গল্পঃ রায়দিঘির যখঃ শর্মিষ্ঠা ব্যানার্জী

“এই তবে তোদের সেই রায়দিঘি? বাব্বা, কত্ত বড়ো রে! এপার থেকে ওপার দেখা যায় না।” রন্টু অবাক গলায় বলল।
সত্যিই তাই। এটাকে দিঘি না বলে বরং ঝিল বলাই চলে। আমাদের কলকাতার ঢাকুরিয়া লেকের  চাইতেও বড়ো দিঘিটা। ওপারে থাকা জঙ্গলটাকেও কেমন ঝাপসা ঝাপসা দেখাচ্ছে এপার থেকে। বিকেলের সূর্যও এবার ঘুমে ঢুলে ঢুলে পড়ছে, একটু পরেই টুকুস করে জঙ্গলের পিছনে মুখ লুকোল বলে। দিঘির ধারটা পুরো শুনশান। আমরা তিনজন ছাড়া আর কোনও লোক দেখতে পাচ্ছি না। অবশ্য মিনিট দশেক আগে একটা ছেলেকে একপাল ছাগল নিয়ে হ্যাট হ্যাট করে লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে দিঘির পুবদিকে মাঠ পেরিয়ে দূরে দেখা কতগুলো মাটির ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছিলাম। দীপু অবশ্য বলেছিল ওটা বুনো পাড়া। এটাই গ্রামের শেষ পাড়া। এরপর দিঘি, আর তারপর যতদূর চোখ যায় জঙ্গল আর জঙ্গল। আর জঙ্গল শেষেই নদী।
অন্ধকার নেমে যাচ্ছে দেখে দীপু তাড়া দিল, “বিল্টুদাদা এবার চল, সন্ধে হয়ে আসছে, মা বকবে দেরি হলে। তাছাড়া তোদের তো বলেইছি জায়গাটা খুব একটা ভালো নয়। এই তো ক’দিন আগেই পরপর দু’জন লোক অদ্ভুতভাবে জলে ডুবে মারা গেছে, তাও রাতের বেলায়। বুঝতে পারছিস তো?”
রন্টু দীপুর কথায় হি হি করে হেসে ফেলল। বলল, “দেখ দাদা, দীপুদাটা কী ভিতু রে! এখনও কেমন বিকেলের আলো আছে, কী সুন্দর ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে, কত্ত পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ। আর এমন সুন্দর পরিবেশে কিনা দীপুদাটা আমাদের ভয় দেখাচ্ছে! বলে কিনা জায়গাটা ভালো নয়।”
রন্টু বলল বটে, তবে এই জায়গাটাতে আমারও সত্যি কেমন গা ছমছম করছে। সন্ধে নামেনি এখনও, তবুও দিঘির ধারে বাঁশবাগান থেকে একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক আর হাওয়ায় বাঁশঝাড়ের মড়মড় আওয়াজ মাঝে মাঝে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল আমার। সত্যি, এই দীপুটাই সব আজগুবি গল্প শুনিয়ে আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে বটে।
তবুও গ্রামের রাস্তা চিনি না, আর এখানে কলকাতার মতো মোড়ে মোড়ে স্ট্রিট ল্যাম্প ও জ্বলে না। তাই রন্টুকে একটু ধমকেই বললাম, “থাক থাক, আর হেসে কাজ নেই। চল বরং ফিরেই যাই। ভূতপ্রেত না থাকুক, এই গরমে গ্রামের রাস্তায় প্রচুর বিষধর সাপখোপ থাকে। একবার গায়ে পা পড়লে না, ব্যস দেখতে হবে না। ওই মিঠুনের ডায়ালগের মতো এক ছোবলেই ছবি হয়ে যাব। বুঝলি?”
দীপু অমনি তডিঘডি বলে উঠল, “উফ্‌ বিল্টুদাদা, তোমরা কলকাতায় থাকো কিন্ত কিচ্ছু জানো না। রাতে ওদের নাম নেয় না গো! বলো লতা, লতা।”
রন্টুও অমনি বলল, “নাও। দেখ দাদা, আবার দীপুদাটা শুরু হয়ে গেল। শুধুমুধু সাপকে লতা বলব কেন রে?”
দীপু তখন দিঘির পাড় ছেড়ে রাস্তায় উঠে পড়েছে। গোমড়া মুখে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, “আচ্ছা, ঠাম্মার কাছে নয় বাড়ি ফিরে জিজ্ঞেস করে দেখো ঠিক বলছি কি না। এবার জলদি পা চালাও, নইলে মার কাছে কিন্ত সত্যিই খুব বকা খাব।”
আসলে হয়েছে কী, এবারের গরমের ছুটিতে তিনমাস আগে থেকে বাবা কুলু, মানালি, সিমলা যাবার টিকিট কেটে রেখেছিল। কিন্ত আগের মাসে ঠাম্মা বাথরুমে হড়কে পড়েই মুশকিলটি ঘটিয়েছে। কোমরের হাড় না ভাঙলেও ঠাম্মার কোমর ফুলে যাচ্ছেতাই অবস্থা। কলকাতার নামি অর্থোপেডিক দেখিয়েও সারে না। কোমরের হাড় নাকি সরে গেছে, অগত্যা অপারেশন করো। কিন্ত ঠাম্মা অপারেশনের নাম শুনেই ভয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। ঠাম্মার বোন মাসি-ঠাম্মি থাকে যাদবপুরে। ঠাম্মা পড়ে গেছে দেখে বাবাকে বলল, “শানু, তুই বরং দিদিকে ভেলোরে নিয়ে যা, ওখানে সব বড়ো বড়ো ডাক্তার, চিকিৎসার খরচও এখানের চেয়ে অনেক কম। দেখ যদি অপারেশন না করে কিছু করতে পারে। আমি গতবছর তোর মেসোর গেঁটে বাতের চিকিৎসার জন্য গেছিলাম। চোখের সামনেই তো দেখছিস মেসো এখন অনেকটা ভালো হাঁটছে আগের চেয়ে।”
সেই মাসি-ঠাম্মিই বাবাকে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, হোটেল ঠিক করে দেওয়া সব ঠিকঠাক করে দিয়েছে। আর সিমলা যাবার জন্য অফিসে তো বাবার আগেই ছুটির দরখাস্ত জমা দেওয়া ছিল। ব্যস। সমস্যা ছিল আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে। মা, বাবা, দাদু, ঠাম্মা তো চলল ডাক্তার দেখাতে, কিন্ত সেখানে আমাদের নিয়ে যাবার তো কোনও দরকার নেই। তাছাড়া আমরাই বা ওখানে গিয়ে করবটা কী? এদিকে মামার বাড়ির দিদা-দাদুন গেছে ছোটোমামার কাছে ইউ.এস.এ। তাহলে আমরা কোথায় যাই? শ্রীরামপুরে আমাদের মেজোমাসি থাকে। মা-বাবা ঠিক করেছিল আমাদের মাসির ওখানেই রেখে আসবে যাবার দু’দিন আগে। যদিও আমাদের দুই ভাইয়ের একদম ইচ্ছে নয় শ্রীরামপুরে থাকার। কারণ, মাসির দুই বিচ্ছু মেয়েーতমালী আর রুদালি। উফ্‌, ওরা তো মেয়ে নয়, দুটো চলন্ত বিছে একেবারে। একবার আমাদের বাড়িতে এসে আমার আর রন্টুর বই, খাতা, জামা, খেলনা কিচ্ছু আস্ত রাখেনি। বাপ রে, দুই বোনই যমজ, তাই কে যে দস্যিপনা করছে বোঝা শক্ত হত। রন্টুর সাধের কাঠের ব্যাটখানা পর্যন্ত ভেঙে দু-আধখানা করে দিয়েছিল। কিন্ত কিচ্ছু বলার নেই, যতই হোক ছোটো বোন বলে কথা। তবুও শ্রীরামপুর যে যাওয়ার আর দরকার পড়ল না এর জন্য পিসুনকেই ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। ঠাকুমার পড়ে যাবার খবর শুনে পিসুন হঠাৎ করেই এর মধ্যে একদিন কলকাতার বাড়ি এসে পড়েছিল। পিসির বাড়ি অনেকদূর, তাই পিসি চাইলেও সংসার ফেলে আসতে পারে না। তাই পিসুন নিজেই এসেছিল খবর নিতে। মায়েদের ভেলোর যাবার কথা শুনে আর আমাদের রেখে যাবার চিন্তার কথা শুনে পিসুনই বলল, “বিল্টু আর রন্টুকে ক’দিন আমার ওখানে নিয়ে গেলে কি কোনও অসুবিধা হবে, বৌদি?”
মায়ের তেমন ইচ্ছা না থাকলেও আমাদের আগ্রহে আর কোনও ওজর আপত্তি টিকল না। তবুও আসার সময় মা পইপই করে বলে দিয়েছিল, “গ্রামে যাচ্ছ, পুকুরে নামবে না, আদাড়েবাদাড়ে ঘুরবে না। আর রন্টুকে সবসময় চোখে চোখে রাখবে। বড্ড দুষ্টু যে।” ব্যস, অমনি পিসুনের সাথে ঘণ্টা খানেক ট্রেন জার্নি করে কালই সবে পৌঁছেছি পিসির গ্রামের বাড়িতে।
কী মিষ্টি নাম গ্রামের! ইচ্ছাপুর। বাংলাদেশের বর্ডারের কাছেই ছোট্ট ছিমছাম, ছায়া নিবিড় এই সুন্দর গ্রামে না এলে সত্যিই খুব আফসোস হত। কিন্ত এসে থেকেই দীপুর মুখে এই রায়দিঘির কথা শুনছি, তাই বিকেলে বেড়াতে এদিকে এসেছিলাম।
সন্ধেবেলার দিকেই ধপ করে লোডশেডিং হয়ে যায় এখানে। এখানে নাকি এমনই হয়, একেই দেখছিলাম টিমটিমে কারেন্টের আলো। পাখা তো যেন হাঁপানি রুগির মতো ক্যাঁচকোঁচ করে ঘুরছে। তবুও ছিল। গেল তো পুরো বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার। তবে পিসি এর মধ্যেই বিকেলেই হ্যারিকেনে তেল ভরে মুছে রেডি করে রেখেছিল, তাই আলো যেতেই সেই হ্যারিকেনের আলো জ্বেলে আমরা রান্নাঘরের দাওয়ায় বসলাম পিসির শাশুড়ি মানে ঠাম্মাকে ঘিরে। বাড়িটা বেশ সুন্দর। চারদিক ঘেরা, মাঝে উঠোন, একদিকে মূল বাড়ি, তার তিনদিকে রান্নাঘর, বাথরুম, আর গোয়ালঘর। গোয়ালঘরের দিকটায় খিড়কির দরজা। সেটার পর বাঁশবাগান, আর সেটা পেরিয়েই রায়দিঘি। উঠোনের মাঝে বড়ো ধানের মড়াই, মানে ধান রাখার জায়গা। আজ সকালেই ঘুরে ঘুরে দেখে নিয়েছি। পিসি এক জাম বাটি মুড়ি তেল, পেঁয়াজ, লঙ্কা আর চানাচুর দিয়ে জবজবে করে মেখে দিয়েছে। সেটা থেকে তিনজনে মিলে খেতে খেতে ঠাম্মার মুখে রায়দিঘির যখের গল্প শুনছিলাম।
ঠাম্মা বলছিল, “সেই কত্ত ছোট্ট বয়েসে বউ হয়ে এই বাড়িতে পা দিয়েছি। তখন তো আমাদের এ-পাড়া শুনশান। আমাদের পাশের বাড়ি নিতাই তাঁতিরা আর তিন-চার ঘর লোক ছাড়া এদিকটায় লোকজন তেমন থাকত না। তখন আমার দিদি-শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন। ওঁর মুখেই শোনা, এ-গাঁয়ের জমিদার ভীষ্মনারায়ণ রায় এই দিঘি কাটিয়েছিলেন। তখন গরমে খুব জলকষ্ট হত। এদিকের নদীটাও অনেকটাই দূরে। সব পুকুরের জল পর্যন্ত শুকিয়ে যেত গরমে। জমিদার এই দিঘি কাটাতে গাঁয়ের লোক তো ধন্য ধন্য করতে লাগল। এমন ভালো জমিদার, কিন্ত বুঝলি, আমার দিদি-শাশুড়ি কিন্ত বলতেন অন্য কথা।
“রায়বাড়ির জমিদার নাকি ডাকাতি করতেন চুপিচুপি। কেউ নাকি জানত না। কিন্ত সন্দেহ করত।  রাতবিরেতে মাঝেমাঝেই গ্রামে অচেনা কাদের ফিসফাস আওয়াজ শোনা যেত। কিন্ত ভয়ে কেউ কিচ্ছু টুঁ শব্দ করতে পারত না। খুব দাপুটে ছিলেন যে এই ভীষ্মনারায়ণ রায়। সেই সময় আশেপাশের গাঁগুলোতে ডাকাতি হত খুব। কিন্ত আমাদের গাঁয়ে হয়নি কোনওদিন। কিন্ত বৌ-ঝিরা দিব্যি এক গা গয়না পরে ওই রায়বাড়িতে পুজোর সময় যাত্রাপালা শুনতে যেত। সে কতরকম পালা আসতーবেহুলা লখিন্দর, দক্ষ আর সতীর পালা, অর্জুন চিত্রাঙ্গদা।”
ঠাম্মার গল্প অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে দেখে দীপু বলল, “উফ্‌ ঠাম্মি! যাত্রাপালার গল্প পরে বোলো। আগে সেই যখের গল্পটা বলো না।”
রন্টু আর আমি সমস্বরে বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ ঠাম্মি, আগে যখের গল্প বলো।”
“ও, হ্যাঁ হ্যাঁ। দাঁড়া বাবা, বলছি বলছি। তা কী হল জানিস, ওই দিঘি কাটানোর পর হঠাৎ করেই বুনো পাড়ার একটা দশ-বারো বছরের ছেলে নিঁখোজ হয়ে গেল। সে তো তন্নতন্ন করে খোঁজা সত্ত্বেও পাওয়া গেল না তাকে, লোকে বলল জমিদার নাকি তার ডাকাতি করা সম্পত্তি সব ওই দিঘির নিচে পুঁতে ওই ছেলেকে বলি দিয়ে ছেলেটাকেও ওই দিঘির নিচে পুঁতে দিয়ে যখ করে রেখে গেছে। যাতে ওই যখ  জমিদারের সম্পত্তি রক্ষা করতে পারে আর ওই বংশের লোকের হাতে সেই সম্পত্তি তুলে দিতে পারে।”
“ঠাম্মি, তুমি কি সেই যখ দেখেছ? কেমন দেখতে তাকে?” রন্টু প্রশ্ন করল।
“না রে ভাই, আমি কখনও চোখে দেখিনি। আমার দিদি-শাশুড়ি গল্প বলতেন, তাই শুনেছি।”
“তাহলে কি উনি দেখেছিলেন?”
“না বোধহয়। তবে উনি বলতেন, আগে লোকেরা ওই রায়দিঘির যখের কাছে বাড়িতে অনুষ্ঠান হলে ভর সন্ধেবেলা একটা ফর্দ করে ওই পুকুরের সামনে দিয়ে আসত। পরদিন সকালে গিয়ে দেখত গোছা গোছা কাঁসার বাসন দিঘির পাড়ে ডাঁই করা। কাজ মিটে গেলে সেই বাসন আবার দিঘির পাড়ে রেখে আসতে হত। পরদিন সকালে গিয়ে দেখত ভোঁ ভাঁ, সেই বাসনের চিহ্ন থাকত না।”
“বলো কী! বাসন দিঘির জল থেকে উঠত?”
“হুম ভাই, লোকে তো তাই বলে।”
“এখন আর ওঠে না? ও ঠাম্মি, বলো না, ওঠে না আর বাসন?” এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“না রে ভাই, সে তো আমিও দেখিনি। ওই দিদি-শাশুড়ি বলতেন, কিছু লোক বদমাইশি করে বাসন ফেরত দিত না। চুরি করে রাখত ঘরে। তারপর থেকেই আর বাসন ওঠে না। আর কী জানিস ভাই? তখনকার দিনে লোকের মন সাফ ছিল, তারা সবকিছুই বিশ্বাস করত। তাই ওই যখই বল, ভূতই বল, লোকেরা তাদের দেখতে পেত। সেই দিন কি আর আছে এখন?”
“হুম। তবে ওই যখকে যখন কেউ দেখেনি, তাহলে যখ সত্যি ছিল কি না সেটারও কোনও প্রমাণ নেই। তবুও লোকের এত ভয়!” রন্টু বলল।
“হবে না ভাই? ক’দিন আগে যে দুটো লোক ওই দিঘিতে ড়ুবে মরেছে, লোকে বলছে ওদের যখেই নিয়েছে।”
“মা, ছেলেগুলোকে সব আজগুবি গল্প শুনিয়ে কেন ভয় দেখাচ্ছ বলো তো এই রাত্তির বেলায়?”
পিসুন প্রতিদিন সন্ধেবেলায় টিউশন করতে বেরোয়। সেখান থেকেই ফিরল এখন। দাওয়ায় আরাম করে বসে পিসুন বলল, “তবে রন্টু, দিঘির ধারটা ইদানীং সত্যিই খুব খারাপ জায়গা হয়ে গেছে। আগের বছর ওখানে বুনো পাড়ার হরেকেষ্ট মালিকে ওই রায়দিঘির জলে ডুবে মরে থাকতে দেখা যায়। আর এই তো রিসেন্ট দুই মাস আগে পুবপাড়ার রাখাল ঘোষালকেও ওই একইভাবে... তাই গাঁয়ের লোক একটু ভয়ে-ভয়েই থাকে। পুলিশ এসেও কিচ্ছু কিনারা করতে পারেনি। ওরাও রাতে দিঘির ধারে কী করতে গেছিল কে জানে। তবে তোমরা বাচ্চা ছেলে, ওসব শুনে কাজ নেই। ওই দিকটায় বেশি যেও না। জঙ্গল থেকে মাঝে-মাঝেই বুনো খটাশ, শেয়াল, সাপ সব বেরিয়ে আসে, সেগুলোও কিন্ত বেশ ভয়ংকর।”


দু-তিনদিনের মধ্যে পিসিদের গ্রামের প্রায় সবকিছুই দেখা হয়ে গেল। এছাড়া পিসিদের বালিপুকুরে চান, আদাড়বাদাড় ঘোরা, যদিও মা বারণ করেছিল, তবুও। এছাড়া দীপুর বন্ধুদের সঙ্গে গাছে চড়া, ফুটবল নিয়ে পেটাপিটিーছুটিটা দিব্যি কাটছিল। এর মধ্যেই আমরা একদিন জমিদার ভীষ্মনারায়ণ রায়ের বাড়িটাও ঘুরে দেখে এসেছি। ভেঙেচুরে একশা সেই বাড়ি। আগে দুর্গাপূজা হত, এখন নাকি সেসব বন্ধ।  জমিদারের ভিটেয় এখন ঘুঘু চরে। এত বড়ো বাড়িতে এখন শুধু থাকে জমিদার বংশের শেষ পুরুষ প্রতাপ নারায়ণ রায়। বাকিরা নাকি সব মরে হেজে গেছে। খুব ইচ্ছা ছিল এখনকার জমিদারটিকে নিজেদের চোখে দেখা, কিন্ত সেটা আর হল না। কারণ দীপু বলল ওই প্রতাপ লোকটাকে নাকি ওর এক্কেবারেই পছন্দ নয়। লোকটার চোখ লাল লাল, সবসময় লোকের সাথে অভদ্রভাবে কথা বলে, পুলিশের খাতাতেও নাকি লোকটার নাম আছে। আর ওই প্রতাপের সাথে সর্বক্ষণ যে লোকটা থাকে হারু নাম তার, সেই লোকটাও ভারি বজ্জাত। কী যে করে লোকটা! দীপুদের বাড়ির পিছনে বাঁশবাগানে ঘুরঘুর করে মাঝেমাঝে। দীপু ওকে কী করছে জিজ্ঞেস করাতে ইচ্ছে করে রায়দিঘির সামনে ভয় দেখেয়েছিল একদিন।
“তা তুই বাড়িতে বলিসনি কেন?” আমি বললাম।
“ইসস্‌, বললে বাবা বকত না? ওই দিঘির ধারে একটা শেয়াকুলের গাছ আছে। শীতে কী কুল হয়েছিল! ওই পেড়ে খেতেই গেছিলাম আমি আর বাদল মিলে। ব্যাটা কোথা থেকে ওখানে এসে… দেখলি না বাবা এমনিতেই দিঘির ধারে যেতে মানা করেছে?”
সেদিন দুপুরে পিসেমশাই গেছে সদর শহরে কিছু দরকারি কাজে, পিসি আর ঠাম্মিও দুপুরে খেয়েদেয়ে নিজের ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। ঘুম নেই শুধু আমাদের চোখে। অন্যদিনের মতো যথারীতি কারেন্ট অফ। ঘরে শুয়ে কাঁহাতক আর গরম সহ্য হয়? দীপুকে ঠেলে তুলে আমি আর রন্টু তিনজনে মিলে বাড়ির খিড়কির দিকের দরজা খুলে বেরোলাম। খিড়কির দরজার পিছনে বেশ বড়ো বাঁশবন, শেষ হয়েছে একেবারে রায়দিঘির কাছে গিয়ে। উত্তরে রায়দিঘির শেষপ্রান্তে জঙ্গল শুরু। এখানে বেশ হাওয়া।  বাঁশবাগানে হাওয়াতে বেশ ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ হচ্ছে। গরমে ঠাণ্ডা হাওয়ায় প্রাণ যেন জুড়িয়ে দিচ্ছে। নির্জন দুপুরে কোথায় একটা বৌ-কথা-কও পাখি ডাকছে। খুব ভালো লাগছিল।
হঠাৎ দেখি, রন্টুর গলার আওয়াজ। “দাদাভাই, দীপুদা, এদিকে শিগগির দেখবি আয়।”
ওমা, দেখি রন্টু কখন আমাদের ছেড়ে এগিয়ে গেছে রায়দিঘির পাড়ের কাছে। জায়গাটা গাছের ছায়ায় দিনের বেলাতেও অন্ধকার হয়ে আছে। এদিকে কোনও ঘাট নেই। বাঁশপাতা পড়ে পড়ে পচে পাড়ের দিকটা কাদা কাদা হয়ে আছে। সেখানেই দাঁড়িয়ে রন্টু হাত দেখিয়ে কিছু দেখাচ্ছে আমাদের। পাড়ের দিকে যেতে গিয়ে পা কাদায় ডুবে যাচ্ছিল। পাড়ে পৌঁছতেই দেখি একটা শক্ত দড়ি বাঁশগাছের গোড়ায় বাঁধা। সেই দড়ি সোজা চলে গেছে দিঘির জলে।
“কী রে এটা, দীপুদা?” রন্টু প্রশ্ন করল।
দীপু দেখি নিজেও অবাক। এদিকে কে আসবে? এলেও এমন দড়িই বা বাঁশগাছের গোড়ায় বেঁধে রাখবে কেন? তবুও আন্দাজ করে বলল, “মনে হয় কেউ মাছ ধরার জন্য জাল ফেলে গেছে।”
“আরেব্বাস, মাছ ধরার জাল! এই একটু টেনে দেখি ক’টা মাছ পড়ল।”
“না না, কোনও দরকার নেই রন্টু, কার জিনিস কে জানে। বকবে এসে। চল, উঠে আয়।”
“ধুস, এদিকে কেউ তো নেই। ক’টা মাছ পড়েছে দেখেই চলে যাব। একটু টেনে দেখিই না।”
তিনজনে মিলে দড়িটা ধরে টানতে লাগলাম। ও রে বাবা, কী ভারী!  মিনিট খানেক টানাটানি করতেই দিঘির জল থেকে একটা বড়ো প্লাস্টিকের বস্তা উঠে এল। ব্যাগটার মুখ দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা।
“তবে তুই যে বললি মাছ ধরার জাল, দীপুদা?” রন্টু অবাক হয়ে দীপুর দিকে তাকাল।
দীপু নিজেও কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। আমার নিজেরও খুব ভালো লাগছিল না। রন্টুকে বললাম, “এই রন্টু, থাক। এটা যাই হোক না কেন চল আবার এটাকে দিঘির জলে ডুবিয়ে দিই।”
রন্টু এবার চোখ গোল গোল করে বলল, “এত কষ্ট করে তুললাম, আর ভিতরে কী আছে দেখব না একবার?”
দীপু এবার ফস করে বলে ফেলল, “এই, এতে সেই জমিদারের যখের ধন নেই তো?”
রন্টু হো হো করে হেসে বলল, “প্লাস্টিকের প্যাকেটে যখের ধন? তোমার কী বুদ্ধি গো, দীপুদা! আর দেখছ না, দড়িটাও কেমন নতুন নতুন? কিন্ত এত যত্ন করে এইরকম জায়গায় প্লাস্টিকের বস্তায় কী রেখেছে সেটা সত্যি খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।” এই বলেই ফস করে বস্তার মুখের দড়িটা খুলে ফেলল। “ওমা, একি? ভেবেছিলাম কী আর বেরোল কী!”
বস্তার ভিতর থেকে বেরোল একগাদা কাঁচের শিশি-বোতল বেশ যত্ন করে প্লাস্টিক প্যাকেট দিয়ে মোড়া। ঠিক ওষুধের বোতলের মতো। তাতে অবশ্য কীসব পোরা আছে, বোতলের মুখগুলো সব সিল করা। তবে কোনও লেবেলিং করা নেই।
বোতলগুলো হাতে নিয়ে কী বোঝার চেষ্টা করছি, এমন সময়, “এই, তোরা এখানে কী করছিস রে?”
আমরা এতটাই মশগুল ছিলাম যে পিছনে এসে যে কেউ দাঁড়িয়েছে সেটা খেয়াল করিনি। চমকে পিছনে তাকালাম। লম্বা সিড়িঙ্গে, গায়ের রং কুচকুচে কালো লোকটা রাগী রাগী মুখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে আরেকটা লোক। এটা বেঁটে গাঁট্টাগোঁট্টা মতন, আর চোখগুলো কী লাল লাল!
দীপু ফিসফিস করে বলল, “হারুদা, আর প্রতাপদা।”
দেখলাম, ভয়ে দীপুর মুখটা শুকনো হয়ে গেছে। বুঝে গেলাম, এই মক্কেলই তবে প্রতাপ আর তার সাগরেদ হারু।
রন্টু দিঘির ধার থেকে একটু এগিয়ে এসে লোকটাকেই উলটে জিজ্ঞেস করল, “তুমিই বা এখানে কী করছ?”
“এই ছেলে, তার জবাব কি আমি তোকে দেব?” প্রতাপের মুখটা রাগে লালচে হয়ে উঠেছে।
“ওই দেখো প্রতাপ, ছেলেগুলো মালগুলোকে টেনে এনেছে। কী সাহস দেখো।” হারুর কথা শুনে প্রতাপের মুখটা আরও রাগী রাগী হয়ে গেল। এবার শক্ত হাতে খপ করে ধরল রন্টুর হাতটা।
“এই, ওর হাত ছাড়ো।” বলে আমি চিৎকার করতেই হারু আমার মুখ চেপে ধরল।
“তোমরা এই বস্তায় কী পুরে রেখেছ এগুলো? এইরকম লুকিয়েই বা রেখেছ কেন?” এবার রন্টু প্রশ্ন করল।
“ওরে ইঁদুর, তোর দেখি খুব সাহস! এই তুই জীবন মাস্টারের ছেলে না?” দীপুকে হারু প্রশ্ন করল।
দীপু ভয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“এরা তোদের বাড়িই এসেছে? তোকে না এদিকে ঘুরঘুর করতে মানা করেছিলাম? এবার আর দুটোকে জুটিয়ে এনে মাতব্বরি করছিস, না? দাঁড়া ব্যাটা, তোদের তিনটেকেই মেরে পুঁতে এই দিঘির মধ্যে যখ বানিয়ে রাখব আজ। তোরা একটু বেশি কিছুই জেনে গেছিস।”
দীপুর হাত ধরে প্রতাপ টান দিতেই নিমেষে ঘ্যাঁক করে আওয়াজ করে মুখটা বিকৃত করল সে। অন্য হাতে রন্টু একটা মোক্ষম কামড় বসিয়ে দিয়েছে প্রতাপের। প্রতাপ উঁ উঁ করে ককিয়ে হাত ধরে মাটিতে বসতেই দীপু আর রন্টু অন্য হাত ছাড়িয়ে আমার হাত ধরে থাকা হারুর পেটে এক ধাক্কা দিয়েই আমার হাত টেনে বলল, “দাদাভাই, ছোট জলদি।”
দিঘির পাড় ধরে দৌড়তে দৌড়তে পিছন ফিরে দেখি প্রতাপ ইতিমধ্যে উঠে পড়েছে, আর তার সঙ্গে হারুও। প্রতাপ চেঁচিয়ে বলছে, “ধর ছেলেগুলোকে! ওদের রায়দিঘির জলে চুবিয়েই মারব আজ।”
আতঙ্কগ্রস্তের মতো ছুটছি। রন্টু আর দীপু এগিয়ে গেছে অনেকটাই। এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎই পাটা ধরে কিছুতে যেন টান দিল, আর ধপাস করে পড়লাম জলে। মাথায় ভারী কিছুর ঠোকা লাগল, সামনেটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। বেশ বুঝতে পারছি, পা থেকে কোমর পর্যন্ত আমার ড়ুবে যাচ্ছে জলে। তবে কি সত্যিই রায়দিঘির যখ আছে? আর আমাকেও টেনে নিচ্ছে জলের অতলে? তলিয়ে যাচ্ছি আমি।
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম কে জানে। জ্ঞান ফিরতেই মাথার ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম। চোখ মেলে দেখি, খাটের চারপাশে উদ্বিগ্ন পিসি, পিসুন, দীপু, আরও অনেক অচেনা উদ্বিগ্ন মুখ।
“দাদা, এখন কেমন আছিস? মাথায় খুব লেগেছে, না রে?” রন্টুর চোখ ছলছল করছে জলে।
কী হয়েছিল আমার? মনে পড়তে কয়েক সেকেন্ড লাগল। ধড়মড় করে উঠে বসতে বসতে বললাম, “রন্টু, প্রতাপ আর হারু কোথায় গেল?”
“ওরা সব ধরা পড়েছে রে দাদা। তুই সেরে ওঠ, সব বলব তোকে।”
ঘুম পাচ্ছিল খুব, তাই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।


মাথার চোট আর দুর্বলতা দিন দুইয়ের মধ্যেই কেটে গেছে আমার। আজ সকালে পুলিশ এসেছিল। রায়দিঘির ওই যখ পুকুরের গল্প ভাঙিয়ে এই গ্রামে একটা জাল ওষুধ চক্রের কারবার চলছিল, যার মূল পাণ্ডা এই গ্রামেরই জমিদার বংশের কীর্তিমান সন্তান প্রতাপনারায়ণ রায়। বর্ডার পেরিয়ে আসত নকল ওষুধের সিরাপভর্তি বোতল, এরপর এগুলোকে লেবেলিং করে পাচার করত দেশের সর্বত্র। আর এগুলো রাখার একটা দারুণ বুদ্ধিও বার করেছিল প্রতাপ মাথা থেকে। এমনিতেই গ্রামের কিছু অশিক্ষিত কুসংস্কারছন্ন লোক এই রায়দিঘির দিকে ভয়ে ঘেঁষে না। তাই ওষুধের বোতলগুলো ভালো করে প্যাক করে প্লাস্টিকের বস্তায় মুড়ে রাখত জলের নিচে। আর রাতের অন্ধকারে সেগুলো তুলে নিয়ে যেত। হরেকেষ্ট মালি আর রাখাল ঘোষালও এই ব্যাবসার পার্টনার ছিল। কিন্তু বখরা নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় দু’জনকেই প্রতাপ আর হারুর লোক জলে চুবিয়ে মেরে ফেলে। ফলে এই দিঘিকে গ্রামের লোক আবার নতুন করে ভয় পেতে থাকে। পুরনো হয়ে যাওয়া যখের গল্প আবার চাউর হয়।
কিন্ত এই রন্টুর কৌতূহলের কারণেই আজ সব ব্যাটা ধরা পড়েছে পুলিশের জালে। এমনিতেই পুলিশ প্রতাপকে সন্দেহ করেছিল, কিন্তু তার বাড়ি তল্লাশি করেও কিচ্ছু পায়নি পুলিশ। প্রতাপ যে গভীর জলের মাছ সেটা আর পুলিশ জানবে কী করে? বাঁশবাগানের ওই পাড় থেকে বাঁশের গোড়ায় দড়ি টেনে প্রচুর জাল ওষুধ পেয়েছে পুলিশ। ওইরকমই একটা দড়িতে পা আটকে আমি সেদিন জলে পড়ে যাই, আর মাথায় আঘাত পাই। হয়তো প্রতাপ আর হারু মেরেই ফেলত আমায়। কিন্তু রন্টু আর দীপু ততক্ষণে চেঁচিয়ে পাড়ার লোক জড়ো করে ফেলায় তারাই প্রতাপ আর হারুর হাত থেকে আমাকে বাঁচায়। তারপর পুলিশ এসে প্রতাপকে বামাল ধরে ফেলে।
চা খেতে খেতে পুলিশ অফিসার সবকথা বলছিলেন আমাদের। আর যাবার সময় এটাও বলে গেছেন, এমন সাহসিকতার জন্য পুলিশের তরফ থেকে আমাদের তিনজনকে পুরস্কৃত করাও হবে নাকি।
দু’দিন রেস্ট নিয়ে আজ বিকেলে পিসি খেলার মাঠে যাবার পারমিশন দিয়েছে। দীপুরা মাঠে ফুটবল পেটাচ্ছে। আমার পাশে বসে রন্টু। ওর দিকে ফিরে বললাম, “কী রে, আর রায়দিঘির যখের সঙ্গে মোলাকাত করতে যাবি না?”
“ধুর, আমি তো প্রথম থেকেই বলেছিলাম ওসব ভূত-যখ বলে কিচ্ছু হয় না। ওগুলো থাকে শুধু ওই প্রতাপ আর হারুর মতন শয়তানদের মধ্যে, যারা শুধু লোভের জন্য মানুষের ক্ষতি করে। ভাব তো, কত্ত জাল ওষুধের শিশি ছিল ওখানে! ওদের থেকে ভূত-যখরা অনেক ভালো, বুঝলি দাদা?”
পড়ন্ত বিকেলের আলো পড়েছে রন্টুর মুখটাতে। আমি ওর নরম চুল ঘেঁটে দিয়ে বললাম, “রন্টু, ইউ আর রিয়েলি আ জিনিয়াস।”
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

3 comments:

  1. গ্রামের অভিজ্ঞতা লব্ধ গল্প। ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  2. Ki opurbo lekho tumi. Ki swatasfurto!

    ReplyDelete
  3. Ki opurbo lekho tumi. Ki swatasfurto!

    ReplyDelete