গল্পঃ ভিতু ভূতের গল্পঃ মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী


ট্রেন থেকে নেমেই নিমাইকাকু টের পেলেন, আজও তিনি একাই নামলেন। বড্ড রাত হয়ে যাচ্ছে আজকাল। উপায়ও নেই, কাজের চাপ বেড়েছে, সামনেই পুজো আসছে বলে কথা। তিনি মালিক হয়ে যদি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চান, তাহলে কর্মচারীরা তো ফাঁকি দেবে। আর এই সময়টাই তো যা একটু লাভের মুখ দেখা। তা না হলে তো আজকাল ঝাঁ-চকচকে দোকানগুলো, ওই যে কী বেশ বলে মল না কী, সেসব এসে তো নিমাইকাকুদের বিক্রিবাট্টা অনেক কমে গেছে।
আধা অন্ধকারে সাবধানে পা ফেলে এগোতে থাকেন নিমাইকাকু। ঝাঁকড়া গাছটার পিছনের ডোবাতে একটা আলো জ্বলে উঠেই মিলিয়ে গেল। আলোটা দেখে নিমাইকাকু নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ির পানে হাঁটতে থাকেন। ওই আলোটা আসলে ভিতু ভূতের লন্ঠনের আলো। ভিতু ভূত ভয় দেখাতে বেরোয় ঠিকই, কিন্তু লন্ঠন নিয়ে। সে লন্ঠনের রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি বহুকাল, ফলে দপদপ করে জ্বলে।
নিমাইকাকু জানেন, ভিতু ভুত বড্ড ভিতু, আজ অবধি বেচারা কাউকে ভয় দেখিয়েই উঠতে পারল না। তবে হ্যাঁ, সবাই জানে সেটা তাই পাড়ার কুকুররা তাকে দেখে ‘ভুপ’ করে ডেকে চুপ করে যায়। কুকুররা বোধহয় দেখতে পায় তাকে, তারা তো অনেক অতিপ্রাকৃত বস্তুও দেখতে পায় কিনা।
ভিতু ভূত কিন্তু নিমাইকাকুকে চেনে। সে জানে, নিমাইকাকু তার অস্তিত্ব স্বীকার করেন। কারণ, প্রায়শই নিমাইকাকু ভিতু ভূতের উদ্দেশ্যে মিষ্টিটা, ফলটা, এমনকি কাঁচা মাছও রেখে যান গাছের গোড়ায়। রেখে ডাক দিয়ে বলেন, ‘খেয়ে নিও।’ কাকুর ধারণা, তাঁর দেওয়া জিনিসগুলো ভূতেই খায়। যদিও ভিতু ভূত নিজে কোনোদিন খায় না, তার তো এখন আর খিদে পায়ই না। সে পাখপাখালিকে দেয়, ডোবার মাছেদের দেয়। সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই কাক বেচারাদের খিদে পায় না? ওরা নিচু স্বরে ‘আঃ আঃ’ করতে থাকে খিদেয়। তখন ব্রেকফাস্টে যদি কাঁচা মাছ পায়, কতটা খুশি হবে ওরা সেটা ভিতু ভূত জানে না?
নিমাইকাকু অবশ্য ভিতু ভূতকে তুষ্ট রাখতেই তাকে খেতে-টেতে দেন। সে কাউকে ভয় না দেখালেও তার উপস্থিতি টের পেয়ে কোনও প্রোমোটার আর ওই ঝাঁকড়া গাছ কাটার বা ডোবা বোজানোর চেষ্টা করে না। একাধিক বার তারা চেষ্টা চালিয়েছিল বৈকি। প্রতিবারই হয় তাদের মেশিন বিগড়ে যায়, না হলে করাত ভেঙে যায়। আর ডোবার জলে যত মাটিই ফেলুক বোজানোর জন্য, সেগুলো ভিতু ভূত তুলে তুলে পাড়ে রেখে দেয়। বেশ কয়েকবার একই ঘটনা ঘটায় প্রোমোটারের দল আর সাহস দেখাতে পারে না। আসলে ভিতু ভূত নিজের থাকার জায়গা চলে যাওয়ার ভয়েই প্রোমোটারদের মেশিন বা গাছ কাটার করাত সব নষ্ট করত। সে তো বহুবছর এই গাছের কোটরে থাকে না? ওই ঝাঁকড়া গাছ আর পচা ডোবাই তো তার ঘরবাড়ি। আগে পাড়ার লোক ডোবা নোংরা করলেও এখন সেখানে পদ্মফুল ফোটে। ভূতের ভয়ে অবশ্য ছেলেপিলেরাও ডোবার ধারে খেলতে যায় না। সেই যে একবার সাঁতার না জানা খোকা ডোবার জলে পড়া বল তুলতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছিল, বাকিরা তাকে না বাঁচালেও ভিতু ভূত তাকে ঠেলে জলের ধারে পাঠিয়ে বাঁচিয়েছিল। তখনই সবাই বোঝে ভূত আছে। ব্যস, আর কেউ খেলতেও আসে না, নোংরা ফেলতেও আসে না। ভিতু ভূতই কোথা থেকে পদ্ম-বীজ এনে লাগিয়েছে। এখন পুজোর সময়ে কিছু মানুষ ওই ডোবার পদ্মফুল তুলে বিক্রি করে দুটো পয়সা রোজগার করে।
নিমাইকাকুদের পাড়াটা অবশ্য তাঁর ছোটোবেলার মতো নেই আর। অমন চাপ চাপ অন্ধকার আর নেই, কারণ রাস্তায় আলো লেগেছে। নিভু নিভু হলেও আলো তো। তার ওপর রাস্তা পাকা হয়েছে, বাড়িগুলো পাকা হয়েছে। সব বাড়িতে ইলেক্ট্রিকের আলো। তাও ওই ঝাঁকড়া গাছ আর ডোবা একদম একইভাবে রয়েছে শুধু ভিতু ভূতের উপস্থিতির ফলে।
এদিকে হয়েছে কী, নিমাইকাকুর সাথে সেদিন অনেক টাকা, বাড়ির সবার জন্য পুজোর বাজার এসব ছিল। সেটা কিছু ছিনতাইকারী খবর পেয়ে সেই ট্রেন থেকেই লুকিয়ে পিছু নিয়েছে নিমাইকাকুর। নিমাইকাকু বুঝতেই পারেননি। তিনি তো ভেবেছেন তিনি একাই নেমেছেন এই ট্রেনে। ভিতু ভূত কিন্তু দেখে ফেলেছে লোকগুলোকে। সেদিনও নিমাইকাকু গাছের গোড়ায় মিষ্টি, মাছ রেখে ডাক দিলেন। ভিতু ভূত অনেক চেষ্টা করল নিমাই কাকুকে বলতে ছিনতাইকারীদের কথা। নিমাইকাকু শুনতে পেলে তো? তিনি তো তখন মনের আনন্দে শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে চলেছেন। তাঁর বেসুরো গলার গান শুনে পাড়ার বাড়িগুলো জানালা ঝপঝপ বন্ধ হল, যাদের বাইরের আলো জ্বলছিল নিভিয়ে দিল। কুকুরগুলো ডাকব কি ডাকব না করতে করতে হঠাৎ সবাই শুনতে পায়, ‘ওরে বাবা রে মা রে, মরে গেলাম রে’ চিৎকার আর তার সাথে কুকুরদের প্রবল ডাকাডাকি। নিমাইকাকুর গান বন্ধ। সাথে পাড়ার লোকেরাও হৈ হৈ করে বেরিয়ে এসেছে। সবাই ভেবেছে নিমাইকাকুরই কোনও বিপদ বুঝি। বড়ো বড়ো টর্চ-ফর্চ নিয়ে সবাই খুঁজতে খুঁজতে দেখে ওই ঝাঁকড়া গাছের নিচে কাদা মাখা কতগুলো অচেনা মানুষ। পরস্পরকে ধরে কাঁদছে, ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।
নিমাইকাকুদের পাড়ার মানুষরা কিনা ভালো মনের মানুষ, তাই এদের দশা দেখে চোর বুঝতে পেরেও তাদের তুলে নিয়ে আসে, চোখমুখ ধোওয়ার জল দেয়। তারপর তাদের মুখেই শোনে যে, তারা ছিনতাইকারী। আজ খবর পেয়েছিল নিমাইকাকু অনেক টাকা, পুজোর বাজার নিয়ে ঘরে ফিরছেন। তারা সেগুলো কেড়ে নেওয়ার জন্যই সুযোগ খুঁজছিল। এরই মধ্যে কোথাও কিচ্ছু নেই, তাদের গায়ে মাথায় পচা গন্ধ কাদা, পাঁক থপ থপ করে এসে পড়তে থাকে। ওরা কিছু বোঝার আগেই কে যেন ওদের জামার কলারে টান দিয়ে নিয়ে গেল গাছের গোড়ায়।
পাড়ার মানুষের আর কিছুই করতে হল না। মুখে মুখে রটে গেল ওই এলাকায় ভূতের উপদ্রবের কথা। তাই চোর-চোট্টা, গুণ্ডা-বদমাশ কেউ আর ও-পাড়ায় আসতে সাহস পায় না। তবে এখন শুধু নিমাইকাকু নন, পাড়ার অন্য মানুষেও কৃতজ্ঞতা জানাতে খাবার রেখে যায় ভীতু ভূতের জন্য। এখন আরও বেশি বেশি খেতে দিতে পারে সে তার পোষ্য বন্ধুদের। নিশ্চিন্তে থাকতে লাগল ভিতু ভূত। সে বুঝে গেছে, তাকে কেউ তাড়াবে না তার বাড়ি থেকে।
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

No comments:

Post a Comment