গল্পঃ সব হিসেবের বাইরেঃ অনিন্দ্যকেতন গোস্বামী


নিতান্তই এক রবিবারের সকালে খেয়ালের বশে রওনা দিলাম পলাশী। অবশ্য ব্যাপারটা যে একেবারেই অভাবনীয়, তা নয়। ডি.এল.এড ক্লাসের সহপাঠী শিক্ষকবন্ধু সাদেরুল সাহনাওয়াজের বাড়ি পলাশীর পাশের গ্রাম পানিঘাটায়। আমরা তাকে সাধুদা বলেই ডাকতাম। এই সাধুদারই এক নিকট আত্মীয় কাজ করতেন পলাশীর সুগার মিলে। সুতরাং সুযোগটা সুবর্ণ। হাতছাড়া করা অবিবেচকের কাজ হবে ভেবে স্কুলে খান দুয়েক সি.এল. একসঙ্গে কেটে সাধুদাকে ফোন করে সেই রবিবারেই রওনা দিলাম পলাশী।
পলাশীতে ট্রেন থেকে নেমে পশ্চিমদিকে এসে ঘন জটপূর্ণ বাজারে সাধুদাকে খুঁজে পেলাম না। যাক গে, ভাবলাম, চৌত্রিশ নং জাতীয় সড়কে ওঠার মোড়ে নেতাজী স্ট্যাচুর কাছেই বোধহয় থাকবেন। না, সেখানেও নেই।
এমনিতেই পলাশী স্টেশন থেকে জাতীয় সড়কের রাস্তা পর্যন্ত এত ঘন দোকানপাট আর সংকীর্ণ পথ, তার সাথে অভাবনীয় লোকের ভিড়। ভাবলাম, সাদেরুলদাকে দেখতে নির্ঘাৎ আমি মিস করেছি। ভটভটি রিক্সা আর ছোটো ছোটো টেম্পোগুলো সবসময়ই হাঁকিয়েই চলেছে, ‘ঘাট ঘাট ঘাট…’।
কিন্তু লোকটা যাবে কোথায়? আমাকে ফোনে সম্ভাব্য যে কয়টি থাকার জায়গার কথা বলেছিলেন, সবই প্রায় খোঁজা শেষ। একপ্রকার হতাশই হলাম। তবে আরেকবার ফোন করার জন্যে পকেটে যেই হাত ঢুকিয়েছি অমনি দূরে মনে হল সদেরুলদা দাড়িয়ে আছেন। আমি হাতের ইশারা করলাম। বুঝলেন বলে তো মনে হল না। তারপর ভালো করে চেয়ে দেখি ব্যক্তিটি আসলে সাদেরুলদাই নন। আমারই ভুল।
এবার ফোনটা করেই দেখা যেতে পারে। নাহ্! রিং হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কলটা রিসিভ করছেন না।
এবার কিন্তু আমার রাগ চরমে পৌঁছে যাচ্ছে। এতটা অবিবেচকের মতন কাজ করাটা সাদেরুলদার উচিত হয়নি। সেই রানাঘাট থেকে সাতাত্তর কিলোমিটার পথ ঠেঙিয়ে এসে আমার দিনটাই মাটি হওয়ার যোগাড় আর কী।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম, একা-একাই পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রটা ঘুরে দেখব। সুগার মিলটাকে বাইরে থেকেই দেখে চক্ষু সার্থক করব। কী আর করা। দু-দুটো দিন থেকে জায়গাটাকে ভালো করে দেখতে চেয়েছিলাম। যে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে আসা তেনারই যদি খোঁজ না পাওয়া যায়!
অগত্যা মধুসূদন ভটভটি। তারই একখানা চেপে রওনা দিলাম ঘাটের উদ্দেশ্যে। মিনিট দুয়েক যাবার পর থানার মোড়ের কাছে এসে কে যেন পেছন থেকে ডাক দিলেন, “নীহারদা-আ-আ…”
আমি ঘাড় ঘুরে তাকাতেই দেখি সাদেরুলদা ছোট্ট একটা ব্যাগ কাঁধে দাড়িয়ে আছেন। আমার সমস্ত রাগ যেন গলে জল হয়ে গেল। আল্টিমেটলি লোকটাকে পাওয়া গেল তবে। কাছে এসেই আমাকে কষে এক ধাওয়া মারলেন, “কী মশাই, ফোনাটাকে সকাল থেকেই বন্ধ রেখেছেন নাকি?”
আমি তো থ। “বলেন কী! আমি তো বরঞ্চ আপনাকে ফোনে পাচ্ছিলাম না!”
যাই হোক, বিতণ্ডার শেষ করে রওনা দিলাম মনুমেন্টে। গ্রাম্য প্রাকৃতিক শোভা আর ভটভটির প্রলয় নাচন নাচতে নাচতে অবশেষে পৌঁছালাম ভারতের সূর্য অস্তাচলের মনুমেন্টে। জায়গাটা আশানুরূপ নিস্তব্ধ। লোকসমাগম খুবই কম। বাঙালি ইতিহাস বিমুখ, একথা তো আর বারবার প্রমাণ করতে হয় না?
সাদেরুলদাও যে এ সমস্ত বিষয়ের প্রতি খুব একটা উৎসাহী তাও মনে হল না। যে মোড়ের কাছে ভটভটি থামাল, তার ডানদিকে সামান্য একটু হেঁটে গেলেই মনুমেন্ট। বাঁদিকের রাস্তাটা হালকা গড়ানো। নেমে গেছে চিনির মিলের দিকে। সোজা গঙ্গার ঘাটে।
আমার চোখ কিছুটা মেঘলা আকাশের দিকে উদাসী। সাদেরুলদা আমাকে বললেন, “নীহারদা, আকাশের দিকে তাকিয়ে কী দেখেছেন? বৃষ্টি নামল বলে।”
“তা নামে নামুক । কাল তো ছুটি নিয়েছি। ফেরার তাড়া নেই।”
“আমি বলছিলাম কী, আমার আর আপনার ব্যাগপত্তর আমার ওই আত্মীয়ের বাসায় রেখে এলে কেমন হত?”
“তা মন্দ হত না। বৃষ্টিতে ভিজলে বরং ব্যাগের কাপড়চোপড়গুলো নষ্ট হবে।”
আমরা প্রথমে গিয়ে উঠলাম কোম্পানির সেই ভাঙাচোরা দোতলার কোয়ার্টারে।
সাদেরুলদার আত্মীয়র রুমের সামনে গিয়ে দেখি ঢাউস এক তালা ঝোলানো। পাশের ঘরে উঁকি মেরে দেখি এক অল্প বয়সী ছোকরা গোছের ছেলে। সে তখন জামাকাপড় ছেড়ে লুঙ্গি পরছে। সাদেরুলদা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, এই অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার সাহেব কখন আসবেন?”
“উনি তো আসতে খুব লেট করেন। তবে সন্ধে নাগাদ আসবেন বলে মনে হয়।”
বয়স অনুপাতে ছোকরার গলার স্বর যেমন অদ্ভুত ভারী, তেমনি ফ্যাঁসফেসে। আমি ইতস্তত বোধ করতে লাগলাম। সাদেরুলদার মুখ দেখে মনে হল, আমার থেকেও তকলিফে পড়েছেন বেশি তিনি। সেটাই স্বাভাবিক। ওঁর নিমন্ত্রণেই যেহেতু আমি এসেছি, সুতরাং আমাকে নিয়ে ইতস্তত বোধ তাঁরই বেশি হওয়ার কথা।
ছেলেটা মুখ বাড়িয়ে দুয়েকবার আমাদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল বলে মনে হল। তারপর যথাসম্ভব বিনীত সুরে বলল, “কিছু যদি মনে না করেন, আমার ঘরে আপনারা অপেক্ষা করতে পারেন সাহেব না আসা পর্যন্ত।”
অগত্যা কী আর করা? সাদেরুলদা বললেন, “এক কাজ করি নীহারদা, আমরা বরঞ্চ মনুমেন্ট আর তার চারপাশটা একটু ঘুরে-টুরে দেখে আসি। ব্যাগদুটো এই ভাইয়ের যদি কোনও অসুবিধে না হয়, তবে এখানেই রেখে যাই। ততক্ষণে আমার দাদা (ইঞ্জিনিয়ার সাহেব) চলে আসবেন।”
ইতিমধ্যে আকাশ ঘন অন্ধকারে প্রায় ছেয়ে গেছে। মেঘও যেন লেপটে গেছে গোবর লেপার মতো আকাশের উঠোন জুড়ে। থেকে থেকে বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। একে শরতের আকাশ তায় আবার মেঘলা। হালকা ঠাণ্ডাও লাগছে।
ছেলেটি হাসিমুখে তার সম্মতি জানাল। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ওর কাছ থেকে একটা ছাতা চেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভারতের ‘ভাগ্যাকাশে আজ ঘনঘটার’ ইতিহাস দেখতে।
থাক থাক করা চারটে বেদীর উপরে মূল মনুমেন্ট। আমার মাথাটাক উপরে ডিম্বাকৃতি সাদা প্লেটের উপরে খোদাই করে ইংরেজিতে কালো অক্ষরে লেখা, ‘ব্যাটেল ফিল্ড, পলশী, তেইশে জুন সতেরোশো সাতান্ন।’ তারপর চৌকো পিরামিড চূড়া আকাশে উত্থিত। তবে তা গৌরবের নাকি দুঃখের বুঝে ওঠার আগেই সাদেরুলদা বললেন, “দেখেছেন, সিরাজদ্দৌলার স্ট্যাচুটা? মনে হচ্ছে যেন কত দুঃখ নিয়ে সুদূর বঙ্গভূমির দিকে তাকিয়ে আছেন।”
আমি একটু অবাক হলাম। সাদেরুলদাও সাহিত্য কপচান! জানতাম না তো!
টুপটাপ দুয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করেছে। সাদেরুলদা বললেন, “নীহারদা, চলুন ঐ ভাইয়ের ঘরে গিয়েই উঠি। বৃষ্টিতে ভিজলে এ সময়ে শরীর খারাপ করবে।”
আমরা আবার সেই গড়ানো রাস্তা ধরে নেমে চিনির মিলের পেছন দিয়ে পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে ফিরে এলাম। ভাইটা আমাদের আসার অপেক্ষাতেই ছিল যেন মনে হল।
এদিকে সন্ধে প্রায় হয় হয়। হঠাৎ করেই সাদেরুলদা আমার কাছ থেকে ছাতাটা নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় চললেন?”
জানালেন, কাছেই ধারে পিঠে কোন এক আত্মীয় বাড়ি আছে তাঁর। এদিকে পাশের পরিচিত ভদ্রলোক তো এলেন না। বিকল্প ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যেই সাদেরুলদা বোধহয় কিছুটা উদ্বিগ্ন।
আমি আর কীই বা করব! বাইরে ছিপছিপে বৃষ্টি পড়ছে তখন। সন্ধে ছ’টা সোয়া ছ’টা হবে বোধহয়। পলাশীর এ অঞ্চলে যারা না এসেছেন তারা বুঝতে পারবেন না। সন্ধেতেই কী অদ্ভুত মায়াবী অন্ধকার ঘিরে ধরে সমস্ত অঞ্চলটাকে। ছ’টা-সাতটার সন্ধে রাতকেই মনে হবে কী গভীর রাত! একে মেঘলা, তার উপরে লো ভোল্টেজের ঝাপসা আলো। ঝিঁঝিঁপোকারাও যেন সামনের অশ্বত্থগাছকে ঘিরে চতুর্গুণ ডেকে চলেছে। কেমন যেন অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে প্রায় পরিত্যক্ত কোয়ার্টার জুড়ে। কোয়ার্টারের দূর দিয়ে ছোট্ট গলি মতন পায়ে হাঁটা রাস্তা। আমি আসার পরে সন্ধে থেকে সর্বসাকুল্যে জনা দুয়েক লোককে চলতে দেখেছি। তারা আমার দিকে কী অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল!
হঠাৎ করেই আমার মনে হল, যে ছেলেটির সঙ্গে রয়েছি তার নামটা তো এখনও জানা হয়নি। সৌজন্যতার দিক থেকে এটা আমারই ভুল। আমি সলজ্জ হেসে ভাইটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু যদি মনে না করো, তোমার নামটা কিন্তু এখনও জানা হয়নি।”
সে সামান্য হাসল মাত্র। “মনোময় রায় আমার নাম।”
যাহ্! এর মাঝে আবার কারেন্টটা একেবারেই চলে গেল। এতক্ষণ তবুও নিভু নিভু হলেও তো ছিল! আমাদের আলোর সঙ্গে শক্তির একটা সম্পর্ক আছে। সেই কারণে আলোহীনতায় কেমন যেন একরাশ ভয় আমাকে চেপে ধরল। মনোময় হাসতে হাসতে আমাকে বলল, “কী দাদা, ভয় করছে নাকি?”
তার সেই অদ্ভুত ফ্যাঁসফেসে কন্ঠস্বরে আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে যেতে লাগল। আমি সামান্য মাথা দোলালাম। আঁধারে যদিও সে তা লক্ষ করল কিনা বুঝতে পারলুম না। সে বলল,”দাঁড়ান, একটা মোমবাতি জ্বালাই।” বলে সে আধাঁরেই ঘরের এদিক ওদিক আঁতিপাতি করে খুঁজে নিয়ে মাঝারি গোছের এক মোমবাতি জ্বালাল। আলো জ্বালতেই আমার আরেক সন্দেহ শুরু হল, এ জ্বলবে কতক্ষণ? তারপর তো আবার যে কে সেই! ঠাকুর, এর মাঝে যেন কারেন্টটা এসে যায়।
সেই অবিকল্প সুরে মনোময় আমায় জিজ্ঞেস করল, “এমন পরিস্থিতিতে কতটুকুই বা ঘুরতে পেরেছেন?”
আমি বললাম, “মনুমেন্টটাই শুধু।”
মনোময় আবার সেই হাড় হিম করা হাসি দিয়ে বলল, “শুধু মনুমেন্ট? মীরমদন-মোহনলালের সমাধি দেখেননি?”
“সেটা আবার আছে নাকি?”
“সেটাই তো প্যাথেটিক। মানুষ শয়তান মীরজাফরকে মনে রেখেছে, কিন্তু সৎ মীরমদন-মোহনলালকে কেউ মনে রাখতে চায় না।”
আমি মনে মনে লজ্জা বোধ করলাম। বললাম, “না, তা নয়। যুদ্ধক্ষেত্রেই যে তারা মরেছে এটা জানতাম। কিন্তু তাদের সমাধি যে এখানেই আছে তা জানতুম না।”
“আমি আপনার কথার সঙ্গে কিন্তু সহমত পোষণ করতে পারলাম না।”
“কোন কথাটা বলো তো?”
“ঐ যে তারা মরেছে বললেন। কই, তাদের শহীদ বললেন না তো? তারাও তো দেশটাকে স্বাধীন রাখার জন্যেই লড়েছিল।”
“আই থিঙ্ক ইউ আর রাইট। আমারই ভুল।”
ভুল স্বীকার করায় মনোময় যেন ক্ষণিকের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। এর মাঝেই বৃষ্টি কখন যে থেমে গেছে বুঝতে পারিনি। ফিনকি দিয়ে চাঁদের আলো উঠেছে। মোবাইল অন করে দেখলাম ন’টা প্রায় ছুঁই ছুঁই। কিন্তু সাদেরুলদা ঐ যে গেলেন এখন পর্যন্ত তো এলেন না! তিনি কি বেমালুম ভুলেই গেলেন যে বন্ধুটি এক অজানা মানুষের আস্তানায় রয়েছে? আর বাড়ি থেকে গিন্নিও বোধহয় ফোন করতে ভুলে গেছে। একবারের জন্যেও মিসড কল পর্যন্ত আসেনি।
জানালা গলে চাঁদের তরল আলো আমাদের বিছানায় এসে পড়েছে। ফক ফক করছে চতুর্দিক। এই কোয়ার্টার থেকে চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে দূরে দৈত্যের মতো দু’হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুগার মিলের দুটি সুউচ্চ চিমনি। মিল এখন অচল, তাই তার ধোঁয়াও নেই। এখনের মালিকানা খৈতানের। আগে ব্রিটিশদের হাত হয়ে বিহারীদের ছিল। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে মিল চলে। বাকি সময়ের কর্মচারীরা হয় ছুটিতে, নচেৎ অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের মতো খেয়ালখুশিতে যাতায়াত করেন। কিন্তু সাদেরুলদা ব্যক্তিটাই তো দেখছি অবিবেচক। এদিকে খিদেয় ছুঁচো ডন মারছে পেটে। মুখ ফুটে সেকথা কাকেই বা বলি? পলাশী হতে পারে ভ্রমণক্ষেত্র। কিন্তু সন্ধে নামতেই এদিককার খাবারের দোকানে ঝাঁপি বন্ধ।
মনোময় বোধহয় আমার মনের কথা টের পেয়েছে। আবার সে সেই রাশভারী ফ্যাঁসফেসে গলায় বলল, “দাদার বোধহয় খিদে পেয়েছে। কোনও চিন্তা নেই, আপনারা যখন ঘুরতে গেলেন সে সময়ে ডিম-আলু দিয়ে সিদ্ধ ভাত করেছি। আপনাদের জন্যেও।”
আমি একটু অবাক হয়েই বললাম, “আমার যে তোমার এখানেই খেতে হবে তা তুমি বুঝলে কী করে?”
কোনও উত্তর না দিয়ে মনোময় স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে শুধু হাসল মাত্র। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। কারণ খিদেটাই এখন আমার কাছে মুখ্য।
ঢের হয়েছে, কাল সকালেই বাড়ির দিকে রওনা দেব। আমাকে নিয়ে এসে সাদেরুলদার এমন করাটা ঠিক হয়নি।
খেতে খেতে মনোময় আমাকে হঠাৎ করেই বলল, “দাদা, আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন?”
এমন বেমক্কা প্রশ্নে আমতা আমতা করে বললাম, “তেমনটা নয় বললেই চলে। হঠাৎ করে একথা... তবে ভূতে আমার ঠিক বিশ্বাস হয় না।”
“কেন?”
“কেন আবার? ভূত আদৌ পৃথিবীতে নেই তাই!”
সে হেঁয়ালি করে বলল, “আজ এই চাঁদের আলোয় আপনি যদি রাজি থাকেন তবে মীরমদন আর মোহনলালের ভূত দেখাতে পারি।”
আমি একটু অবাক হলাম। ভূত? তাও আবার একেবারে ঐতিহাসিক চরিত্র? খাওয়াদাওয়া শেষ করে মুখ মুছতে মুছতে বললুম, “ঠিক আছে ভাই, দেখানো চাই কিন্তু।” আমার কেমন যেন একটা নির্বিরোধী জেদ চেপে বসল মনে।

খানিক আগে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা প্যাঁচপেচে। মনোময় আমার সামনে সামনে ছোটো দু’ব্যাটারি টর্চের আলো ফেলে চলেছে। আমি তার পিছু পিছু। মেঘ ভাঙা চাঁদের আলো যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে গঙ্গার বিস্তৃত চরাচরে।
অর্ধবৃত্তাকারভাবে মনুমেন্টকে ঘিরে একটা মোরাম রাস্তা চলে গেছে সম্ভবত পশ্চিমে। রাতের আলো-আঁধারির মাঝে তেমন দিক ঠাওর হচ্ছিল না। রাস্তাটি গিয়ে মিশেছে গঙ্গার বাঁধের সাথে। বড়ো বড়ো শিরীষ আর ইউক্যালিপটাসের গাছ পুরো রাস্তাটাকেই ঢেকে ফেলেছে অন্ধকারে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে মাটিতে কাদা হওয়ার কথা ছিল। বেলে চর অঞ্চল হওয়ায় তা হয়নি।
মনোময় আমার সাথে একটিও বাক্যালাপ করেনি এ পর্যন্ত। শুধু ইশারায় পিছু পিছু ডেকেছে মাত্র। আমি তাকে ছায়াসঙ্গীর মতন অনুসরণ করে বাঁধের উপর গিয়ে দাঁড়ালাম। মনোময় সেই অবিকৃত সুরে হাত উঁচু করে আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে বলল, “দেখতে পাচ্ছেন? উ-উ-ই যে গঙ্গাচরের প্রান্তে সাদা দুটি গম্বুজ। ঠিক আখ ক্ষেতের পাশেই।”
আমি মাথা ঝাঁকালাম।
“ও দুটোই হল মীরমদন-মোহনলালের সমাধি।”
আমি শিহরিত হলাম। ভরা পূর্ণিমার রাত্তিরে এমন করে মৃতের সমাধি দেখব ভাবিনি।
আমাকে মোহিত করে মনোময় বলে চলল, “চোখের পলক ফেলবেন না। চেয়ে দেখুন লাল জোব্বা পরা দুটি লোক কেমন উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে গঙ্গার দিকে ছুটে চলেছে।”
আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললাম, “কই, কিছু দেখতে পাচ্ছি না তো!”
মনোময় আবার সেই অবিকৃত কন্ঠে বিরক্তি প্রকাশ করে জানতে চাইল, “সত্যি দেখতে পাচ্ছেন না? না ঠকে যাওয়ার ভয়?”
আমার আঁতে ঘা লাগল। জোরের সাথে বললাম, “না।”
মনোময় এবার আমাকে অদ্ভুতভাবে বলল, “আমার পিছন পিছন বাঁধ থেকে নেমে একটুখানি ওই চরের দিকে এগিয়ে চলুন। নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন।”
আমিও কেমন যেন বিবশ হয়ে মনোময়কে অনুসরণ করতে লাগলাম।
খানিক নিচে নেমে এবার সত্যি সত্যি লাল জোব্বা পরা দু’জন নবাবী সৈনিককে তরবারি হাতে গঙ্গার দিকে ছুটে যেতে দেখলাম অবিকল। স্পষ্টভাবে দেখার জন্যে আর একটু এগিয়ে যাব মনোময়কে লক্ষ্য করে, হঠাৎ করেই বাঁহাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে কে যেন আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল। পেছন ঘুরেই লক্ষ করলাম, সাদেরুলদা। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলুম। সাদেরুলদা টের পেলেন কী করে যে আমি এই সময়ে মনোময়ের সঙ্গে এই গঙ্গাচরে জোছনা রাতে ভূত দেখতে এসেছি?
সাদেরুলদা শুধু চাপা উত্তেজিত সুরে আমাকে বললেন, “এখন কোনও কথা নয়। আপনি বড়ো বিপদে পড়তে চলেছিলেন, এইটুকুনি বলব। শীগগির আমার সাথে ফিরে চলুন বাঁধের উপর।”
আমি বললুম, “সে কি! মনোময় একা পড়ে থাকবে তো! ওকেও ডাকি, দাঁড়ান।”
সাদেরুলদা আমাকে চাপা ভয়ার্ত সুরে বললেন, “ওকে যেতে দিন। আপনি ইমিডিয়েট আমার সঙ্গে চলে আসুন। ঘরে ফিরে আপনাকে আমি সব জানাব।”
সাদেরুলদা আমাকে নিয়ে সুগার মিলের সেই কোয়ার্টারে এলেন। তাঁর হাতের সুতীব্র টর্চের আলো মনোময়ের ঘরকে ফালা ফালা করে দিল। কিন্তু এ কী! ঘরের ভেতর মাকড়শার অগনিত জাল। অবিন্যস্ত বিছানাপত্র। ছাগলের নাদি আর বোঁটকা গন্ধে বমি আসার জো হল প্রায়। মনোময়ের সাথে আমি এতটা সময় তাহলে কাটিয়েছি এইখানে? এইভাবে? ভাবতেই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল আমার।
এ-ঘরে আমরা আর সামান্যটুকুও সময় ব্যয় না করে দু’জনের ব্যাগ নিয়ে রওনা দিলাম সাদেরুলদার আত্মীয়র বাড়ি। বেশিদূরে নয়, সুগার মিল থেকে খান দশেক বাড়ির দক্ষিণে। সাদেরুলদার এই আত্মীয়রা যথেষ্ট আপ্যায়ন করলেন আমাদের।
সাদেরুলদা এবার আমাকে সব খুলে বললেন। “নীহারদা, আপনার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। আমার জন্যেই এমন বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ডের মধ্যে পড়তে হয়েছে আপনাকে। আমি লজ্জিত। কিন্তু আপনাকে যে ঘোর বিপদের মধ্যে থেকে উদ্ধার করতে পেরেছি এটাই আমার ধন্য কপাল। আসলে আপনি মনোময় নয়, তার প্রেতাত্মার সাথে এতক্ষণ কাটিয়েছিলেন।”
সাদেরুলদার কথা শুনে বিস্ময়ে এবং ভয়ে আমার নিচের ঠোঁট ঝুলে পড়ল।
“বেশ কিছুদিন আগে ওই মনোময় পারিবারিক অশান্তিতে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাও আবার আপনাকে নিয়ে যাচ্ছিল যেদিকে ঠিক ওদিকেই। এই আত্মীয় বাড়িতে না এলে আমি ওসব কথা জানতেও পারতাম না। আমার যে আত্মীয় ঐ অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, সেও গত পরশু রাতে পাশের ঘর থেকে মারাত্মক ভয় পেয়ে মোতিগঞ্জে ফিরে গেছে। বহু চেষ্টাতে কল করে জানতে পারলাম সে এখন বেঘোর জ্বরে ভুল বকছে। ভাবছি গঙ্গা পার হয়ে কাল একবার তাকে দেখেই যাব।”
আমার মুখ দিয়ে বাক্য সরছিল না। কপালে হাত ঠেকিয়ে গুরুদেবকে স্মরণ করলাম, জোর বেঁচেছি। ঢের হয়েছে ভ্রমণ বাবা। কাল সকালেই সাড়ে আটটার মেমো ধরে বাড়ি ফিরে যাব।
সাদেরুলদা সকালে আমাকে পলাশী স্টেশনের উদ্দেশ্যে একটা ভটভটি ধরিয়ে দিয়ে নিজে গঙ্গার ওপারে চলে গেলেন অসুস্থ আত্মীয়কে দেখার উদ্দেশ্যে।

রানাঘাটের বাড়িতে যখন ফিরলাম তখন ঘড়িতে দশটা পঁচিশ বাজে। অবসন্ন ক্লান্ত হাতে দরজার বেল টিপলাম। দরজা খুলতেই স্ত্রী সুধা চোখের জলে নাকের জলে একাকার। ততোধিক বিস্ময়ে চেয়ে দেখি সোফাতে বসে রয়েছেন সাদেরুলদা। চাপা ধমকের সুরে সাদেরুলদা বললেন, “কোথায় ছিলেন মশাই পরশু থেকে? ফোনটা পর্যন্ত অফ করে রেখেছেন। বৌদি তো ফোনে কেঁদেকেটে একসা। স্টেশনে আপানাকে নিতে গিয়ে না পেয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম। বৌদির কান্নাকাটির জন্যে সকালের মেমো ধরে আবার আমাকে রানাঘাটে আসতে হল।”
সাদেরুলদা তখন অনেক কথাই বলে চলেছেন, কিন্ত আমার তখন তাঁর কোনও কথাই কানে ঢুকছে না। মনে হচ্ছে যেন জ্ঞান হারিয়ে এই দরজাতেই পড়ে যাব। সাদেরুলদা তো গঙ্গা পার হয়ে তার আত্মীয়কে দেখতে চলে গেছেন। তবে একশো কিলোমিটার পার হয়ে আমার আগে এখানে এলেন তিনি কী করে? সমস্ত হিসেব যেন আমার গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আমি কি সত্যি ইহ জগতে আছি? বুঝতে পারছি না। আমার সঙ্গে অদ্ভুত একটা খেলা চলছে। এ খেলার নাম যেন ভূত-ভূতাইয়া।
পলাশীতে যে ভয় আমার লাগেনি, এবার সত্যি সত্যি ঘরের দোরে এসে সেই ভয় আমার লাগতে শুরু করেছে! সন্দেহ হচ্ছে, এ ঘর আমার তো? তবে সোফার উপরে যে সাদেরুলদা বসে বসে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন, তিনি আসলে কে?
_____

অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক দাশ

No comments:

Post a Comment