমি বাধা দিলে না? তুমি তো জানো এখানে কোথায় বিপদ হতে পারে!” স্টিফেনের গলার ঝাঁঝ বাড়ছে।
“স্যার, আমি বারণ করেছিলাম। কিন্তু মাইক সাহেব শুনলেন না।” সুন্দর বুঝেছে এবার অভিযোগের আঙুল তার দিকে ঘুরছে।
“আরে স্টিফেন, তুমি খামোকা ভয় পাচ্ছ। ভাটা চলছে, খাঁড়িতে জল প্রায় নেই, শুধু থকথকে কাদা। তাই খাঁড়ি পেরিয়ে ওপারে গেলাম। ছবিটা দারুণ এসেছে।”
“তোমার সাথে কথা বলা বৃথা। টম, তুমি অন্তত কিছু বলো।” স্টিফেন এবার টমের দিকে তাকিয়ে বলল।
“মাইক, তুমি কিন্তু সত্যিই অন্যায় করেছ। প্রথমত, টিম লিডারের নির্দেশ মেনে চলাটাই তোমার কর্তব্য। তাছাড়া মানছি তোমার আফ্রিকার এক্সপিরিয়েন্স আছে, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশ। এখানকার বাঘেরা নরখাদক। প্রতিবছর কত মানুষ বাঘের শিকার হয় এখানে তোমার কোনও ধারণা আছে? আর সুন্দরবনে জঙ্গলে যেমন বিপদ, জলেও বিপদ। আফ্রিকার কুমিরদের মতো এখানকার নোনা জলের কুমিররা দল বেঁধে থাকে না। এদের আলাদা আলাদা টেরিটরি থাকে। ওই যে তুমি বললে খাঁড়িতে জল প্রায় ছিল না। ওই সামান্য কাদাজলের মধ্যেই এখানকার কুমিররা চোখের চারপাশের একটু বাদ দিয়ে বাকি অংশ ডুবিয়ে শিকারের অপেক্ষা করতে পারে। দরকারে জলের উপর শরীরের অনেকটা অংশ ছুড়ে দিতে পারে উঁচুতে থাকা শিকারকে ধরার জন্য। সল্ট ওয়াটার ক্রকোডাইলের বাইট ফোর্সও সবচেয়ে বেশি। এরপর আর এরকম করো না ভাই, প্লিজ।”
মাইকের অবশ্য হেলদোল নেই। হাসি হাসি মুখে বলে চলেছে, “আরে বিগ ব্রাদার, এত চিন্তা কী, আমার সাথে সুন্দর আছে তো। এটা তো ওরও টেরিটরি, নাকি?”


চার


স্টিফেন আর টমের চিন্তা অমূলক নয় প্রমাণ হল দু’দিন পরে। দিনটা খুব দৌড়ঝাঁপের মধ্যে গিয়েছিল। টম পরের দিনই ফিরে যাবে, মাইকরাও আর তিনদিন আছে। সেই দিনটাই ছিল কাজের শেষ দিন। পরের দু’দিন বিশ্রাম। সুন্দরের গ্রাম থেকে দক্ষিণে একটা জায়গা ছিল, নাম পীরডাঙা। এখন অবশ্য সেটা ভাঙনে তলিয়ে গেছে। সেখানে বাঁধের কাজ কীভাবে হচ্ছে দেখতে গিয়েছিল সবাই। ভাটার সময়, জল সরে গেছে, বাঁধের কাছে জল কম, জায়গায় জায়গায় জলের বুক থেকে পলির স্তর মাথা তুলেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য হয়তো এতটাই মায়াময় যে অভিজ্ঞ মানুষও ভুল করে বসে। না হলে সুন্দর আর মাইক বাঁধে পা ঝুলিয়ে বসে থাকবেই বা কেন!
কিছু দূরে নদী আরও চওড়া হয়েছে। দু’দিকের তীর-ভূমি ক্রমে আবছা হয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকেলে সাগরের উপর মেঘ জমছে। হু হু করে হাওয়া বইছে। সেই আওয়াজে নিজের কথাই ভালো করে শোনা যায় না। তার মধ্যেই দু’জনে গল্প করছে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে। সুন্দর বলছে, গ্রামে সে-ই সবচেয়ে শিক্ষিত, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ, এমন পাত্রের পাত্রীর অভাব হবে না। সামনের বছরই বিয়েটা সেরে ফেলবে। অন্যদিকে মাইক বলছে, “আমায় বিয়েতে না ডাকলে তোমায় ছুড়ে এই নদীতে ফেলে দেব।”
সুন্দর এখন আর মাইককে সাহেব বলে না। দু’জনে ভীষণ বন্ধু হয়ে গেছে। গল্পে তারা এতটাই মশগুল যে অন্য দিকে হুঁশ নেই।
টম খানিক দূরে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখছিল। মাইকদের থেকে ওর দুরত্ব প্রায় দুশো মিটার। বাতাসের দোলায় নদীতে ঢেউ উঠছে। কী অপরূপ এই সুন্দরবন! হঠাৎ টম খেয়াল করল, স্রোত কেটে কিছু একটা মাইকদের দিকে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। তার অভিজ্ঞতা থেকে সে জানত এটা কী। শিকার খুঁজে পেয়েছে সেই মৃত্যুদূত। জলের উপর চোখ আর পিঠের সামান্য অংশ বাদ দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সেটার লক্ষ্য নিশ্চিতভাবেই মাইকরা।
টম চেঁচাল সবাইকে সতর্ক করার জন্য, কিন্তু হাওয়ার আওয়াজে ওরা কিছু শুনতে পেল না। টম দৌড়তে শুরু করল বাঁধ ধরে।
হঠাৎ কুমিরটা জলের নিচে ডুব দিল। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান, কুমিরটা পৌঁছে গেছে মাইকদের কাছাকাছি। মাইকরা এখনও দেখেনি। বাঁধের কাছে জল কম, কুমিরটার শরীরের অনেকটা এখন আবার জলের উপর ভেসে উঠেছে, ধীরে ধীরে এগোচ্ছে শিকারের দিকে।
টম আবার চিৎকার করল। মাইক সেটা শুনতে পেলেও স্পষ্ট বুঝল না। শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে টমকে দেখতে পেয়ে ইশারায় কাছে আসতে বলল। ঠিক তখনই কুমিরটা জল থেকে লাফিয়ে উঠে ধরে ফেলল সুন্দরের পা। টেনে নিয়ে ফেলল বাঁধের পাশে জল আর কাদার মধ্যে। আচমকা আক্রমণে মাইকও হতবুদ্ধি হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। প্রাণীটা সুন্দরকে আরও গভীর জলে টানার চেষ্টা করছে, কিন্তু সুন্দর হাতের কাছে একটা মোটা দড়ি পেয়ে সেটাকে আঁকড়ে ধরেছে। তবে এ প্রতিরোধ কতক্ষণ স্থায়ী হবে তা সকলেই জানে। সুন্দর চিৎকার করছে, মাইকের নাম নিয়ে সাহায্য চাইছে, আর তার পায়ের রক্তে কাদা মাটি লাল হয়ে যাচ্ছে।
বাঁধের কাজ চলছিল বলে আশেপাশে কিছু বাঁশ পড়ে ছিল। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে মাইক সামনে থাকা একটা বাঁশের টুকরো তুলে নিল। লাফিয়ে নামল বাঁধ থেকে। বাঁশ দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল কুমিরটাকে।
কুমিরটা এই অনাহূত আক্রমণকারীকে মোটেই পছন্দ করল না। লেজের এক ধাক্কায় মাইককে ছিটকে ফেলল আর একটু গভীর জলে। সুন্দরকে ছেড়ে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল নতুন শিকার মাইকের দিকে।
টম ততক্ষণে সেই জায়গায় পৌঁছে কাদার স্তরে নেমে পড়েছে। কিন্তু তার হাত খালি। কাদার মধ্যে দিয়ে এগোনো বেশ কঠিন, নরম পলিতে পায়ের অনেকটা অংশ ডুবে গেছে। তাও সে প্রাণপণে কাদা হাতড়াতে হাতড়াতে এগিয়ে চলল। মাইককে বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টা যে তাকে করতেই হবে। কুমিরের চোখ তার শরীরের একটা দুর্বল স্থান। টম কোনওমতে কাদার মধ্যে দিয়ে কুমিরটার কাছে পৌঁছল। তারপর সজোরে ঘুসি চালাল সেটার চোখ লক্ষ্য করে।
কুমিরটা একটু ছটফটিয়ে উঠল, কিন্তু পরমুহূর্তেই মাথাটা ঘুরিয়ে কামড়ে ধরল টমের বাঁহাত। তারপর পলকের মধ্যে শুরু করল কুখ্যাত এবং ভয়ংকর ‘ডেথ রোল’। টমের চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে এল। ব্যথা-যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে উঠল।
স্টিফেন কিছুদূরে বাঁধ মেরামতির কাজে নিযুক্ত মজুরদের সাথে কথা বলছিল। একটা হই-হল্লার আওয়াজ পেয়ে ওরা সবাই ছুটে এল লাঠিসোটা নিয়ে। টম, সুন্দর আর মাইকের অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাদার মধ্যে। সবাই মিলে লাঠি চালাতে লাগল কুমিরটার উপর। মাইকও নিজেকে সামলে সেই দলে যোগ দিল। কতক্ষণ চলল এমন? হয়তো মিনিট খানেক, টমের মনে হল যেন অনন্তকাল। সে আর সহ্য না করতে পেরে অজ্ঞান হয়ে গেল। অবশেষে এতগুলো মানুষের সাথে পেরে না উঠে কুমিরটা শিকার ছেড়ে পালাল।


পাঁচ


এটুকু বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মিঃ এডওয়ার্ড। আমি বললাম, “তারপর?”
এডওয়ার্ড বললেন, “সুন্দরের চোট সারতে মাস দুয়েক লেগেছিল। পায়ের চেটোয় ইনফেকশন হওয়ার সম্ভবনা থাকলেও সে-যাত্রায় সে বেঁচে গিয়েছিল। মাইকের চোট তেমন কিছু ছিল না, প্রাথমিক চিকিৎসাতেই কাজ হয়ে গেছিল। তবে টমের অবস্থা এতটাই সংকটজনক ছিল যে তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সংক্রমণ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ায় টমের হাতটা বাঁচানো যায়নি, বাদ দিতে হয়েছিল।”
আমি কিছু আর বলার অবস্থায় ছিলাম না। টমের কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু অতনুর খুঁতখুঁতে মন, সে জিজ্ঞাসা করল, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু আপনি নিজেই তো বললেন খবরটা পেপারে খুব ছোটো করে বেরিয়েছিল। আপনি এত খুঁটিনাটি জানলেন কী করে? নাকি কল্পনার রং মিশিয়ে গল্পটা বানালেন? দেখুন, যেকোনও আনাড়ি লোকই গল্পটা শুনে আতঙ্কিত হবে। এই যেমন আমার বন্ধু হয়েছে। দেখুন ওর মুখচোখের অবস্থা। কিন্তু আমায় বোকা বানানো যে অত সহজ নয়, মিঃ এডওয়ার্ড। আপনি এত বিশদে জানলেন কী করে?”
এডওয়ার্ডের ঠোঁটের কোনায় একটা বিষাদ মাখানো হাসি ফুটে উঠল। “কারণ আমি সেখানে ছিলাম, মাই বয়।”
আমি বললাম, “আপনি ওই টিমের মেম্বার ছিলেন!”
তিনি চাদরটা সরালেন আর ধীরে ধীরে বললেন, “মাই বয়, আমার পুরো নাম টমাস এডওয়ার্ড হ্যান্ডারসন, ওখানে সবাই টম বলেই আমাকে ডাকত।”
আমরা দেখলাম এডওয়ার্ডের বাঁহাতটা কনুইয়ের নিচ থেকে নেই। অতনুর দিকে আমি আড়চোখে তাকালাম। বুঝতে পারলাম না সেও কি আমার মতোই আতঙ্কিত?
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক

1 comment: