গল্পঃ পেয়ারাতলাঃ বনশ্রী মিত্র


বাড়ির বাইরের উঠোনে দুপুরবেলা লুডোর কোর্ট নিয়ে একা বসে খেলছে পিউ। সাপ-লুডো। কতবার যে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে আর সাপের মুখে পড়ে নেমে আসছে। ছুটির দুপুরে সবাই যখন খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমোয়, তখন উঠোনে বসে এই রঙিন লুডোর কোর্টে সাপ-লুডো খেলতে খুব ভালোবাসে সে। আগে টুপুর সঙ্গে সে উঠোনের পাশে পেয়ারাতলায় বসে খেলত। ভাই টুপুকে প্রায় রোজই হারিয়ে দিত সে। হেরে গিয়ে টুপু কান্না জুড়ে দিত। ভাইয়ের মন ভোলাতে পিউ তখন গাছের পেয়ারা পেড়ে দিত টুপুকে। আর টুপুও হেরে যাওয়ার দুঃখ ভুলে দিদিকে বলত, “আরেক দান খেলবি, দিদি?”
কিন্তু এখন তো আর টুপুর সাথে খেলার কোনও উপায় নেই। কাকিমা টুপুকে আর পিউর সঙ্গে খেলতে দেয় না। পিউর মাও পিউকে বারণ করে দিয়েছে, সে যেন টুপুকে আর না ডাকে।
ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর পিউদের বাড়িতে সবকিছু কেমন যেন পালটে গেল। বাবা আর কাকুর একদিন খুব ঝগড়া হল। বাবা বলল, বড়ো ঘরটা পিউ পাবে। কাকু বলল, বড়ো ঘরটা টুপুকে দিতে হবে, কারণ টুপু ঘোষালবাড়ির নাতি।
পিউ তখন স্কুলে বেরোবে। বাবা আর কাকুর সবকথা শুনেছিল সে। সে তো প্রায় বলেই ফেলেছিল যে বড়ো ঘর তার চাই না, তোমরা ও-নিয়ে ঝগড়া কোরো না। কিন্তু ঠিক তখনই তার স্কুল বাস এসে গেল, আর মা তাকে খুব তাড়া লাগাল।
সেদিন স্কুল থেকে ফিরে আর টুপুকে দেখতে পায়নি সে। কাকিমার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। অনেকবার দরজা ধাক্কানোর পর ঘরের ভেতর থেকে কাকিমা খুব কড়া গলায় বলেছিল, টুপু ঘুমোচ্ছে। ওকে যেন আর বিরক্ত না করে পিউ। তারপর থেকে সবকিছুই পালটে গেল পিউদের বাড়িতে। মা শুধু বাবা আর পিউয়ের জন্য রান্না করে, আর কাকিমা করে কাকু আর টুপুর জন্য। একসঙ্গে আর খেতে বসে না তারা। টুপুর থালা থেকে আর আলুভাজা তুলে খাওয়া হয় না পিউয়ের। দিদির গেলাস থেকে জল খেয়ে আর পালায় না টুপু।
খেলনাওয়ালা খেলনা বিক্রি করতে এসে আর একসঙ্গে পায় না পিউ-টুপুকে। উড়োজাহাজ, রেলগাড়ি, টিয়াপাখি–কে কোনটা নেবে তা নিয়ে আর মারামারি হয় না পিউদের উঠোনে। পেয়ারাতলায় আর কোনও হুটোপুটি নেই, ভাইবোনের আর সেই খেলা নেই।
একদিন লুকিয়ে লুকিয়ে পিউ আর টুপু ছাদে খেলছিল। ছোটোকাকু দেখতে পেয়ে খুব বকাবকি করল টুপুকে আর টানতে টানতে তাকে নিচে নিয়ে চলে গেল। তারপর থেকে টুপুর সঙ্গে পিউর আর কথা হয় না।
আজ যখন সে একাই উঠোনে বসে লুডো খেলছে, পেয়ারাগাছে টিয়াপাখিগুলো খুঁটে খুঁটে পেয়ারা খাচ্ছে, তখন হঠাৎ একটা ছোটো ঢিল এসে পড়ল পিউর গায়ে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাকিমার ঘরের জানালায় টুপুকে দেখতে পেল পিউ। জানালার কাছে যেতেই টুপু ফিসফিস করে বলল, “দিদি, আমিও খেলব।”
আর তারপরেই আস্তে করে দরজা খুলে বেরিয়ে এল টুপু। ভাইকে নিয়ে পেয়ারাতলায় গিয়ে বসল সে। টুপুর গায়ে হাত দিতেই হাতটা ছ্যাঁৎ করে উঠল পিউর। “তোর জ্বর হয়েছে?”
“হ্যাঁ। মাকে বলিনি।” ঘাড় নেড়ে বলল টুপু।
“ওমা, সে কি! বলিসনি কেন কাকিমাকে?”
“বললেই তো ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত। তবে আমি পালাতাম কী করে!” টুপু চোখ বড়ো বড়ো করে বলে। “আচ্ছা দিদি, সবাই ঘর নিয়ে কেন এত ঝগড়া করে বল তো! আমার বড়ো ঘর চাই না। কতবার বলেছি। কিন্তু কেউ শোনেই না আমার কথা। জানিস দিদি, বাবা বলছিল কেস করবে। কেস কী রে দিদি?”
পিউ ভাইয়ের কথা শুনতে শুনতে লুডোর কোর্ট গোছাতে থাকে। তারও ঘর চাই না। শুধু এই পেয়ারাতলাটা পিউ আর টুপুকে দিয়ে সব ঘরগুলো বড়োরা নিয়ে নিক। টুপুর সাথে পিউ এই পেয়ারাতলাতেই থাকবে।
কেস হলে উকিল আসে, কোর্টে যেতে হয়ㄧএসব কিছু কিছু জানে পিউ। কিন্তু ভাইকে আর সেসব কথা না বলে লাল-নীল ঘুঁটিগুলো টুপুর হাতে দিতে থাকে সে।
সেদিন ইচ্ছে করে লুডোর দান খারাপ করে দিল পিউ। টুপু বুঝতেও পারল না, ইচ্ছে করে সাপের মুখে গিয়ে পড়ল পিউ আর বারবার অনেকটা নিচে নেমে গেল। খানিকক্ষণের মধ্যেই টুপু অনায়াসে জিতে গেল। দিদিকে হারানোর আনন্দে খুব লাফালাফি করল সে। কিন্তু তার শরীরটা ভালো লাগছে না। জ্বর বোধহয় বাড়ছে।
“তুই বরং ঘরে চলে যা, টুপু। কাকিমাকে গিয়ে বল, ওষুধ দেবে।”
“আরেক দান খেল না, দিদি। দেখবি আবার তোকে হারিয়ে দেব।”
এবার বেশ কড়া শাসনের গলায় পাঁচ বছরের ভাইটাকে ধমক দিল তার এগারো বছরের দিদি, “না। এখন ঘরে যা টুপু। মেঘ ডাকছে। আবার পরে খেলব। মনে করে ওষুধ খাস কিন্তু।” ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পিউ।
ডেলা ডেলা কালো মেঘ কোথা থেকে যেন সাঁতরে সাঁতরে এসে পিউদের ছাদের ওপরে জমা হচ্ছে। বর্ষা এসে গেল।


পাড়ায় মেলা বসেছে। সন্ধেবেলা মায়ের সাথে মেলায় যায় পিউ। কিন্তু টুপুকে ছাড়া জিলিপিতে কোনও স্বাদ পেল না সে। মা তাকে একটা পুঁথির মালা কিনে দিল, কিন্তু সে মালা পরতে তার মন চাইল না। হঠাৎ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল পিউ।
“ওমা, কাঁদছিস কেন, পিউ?” পিউয়ের মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আমার মালা চাই না। আমার কিচ্ছু চাই না।” কাঁদতে কাঁদতে পিউ বাড়ির দিকে ছুটে পালায়।
সারারাত খুব জোরে বৃষ্টি হল। পিউদের উঠোনে থৈ থৈ জল। টুপুর গায়ে মোটা কাঁথা চাপা দিয়ে আরেকবার মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিল টুপুর মা।
রাতে পিউ স্বপ্ন দেখল, একটা বড়ো নৌকো এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পেয়ারাতলায়। বৃষ্টির জলে তাদের বাড়িটা একটা বড়ো নদী হয়ে গেছে। নদী পেরিয়ে সবাই নৌকোয় গিয়ে বসছে। বাবা, মা, কাকু, কাকিমা। টুপু একহাঁটু জলে দাঁড়িয়ে আছে। পিউ তাকে নৌকোয় টেনে তোলার চেষ্টা করছে। মাঝি খুব তাড়া দিচ্ছে পিউ আর টুপুকে। ভাইয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রয়েছে পিউ।


কলকাতায় রোজই প্রায় বৃষ্টি হচ্ছে। পিউদের বাড়ির সামনে একহাঁটু জল। এর মধ্যে শহর জুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আজ দু’দিন হল টুপু হাসপাতালে ভর্তি। বাবা-মা হাসপাতালে টুপুকে দেখে এসেছে। কাকিমা সারাদিন শুধু কাঁদে। মা কাকিমার পাশে পাশে থাকে। এই বিপদের সময় টুপুর পথ্যি বাবা কিনে আনে। কাকুর জলখাবার মা তৈরি করে দেয়। রবিবার পিউ যাবে হাসপাতালে টুপুকে দেখতে। খেলনার দোকান থেকে টুপুর জন্য একটা বাঘ কিনে এনেছে পিউ। হাসপাতালে নিয়ে যাবে ভাইয়ের জন্য।


দুর্গাপুজোর পরেই হাওয়ায় একটা শিরশিরানি ভাব। বিকেলবেলা গায়ে একটা সোয়েটার চাপিয়ে তাদের ঘরের জানালায় বসে আছে পিউ। মা আর কাকিমা পাশের ঘরে। পুজোয় এবার সে একটাও ঠাকুর দেখেনি। পাশের বাড়ির রুমকি তাকে ডাকতে এসেছিল। কিন্তু পিউ বেরোয়নি।
তাদের বাড়িতে অনেক কিছুই আবার আগের মতো হয়ে গেছে। বাবা আর কাকু এখন পাশাপাশি বসেই খায় আর একসঙ্গে অফিসে বেরোয়। মা আর কাকিমা সঙ্গে সঙ্গে থাকে।
লুডোর কোর্টটা আলমারিতে তুলে রেখেছে পিউ। পেয়ারাতলায় আর যায় না সে।
বড়ো ঘরের ভাগ নিয়ে আর তাদের বাড়িতে কেউ ঝগড়া করে না। ছুটির দুপুরে খেলনাওয়ালা ফাঁকা পেয়ারাতলায় আওয়াজ দিয়ে চলে যায়। জানালায় একা বসে টিয়াপাখিগুলোকে পেয়ারাতলা থেকে উড়ে যেতে দেখে পিউ।
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment