গল্পঃ আশ্চর্যপুরে বুকুঃ সাগরিকা দাস


নরম গদির উপর হেলান দিয়ে বসতেই বুকুর ছোট্ট শরীরটায় আরামের পরশ লাগল। গত কয়েকদিন ধরেই যা গরম পড়েছে! এই গরমে স্কুলে যেতে বুকুর একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু বুকু এবছর ক্লাস টুতে উঠেছে। মা বলেছে, এবার থেকে আর কখনও স্কুল বন্ধ করা চলবে না। তার ওপরে গত সপ্তাহ থেকে বুকুদের স্কুলে ইউনিট টেস্টও চলছিল। সুতরাং স্কুল যাওয়া ছাড়া আর কিছু উপায়ও তো নেই। এই প্যাচপ্যাচে গরমে সাত রাস্তা ঘুরিয়ে পুলকার যখন বুকুকে বাড়ির সামনে নামায় তখন ঘেমে নেয়ে স্নান করে বুকুর অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। সিলিং ফ্যানের হাওয়া তখন আর গায়ে লাগে না যেন। বুকুর তখন খুব ইচ্ছে করে এসিটা চালিয়ে দিতে। কিন্তু ঠাম্মা, দাদু, সুতপামাসি কেউই ওকে কিছুতেই সেটা করতে দেবে না। মায়ের নাকি ‘স্ট্রিক্ট ইনস্ট্রাকশন’ আছে ওদের ওপরে, রোদ্দুর থেকে ঘরে ঢুকেই বুকু যেন এসি না চালায়। কিন্তু এখন কোথা থেকে যেন ফুরফুর করে সুন্দর একটা হাওয়া আসছে। জানালা দিয়ে কি?
ওহো! এটা তো এসি থেকেই আসছে। জানালার কাচটা এত স্বচ্ছ যে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে বুকু ভুলেই গেছিল ও এখন ট্রেনের এসি কোচের ভেতরে বসে রয়েছে। উফ্! কতদিন পরে বুকু ট্রেনে চেপে ঘুরতে যাচ্ছে! স্কুল, পরীক্ষা, বাবার অফিস, মায়ের ছুটির সমস্যা এসব নানা ঝামেলায় বুকুর ঘুরতে যাওয়াটাই আর হয়ে ওঠে না। কাচের জানালার ওপারে সারি সারি চলমান গাছেদের সারি, সবুজ শস্যক্ষেত, ছোট্ট ছোট্ট ঘরবাড়ি, পুকুর, রাস্তা স-বটুকু মন দিয়ে দেখতে লাগল বুকু।
অনেকগুলো স্টেশন পেরিয়ে ট্রেনটা এসে দাঁড়াল মস্ত একটা প্ল্যাটফর্মে। এই স্টেশনটা অন্যগুলোর মতো নয়। এটা বেশ সাজানো গোছানো রঙচঙে একটা স্টেশন। এত বড়ো স্টেশন অথচ প্ল্যাটফর্মে লোকজন বিশেষ কেউ নেই। ট্রেন এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কই, কেউ তো ট্রেনে উঠছে না বা ট্রেন থেকে  নামছে না! বুকু আড়চোখে দেখল উলটোদিকের বার্থে বাবা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ওপরের বার্থে মা আধশোয়া হয়ে একটা বই পড়ছে। বইয়ের আড়ালে মার মুখটা দেখাই যাচ্ছে না। পায়ে পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল বুকু। বাহ্, বাইরের আবহাওয়াটা খুব সুন্দর তো! হালকা হলুদ রঙের নরম রোদে রঙিন প্ল্যাটফর্মটা বেশ মায়াবী লাগছে। বুকুর ভীষণ ইচ্ছে করছে এখানে নেমে জায়গাটা একটু ঘুরে দেখতে। আশেপাশে তাকিয়ে বাবা, মা অথবা চেনা কাউকে দেখতে পেল না বুকু। ও টুক করে একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে নেমে পড়ল ট্রেন থেকে।
একটু দূরে একটা লাল রঙের সাইনবোর্ড ঝুলছে। জায়গাটার নামটা জানবে বলে বুকু সেদিকেই আগে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর এগোতেই পুঁউউউউ করে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটা চলতে শুরু করল। বুকু পেছন ফিরে দেখল ট্রেনটা হঠাৎই বেশ জোরে ছুটতে শুরু করেছে। ট্রেনের পেছনে ছুটতে একটুও ইচ্ছে করছে না ওর। ধীরেসুস্থেই হাঁটতে হাঁটতে সাইনবোর্ডটার সামনে এগিয়ে গেল ও। কিন্তু সামনে থেকে সাইনবোর্ডটা আর পাঁচটা স্টেশনের মতো দেখতে লাগছে না তো! এটা বোর্ডের আদলে তৈরি করা একটা ইয়া বড়ো কেক বলে মনে হচ্ছে। মাঝে ঝিকিমিকি লাল আলোর মালা দিয়ে লেখা ‘আশ্চর্যপুর’। বুকু ভাবল, খুব অদ্ভুত তো নামটা! এমন কোনও জায়গা আছে বলে তো আগে কখনও বুকু শোনেনি! অবশ্য পৃথিবীতে কত দেশ, শহর, গ্রাম যে রয়েছে, এইটুকু বয়সে বুকু তার কতটুকুই বা জানে? এইসব ভাবতে ভাবতে স্টেশনের বাইরের দিকে এগিয়ে গেল সে।
স্টেশনের বাইরে বেরোতেই বুকুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ঘন সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল একটা মাঠ। বুকুদের কমপ্লেক্সেও একটা সুন্দর মাঠ আছে। কিন্তু এই মাঠটা তার চেয়ে অনেক অনেক বড়ো, আর সবুজ। বিভিন্ন বয়সের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে মাঠে ফুটবল খেলছে। ফুটবল খেলতে বুকুরও খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু ওদের কমপ্লেক্সে ক্রিকেট অ্যাকাডেমিটা নাকি বেশি ভালো। মা তাই ওকে সেখানেই ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। সপ্তাহে দু’দিন করে বুকু সেখানে ক্রিকেট খেলা শিখতে যায়। আচ্ছা, এই মাঠে তো কোনও কোচকে দেখা যাচ্ছে না। এরা তাহলে কার কাছে শিখছে? মাঠের দিকে এগোতেই নরম ভেলভেটের মতো ঘাসে বুকুর পা ডুবে গেল। এত নরম ঘাসে বুকু আগে কখনও পা দেয়নি। কে যেন বুকুর দিকে বলটা পাস করে দিল। গায়ে যত জোরে ছিল তার সবটুকু দিয়ে বলটায় পা চালাল বুকু। বলটা উড়ে গেল গোলপোস্টের দিকে। একটা মেয়ে লাফিয়ে উঠে উড়ন্ত বলটায় মাথা দিয়ে ধাক্কা মারল আর বলটা সোজা গিয়ে ঢুকল গোলের মধ্যে। ‘গোওওওওল’ চিৎকারে বুকুর কানে তালা লাগার যোগাড় হল। বাহ্‌, বেশ মজা তো! হৈ হৈ করে বুকু মিশে গেল ওদের দলটার সঙ্গে।
বেশ কিছুক্ষণ ছুটোছুটি করে ফুটবল খেলার পর বুকুর খুব তেষ্টা পেল। ও মাঠ থেকে বেরিয়ে এসে পাশের কাঁচা রাস্তাটা ধরে সামনে হাঁটতে লাগল। অন্য ছেলেমেয়েরা তখনও মাঠে খেলছিল। কী জানি, ওদের হয়তো অভ্যাস আছে অনেকক্ষণ একটানা ছুটে বেড়াবার। আসলে বুকু তো এই প্রথমবার খোলা মাঠে ফুটবল খেলল।
দু-চার পা এগোতেই একজন খুব বুড়ো মতন, লম্বা ঝুলের লাল জামা পরা, দাড়িওয়ালা মানুষ ওর পথ আগলে দাঁড়ালে। একটু দুলে দুলে তাঁর লম্বা, সাদা দাড়ি নাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যে ছেলে, নাম কী তোমার?”
“আমার নাম সৌমাভ সরকার।”
“বাহ্‌ বাহ্‌, নামটা তো বেশ, চমৎকার। জানো নাকি মানে কী তার?”
“নামের আবার মানে কী?”
“দেখো কাণ্ড, এই ছেলেটা বলে কী!”
“আমি জানি না। তাহলে তুমিই বলো।”
“বেশ তো, তবে আমার সঙ্গে চলো।”
“কোথায়?”
“জল পাওয়া যাবে যেথায়।”
ও হ্যাঁ, তাই তো! একটু আগে বুকুর তো সত্যিই খুব জলতেষ্টা পেয়েছিল। কিন্তু এই দাদুটা সেটা কী করে জানল? আর দাদুটা এমন পোয়েম বলার মতো মিলিয়ে মিলিয়ে কেন কথা বলছে? এসব ভাবতে ভাবতেই বুকু ঐ বুড়ো মতন লোকটার সঙ্গে হাঁটতে লাগল।
রাস্তার মাঝে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়ে দাদুটা তড়তড় করে একটা গাছে উঠে গেল। বুকু জানে, এটা কোকোনাট ট্রি। ওদের কমপ্লেক্সের পেছনে বাউন্ডারি ওয়ালের পাশে দুটো কোকোনাট ট্রি আছে। বাবা একদিন দেখিয়েছিল ওকে। মা যদিও একটু বকাবকি করেছিল বাবাকে। ওই সাইডটা নাকি আন-হাইজেনিক। সুইপারদের আসাযাওয়ার রাস্তা ওটা।
“নাও দাদুভাই, এক চুমুকে জলটা খেয়ে ফেল দেখি।” দাদুটার ডাক শুনে বুকু হাত বাড়িয়ে ডাবটা নিল। ওর খাওয়া শেষ হতেই দাদুটা আবার হাঁটতে শুরু করল। বুকুও পাশে পাশে হাঁটতে লাগল।
“আচ্ছা, তুমি কী করে জানলে আমার তেষ্টা পেয়েছিল?”
“আহা! তেমনই তো কথা হয়েছিল।”
“কথা! তবে কি তোমার সঙ্গে আমার আগে কখনও দেখা হয়েছিল?”
“হয়েছিল বৈকি! সেই যেবার বড়ো বেশি ঠাণ্ডা পড়েছিল।”
“ঠাণ্ডা মানে উইন্টার?”
“ওহো, উইন্টার বলতে মনে পড়ল। খাবে নাকি একটা চিজ বেকন বার্গার?”
“বার্গার! কোথায়?”
“ঐ যে হোথায়।”
বুকু তাকিয়ে দেখল, রাস্তার পাশেই একটা বেঁটেমতো গাছ। গাছটার পাতাগুলো ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া, গোল গোল। আর সেইসব পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে বিভিন্ন রকমের বার্গার। বার্গারও যে গাছে ফলে তা আজই বুকু প্রথম জানল। অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে টুপ করে একটা বার্গার পেড়ে নিল বুকু। বার্গার, পিৎজা, হটডগ, পেস্ট্রি, মোমো এসব বুকুর ফেভারিট খাবার। এছাড়া চিপস আর চকোলেট তো রয়েছেই। কিন্তু মা কিছুতেই এসব মন ভরে খেতে দেয় না। খালি বলে, ‘বুকু, এসবের মধ্যে কোনও ফুড ভ্যালু নেই। মাঝে মাঝে খাও ঠিক আছে, কিন্তু রোজ রোজ এগুলো আমি কিনে দেব না। তোমাকে বাড়ির খাবার, সবজি, ফল, মাছ, দুধ এসব খেতে হবে।’
বুকুর ভারি বয়েই গেছে ওসব খেতে। ভাত, মাছ, সবজি খেতে বুকুর খুব বিচ্ছিরি লাগে আর দুধের গ্লাস দেখলেই তো বমি পায়।
বার্গারটা শেষ করে আশেপাশে তাকাল বুকু। দাদুটা আবার কোথায় গেল? সামনে এগিয়ে বরং দেখা যাক দাদুটাকে পাওয়া যায় কি না। ফেরার পথে বরং কিছু বার্গার এই গাছটা থেকে পেড়ে নিয়ে যাওয়া যাবে।
দু-চার পা এগোতেই রাস্তাটা ক্রমশ সরু হয়ে এল। পথের দু’পাশে সুন্দর করে সাজানো নানান ধরনের বাড়ি। কোনোটা একতলা, কোনোটা আবার দোতলা। সাদা, গোলাপি, হালকা হলুদ বিভিন্ন তাদের রং। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে পৌঁছতেই মিষ্টি মিষ্টি মনকাড়া গন্ধ নাকে আসছে। সাহস করে একটা বাড়ির সামনে এগিয়ে যেতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হল বুকুর কাছে। সুন্দর গন্ধগুলো আসছে বাড়িগুলোর গা থেকে। এই বাড়িগুলোর দেওয়াল আসলে ইট, বালি, সিমেন্টের বদলে কোনও নরম জিনিস দিয়ে তৈরি। কিন্তু জিনিসটা কী? একটু ভয়ে ভয়ে বুকু হাত রাখল গোলাপি বাড়িটার দেওয়ালে। বাহ্, বেশ নরম তো দেওয়ালটা! কিন্তু আঙুলের ডগায় এই গোলাপি গুঁড়ো গুঁড়ো জিনিসটা কী লাগল? নাকের কাছে আনতেই স্ট্রবেরির হালকা গন্ধ পেল বুকু। কী ভেবে আঙুলটা জিভে ছোঁয়াল ও। আরিব্বাস, এটা তো বুকুর ফেভারিট স্ট্রবেরি সন্দেশ! এত্ত বড়ো বড়ো বাড়িগুলো তাহলে নানা ফ্লেভারের সন্দেশ দিয়ে তৈরি! আনন্দের চোটে বাড়িটার জানালার নিচের কিছুটা অংশ খাবলে খেয়ে ফেলল বুকু। ওমা! দেখতে দেখতে জায়গাটা ভরাট হয়ে গেল আবার। বেশ মজা তো! বুকু এইবার বুঝতে পারছে, জায়গাটার নাম আশ্চর্যপুর কেন।
আনন্দে প্রায় ছুটতে ছুটতে বুকু সামনের দিকে এগিয়ে গেল। কয়েকটা বাড়ির পরেই একটা ধবধবে সাদা পথ দেখতে পেল ও। পথটায় হাঁটতে যেতেই নিজেকে খুব হালকা লাগল বুকুর। পা ফেললেই ছোটো ছোটো লাফ দেওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে ওর। একবার সত্যিই একটা লম্বা লাফ দিল ও। ওহোওওও… কত্ত উঁচুতে উঠে গেল বুকু! তারপর সোজা মাটিতে নেমে এল। খুব মজার ব্যাপার তো! আবার লাফ দিল ও। আবার। আবার।
মনের সুখে বার কয়েক লাফানোর পরে হাঁফাতে হাঁফাতে একসময়ে বুকু রাস্তার ওপরেই বসে পড়ল। আর তখনই ও বুঝতে পারল, এই ধবধবে সাদা রাস্তাটা বিশাল বড়ো একটা মার্শমেলো দিয়ে তৈরি। রাস্তাটার পাশে একটা পুকুর দেখতে পেল ও। কিন্তু পুকুরের জলটা কেমন ঘন বাদামি রঙের। বুকু এবার আর ঘাবড়াল না। গটগট করে পুকুরপাড়ে হেঁটে গিয়ে সোজা দুটো আঙুল ডুবিয়ে দিল জলের ভেতর। হুম, যা ভেবেছিল ঠিক তাই। এটা কোনও সাধারণ পুকুর নয়। এটা আসলে চকলেটের পুকুর। পুকুরপাড়ে বসে মনের সুখে চকলেট খেতে লাগল বুকু।
চকলেট খেতে খেতে কতক্ষণ যে কেটে গেছে সে খেয়ালই বুকুর ছিল না। হঠাৎ একটা চেনা গলার প্রশ্ন শুনে ঘুরে তাকাল বুকু। সেই দাদুটা কখন যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুকুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করছে, “বুকু তো আর ফিরবে না বাড়ি। এবার উঠে পড়ো দেখি, তাড়াতাড়ি।”
বাড়ির কথা শুনেই বুকুর মা আর বাবার মুখটা সবচেয়ে আগে মনে পড়ল। সত্যিই তো! বুকুকে ছাড়া মা-বাবা যে এতক্ষণ কী করছে! ট্রেনটাই বা কতদূর পৌঁছল কে জানে! চট করে উঠে দাঁড়িয়ে দাদুটাকে জিজ্ঞাসা করল বুকু, “এরপরে ট্রেন আবার কখন আসবে?”
“আসবে। আবার যখন মর্জি হবে।”
“মানে? ট্রেনের আসাযাওয়ার কোনও টাইমটেবল নেই?”
“তা জেনে কী লাভ? তোমাকে তো এখানে থাকতেই হবে সেই।”
“থাকতেই হবে…, কেন?”
“হুহ্‌, এ দেশটা তোমার ভালো লাগছে না যেন!
এখানে যারা একবার আসে
তারা এই দেশটাকেই ভালোবাসে
ফিরে যাওয়ার নেই তো কোনও পথ
তাছাড়া এদেশে তো মজা হরবখত
এখানে পড়াশোনার নেই কোনও চিন্তা
শুধু খেলা, খাওয়া আর আনন্দ ধিনতা ধিনতা।”
“কিন্তু বাবা-মা তো আমার জন্য চিন্তা করবে!”
“সেকথা কি আর এখন ভাবলে চলবে?”
“আমি মার কাছে যাব।” এবার বুকুর গলাটা একটু কাঁদো কাঁদো শোনাল। আসলে বাড়ি যেতে পারবে না শুনে ওর এবার একটু ভয় ভয় করছে।
“ওসব কথা ভেবো না, শুধু খাওয়ার কথা ভাবো।
বাড়ি গিয়ে খাবে কী?
সেই তো ভাত-রুটি-মাছ আর শাকসবজি
তার চেয়ে থেকে যাও
পেট ভরে বার্গার-পিৎজা-চকলেট খাও।”
“না প্লিজ, আমাকে যেতে দাও।” এবার সত্যি কেঁদে ফেলল বুকু।
আর তখনই চেনা গলায় কে যেন ডেকে উঠল, “বুকু, অ্যাই বুকু, ভাত খাবি না? ওঠ সোনা, দেখো দেখি কাণ্ড! স্নান করে ভিজে মাথায় এভাবে কেউ ঘুমোয়?”
চোখ মেলে বুকু দেখল ঘরের সোফার ওপর শুয়ে রয়েছে ও। সামনে ঝুঁকে পড়ে মা ওকে ডাকছে। ওহ্, তাহলে এতক্ষণ ধরে ও স্বপ্ন দেখছিল!
ছুটির দিনগুলোতে বাবা-মা আর বুকু একসাথে খেতে বসে। ওর পরে আজ বাবা স্নান করতে গিয়েছিল। বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যে একটু ঘুম এসে গেল! কিন্তু ঐ বুড়ো দাদুটা তাহলে কে ছিল? বড্ড চেনা চেনা লাগছে যে! বুকুর হাতের আঙুলগুলো আর জিভটাও এমন চটচটে হয়ে গেল কী করে? ভাবতে ভাবতেই ও উঠে হাতমুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে বসল। সুতপামাসি আজ ভাত, শুক্তো, মাংস আর আমের চাটনি রেঁধেছে। শুক্তো দিয়ে ভাত মেখে চটপট খেতে শুরু করল বুকু। ওর খাওয়া দেখে বাড়ির সকলে অবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। ঠাম্মা তো বলেই ফেলল, “বাব্বা, আজ হঠাৎ হল কী, দাদুভাই? শুক্তো দিয়ে ভাত খেতে তোমার এত ভালো লাগছে!”
ঠাম্মা কী করে জানবে বার্গার, মার্শমেলো, চকলেটের দেশে বুকু কেমন ঝামেলায় পড়েছিল? বুকু ভাবল পরে ঠাম্মাকে চুপিচুপি সত্যি কথাটা বলে দেবে। এখন বললে মা তো কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। ভাববে বুকু বানিয়ে বানিয়ে স্টোরি বলছে। মুখ তুলে ঠাম্মার দিকে তাকাতে গিয়ে বুকুর চোখ পড়ল উলটোদিকের দেওয়ালে টাঙানো চেনা ছবিটার দিকে। বরফের রাজ্যের মাঝে দু’হাতে প্রচুর গিফট বক্স নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে সান্টা ক্লজ। বুকু চেঁচিয়ে উঠল, “ওওওও! ঐ দাদুটা তবে…”
“মানে? কোন দাদুটা?” বুকুর দাদু জানতে চাইলেন।
“শশশশ… এখন চুপ করে খেয়ে নাও দাদু। জানো না, খাওয়ার সময়ে বেশি কথা বলতে নেই?”
বুকুর কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। কিন্তু বুকু জানে, আসলে ব্যাপারটা মোটেই হাসির নয়।
_____
অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

No comments:

Post a Comment