গল্পঃ মলুটির প্রদীপঃ দীপক দাস


প্রথমে ফরফর করে একটা আওয়াজ। তারপর জোর কোরাসে ‘ধর ধর, পালাল পালাল’। মোরগটা উড়ে গিয়ে বসল ধানের গোলার চালে।
ছয় ঘুরনচাকি মলুটিতে এসেছি। কচি, বাবলা, দীপু, শুভ, ইন্দ্র আর আমি। জায়গাটা ঝাড়খণ্ডে। রামপুরহাট থেকে গাড়িতে আসা যায়। দল বেঁধে মাঝেমাঝেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি আমরা। ছুটিছাটা পেলেই কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে যাত্রা। যখন তখন ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি বলে আমাদের দলটাকে অনেকে ঘুরনচাকি বলে। নামটা দিয়েছেন শুভর এক মাস্টারমশাই। স্যারের ছোটোবেলায় ইউ.এফ.ও নিয়ে খুব চর্চা হত। ইউ.এফ.ও মানে ভিনগ্রহীদের মহাকাশযান। পুরো নাম ‘আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট’। মাস্টারমশাই বলেছিলেন, সেইসময়ে ইউ.এফ.ও-র বাংলা করা হয়েছিল উড়নচাকি। অনেক গল্পও লেখা হয়েছে উড়নচাকি নিয়ে। উড়নচাকির সঙ্গে মিল রেখে আমাদের নাম ঘুরনচাকি। জঙ্গল-পাহাড়ে চক্কর কাটি আমরা।
এমন নাম দেবেন না-ই বা কেন? আজ দুর্গাপুজোর সপ্তমী। বন্ধু, ভাইবোনেরা কোথায় কোথায় ঠাকুর দেখতে যাবে, কোন মণ্ডপে আগে ঢুঁ মারবে তার পরিকল্পনা করছে। আর আমরা ছ’জন মলুটির অজ গাঁয়ে ঘুরতে এসেছি। পুজোর মধ্যে ট্যুর করেছি বলে এবার তো রাগে অরিজিৎ, জুয়েল, ধেপু আর রাজা আসেনি। ওরা কলকাতায় সারারাত ঠাকুর দেখবে। জুয়েল তো আমাদের শাসিয়ে রেখেছে, একেকটা মণ্ডপে ঢুকবে আর সেলফি তুলে ফেসবুকে আপডেট দেবে। ছবিতে আমাদের ট্যাগ করে লিখবে, ‘আপনারা কী মিস করিলেন’।
তাতে অবশ্য আমাদের কিছু আসবে যাবে না। এখানে ইন্টারনেটের সমস্যা। ওদের পোস্ট আমরা দেখতে পাব না। যখন পাব তখন আমাদের হাতেও অস্ত্র মজুত হয়ে যাবে। মলুটির প্রকৃতি অসাধারণ। চন্দননালা নামের ছোট্ট নদীটার পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা প্রচুর ছবি তুলেছি। সেসব ছবি ফেসবুকে কভার পিকচার করলে ওরা চোখ বড়ো বড়ো, মুখ হাঁ করা ‘ওয়াও’ ইমোজি দিতে বাধ্য। জায়গাটা এত সুন্দর যে কচি তো বলেই ফেলল, “কলকাতার লাখ টাকার দুর্গা মলুটির কাছে তিন গোল খাবে!”
বন্ধুদের সঙ্গে ফেসবুক যুদ্ধ তো পরে হবে। ইন্টারনেট সংযোগ মিললে। এখন আমাদের চিন্তা, মোরগ লড়াইয়ে কীভাবে জেতা যায়! মোরগটা গোলার চালে গলা উঁচিয়ে হাওয়া মোরগের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে ঘাড়টা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখছে। আমরা ছ’জন বুরবক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের এমন হেনস্থায় মোরগটার বোধহয় মজা লাগছে। একবার ‘কোঁকরকক’ করে ডেকে উঠল। আর আমি রাগ রাগ চোখে ইন্দ্রর দিকে তাকালাম। ওর নানা বায়নাক্কার জন্য আমাদের প্রত্যেকবার সমস্যায় পড়তে হয়। বেশিরভাগ বায়নাই অবশ্য খাওয়াদাওয়া নিয়ে।


***


বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। গ্রাম দেখতে। বেশ অন্যরকম ছাঁদের বাড়িঘর। মাটির একতলা, দোতলা বাড়ির সঙ্গে পাকাবাড়িও রয়েছে। বেশ কয়েকটা বাড়ির পাঁচিলে ফুল, লতাপাতার ছবি আঁকা। খুব ভালো লাগছিল হাঁটতে। আমরা হাঁটছি। ইন্দ্র কিন্তু মাঝে মাঝেই আওড়ে চলেছে, ‘রাতে কী খাওয়া হবে? রাতে কী খাব?’ ও খেতে ভালোবাসে। তবে আজকের কারণ অবশ্য কিছুটা আলাদা। দুপুরে আমাদের ঠিকমতো খাওয়া হয়নি। রামপুরহাট থেকে মলুটি আসতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। এই রুটে একটাই বাস চলে। কিন্তু কী কারণে বাসটা এলই না আজ। অনেক দরাদরি করে টোটো ভাড়া করে মলুটি আসি। পৌঁছেই বুঝতে পারি, একটা বড়ো ভুল করে ফেলেছি। রামপুরহাট থেকে দুপুরের খাবার কিনে নেওয়া দরকার ছিল। তখন ভরদুপুর। এলাকা প্রায় শুনশান। মৌলীক্ষা মন্দিরের সামনে একটা টোটো আর একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। ভক্তরা পুজো দিতে এসেছেন। আগে থাকার বন্দোবস্ত করলাম। মন্দিরের একটা ধর্মশালা রয়েছে। সেখানেই আশ্রয় নিলাম। তারপরেই খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়া।
এলাকায় মাত্র দুটো দোকান। একটা একেবারেই খোলামেলা। তার কোনও ঝাঁপ নেই, আগল নেই। দোকানের সামনে ছাগল, কুকুর ভিড় করে আছে। ওখানে কিছু মিলবে না। পাকা ঘরের দোকানটায় গেলাম। কিন্তু কিচ্ছু নেই। অগত্যা সেই খোলামেলা দোকানেই ফিরে আসা। দোকানটা বছর আঠারোর একটা ছেলে আর তার মা মিলে চালায়। ছেলেটার নাম প্রেমশঙ্কর। কিন্তু প্রেমশঙ্করের দোকানেও প্রায় কিছু নেই। কয়েকটা চপ পড়ে রয়েছে একটা চুপড়িতে। মুড়ি আছে। আর ডিম। আমরা মুড়ি নিলাম। চুপড়ির সব চপ দিয়ে দিতে বললাম। বেশি চপ নেই অবশ্য। গোটা সাতেকই পড়ে। মাথাপিছু একটা করেই হবে। এতে পেট ভরবে না। প্রেমশঙ্করকে ডিম সেদ্ধ করে দিতে বলা হল। পেট না ভরুক, কিছুটা পুষ্টি হোক। বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছি ডিম সুষম খাদ্য।
ডিম সেদ্ধ হচ্ছে। আমরা গল্প করছি। তখন মনে পড়ল, মুড়ি তো নিচ্ছি, খাব কীসে? দোকানদার থালা-বাটি দিতে চেয়েছিল। দীপু শালপাতার ঠোঙা দিতে বলল। আমরা বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় ঘোরার সময়ে বহু জায়গায় দেখেছি, লোকজন শালপাতার ঠোঙায় মুড়ি খাচ্ছে। আমরাও খেয়েছি। ঘুরতে বেরোলে পাতা-টাতাতেই আমাদের বেশি আগ্রহ। খাওয়াদাওয়া নিয়ে কোনও বাছবিচার নেই। পেটে কিছু দিতে পারলেই হল। তারপর ঘুরে বেড়াও। আজও মুড়ি, চপ আর ডিম দিয়ে একখানা ড্যাঞ্চি লাঞ্চ হবে। এত সস্তায় বোধহয় কোথাও লাঞ্চ করিনি।
ড্যাঞ্চি শব্দটার পিছনে একটা গল্প আছে। একসময়ে বাঙালিরা পশ্চিমে মানে অবিভক্ত বিহারের নানা অংশে ছুটি কাটাতে আসত। আর এখানকার খাবারদাবার, দুধ, ডিম, দেশি মুরগির দাম শুনে অবাক হয়ে বলত, ‘ড্যাম চিপ।’ ড্যাম চিপ শব্দ দুটোই মিলেমিশে ড্যাঞ্চি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ইংরেজি না জানা মানুষগুলো ড্যাঞ্চি বলতেন। মানে খুব সস্তা।
এসব নিয়েই হাসাহাসি করছিলাম। তখনই ছেলেটাকে চোখে পড়ল। দোকানের মাচায় বসে। ছেলেটা শুধু দেখছিল আমাদের। জিজ্ঞাসা করলাম, “কী নাম রে তোর?”
বলল। কিন্তু ভাষার টানে বুঝতে পারলাম না। প্রেমশঙ্কর বলল, “ওর নাম প্রদীপ।”
কেন জানি না মনে হল, ও ডিম খেতে চায়। হয়তো ওর মলিন পোশাক দেখে। হয়তো ডিম, চপ আর আমাদের দিকে তাকানো দেখে। ওকে বললাম, “কী রে প্রদীপ, ডিম খাবি?”
ও মাথা নাড়ল। বলল, ডিম খাবে না। বাজি কিনবে।
আমরা ওকে খেতে দিতে চাইছি আর ও কিনা বাজি কিনতে চাইছে? একটু রাগ হল। ছদ্ম ধমক দিয়ে বললাম, “বাজি কিনতে হবে না। বাজি ফাটালে পরিবেশ দূষণ হয়। তুই ডিম খা। এই প্রেমশঙ্কর, আরেকটা ডিম সেদ্ধ দাও।”
ছেলেটা আর কিছু বলল না। আমরা খাবার নিয়ে চলে গেলাম।
ধর্মশালায় ইন্দ্র তখন চানটান করে তৈরি। ঝটপট হামলে পড়ল। আমাদের চান হয়নি। সামনের নদীতে চান করতে যাব বলে ঠিক ছিল। কিন্তু ইন্দ্রর রূপ দেখে চান স্থগিত রইল। দুপুরে কিছু পেটে না পড়লে মুশকিল। ইন্দ্র যেভাবে হামলে পড়েছে তাতে আমাদের মুড়ি, চপ ওর পেটে তলিয়ে গেলে!


***


দুপুরে ভালো করে খাওয়া হয়নি বলেই ইন্দ্র চাইছিল রাতের খাওয়াটা জম্পেশ হোক। তাই দেশি মুরগির বায়না। এখানে প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই মুরগি রয়েছে। চরে বেড়ানো মুরগি দেখলেই ইন্দ্র বলে উঠছিল, “রাতে কী খাব?”
“দেশিই খাব। কিন্তু আগে তো মোরগটাকে ধরা দরকার!”
যাঁর মুরগি তিনিও আমাদের মতোই হাঁ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বর্ষার পরে গোলার চাল সারাই হয়নি। জল পেয়ে পচে গিয়েছে বাঁশ, বাখারি। তিনি উঠলে ভেঙে পড়তে পারে। হঠাৎ প্রদীপ বলল, “আমি ধরে দিব?”
দোকানে সেই মোলাকাতের পর থেকে প্রদীপ চিনে গিয়েছে আমাদের। বিকেলে আমরা যখন বেরোচ্ছি, ও মন্দিরের সামনের বটগাছতলায় বসেছিল। আমাদের দেখে ছুটে চলে এসেছিল। প্রদীপকে মোরগটা ধরে দিতে বললাম। বছর দশেকের ছেলেটা তরতর করে ধানের গোলার পাশে পেয়ারাগাছটায় উঠে পড়ল। তারপর আস্তে করে নামল গোলার চালে। মোরগটার পিছন দিকে। গুঁড়ি মেরে এগিয়ে খপ করে ধরে ফেলল সেটাকে। আচমকা আক্রমণে কঁক কঁক করে ডেকে উঠল মোরগটা। আর আমরা চেঁচিয়ে উঠলাম বিজয় উল্লাসে।
ধর্মশালার উলটোদিকেই একটা মুরগির দোকান। প্রদীপকে বলা হল মোরগটা দোকানে দিয়ে আসতে। ওটার পাশেই সেই ছোট্ট খাবারের দোকান। রাতের খাবার ওই দোকান থেকেই নিতে হবে। প্রেমশঙ্কর সন্ধেবেলায় চপ ভাজে না।
প্রদীপ মোরগটা হাতে ঝুলিয়ে হাঁটতে শুরু করেছিল। কচি ওকে ডাকল। তারপর কাছে গিয়ে বলল, “রাতে এসে একটু মাংস নিয়ে যাস রে।”
কিন্তু প্রদীপ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কচিকে বলল, “বাজি কিনব, পয়সা দিবে?”
আমরা আবার হইহই করে উঠলাম। বাজি! পাগল? দূষণ! বাবলা তো বুকে হাত দিয়ে হ্যা হ্যা করে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “শ্বাসকষ্ট, শ্বাসকষ্ট। বাজি ফাটাতে নেই।”
ছেলেটা ঘাবড়ে গিয়ে চলে গেল।
সন্ধে পর্যন্ত সারা গ্রাম চষে ফেললাম। গ্রামে কত মন্দির। কতরকমের কারুকাজ। মোট বাহাত্তরটি মন্দির আছে গ্রামে। গায়ে গায়ে লাগানো। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম চুমড়ে নদীর পাড়ে। একজন জাল ফেলছিলেন নদীতে। দু-চারটে ল্যাটা আর পোনা মাছ ধরা পড়েছে। আমরা ছবি তুললাম।
ঘুরতে ঘুরতে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। যথারীতি ইন্দ্রর আবার খিদে পেয়ে গিয়েছে। শুভরও বোধহয়। ও আবার সরাসরি খাওয়ার কথা বলতে লজ্জা পায়। কিছুক্ষণ আগে একবার বলেছিল, “রান্নায় খুব ঝাল দেবে না তো?”
তার মানে এবার ফেরা দরকার।
দোকান থেকে মাংস আর রুটি নিয়ে ঢুকে পড়লাম ধর্মশালায়। হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় খবরের কাগজ পেতে শালপাতায় মাংস-রুটি ভাগ করে দিল দীপু। খেতে শুরু করেছি, মনে হল দরজার পাশ দিয়ে একটা ছায়া সরে গেল। রাস্তায় প্রচুর কুকুর। দুপুরেই একটা ঘরে ঢুকে পড়েছিল। এখানে রাস্তায় সৌরবিদ্যুতে আলো জ্বলে। সে আলোর জোর কম। তাপবিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ভোল্টেজ এত কম যে ধর্মশালার পাখা প্রায় ঘুরছেই না। বাইরের হাওয়া যাতে আসে সেজন্য দরজাটা খোলাই ছিল। খেতে শুরু করতে যাব, আবার ছায়াটা দরজার সামনে এল। একটা বাচ্চা ছেলে। প্রদীপ। কচি ডাকল, “প্রদীপ আয়।”
ভুলেই গিয়েছিলাম প্রদীপকে মাংস দেওয়ার কথা। ছেলেটা ঘরে ঢুকল। আর আমরা এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলাম। এই তাকানোর মানেটা খুব সোজা। মাংসের ভাগ দিতে হবে। দেশি মুরগির স্বাদ নেওয়া একটু কম হয়ে যাবে। কিন্তু শুরুটা করবে কে? দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে আমারই করা উচিত। কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই কচি ওর পাত থেকে অনেকটা মাংস তুলে একটা শালপাতায় রাখল। অতিরিক্ত পাতা ছিলই। তারপর দুটো রুটি পাতায় দিয়ে প্রদীপের হাতে দিল। প্রদীপ বলল, “মাংস লয় গো। বাজি ফাটাইব। পয়সা দিবে?”
কাছেই একটা দুর্গাপুজো হচ্ছে। সকাল থেকে দেখেছি, ছেলেরা বাজি ফাটাচ্ছে। বাচ্চা ছেলে তো। সেসব দেখে ওরও ফাটাতে ইচ্ছে করছে। কচি আস্তে আস্তে বলল, “চল, তোকে বাড়ি দিয়ে আসি।”
প্রদীপ বলল, “না গো, যেতে পারব।”
তবুও কচি ওর সঙ্গে গেল।
আমরা তখন সবাই খাবার ছেড়ে উঠে এসেছি। রাস্তার মৃদু আলোয় দেখলাম, ছেলেটা শালপাতাটা হাতে ধরে ধীরে ধীরে মৌলীক্ষা মন্দিরের পাশ দিয়ে নদীর দিকের রাস্তায় হেঁটে চলেছে। কচি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুকুরগুলো ভাগ্যিস নেই।
প্রদীপ গেস্ট হাউসটা পেরিয়ে যাওয়ার পরে আমরা খেতে বসলাম। খেতে বসে প্রচুর মজা করি আমরা। কিন্তু আজ আমরা কেউই কথা বলছিলাম না। সকলের ভাগ থেকে একটু একটু করে মাংস কচির পাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ও লাগবে না বলছিল। কিন্তু আমরা ওর কথা শুনিনি। কোনওমতে খাওয়া শেষ করলাম।
ঘুমতে যাওয়ার আগে আড্ডাটাও জমল না তেমন। আমরা পয়সা খরচ করে ঘুরতে এসেছি। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছি। আর সেখানকার শিশুরাই…
সকালে আর প্রদীপের কথা একদম মনে ছিল না। তখন প্রবল তাড়াহুড়ো। গতকাল মন্দির দেখে ফেরার সময়ে একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। গোপাল দাস মুখার্জি। উনি গ্রামের মন্দিরগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছেন। সফলও হয়েছেন। এখন তো এই এলাকা হেরিটেজ সাইট। গোপালবাবু ওঁর সংগ্রহে থাকা কয়েকটা জিনিস দেখিয়েছিলেন। প্রস্তর যুগের কয়েকটি হাতিয়ার। পাথরের তৈরি সেই অস্ত্র দিয়ে শিকার করা, পশুর মাংস কাটা, ছাল ছাড়ানো যেত। অস্ত্রগুলো পাওয়া গিয়েছিল শিরালি নামে এক জায়গায়। মলুটির কাছেই। এখন আমরা সেখানে যাব।
দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে প্রেমশঙ্করের দোকানে গেলাম। ওর দোকানে এখন সব আছে। ঘুগনি, চপ, ওমলেট, ডিমসেদ্ধ। আমরা জম্পেশ করে খেয়ে নিলাম। ফিরে আর খাওয়ার সময় মিলবে কি না কে জানে। এসেই তো ট্রেন ধরতে ছুটতে হবে। রামপুরহাট থেকে দুমকার ট্রেন ধরব। বছর দুয়েক হল দুমকা পর্যন্ত নতুন লাইন পাতা হয়েছে। লাইনের দু’পাশের সৌন্দর্য অসাধারণ। সেসবই দেখব।
আমরা খাচ্ছিলাম। কচি হঠাৎ প্রেমশঙ্করকে জিজ্ঞাসা করল, “প্রদীপ আসেনি?”
তাই তো! সকাল থেকে ছেলেটার কথা তো মনেই ছিল না। প্রেমশঙ্কর জানাল, সকাল থেকে দেখতে পায়নি ওকে। কচি টুকটুক করে প্রদীপের কথা জিজ্ঞাসা করছিল। খেতে খেতে আমরা শুনছিলাম। প্রদীপের বাবা একটা পাথর ভাঙার কলে কাজ করতেন। কলেই একটা দুর্ঘটনায় কোমর ভেঙে যায়। প্রদীপের মা পাথর কলে কাজ করেন। কোনওমতে চলে যায়। ওরা দুই ভাই। প্রদীপ বড়ো। ক্লাস ফোরে পড়ে। ভাইটা বোধহয় দ্বিতীয় শ্রেণিতে। ছেলেটা খুব ভালো। ভাইকে চান করিয়ে, খাইয়ে ইস্কুলে নিয়ে যায়। মিড ডে মিল নিয়ে বাড়িতে চলে আসে। বাবাকে খাইয়ে দেয়। নিজে খায়। ও ভাইকে খুব ভালোবাসে। এই যে ও মাঝে মাঝে বাজি কিনে দিতে বলছে সেটা কিন্তু নিজের জন্য নয়। ভাই বোম ফাটাবে বলে বায়না করছিল, তাই।
ঘুরতে যাওয়ার তাড়া ছিল। দ্রুত দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম।
শিরালি জায়গাটা খুব সুন্দর। এখানেই মিলেছিল সেই প্রস্তর যুগের অস্ত্র। বনবাসী মানুষ এই এলাকায় পাথরের অস্ত্র নিয়ে শিকারের খোঁজে ঘুরে বেড়াত। কল্পনায় যেন দেখতে পেলাম আমাদের পূর্বপুরুষদের। একটা শিকারকে ঘিরে উল্লাস করছে তারা। তারপর পাথরের অস্ত্র দিয়ে সুচারুভাবে শিকারের ছাল ছাড়িয়ে নিল। দু’জনের হাতে ছিল পাথরের কুড়ুল। সেটা দিয়ে টুকরো টুকরো করতে শুরু করল শিকারকে…
“এবার কিন্তু ফিরতে হবে।”
দীপুর কথায় ভেঙে গেল কল্পনার ছবিটা। তার কারণও আছে। ঘুরতে গিয়ে কোনও জায়গা ভালো লেগে গেলে আমরা সেখানে নড়তে চাই না সহজে। প্রকৃতির রূপ দু’চোখ ভরে দেখা, ফটো সেশন চলতেই থাকে। দীপু আমাদের টাইম ম্যানেজার। ও সময়মতো মনে করায় সবকিছু।
ফিরে এলাম ধর্মশালায়। তারপর ব্যাগপত্তর গুছিয়ে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি ঠিক করাই ছিল। কাছেই বাড়ি চালকের। উনি ঠিক সময়ে গাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছেন।
দেখতে দেখতে গাড়ি পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়ল। দুটো রাজ্যকে খুব সহজে আলাদা করা যায় না এখানে। একটা মাইল ফলক দেখে বুঝলাম আমরা বীরভূমে ঢুকে পড়েছি। গাড়িচালক দাদা খুব ভালো। প্রচুর গল্প বলছেন। এলাকার গল্প। মলুটিতে প্রচুর বাঙালি থাকেন। তাঁদের বেশিরভাগই বাইরে কাজ করেন। কিন্তু কালীপুজোর সময়ে সবাই গ্রামে ফিরে আসেন। রাস্তার দু’পাশে প্রচুর গাছ। তারপর মাঠ। চাষবাস হয়েছে। মাঠ পেরিয়ে একটা, দুটো পাড়া দেখা যাচ্ছে। চালকদাদা কথায় কথায় বললেন, “সামনের একটা গ্রামে বাজি তৈরি হয়। খুব সস্তা।”
সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্র আর বাবলা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, বাজি কিনে নিয়ে যাবে। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। ট্রেনে বাজি নিয়ে ওঠা আইন-বিরুদ্ধ কাজ। কিন্তু ইন্দ্র বলল, ব্যাগের একদম নিচে ঢুকিয়ে দেবে। কিচ্ছু হবে না। মনে মনে হাসলাম। প্রদীপ যখন বোম কিনে দিতে বলছিল, আমরা পরিবেশ দূষণ, শ্বাসকষ্ট কত লম্বাচওড়া জ্ঞান দিয়েছি। এখন নিজেরাই সেই নীতি-আদর্শের ধার দিয়ে যাচ্ছি না। শুধু সস্তায় মিলছে বলে।
ওরা বাজি কিনতে নেমে গেল। আমি আর কচি গাড়িতেই বসে রইলাম। দলের ক্যাপ্টেন হয়ে আইন-বিরুদ্ধ কাজ করতে পারি না। কচিরও বোধহয় সেই মত। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি কচি মত বদলাল। বাজি কিনতে চলে গেল।
কেনাকাটা শেষ করে সবাই গাড়িতে ফিরেছে। চালকদাদা স্টার্টও দিয়েছেন। হঠাৎ কচি বলল, পাওয়ার ব্যাঙ্কটা ধর্মশালার জানালায় ফেলে এসেছে। সর্বনাশ! এখন এতটা পথ ফিরতে হবে! ট্রেন পাওয়াটা চাপের হবে। ভালো করে মনে করতে বললাম। ভুল করে ব্যাগে পুরে নেয়নি তো? কচি না বলল। গাড়ি আবার ঘুরল মলুটির দিকে।
ধর্মশালার সামনে গাড়ি থামতে কচি লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামল। কিন্তু ধর্মশালায় ঢুকল না। দৌড় লাগাল প্রেমশঙ্করের দোকানের দিকে। ওখানে ফেলে এসেছে? আমরাও গেলাম দোকানে। কিন্তু কচি পাওয়ার ব্যাঙ্কের কোনও কথাই জিজ্ঞাসা করল না প্রেমশঙ্করকে। ও প্রদীপের বাড়ি কোথায় জানতে চাইল। প্রেমশঙ্কর বলল, চন্দননালা নদীর পাশ দিয়ে যেতে হয়। ও আঙুল দিয়ে যেদিকটা দেখাল সেই দিকেই আমরা চান করতে গিয়েছিলাম।
কী যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কচি কি প্রদীপকে সন্দেহ করছে? কিন্তু কী করে সম্ভব? ও তো আমাদের ঘরের দরজা পর্যন্ত এসেছিল। তাহলে? এখন আর ভাবার সময় নেই। শুধু বুঝতে পারছি, দ্রুত প্রদীপের বাড়ি যেতে হবে। ইশারা করে গাড়িটা ডাকলাম।
চন্দননালার পারে গাড়ি থামতেই কচি ওর ব্যাগটা নিয়ে ছুট লাগাল। ওর পিছন পিছন আমরাও। ওদের বাড়ি খুঁজতে দেরি হল না। একজন দেখিয়ে দিয়েছিল। টিনের ছাউনি দেওয়া একচিলতে ঘর। কিন্তু ঘরে দরজায় শিকল তোলা। আমাদের কথাবার্তা শুনে এক মহিলা এগিয়ে এলেন। কচি প্রদীপের কথা জিজ্ঞাসা করল। ওই মহিলা বললেন, আজ সকালে প্রদীপের বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ওর মা বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছেন। প্রদীপ আর ওর ভাইকে নিজের বাড়িতে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ওরাও কাঁদতে কাঁদতে ভ্যানের পিছনে ছুটেছে। বাবা কষ্টে এমন করছিলেন যে দুই ভাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কচি। তারপর প্রদীপদের বাড়ির দাওয়ায় ব্যাগটা নামিয়ে কী যেন খুঁজতে শুরু করল। ব্যাগ থেকে হাত বের করতে দেখি, বাজির প্যাকেটটা। যেটা শেষমুহূর্তে কিনেছে ও। কচি দাওয়ায় উঠে বাজিভর্তি প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগটা প্রদীপদের ঘরের শিকলে বেঁধে দিল। তারপর নেমে এল। আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে। ওই মহিলাও অবাক হয়ে আমাদের দেখছিলেন। কচি আমার কাছে এসে আস্তে আস্তে বলল, “হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে প্রদীপের ভাই বাজি ফাটাবে, বলো?” ওর গলাটা কেমন যেন ভিজে ভিজে।
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলুম। বাকিরাও।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

No comments:

Post a Comment