গল্পঃ টিনা ও মিনাঃ রক্তিম কুমার লস্কর


বছরের শুরুতেই টিনার বাবা-মা নতুন ফ্ল্যাট কিনে চলে এল আনন্দলোক আবাসনে। এতদিন তারা কলকাতায় ভাড়া বাড়িতে থাকত। এবার টিনার বাবা-মা শহরের একটু বাইরে ফ্ল্যাট কিনে পাকাপাকি চলে এল।
টিনাদের আবাসনটি এয়ারপোর্টের খুব কাছে। আবাসনের মধ্যে রয়েছে আম, জাম ও নারকেলসহ নানা গাছপালা। কলকাতার কাছে এত সবুজের সমারোহ দেখে টিনার মা অন্তরার আনন্দলোক আবাসনটি খুব পছন্দ হয়। আর সাধ্যের মধ্যে এত সুন্দর একটি আবাসন দেখে টিনার বাবা রাতুলও আর দেরি করেনি।
নতুন জায়গায় এসে টিনাও ভর্তি হল নতুন স্কুলে। ছোট্ট টিনার বয়স চার বছর। এতদিন সে কলকাতায় একটি প্লে স্কুলে পড়ত। এখন আবাসন থেকে হাঁটা পথে টিনার স্কুল। সকালে টিনা বাবার সাথেই স্কুলে যায়। আর ফেরার সময় তার মা আনতে যায়। টিনার সমস্ত বায়নাক্কা শুরু হয় স্কুল থেকে ফেরার সময়। আর সেসব সামলাতে হয় অন্তরাকেই।
রাতুল কাজ করে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে। সাতসকালে সে অফিস বের হয়ে যায়। আর বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বা ন’টা। তাই ছোট্ট টিনার পড়াশোনা দেখতে হয় অন্তরাকেই।
টিনার স্কুল শুরু হয় বেশ সকাল সকাল। সকাল সাতটার মধ্যে তাকে স্কুলে যেতে হয়। আর ছুটি হয় সেই বেলা এগারোটায়। বাড়ি ফিরে আসার পর টিনার কোনও পড়াশোনা থাকে না। তখন টিনার সময় কাটে খেলাধুলোয়।
টিনাদের ফ্ল্যাটটি তেতলায়। ফ্ল্যাটের ব্যালকনিটা বেশ বড়ো। আর তাতে সবসময় আলো হাওয়া থাকে। আর ব্যালকনির ঠিক নিচেই রয়েছে একটা ছোটোদের পার্ক। সেখানে দিনের বেশিরভাগ সময়ই আবাসনের বাচ্চাদের খেলতে দেখা যায়। ব্যালকনিতে বসে ছোট্ট টিনা এসব দেখতে থাকে। নানা ধরনের খেলনা নিয়ে সেখানেই তার সময় কেটে যায়। নিচে পার্কে চেনা বাচ্চাদের দেখলে সে ডাকতে থাকে। টিনা যখন খেলাধুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকে তখন টিনার মা অন্তরা কাজের ফাঁকে এসে মাঝে মাঝে মেয়েকে দেখে যায়।

***

এরই মধ্যে এক ছুটির দিন সকালে রাতুল ঘুম থেকে উঠে বাজারে গিয়েছে। ছোট্ট টিনা ঘুম থেকে উঠে ব্রাশিং করেছে। তারপর দুধ-বিস্কুট খেয়ে বারান্দায় বসে খেলাধুলো করছে। হঠাৎ শোনা গেল টিনার গলা, “মাম্মা মাম্মা, দেখো মিনা এসেছে।”
অন্তরা এতক্ষণ রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত ছিল। টিনার গলার আওয়াজ পেয়ে বলল, “তুই দেখ, আমি আসছি।”
হাতের কাজ শেষ করে একটু পরে অন্তরা বারান্দায় এসে বলল, “কোথায় রে মিনা?”
টিনা আঙুল দিয়ে নিচে পার্কের দিকে দেখাল। “ওই দেখো মাম্মা, দুটো মিনা এসে পার্কের দোলনার মাথায় বসেছে। সাথে একটা বেবি মিনাও আছে।”
এতক্ষণে অন্তরা পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারল। টিনা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ছে। তাই সে শালিককে মিনা বলেই জানে। আর অন্তরা বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রী। তাই সে মেয়ের কথা শুনে প্রথমে বুঝতে পারছিল না। অন্তরা দেখল, দুটো শালিক পাখি পার্কে এসে বসেছে। আর এক বাচ্চা শালিকও আছে। বাচ্চা শালিকটি খুব ছোট্ট বলে ভালো উড়তে পারছে না। সে শালিক পাখিগুলো দেখিয়ে বলল, “ওই দেখ টিনা, বড়ো দুটো হল পাপা মিনা আর মাম্মা মিনা। আর ছোট্টটা হল বেবি মিনা।”
কথাটা টিনার খুব পছন্দ হল। সে আবার বলল, “মাম্মা দেখো, পাপা মিনা মুখে খাবার নিয়ে এসেছে। আর মাম্মা মিনা বেবিটাকে খাইয়ে দিচ্ছে।”
অন্তরা মেয়ের কথা শুনে হেসে ফেলল। বলল, “একদম ঠিক তোর মতো। এখনই তোর পাপাও চলে আসবে। তারপর তোকে সকালের জলখাবার দিচ্ছি।”
টিনা বলল, “আমি এখানেই খাব। আচ্ছা মাম্মা, বেবি মিনাকে আমি খাওয়াতে পারি না?”
অন্তরা জবাব দিল, “বেবি মিনা তো খুব ছোট্ট। তাই আমাদের ব্যালকনিতে উড়ে আসতে পারবে না। ও বড়ো হলে তুই খাওয়াবি।”
অন্তরা আবার তার কাজে ফিরে গেল। আর টিনা গভীর মনোযোগ সহকারে মিনাদের কাজকর্ম দেখতে লাগল।
এর মধ্যে রাতুল বাজার থেকে ফিরে এসেছে। ঘরে ঢুকে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, “টিনা কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না তো।”
অন্তরা বলল, “আর যাবে কোথায়? তোমার আদরের মেয়ে ব্যালকনিতে বসে পাখিদের কার্যকলাপ দেখছে।”
রাতুল আর কথা না বাড়িয়ে সকালের নিউজ পেপারটায় চোখ বোলাতে লাগল। ওদিকে অন্তরা বাজার গোছাতে শুরু করেছে। হঠাৎ টিনার চিৎকার শোনা গেল, “মাম্মা মাম্মা, শিগগিরি এসো।”
টিনার চিৎকার শুনে রাতুল ও অন্তরা দু’জনেই চমকে উঠল। হাতের কাজ ফেলে ওরা ব্যালকনিতে ছুটে গেল।
“কী হয়েছে রে, টিনা?” আতঙ্কে বলে উঠল অন্তরা।
“মাম্মা দেখো, বেবি মিনাটা উড়তে পারছে না। আর তাই না দেখে দুষ্টু ক্যাটটা কোথা থেকে চলে এসেছে।“ টিনা জবাব দিল।
ইতিমধ্যে রাতুলও ব্যালকনিতে চলে এসেছে। ওরা দেখল বাচ্চা শালিকটা উড়তে পারছে না বলে পার্কের দোলনার উপরে বসে আছে। আর বড়ো শালিকদুটো বাচ্চাটাকে পাহারা দিচ্ছে। এদিকে তক্কে তক্কে একটা বিড়াল ঠিক দোলনার নিচে এসে চুপটি করে বসে আছে। আর বিপদ বুঝে বড়ো শালিকদুটো প্রাণপণে চেঁচিয়ে বিড়ালটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করছে।
“পাপা, দেখো না। দুষ্টু ক্যাটটা বেবি মিনাটাকে মেরে ফেলবে। তুমি কিছু করো না।”
টিনার কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে অন্তরাও বলল, “যাও না, নিচে গিয়ে বিড়ালটাকে একটু তাড়িয়ে দিয়ে এসো।”
অগত্যা রাতুল আর কী করে। সে পায়ে চটিটা গলিয়ে নিচে নেমে যায়। রাতুলকে দেখেই বিড়ালটা পার্ক থেকে পালিয়ে গেল। সেটা দেখে উপর থেকে টিনা আনন্দে হাততালি দিল।
কিন্তু বিড়ালটাও কম যায় না। একবার তাড়ালে কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকে। আবার সুযোগ বুঝে পার্কে চলে আসে। আর শালিকদুটোর চিল-চিৎকার শুনে টিনাও বাবাকে ডাকতে থাকে। মেয়ের আবদারে রাতুলকে সেই নিচে ছুটে যেতে হয়। সারাদিনে বেশ কয়েকবার ঘটল এরকম।

পরদিন স্কুল থেকে ফিরেই টিনা সোজা ছুটে গেল ব্যালকনিতে। “মাম্মা দেখো, বেবি মিনাটা কোথায় বসে আছে।”
অন্তরা বলল, “কোথায় রে, টিনা?”
টিনা জবাব দিল, “দোতলার সানশেডে।”
অন্তরা বুঝল, বাচ্চা শালিকটা একটু উড়তে শিখেছে। আর তার বিড়ালের কোনও ভয় নেই।

***

দেখতে দেখতে বছর দুয়েক কেটে যায়। টিনাও একটু বড়ো হয়েছে। সে এখন ক্লাস ওয়ানে পড়ে। সে আর আগের মতো খেলাধুলো করে না। বরং এখন তার সবসময়ের সঙ্গী হল একটা ট্যাব। গত জন্মদিনে পাপা ওকে গিফট করেছে। টিনা অবসরে সেই ট্যাব নিয়ে কার্টুন দেখে, ছবি আঁকে। কিন্তু টিনার একটা অভ্যাস বদলায়নি। রোজ স্কুল থেকে ফিরে সে ব্যালকনিতে যাবেই। আর ছুটির দিন সকালে খানিকটা সময় সে ব্যালকনিতেই কাটায়। তারই মধ্যে চলে পড়াশোনা। অন্তরা গজগজ করে।
এরই মাঝে টিনার মিনা বন্ধুরা ব্যালকনির সামনে এসে ঘুরে যায়। টিনাও ওদের জন্যে ব্যালকনির সামনে সানশেডে জল রেখে দেয়। এমনকি সকালে নিজের জলখাবার থেকে বাঁচিয়ে কিছুটা ব্রেডও রেখে দেয় সে মিনাদের জন্যে। যদিও এর জন্যে মাঝেমধ্যেই মার কাছে খুব বকাও খায়।

এক ছুটির দিন সকালে রাতুল গেছে বাজারে। অন্তরা যথারীতি রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত। আর এদিকে টিনা বই নিয়ে বসে আছে ব্যালকনিতে। মাঝে অন্তরা এক-দু’বার গিয়ে মেয়েকে দেখেও এসেছে।
রাতুল কিছুক্ষণ পরে বাজার থেকে ফিরে এসেছে। তারপর সে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে নিউজ পেপার পড়ছে। আর অন্তরা ওদিকে জলখাবার রেডি করছে। হঠাৎ কানে এল ড্রয়িং রুমের জানালার সামনে পাখিদের জোর কিচিরমিচির আওয়াজ।
“কী হয়েছে, অন্তরা? পাখিগুলো এরকম ডাকছে কেন?” রাতুল জিজ্ঞেস করল।
“সত্যি তো! একবার দেখো না কী হয়েছে।” অন্তরা বলে উঠল।
রাতুল সোফা থেকে উঠে জানালার সামনে এসে দেখে, কয়েকটি শালিক পাখি কিচিরমিচির করে ডেকে চলেছে সমানে। হঠাৎ রাতুলের মেয়ের কথা মনে হল। “আচ্ছা, টিনা কোথায়? টিনা... টিনা...” বলে ডাকতে লাগল রাতুল।
অন্তরা বলল, “কোথায় আর হবে? নিশ্চয়ই ব্যালকনিতে বসে আছে।”
শুনেই রাতুল বলল, “আচ্ছা, গিয়ে একবার দেখে আসি।”
পরমুহূর্তেই গিয়ে হাজির হল সোজা ব্যালকনিতে। ব্যালকনির ঘরের দরজার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখতে পেল টিনাকে। টিনা ব্যালকনিতে বসে কানে হেডফোন লাগিয়ে ট্যাবে গভীর মনোযোগ সহকারে কার্টুন দেখছে। আর ঠিক তার পাশেই ব্যালকনির রেলিংয়ে একটা সবুজ রঙের সাপ জড়িয়ে আছে। এটা দেখেই আঁতকে উঠল রাতুল। অন্তরাকেও ডেকে আনল। এতক্ষণে ওরা শালিক পাখিদের ছটফটানির কারণ বুঝতে পারল। টিনার আসন্ন বিপদ বুঝে শালিক পাখির দলটি প্রাণপণে চেষ্টা করছে সাপটাকে তাড়ানোর। ওদিকে কানে হেডফোন নিয়ে টিনা সম্পূর্ণ অন্য জগতে ডুবে আছে। পাখিদের চ্যাঁচামেচি ওর কানে পৌঁছচ্ছে না।
চোখের সামনে এরকম একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখে অন্তরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। ভয়ে তার গা-হাত-পা প্রায় ঠাণ্ডা হওয়ার যোগাড়। অবশ্য রাতুল ঠাণ্ডা মাথার লোক। সে ঘর থেকে একটা লাঠি যোগাড় করে আনল। প্রায় মিনিট দশেকের চেষ্টায় রাতুল সাপটাকে ওদের ব্যালকনি থেকে তাড়াতে সক্ষম হল। আর ঠিক পরমুহূর্তেই টিনাকে কোলে তুলে সোজা ঘরের ভিতরে ছুট লাগাল অন্তরা।
এরপর থেকে ব্যালকনিতে বসা নিয়ে টিনার আর কোনও বাধা রইল না। ছুটির দিন সকালে পড়াশোনাটা সে ব্যালকনিতে বসেই করে। এর জন্যে বাবা বা মা কেউ তাকে বকাঝকা করে না। আর দিনের বেলা ব্যালকনির সানশেডে টিনার মিনা বন্ধুদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার ও জল রাখা থাকে। আর মিনা বন্ধুরা পালা করে এসে টিনার সাথে দেখা করে যায়।

_____
অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক




No comments:

Post a Comment