গল্পঃ ভিমরুকের ব্ল্যাক প্যান্থারঃ অরিন্দম দেবনাথ


এক


“ক্যাপ্টেন কুমার, ওড়া কি সম্ভব?”
“অন্য সময় হলে না বলে দিতাম। কিন্তু যা পরিস্থিতি... চলুন, আকাশে একটা চক্কর মেরে আসা যাক। মিডিয়া সকাল থেকে বারবার মোবাইল টাওয়ারের ছাদে আশ্রয় নেওয়া ব্ল্যাক পান্থারের ওই এক ছবি দেখাচ্ছে।” বললেন ক্যাপ্টেন কুমার।
“এই ইমেইলটা দেখুন ক্যাপ্টেন কুমার। জাস্ট এল। মন্ত্রক থেকে জানতে চাইছে আমরা ব্ল্যাক প্যান্থার উদ্ধার করতে কী করছি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বন মন্ত্রকের কাছে আপডেট চাইছেন।” বললেন কন্ট্রোল রুমের রেডিও সেটের সামনে বসা ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কের ডিরেক্টর মিস্টার মোহন। “আশিস, সুরেশ, তোমরা আমাদের সাথে চলো। মিস্টার দাস, ডক্টর রাজন, আপনারা অফিস সামলান।”
নভেম্বরের শেষ। গতকাল সকাল থেকেই আকাশ ঢেকে ছিল ঘন মেঘে। হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। তারপর বিকেল বেলা আচমকা ‘ক্লাউড বার্স্ট’–মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। নদী বেয়ে হু হু করে নেমে আসা জলে, দু’ঘণ্টাতেই চারদিক জলমগ্ন। এত জল কোনওদিন দেখেনি পার্কের কেউ। আরও ভারী বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
আটশো পঞ্চাশ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কের প্রায় পুরোটাই পাহাড়ি অঞ্চল। তাই বন্যার জলে পার্কের ভেতরের কোনও ক্ষতি হয়নি। অন্তত বিট অফিসগুলো সেরকমই খবর দিয়েছে। সমস্যাটা হয়েছে ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কের এন্ট্রি পয়েন্টে। পার্কের ডিরেক্টর মিস্টার মোহন গতকাল বিকাল থেকে কন্ট্রোল রুমে আছেন।
পার্কের একদম গভীরে ভিমারু লেক থেকে উৎপত্তি হয়েছে ভিমরুক নদীর। সারাবছর জল থাকে এই লেকে। এই নদীর নাম থেকেই এই ন্যাশনাল পার্কের নাম ভিমরুক। ভিমরুক একটি বর্ষণ-বন। প্রায় সবসময় বৃষ্টি হয় এই অঞ্চলে।
পাহাড়ের শেষ আর সমতলের শুরু তিনতিরিতে ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কে ঢোকার এন্ট্রি পয়েন্ট। পর্যটন দফতরের চল্লিশ কামরার একটা বিশাল হোটেল আছে তিনতিরিতে। আর আছে একটা মোবাইল ফোনের টাওয়ার। কাছাকাছি গ্রাম এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ভিমরুক নদীখাত থেকে খানিক দূরে, দশ ফুট উঁচু কয়েকশো সিমেন্টের খুঁটির ওপর তৈরি বিশাল দোতলা হোটেলটি। প্রতিবছর এখানে বন্যা হয়। সেই কারণে হোটেলটির নিচের অংশটি ফাঁকা। হোটেলের তলা দিয়ে ছোটো ছোটো জন্তুজানোয়ার চলাচল করে ও বন্যার জল বয়ে যায়।
পুরো হোটেলটি কাচ দিয়ে মোড়া। বিষাক্ত পোকামাকড়, মশা আর সাপ থেকে বাঁচতে এই ব্যবস্থা। রাত্রে হোটেলের কাচে ঢাকা বারান্দায় বসে ভিমরুক নদীখাতে অনেক জন্তুজানোয়ার চরে বেড়াতে দেখা যায়। হাতির পাল তো প্রায় রোজই আসে। হোটেলের ছাদে শক্তিশালী সার্চ লাইট লাগানো আছে রাতে জন্তুজানোয়ার দেখার জন্যে। হোটেলটি খুব খরচবহুল। তবুও সারাবছর ধরে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে, এমনকি বছরের যে তিন মাস পার্ক বন্ধ থাকে তখনও। বিকেল পাঁচটার পর হোটেলের একতলা থেকে নিচে নামা বারণ। এমনকি পর্যটকদের নিয়ে আসা গাড়িগুলোকে চলে যেতে হয় হোটেল থেকে এক কিলোমিটার দূরের হোটেলের নিজস্ব পার্কিং প্লেসে।
ভিমরুক নদীর ওপর একটা সিমেন্টের ব্রিজ আছে তিনতিরিতে। এই ব্রিজ পার হয়ে ঢুকতে হয় ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কে। প্রতিদিন মাত্র চল্লিশ জন পর্যটক ঢোকার অনুমতি পান এই পার্কে। পার্কের নিজস্ব পুরু কাচে ঢাকা বিশেষ গাড়ি পর্যটকদের ঘোরায় পার্কের ভেতর। হোটেল থেকে ওই গাড়িগুলো ছাড়ে। ড্রাইভার আর গার্ড ছাড়া মাত্র চারজন বসতে পারে এই গাড়িতে। গাড়ি থেকে নামা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বিষাক্ত সাপ আর পোকামাকড়ে ভর্তি ভিমরুক ন্যাশনাল পার্ক। হামেশাই গাছের ডালে ঝুলতে থাকা অজগর দেখা যায়। পাখি আর ফুলের তো ইয়ত্তা নেই। হাতি, হরিণ, ভাল্লুক, বুনো শুয়োর, বুনো কুকুর, লেপার্ড ছাড়াও আছে ব্ল্যাক প্যান্থার।


দুই


হাওয়া বইছে বেশ জোরে আর টিপটিপ করে বৃষ্টিটা হয়েই চলেছে। কন্ট্রোল রুম থেকে বেরিয়ে ক্যাপ্টেন কুমার, মিস্টার মোহন, আশিস ও সুরেশ চললেন হেলিকপ্টারের হ্যাঙ্গারের দিকে। হেলিকপ্টারটা পার্কের নিজস্ব। পার্কের চৌহদ্দিতে উড়তে কোনও বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
মিস্টার মোহন সহ সবাইকে কন্ট্রোল রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখে এগিয়ে এল কয়েকজন বনকর্মী। তার মধ্যে হেলিকপ্টার মেনটেনেন্সের স্টাফ রোহিতও ছিল। ক্যাপ্টেন কুমার রোহিতকে বললেন, “কপ্টার রেডি করো, হ্যাঙ্গার খোলো। ফ্লাই করব।”
রোহিত বলল, “স্যার, সব রেডি আছে। কিন্তু এই ওয়েদারে উড়বেন?”
ক্যাপ্টেন কুমার বললেন, “ব্ল্যাক প্যান্থারের খবরটা শুনেছ তো? আমাদের প্রায় নাকের ডগায় রয়েছে ওটা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানতে চাইছে ব্ল্যাক প্যান্থার উদ্ধার করতে আমরা কী করছি।”
রোহিত আর কথা না বাড়িয়ে হ্যাঙ্গারের দরজা খুলে কমলা রঙের হেলিকপ্টারটা বের করে হেলিপ্যাডে দাঁড় করিয়ে দিল। রোহিতও কপ্টার চালাতে জানে।
আশিস ও সুরেশ হ্যাঙ্গারের দরজাটা খুলে দিয়ে হেলিকপ্টারে পেছনের সিটে উঠে বসল। মিস্টার মোহন সামনের সিট থেকে বললেন, “আশিস, সুরেশ, সব নিয়েছ তো?”
পার্কের বহুদিনের কর্মী আশিস আর সুরেশ জানে স্যার কী বলছেন। আশিস বলল, “হ্যাঁ স্যার, ডার্টগান, জাল, দড়ি সব ঠিক আছে।”
হেলিকপ্টারটা চালু করে বুকে ক্রস আঁকলেন ক্যাপ্টেন কুমার। বললেন, “আশা করি ওয়েদার এর থেকে খারাপ হবে না।”
গ্লপ গ্লপ আওয়াজ করতে করতে হেলিকপ্টারটা আকাশে উড়ল। ক্যাপ্টেন কুমার রেডিওতে যোগাযোগ করলেন কন্ট্রোল রুমে। জানালেন, তিনি উড়ছেন পার্কের এন্ট্রি পয়েন্টের দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টারটা পার্কের এন্ট্রি পয়েন্টের আকাশে চলে এল। ভিমরুক নদী আর নদী নেই। ঘোলা জলের সমুদ্র হয়ে আছে। হোটেলটা সমুদ্রের মাঝে একটা বড়ো দ্বীপের মতো জেগে আছে। ইতিউতি জলের ওপর মাথা তুলে আছে বড়ো বড়ো কিছু বোল্ডার। আর দেখা যাচ্ছে খাড়া লম্বা মোবাইল টাওয়ারটা।
মোবাইল টাওয়ারকে ঘিরে চক্কর মারতে থাকল ছোটো হেলিকপ্টার। টাওয়ারের জন্য ঘরটার খুব কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে বসে আছেন মিস্টার মোহন। আর ছবি তুলে যাচ্ছে সুরেশ। একচিলতে ছাদের একটা ছোটো টিনের শেডের নিচে বসে আছে ব্ল্যাক প্যান্থারটা। হেলিকপ্টারের আওয়াজে আকাশের দিকে মুখ তুলে চাইল প্যান্থারটা। ওর পেটের কাছে মিশে আছে বাচ্চাদুটো। বেঁচে আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। আর একটু জল বাড়লেই ঘরটার ছাদ জলের তলায় চলে যাবে।
প্রায় তিরিশ বছর ধরে বন্যপ্রাণী নিয়ে ঘাঁটছেন মিস্টার মোহন, কিন্তু এইরকম জলের তোড়ে সাঁতরে ব্ল্যাক প্যান্থারকে জঙ্গলের বাইরে কোথাও আশ্রয় নিতে দেখেননি। বাচ্চা সহ ব্ল্যাক প্যান্থারটাকে ওই জলে ঘেরা ছাদ থেকে তুলে নিয়ে আসাটাই চ্যালেঞ্জ। পার্কের কাছে যে স্পিড বোট দুটো আছে সেগুলো দিয়ে কিছু করা যাচ্ছে না কারণ, ইঞ্জিনগুলো এই স্রোতের বিরুদ্ধে এগোনোর মতো শক্তিশালী নয়। একটাই উপায়, দড়ি ঝুলে ছাদে নামা। কিন্তু নামতে হবে প্রায় পঞ্চাশ ফুট। কারণ, মোবাইল টাওয়ারের উচ্চতা কুড়ি ফুট, হেলিকপ্টারটাকে অন্তত তার থেকে তিরিশ ফুট উঁচুতে রাখতে হবে। কাজটা শুধু বিপদজনক তাই নয়, এই আবহাওয়াতে এটা করা কতটা সম্ভব সেটাই ভাবাচ্ছে মিস্টার মোহনকে।
আশিস আর সুরেশ দুজনেই হেলিকপ্টার থেকে দড়ি ঝুলে নামতে অভ্যস্ত। কিন্তু প্যান্থারটাকে জালবন্দী করার আগে বন্দুক থেকে ঘুমপাড়ানি গুলি ছুঁড়তে হবে। সেটা দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে ওরা করতে পারবে না। ওই একচিলতে ছাদে ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত আর সদ্যোজাত বাচ্চা সহ ব্ল্যাক প্যান্থারের কাছে কাউকে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
“ক্যাপ্টেন কুমার, ফিরে চলুন।” বললেন মিস্টার মোহন।
আকাশে একটা চক্কর মেরে গ্লপ গ্লপ আওয়াজ করতে করতে পার্কের হেলিপ্যাডের দিকে উড়ে চলল হেলিকপ্টার।
হেলিকপ্টার থেকে নেমেই কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুট লাগালেন মিস্টার মোহন। কন্ট্রোল রুমে ঢুকতেই রেডিও অপারেটার মিস্টার দাস বলে উঠলেন, “স্যার দেখুন টিভিতে আমাদের হেলিকপ্টারের আকাশে চক্কর দিতে দেখাচ্ছে, আর বলছে আকাশে হেলিকপ্টার নিয়ে কয়েকবার চক্কর মারা ছাড়া ভিমরুক ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষ ব্ল্যাক প্যান্থার উদ্ধারে এখনও কিছু করেনি। স্যার, খবরটা ছড়াচ্ছে হোটেল উপস্থিত এক টিভি জার্নালিস্ট।”
মুচকি হেসে মিস্টার মোহন বললেন, “সাংবাদিক ওঁর কাজ করছেন। সত্যিই তো আমরা কিছুই করতে পারিনি। নাইন ব্যাটেলিয়ান আর্মির ব্রিগেডিয়ার সেনকে ফোনে ধরুন তো। ওঁকে মোবাইলে না পেলে হট লাইনে যোগাযোগ করুন। আর্জেন্ট।”


তিন


মোবাইলেই পাওয়া গেল ব্রিগেডিয়ার সেনকে। মিস্টার দাস ফোনটা এগিয়ে দিলেন মিস্টার মোহনকে।
“আরে মোহন, বল কী করতে পারি। ভিমরুকের বন্যা আর ব্ল্যাক প্যান্থারের কথা আমি জানি।” বললেন ব্রিগেডিয়ার সেন।
মিস্টার মোহন আর ব্রিগেডিয়ার সেন দু’জনে ছোটোবেলার বন্ধু। একই স্কুলে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছেন। মিস্টার মোহন কী সাহায্য লাগবে বিশদে বললেন। এও জানাতে ভুললেন না যে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আপডেট চাইছেন।
ফোনে কথা শেষ হলে মিস্টার মোহন সুরেশের হাত থেকে ডিজিটাল ক্যামেরাটা ডক্টর রাজনকে দিয়ে বললেন, “ছবিগুলো সব ডাউনলোড করুন তো একটু প্লিজ।”
ঘণ্টা দুয়েক পর একটা মিলিটারি হেলিকপ্টার এসে নামল ভিমরুকের হেলিপ্যাডে। তিনজন নেমে এলেন হেলিকপ্টার থেকে। তাদের মধ্যে একজন ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার। হেলিকপ্টারের ভেতর থেকে নামল একটা রাবারের বোট আর পঁচাশি হর্স পাওয়ারের একটা আউট বোট মোটর।
তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হল পার্কের কন্ট্রোল রুমে। মিস্টার মোহন কম্পিউটারে আজকে হেলিকপ্টার থেকে তোলা ছবিগুলো দেখাতে লাগলেন। ঠিক হল, আর্মির দু’জন আর পার্কের দু’জন, এই চারজন লোক মিলে স্পিড বোটে করে মোবাইল টাওয়ারের জলঘেরা ঘরের ছাদ থেকে ব্ল্যাক প্যান্থারকে জালবন্দী করে নিয়ে আসবে। আকাশে হেলিকপ্টার থেকে বোটের সাথে ওয়ারলেস ফোনে পুরো অভিযানটা কন্ট্রোল করবেন মিস্টার মোহন, সঙ্গে আর্মির ক্যাপ্টেনও থাকবেন।
বিকেল তিনটের সময় পার্কের কন্ট্রোল রুমের খানিক নিচু থেকে আর্মির স্পিড বোটটি জাল, বন্দুক ইত্যাদি নিয়ে রওনা দিল। প্রচণ্ড গতিতে বয়ে চলা জলরাশি ঠেলে একটু একটু করে এগোতে লাগল শক্তিশালী ইঞ্জিন চালিত স্পিড বোট।
মিনিট কুড়ি লাগল স্পিড বোটের মোবাইল টাওয়ারের ঘরের কাছে পৌঁছতে। বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু হাওয়া একদম বন্ধ। আলো কমে আসছে। আর্মির হেলিকপ্টারটি মোবাইল টাওয়ারের ঘরের ওপরের আকাশে চক্কর মারছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, হেলিকপ্টারের আওয়াজে সামনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে মুখ উঁচু করে দাঁত খিঁচোচ্ছে প্যান্থারটি। তিনি ওয়ারলেস ফোনে যোগাযোগ করলেন বোটের সাথে। “সুরেশ, ভালো করে শোনো। প্যান্থারটা পুরো সেন্সে আছে। ওটাকে ট্রাঙ্কুলাইজ না করে জালে জড়াতে যেও না। চেক করে নাও, তোমাদের বোট রেঞ্জে এসে গেছে। খুব সাবধানে এগোও, অনেক বড়ো বড়ো বোল্ডার আছে ওখানে। ধাক্কা লাগলে উলটে যেতে পারে বোট। ওভার।”
“হ্যাঁ স্যার, আমরা রেডি। কিন্তু আর একটু সামনে না এগোলে প্যান্থারটাকে গুলি করা যাবে না। ওটা শুয়ে আছে, আর ছাদের দেওয়ালটা গার্ড করে দিচ্ছে। ওভার।”
“ঠিক আছে সুরেশ, দেখে নাও। কিন্তু মেক শিওর, প্যান্থারটা পুরো ট্রাঙ্কুলাইজ না হলে ছাদে উঠবে না। ওভার অ্যান্ড আউট।”
বোটের মাঝখানে সুরেশ ট্রাঙ্কুলাইজার বুলেট ভরা বন্দুক কাঁধে দাঁড়িয়ে। বোটের সবাই লাইফ জ্যাকেট পরে আছে। বোটটা ধীরে ধীরে চক্কর কাটছে ঘরটাকে ঘিরে। আকাশ থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখছেন মিস্টার মোহন। বুঝতে পারছেন না ওরা এত দেরি করছে কেন। অন্ধকার নেমে আসছে, তারপর আবার হালকা ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
এ কী! এটা কী হল?
আঁতকে উঠলেন মিস্টার মোহন। বোটটা হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকুনি খেল আর সুরেশ বেসামাল হয়ে বন্দুক সহ ছিটকে পড়ে গেল জলে। নিশ্চয়ই জলে ডোবা বোল্ডারে ধাক্কা খেয়েছে বোটটা।
জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সুরেশ। বোটটা একটা চক্কর মেরে ডুবন্ত সুরেশের খোঁজে বন্যার জলরাশি তোলপাড় করতে শুরু করল। আকাশে হেলিকপ্টার থেকে ওয়ারলেস সেটে বোটে ইন্সট্রাকশান পাঠাতে লাগলেন মিস্টার মোহন। হেলিকপ্টার থেকে কমলা লাইফ জ্যাকেটটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। স্পিড বোটটা সুরেশকে জল থেকে তুলে নিয়ে ফিরে চলল পার্কের দিকে।
হেলিকপ্টার থেকে নেমে এলেন মিস্টার মোহন। আজকে আর কিছু করার নেই। অন্ধকার হয়ে এসেছে। বাঁচোয়া সুরেশ সুস্থ আছে।
বোটটা তুলে নিয়ে হেলিকপ্টারটা ফিরে গেল।


চার


কন্ট্রোল রুমে ঢুকে এক কাপ কফি চাইলেন মিস্টার মোহন। আবার তোড়ে বৃষ্টি নেমেছে। খানিক ভুরু কুঁচকে চুপ করে বসে রইলেন মিস্টার মোহন। তারপর মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে ফোন করলেন ব্রিগেডিয়ার সেনকে।
কথা বলা শেষ করে পার্কের পশু হাসপাতালের ডাক্তার রাজনকে বললেন, “ডক্টর, টুমরো মর্নিং উই হ্যাভ টু গো ফর আ ক্রিটিক্যাল মিশন, আই ওয়ান্ট ইয়ু টু বি আ পার্ট অফ দ্য ভেঞ্চার। এখন কোয়ার্টারে ফিরে যান। কাল সকাল ছ’টায় দেখা হবে। আপনার কোয়ার্টারে জল ঢোকেনি তো?”
টিলার ওপর কন্ট্রোল রুম সংলগ্ন অনেকগুলো স্টাফ কোয়ার্টার। তারই একটায় থাকেন ডক্টর রাজন। মিস্টার মোহনের কোয়ার্টারও এই টিলার ওপর। অফিস, স্টাফ কোয়ার্টার, হেলিপ্যাড, হেলিকপ্টার রাখার হ্যাঙ্গার এসব ছাড়াও এই টিলার ওপর আছে একটা পশু হাসপাতাল ও ছোটো চিড়িয়াখানা।
ডক্টর রাজন বললেন, “না না, আমার কোয়ার্টার ঠিক আছে। আমি কাল ভোরে চলে আসব। কিন্তু মিশনটা কী বলবেন কি?”
মিস্টার মোহন বললেন, “কাল সকালেই বলব, একটু ভাবতে দিন। আপনার কী মনে হয়, প্যান্থারটা কাল সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে?”
ডক্টর রাজন বললেন, “দেখুন প্রেয়ার করা ছাড়া কিছু বলার নেই। বাচ্চাগুলোর কী হবে কে জানে।”
“স্যার, আপনি বাড়ি যাবেন না? কাল থেকে তো বাড়ি ফেরেননি, আর কয়েক কাপ কফি ছাড়া কিছু খাননি। এরপর তো আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ম্যাডাম দু’বার ফোন করেছিলেন।”
মিস্টার মোহন বললেন, “যাব, কয়েকটা ফোন করার আছে। ভাগ্য ভালো ফোনগুলো কাজ করছে।”
রেডিও অপারেটার দাসের ডিউটি শেষ হয়ে গেছে। তার জায়গায় অন্য লোকও এসে গেলেও তিনি তখনও অফিসে বসে। তিনি বললেন, “স্যার, কাল সকালে আমার ডিউটি নেই। আমি কি কন্ট্রোল রুমে থাকতে পারি?”
মুচকি হাসলেন মিস্টার মোহন। তিনি জানেন কতটা ডেডিকেটেড এঁরা। তিনি বললেন, “কোনও অসুবিধা নেই। আপনি একবার দেখে নিন অন্তত তিনটে ওয়াকিটকির ব্যাটারি ঠিক আছে কি না।”
মিস্টার দাস চলে গেলে মিস্টার মোহনও তার নিজের অফিস ঘরে চললেন। মিনিস্ট্রিতে অনেকগুলো রিপোর্ট পাঠাতে হবে।
সন্ধে সাতটার সময় অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের কোয়ার্টারে যাবার পথে একবার সুরেশের কোয়ার্টারে নক করলেন মিস্টার মোহন। বেরিয়ে এল সুরেশের স্ত্রী। সাহেবকে দেখে, নিয়ে গেল সোজা সুরেশের ঘরে। কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়েছিল সুরেশ। মিস্টার মোহনকে দেখে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। বলল, “স্যরি স্যার, বোটটা জলের তলার বোল্ডারে ধাক্কা খেতে টাল সামলাতে পারিনি। ডার্ট গানটা গেল।”
মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া লোকটার মুখে নিজের সম্পর্কে কোনও কথা নেই। সুরেশকে নিজের হাতে অ্যানিম্যাল রেসকিউয়ার বানিয়েছেন মিস্টার মোহন। উনি নিজেও একজন দুঁদে মাউন্টেনিয়ার, তারপর বিশেষ কমান্ডো ট্রেনিং পেয়েছেন। মিস্টার মোহন সুরেশের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “ কাল সকাল ছ’টায় কন্ট্রোল রুমে আমাকে রিপোর্ট করবে।”


পাঁচ


ভোর ছ’টায় কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত হয়ে মিস্টার মোহন দেখলেন, ঘরে বসে আছেন মিস্টার দাস, ডক্টর রাজন ও সুরেশ। টিপটিপ বৃষ্টি হয়েই চলেছে, তবে তেজালো হাওয়াটা নেই।
“আরে বাহ্‌, সব্বাই এসে গেছেন! সুরেশ দেখো তো কেউ আছে কি না, সবাইকে একটু চা দিতে বলো।”
পাঁচ মিনিটেই চা এসে গেল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করলেন মিস্টার মোহন। “আজকের বিশেষ মিশনটা কী আপনারা জানেন। ব্ল্যাক প্যান্থারটাকে শাবকসহ ওই জলবন্দী ছাদ থেকে তুলে আনতে হবে আমদের পশু হাসপাতালে। প্রায় সারা পৃথিবী জুড়ে ব্ল্যাক প্যান্থারের ক্লিপিংটা দেখানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে বারবার জানতে চাওয়া হচ্ছে ব্ল্যাক প্যান্থারের উদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে। আমাদের আর্মি থেকে যেকোনও রকম সাহায্য নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
“আজ ঠিক সাতটার সময় কালকের আর্মির হেলিকপ্টারটা আসবে। সাথে দু’জন কমান্ডো পাঠাবে ওরা। কমান্ডো পাঠাবে এই কারণে, যদি দড়িতে ঝুলে নামতে নামতে প্যান্থারটাকে গুলি ছুড়ে ঘুম পাড়াতে হয়। আপনারা জানেন এই কাজে ওদের জুড়ি নেই।
“যদিও আমি অন্য কিছু ভাবছি। কমান্ডোরা থাকেলও আমরা ওদের কাজে লাগাব না। ওরা বন্য জানোয়ারদের ব্যাপারে সেরকম কিছু জানে না। দুম করে গুলি ছুড়ে দিলে ব্ল্যাক প্যান্থারটা খতম হয়ে যেতে পারে।
“না, কোনও ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। তিনদিন ধরে অভুক্ত প্যান্থারটা দুটো বাচ্চা নিয়ে অবিরাম জলে ভিজছে।”
খানিক চুপ করে রইলেন মিস্টার মোহন। উপস্থিত সবাই মিস্টার মোহনের মুখের দিকে তাকিয়ে। “আমি সবার আগে আর্মির হেলিকপ্টারটা থেকে ডার্ট গান নিয়ে দড়িতে ঝুলে নামব। তারপর নামবে সুরেশ ও সবার শেষে ডাক্তার। তারপর প্রয়োজন হলে কমান্ডোরা। অ্যানি কোশ্চেন?”
সবাই চুপ। ঘড়ির দিকে তাকালেন মিস্টার মোহন। তারপর বললেন, “ছ’টা চল্লিশ। আর ঠিক কুড়ি মিনিট আছে। সুরেশ জাল আর ডার্ট গান নিয়ে হেলিপ্যাডে চলো, তিনজনের জন্যে বডি হারনেস আর স্লিদারিং গ্লাভস বের করো। ডাক্তার আপনার কিট রেডি করুন। মিস্টার দাস  ওয়াকিটকি দিন।”


ঠিক সাতটায় ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কের কন্ট্রোল রুম সংলগ্ন হেলিপ্যাডে নামল আর্মির বিশাল হেলিকপ্টারটা।
হেলিকপ্টারের পাখার প্রচণ্ড আওয়াজ ও হাওয়ার চাপে কাঁপছে চারপাশ। তিনজনই হেলিকপ্টার চড়তে অভ্যস্ত। হেলিকপ্টারের দরজা খুলতেই জিনিসপত্র কাঁধে চাপিয়ে মাথা নিচু করে দৌড়ে কপ্টারে উঠলেন সবাই। পাইলট ছাড়াও হেলিকপ্টারে আছেন কালকের সেই ক্যাপ্টেন ভদ্রা, জংলি পোশাক ও মাথায় ফেট্টি বাঁধা দুই কমান্ডো। হাত তুলে ‘গুড মর্নিং’ বললেন ক্যাপ্টেন।
মিস্টার মোহন ক্যাপ্টেনকে তাঁর প্ল্যান ব্রিফ করলেন। ক্যাপ্টেন বললেন, তাঁদের ওপর অর্ডার আছে মিস্টার মোহনের নির্দেশকে ফলো করার।
আকাশে উড়ল হেলিকপ্টার। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মোবাইল টাওয়ারের ঘরের ওপরের আকাশে একজায়গায় স্থির হয়ে রইল হেলিকপ্টারটা। হেলিকপ্টারের পাখার হাওয়ার চাপে হালকা দুলছে টাওয়ারটা। কাঁধে ট্রাঙ্কুলাইজার ডার্ট লাগানো বন্দুক নিয়ে হেলিকপ্টার থেকে সাঁ করে দড়ি বেয়ে মোবাইল টাওয়ারের ঘরের ছাদে নেমে এলেন মিস্টার মোহন। ন্যাশনাল পার্কের ভেতরকার প্রত্যন্ত বিট অফিসগুলো প্রয়োজনে এভাবেই ভিজিট করেন উনি। অ্যাডভেঞ্চার ওঁর রক্তে।
ছাদের ওপর পা রেখেই মিস্টার মোহন কাঁধে ডার্ট গান তুলে তাক করলেন ব্ল্যাক প্যান্থারটার দিকে। থাবার ওপর মুখ গুঁজে চুপ করে শুয়ে আছে প্যান্থারটা। হেলিকপ্টারের প্রচণ্ড আওয়াজে বিরক্ত হয়ে কানটা নাড়াচ্ছে মাঝে মাঝে। বাচ্চাগুলো প্যান্থারটা পেটের সাথে মিশে। তার মানে বেঁচে আছে প্যান্থারটা এখনও। কিন্তু বাচ্চাগুলো বেঁচে আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। বন্দুকটা প্যান্থারটার দিকে তাক করে রেখে সুরেশকে নেমে আসার ইঙ্গিত করলেন। একমিনিটের মধ্যে জাল কাঁধে ছাদে নেমে এল সুরেশ, আর তার পেছন পেছন ওষুধের ব্যাগ পিঠে ডাক্তার।
ডাক্তার ও সুরেশ মিলে প্রথমেই প্যান্থারটাকে জালে জড়ালেন। কোনও বাধা দিল না প্যান্থারটা। একদম নিস্তেজ হয়ে রয়েছে ওটা। তারপর ওর পেটের কাছ থেকে বাচ্চাদুটোকে সরিয়ে নিয়ে এলেন ডাক্তার। পিঠের ব্যাগ থেকে দুটো তোয়ালে বের করে বাচ্চাদুটোকে তাতে মুড়ে সুরেশের হাতে তুলে দিলেন। বাচ্চাদুটো বেঁচে আছে এখনও। বাচ্চাদুটোকে নিজের বুকের কাছে আঁকড়ে রাখল সুরেশ। ব্যাগ থেকে একটা ইঞ্জেকশন বের করে প্যান্থারটাকে পুশ করলেন ডাক্তার। এমনিতেই নেতিয়ে ছিল প্যান্থারটা। কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না প্যান্থারটার। চোখ বুজে গেল প্যান্থারটার। ডাক্তার আর মিস্টার মোহন মিলে প্যান্থারটাকে আবার ভালো করে জালে বাঁধলেন। হেলিকপ্টারে টেনে তুলতে হবে এটাকে।
হেলিকপ্টার থেকে ঝুলতে থাকা দড়িটা নিজের হারনেসে জড়িয়ে প্যান্থারের একটা বাচ্চাকে নিজের কোলে নিয়ে নিলেন ডাক্তার। মিস্টার মোহন ইশারা করতে দড়িটা হেলিকপ্টার থেকে টেনে তোলা হতে লাগল। মিনিট দেড়েকের মধ্যে হেলিকপ্টারের ভেতরে ঢুকে গেলেন ডাক্তার। তারপর আবার দড়িটা নেমে এল। একইভাবে আরেকটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সুরেশ উঠে গেল হেলিকপ্টারে। আবার দড়িটা নেমে এলে প্যান্থারসহ জালটাকে ভালো করে দড়িতে বাঁধলেন মিস্টার মোহন। জালে বাঁধা প্যান্থারটা দুলতে দুলতে দড়িতে ঝুলে ঢুকে গেল হেলিকপ্টারের ভেতরে। সবার শেষে হেলিকপ্টারে তোলা হল মিস্টার মোহনকে। হেলিকপ্টার উড়ে চলল ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কের হেলিপ্যাডের দিকে।
হেলিকপ্টারটা ল্যান্ড করে ইঞ্জিন বন্ধ করতেই ছুটে এল বন দফতরের অনেক কর্মী। একটা মিনি ট্রাক রেডি ছিল। তাতে তোলা হোল জালবন্দী প্যান্থারটাকে। আরেকটা গাড়িতে প্যান্থারের বাচ্চাদুটো সহ উঠলেন ডক্টর রাজন, সুরেশ ও মিস্টার মোহন। গাড়ি ও ট্রাক ছুটল পশু হাসপাতালের দিকে। হেলিকপ্টার ফিরে চলল।
খানিক পর টিভির স্ক্রিনে দেখা গেল, তোড়ে বয়ে চলা বন্যার জলের মাঝে জেগে থাকা একচিলতে একটা ঘরের ছাদের ছবি। ছাদের ওপর একটা টাওয়ার। টাওয়ারের ওপর আকাশে স্থির হয়ে ভেসে একটা হেলিকপ্টার। সেটা থেকে দড়ি বেয়ে ওই ছাদে নেমে আসছে এক এক করে তিনটে মানুষ। জালবন্দী করে প্যান্থারকে দড়িতে বেঁধে টেনে তোলা হচ্ছে হেলিকপ্টারে। আর ছবির নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে একটা ক্লিপিংーসামরিক বাহিনী ও ভিমরুক ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষের আকাশপথে যৌথ অভিযানーবন্যা-বিধ্বস্ত ভিমরুক ন্যাশনাল পার্কের বাইরে তিনতিরির মোবাইল টাওয়ারের ঘরের ছাদে আশ্রয় নেওয়া বাচ্চা সহ ব্ল্যাক প্যান্থারকে উদ্ধার করে পার্কের পশু হাসপাতালে স্থানান্তর।
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ পুষ্পেন মণ্ডল

No comments:

Post a Comment