প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র

প্রচ্ছদঃ  https://www.scorpydesign.com/



সূচিপত্র

কচিপাতা
আঁকিবুঁকি আদিত্য কুমার রায়

কমিকস
নেংটি, গাড্ডু ও লোগো প্লেন সম্বিতা

গল্প
পালকের দুল সুস্মিতা কুণ্ডু
পোষ্য অরিন্দম দেবনাথ
লিওবাবুর প্রাপ্তিযোগ ধূপছায়া মজুমদার
সাদা ভূত অমিতাভ সাহা
ভুতোর কীর্তি কণিকা সরকার
বহুরূপে কল্যাণ সেনগুপ্ত
ভীমগড়ের পাঁচু ডাকাত পবিত্র চক্রবর্তী
উদ্বোধন প্রান্তিক বিশ্বাস
স্কাউট বয় বড়োমামা রাজীবকুমার সাহা

লোককথা
গান গাওয়া কচ্ছপ ও শিকারির গল্প অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছড়া
স্বপ্নকথা মধুমিতা ভট্টাচার্য
ঘুড়ি অমৃতাভ দে
পড়ুয়া ভূত প্রিন্স মাহমুদ হাসান
পাখিদের সভা মোহন মিত্র
ডানপিটে এক ছেলে শম্ভু সরকার
লুকোচুরি মানসী পাণ্ডা
লিখতে বসে মৃত্যুঞ্জয় হালদার
হাসি তনয় ভট্টাচার্য

না মানুষের পাঁচালি
কৌতূহলী কাকেশ্বর কুচকুচে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিজ্ঞানের পাঠশালা
যা দেখি যা শুনি... (৭ম) কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রবন্ধ

আমার স্কুল
আমি, অঙ্ক ও বুক কিপিং অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ আদিত্য কুমার রায়


অঙ্কনশিল্পী

আদিত্য কুমার রায়
নবম শ্রেণি
ফাকল পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজ,
মিশনমোড়, লালমনিরহাট,বাংলাদেশ


কমিকসঃ নেংটি, গাড্ডু ও লোগো প্লেনঃ সম্বিতা



গল্পঃ পালকের দুলঃ সুস্মিতা কুণ্ডু



শেকু একটা ছোট্ট মিষ্টি ছেলে। মা-বাবার সঙ্গে থাকে। একটা ঘন জঙ্গলের ধারে ওদের বাড়ি। শেকুর বাবা সূর্যের আলো ফুটলেই একটা ইয়াব্বড় চটের বস্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। জঙ্গলে পড়ে থাকা শুকনো কাঠ, শুকনো পাতা কুড়িয়ে হাটে বিক্রি করে। আগে শেকুর বাবা জঙ্গলে কাঠ কাটত, কিন্তু চারদিকে মানুষেরা নাকি জঙ্গলের গাছপালা কেটে শেষ করে ফেলছে; বনের পশুপাখিরা থাকার জায়গা পাচ্ছে না আর। এ তো ভারি অন্যায়। তাই শেকুর বাবা এখন শুধু ভেঙে পড়া ডালপালা কুড়োয় বা মরা শুকনো গাছগুলো কেটে আনে। আর যদি বা প্রয়োজনে বড়ো কোনও গাছ কাটতে হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গায় আরও অনেকগুলো গাছের বীজ বা চারা পুঁতে দেয়।
ছোটো থেকেই শেকুকে ওর মা-বাবা গাছপালাকে, পশুপাখিকে, এই প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
শেকুর বাবা সেই কোন ভোরে শেকু ঘুম থেকে ওঠার আগে বেরোয় আর সন্ধে গড়িয়ে গেলে তবে বাড়ি ফেরে। ততক্ষণে শেকু ঢুলতে শুরু করে দেয়। আবার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে ভোর। বাবার সঙ্গে শেকুর আর দেখাই হয় না প্রায়।
একদিন বাবা বাড়ি ফিরতে শেকু বলল, “বাবা আমি তো এখন অনেএএএক বড়ো হয়ে গেছি। আমিও এবার থেকে তোমার সঙ্গে জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে যাব।”
শুনে তো বাবা হাঁ হাঁ করে উঠল, “না না! এই এত্তটুকুনি ছেলে আবার ওই ঘন জঙ্গলে যায় নাকি! কী থেকে কী বিপদ ঘটবে। না সোনামাণিক, তুমি বাড়িতে মায়ের কাছে বরং খেলাধুলো করো। আমি ফেরার সময় তোমাদের জন্য জামরুল পেড়ে আনব।”
শেকু অভিমান করে গম্ভীরমুখে বসে রইল।
শেকুর মা অবশ্য বেশ কড়া ধাতের মানুষ। মা বাবাকে বকে দিয়ে বললে, “এত্তটুকুনি আবার কী? তুমি জানো আমাদের শেকুসোনা কত্ত কী পারে? শেকু নিজে নিজে চান করে, চুল আঁচড়ায়, নিজের হাতে ভাত মেখে খায়, একা-একাই অন্ধকার ঘরে ঘুমোতে পারে। আমি কাল সকালে ঘুম থেকে তুলে ওকে তৈরি করে দেব, তুমি ওকে নিয়ে যেও তোমার সঙ্গে। জঙ্গলের বেশি ভেতরদিকে যেও না, একটু চোখে চোখে রেখো আর তাড়াতাড়ি ফিরে এসোーতাহলেই আর ভয় নেই। এত যখন ইচ্ছে হয়েছে যাক না একটা দিন।”
বাবা আর কী করবে, অগত্যা মায়ের কথাতেই রাজি হল। শেকুও আনন্দে লাফিয়ে উঠে মা-বাবা দু’জনেরই গলা জড়িয়ে হামি খেয়ে শুয়ে পড়ল ঝটপট। কাল ভোর ভোর উঠতে হবে না?


পরেরদিন সকালে শেকুকে মা ডাকার আগেই শেকু উঠে চোখেমুখে জল নিমকাঠিতে দাঁতন করে জামাকাপড় পরে তৈরি। বাবা তারপর তৈরি হতে মা ওদের দু’জনকে অনেক অনেক নিয়ম বলে বুঝিয়ে হাত নেড়ে টাটা করল। বাবার পিছু পিছু শেকু চলল জঙ্গলে। বাবার চটের বস্তার মতো একটা ছোট্ট বস্তা শেকুকেও দিয়েছে মা। কাজে যাচ্ছে না শেকু? তাই বস্তার ভেতরে টিফিন কৌটোয় মা শেকুর সবচেয়ে প্রিয় খাবার গরম গরম ফুলকো আটার রুটি আর গোল গোল চাকা চাকা করে কেটে আলুভাজা ভরে দিয়েছে। কত কাজ করবে ওই পুচকু ছেলেটা, খেতে হবে তো পেট ভরে!
অনেকটা পথ হেঁটে জঙ্গলে পৌঁছল শেকু আর শেকুর বাবা। এতটা পথ শেকু কিন্তু নিজে নিজে হেঁটে এসেছে, একবারও বাবার কোলে চাপার বায়না করেনি। এমনকি বাবা বললেও রাজি হয়নি।
জঙ্গলের ভেতরে পৌঁছে বাবা শেকুকে বলল, “শেকুসোনা, তুমি এখানেই আমার আশেপাশে খেলা করো। চোখের আড়ালে যেও না। জঙ্গলে অনেকরকম পশু আছে। কেউ খুব শান্ত মিশুকে, আবার কেউ কেউ ভীষণ রাগী। সাবধানে থাকতে হবে আমাদের তাই। কেমন?”
শেকু ভারি লক্ষ্মী ছেলে, বাবা-মায়ের কথার অবাধ্য হয় না কখনোই। বাবার দেখাদেখি ওর ছোটো চটের বস্তাটায় শুকনো পাতা, কাঠিকুটি সব জমা করতে থাকে। মাঝেমাঝে এই গাছ ওই পাতা সেই ফুল ওই ফল দেখিয়ে বাবাকে নাম জিজ্ঞেস করে।
এদিক ওদিক পাতা কুড়োতে কুড়োতে কখন যেন শেকু ওর বাবার চোখের আড়াল হয়ে যায়। নিজেও লক্ষ করেনি কখন দূরে চলে এসেছে। যখন পেছন ফিরে বাবাকে ডাকতে যায় শেকু, দেখে আশেপাশে কোথাও বাবা নেই। এই রে! তাহলে কি শেকু হারিয়ে গেল? নাহ্, এত সহজে ঘাবড়ে গেলে চলবে না। চারপাশটা ভালো করে চেয়ে দেখে শেকু। মনে করার চেষ্টা করে কোন পথ ধরে এসেছে ও।
এমন সময় হঠাৎ চোখে পড়ে সামনের ছোটো টিলার গায়ের ঝামরিঝুমরি গাছপালার আড়ালে একটা কী যেন রঙিন কিছু সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে একটা ভারি সুন্দর বাহারি রঙিন পালক পড়ে রয়েছে ঘাসের ওপর। কতরকমের রঙ সেই তুলোর মতো হালকা ফুরফুরে পালকটার গায়ে! হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে শেকু। মনে মনে ভাবে এই পালকটা দিয়ে ভারি সুন্দর একটা কানের দুল বানিয়ে দিলে কেমন হয় মায়ের জন্য! মা রাজি হল বলেই না শেকু আসতে পারল জঙ্গলে।
এই দ্যাখো শেকু কীরকম পাগল ছেলে! কানের দুল তো দুটো চাই, দু’কানের জন্য। কিন্তু একটা পালক দিয়ে তো দুটো দুল হবে না। আরেকটা পালক চাই শেকুর। ইতিউতি উঁকিঝুঁকি মেরে আরেকটা পালক খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু নাহ্! কোত্থাও নেই। এমন সময় নজর পড়ে যে ঝামরিঝুমরি ঝোপের সামনে পালকটা পড়েছিল সেটার দিকে। হয়তো এই পালকের মালিক পাখিটার বাসা ওই ঝোপে। একটু খুঁজলে হয়তো ওখানে পালক মিলতে পারে। ঝোপটা নাড়াতে গিয়েই শেকু দেখল ঝোপটার পেছনেই একটা গুহার মুখ। ওই টিলার গায়ের একটা গুহার প্রবেশদ্বার। তবে কি পাখিটার বাসা গুহার ভেতর? পাখিরা তো গাছের ওপর বাসা বাঁধে এমনটাই জানত শেকু। অবশ্য এমন সুন্দর পালক যার সে-পাখি নিশ্চয়ই বিশেষ কোনও ধরনের পাখিই হবে। পা টিপে টিপে গুহায় ঢোকে শেকু। একটু একটু করে এগোয় ভেতর দিকে।
খানিকটা যাওয়ার পরই একটা মৃদু ‘টুই টুই’ আওয়াজ শুনতে পায় শেকু। তার মানে পাখিটা গুহাতেই আছে। গুহাটা খুব সরু বা গভীর নয়, তাই ভেতরে সূর্যের আলোর হালকা আভা আছে। আর একটুখানি এগোতেই শিকুর চোখে পড়ল, ওর হাতের পালকটার মতো রঙিন পালকওয়ালা একটা পুচকে পাখি একটা বিশাল বড়ো মাকড়সার জালে আটকে পড়ে ছটফট করছে। এরকম বিশাল বড়ো মাকড়সার জাল শেকু আগে দেখেনি কখনও। যেমন মোটা তেমন শক্ত! এমনিতে তো মাকড়সার জাল পাতলা রেশমি সুতোর মতো হয়। ফুঁ দিলেই ছিঁড়ে যায়। কিন্তু এই জালটা এত পলকা মোটেই নয়। কীরকম আবার আঠালো জালটা। আহা রে, পাখিটার ভারি কষ্ট হচ্ছে বুঝি।
শেকু পাখিটাকে ছাড়াতে এগিয়ে যায়। কিন্তু পাখিটা বলে ওঠে, “ও ছেলে! এই জালটা তুমি ছুঁয়ো না, তাহলে তুমিও আমার মতো আটকে পড়বে। এ এক রাক্ষুসে মাকড়সার জাল। কারোর সাধ্যি নেই এই জাল ছেঁড়ার। তুমি এই গুহায় এলে কী করে? বাঁচতে চাও তো মাকড়সা ফেরার আগে পালাও।”
শেকু বলে ওঠে, “না না রঙিন পাখি, আমি তোমায় এই অবস্থায় ফেলে কিছুতেই যাব না। আমি গুহার বাইরে তোমার ওই রঙিন পালক একখানা কুড়িয়ে পেয়ে ভাবলুম আমার মায়ের জন্য কানের দুল বানাব। তাই আরেকটা পালক খুঁজতে খুঁজতে এই গুহার ভেতর ঢুকে পড়েছি। এখন তোমাকে উদ্ধার করে তবেই আমি যাব। আমার বাবার কাছে কুড়ুল আছে, এক কোপেই বাবা জাল কেটে দিতে পারবে। কিন্তু আমি আসলে এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে বাবার কাছছাড়া হয়ে পড়েছি। বাবাকেও কোত্থাও খুঁজে পাচ্ছি না।”
রঙিন পাখি আর শেকু কথার মাঝেই হঠাৎ একটা জোরে খড়খড় সড়সড় আওয়াজ হতে লাগল। রঙিন পাখি ভয়ে চিৎকার করে উঠল, “মাকড়সাআআআ!”
মাথার ওপর তাকিয়ে দেখে শেকু গুহার ওপরদিক থেকে একটা বিশাআআআল বড়ো মাকড়সা তার আট পায়ে খচরমচর আওয়াজ তুলে নেমে আসছে। সে মাকড়সার পেটটা শেকুদের বাড়িতে যে তাওয়াতে মা রুটি বানায় তার থেকেও বড়ো। মাথাটা শেকুর খেলার বলের মতো। গোটা গায়ে খোঁচা খোঁচা শক্ত রোঁয়া।
শেকুকে দেখে মাকড়সা বলল, “মানুষের পো! আটপেয়ের গুহায়! তুই নির্ঘাত আমার খাবার চুরি করতে এসেছিস? দাঁড়া তোকেও তবে জালে জড়িয়ে বেঁধে রাখব।”
শেকুকে লক্ষ্য করে সাদা আঠালো জাল ছোড়ে মাকড়সা। শেকুর পা দুটো বাঁধা হয়ে যায়। কী শক্ত জাল রে বাবা! যে দড়ি দিয়ে বাবা গাছের বোঝা বাঁধে, তার থেকেও শক্ত। চটচটে আঠালো।
শেকু ঘাবড়ে যায়, কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রাখে। মা বলেছে বিপদে উত্তেজিত হতে নেই, ধীর-স্থিরভাবে চিন্তা করে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ ভাবতে হয়।
শেকু বলে, “মাকড়সা রাজা, তুমি ওইটুকু ছোট্ট পাখিকে বন্দী করেছ কেন? ও তোমার কী ক্ষতি করেছে? কী সুন্দর গান গায় ও, কেমন রঙিন পালক। ওকে ছেড়ে দাও।”
মাকড়সা বলে, “আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। তাই আমি ওকে ধরেছি। আমি খাব ওকে।”
শেকু বলে, “এ ম্যাঅ্যা! এসব আবার খাবার জিনিস নাকি? চাট্টি পালকেই তো গলায় সুড়সুড়ি দেবে। পেট ভরবে কি? তুমি মাকড়সা রাজা হয়ে এইসব খাও! আহা রে, তোমার মা বুঝি তোমায় আটারিরুটারি করে খাওয়ায়নি কখনও? তুমি বুঝি চাকালুভাজিতংও খাওনি কোনোদিন?”
মাকড়সা তো জন্মে এসব খাবারের নাম শোনেনি। সে বলে, “আমি তো এসব কক্ষনও খাইনি। ভারি ভালো খেতে বুঝি? এই দ্যাখো না, এই ফাঁদে যা পোকামাকড় মশা-মাছি পড়ে তাই খেয়েই দিন গুজরান করি। বয়স হয়েছে আমার, আজ আছি কাল নেই। আমার একটু ভালোমন্দ খেতে সাধ যায় না, বলো দেখি মানুষের পো?”
শেকু দেখল মাকড়সা ফাঁদে পা দিয়েছে। বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি যদি কথা দাও যে রঙিন পাখি আর আমাকে ছেড়ে দেবে তাহলে আমি তোমায় আটারিরুটারি আর চাকালুভাজিতং খাওয়াতে পারি।”
শুনে তো মাকড়সা আট পায়ে লাফ মেরে উঠে বলল, “এক্ষুনি দেব ছেড়ে।” 
বলে একটা পায়ের তীক্ষ্ণ নখের ডগা দিয়ে শেকুর পায়ে বাঁধা জালটা কেটে দিল। শেকু তখন কাঁধের বস্তা থেকে টিফিন কৌটো বার করে তাই থেকে একটা আটার রুটি আর দুটো গোল আলুভাজা নিয়ে মাকড়সার সামনে রেখে বলল, “এবার পাখিকে ছেড়ে দাও।”
মাকড়সা ঝটপট পাখির চারপাশের জাল কেটে দিয়ে হামলে পড়ল খাবারের ওপর। পাখিও ফুড়ুৎ করে এসে লুকলো শেকুর পেছনে। দু’জনে এবার ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার জন্য তৈরি হতে লাগল। মাকড়সা রুটি আলুভাজা খাক, এই সুযোগ ওদের। কিন্তু মাকড়সা রুটি আলুভাজা ততক্ষণে গপগপিয়ে খেয়ে আট হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছে। “ও মা গো! ও বাবা গো! তোমরা এমন অমৃত খাবার আমায় কোনোদিন খাওয়ালে না কেন গো! সেই এক ঢোল এক কাঁসি পোকামাকড় খেয়ে আমার পেটে চড়া পড়ে গেল।”
মাকড়সার অবস্থা দেখে এবার একটু মায়াই লাগল শেকুর। ওরও তো দোষ নেই। জঙ্গলের পশুপাখিদের নানা নিয়ম। শিকার ওদের করতেই হয় খাদ্যের জন্য। মাকড়সাও তো শিকার ধরতে গিয়েছিল। আবার নিরীহ প্রাণীদের বাঁচানোও কর্তব্য। রঙিন পাখিকে তাই উদ্ধার করেছে শেকু।
শেকু মাকড়সাকে বলল, “মাকড়সা রাজা, তুমি যদি সারা হপ্তা গুহার ভেতরের পোকামাকড় খেয়ে কাটাও তাহলে আমি তোমায় রবিবার রবিবার এই আটারিরুটারি আর কাটালুভাজিতং খাবার পাঠাব।”
রঙিন পাখি বলল, “হ্যাঁ, আমি উড়ে এসে গুহার মুখে রেখে দিয়ে যাব।”
মাকড়সা খুব খুশি হয়ে ওর জালের খানিকটা রেশমি সুতো ওদের উপহার দিল। মাকড়সার জাল শুকিয়ে গেলে একদম চকচকে শক্তপোক্ত সাদা রেশমি সুতো হয়ে যায় একদম।
“তোমরা যা বলবে আমি তাই শুনব। শুধু খাবার পাঠাতে ভুলো না যেন।”


শেকু আর রঙিন পাখি গুহার বাইরে এল। রঙিন পাখি শেকুকে একটা পালক দিয়ে বলল, “এই নাও তোমার মায়ের কানের দুলের জন্য পালক। আর চলো দেখি আমি আকাশপথে রাস্তা খুঁজে তোমায় বাবার কাছে পৌঁছে দিই।”
শেকু পালকদুটো আর মাকড়সার জালের রেশমি সুতো পকেটে লুকিয়ে রঙিন পাখির পিছু নিল। একটু দূরে যেতেই দেখল বাবা এদিক সেদিক যাচ্ছে আর ‘শেকু শেকু’ করে ডাকছে।
শেকু রঙিন পাখিকে টাটা করে ছুট্টে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বাবা বলল, “কোথায় ছিলি শেকু? আমি যে তোকে খুঁজছি তখন থেকে!”
শেকু বলে, “এই তো এখানেই ছিলুম। চলো চলো সব কাঠকুটো বস্তায় ভরে ফেলি।”
বাবা বলে, “তুই বসে বিশ্রাম নে। আমি করে ফেলছি সব।”
শেকু চুপটি করে ঘাড় নেড়ে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে বসে রইল। টুকটুক করে পকেট থেকে সুতো আর পালকদুটো বার করে দু’খানা কানের দুল বানিয়ে ফেলল মায়ের জন্য। তারপর বাবার হাত ধরে তিড়িংবিড়িং করে বাড়ি ফিরে এল।


বাড়ি আসতেই তো মা একশো চুমু দিয়ে শেকুকে আদর করল। যতই সাহস করে শেকুকে জঙ্গলে পাঠাক, মা তো সারাদিন আনচান ঘরবার করেছে। শেকুকে জড়িয়ে মা বলল, “কী করলি শেকুসোনা জঙ্গলে?”
শেকু মায়ের গলা জড়িয়ে বলল, “আমার জঙ্গলে অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে মা। তারা তোমার জন্য কী উপহার দিয়েছে দেখো।”
এই বলে পকেট থেকে কানের পালকদুল দুটো বার করল শেকু। মা তো এমন সুন্দর কানের দুল দেখে অবাক।
“এক বন্ধু পালক দিল, আরেক বন্ধু দিল রেশমি সুতো। তাই দিয়ে আমি বানালুম তোমার জন্য কানের দুল।”
মা তো আরও খুশি!  “বা রে বা! তাহলে তো শেকুর বন্ধুদেরও কিছু দিতে হয় আমাদের।”
বাবা মাথা চুলকে বলল, “তুই কখন আবার এত বন্ধু পাতালি! কিছুই তো জানতে পারলুম না আমি।”
শেকু খিলখিলি হেসে মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, “মা, রবিবার রবিবার তুমি আটারিরুটারি আর চাকালুভাজিতং বানিয়ে দিও। আর বাবা, তুমি ওই টিলার ধারে বড়ো বটগাছটার তলায় যেখানে আমরা পাতা কুড়োচ্ছিলাম সেখানে কলাপাতায় করে রেখে দিও। আর সেই সঙ্গে কিছু গমের দানা আর ছোলার দানাও রেখে দিও।”
মা-বাবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলল, “সে নাহয় রাখব, কিন্তু ওগুলো কী খাবার? নামই তো শুনিনি কক্ষনও! বানাব কী করে?”
শেকু ফিকফিকিয়ে হেসে বলে, “আটারিরুটারি হল গিয়ে আটার রুটি আর চাকালুভাজিতং হল...”
শেকু শেষ করার আগেই বাবা আর মা একসঙ্গে বলে উঠল, “গোল গোল চাকা চাকা আলুভাজা!”


_____

গল্পঃ পোষ্যঃ অরিন্দম দেবনাথ



যে বছর ‘দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজ’ স্থাপিত হল, সেই ১৯৭০-এ কলেজে ভর্তির লাইনে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্ব হয়েছিল রঞ্জন আর তমালের।
তমালের ডট পেনের কালি যে শেষ হয়ে গেছিল, সে খেয়াল ওর ছিল না। ভর্তির ফর্মের এক জায়গায় সই করতে গিয়ে বেচারা টের পেল যে, ও পেনের রিফিল পালটাতে ভুলে গেছে। বোকা বোকা মুখ করে লাইনে ওর ঠিক পেছনে দাঁড়ানো রঞ্জনকে বলেছিল, “তোমার পেনটা একটু দেবে ভাই? রিফিলে কালি নেই। আরও একটা সই করতে হবে। আগে খেয়াল করিনি। বাইরে কিনতে গেলে দেরি হয়ে যাবে।”
“শোন, আমার নাম রঞ্জন। একটা কথা বলি। আমার দাদু বলেন, ‘আইন পড়তে যাচ্ছ, আর যাই করো কলমের কালি শেষ হতে দিও না। কলমের জোর সবচাইতে বেশি। আর চোখ-কান সবসময় খোলা রেখ।’ এই নে, এই পেনটা রাখ আর কথাটা মনে রাখিস।”
পেনটা আর ফেরত নেয়নি রঞ্জন। কিন্তু সেই যে বন্ধুত্ব হল, আজ পঞ্চাশ বছর পরেও সে বন্ধুত্ব অটল।
দু’জনেই পেশায় সফল। যদিও দু’জনের বিশেষজ্ঞতা ছিল আলাদা আলাদা বিষয়ে। রঞ্জন ক্রিমিন্যাল লইয়ার হিসেবে দেশে ও বিদেশে খ্যাতি পায়। বিশেষ করে আলিগড়ের মুজারফ আহমেদ হত্যা রহস্যে যেভাবে সে পুলিশের ওপর টেক্কা দিয়ে আসল খুনিকে ধরায়, তা রঞ্জনকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দেয়।
মুজারফ আহমেদ ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। রঞ্জনের পুরনো বন্ধু। বিশাল পৈতৃক সম্পত্তি ছিল ওঁদের। ওঁর ভাই মোক্তার ছিলেন আলিগড়ের বিখ্যাত শিশুবিশেষজ্ঞ ডাক্তার। দু’জনেই যে যাঁর পেশায় সাফল্যের চূড়ায় ছিলেন।
মুজারফের একটা শখ ছিল। বাড়ির কোনও কিছু খারাপ হলে মিস্তিরি না ডেকে তিনি নিজেই তা মেরামত করতেন। ওঁদের পুরনো দিনের তিনতলা চকমিলানো বাড়ির ঝুলবারান্দার বাইরে ঝুলন্ত একটি লাইট গ্রিলের বাইরে ঝুলে ঠিক করার সময় একদিন পড়ে গিয়ে মারা যান।
পুলিশ দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে কেসটার ইতি টানে। কারণ, সে সময় তাঁর ভাই ডাক্তার মোক্তার উপস্থিত ছিলেন বারান্দায়। তিনিই দাদাকে হাত পিছলে পড়ে যেতে দেখেন।
মুজারফের ভাই ডাক্তার মোক্তারের চেম্বার ছিল বাড়ির নিচে একটা ঘরে। তিনি দাদাকে তিনতলার চকমেলানো বারান্দায় বাইরে ঝুলে বাল্ব বদলাতে দেখে উপরে উঠে এসে দাদাকে বারণ করার করার আগেই হাত পিছলে সোজা তিনতলা থেকে নিচের চাতালে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা যান মুজাফর। পুলিশ শহরের নামকরা শিশু চিকিৎসকের বয়ান মেনে নেন। কারণ, তিনি ছিলেন ঘটনার সাক্ষী।
কিন্তু মোক্তায়ের বয়ান অনুযায়ী পুলিশের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি মুজারফের স্ত্রী। মুজারফ ছিলেন একজন দক্ষ পর্বতারোহী। সে কারণেই তিনতলা থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যাবার তত্ত্বটা তিনি মেনে নিতে পারনেনি। তিনি মুজারফের বন্ধু রঞ্জনকে বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে একবার দেখা করতে বলেন। রঞ্জন গিয়ে একটি বাল্বের সূত্র ধরে প্রমাণ করেন ওটা দুর্ঘটনা ছিল না, ওটা আসলে ছিল একটা খুন।
মোক্তারের জবানবন্দী মেনে না নেবার কোনও কারণ ছিল না। কারণ, দাদার মৃত্যুর পর ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কিছুদিন চেম্বারেও বসেননি।
রঞ্জন মোক্তারকে ভালোই চিনতেন। দাদার বন্ধু হিসেবে মোক্তারও যথেষ্ট পছন্দ করতেন রঞ্জনকে। মুজারফদের বাড়িতে বেশ কয়েকবার আড্ডাও মেরেছেন মোক্তারের সঙ্গে। তাই প্রথমে রঞ্জনও মোক্তারের কথা সত্য বলে ধরে নেন। কিন্তু যে বাল্ব পালটাতে গিয়ে মুজাফর পড়ে যান, সেই বাল্বটি দেখে রঞ্জনের সন্দেহ হয়। বাল্বটি একদম নতুন, কিন্তু ফিউজ হয়ে গেছে। অথচ বাড়ির লোকেরা জানিয়েছিল বাল্বটি বহুদিন পালটানো হয়নি এবং মুজাফর বাল্বটি পালটানোর আগেই পড়ে যান। নতুন বাল্বটি পড়ে ছিল বারান্দার একটি টেবিলে। মুজারফ ফিউজ হয়ে যাওয়া বাল্বটি খুলে নিয়ে এসে নতুন বাল্বটি লাগাতেন। কিন্তু ফিউজ বাল্বটি খোলার আগেই তিনি পড়ে মারা যান।
ফিউজ বাল্বটি খুলে নিয়ে রঞ্জন সেটিকে বিশেষজ্ঞদের দেখান। তাঁরা জানান, বাল্বটি নতুন এবং হাই ভোল্টেজ পাঠিয়ে বাল্বটির ফিলামেন্ট কাটা হয়েছে।
রঞ্জন খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন নিঃসন্তান মুজারফ ও তাঁর স্ত্রী একটি শিশুকে দত্তক নেবেন বলে দিল্লিরর একটি অনাথ আশ্রমে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু দত্তক নেবার বিষয়টি সমর্থন করেননি তাঁর পরিবারের গোঁড়া সদস্যরা। বিশেষ করে মোক্তার। দাদাকে বারবার বোঝালেও দাদা একটি শিশুকে দত্তক নিতে অনড় ছিলেন।
রঞ্জনের মোক্তারের আচার-আচরণে সন্দেহ হয়। খানিক জেরা করতেই ভেঙে পড়েন মোক্তার। স্বীকার করেন, রাগের মাথায় দাদাকে তিনিই খুন করেছেন।
মোক্তার ভালো করেই জানতেন দাদার ক্ষ্যাপামিーবিশেষ করে বাড়ির কোনও কিছু খারাপ হলে তা নিজে ঠিক করার নেশার কথা। তাই একটি বাল্ব কিনে সেটিকে ফিউজ করেন তিনি। তারপর ফিউজ বাল্বটি ঝুলিয়ে দেন তিনতলায় রাতের অন্ধকারে। জানতেন দাদা বাল্ব জ্বলছে না শুনলেই সেটা নিজেই পালটাতে চাইবেন।
তক্কে তক্কে ছিলেন মোক্তার। যেই নিজের চেম্বার থেকে দাদাকে তিনতলার বারান্দায় দেখেন, অমনি ওপরে ছোটেন উনি। ভাবখানা ছিল যেন দাদাকে ওই কাজটা করতে বারণ করতে যাচ্ছেন। তারপর তিনতলার বারান্দায় পৌঁছে চেঁচিয়ে দাদাকে বারণ করতে করতে টুক করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। কেউ ধরতে পারেনি মোক্তারের কীর্তি। কারণ, সবাই শুনেছে মোক্তার দাদাকে গ্রিলের বাইরে ঝুলতে বারণ করছে। মোক্তার দাদাকে খুব ভালোবাসতেন। রাগের বসে দাদাকে মেরে ফেলে তিনি মনের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তাই রঞ্জনের কথার ফাঁদে সত্যি ঘটনাটা বলে ফেলেছিলেন।


তমাল একজন পরিবেশ সংক্রান্ত আইন বিশেষজ্ঞ। মানালিতে বিপাশা নদীর গতিপথ বদলে হোটেল বানিয়েছিল একটি সংস্থা। পুরো বেআইনি কাজটার পেছনে ছিলেন এক ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তমাল ওই কেসে সংস্থাটিকে বাধ্য করেছিলেন হোটেল ভেঙে ফেলে নদীর গতিপথকে আবার তাঁর নিজস্ব ধারায় ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু তাঁর আগেই ক্ষতি হয়ে গেছিল ওই অঞ্চলের অনেক। হিমালয়ের ওই অঞ্চলে বন্যায় নদী-কিনারার গ্রামের পর গ্রাম ভেসে গিয়েছিল নদীর স্রোতে। 


***


সম্প্রতি দু’জনেই পেশা থেকে অবসর নিয়ে ফিরে এসেছেন কলকাতায়। ফলে আড্ডা মারার জন্য দু’জন দু’জনের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছেন।
আইনজ্ঞদের লাইব্রেরি সবসময় বিশাল হয়। আর এই লাইব্রেরিতেই সাধারণত আড্ডা চলে।
“বুঝলি তমাল, আমার লাইব্রেরির দফারফা হয়ে গেছে। এত বই, পোকায় কেটে সব শেষ করে দিয়েছে। টেরই পাইনি। আর এটা হয়েছে বছর দুয়েকের মধ্যে।” তমালের সঙ্গে নিজের লাইব্রেরি ঘরে আড্ডা মারতে মারতে বলেন রঞ্জন।
“এত বড়ো লাইব্রেরি বানিয়েছিস আর এত বই পোকায় কেটে দিল টের পাসনি? আরে এসব ব্যাপারে আগে সাবধান হওয়া উচিত ছিল।”
তমালের কথা শুনে খানিক উত্তেজিত হয়ে ওঠেন রঞ্জন। “সাবধান! তুই জানিস না, প্রতিমাসে নিয়ম করে পেস্ট-কন্ট্রোলের লোক এসে ওষুধ ছড়িয়ে যায় এঘরে। ইঁদুর, টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শাーকিচ্ছু নেই আমার বাড়ির ত্রিসীমানায়।”
“বেশি ওষুধ ছড়িয়ে ছড়িয়ে সর্বনাশটা করেছিস রঞ্জন, ওদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। পোকামাকড় মারার বিষ আর সেরকম কোনও কাজ করবে না ওদের ওপর।” তমাল বলেন।
“আরে না, এখন আর ওষুধ স্প্রে করাই না। ঘরের সব দরজা-জানালায় নেট লাগিয়েছি, তাও মশা আটকাতে পারছি না। ইঁদুর, আরশোলা তাড়াবার জন্য অন্য হাতিয়ার রেখেছি। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। মনে হচ্ছে ওই ওষুধ স্প্রে করাই ভালো ছিল।” রঞ্জন বলেন।
“ক্রিমিনাল কেস করে করে তুই খুন-জখম-হাতিয়ার ছাড়া আর কিছু বুঝিস না নাকি, রঞ্জন?” তমাল হাসতে হাসতে বলেন।
“হাসছিস! হাস, কিন্তু আমার হাতিয়ারটা কী তা তো শোন!”
“কী আর হবেーইঁদুর ধরার কল, স্টিকি প্যাডーযার ওপর দিয়ে ইঁদুর, আরশোলা, টিকটিকি হাঁটলেই আটকে যায়। ওটা কিন্তু একটা ক্রিমিনাল অফেন্স।” তমাল বলে ওঠেন।
“আরে ওসব কিছু না। জানিস তো, আমার গিন্নির বেড়ালের শখ। মায়ের ষাট বছরের জন্মদিনে আমার ছেলে আমেরিকা থেকে একটা লাপার্ম বেড়াল আনিয়ে দিয়েছিল। ওঁর আবার হাঁপানির রোগ। ডাক্তার বাড়িতে একদম পেস্টিসাইড স্প্রে করাতে মানা করে দিয়েছে। তাই অনেক পড়াশুনা করে এই লাপার্ম বেড়াল আনিয়েছিল ছেলে। এই বেড়াল ইঁদুর, টিকটিকি, আরশোলা তাড়াতে ওস্তাদ। টিকটিকি দেখলে আর রক্ষা নেই। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে একশা করে। পরশুদিন টিকটিকির পিছনে ছুটে একটা ফুলদানি ভেঙেছে।”
“ঠিকই তো! তোর বাড়িতে তো একটাও টিকটিকি নেই। তবে যাই বল, পেস্টিসাইড স্প্রে বন্ধ করার পর তোদের বাড়িতে মশার উপদ্রব খুব বেড়েছে।” তমাল বলেন। “তা আয় না সামনের সপ্তাহে আমাদের বাড়ি। অনেকদিন আসিস না। নতুন অনেক বই আনিয়েছি। এবার আর আইনের কেস হিস্ট্রি নয়। সব নভেল। অ্যামাজন থেকে।”


***


“আরে, তোর লাইব্রেরি তো একদম ফিট! একটা বইও নষ্ট হয়নি!” তমালের লাইব্রেরির বইগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে রঞ্জন বলেন, “অনেকদিন পর তোদের বাড়ি এলাম।”
“ঘরে মশা আটকানোর নেট লাগাসনি?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন রঞ্জন।
“না, লাগাতে পারিনি। মশা আটকানোর নেট লাগালে নাকি দমবন্ধ দমবন্ধ লাগে আমার গিন্নির।” তমাল বলেন।
“তুই ভাগ্যবান। তোদের বাড়ি খুব একটা মশার উপদ্রব নেই।” রঞ্জন হাসতে থাকেন।
“আরে, সবটাই আমার পুষ্যির গুণ!” হাসতে থাকেন তমালও।
“সে কি রে! কী পুষ্যি রেখেছিস বাড়িতে যে সব মশা আর পোকা উধাও?”
“পুসি ক্যাট!”
“পুসি ক্যাট! মানে বেড়াল পুষে!”
“ঠিক। পুসি ক্যাট পুষে আমার ঘরে আর খুব একটা পোকামাকড় বা মশা নেই। তবে ঘরবাড়ি একটু নোংরা হয়, এই যা।”
“তোর রহস্য করে কথা বলার স্বভাবটা কোনোদিন যাবে না তমাল। আমার বাড়িতেও তো বেড়াল আছে। সে বেড়ালের জন্য টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শার উপদ্রব প্রায় নেই বললেই চলে। তবে আমার বেড়াল মশাকে বাগে আনতে পারেনি। বেড়ালটাকে এমন ট্রেনিং দিয়েছি যে সে ঘরদুয়ার খুব একটা নোংরা করে না। টুক করে বাগানে চলে যায়।” গর্বিত ভাব রঞ্জনের গলায়। “পশুপাখিকে ট্রেনিং দেওয়া একটা আর্ট, বুঝলি পরিবেশপ্রেমী?” এর আগের দিন তমালের ক্রিমিনাল বলে খোঁচা মারার বদলা নেন রঞ্জন।
“একদম ঠিক শিকারি ট্রেনার। আমার পুসিকে দেখ, বইয়ের আলমারির ওপর উঠে শুয়ে আছে। ও খালি আদর, মাছ আর দুধ খেতে ভালোবাসে। ব্যাটা এমন ভীতু যে টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শা মারা তো দূরের কথা, দেখলেই ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।” তমাল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন। “তবে তোর বেড়ালের মতো আমার পুসিও বাথরুম ব্যবহার করতে জানে।”
রঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে যেন কোনও ক্রিমিনালকে জেরা করছেন এরকম ভঙ্গীতে বলেন, “তবে যে বললি তোর পুষ্যি ঘর নোংরা করে!”
“অস্বীকার করছি কোথায়? বরং জোর গলায় বলছি, আমার পুষ্যিরা ঘর নোংরা করে।” হাসতে হাসতে উত্তর দেন তমাল।
“পুষ্যিরা! তার মানে আরও কিছু পুষেছিস? আর সেটা আমার কাছে চেপে গেছিলি। ভাবলি কী করে আমার কাছ থেকে চেপে থাকতে পারবি? বল আর কী কী পুষছিস।” খানিক উত্তেজিত হয়ে ওঠেন রঞ্জন।
“আরে চেপে থাকব কেন? তোর সামনেই তো ওরা ঘুরে বেড়াচ্ছে!” তমাল শান্ত গলায় বলেন।
“আমার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে! কী বলতে চাইছিস তুই? আমার চোখ খারাপ, না ওরা ভূত যে সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমি দেখতে পাচ্ছি না!”
“আরে না, ওসব ভূত-টুত কিছু নয়, আমি যাদের পুষছি তারা তোর আশেপাশেই আছে। ওরাই আমার মশা তাড়ায়, বই বাঁচায়।”
খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে রঞ্জন বলেন “অনেক বয়স হয়েছে, এখন মিথ্যে বলাটা বন্ধ কর তমাল। আর এটা তোর এজলাস নয় যে কথার ফাঁদ পাততে হবে।”
“ভুলে গেছিস রঞ্জন, তোর সাথে ল কলেজে সেই প্রথমদিন দেখা হবার কথা? একটা পেন দিয়ে তুই তোর দাদুর একটা উক্তি আমাকে শুনিয়েছিলিー‘আইন পড়তে যাচ্ছ, আর যাই করো কলমের কালি শেষ হতে দিও না। কলমের জোর সবচাইতে বেশি। আর চোখ কান সবসময় খোলা রেখ।’ আমি সেকথা ভুলিনি। শুধু তাই নয়, সেই পেনটা এখনও রেখে দিয়েছি বন্ধুত্বের প্রথম উপহার হিসেবে। তোর সেই পেনটার কথা মনে নাও থাকতে পারে। আমার আছে। এই দেখ।” ড্রয়ার খুলে একটা ভেলভেটের বাক্স থেকে একটা পেন বের করেন তমাল।
পেনটা হাতে নিয়ে খানিক চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন রঞ্জন।
“আমি সত্যিই ভুলে গেছিলাম পেনটার কথা। তুই যে একটা তুচ্ছ প্লাস্টিকের পেন এত যত্ন করে রেখে দিবি আমি ভাবতে পারিনি। আমায় ভুল বুঝিস না তমাল। কিন্তু তোর কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কাদের কথা বলছিস তুই?”
“দেখ, আমি পেশা হিসবে বেছে নিয়েছিলাম পরিবেশ আইনকে। কারণ, আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসি। বহুদিন আগে শিলং গেছিলাম একটা কেস লড়তে। সেখানে গিয়ে আমার এক লেখক বন্ধু তার লাইব্রেরি সে কী করে পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচায় তার পন্থা দেখায়। আমি সেটা আমার লাইব্রেরিতেও অ্যাপ্লাই করেছি। তাই একটা বইও আমার নষ্ট হয়নি।”
খানিক চুপ করে থেকে আবার শুরু করেন তমাল। “আমি আমার ঘরে একটা বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলেছি শুধু। সেটা সাধারণ লোকের চোখে ধরা পড়ার নয়। ভেবেছিলাম তোর মতো এক দুঁদে ক্রিমিনাল লইয়ার ধরে ফেলবে। তুই একটা বাল্ব দেখে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া একটা কেসকে প্রমাণ করেছিলি ওটা দুর্ঘটনা ছিল না। ছিল খুন। মধ্যে আমাদের বহুবছর দেখা হয়নি ঠিকই, কিন্তু আমি তোর সব খবর রাখতাম। আমি তোকে একটা নোংরা পরিষ্কার করার কথা বলেছি, সেটা ওই বাস্তুতন্ত্রের ফল।” একনাগাড়ে বলে যান তমাল।
“কিন্তু এই পোষ্যগুলো কী সেটা তো এবার বল। আমিও একবার আমার লাইব্রেরিটা বাঁচানোর চেষ্টা করে দেখি।”
“ধীরে বন্ধু, ধীরে। এই কাজটা করতে গেলে প্রথমে যে কাজটা করতে হবে সেটা হল তোমার লাইব্রেরি ঘর থেকে ওই আমেরিকান শিকারি বেড়ালটা সারানো।”
“কী বলছিস তুই, লাইব্রেরি বাঁচানোর সঙ্গে ওই বেড়ালের কী সম্পর্ক?”
“আছে বন্ধু, আছে। এতদিন ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করছি। এটাই আমার স্পেশালিটি। ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন গাছ থাকে। কোনও নষ্ট হয়ে যাওয়া জঙ্গলকে নতুন করে গড়ে তুলতে যদি ভুল গাছ লাগানো হয় তাতে গাছগুলো হয়তো বাঁচবে, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হয়ে যাবে। যেমনি হয়েছে ইউক্যালিপটাস গাছ লাগিয়ে। তাতে মাটি থেকে রস শুষে ওই গাছ অন্য গাছকে মেরে ফেলেছে, নয়তো সেই জায়গাটার চরিত্র বদলে দিয়েছে।
“তোর ওই শিকারি বেড়ালটাও টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শা মেরে ঘরের বাস্তুতন্ত্রটা নষ্ট করে দিয়েছে। মাকড়সা তোর বইয়ের ক্ষুদে পোকাগুলো খেয়ে নিত। আর ওই মাকড়সাগুলোকে খেত আরশোলারা। আর আরশোলাগুলোকে খেত টিকটিকিরা। কিন্তু এখন সেই মাকড়শা, আরশোলা আর টিকটিকিগুলোকে তোর ওই শিকারি বেড়ালটা মেরে ফেলে ঘরের বাস্তুতন্ত্র দিয়েছে ধ্বংস করে। তাই ওই মাকড়শার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ক্ষুদে পোকার দল বাসা বেঁধেছে তোর বইয়ের আলমারিতে। এতে যা হবার তাই হয়েছে। যেই তুই পেস্টিসাইড ছড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিস, ক্ষুদে পোকার দল ফিরে এসে বাসা বেঁধেছে বইয়ের র‍্যাকে। কেটে শেষ করেছে তোর সম্পদ। হু হু বাওয়া, পুষ্যি বাছাই অত সহজ নয়। না হয় রোজ খানিক টিকটিকির ময়লা পরিষ্কার করতে হয়।”


___


অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

গল্পঃ লিওবাবুর প্রাপ্তিযোগঃ ধূপছায়া মজুমদার


লিওবাবুর প্রাপ্তিযোগ


ধূপছায়া মজুমদার

লিওবাবু আড়মোড়া ভেঙে এপাশ ওপাশ উলটেপালটে খানিকক্ষণ গড়াগড়ি খেয়ে চোখ খুললেন। বেলা অনেক হল, এবার বিছানা না ছাড়লেই নয়। সংসারের এত কাজ, যেদিকটায় তিনি নজর দেবেন না, সেটাই এরা ভণ্ডুল করে রাখবে। একা হাতে আর কত সামলাবেন! বেশ যদি দুয়েকজন অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকত তাঁর, ভালো হত। কিছুটা বোঝা হালকা হত। এই ধরো, তিনি নিজে গেলেন বারান্দায় গাঁদাগাছটাকে চান করাতে, তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট তাঁর পিছু পিছু চলল গামছা আর চিরুনি নিয়ে। চানের পর গাঁদাগাছের পাতাগুলো কেমন জড়িয়ে-মড়িয়ে যায় না? গামছা দিয়ে বেশ করে গাছের মাথা, মানে পাতা মুছিয়ে তাদের পাতাগুলোকে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে তবে শান্তি।
হ্যাঁ, বাড়িতে তিনি একেবারে একা নন, একটা বেজায় লম্বা লোক আর এক দজ্জাল মহিলা তাঁর সঙ্গে থাকেন বটে। লোকটা খারাপ নয়, মোটামুটি সর্বক্ষণই হুটোপুটি চালায়। ফ্রিজ খুলে চকোলেট খাওয়া বলো বা পাড়াতুতো বেড়াল ন্যাজেশ্বরকে দুধের সর খাইয়ে দেওয়াই বলোㄧভালো ভালো কাজগুলোয় লোকটার সাহায্য পাওয়া যায়। কিন্তু ওই মহিলা? বাপ রে! যেমন তার মেজাজ, তেমনি গলার আওয়াজ। শুনলে শরীর কেমন করে। একদিন লিওবাবু গাঁদাগাছের পাতা আঁচড়ে দিচ্ছেন দেখে ওই মহিলা এমন চেঁচিয়েছিলেন, যেন টবের মাটি থেকে কেঁচো বেরিয়েছে! সেইদিনই লিওবাবু ঠিক করে ফেলেছিলেন, অ্যাসিস্ট্যান্ট তাঁর চাইই।
এবার কি মা সরস্বতীকে বলে দেখবেন, কাজ হয় কি না? এরা সবাই বলছে খড়ি ফুটবে সরস্বতীপুজোর দিন, সেদিনই বলবেন কি? আচ্ছা, খড়ি তো তেল না মাখলে গায়ে ফোটে। রোজ মা, মানে ওই চেঁচামেচি করা মহিলা চেপ্পে চেপ্পে তাঁকে ধরে তেল মাখান, আর গা-হাত-পা ডলে দেন। জ্যাবজেবে করে সারা গায়ে তেল মাখতে লিওবাবুর একদম ভালো লাগে না। সুযোগ পেলেই তেলের বাটি উলটে দিয়ে তিনি ছুট্টে পালান; আর ওই মহিলা পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে গজগজ করেন, “মাখতে হবে না তেল। চানটান কিচ্ছু করতে হবে না। ফেলে রেখে দেব। গায়ে-হাতে-পায়ে খড়ি ফুটবে, খ্যাসখ্যাস করে গা চুলকোবি, তখন মজা বুঝবি!”
সেই খড়ি সরস্বতী পুজোর দিন ফুটবে? মানে সেদিন তেল মাখার ছুটি? বাহ্‌ বাহ্‌, তবে ওই দিনটাই ভালো। হাতজোড় করে পা মুড়ে বসে ঠাকুরের কাছে বলতে হবে, ঠাকুর যেন অ্যাসিস্ট্যান্ট এনে দেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে গেলে তিনি তাকে দুটো, না না, তিনটে বাতাসা একটা নারকেল নাড়ু দেবেন। আচ্ছা, অ্যাসিস্ট্যান্ট কি উচ্ছে খায়? তাহলে তাকে নিজের ভাগের উচ্ছেটাও খাইয়ে দেবেন।
মুখটুখ ধুয়ে লিওবাবু কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে পড়লেন। অ্যাসিস্ট্যান্টের একটা ছবি এঁকে রাখতে হবে তো! নইলে ঠাকুর যখন জিজ্ঞেস করবেন, ‘তোমার কেমন অ্যাসিস্ট্যান্ট চাই?’ তখন কী উত্তর দেবেন?
ছবিটায় লিওবাবু দাঁড়িয়ে আছেন মাঝখানে, দুইপাশে দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট ভারি বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। ছবিটা আঁকতে আঁকতে লিওবাবুর মনে হল, একটু একটু ক্ষিদে পাচ্ছে। মা তো এক্ষুনি একবাটি দুধে রুটি আর কলা চটকে নিয়ে আসবে। ও-জিনিস মানুষে খায়? ছ্যা ছ্যা! একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট পেলে লিওবাবু রোজ সকালে লুচি-আলুভাজা খাবেন। তিনি আটা মাখতে পারেন, মা কোথায় আটা রাখে তাও জানেন। গামলায় আটা-জল নিয়ে মেখে ফেলবেন, আর অ্যাসিস্ট্যান্ট লুচি বেলে ভেজে ফেলবেন। এই ছবিতেও বরং লুচির ব্যাপারটা একটু ঢুকিয়ে রাখা যাক।
“লিওবাবু, কী করছ সক্কাল সক্কাল?”
বড্ড মন দিয়ে আঁকছিলেন তো, বেয়ালীপিসির ডাকে একটু চমকে উঠলেন। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “আসিস্তা আঁকছি।”
“বাহ্‌ বাহ্‌, খুব ভালো। আসিস্তা এঁকে কী কাজ হয় বাবা?”
বেয়ালীপিসি লিওবাবুকে কাঠবেড়ালি ছড়া শেখান, মাঝেমাঝে ঘোড়া হয়ে তাঁকে পিঠে চড়িয়ে ঘুরে বেড়ান, তাই তাঁকে লিওবাবু পছন্দ করেন, তা বলে অ্যাসিস্ট্যান্ট এঁকে কী কাজ হয় জিজ্ঞেস করবেন! এ ভারি অন্যায়।
গম্ভীর গলায় লিও বলেন, “আসিস্তা লুচি করে, বল করে, আমার সঙ্গে হামা দেয়, গাছের চুল আঁচড়ালে বকে না, বিট্টুর জামাটা পিঠের দিকে আটকে দেয়, বকুমকে দুপুরে ডেকে ভাত দেয়।”
বিট্টু লিওবাবুর ফুটবলার পুতুল, তার জার্সিটি পিঠের কাছে ছেঁড়া। আর বকুম হল লিওবাবুর অঘোষিত পোষা পায়রা। সে মাঝে মাঝে বারান্দায় এসে বসে। মা দেখলেই হুশ হুশ করে তাকে তাড়িয়ে দেয়।
“বাব্বা! তোর আসিস্তা তো অনেক কাজের! আচ্ছা, যদি কাউকে পাস যে লুচি ভাজতে পারে না, পুতুলের জামা আটকাতে পারে না, কিন্তু তোর সঙ্গে খেলবে, তাকে তোর আসিস্তা করবি?”
বেয়ালীপিসির কথায় লিওবাবু চিন্তায় পড়লেন। লুচি-টুচি ভাজতে না পারলে আর অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়ে কী লাভ? আবার পরের মুহূর্তেই মনে হয়, লুচি না পারুক গে, বল করতে তো পারবে! তাহলেই হবে।
“হ্যাঁঅ্যাঅ্যা।” বলে লম্বা করে ঘাড় নাড়েন তিনি।
“আচ্ছা।” বলে পিসি বাইরে গিয়ে কাদের যেন নিয়ে আসেন ভেতরে।
ততক্ষণে মা আর বাবাও লিওবাবুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
“দাদা, ইনিই মিস্টার বড়ুয়া। আমাদের ফ্লোরে নতুন এসেছেন। কালকেই এসে পৌঁছেছেন। নাগপুর থেকে বেহালা, কম রাস্তা তো আর নয়, তাই কাল আর এঁদের ব্যস্ত করিনি। আজ সক্কাল সক্কাল হাজির হলাম।” হেসে বলেন বেয়ালীপিসি, “ইনি বউদি, আর এই যে, দুই যমজ ছেলেㄧলবকুশ। লিওবাবু, লবদাদা আর কুশদাদা দু’জনে আজ থেকে তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। কী, খুশি তো?”
আর খুশি! লিওবাবু তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না যে সত্যি সত্যি তিনি দু’জন অ্যাসিস্ট্যান্ট পেয়েছেন। এবার থেকে খেলতে ইচ্ছে হলে বাবার কাছে গিয়ে বায়না করতে হবে না, মাকে আর কাজ ফেলে তাঁর পিছনে দৌড়তে হবে না। লিওবাবু সব কাজ তাড়াতাড়ি সেরে ফেলবেন। এদের দু’জনের সঙ্গে রোজ বিকেলে তাঁকে খেলতে হবে যে!
আহ্লাদে ডগমগ হয়ে তিনি টেবিলে পড়ে থাকা কাগজটায় আঁকতে থাকলেন চার-পাঁচটা লুচি, গোল্লা পাকিয়ে তাতে হিজিবিজি কেটে খোসা ছাড়ানো আলুভাজা, থালা, থালার ওপরে উলটে রাখা গেলাস, মাথার ওপরে খালি জায়গাটায় এঁকে ফেললেন গ্যাসের ওভেন, লুচি ভাজার কড়াইটাকে তার ওপরে বসিয়ে দিলেন। ব্যস, লুচি ভাজা শেষ, এবার খাওয়া পর্ব।
মুখ তুলে লিওবাবু দেখলেন লুচি-আলুভাজা প্লেটে নিয়ে মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন সামনে। সবার মুখেই মিটিমিটি হাসি। মায়ের মুখটা রাগী রাগী হলেও চোখ দেখে মনে হচ্ছে হাসছেন। লিওবাবু মনের আনন্দে তাঁর দুই অ্যাসিস্ট্যান্টকে জড়িয়ে ধরলেন, আর টেবিলের ওপর থেকে হাসতে লাগল তাঁদের তিনজনের ছবিটা।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ