গল্পঃ শম্ভুর মাঃ কস্তুরী মুখার্জী


একটা ছোট্ট কলাই করা কাঁসির মধ্যে গোটা পাঁচেক তেলাপিয়া মাছ নিয়ে কোমর পর্যন্ত জবজবে ভিজে, একটা ভাঙা ছাতা মাথায় দিয়ে শম্ভুর মা মুলি বাঁশের গেটটা খুলে বারান্দার কাছে আসতেই ছোটোমাসি অবাক হয়ে বলে উঠল, “ও বাবা, শম্ভুর মা! এই দুর্যোগ মাথায় করে কাজে এসেছ? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? কাপড়টা ভিজে একসা হয়ে গেছে।”
“সেটা কোনও কতা হল গে ছোড়দি? এই মাতা ভাঙা জলে তুমি কেমন করে পুকুরে যাবে বলো দিকিন! ন্যাও ধরো। আসার পতে দেকলুম বোসেদের পুকুর ছাপিয়ে রাস্তায় এক হাঁটু জল। কচি বুড়ো সবাই গামচা ডুবিয়ে মাছ ধরচে। আমি তকন রাধের বৌর থেকে এই কাঁসিখান চেয়ে ক’টা তেলাপিয়া পেলুম, নে আসলুম তোমার জন্য। বেশ কষা করে রাদো দিকিন।” বারান্দার সিঁড়ির কাছে হেঁট হয়ে মাছের কাঁসিটা ছোটোমাসিকে এগিয়ে দিতে দিতে ফিরিস্তি দিতে লাগল।
“ওরে আমার কপাল রে! মাছ নিয়ে এসে হাজির। আচ্ছা দাঁড়াও, আমি শুকনো কাপড়-শায়া দিচ্ছি, পরে নাও। তারপর কাজে লাগো।”
“ও ছোড়দি, কাপড় গায়ে শুকিয়ে যাবে। অত চিন্তা কোরো নি তো বাপু। গরিবের শরীল। সব সহ্যি হয় গো। ন্যাও ন্যাও, আমি ছাই নে এসে কুটে দিচ্চি মাছ ক’টা।” দোক্তা মুখে এক গাল হেসে শম্ভুর মা বলল।
ছোটোমাসি অদ্ভুত এক ভালোবাসার চোখে শম্ভুর মায়ের দিকে তাকিয়ে মাছটা নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।


সাঁতরাগাছিতে আমার ছোটোমাসি ষাটের দশকে বাড়ি করে এসেছিল। মেসোমশাই তখন প্রায় মৃত্যুশয্যায়। গৃহপ্রবেশের একমাসের মধ্যে তিনি পরলোকে যান। ছোটোমাসি তার দত্তক ছেলে পরাণকে নিয়ে দিনযাপন শুরু করে। ছোটোবেলা থেকেই এই শম্ভুর মাকে ছোটোমাসির বাড়ি কাজ করতে দেখেছি। মিলের মোটা থান কাপড়, আধা কাঁচাপাকা চুল, স্বাস্থ্যবতী, কালো রঙের এই শম্ভুর মা আমাদের ছোটোদের সবার ‘শম্ভুর মা মাসি’। কাজের সময় গায়ে ব্লাউজ দেখিনি। হাসিখুশি এক অমায়িক মানুষ। গলার স্বরে এক আন্তরিকতা ছিল যা ছোটোবড়ো সকলকে আপন করে নিত। পঞ্চাননতলায় টালির চাল দেওয়া উঁচু মাটির বাড়ি ছিল। ভোরবেলায় বাড়ির কাজ সেরে শম্ভুর মা কাজে বেরিয়ে পড়ত। নরম স্বভাবের এই মানুষটা আমার মনের বড়ো কাছের ছিল।


“ছোড়দি, রান্না হয়ে গেচে?”
“কিছুটা হয়েছে। শম্ভুর মা, মাছ রাখো এই বাটিতে। আমি রান্নার যোগাড় করি।”
“ছোড়দি, দাও পেঁয়াজ বেটে দিই। নংকা আর আদাও খানিক দাও।” রান্নাঘরে শিল পেতে নোড়া ধুয়ে ভেজা শাড়ি নিয়ে বসে ছোটোমাসিকে বলল।
“না। আমি বেটে নিচ্ছি। তুমি কথা না বলে যাও তো, বাসনটুকু দিয়ে বাড়ি যাও। আমি তোমার জন্য রেখে দেব। কাল খাবে। বিকেলে আর আসবে না।”
“না গো, আমি একটু যোগাড় দিয়ে দিই। তোমার চটপট হয়ে যাবে। ছোড়দি, আমার একোনো দু’বাড়ি কাজ আচে। সেরে একেনে এসে খাবার নে বাড়ি ফিরব। শম্ভুটা কতদিন মাছ খায় না গো ছোড়দি। আমি একেনে খেতে পারবু নি গো।” কথাগুলো বলতে বলতে শম্ভুর মায়ের গলার স্বর বুজে এল।
গরিব-বড়লোক সব মায়ের সংজ্ঞা এক। নাড়ির টানের বুঝি কোনও ভেদাভেদ হয় না। শম্ভু দিনের পর দিন মাছ খেতে পারে না, তাই শম্ভুর মাও এখানে মাছ খায় না। যখনই ছোটোমাসি মাছ-মাংস দেয়, শম্ভুর মা ছেলের জন্য বাটি করে নিয়ে যায়। মা তো!


বিকেলের দিকে বৃষ্টি আরও ঝেঁপে এল। পুকুর, ডোবা সব টইটম্বুর। পথে জল প্রায় হাঁটু ছড়িয়ে গেছে। নিচু জায়গায় কোমর ছুঁই ছুঁই। ছোটোমাসির বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’ পড়ছি। উপন্যাসের মধ্যে ডুবে গেছি। বাইরে বৃষ্টির আওয়াজের সঙ্গে দূর থেকে দুই একটা বাচ্চার জলে ঝাপাঝাপির শব্দ কানে আসছে।
শম্ভুর মা আড়াইটা নাগাদ বাটিতে শম্ভুর জন্য তেলাপিয়া মাছ আর একহাতে ছাতা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হল। “চলি গো ছোড়দি।”
“হ্যাঁ, এসো। পথঘাট জলে থৈ থৈ। শম্ভুর মা, খুব সাবধানে যেও। এইরকম বৃষ্টি থাকলে কাল এসো না।”
“সে হবে’খন। পুঁটুলি মামণি, চলি।” শম্ভুর মা আমাকে চেঁচিয়ে বলে পথের দিকে পা বাড়াল।
কখন ছোটোমাসি পাশে এসে বসেছে টের পাইনি। বই পড়তে পড়তে খানিক অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ছোটোমাসির কথায় চমকে উঠলাম। ছোটোমাসি বলল, “পুঁটলি, এই দুর্যোগে শম্ভুর মা না খেয়ে ভিজতে ভিজতে গেল। শুধু মাছটা ছেলেটার মুখে তুলে দেবে বলে। কম দূর ওর বাড়ি! দুগ্গা দুগ্গা বলে পৌঁছে যায় যেন।”
“ঠিক বলেছ, ছোটোমাসি। ভিজে ওর শীত করছিল। আমাকে বলল তো, ‘পুঁটুলি মামণি, খুব শীত ধরেচে গো। শরিলটা কনকন করচে।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা মাসি, ছোটোমাসি তোমাকে শুকনো শাড়ি দিতে চাইল, তুমি নিলে না কেন? এইভাবে জল গায়ে বসত না। জ্বর না এসে যায়।’ তখন শম্ভুর মা  কী বলল জানো?”
“কী বলল রে?” ছোটোমাসি জিজ্ঞেস করল।
“বললো, ‘দূর বোকা মেয়ে। আমি বেদবা মানুষ। ছোড়দির পাড় দেওয়া শাড়ি আমি পরতে পারি?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয় পরলে?’ উত্তর দিল, ‘পুঁটুলি মামণি, তুমি বড়ো ছেলে মানুষ। আমাদের ঘরে বেদবারা পাড় দেওয়া শাড়ি পরলে ছেলের বেপদ হয়। শুব-অশুব বলে কতা আছে তো! বাপ মরা ছেলে শম্ভু আমার। জান থাকতে ওকে বেপদে ফেলতে পারি?’ কী কুসংস্কার বলো ছোটোমাসি?”
চুপ করে বাইরের বৃষ্টির দিকে একটু তাকিয়ে থেকে ছোটোমাসি উত্তর দিল, “মায়ের মন সব কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে। ওর একটু অশুদ্ধচারিতার জন্য শম্ভুর যদি কোনও অমঙ্গল হয়!”
“তবুও... এর জন্য কখনও অমঙ্গল হতে পারে? তুমি বিশ্বাস করো এইসব?” আমি অবিশ্বাসের সুরে বললাম।
“ও যে মা, পুঁটলি।” ছোটোমাসির কেমন আনমনা গলার স্বর কানে এল।


পরের দিন ভোরবেলা। ঘড়িতে পাঁচটা বোধহয় বাজে। দরজা ধাক্কার শব্দ। আমি আর ছোটোমাসি জেগে গেছি। পরাণদা আগের দিন ভোরে দেউলটিতে ওর এক বন্ধুর বাড়ি গেছে। আমরা দু’জন বাড়িতে। ছোটোমাসি মশারির ভেতর থেকেই সাড়া দিল, “কে?”
“পিসি, আমি বিনু। দরজা খোলো।”
“বিনু! এত ভোরে?” বিনুর নাম শুনে মশারি খুলে খাট থেকে নামতে নামতে ছোটোমাসি জিজ্ঞেস করছে।
কাঠের খিল সরিয়ে ছিটকিনি খুলে দেখে পাড়ার বিনু, হরি দাঁড়িয়ে। ছোটোমাসি অবাক। “কী হয়েছে?”
“পরাণ কই?”
“পরাণ তো কাল দেউলটি গেছে বন্ধুর বাড়ি। আজ রাতে আসার কথা। কেন রে, কী হয়েছে?” এক অজানা আশঙ্কায় ছোটোমাসির গলার স্বর কেঁপে গেল। আমিও বিছানা থেকে নেমে দরজার কাছে এলাম।
“গদাইকে চেনো তো?”
“হ্যাঁ।”
“গদাই ভোরের বেলা সবজির ভ্যান নিয়ে পঞ্চাননতলা থেকে বাজারের দিকে আসছিল। পথ আর পুকুর জলে এক হয়ে গেছে। দিক বোঝা যাচ্ছে না। তখনও আধো অন্ধকার ছিল। হঠাৎ ভ্যানের চাকাটা কীসে যেন ধাক্কা খেল। গদাই ভ্যান থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে দেখে রাস্তার মধ্যে উপুড় হয়ে এক মহিলা পড়ে রয়েছে। ও তখন আশেপাশের লোকজন ডেকে তুলে লাশটা চিত করে আচমকা শক খেয়েছে। এ যে শম্ভুর মা!”
“কী বললি বিনু? শম্ভুর মা!” ছোটোমাসির ভয়ার্ত গলা শোনা গেল।
“হ্যাঁ পিসি, শম্ভুর মা।” বিনু বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছে।
শম্ভুর মা অবরে সবরে বিনুর মা অর্থাৎ মজুমদার কাকিমাকে থোড়, মোচা, এঁচোড় কেটে দিত। বিনুদের বাড়ি থেকে রোজ ছোটোমাসিকে খবরের কাগজ এনে দিত। ছোটো ছেলেমেয়েদের প্রতি অকৃপণ ভালোবাসা ছিল মানুষটার মধ্যে। শম্ভুর মা নেই! কানে মিষ্টি ডাকটা বাজছে, ‘পুঁটুলি মামণি।’
বারান্দায় লেপটে বসে হরিদা, বিনুদা, ছোটোমাসি। আমি চৌকাঠের ধরে দাঁড়িয়ে আছি। পাড়ার আরও কয়েকজন এসেছে। হরিদা বারান্দার পিলারে ঠেস দিয়ে বসে পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে। ভোরের ঝিরিঝিরি হাওয়ায় জলে হালকা স্রোত উঠছে। সেইভাবেই বলল, “গদাই বলছিল, শম্ভুর মা পড়ে আছে, মুখে রক্ত। আর একটা বাটি জলে ভাসছে। রান্না করা তেলাপিয়া মাছ চারদিকে ছড়িয়ে আছে। বোধ হয় শম্ভুর জন্য নিয়ে যাচ্ছিল।”
কথাটা শুনে আমার কেমন গা গুলিয়ে উঠল। কষা কষা তেলাপিয়া মাছের গন্ধ নাকে ভেসে এল। দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ধপ করে বসে পড়লাম। ছোটোমাসিকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলাম।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

1 comment: