প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র

 

প্রচ্ছদঃ বিশ্বদীপ পাল

সূচিপত্র

কচিপাতা

গল্প
চোর ধরার ফাঁদ অন্তরীপ মজুমদার
বন্ধু বোলতা কৌশানি দেব
জম্বুর ডায়েরি প্রবাহনীল দাস
রহস্যের রাত প্রত্যক চক্রবর্তী
ভাই ক্ষিতিকা বিশ্বাস

ছড়া
ইঁদুরের মজা শুভ্রজা চ্যাটার্জী

আঁকিবুঁকি

উপন্যাস

ছোটো গল্প
ভূতের চিঠি অভিজিৎ চৌধুরী
খিদে অনন্যা সাহা ব্যানার্জী
ছায়া দ্বীপ অনির্বাণ সরকার
দুয়োরানির দেশে অনিরুদ্ধ সেন
পিকনিক অনুষ্ট‌ুপ শেঠ
লিড আস অরিন্দম দেবনাথ
অমৃতস্য পুত্রাঃ বুদ্ধদেব চক্রবর্ত্তী
কালোমানিকের গল্প চুমকি চট্টোপাধ্যায়
উলবোনা সুধাকর দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
ফিকে দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী
ম্যামথ শিকারি গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
ভেষজ বিড়ি জিৎ দত্ত
ভিকু কস্তুরী মুখার্জি
বুলেট রিকশ কিশোর ঘোষাল
কালবীন কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
তুলি ও লালি কৃষ্ণেন্দু দেব
রামধনুর রঙফেরতা মধুমিতা ভট্টাচার্য
ল্যাংড়া প্রকল্প ভট্টাচার্য
ক্যাটরিনা প্রান্তিক বিশ্বাস
উত্তর মেলে না সহেলী চট্টোপাধ্যায়
নিঝুম সন্ধ্যায় সনৎকুমার ব্যানার্জ্জী
অন্ধকার নামে যখন সঞ্জয় কর্মকার
বুদ্ধির দাম সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী
সিরো সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
অতীন্দ্রিয়তা শেলী ভট্টাচার্য
ভোরের স্বপ্ন সৌম্যদীপ
ডিফেন্সের প্রাচীর ভেঙে সৌরভকুমার ভূঞ্যা
স্মৃতিহারা শিবতোষ তরুণকুমার সরখেল

জীবনের গল্প
রাজবন্দী দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

বড়ো গল্প
কুম্ভঘোষকের গুপ্তধন নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী
লেপসোনা অন্বেষা রায়
টেক্কা দৃপ্ত বর্মন রায়
গোলকুণ্ডায় গণ্ডগোল দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়
টান সত্যম ভট্টাচার্য

কমিকস
অন্তর্ধান রহস্য অলক দাশগুপ্ত

ছড়া
আগমনী গান গোবিন্দ মোদক
বীরপুরুষ শ্যামাচরণ কর্মকার
নিশাচর ফুল্লরা ধর
শরৎ প্রদীপকুমার পাল
আগমনী নুরজামান শাহ
আঁকিবুঁকি সুদীপ্ত বিশ্বাস
লক-ডাউন মীনা সাহা
আসছে শরৎ সুব্রত দাস
রাম সিং পালোয়ান সুজাতা চ্যাটার্জী
স্বপ্নপুরী মানসী পাণ্ডা
চাঁদের বাড়ি শর্মিষ্ঠা বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিমানের চিঠি শম্ভু সরকার
পড়ার ঘরে দেবীস্মিতা দেব
বঙ্কুবাবুর স্বপ্ন পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
মুন্নির বায়না বাপ্পা দাস
লকডাউনের ছড়া শৈলেনকুমার দত্ত
মানুষ হওয়ার পথে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
নেই তো কোনো ছবি মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস
ছোটো নদী ও বালক শঙ্খশুভ্র পাত্র
জোনাক তুমি বিদ্যুৎ মিশ্র
ঘড়ির আদেশ সবিতা বিশ্বাস
খুশির খোঁজে রাজীব মিত্র
খুড়োর ধুতি সজল বন্দ্যোপাধ্যায়
ইচ্ছে-গাড়ি তনয় ভট্টাচার্য

রূপকথা
বদ্রীনাথ ও রাগেশ্বরী সুস্মিতা কুণ্ডু

অনুবাদ গল্প
উপকুলের স্বর্ণ ঈগল অর্চন চক্রবর্তী

অণুগল্প
সুতো বনশ্রী মিত্র

লিমেরিক
লকডাউনের পুজো শাম্ব চ্যাটার্জী

লোককাহিনি
কুম্ভীরাশ্রু অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আলোর দিশারি

অতীতের আয়না
নাসার দেওয়ালে টাঙানো সেই ছবি কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

চলো যাই
ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা সায়নদীপা পলমল

না-মানুষের পাঁচালি
মানুষ ছিল বনমানুষের রূপে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিজ্ঞানের পাঠশালা
যা দেখি, যা শুনি... (৮ম) কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

কচিপাতাঃ গল্পঃ চোর ধরার ফাঁদ - অন্তরীপ মজুমদার



একটি গ্রামে একজন কৃষক ছিল। কৃষকটির একটি গাধা ছিল। কৃষকটি ছিল খুব গরিব। কৃষকটির কাছে শুধু একটুকরো জমি ছিল আর একটি গাধা ছিল। কৃষক একদিন জমিতে চাষ করার জন্য গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে দেখল গাধাটি চুরি হয়ে গেছে। কৃষকটি সারাদিন কান্না করল। পরের দিন সকালে কৃষকটি রাজার কাছে গিয়ে নালিশ করল। রাজা বললেন, “আমি এবং আমার সৈনিকেরা তো চোরকে চিনি না, তাহলে চোরকে ধরব কীভাবে?”

রাজার মুখে একথা শুনে কৃষক তার বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে কৃষকের মাথায় একটা বুদ্ধি এল।

পরদিন সকালে কৃষক তার বন্ধুর বাড়ি থেকে একটা গাধা আনল। তারপর সে গাধাটিকে বেঁধে একজায়গায় লুকিয়ে রইল। যখন চোরটা গাধাটিকে চুরি করতে এল তখন কৃষক চোরটিকে ধরে ফেলল।

তারপর কৃষক চোরটিকে নিয়ে রাজবাড়িতে গেল। রাজাকে সবকথা খুলে বলল। রাজা তখন চোরটিকে দশ বছরের জন্য কারারুদ্ধ করলেন।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক


অন্তরীপ মজুমদার (১০)

চতুর্থ শ্রেণী

রমেশ এইচ.এস ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল

উদয়পুর, ত্রিপুরা

অন্তরীপ ক্রিকেট খেলতে ও গল্প লিখতে ভালোবাসে।


কচিপাতাঃ গল্পঃ বন্ধু বোলতা - কৌশানি দেব


কৌশানি দেব


লকডাউন চলছে। বাড়িতে বসে বসে বোর হচ্ছি। মন ভালো রাখবার জন্য টেনিদা পড়ছি। পড়ছি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা সদাশিব। হঠাৎ একদিন চোখ পড়ল দোতলার ভেন্টিলেটরের দিকে। দেখি হলুদ বোলতার বাসা। এতদিন চোখেই পড়েনি! তবে কয়েকদিন ধরেই বাড়ির চারপাশে বোলতা ঘুরতে দেখছিলাম। বাসাটা পুরো বানানো হয়ে গেছে বলেই মনে হল। কী সুন্দর! অনেকটা ছোটো ঝুলন্ত ঝাড়বাতির মতো। বাবা বলেছে বোলতারা মাটি, কাঠের গুঁড়ো, নানা জৈব পদার্থের সঙ্গে নিজের লালা মিশিয়ে এই বাসা বানায়। বাসাটিতে অনেকগুলো কুঠুরি রয়েছে। প্রতিটা কুঠুরি ছ’কোনা, একই মাপের।

আমার তো বেশ আনন্দই হল। পড়ার ফাঁকে ওদের কীর্তিকলাপ দেখতে পাব। হয়তো ক’দিনের মধ্যেই ডিম পাড়বে। লার্ভা হবে। তারপর বেরোবে একটা জ্যান্ত বোলতা। ভেবেই আমার দারুণ মজা লাগছিল। তখুনি গিয়ে বাবা-মাকে বললাম।

এখন মাঝেমধ্যেই ওদের দিকে নজর রাখি। যদিও একটু অসুবিধা হয় ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে দেখতে, আবার বেশি কাছে যেতেও সাহস পাই না। পাছে হুল ফুটিয়ে দেয়। সারাক্ষণই দেখি ছ’-সাতটা বোলতা বাসাটাকে ঘিরে থাকে। বিকেলে আর সকালে যখন বাগানে জল দিতে যাই, কয়েকটা বোলতাকে বাগানে ঘুরতে দেখি। হয়তো ফুলের নেকটার কিংবা মধু সংগ্রহ করতে আসে।

কয়েকদিন পর দেখি কুঠুরির মুখগুলো সাদা একটা জিনিস দিয়ে ঢাকা। মনে হয় ডিম পেড়েছে। ডিমগুলো পড়ে যাওয়ার ভয়ে হয়তো ঢাকা দিয়ে রেখেছে।

ইতিমধ্যে আমি রিমিকে এ ব্যাপারে বলেছি। ও থাকে আমার পাশের বাড়িতে। খুব ভালো বন্ধু আমার। বারান্দায় গিয়ে ডাকলাম ওকে। রিমি এল। যা দেখেছি তা বললাম। রিমি বিমর্ষ মুখে বলল, “লকডাউনের জেরে আমার আর বোলতার বাসা দেখাই হল না।”

আমি একগাল হেসে আবার ঘরে ফিরে এলাম। সতিই আমার রিমির জন্য খারাপই লাগল।

সন্ধে হলেই বোলতাগুলো আমার পড়ার ঘরে আলোর কাছে ঘুরঘুর করে। সেটা আমার বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু একদিন দেখি ওরা শুধুই আমার চারপাশে ঘুরছে। মুখ-চোখের সামনে দিয়ে শাঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি ছুটে বাবার কাছে গিয়ে কাঁচুমাচু মুখে সে কথা বললাম। বাবা সব শুনে বলল, “ওরা একটু ওড়াউড়ি করছে বটে, কিন্তু তোমায় তো আর হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে না? তাই তুমিও ওদের আঘাত কোরো না।” এরপর বাবা একটু হেসে বলল, “ওরা আসলে দেখতে এসেছে তুমি ঠিকমতো পড়াশোনা করছ কি না, অঙ্ক কষছ কি না। নিশ্চয়ই তুমি তখন মন দিয়ে পড়ছিলে না, তাই ওরা তোমার চারপাশে ঘুরছিল।”

বাবার কথা আমার খুব একটা পছন্দ হল না। আবার পড়ার ঘরে চলে এলাম। দেখি এখন আর একটা নয়, চার-পাঁচটা বোলতা এসে পড়েছে। তার মধ্যে হঠাৎ একটা উড়ে এসে বসল আমার অঙ্ক বইয়ের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে পেনসিল বক্সটা চাপিয়ে দিলাম ওর গায়ে।

বোলতাটাকে মারতে পেরে সেদিন আমার বেশ গর্ববোধই হচ্ছিল। রাতে ঘুমোবার সময়ে মনে হচ্ছিল আরো কয়েকটাকে ওভাবেই মেরে ফেলি। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দক্ষিণের জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি হলুদ রঙের একটা ক্রিকেট বলের আকারের প্রাণী। ওটা জানালা দিয়ে ঢুকে আমার দিকেই আসতে লাগল। আমি তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। যখন একেবারে সামনে চলে এল, দেখি প্রাণীটার চোখদুটো আসলে পুঞ্জাক্ষি! গায়ে হলদের ওপর বড়ো বড়ো খয়েরি দাগ। আর দুটো লম্বা শুঁড়। এটা কি বোলতা?

বোলতা যে এরকম বিশাল হতে পারে তা এতদিন জানতামই না। মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল। আরে আজ সন্ধ্যাতেই তো রাগের চোটে একটা বোলতাকে মেরে ফেলেছি! এখনো পেন্সিল বক্স দিয়ে সেটা চাপা দেওয়া আছে। তারই কি প্রেতাত্মা নাকি ওটা?

আমি ঘামতে শুরু করলাম। ওদিকে বড়ো বোলতাটা আমার দিকে চেয়ে বলল, “আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি যে তুমি আমাকে মেরে ফেললে?”

আমার তখন কথা বলবার ক্ষমতা নেই। ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে। বোলতাটা কটমট করে তাকিয়ে এবার কড়া সুরে বলল, “তোমার মতো লোকেরাই আমাদের ভালোভাবে বাঁচতে দেয় না। একটা সময় আমরাও কত আনন্দে দিন কাটাতাম। চারদিকে গাছপালা, ফাঁকা মাঠ। কিন্তু এখন সেই সুন্দর পরিবেশ আর নেই। চারদিকে শুধু উঁচু উঁচু বাড়ি। গাছপালাও কমে গেছে। ফলে কমে আমাদের থাকার জায়গাও। তাই তো লোকের বাড়িতে গিয়ে বাসা বানাতে হয়। অনেকেই সেই বাসা ভেঙে দেয়। আমাদের তাড়িয়ে দেয়, মেরেও ফেলে তোমার মতো। আমরা ক্ষুদ্র প্রাণী বলে প্রতিবাদ করতে পারি না। তবে মনে রেখো, তোমাদের মতো আমাদেরও মন আছে, পরিবার আছে।”

বোলতাটার কথা শুনে আমার সারা গা কেঁপে উঠল। আর তখনই হঠাৎ মিলিয়ে গেল প্রাণীটা। আর আমার মুখের উপর এসে পড়ল সূর্যের আলো। মা ডাকছে।

আমি তাহলে এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিলাম! বোলতাটা তাহলে আমার স্বপ্নে এসেছিল। মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। কেন যে কাল বোলতাটাকে মারতে গেলাম! তক্ষুনি ঠিক করলাম, যা কিছুই হোক, আমি আর কক্ষনো বোলতা মারব না।

তারপর থেকে প্রতিদিন সন্ধে হলেই বোলতাগুলো আলোর কাছে ঘুরঘুর করে। আমার আশেপাশেও উড়ে বেড়ায়। কিন্তু আমি ওদের কাউকে আঘাত করি না। ওরাও আমাকে কিচ্ছু বলে না। কোনোদিন যদি ওদের না দেখতে পাই, তাহলে মনখারাপ হয়ে যায় আমার। বাসা থেকে নতুন বোলতা বেরোনোর অপেক্ষায় আছি।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক মজুমদার


কচিপাতাঃ গল্পঃ জম্বুর ডায়েরি - প্রবাহনীল দাস



জম্বুর ডায়েরি


প্রবাহনীল দাস



১৭ই জুলাই

আমি জম্বু। আজ আমি প্রথম ডায়েরি লিখছি। আমার বয়স আঠারো বছর। আমি সৌরমণ্ডলের পার্শ্ববর্তী প্রক্সিমা সেনটাউরির গ্রহ ‘কোল্টরন’-এর বাসিন্দা। আজ আমি বাংলায় ডায়েরি লিখছি, যদিও এটা আমার মাতৃভাষা নয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, আমাদের গ্রহে কেউ এই ভাষার নামও শোনেনি। কিন্তু আমি এই ভাষায় কথা বলতে পারি, লিখতেও পারি; কিন্তু কীভাবে জানি না। আমাদের জ্যোতিষী বলেছেন আমি যেন বাংলাতেই এই ডায়েরি লিখি। কারণ, তাঁর মতে ভবিষ্যতে আমার এই ডায়েরি আমার কোনো বাঙালি বংশধরই পড়বে। ১৭, ১৮, ডায়েরি, সৌরমণ্ডল ও প্রক্সিমা সেনটাউরি; তিনি বলেছেন যাতে আমি এই শব্দগুলোই লিখি। এই কথাগুলো লিখলে যে এই ডায়েরি পড়বে, সে বুঝতে পারবে।


১৮ই জুলাই

আজ আমি জানলাম কেন আমি ডায়েরি লিখছি। আমাদের জ্যোতিষী জানিয়েছেন যে আমরা আর কিছুদিনের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে যাব, কারণ আমাদের গ্রহের দিকে অসম্ভব গতিতে ধেয়ে আসছে এক উল্কা। তবে তিনি এও জানিয়েছেন যে জম্বু নামক এক ছেলে ও সুমা নামক এক মেয়ে নাকি সেই উল্কার টানে সেটির সঙ্গে গিয়ে পড়বে আমাদের পাশের সৌরমণ্ডলের পৃথিবী নামক এক গ্রহতে। সেখানকার ডাইনোসর প্রজাতির বিলুপ্তির সঙ্গেই আমাদের সভ্যতার শুরু হবে সেখানে—জম্বু ও সুমার হাত ধরে। জম্বু হলাম আমি ও সুমা হল আমাদেরই পাড়ার মেয়ে। আমরাই তবে সেই ভাগ্যবান, যারা এই গ্রহের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর আমার এই ডায়েরিই হল তার প্রমাণ।


***


আমি একজন প্রত্নতাত্ত্বিক। উপরে যে ডায়েরি থেকে অংশটি আমি তুলে দিলাম, সেটি আমি একটি পুরুষ ও একটি মহিলা রামাপিথেকাসের জীবাশ্মের সঙ্গে পাই। এরপরের পাতাগুলি আর নেই। আমি এটির কেমিকাল অ্যানালাইসিস করিয়েছি, কিন্তু এই ডায়েরিটি যে কী উপাদানে তৈরি তা জানা সম্ভব হয়নি। যদিও এটি বাংলা হরফে লেখা, তবুও এটির কার্বন ডেটিং বলছে যে এটির বয়স নাকি ৮০ লক্ষ বছর, যা কিনা পৃথিবীতে বাঁদরের আগমনেরও আগে। ডায়েরিটি পড়ে আমার মনে হল যে আমরা মানুষেরা, যারা কিনা ভিনগ্রহী জীব খুঁজে চলেছি, তারা এটা বুঝতে পারলে বিস্মিত হবেন যে আমরা নিজেরাই হয়তো ভিনগ্রহী!


প্রবাহনীল দাস

ষষ্ঠ শ্রেণী

একমে অ্যাকাডেমি


কচিপাতাঃ গল্পঃ রহস্যের রাত - প্রত্যক চক্রবর্তী



রহস্যের রাত


প্রত্যক চক্রবর্তী


একটা ভাড়াবাড়িতে উঠেছে ঋক। বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল, কোনো বিপদ-আপদ তেমন হয়নি। ঋকের মা গত হয়েছেন। বাবা নিখোঁজ। আশেপাশের লোকজনের বিশ্বাস, ঋকের বাবাও আর বেঁচে নেই। ঋকের বাড়িতে ঋক ছাড়াও আছে তার বিশ্বস্ত চাকর গোপাল। গোপালদের বাড়িতে খুব অভাব-অনটনের কারণে অনেক অল্প বয়েসেই পড়াশুনো ছাড়তে হয়েছিল। তাছাড়া গোপাল খুব সহজ-সরল ছেলে। ঋক স্কুল-শিক্ষক। সারাদিন বাড়ির দেখাশুনো গোপালই করে। গোপালের ওপরে ভরসা করে ঋক মাস খানেক কাটিয়ে ফেলল নতুন ভাড়াবাড়িতে।

সেইদিন খবরে বলছিল, রাতে খুব ঝড়বৃষ্টি হবে। ঋকের পাশে বসে গোপালও সে খবর শুনল। গোপাল বলল, “বাবু, আজ তো খুব জল হবে। মা আমার একা আছে বাড়িতে। খুব চিন্তা করবে আমার জন্যে। আমায় আজ একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিন।”

ঋক বলল, “ঠিক আছে। আমার কোনো অসুবিধা নেই। শুধু কাল একটু তাড়াতাড়ি চলে আসিস। স্কুলে সকালে কিছু কাজ আছে।”

যথারীতি সন্ধে সাতটা বাজতে না বাজতে গোপাল উতলা হয়ে উঠল। আকাশ ডাকছে। বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেল ঝমঝম করে। গোপাল আটকে গেল। বৃষ্টি থামল যখন, ঘড়িতে রাত এগারোটা। গোপাল তখন ঋকের খাবার টেবিলে চাপা দিয়ে তাকে বলে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

স্কুলের প্রচুর কাজ ছিল। খাওয়ার কথা প্রায় ভুলেই গেল ঋক। কাজ যখন শেষ, রাত তখন পৌনে একটা। বাইরে আবার খুব বৃষ্টি শুরু হয়েছে ততক্ষণে। এখন সঙ্গে আবার ঝড়ও এল পুরোদমে। ঋকের খেয়াল হল, টেবিলের ওপরে খাবারটা চাপা দেওয়াই পড়ে আছে। বাইরের এই অবস্থা। এত কাজ করে প্রচণ্ড ক্লান্তও লাগছিল ঋকের। ঘুমে চোখ বুজে আসছিল। ‘নাহ্‌, আজ আর খেতে ভালো লাগছে না। শুয়েই পড়ি গিয়ে। কাল সকাল সকাল গোপাল এসে ডেকে দেবে’খন।’ এই ভেবে যেই ঋক বিছানার দিকে এগোচ্ছে, অমনি কলিং বেল বেজে উঠল ডিং ডং শব্দ করে। রাত একটার পরে আবার কে এল! একটু বিরক্তই হল ঋক। দরজা খুলে দেখে, একজন অচেনা ব্যক্তি। বৃষ্টিতে পুরো ভিজে গেছেন। ভদ্রলোক বললেন, “নমস্কার। আমার নাম সুমন বাগচী। খুব ঝড়ে রাস্তার ওপরে বহু গাছই ভেঙে পড়েছে। আমার পক্ষে গাড়ি নিয়ে এগোনো প্রায় অসম্ভব। আজ রাতটা আমায় যদি এখানে একটু আশ্রয় দেন তাহলে বড়ো উপকার হয় মশাই। কাল সক্কাল হলেই আমি চলে যাব। আমাকে খেতে দেবার দরকার নেই। মাটিতেই একধারে শুয়ে পড়ব নাহয়। আমাকে নিয়ে বিব্রত হবার একটুও দরকার নেই।”

ঋক নিজের বিছানাতেই তাঁকে শুতে দিল। হাজার হোক, অতিথি ভগবান। ঋক পাশের ঘরের ক্যাম্প খাটটায় শুয়ে পড়ল।

পরের দিন কাজে এসে দরজা খোলা দেখে অবাক হয়ে গেল গোপাল। ইতস্তত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকে পড়ল সে। আর ঢুকেই অবাক হয়ে গেল। ঋক ক্যাম্প খাটে ঘুমোচ্ছে আর তার নিজের বিছানা একেবারে ছিমছাম, পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা। চাদরটা এমন সুন্দর করে রাখা, দেখলেই বোঝা যায়, বিছানাটা রাতে ব্যবহারই করেনি ঋক। গোপাল ঋককে ডেকে তুলল। ঋক গোপালকে দেখে বলল, “এ বাবা, যাহ্‌, কত দেরি হয়ে গেল। তোকে বললাম আজ একটু তাড়াতাড়ি আসতে! সেই তুই দেরি করে দিলি। আজ আর কাজে যাওয়া হল না।”

এরপর গোপাল যা বলল তা সত্যিই ভয়ানক। “কাল রাতের ঝড়ে রাস্তার ওপরে প্রচুর গাছ পড়েছে। একটা গাছ তো দামি একখানা গাড়ির ওপরে পড়ে গাড়িটাকে একেবারে তুবড়ে দিয়েছে। গাড়িটার কিছুই আর নেই বলতে গেলে। গাড়িতে আরোহী একজনই ছিলেন। অ্যাকসিডেন্টে বেচারা লোকটা একদম থেঁতলে গেছে। স্পট ডেড। সকালে শুনছিলুম, রাস্তার লোক বলাবলি করছিল, লোকটার নাম সুমন বাগচী। ওইজন্যেই তো আমার আসতে এত দেরি হয়ে গেল।”

মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল ঋকের। কেমন যেন অস্থির লাগছে মনের মধ্যেটা। সারাদিন কোনো বিষয়েই আর মন বসাতে পারল না সে। শেষপর্যন্ত অতিথি ভগবান না হয়ে কিনা...

সেইদিনেই রাত বারোটার সময় আবার কলিং বেল বেজে উঠল ঋকের বাড়িতে। একটু ভয়ে ভয়েই দরজা খুলল সে। আর খুলেই অবাক হয়ে গেল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা। তিনি নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ঋকের দিকেই। এক অদ্ভুত অজানা আতঙ্কে শরীরটা শিউরে উঠল ঋকের।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ প্রত্যক চক্রবর্তী

সপ্তম শ্রেণী

সেন্ট মন্টফোর্ট সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল, বারুইপুর


কচিপাতাঃ গল্পঃ ভাই - ক্ষিতিকা বিশ্বাস


“উউফ্!” বাবার গলায় এবার বিরক্তি।

আসলে সকাল থেকে এতবার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছি যে মা আজ ভাইকে নিয়ে আসবে তো? প্রথম কয়েকবার বাবা হ্যাঁ বললেও কখন যে ভাই আসবে কিছুতেই বলতে চাইছে না। আমিও ছাড়বার পাত্রী নই। কতদিন ধরে আবদার করেছি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে এমন একটা ভাই আমার চাই-ই চাই। তাই...

“চল, এবার বাস ছেড়ে দেবে।” বাবা বেশ রেগেমেগেই বলল।

আমি মনে মনে ভাবলাম, সেটাই তো ভালো, তাহলে তো আমি ভাই এলেই কোলে নিয়ে আদর করতে পারব।

বাবা বাসে তুলে দেওয়ার সময় অন্যদিনের মতন হামি দিল যদিও আমি এখন আর সেটা একদম পছন্দ করি না। বাসের পুঁচকেগুলো পর্যন্ত হাসাহাসি করে, ক্লাস সেভেনের মেয়েকে বাবা-মা স্কুল বাসে তুলে দেওয়ার সময় হামি দেয় দেখে। কিন্তু এদের কে বোঝাবে!

বাসে উঠে আমি রোজ ছোট্ট করে একটু ঘুমিয়ে নিই। ঘুমটা ভাঙে যখন মেইন রাস্তা থেকে বাসটা বাঁক নিয়ে স্কুলের সামনের সরু রাস্তাটায় ঢোকে। আজও ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্ন দেখলাম ভাইয়ের সঙ্গে খেলছি। ওকে চান করাচ্ছি, কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

স্কুলে আজ কিছুতেই সময় কাটতে চায় না। সায়েন্স আমার কখনোই খুব ভালো লাগে না, তার উপর ম্যাথসসুদ্ধু চার-চারটে সায়েন্স পিরিয়ড। মনটা বাড়িতেই পড়ে আছে। বন্ধুরা এইসব বোরিং ক্লাসের মাঝেই হাসি-মজা করে যাচ্ছে। প্রণীতা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওরই জানার কথা কেন আজ আমার ক্লাসে মন নেই। কিন্তু ও তো আজ আসেনি। তাই আরো যেন অসহ্য লাগছে। বড়ো টিফিন ব্রেকে স্যান্ডউইচ খেতে খেতে ভাবতে লাগলাম ভাইকে কী নামে ডাকব। অনেক ক’টা নাম মা, বাবা, আমি তিনজনে মিলে ভেবে রেখেছি। দেখা যাক কোন নামটা শেষপর্যন্ত ঠিক হয়।

একটা করে পিরিয়ড শেষ হচ্ছে আর আমার মনের আনন্দ ততই বাড়ছে। ম্যাথস ক্লাসে বকুনি খেলাম জোর! বাইরে জানালার দিকে তাকিয়ে কী যে ভাবছিলাম নিজেই জানি না। ম্যামের প্রশ্নগুলোর একটাও ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলাম না। দাঁড়িয়ে থাকতে হল বাকি ক্লাস। বাড়িতে বাবা-মার প্রচুর বকুনি খেলেও স্কুলে আজ পর্যন্ত কোনোদিন এরকম পানিশমেন্ট হয়নি আমার। তাই একটু মনখারাপও হল। কিন্তু একই সঙ্গে ভাইয়ের কথা আবার মনে হওয়াতে সেটা হাওয়ায় ভ্যানিশ হয়ে গেল।

দুটো বাজতেই দৌড়লাম মেইন গেটের দিকে। আজ আমি বাসে ফিরব না। বাবা এসে নিয়ে যাবে। বাবা সবসময় লেট করে, কিন্তু আজ দেখি গেটের বাইরে আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে আগে থেকেই। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করার আগেই বাবা বলল, “তোমার ভাই এসে গেছে।”

আমি তো শুনে এত খুশি হলাম যে বাবাকে একটার জায়গায় দু-দুটো হামি দিয়ে দিলাম। একটু আবদার করলাম যে ভিডিও কল করে দেখি। কিন্তু বাবা বলল, ভাই নাকি এখন ঘুমোচ্ছে। যাই হোক, এতদিন যখন অপেক্ষা করতে পেরেছি তখন আর নাহয় আধঘণ্টা বেশিই করব।

বাড়ি পৌঁছেই চটপট জুতো খুলে, সোফার ওপর পিঠের ব্যাগটাকে ছুড়ে দিয়ে গুটি গুটি পায়ে বেডরুমে ঢুকলাম। মা বলল, “বাইরে থেকে এসেছ, হাত-পা-মুখ ভালো করে ধুয়ে এসো।”

একটু উঁকি মেরে দেখলাম মায়ের পিছনে বিছানায় একটা সাদা তোয়ালে মোড়া ছোট্ট একজন... ওটাই তাহলে ভাই! হাতমুখ ধুতে ধুতে মনে পড়ল যে আমি তো ছোট্ট বাচ্চাদের কোলে নিতে একদম পারি না। ভয় লাগে কখন যে বেসামাল হয়ে পড়ে যাবে। তাহলে, ভাইকে কী করে কোলে নেব?

ঘরে ঢুকে দেখি মা ওকে কোলে নিয়ে বসে আছে। চোখদুটো বোতামের মতন গোল, বাদামি রঙের মণি। কানদুটো বড়ো বড়ো। কী মিষ্টি দেখতে! আধো ঘুমে চোখ পিটপিট করছে। ভাগ্যিস ওর গায়ে জড়ানো তোয়ালেটা নিঃশ্বাসের তালে তালে উঠছে নামছে, নাহলে সফট টয় বলে ভুল করবে যে কেউ।

“মা, কোলে নেব ভাইকে?”

“বিছানায় বসে নিতে পারিস, কিন্তু খুব সাবধানে।”

মা হাত বাড়িয়ে দিতে আমি দু-হাত বাড়িয়ে ওকে নিলাম। একদম হালকা। কোলে নিতেই একটু নড়েচড়ে উঠল।

“কী সুইট দেখতে গো ওকে! আমি ওকে চিকু বলে ডাকব।”

“আচ্ছা, সে নাহয় ডাকিস। তবে ওকে এখন খাওয়াতে হবে। তুইও চান করে খেয়ে নে। অনেক বেলা হল।”

মায়ের কথাটা শুনতে শুনতে আমার হাতদুটো ভিজে আর গরম হতে থাকল। বুঝতে পারলাম যে উনি হিসি করে দিয়েছেন। একটু উপরে যেই ওকে তুলেছি, নাকের ভেতর কী যেন একটা সুড়সুড়ি দিল। মা ভাগ্যিস ওকে চট করে কোলে নিল, নাহলে হয়তো হাঁচতে গিয়ে ফেলেই দিতাম। নাক-মুখ মুছতে মুছতে বুঝলাম, ওটা ছিল চিকুর লেজ!


___


অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক


কচিপাতাঃ ছড়াঃ ইঁদুরের মজা - শুভ্রজা চ্যাটার্জী



ইঁদুরের মজা


শুভ্রজা চ্যাটার্জী



এক যে আছে ইঁদুর,

সে পরল সিঁদুর,

পরে সে গিয়ে,

করতে বিয়ে,

করল খুব মজা,

আর খেল গজা।


অঙ্কনশিল্পীঃ শুভ্রজা চ্যাটার্জী (৬)

স্কুলঃ সেন্ট জেনেভিভ, ব্রাসেলস, বেলজিয়াম

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ চন্দ্রিকা চ্যাটার্জী

 


শিল্পীঃ চন্দ্রিকা চ্যাটার্জী

চতুর্থ শ্রেণী

আড়িয়াদহ সর্বমঙ্গলা বালিকা বিদ্যালয়

ভালোবাসে ছবি আঁকতে ও নাচতে।

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ শুভস্মিতা ঘোষ

 


শিল্পীঃ শুভস্মিতা ঘোষ

সপ্তম শ্রেণী

সেন্ট মন্টফোর্ট সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ সৃজনী দত্ত


শিল্পীঃ সৃজনী দত্ত

সপ্তম শ্রেণী

ওয়েলকিন ন্যাশনাল স্কুল

বারুইপুর, কলকাতা

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ সৃজিত সরকার

 


শিল্পীঃ সৃজিত সরকার

ওয়েলকিন ন্যাশনাল স্কুল

বারুইপুর, কলকাতা

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ রাজন্যা ব্যানার্জী

 


শিল্পীঃ রাজন্যা ব্যানার্জী (৯)

চতুর্থ শ্রেণী

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ ঈশানী ব্যানার্জী

 


শিল্পীঃ ঈশানী ব্যানার্জ্জী (৬)
দ্বিতীয় শ্রেণী
নিউ হরাইজন স্কলার'স স্কুল
থানে, মহারাষ্ট্র

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ অভিকর্ষ ঘোষ

 


শিল্পীঃ অভিকর্ষ ঘোষ (৫)
শ্রেণীঃ কে.জি
বিদ্যাসাগর শিশু নিকেতন

কচিপাতাঃ আঁকিবুঁকিঃ তৃষিত রক্ষিত

 


শিল্পীঃ তৃষিত রক্ষিত

স্কুলঃ দা দ্রি  মাস্টার

শ্রেণীঃ গ্রুপ টু

ডেন হাগ (নেদারল্যান্ড)

ভালোবাসে বেলুন আর লেগো দিয়ে খেলতে।

উপন্যাসঃ কুমিরগঞ্জের গুপ্তধন - শাশ্বত কর



পয়লা বৈশাখের দিন পুজো সেরে নতুন বাড়িতে উঠে এলেন তপোধীরবাবু আর তাঁর পরিবার। মেয়ে আসতে পারেনি অবশ্য। সেই মেয়েই এতদিনে আসবে।

সুচরিতা আইজারে কেমিস্ট্রি নিয়ে এম.এস.সি পড়ছিল। ওদের আবার প্রতিটা সেমিস্টারে প্রজেক্ট। সুচরিতা পড়ুয়া মেয়ে। আগাগোড়াই রেজাল্ট ভালোই করে। প্রথম দুটো সেমিস্টারের প্রজেক্ট সেরেছে মুম্বই আই.আই.টি. আর জে.এন.ইউ.তে। থার্ড সেমিস্টারের প্রজেক্টের জন্য অ্যাব্রড স্কলারশিপ পেয়ে জাপানে প্রফেসর নাকামুরা নোহারার ল্যাবে গেছে। এবারেও যাওয়ার কথা ছিল ইউ.এস। কিন্তু শেষমুহূর্তে ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত সমস্যা হওয়ায় তা ক্যান্সেল করতে হয়েছে। এবারের প্রজেক্ট সারতে তাই এসেছে কলকাতায়। আই.আই.সি.বি-তে।

ওখানেই কাছাকাছি থেকে কাজ করছিল। এরই মাঝে পুজোর ছুটি পড়ল। দিন দশেকের ছুটি। নতুন তৈরি বাড়িতেও যাওয়া হয়নি এখনও। কাজেই সেখানে গিয়ে বাবা-মাকে চমকে দেবে ভাবল।

হাওড়া থেকে কুমিরগঞ্জ আড়াই ঘণ্টাটাক। ছুটির আগের শেষদিনে কাজ গোছাতে গোছাতে এতটা দেরি হবে ভাবতেও পারেনি। ল্যাব থেকে বেরোতে বেশ একটু দেরিই হয়ে গেল সুচরিতার। তার উপর আবার ট্রাফিক জ্যাম। বড়বাজারেই প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে। সেসব কাটিয়ে ক্যাব থেকে হাওড়া স্টেশন চত্বরে নামল যখন তখনই প্রায় সাড়ে ছ’টা। যে ট্রেনে টিকিট কনফার্মড ছিল সে ট্রেন ছেড়ে গেছে তা প্রায় আধঘণ্টা। লোকালের টিকিট কাটতে গিয়ে জানতে পারল পরের ট্রেন প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে।

বড়ো ঘড়ির নিচে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে মোবাইলে দিনের খবরগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে নিল সুচরিতা। তারপর ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে হেঁটে গেল বুক স্টলের দিকে। কয়েকটা ম্যাগাজিন কেনা দরকার। অনেকটা পথ একা যেতে হবে।

“এইটা নাও দিদিভাই! খুব কাজে দেবে।”

কথাটা শুনে পাশে চেয়ে সুচরিতা দেখল ধুতি, সাদা শার্ট পরিহিত এক বৃদ্ধ একটা হলদে হয়ে আসা পুরোনো বই এগিয়ে দিচ্ছেন তার দিকে। এমনিতেই গোটা তিনেক পত্রিকা পছন্দ করে নিয়েছিল, তাই হেসে বলল, “না, লাগবে না।”

“নিয়েই নাও দিদি। কাজে দেবে দেখো।”

পুরোনো বইয়ে অবশ্য বেশ টান আছে সুচরিতার। আগে কলকাতায় থাকতে কলেজ স্ট্রিটে, ইউনিভার্সিটির পাশের গলিতে পুরোনো বই খুঁজতে যেত শনিবার করে। যাই হোক, ভদ্রলোকের বয়স, ব্যক্তিত্ব দেখে বইটা হাতে নিল সুচরিতা। ‘কুম্ভীরগঞ্জ ইতিবৃত্ত, শ্রীযুক্ত পঞ্চানন তর্করত্ন প্রণীত এবং শ্রী সর্বেশ্বর তর্কালঙ্কার মহাশয়ের মুদ্রণযন্ত্র হইতে প্রকাশিত’। বইটা নিয়ে কয়েক পাতায় চোখ বুলিয়ে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল সুচরিতার। আজ থেকে প্রায় দু’শো বছর আগের ইতিহাস! ভালোই পড়া যাবে ট্রেনে। আচ্ছা, এই কুম্ভীরগঞ্জ আর ওদের কুমিরগঞ্জ কি একই? জিজ্ঞেস করেই দেখা যাক না।

জিজ্ঞেস করবে বলে ঘাড় ঘুরিয়েই আর সেই ভদ্রলোককে দেখতে পেলে না সুচরিতা। যাহ্!

“আচ্ছা! বৃদ্ধ ভদ্রলোক কোথায় গেলেন?” টেরিলিনের সাদা খয়েরি চেক শার্ট পরা দোকানিকে জিজ্ঞাসা করল সুচরিতা।

“কোন বৃদ্ধ ভদ্রলোক?”

“এই যে যিনি এতক্ষণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে এই বইটা দেখাচ্ছিলেন। আপনাদেরই তো স্টাফ!”

“কী যে বলেন দিদি! আমার ছোটো দোকান। আমি আর আমার ভাই। কোনো স্টাফ নেই।”

“সে কি! তাহলে এই বই?”

“এ বই তো আমার দোকানের নয়।”

“তাহলে...”

“তাহলে আর কী?” ভদ্রলোক হেসে বললেন, “আপনাকে দিয়ে গেছেন যখন আপনিই রাখুন।”

“কিন্তু দাম নিলেন না যে!”

“দাম নেওয়ার হয়তো দরকার নেই ওঁর।”

“এরকম আবার হয় নাকি!”

“এ হাওড়া স্টেশান দিদি! সারাদিন কত যে আশ্চর্যের ঘটনা ঘটে তার ইয়ত্তা নেই। ওসব নিয়ে ভাববেন না, আপনাকে দিয়েছেন যখন আপনিই রেখে দিন।”

আর কথা না বাড়িয়ে ম্যাগাজিন তিনটের দাম চুকিয়ে পুরোনো বইটা নিয়ে তেরো নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে রওনা হলো সুচরিতা। ওখানেই দিয়েছে ট্রেনটা।

কুলিকে বলে মহিলা কামরায় জানালার ধারে একটা সিটও পেয়ে গেল। বাংলার লোকাল ট্রেন যে বিচিত্র সব ঘটনায় ভরপুর তা তো আপনারা সবাই জানেন। কাজেই জানালা দিয়ে বাইরে দুর্গাপুজোর শেষপর্বের প্রস্তুতি, কামরার ভিতরে হকারদের রকমারি পসরা আর মানুষের বিচিত্র সব কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে কখন যে কুমিরগঞ্জে পৌঁছে গেল ট্রেন, বোঝাও গেল না। অবশ্য এর মাঝেই ‘কুম্ভীরগঞ্জ ইতিবৃত্ত’ গোটাটা একবার পড়ে ফেলেছে সুচরিতা।

আর পাঁচটা অভিজাত পরিবারের ইতিহাসের থেকে আপাতভাবে এই গ্রন্থটি আলাদা কিছু নয়। পেনেটি থেকে সমাজদার বংশের তিন ভাই এলেন এই জলাপ্রধান জায়গায়। সে সময় নদীতে অসংখ্য কুমির! কেবল নদী কেন, বড়ো বড়ো বিলগুলোতেও কুমিরের দেখা মেলে। অল্প কিছু জেলে ধীবর শ্রেণীর মানুষ আর কয়েক ঘর চাষিদের বাস।

সমাজদারদের তিন ভাই অবনীমোহন, মনোমোহন আর রাধামোহন এসে অধিকাংশ জমিজিরেত কিনে নিয়ে তাঁদের জমিদারি স্থাপন করলেন। বিষয়বুদ্ধি ছিল বটে মনোমোহনের। এই অজ গাঁয়ে সেই সময়ে প্রায় আধুনিক মাছের আড়ত গড়ে তুলেছিলেন। তার ফলও হয়েছিল লক্ষ্মীপ্রদ। শহর থেকে ব্যবসায়ীরা এসে মাছের পাইকারি ব্যাবসা চালাত। পাশাপাশি বেশ কিছু জলা জায়গা ভরাট করে চাষবাসও চলল।

ক্রমে সমাজদার বাড়ির লক্ষ্মী ঝাঁপি বলা যায় ফুলে ফেঁপে উঠল। বড়োভাই অবনীমোহনের অবদানও বড়ো কম নয়। সম্পত্তি হলে তা কেমনভাবে রক্ষা করার দরকার হয় সেই শিল্প জানতেন তিনি ভালোই। নিজেও কুস্তিগির। গাঁয়ের ছেলেছোকরাদের নিয়ে প্রথমে কুস্তির আখড়া, আর তারপরে লাঠি খেলা শুরু করলেন। কয়েক বছরের মধ্যে অবনীমোহনের লেঠেলদের বজ্রনাদে সাধারণের হৃদকম্প হতে শুরু করল। কানাঘুষোয় শোনা যেত, অবনীর নাকি ডাকাত দল আছে। দূর দূর গাঁয়ে ধনী বাড়িতে তারা ডাকাতি করে।

এমন কানাঘুষোর অবশ্য কারণ আছে। সে সময় হঠাৎ হীরা ডাকাতের খুব নাম হয়। ত্রাস বলতে যা বোঝায় তাই। একেবারে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ডাকাতি সারে হীরা। কোথায় যে থাকে সে আর তার দলবল, কেউ জানে না। ওদিকে কোনো কোনো রাতে কুমিরগঞ্জে শক্ত পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। কুমিরগঞ্জের ছাপোষা মানুষেরা অপদেবতার ভয়ে কাঁপে সন্ধে হলেই। কাজেই রাত্তিরের সেইসব আওয়াজ পেলেও তারা বের হয় না কেউ। কেবল বংশী ধীবর একরাতে প্রকৃতির ডাকে বার হয়েছিল, সেই রাতে তখনই সেই রহস্যময় আওয়াজ ফোটে, ঝোপে লুকিয়ে বংশী কালো পোশাকে আপাদমস্তক ঢাকা বেশ কিছু ছায়ামূর্তিকে চলে যেতে দেখে। সবার পিছনে এক অশ্বারোহী। রাত্রির নিকষ অন্ধকারে যেন তার শরীর মিশে আছে। মাথা থেকে কালো পাগড়ির প্রান্ত হাওয়ায় উড়ছে। হঠাৎ ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল, মৃদুস্বরে ঘোড়াকে কিছু বলল অশ্বারোহী। এ স্বর তো চেনা বংশী ধীবরের!

বংশী ধীবর অবশ্য কথাটা কাউকে বলেনি। বংশীর বৌও তাই কাউকে বলেনি। বংশীর বুড়ো বাবাও সেজন্য হুঁকো খেতে খেতে কাউকে কিছু বলেনি, বংশীর মাও ঘাটে জল তুলতে গিয়ে তাই কাউকেই কিচ্ছুটি বলেননি। তবুও কী করে যে ডানা মেলে খবরখানা উড়ে গেল কে জানে।

অবিশ্যি গাঁয়ে গঞ্জে এমন ধারা হয়। আর গাঁ-ঘরে এমন খবরের ডানা গজানো মানে তো বোঝেনই সুজন পাঠক, এ-ঘরে ও-ঘরে খবর উড়তে উড়তে ফের যখন বংশীর কানে এল, তখনই বলা যায় বংশী জানতে পারল যে সেই আঁধার রাতে সে নাকি অবনীমোহনকে কালো আলখাল্লা পরে উড়ে যেতে দেখেছে—এমনি এমনি নয়, গজকুমিরের পিঠে চেপে! সঙ্গে তাঁর সব কুস্তি আখড়ার চেলারা। তারাও সবাই নিজের নিজের কুমিরের পিঠে চেপে উড়ছে। বোঝো!

কিন্তু তির একবার ধনুর্ছিন্ন হলে তো আর ফেরত আসার উপায় নেই। তা আর হলও না। কথাটা অবনীমোহনের কানে গেল। ভয়ে বংশীর দুই হাঁটুতে ঠকাঠকির চোটে ব্যথা হয়ে গরম তেল ডলতে হল। তারপর অবনীবাবুর চেলা যখন লাঠি হাতে গালপাট্টা গোঁফ চুমড়ে এসে হাঁক পাড়ল, রোগা পাতলা বংশীর প্রাণ-চড়াইটা ফুড়ুৎ করে উড়ে যাওয়ার জোগাড়। যাই হোক, অবনীবাবুর সঙ্গে বংশীর যে কী কথা হল, তা কেউ জানে না। কিন্তু বংশী ধীবরের অবস্থা গেল ফিরে। মাস ছয়েকের মধ্যে কপদর্কহীন বংশী ধীবরের নামে গোটা তিনেক বিলের মালিকানা তৈরি হল। 

এর পরে কী আর সুনাম আটকানো যায়? অবনীমোহনের নাম হীরা ডাকাতের সঙ্গে এক বর্গে উচ্চারিত হতে থাকল। কিন্তু এতে যা গোল পাকানোর পাকাল, কোম্পানির পেয়াদারা হাদুম হুদুম করে এসে হাজির হল একদিন।

অবিশ্যি হাজির হলেও সমাজদার বাড়ির আতিথেয়তা আর উপঢৌকনে তারা এতটাই পরিতুষ্ট হল যে গুনগুন করে গুণগান গাইতে গাইতে ফিরে গেল। অবশ্য তা ছাড়া আর উপায়ও ছিল না। কারণ, যে মুহূর্তে তারা সমাজদার বাড়ির ভিতরে ঢুকল, প্রত্যেকে একটি করে ভয়ংকর পত্র পেল যাতে তাদের পরিবার-পরিজনের ঠিকুজি কুষ্ঠী সহ সব হালহকিকত লেখা আর সেই সঙ্গে অকারণে অবনীমোহনকে হীরা ডাকাতের গরিমা আরোপ করা হলে তাদের আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা কীরকম হবে সেসব বিস্তারে লেখা। সবশেষে হীরা ডাকাতের স্বাক্ষর আর লাল কালিতে ছাপা হীরার মোহর।

কাজেই অবনীমোহনকে হীরা ডাকাতের গরিমা আর তারা দিয়ে উঠতে পারল না। মনোমোহনের আড়তের পাকা পোনা উপঢৌকন নিয়ে তারা বিদায় নিলে। যাই হোক, হীরা ডাকাত বা তার সাঙ্গপাঙ্গরা কেউই কোনোদিন আর ধরা পড়ল না।

ছোটোভাই রাধামোহনের কথায় আসি। তিনি একটু সখী ভাবের। সারাদিন পদাবলি নিয়ে থাকেন। নিজেও পদ রচনা করেন। তাঁকে নিয়ে বইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত খুব বেশি কিছু লেখেননি লেখক। কিন্তু শেষদিকটা জুড়ে কেবল তিনিই। তার কারণও আছে অবশ্য।

‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।’ সমাজদার বাড়ির উত্থান যেমন হুড়হুড়িয়ে, পতনও কিন্তু তেমনই। বই থেকে যতটুকু জানা যায়, শেষদিকে কোম্পানি আর স্বদেশী উভয়েরই কু নজরে পড়েছিলেন সমাজদাররা। অবনীর আখড়াও ততদিনে ভেঙে গেছে। দু-দু’বার থ্রম্বোসিস হওয়ায় গায়ের জোরও তলানিতে। সেই সংকটের সময় পরপর আক্রমণ চলে মনোমোহনের আড়তে আর কাছারি বাড়িতে। সেকেলে সব লেঠেলদের সাধ্যিতে কুলোয় না লুটপাট আটকানোর।

তিন ভাই কিন্তু কোনোদিনই স্বদেশী আন্দোলনের বিরোধী নন, বরং নানাভাবে মদতই দিয়ে এসেছেন এতদিন। কিন্তু এই অঞ্চলে সেই সময় যে মুরুব্বি, তার ব্যক্তি আক্রোশ ছিল অবনীমোহনের উপর। সবাইকে ভুল বুঝিয়ে সেই সমাজদারদের বিরোধী করে তোলে। ফলস্বরূপ সমাজদারদের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে দাঁড়ায়।

কথায় বলে মরা হাতির দামও লক্ষ মুদ্রা! যতই অবস্থা পড়ে আসুক, সমাজদারদের নুন খায়নি এমন লোক তো গোটা কুম্ভীরগঞ্জে নেই! সেইসব নুনগ্রাহীদেরই একজন এক পড়ন্ত বেলায় মাথায় মুখে গামছা পেঁচিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে খবর দেয়, যে আজ সমাজদারদের বসতবাড়ি লুট হবার প্ল্যান হয়েছে। আরও ভয়ের কথা যেটা, তা হল এই প্ল্যানে লুটেরাদের সঙ্গে মদত রয়েছে কোম্পানিরও। লুটেরাদের নেতা নানান দাবি উশুলের বিনিময়ে এই সওদাখানা করে এসেছে সাহেবের সঙ্গে।

ঠিক এইখানেই রাধামোহনের কেরামতি শুরু। এর বহু আগেই, লক্ষ্মীর ঝাঁপি যখন উপচে পড়েছিল, তখনই সমাজদার বাড়িতে শহর থেকে পাকা মিস্ত্রি আনিয়ে গোপন কোষাগার বানানো হয়েছে। তিন ভাই ছাড়া সে ঘরের হদিশ আর কারো জানা নাই। বড়োভাই অবনীমোহন ছোটোভাই রাধামোহনকে সেদিন আদেশ দিলেন এই গুপ্ত কোষাগারের হদিশ জানিয়ে কয়েকটা পদ রচনা করতে। উত্তরপুরুষদের মধ্যে যার মগজের জোরে কুলোবে, সে-ই খুলতে পারবে ওই কোষাগারের তালা। সেইমতো পদ বাঁধলেন রাধামোহন। কিন্তু সেই পদ যে রাখা হল কোথায় তার হদিশ আর জানাতে পারেননি লেখক। কেবল সে রাতের বিভৎস বর্ণনা দিয়ে শেষ করেছেন তাঁর ইতিহাস।

সেই রাতে কোষাগারের হদিশ না পেয়ে প্রায় অথর্ব বড়োভাই অবনীমোহনের চোখের সামনেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ছোটোভাই রাধামোহন আর মেজোভাই মনোমোহনকে। কেবল বেঁচে রইলেন অথর্ব অবনীমোহন, আর বেঁচে রইল মামার বাড়িতে থাকা মনোমোহনের দুই ছেলে আর এক মেয়ে। অবনীমোহন আর রাধামোহন বিয়ে করেননি।

অদৃষ্টের কী পরিহাস! মনোমোহনেরর ছেলেমেয়েরা যখন বাড়ি ফিরল তখন তাদের জ্যাঠামশাই অন্তিম শয্যায়। বাকরুদ্ধ হয়েছেন। কাজেই সেই কোষাগারের সংকেত যে কার হাতে উঠল কে জানে! বোধ হয় ওঠেনি। কারণ অবনীমোহনের দেহান্তরের প্রায় মাস ছয়েকের মধ্যে এক ভাই স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে হল দেশান্তরী, আর বাকি দুই ভাইবোন আড়ত আর জমিজমা বিক্রি করে বৃদ্ধ নায়েবের হাতে বাড়ির চাবি দিয়ে চলে গেল বর্ধমান।

ইতিবৃত্ত এখানেই শেষ। বইটির লেখক শ্রীযুক্ত পঞ্চানন তর্করত্ন সেই বৃদ্ধ নায়েবমশাইয়ের ভাগ্নে। মামার কাছ থেকে শুনে এই ইতিবৃত্তটি রচনা করেছিলেন।

বইটা শেষ হতে হতে কুমিরগঞ্জ স্টেশন এসে পড়ল। ট্রেন থেকে নামতে নামতে সুচরিতা ভাবছিল সময়ের অদ্ভুত ক্ষমতার কথা। যে অঞ্চলের ইতিহাস সে পড়ছিল, সেই অজ গাঁয়ে এমন রেলগাড়ি চলবে, সেকথা কি আর সেই যুগের লোকেরা স্বপ্নেও দেখতে পেত?


রাত ঘনিয়েছে বেশ। ঘড়িতে পৌনে এগারোটা। কলকাতায় এই রাত কোনো রাতই নয়। আর দুর্গাপুজোর শ্রীপঞ্চমীতে তো আর কথাই নেই।

কিন্তু কুমিরগঞ্জে এখন বেশ রাত। অল্প কয়েকজনই মাত্র ট্রেন থেকে সুচরিতার সঙ্গে নেমেছে। যে যার পথে চলেও গেছে। মোবাইলে লোকেশন অন করে দেখল সুচরিতা যে ওর ডেস্টিনেশন স্টেশন থেকে হেঁটে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। একটা রিক্সা বা ভ্যান পেলে খুব ভালো হয়। বাইরে বেরিয়ে এল সুচরিতা। স্টেশনের বাইরের বিরাটাকায় বটগাছটা আলোয় আলোয় সেজেছে। তার নীচে রিক্সা স্ট্যান্ড। দুটো রিক্সা দাঁড়িয়ে।

“এই! কে যাবেন?”

“কোথায় যাবেন?”

“সমাদ্দার পাড়া।”

“না। ওদিকটায় এখন যাব না।”

“কেন?”

“আমাদের বাড়ি ওদিকে নয় দিদি। আর ফেরার পথে ভাড়াও পাব না।”

“মানে? চলুন, একটু বেশিই না হয় নেবেন!”

“না দিদি। পুজোর দিন এমনিই একটু বেশি পাওয়া যায়। এত রাতে আর ওদিকে যাব না।”

সুচরিতা আর কথা বাড়াল না। জি.পি.এস অন করে রওনা হল।

স্টেশন পেরিয়ে প্রথম বাঁকটা পার হয়েছে এমন সময় পায়ের কাছে একটা রিক্সার চাকা এসে থামল। “সমাদ্দার পাড়ায় কোথায় যাবেন? নতুন বাড়িতে? তালেকদার বাড়ি?” একটা ভাঙচোরা রিক্সার সিটে বসে খেঁকুড়ে এক রিক্সাওয়ালা কথাগুলো বলল।

“আপনাকে তো স্ট্যান্ডে দেখলাম না!”

“আপনাকে আমি তো দেখলাম। সমাদ্দারপাড়া শুনেই বুঝলাম তালেকদারবাবুর মেয়ে। বাবার সাথে মুখের কী মিল!”

“যাবেন আপনি?”

“যাব বলেই তো এলাম দিদিমণি। উঠে পড়েন। পুজোর দিন, অচেনা পথে রাত্তির বেলা একা একা যাওয়া ঠিক নয়। সত্তুরটা টাকা দিয়েন।”

ভাড়াটা একটু বেশি মনে হলেও উঠে পড়ল সুচরিতা। প্যাডেলে চাপ দিয়েই সেই রিক্সাওয়ালা বলতে শুরু করল, “আপনার বাবারে আমার কথা বলেই চিনতে পারবে। বলবেন দামোদর নিয়ে এল আপনারে। বলবেন তো?”

আচ্ছা জ্বালা তো! “বলব।” বলে চুপ করে গেল সুচরিতা।

কলকাতার মতো একশো গজ দূরে দূরে প্যান্ডেল নেই এখানে। তবে সোজা রাস্তা বলে অনেক দূর থেকেও প্যান্ডেলের আলো চোখে পড়ে। বাঁদিকে এইমাত্র একটা মণ্ডপ পার হল। হাজার কুচির প্যান্ডেল। ঠাকুর এসে গেছে। তবে খবরের কাগজে মুখ ঢাকা। জনাকয়েক ছেলে চেয়ারে বসে। সুচরিতাকে যেন তারা দেখতেও পেল না। এমনি নিরিবিলি ম্যাড়মেড়ে হলে পুজোগণ্ডায় ভালো লাগে!

ঝিঁঝিঁর ডাক চলেছে নিজস্ব ছন্দে। একটানা এমন ডাক ভালোই লাগে।

কিন্তু রাস্তা যে আর ফুরোয় না! কী মনে হতে মোবাইলে ফের লোকেশন অন করে ম্যাপে চোখ পাতল সুচরিতা। সে কী! এ তো অন্যদিকে চলেছে! “এই থামো! থামো!”

“কী হল দিদি?”

“তুমি তো অন্য পথে চলছ!”

“কী যে বলেন দিদি! কুমিরগঞ্জে তালেকদারবাবুর বাড়ি যাবার পথ আমি চিনি না? উই তো ইস্টিশান থিকে সোজা ছাতিমতলা। সেখান থেকে বাঁদিকে তিনটে ছেড়ে চার নম্বর গলি। সেখান থেকে পেরাইমারি ইশকুলকে ডাইনে রেখে জোড়াপুকুর পার করে মিলন সমিতির মাঠ। সেখান থেকে…”

“থামো! থামো! কী বলছ? এসব মাঠ, পুকুর, ছাতিমতলা কিছুই তো আসেনি!” মোবাইলের ম্যাপ আর লোকটার কথায় মিল থাকলেও এই পথে সেসব কিছুই নেই দেখে সুচরিতা চেঁচিয়ে বলে উঠল।

“খেয়েছে! তাহলে এইদিকে ঠিক কী আছে বলেন তো দিদি।”

“মানে? তুমি নিজে দেখতে পাচ্ছ না?”

“আজ্ঞে দিদি, রাতে খুব একটা দৃষ্টি পরিষ্কার হয় না আমার। তবে ভাতের থালার মতো সব চেনা আমার। কুনো অসুবিধা নাই। আপনি বলেন না!”

প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল সুচরিতার। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বলল, “কিচ্ছু জানতে হবে না তোমার। আমি যেভাবে বলব চালাও, আর দয়া করে বকবক কোরো না।”

মুচকি হাসল রিক্সাওয়ালা। রহস্যময় গলায় বলল, “আমায় বিশ্বাস করতে পারলেন না দিদি!” তারপর আরও রহস্যময় গলায় বলল, “একটু শক্ত করে হাতলটা ধরে থাকবেন দিদি।”

বলেই মুখ নামিয়ে হ্যান্ডেলের প্রায় মুখ ঠেকিয়ে চাপা গলায় বলল, “চল দেখি পক্ষীরাজ! একা একাই উড়ে চল তো দেখি তালেকদারবাবুর বাড়ি।”

কী বলছে লোকটা! পাগল নাকি! ভাবতে ভাবতেই কী মনে হতে হাতলটা চেপে ধরল সুচরিতা। আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড একটা হ্যাঁচকা লাগল ঘাড়ে।

“সামলে দিদিভাই!” হু হু করে ঝাপটা মারা বাতাসে রিক্সাওয়ালার গলা শোনা গেল।

ওরে বেগ! গতি কাকে বলে রে দাদা! পথের ধারের আলো তখন কেবল রেখা হয়ে গেছে। সুচরিতার গোটা শরীরটাকে যেন রিক্সার সঙ্গে ঠেসে ধরেছে বাতাস। হাতল শক্ত করে চেপে কোনোরকমে সামাল দিচ্ছে। মালপত্র যে কী হচ্ছে!

“মালপত্র নিয়ে ভাববেন না দিদি। সব ঠিক থাকবে।”

চিৎকার করে বলা কথাগুলোও সুচরিতার কানে এল ক্ষীণ হয়ে। লাগেজের দিকে তাকিয়ে দেখল অবাক কাণ্ড! কখন যে সেগুলো বড়ো বড়ো ফিতে দিয়ে বাঁধা হয়ে গেছে রিক্সার সঙ্গে কে জানে!

কী হচ্ছে এসব! বিজ্ঞানের ছাত্রী সুচরিতা। ভয় কাকে বলে কোনোদিন জানে না। ভয় ও পাচ্ছে না। কিন্তু কী হচ্ছে বুঝতেও পারছে না। এ কি সম্ভব! ঝরঝরে রিক্সার এমন স্পিড! গাড়িরও তো সম্ভব নয়!

ভাবতে ভাবতেই গতি কমে এল। আস্তে আস্তে একটা গলির সামনে থেমে গেল দামোদরের রিক্সা। একগাল হেসে দামোদর বলল, “এই গলিতেই ডানদিকে তিন নম্বর বাড়ি তালেকদারবাবুর।”

সুচরিতা নেমে এসে দামোদরকে ভাড়াটা দিয়ে লাগেজ নামাতে গেলে দামোদর বলল, “কী যে করেন দিদি! আপনাকে টানতে হবে এইসব? ওরা ঠিক চলে যাবে।” বলেই সেগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “এই! সবাই নেমে সোজা তালেকদারবাবুর বাড়ি চলে যা।”

ওমা! বলার অপেক্ষা কেবল। ধাঁই-ধপর লাগেজরা নেমে গড়িয়ে গড়িয়ে চলল।

সুচরিতা অবাক হয়ে দামোদরকে কিছু একটা বলবে বলে তাকিয়ে দেখে সব ভোঁ ভাঁ! একটানা ঝিঁঝিঁর কোরাসে ভরা নির্জন গলির মোড়ে কেবল সে। আর কীসের এক লম্বা ছায়া কেবল দুলছে। দুলছে, দুলছে!

অসীম সাহসী সুচরিতার পায়ের তলার মাটি এই প্রথম যেন কেঁপে উঠল। টাল সামলাতে সামলাতে কে যেন ধরে ফেলল ওকে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলেও সুচরিতার মনে হল মোট তিনজন রয়েছে ওকে ঘিরে। পরনে বোধ হয় ধুতি আর শার্ট। কারা এরা?

“আমি অবনীমোহন সমাজদার। ইনি আমার মেজোভাই মনোমোহন, আর তোমায় যিনি ধরে আছেন তিনি আমার ছোটোভাই রাধামোহন।” গমগম করে উঠল ভদ্রলোকের কন্ঠস্বর।

অবাক হয়ে সুচরিতা তাকিয়ে দেখল, সে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট এক হলঘরে। ঘরময় মিষ্টি একটা গন্ধ। এ গন্ধ এর আগে কখনো পায়নি সে। পুরোনো দিনের রকমারি আসবাব চারদিকে। রুপোর গড়গড়া হাতে বার্মা টিকের ভারী কেদারায় বসে যিনি কথা কইছেন তাঁকে দেখলেই বেশ স্বাস্থ্যবান এবং ধনবান বলে বোধ হয়। তাঁর পাশে একটা আরামকেদারায় আধশোয়া আরো একজন। তাঁর হাতে ধরা লাল খেরোর খাতাখানা মুখটাকে ঢেকে রেখেছে। কী যেন পড়ছেন সেই খাতা থেকে আর অনবরত কর গুনে গুনে কী যেন হিসেব করে করে খাতায় বাঁধা পেনসিল দিয়ে লিখছেন।

অবনীমোহন, মনোমোহন, রাধামোহন... এই নামগুলো তো খানিক আগেই ট্রেনে বসে পড়ল সুচরিতা!

“ও-বই আমিই তোমাকে দিয়ে এসেছি মা। আমারই রচনা।” নরম আওয়াজে সুচরিতা তাকিয়ে দেখল হাওড়া স্টেশানের সেই ভদ্রলোক!

“আপনিই শ্রীযুক্ত পঞ্চানন তর্করত্ন?”

“হ্যাঁ, মা। এই সমাজদার বংশের ইতিবৃত্ত লিখেছি আমি।”

“মাথা কিনে নিয়েছ! ভণ্ড পামর কোথাকার!” ঘাড়ের কাছ থেকে বিশেষ রিনিঝিনি সুরে কথাগুলো বলে উঠলেন রাধামোহন।

“ওই দেখুন ছোটো কত্তা! আমার কী দোষ?”

“না! দোষ তোমার কেন, দোষ আমার! কোন কুক্ষণেই যে তোকে কথাগুলো বলেছিলাম রে পাঁচু!”

সুচরিতা চেয়ে দেখল, বেশ সম্ভ্রান্ত গোছের একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক কখন যেন এসে উঠেছেন। তিনিই কথাগুলো বলছেন।

“তুমি তো সব তাতেই আমার দোষ দেখো মামা!”

“দেখবই তো! কে বলেছিল রে হতভাগা ওই গুপ্ত কোষাগারের কথা তোকে লিখতে? না লিখলে কি তোকে অমন অপঘাতে মরতে হত নাকি রে ব্যাটা পাঁচু!”

সুচরিতা বুঝল, এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক হলেন নায়েবমশাই, যিনি কিনা সমাজদার বংশের ইতিবৃত্ত ভাগ্নেকে বলেছিলেন। কিন্তু তা কেমন করে সম্ভব? এঁরা সবাই কবে গত হয়েছেন! এভাবে তো কথা হতে পারে না!

“চাইলে সব হতে পারে গো, এও এক ধরনের টরেটক্কা।”

সুচরিতাকে ছেড়ে সামনে আসায় এতক্ষণে রাধামোহনকে দেখতে পেল সুচরিতা। টুকটুকে ফর্সা, শ্মশ্রু-গুম্ফহীন সাদা ধুতি আর চিকনের পাঞ্জাবি, কাঁধে শাল। বেশ সুন্দর দেখতে।

“আহ্, রাধা! চুপ করো তো! এইসব ধাঁধা ভেদ করবার অনেক সময় ও পরে পাবে। কিন্তু আমাদের হাতে সময় আর বেশি নেই। কাজেই কাজের কথায় এসো। বড়দা, তুমিই বলো।” আরামকেদারা থেকে মাথাটা একটু তুলে মনোমোহন কথাগুলো বলে ফের লাল খেরোর খাতাটায় ডুবে গেলেন।

“বেশ। আমিই বলছি।” সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে অবনীমোহন তাঁর ভরাট গলায় বলতে থাকলেন, “শোনো মেয়ে। এই পাঁচু না লিখলেও এই সমস্যা যে আসত না, তা নয়। তবে ও লিখে সেই ঝঞ্ঝাটে আরো প্যালা দিয়েছে বলা যায়। তবে লিখেছে বলেই আমায় অন্তত বেশি কথা বলতে হবে না। কথা বলতে এখন এখানে বেশ কষ্ট হয়। সে যাই হোক, পাঁচুর বইয়ে তো পড়েছ আমাদের গুপ্ত কোষাগারের কথা। এও জেনেছ যে তার হদিশ আমি দিয়ে যেতে পারিনি। আসলে তার হদিশ লেখা ছিল কয়েকটা পদে। রাধাই লিখেছিল। আমি বলতে না পারলেও সে লেখা তো আর উবে যায়নি! সে রাতে যারা লুট করতে এসেছিল তাদের যে নেতা, সেই সরল সাঁপুইয়ের হাতে সেই লেখা পড়ে...”

“কিচ্ছু বুঝতে পারেনি। হুঁ হুঁ বাবা! রাধামোহনের হেঁয়ালির পদ পড়ে বুঝবে ওই সাঁপুই! ছোঃ!” রাধামোহন বলে উঠলেন।

খানিক বিরক্তির দৃষ্টিতে সেদিকটায় দেখে অবনীমোহন বলতে শুরু করলেন, “কিছু বুঝতে না পেরে ও আমার দুই ভাইকে খুন করল। কিন্তু সেই সংকেত লেখা কাগজ নিয়ে গেল নিজের সঙ্গে। সেই কাগজ এখন তার বংশধর দুর্জন সাঁপুইয়ের হাতে পড়েছে। বংশের মান রেখে সেও যথারীতি বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠেছে। বরং বলা যায় আরো খারাপ হয়ে উঠেছে। শুনেছি তো সে আবার পদবি বদলেছে। সিং না সিংহ কী একটা পদবি নিয়েছে যেন। আমি চাই আমাদের সঞ্চিত ধনরাশি তোমাদের হাতে পড়ুক। সংকেতের পাঠোদ্ধার করে গুপ্ত কোষাগার যদি-বা সে খুলে ফেলে, তবুও সিন্দুকের চাবি ছাড়া সে কিছুই পাবে না। সেই চাবি তোমাকেই আজ দেব। কই, হাতটা বাড়াও দেখি।”

সুচরিতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাত বাড়াল। অবনীমোহন চাবি দিলেন। তাঁকে প্রণাম করে, মনোমোহনকেও প্রণাম করে পকেটে চাবিটা ঢুকিয়ে রাধামোহনের কাছে গিয়ে বলল, “ওই হেঁয়ালিটা কি পেতে পারি দাদামশাই?”

সুচরিতার থুতনিটা একটু নেড়ে দিয়ে রাধামোহন বললেন, “মাগো মা! দাদামশাই বললে, আর হেঁয়ালি পাবে না! দাঁড়াও।” এই বলে পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে একটা ভাঁজ করা লালচে কাগজ বার করে সুচরিতার হাতে দিয়ে বললেন, “এই নাও। এটা ছিল আমার কপি। তোমায় দিলাম। হাতের মুঠোয় শক্ত করে রাখো, হারিয়ো না কিন্তু।”

সুচরিতা কাগজটা খুলল। লালচে হয়ে আসা হলদে কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লেখাঃ

হরে কৃষ্ণ নাম দিল প্রিয় বলরাম

রাখাল রাজা নাম দিল ভক্ত শ্রীদাম।।

কৃষ্ণ রাধা দুইজনায় আনন্দেরই যোগ

হরি বলে দাও গো সবে দোঁহে মোহন ভোগ।।

গুণী লেখেন জ্ঞানী জানেন কৃষ্ণ রাধা সার

কেমনে পার হতে হবে ধন পারাবার।।

আছেন দেব আছেন দেবী কীসের অসুখ?

উন্মুক্ত রাখিও সদা আপন গৃহের মুখ।।

দিক দক্ষিণ রাজা জেনো সুখের হাওয়া বয়

কৃষ্ণ ভজে গাঁথো যদি সুখের দেওয়াল হয়।।

জয় কৃষ্ণ জয় কৃষ্ণ শ্রী মধুসূদন

বুকে লইয়া তেয়াজিব শ্বাস কৃষ্ণ চিত্রে মন।।

শ্যাম বাঁশির ধ্বনি শুনি ধন্য চরাচর

বামে রহি রাই আমি দক্ষিণে দোসর।।

রাই কমলে কোমল মাণিক হৃদি শ্যামরাই

হরি ধন সাথে আছে নাই কোনো চাপ নাই।।

হরি দিলেই সব মেলে না দিলেও ভালো

হরি বিনে জগৎ মরু সকল দুয়ার কালো।।

হৃদয় খুলে নাম করো শ্রীরাধে শ্যাম রাই

কৃষ্ণ কৃপা বরষিলে দুঃখ যাবে ভাই।।

কৃষ্ণধন চাবিকাঠি যে পায় ঠিকানা

ধন্য ধন্য সেই জন সরস্বতীর বীণা।।

সুকাজে লাগিবে রতন কৃষ্ণ চাহেন তাই

ভণিছেন রাধামোহন হরি বলো ভাই।।


গোটা পদটা বার তিনেক পড়ল সুচরিতা। তারপর পকেট থেকে মোবাইল বের করে স্ক্যান করে নিয়ে কাগজটা ফেরত দিল রাধামোহনকে। তাতে বেশ খানিক এদিক ওদিক নড়েচড়ে রাধামোহন বললেন, “ওমা! এ তো তোমারই!”

“আমার কাছেও তো সফট কপি রইল। বললেন যে আপনারা, দুর্জন সাঁপুইয়ের কথা, ও তো নিশ্চয়ই এরকম কিছু একটার খোঁজে থাকবেই। এই কাগজটা হাতিয়ে নিতেও পারে আমাদের কাছে থাকলে। এটা তাই আপনার কাছেই থাক। তাহলে তো প্রয়োজন হলে আবার পাওয়া যাবে। তাই না? আপনার থেকে নিয়ে যাওয়ার সাধ্য আশা করি ওর নেই!”

সুচরিতার কথা শুনে মনোমোহন এমন গলায় ‘বাহ্!’ বলে উঠলেন, যে বেশ মালুম হল তিনি বেজায় তুষ্ট হয়েছেন। আর রাধামোহনের মুখে হাসি তো আর ধরেই না। কেবল ‘সরস্বতীর বীণা, সরস্বতীর বীণা’ বলে লাফাতে থাকেন।

অবনীমোহন তখন গড়গড়ার নলটা মুখ থেকে নামিয়ে কথার ফাঁকে ফাঁকে অম্বুরীর গন্ধমাখা ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “আজ আমরা আসি দিদি। সাবধানে থেকো। প্রয়োজনে স্মরণ কোরো আমাদের।”

বলতে বলতেই সেই গন্ধ, সেই আসবাব, ধুতি, পাঞ্জাবি, আরামকেদারা, তিন ভাই—সব্বাই কেমন সূর্যের তাপে তেতে ওঠা রাস্তার থেকে ওঠা ভাপের মতন দুলে দুলে গলে গিয়ে মিশে গেলেন অন্ধকারে।

গাঢ় ঘুম ছেয়ে এল সুচরিতার চোখেও। চোখ টেনে কোনোরকমে তাকিয়ে দেখল দাঁড়িয়ে আছে একটা বাড়ির দরজায়। সমস্ত জোর একত্রিত করে কোনোরকমে ধাক্কা দিল দরজাটায়। তারপর লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।


***


কুমিরগঞ্জ একতা সংঘের পুজোয় নাকি এবার মারকাটারি ভিড়। একতা সংঘ আর আমরা ক’জনের মধ্যে চিরকালীন খিটিমিটি। ফুটবল হোক চাই ক্রিকেট, তাস হোক চাই দাবা—যে-কোনো খেলায় এই গঞ্জেও একেবারে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানী মেজাজ! এরা জলসা করে তো ওরা করে অষ্টপ্রহর নামগান। তারস্বরে দু-ক্লাবেরই মাইক বাজে গাঁয়ের দু-কোণ থেকে। টাইট অবস্থা তখন। মায়েদের রাগ বেড়ে যায়। ধপাধপ কিল পড়ে ছোটোদের পিঠে। টপাটপ ঢিল পড়ে দুই ক্লাবের টিনের চালায়। টকাটক টেলিফোন ঠুকে থানা থেকে পুলিশ ডেকে তখন কোনোমতে হট্টগোল সামলান পত্রঘন ঘনশ্যাম ঘোষাল। পত্রঘন কিন্তু এ অঞ্চলের পঞ্চায়েত প্রধান এমনকি সদস্যও নন। জমিদার বা হেডমাস্টারও নন। তিনি কেবল ঘনশ্যাম। সম্পন্ন গৃহস্থ ঘোষাল বাড়ির মেজো ছেলে দফতরে দফতরে ঘন ঘন চিঠি লেখা, ফোন করা তাঁর হবি। লোকে তাঁকে সেজন্য পত্রঘন বলে ডাকে। তাতে অবশ্য তিনি চটেন না। মানুষের আসল পরিচয় তার কাজে। তাঁর এই পত্র লেখার অভ্যাস যে পরিচিত হয়ে নামের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে, এতে তিনি বরং গর্ব বোধ করতেন।

যে কথা বলছিলাম। একতা সংঘের পুজোয় নাকি এবার মারকাটারি ভিড়! হবে নাই বা কেন? দৈবে পাওয়া ওষুধ যেমন মিরাক্যুলাস ফল দেয়, তেমনি দৈবে পাওয়া অসুরও তো দেবে, নাকি? বুঝলেন না বোধ হয়? আচ্ছা বেশ, একটু খোলসা করেই না হয় বলি। ব্যাপারটা কিন্তু উলটো হওয়ারই কথা ছিল। মানে আমরা ক’জনের ভিড় বেশি হওয়ার কথা। কেন? আরে এবছর ওরা প্যান্ডেল যা করার সে তো করেইছে, মহালয়ার দিন রেডিওতে ‘রূপং দেহি জয়ং দেহি’-র রেশ তখনও মেলায়নি, টোটোর পর টোটো সাজিয়ে গুছিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চোঙা দেগে দেগে প্রচার চালিয়েছে যে, ওদের এবার মণ্ডপে থাকছেন জীবন্ত দুর্গা! যে-সে দুর্গা নন, যাত্রা জগতের মুকুটধারী মালকিন মিস সুগন্ধা! ব্যস! চারদিকের আলোচনায় শুধুই আমরা ক’জন আর মিস সুগন্ধা।

গন্ধরাজ গাঙ্গুলী হলেন একতা সংঘের প্রেসিডেন্ট কাম প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাঁর তো রাগে গাল-টাল একেবারে লাল তেলাকুচো! জরুরি মিটিং ডেকে হম্বিতম্বি করেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না। লাল চা, সাদা চা পরপর উড়ে যাচ্ছে—কিস্যু হচ্ছে না। এখানে ফোন, সেখানে ফোন—লাভ লবডঙ্কা! সব বুক হয়ে রয়েছে। সত্যি ব্যাপারখানা চেপে রেখে মোক্ষম চাল চেলেছে বটে আমরা ক’জন। এই যে হেরে যাওয়ার গন্ধ, তাতেই গন্ধরাজবাবুর লাল অবস্থা। সব আশা যখন প্রায় শেষ, এমন সময় এক মূর্তিমান মুস্টান্ডা মোচ মুচড়ে হাতে ধরা তেল চুকচুকে এক বংশদণ্ড মেঝেয় ঠুকে গন্ধরাজের সামনে হাজির হলে।

গণ্ডারকে গেঞ্জি আর প্যান্ট পরালে যেমন লাগার কথা, লোকটা ঠিক তেমনি। হাতার ফাঁক দিয়ে, গলায় গেঞ্জির উপর দিয়ে বুনো শনের মতো লোম বের হয়ে আছে। গেঞ্জির উপর দিয়েই মোটা মোটা পেশি মালুম হচ্ছে। আর গোঁফ! এমন গালপাট্টা কুমিরগঞ্জ কেন, কলকাতার লোকজনও খুব বেশি দেখেছে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। তার উপর ডান গালের উপর দিকে চোখের নীচে পৌনে এক ইঞ্চি ছেড়ে শুঁয়োপোকার মতো এক জড়ুল! সে দামামা এসে হাজির হতেই ভয়ের চোটে প্রধান উপদেষ্টা অশীতিপর লাবণ্য লাহার হাত থেকে মুড়ির বাটি আর গাল থেকে বাঁধানো দাতের পাটি ঠকাস ঠন ঠন করে খসে পড়ল।

কিন্তু সেই দশাসই দ্য গ্রেট যেই না মুখ খুলল অমনি চিত্তির। মনে হল কোত্থেকে যেন একশো কাঠবেড়ালি ক্যাঁ ক্যাঁ জুড়ল। ফিচকে ফক্কড় ফণী মিত্তির ফ্যাকফেকিয়ে হেসে উঠতেই সব গোলমাল। সে দশাসই তো মুহূর্তে ফণীর ঘেঁটি ধরে টাঙিয়ে দিয়েছে শূন্যে। সেই না দেখে ক্লাব সেক্রেটারি লাবণ্য লাহার বাড়িতে গিন্নির শাড়ি শুকোতে দেওয়ার কথা, ক্যাশিয়ার পাঁচু মোক্তারের নখ কাটার কথা, পুজো কমিটির আহ্বায়ক শশাঙ্ক সান্যালের প্রেশারের বড়ির কথা তড়াক করে মনে পড়ে গেছে। তাঁরা তো ‘আসি হে’ বলে বাড়ি যাবেন বলে দাঁড়িয়েই পড়েছেন, আর সব মেম্বার-টেম্বাররাও ভয়ে মুখ ভেচকে, এমন সময় গন্ধরাজ গাঙ্গুলী তাঁর পেটেন্ট বাজখাঁই গলায় দিলেন এক রাম ধমক! অমনি সেই ভীমের হাত থেকে ফণী মিত্তির টুস করে খসে পড়েই হামাগুড়ি দিয়ে এসে বসলেন গন্ধরাজের পাশের মোড়ায়।

তখন তো সবার সাহস আবার ফেরত এসেছে। কাজেই এ বলে ‘এই’ তো সে বলে ‘হেই’।

গন্ধরাজ ফের ধমকে উঠে বলেলেন, “থামো সব! খাঁচার দৌড় সবার আমার জানা হয়ে গেছে। এখন এই বিন্ধ্যপর্বত কোন কাজে উদয় হলেন সেটা আগে জানতে দাও।” বলেই সেই মুস্টান্ডার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললেন, “বলো তো বাবু জাম্বুবান, কী জন্য এসেছ এ ঘোর কান্তারে? আমরা ক’জনের প্রেসিডেন্ট ন্যাড়া নকুল নস্কর তোমায় পাঠিয়েছে, তাই না? ঠিক বুঝেছি আমি, এইসব ওই বেটা বেল্লিক নকুলের কাজ। ভেবেছে এই জাম্বুবানকে দেখে আমরা ভয়ে ভিরমি খেয়ে হার মানব! কিন্তু না! বন্ধুগণ, এই গন্ধরাজের শরীর জুড়ে বিপ্লবীদের গন্ধ। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী!”

“আজ্ঞে না।” চিঁ চিঁ রবে বলে উঠল জাম্বুবান, “আজ্ঞে না। কেউ পাঠায়নি। আমি নিজেই এসেছি আপনাদের কাছে।”

গলা খাঁকরে পাঁচু মোক্তার তখন বললেন, “তা কী মনে করে এসেছ? মা দুগগার অসুর হবে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি জীবন্ত অসুর সাজি।” সেই চিঁ চিঁ ভীম নাকি জাম্বুবান বলে উঠল।

“আরি ল্লে!” গন্ধরাজ হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলেন। তারপর চোখ উলটে ‘মা মা! তুমি আছো! তুমি আছো!’ বলতে বলতে সেই ভীম নাকি জাম্বুবানের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “এই ভাই, তুমি সত্যি অসুর সাজো?”

“আজ্ঞে সাজি তো!”

“বা! বা! বা! তা কত টাকাপয়সা নাও?”

“সে যে যা খুশি হয়ে দেয়। পাঁচ, দশ, পনেরো।”

“না না। অত কম দিয়ে তোমায় ঠকাবো না। তোমাকে আমরা দৈনিক পাঁচশো টাকা দেব। চলবে?”

নিমপাতার পাচন খাওয়া হাসি ঝুলিয়ে সেই ভীম বলল, “আজ্ঞে আমি তো হাজারে বলেছিলাম।”

“কী! মামাবাড়ি পেয়েছ? এই অজ পাড়া গাঁয়ে অসুর সেজে পাঁচ হাজার, দশ হাজার! হরির নাম খাবলা খাবলা?” নকুল নস্কর মোড়া থেকে লাফ দিয়ে বললেন।

ভীমের পেশি ফের শক্ত হচ্ছিল। সেই দেখে গন্ধরাজ বললেন, “সবাই চুপ!”

তারপর ভীমের দিকে ফিরে বললেন, “বেশ। আর দু’শো বাড়ালাম। দৈনিক ওই সাতশোতেই রফা হল। তা তোমার আর সব লোক কোথায়? মা দুগগা, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ সব কই?”

“আজ্ঞে সেসব তো আমার নেই।”

“নেই মানে? এখানে এয়েচো কি তা’লে চ্যাংড়ামো করতে?” তড়াক করে বেঞ্চি থেকে লাফিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ বনমালী বাঁড়ুজ্যে। ঠিক লাফিয়ে উঠলেন না, ওঠার চেষ্টা করে লুঙ্গির খুঁট নখে আটকে হুড়মুড়িয়ে পড়লেন নীচে বসা ছোকরাদের ঘাড়ে। তাদের একজন কিনা আবার সবে ঠোঁটে চায়ের ভাঁড় ছুঁইয়েছিল, সে তো রিফ্লেক্স অ্যাকশনে রেগেমেগে না বুঝেই একটা কটু কথা বলে বসেছে। শুধু কি তাই? সেই চায়ের ভাঁড় থেকে গরম চা ছিটকে লেগেছে পেঁচোবাবুর মুখে। আর যায় কোথায়! পেঁচার থেকে পাঁচশো গুণ কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে উঠেছেন পেঁচোবাবু। সেই চেঁচানিতে তিতিবিরক্ত হরি হোমিওপ্যাথ টেবিল ভেবে পাশের তিনু তরফদারের ঊরুতে টেনে এক চাপড় লাগিয়ে বসেছেন। এর চেঁচানি, ওর ধমকানি, তার আর্তনাদ—সব মিলে একেবারে কমপ্লিট প্যান্ডিমোনিয়াম!

তাতে অবিশ্যি একটু লাভই হয়েছে। নইলে সে ভীমের রাগ থামানো যেত কি না কে জানে? গন্ধরাজ গাঙ্গুলী আবার বেশিক্ষণ চেঁচামেচি সইতে পারেন না। হোক ক্লাবের মিটিং, তবুও প্রিসাইড করতে বসলেই তাঁর হাতে থাকে একটা কাঠের হাতুড়ি। সেই হাতুড়ি টেবিলে ঠুকে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “অর্ডার! অর্ডার!”

হইচই ফেড আউট হয়ে শেষে থেমে গেল। গন্ধরাজ ভীমের দিকে ফিরে বললেন, “বাপু, তুমি আফবল নম্বরের অসুর যে হতে পারো সেকথা মানচি। কিন্তু পারিশ্রমিক যা চাইছ, সে আমাদের মতো ক্লাবের পক্ষে বড্ড বেশি। তাছাড়া ভাবো, আমাদের আলাদা করে আবার মা দুগগা আর তাঁর সন্তানদের ব্যবস্থা করতে হবে, তাঁদের বাহন-টাহন—সব মিলিয়ে দেদার খরচ!”

“আমরা ক’জনেই তা হলে যাই।” চিঁ চিঁ করে বলে উঠল সেই ভীম নাকি জাম্বুবান, “ওঁরা তো চারদিনে পুরো টিমকে পঁচিশ দিচ্ছেন। তার মানে এক-একজনের সেই হিসাবে পাঁচ। আমি তো অনেক কমই বলেছি সে তুলনায়। ভেবে দেখেন, নইলে চললাম।”

“চললাম মানে? বললেই কি চলা যায় নাকি?” কপট ধমকের স্বরে বললেন গন্ধরাজ, “এসেই যখন পড়েছ তখন ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। ওই তোমার কথাই থাকল।” বলেই সেক্রেটারি আর আহ্বায়কের দিকে চেয়ে বললেন, “আধঘণ্টার মধ্যে নিজেরা মিলেমিশে পাড়ার ভিতরে যেখান থেকে পারো দুর্গা মা আর তাঁর সন্তানদের খুঁজে বার করো। মনে রেখো, আধঘণ্টা মানে কিন্তু আমি আধঘণ্টাই বুঝি।”

তারপর আর কী—হইহই, গুজগুজ, ফিসফাস চলল। এই প্রস্তাব, সেই নাকচ হয়ে-টয়ে শেষমেশ একটা লিস্টি খাড়া হল। সেই মেনে ধরে ধরে ফোন-টোন করে কার্তিক, গণেশ, মা লক্ষ্মী নির্ধারণ হয়ে গেলেও মা দুর্গা আর মা সরস্বতীকে কিন্তু কিছুতেই পাওয়া গেল না।

গন্ধরাজ এতক্ষণ একমনে বসে মুড়ি চিবোতে চিবোতে আমরা ক’জন আর ন্যাড়া নকুল নস্করের হার কল্পনা করে মনে মনে খুশি হচ্ছিলেন। বেখেয়ালে কাঁচালঙ্কা কচকচিয়েই হেইক হেইক হিক্কা তুলতে শুরু করলেন। তার মধ্যেই এই অপ্রাপ্তি সংবাদে মেজাজ আরো বোমকে গেল। খসখস করে প্যাডে কী একটা লিখে ভাঁজ করে হিক্কাস্তব্ধ গলায় হোঁচট খেতে খেতে যা বললেন তার মানে গিয়ে দাঁড়াল যে, সেক্রেটারি লাবণ্য লাহাকে এক্ষুনি গন্ধরাজের বাড়িতে গিয়ে চিঠিটা গিন্নিমাকে দিয়ে বসে থেকে উত্তর আনতে হবে। এরা সবাই গন্ধরাজবাবুর একনিষ্ঠ, কাজেই মুহূর্তে দরজা টপকে চলে গেলেন ভিতর ঘরে। ও হ্যাঁ, একটা দরকারি কথা এতক্ষণ বলা হয়নি, এইবার ঝোপ বুঝে বলেই দিই, গন্ধরাজবাবুর এই একচ্ছত্র আধিপত্যের কিন্তু একটা শক্তপোক্ত কারণ আছে। একেবারে বাইরের ঘরখানি তিনি আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকার শর্তে একতা সংঘকে দান করেছিলেন।

সে যাই হোক, লাবণ্য তো ভিতরে গিয়ে দেখল গিন্নিমা বেতের ঝুড়িতে ঘষে ঘষে কাচকি মাছের আঁশ ছাড়ানোর তদারকি করছেন। সেই দেখে চিঠি হাতে মোড়ায় বসলেন।

গিন্নিমাও তাকে দেখে, “কী ব্যাপার? আবার চা?” বলে এগিয়ে আসতেই লাবণ্যর কেন জানি গলাটা দুরদুর করতে লাগল। গিন্নিমার হাতের গুলি লাবণ্যর গলার থেকেও মোটা। চোখের দৃষ্টিও যাকে বলে একেবারে তিরের মতন তীক্ষ্ণ। শুকনো গলায় বললেন, “আজ্ঞে চিঠি।”

“চিঠি? কই, দেখি!”

হাত বাড়িয়ে চিঠিখানা নিয়ে চোখ বুলিয়েই একবার এমন দৃষ্টি দিলেন যে লাবণ্য উঠে দাঁড়ালেন।

“বোসো। উত্তরখানা নিয়ে যাও।” বলে ভিতরে গিয়েই খানিকক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে এসে সেই চিঠিটাই হাতে দিয়ে বললেন, “এবার যাও, আর তাঁকে দাও।”

সুড়সুড় করে সরে পরেই ক্লাবে ঢুকে শ্বাস ছাড়লেন লাবণ্য। ততক্ষণে গন্ধরাজের হিক্কা থেমেছে। বললেন, “কী হল? চিঠি দিয়েছ?”

“আজ্ঞে উত্তরও এনেছি।”

“কই, দেখি!”

লাবণ্যর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে পড়েই গন্ধরাজ গুম হয়ে গেলেন। ফণী মিত্তির টুকি দিয়ে দেখলেন, তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে, ‘ভীমরতি ধরেছে! মরণ!’

দেখেই ফিক করে হেসে উঠলেন। আর অমনি চোখে ভিসুভিয়াস জ্বেলে গন্ধরাজ গাঙ্গুলী চাইলেন তাঁর দিকে, আর তারপর উঠে চেয়ারের পাশ থেকে ছড়িখানা নিয়ে ঢুকে পড়লেন ভিতরে।

তারপর ঝনঝন, ঠনঠন, ধুপধাপ, ক্যাঁচকোঁচ এই সব আবহ সঙ্গীতে মিনিট দশেক পার হল। শেষমেশ ছড়ি নিয়ে যখন গন্ধরাজ ফিরে এলেন তখন তার কপাল থেকে ঘাম ড্রপ খাচ্ছে মাটিতে।

“যাক, দুর্গা স্থির হল। তোমাদের গিন্নিমা।” গন্ধরাজ গাঙ্গুলী কেদারায় বসে বললেন।

“রাজি হলেন গিন্নিমা?” লাবণ্য লাহার গলায় জিজ্ঞাসার চেয়েও যেন সংশয় বেশি।

“হবেন না মানে! আমি গন্ধরাজ গাঙ্গুলী...”

“কী?” দরজার গোড়ায় গিন্নিমার বাজখাঁই গলা!

“বলছি আমি গন্ধরাজ গাঙ্গুলী,” গলা যতটা পারা যায় লো স্কেলে নামিয়ে, আঁজলা পরিমাণ গদগদ বিনয় মাখিয়ে বললেন, “গিয়ে অনুরোধ করলাম বলেই তোমাদের গিন্নিমা রাজি হলেন।”

“পাঁচ মিনিট!”

গিন্নিমার একটা একটা আওয়াজ আসে আর গন্ধরাজ চমকে ওঠেন। লাবণ্যর পেট গুলিয়ে ওঠে আর ফিচকে ফক্কড় ফণী মিত্তিরের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফোটে।

“হ্যাঁ, ওই পাঁচ মিনিট। মানে পাঁচ মিনিট করে দর্শন, তারপর পাঁচ মিনিটের বিরতি। এমনি করে রোজ দু-ঘণ্টা। সাতটা থেকে ন’টা। এছাড়া কোনো শর্তে দুর্গা রাজি নন।” গন্ধরাজ বললেন।

লাবণ্য তো তো করে কী বলতে যাচ্ছিলেন, গন্ধরাজ জমে থাকা অবদমন একেবারে ব্যারেন আইল্যান্ডের ক্রেটার ফাটিয়ে বার করলেন, “চোওপ! আমার ওপর কোনো কথা নয়! পাঁচ মিনিট তো পাঁচ মিনিট!”

চিঁ চিঁ ভীম এতক্ষণ একমনে চপ মুড়ি সাঁটাচ্ছিল, সেও এবার মুখ তুলে বলল, “সেই ভালো। পাঁচ মিনিট।”

“পাস! পাস! পাস!” হাতুড়ির বাড়ি তিনবার ঠুকে সিদ্ধান্ত পাস করিয়ে নিলেন গন্ধরাজ। একেবারে পাকা কাজ।

“তাহলে বাবু, আমার ওই সাতশোই স্থির হল তো?” চিঁ চিঁ ভীম বললে।

“না! পাঁচশো!” ভিতর থেকে ঝাঁঝি মেখে উত্তর এল।

গিন্নিমার ঝাঁঝিতে সেই দামড়া অসুরেরও মোচ তিড়তিড়িয়ে উঠল। গালের জরুল কুঁচকিয়ে টুচকিয়ে সে বলল, “তাই সই। মা জননী যা বলেন।”

“তাহলে তো হয়েই গেল।” মোক্তার বলে উঠলেন, “তাহলে মিটিং শেষ তো?”

“বোসো!” কড়া গলায় বললেন গন্ধরাজ, “এখনো মা সরস্বতী বাকি। হাতে কেবল আজ আর কাল। তাছাড়া আর সব ব্যবস্থা আছে, লোকজনকে জানানো আছে... যাই বললেই হল? সেইসব প্ল্যান করো। আমি একটু তোমাদের জলখাবারের ব্যবস্থা দেখি।”

এই কথা শোনার পর আর কেউ যাওয়ার নাম করে? গুছিয়ে বসল সবাই। ফের গুনগুন হইহই শুরু হয়ে গেল।

ঘরে যাবার সময় কী মনে হতে গন্ধরাজ সেই চিঁ চিঁ ভীমকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ও হো! বাপু তোমার নামটাই তো জানা হল না। কী নাম তোমার?”

ঘরময় হইহইয়ের মধ্যে চিঁ চিঁ ভীমের গলা দমে, বসে যেটুকু কানে এল তাতে গন্ধরাজের মনে হল যেন সে বলছে দুর্বল সিংহ।

“কী নাম বললে? দুর্বল সিংহ?”

গাগরা বাঘের মতো জোয়ানের নাম দুর্বল, তায় তার পদবি সিংহ শুনে ঘর ফেটে পড়ল হাসিতে। সেই চিঁ চিঁ ভীম দুর্বল সিংহ তাতে দু-পাশে মাথা নাড়িয়েও হঠাৎ কী যেন ভেবে কেমন একটা রহস্যময় হাসিতে মুখখানা একেবারে ভরিয়ে ফেলল।

***


সুচরিতার ঘুম ভাঙতেই দেখল বিছানার পাশে মা বসে আছেন। মা যে কত আপনার এতদিন পর মায়ের কাছে শুয়ে বেশ মালুম হল। কাত হয়ে একটু এগিয়েই উঠে পড়ল মায়ের কোলে। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কিছুই বললেন না অনেকক্ষণ। মায়েদের অবশ্য কিছু বলতেও হয় না। মায়ের ভালোবাসা অমনিই বোঝা যায়।

আদর খেতে খেতেই হাতটা এদিক ওদিক নাড়ছিল সুচরিতা। এ ওর ছোট্টবেলার অভ্যাস। মা আদর করলেই চোখ বুজে আদর খায় আর হাতদুটো নাড়ে। হাতটা পকেটে ঠেকতে কী যেন অনুভব করে পকেটে হাতটা পুরে কী মনে হতেই ধড়মড় করে উঠে বসল সুচরিতা। উৎকণ্ঠা মেশানো গলায় মাকে জিজ্ঞেস করল, “আমায় কালকে কোথায় পেলে মা? আমি কি বাড়ি আসতে পেরেছিলাম? আমার জিনিসপত্র?”

মা ওকে শান্ত করতে করতে বললেন, “বাড়িতে তো আসতে পেরেছিলি, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে নয়। রাতে দরজায় একটা আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দেখি তুই দরজার পাশে লুটিয়ে আছিস। ভাব তো মনের কী অবস্থা হয়! সবতাতে জেদ তোর! কেন? একটা খবর দিয়ে আসা যেত না? বাবা স্টেশানে চলে যেত! ভাব তো রাস্তার মাঝখানে যদি এমন অসুস্থ হতিস! আমি আর তোর বাবা কাল সারারাত শুধু তাই ভেবেছি। কী যে একটা ফাঁড়া গেল না!”

মাকে আর একটু জড়িয়ে সুচরিতা বলল, “তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে এসেছিলাম গো। কিন্তু এতকিছু হল যে নিজেই সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম।”

“কী হয়েছিল রে?”

“সব বলব, আগে একটু ফ্রেশ হয়ে আসি? ততক্ষণ তুমি এটা রাখো তো।” বলে মায়ের হাতে পকেট থেকে বের করে চাবিটা দিয়ে বলল, “ওয়াশরুমটা কোথায় গো মা?”

“এটা কীসের চাবি? তোর লাগেজের তো মনে হচ্ছে না। হস্টেলের? তাও তো...”

প্রত্যুত্তরে মায়ের দিকে হাতজোড় করে যে ইশারাটা করল সুচরিতা, তার মানে দাঁড়ায়, ‘প্লিজ! সব বলব পরে। আগে ঘুরে আসি।’

হেসে মেয়েকে বাথরুমটা দেখিয়ে দিয়ে ফের বিছানায় বসে চাবিটা দেখছিলেন সুনেত্রা। বেশ বড়ো। সোনালি রঙটা নকল বলে তো মনে হচ্ছে না। চাবিটার গায়ে ছোটো ছোটো পাথর দিয়ে ডিজাইন করা আছে। কী মনে হতে উঠে গিয়ে সেলাইয়ের বাক্সটা এনে সেখান থেকে আতশকাচটা বার করে নীচের পাথরটার দিকে তাকালেন সুনেত্রা। সত্যি তো, পাথরটার নীচে কী যেন সব লেখা! কী লেখা? আতশকাচেও ভালো বোঝা যাচ্ছে না, এত খুদে খুদে লেখা।

“দাঁড়াও, আমি দেখছি।”

মেয়ের গলা পেয়ে সুনেত্রা বললেন, “কীসের চাবি রে?”

“স্বপ্নে পাওয়া মা।” বলে মায়ের হাত থেকে আতশকাচটা নিয়ে চাবিটা ভালো করে দেখতে লাগল সুচরিতা। তারপর মোবাইলটা নিয়ে আতশকাচের উপর দিয়েই খিচিক করে ছবি তুলল একটা। ছবিটা নিয়ে দু-আঙুলে একটু খেলা করেই মাকে ফোনটা দিয়ে বলল, “দেখো এবার কী লেখা আছে।”

সুনেত্রা দেখলেন, ছবিটাকে জুম করে নিয়েছে মেয়ে। বুদ্ধি আছে বটে ঘটে। বেশ স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে কথাগুলো। চাবির গায়ে বাঁকা বাঁকা অক্ষরে আড়াআড়ি লেখা আছে ‘মা লক্ষ্মীর চাবিকাঠি’।

“এসব কী রে?”

“দেখলে তো মা লক্ষ্মীর চাবিকাঠি। তুমি তো বুদ্ধিমতী মা! বুঝতেই পারছ।”

“এই গুপ্তধনের চাবি তুই পেলি কোথায়?”

মায়ের মুখের সামনে গুছিয়ে বসল মেয়ে। বলল, “বলছি তোমায় সব, মন দিয়ে শোনো।”

হঠাৎ কী মনে হতে সুনেত্রা বললেন, “দাঁড়া। আগে তোর খাবারটা নিয়ে আসি।”

“পরে হবে সেসব, আগে শোনোই না!”

“উঁহু। আগে খাওয়া। সারারাতে তোমার সাড় ছিল না। আগে খাও, পরে মা তোমার কথা শুনব।”

বাবার গলা পেয়ে তাকিয়ে বাবাকে দেখেই সুচরিতা ফ্যাক করে হেসে ফেলে বলল, “বাবা! তুমি তো পুরো বদলে গেছ! ধুতি-ফতুয়ায় তোমাকে দেখব, ভাবিনি।”

“যেখানে যেমনি রে মা। তবে এখানে কিন্তু আমরা বেশ আছি।”

“সে অবশ্য তোমাদের দেখে বোঝাই যাচ্ছে।”

“খাবার টেবিলে চলো না কেন? সেখানেই খেতে খেতে কথা বলা-কওয়া যাবে এখন!” সুনেত্রা বলে উঠলেন।

বাপ মেয়ে দু’জনেই রাজি। কাজেই গন্তব্য খাবার টেবিল।

সেখানে গিয়ে বসতে না বসতেই রান্নাঘর থেকে ছাপা শাড়ি পরা সুচরিতারই বয়সের একটি মেয়ে এসে গামলা ভরে ফুলকো লুচি, ডিশভর্তি চাক চাক বেগুনভাজা আর বাটিতে করা কষা আলুর দম দিয়ে গেল। এই তো সবে সকাল আটটা! এর মধ্যেই এত কিছু করে ফেলেছে! মেয়েটার এলেম আছে তো!

প্রাণভরে সুগন্ধটা টেনে নিয়ে সুচরিতা ভুরু নাচিয়ে মাকে ইশারা করায় মা বললেন, “ও কল্পনা। এই গাঁয়েই থাকে। রান্নার হাতটা দারুণ! খেয়ে দেখ!”

কল্পনা তখন রসগোল্লার রেকাবিটা টেবিলে রাখতে রাখতে সুচরিতার দিকে তাকিয়ে মুখভরা হাসি নিয়ে সুনেত্রাকে বলল, “তোমার মেইয়ে তো মা একদম ঠাকুর-প্রতিমার মতো দেখতে!”

সুচরিতা তার দিকে চেয়ে হাসিমুখে বলল, “ভালো আছ দিদি?”

“হ্যাঁ গো! মা আমার কত খেয়াল রাখে! ভালো না থেইকে পারি?” বলেই ফের চলে গেল রান্নাঘরে।

ততক্ষণে সুনেত্রা প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়েছেন। একটা ফুলকো লুচির পেট আঙুল দিয়ে ফুটো করতে করতে সুচরিতা বলল, “তাহলে বাবা, তুমিই শুরু করো। নাকি?”

তারপর সেই যে গপ্পগাছা শুরু হল সে আর শেষ হয় না। হাতের এঁটো শুকিয়ে চড়চড়ে হয়ে গেল। চড়চড়ে হাতেই কল্পনার দেওয়া চা ফুরোল, ঘড়ির কাঁটা নড়তে নড়তে প্রায় যখন আড়াই ঘণ্টা পার করল, তখন গিয়ে সবকথা বলা শেষ হল।

ঠিক তক্ষুনি বাইরে থেকে কে যেন দরজার কড়ায় নাড়া দিল।

মা দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড় করে একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে ছুট্টে এসে দাঁড়াল সুচরিতার সামনে। আঙুল দিয়ে সুচরিতাকে দেখিয়ে সুনেত্রাকে জিজ্ঞেস করল বলল, “কী গো পিসিমণি! এ আমার দিদিভাই?”

সুনেত্রা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলতেই সে সুচরিতাকে জিজ্ঞেস করল, “তা’লে বলো তো আমি কে?”

সুচরিতা তার মাথাটা নেড়ে দিয়ে বলল, “তুই আমার মিষ্টি বুনু ইল্লি, ঠিক তো?”

যে হাসিটা তাতে ইল্লি দিল, তার দাম লাখ টাকা। সুচরিতা সেই লাখ টাকার হাসির মালিককে চেপে ধরে খানিক চটকা মটকা করে দিয়ে বলল, “তোর ক’টা জামা হল রে?”

দুই হাতে কড় গুনে গুনে ইল্লি বলল, “এখনো অবধি সাতটা!”

“এখনো অবধি মানে? আরো হবে নাকি?”

“তুমি দেবে না?” ফোকলা হাসি হেসে বলল ইল্লি।

“ওরে! তুই তো পুরো তৈরি রে!” সুচরিতা ইল্লির দুটো গাল টেনে আদুরে গলায় বলল।

“তা তো বটেই, দিদির তো দেওয়াই উচিত। এত বড়ো দিদি, বাইরে থেকে পুজোয় এল, আর বুনুর জন্য কিছু আনবে না!” সুনেত্রা বললেন।

“কিন্তু মা, আমি তো...”

সুচরিতার কথা শেষ হতে না দিয়েই সুনেত্রা বললেন, “হ্যাঁ, জানি তো! দাঁড়া, নিয়ে আসছি।”

বলে উঠে গিয়ে ভিতর থেকে একটা মিষ্টি গোলাপি রঙের ডান্সিং ফ্রক নিয়ে এলেন। তাতে গোলাপি ফ্রিল লাগানো আর চুমকির কাজ করা। সুচরিতার দিকে চেয়ে ইশারায় বললেন, ‘পছন্দ?’

সুচরিতা তো অবাক! ইল্লির জন্য সে তো জামা আনেনি, এনেছে বার্বি ডল। সেই বার্বির ফ্রক আর মায়ের আনা ফ্রক হুবহু এক! তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে রুকস্যাকটা খুলে বার্বিটাকে বার করে ফিরে এসে দেখল ইল্লি সেই ফ্রকটা পরে ঘুরছে। ঘুরছে আর তার ডান্সিং ফ্রক ফুলে উঠে উঠে ঘুরছে। ঠিক যেন একটা পরি।

সুচরিতা সেই ইল্লি পরির হাতে বার্বিকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই নাও। এটাও তোমার।”

“আরে! দিদিভাই দেখো, দেখো! আমার আর বার্বির জামা একরকম! পিসিমণি, দেখো দেখো!”

 এই অনাবিল আনন্দের জন্যই তো দুর্গাপুজো, ঘরে ঘরে নিজেদের মতন করে আনন্দের ছোঁয়া। কিন্তু সবাই কি আর আনন্দ নিতে জানেন? অনেক থেকেও আরো চাই আরো চাই করে সব আনন্দ মাটি করা অনেকেরই অভ্যেস। এই তো ধরুন না, এখানে তালুকদার বাড়িতে ইল্লি আর সুচরিতাকে নিয়ে আনন্দের ঢেউ খেলছে আর ওদিকে ক্লাবের প্রেসিডেন্টের বাড়ির বৈঠক খানায় দু-দিস্তা লুচি আর আধ গামলা ছোলার ডাল আর এক জামবাটি রসগোল্লা খেয়েও সেই চিঁ চিঁ ভীম দুর্বল সিংহের চিত্তে না পাওয়ার মেঘ বেহুলো বাজাচ্ছে! এতসব পেটের গর্তে সেঁধোনোর পরেও যে কারো অসন্তুষ্টি থাকে, ভাবা যায়? যাক গে যাক! নিজের মনের খাবা-জাবা নিয়ে সে থাকুক গিয়ে। আমরা গিয়ে বরং চলুন চোখ রাখি তালুকদার বাড়িতে।

ইল্লি তো সেই জামা আর পুতুল পেয়ে মহাখুশি! সে তো জামা নিয়ে পুতুল নিয়ে খানিক ঘুরে ঘুরে নেচে নিল। তারপরে সুচরিতার কাছে বসে যেই না গপ্পগাছা শুরু করেছে, অমনি বাইরের দরজায় কার যেন সাড়া পাওয়া গেল। আর ইল্লি থাকে? একছুটে দরজায়।

সুনেত্রা গিয়ে দেখলেন গাঙ্গুলী গিন্নি এসেছেন। একে পাড়ার সম্ভ্রান্ত ঘরের, তায় পুজোগণ্ডার দিন! সুনেত্রা হাত ধরে তাঁকে নিয়ে এলেন ঘরে। সুচরিতাকে ডেকে বললেন, “দেখ মা! ইনি হলেন...”

তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়েই গিন্নিমা বললেন, “দাঁড়াও তো বউ! আমি আগে আমার মেয়েটাকে দেখি। কী সুন্দর মেয়ে গো তুমি!”

সুচরিতা হেসে তাঁকে প্রণাম করতে গেল। অমনি খপ করে তার হাতটা ধরে ফেলেই বললেন, “উঁহু মা, এখন নয়। এখন যে আমাদেরও সব্বার মা মণ্ডপে এসে গেছেন! বিজয়ার পর আগে তোমায় নাড়ু-বড়ি-মিষ্টি-মণ্ডা খাওয়াব, তারপরে তোমার প্রণাম।”

সুনেত্রা হেসে বললেন, “সুচিমা, ইনি তোমার জেঠিমা হন কিন্তু।”

“জেঠিমা নয়, আমি তোমায় বম্মা বলে ডাকব।”

“ডাকবেই তো!” বলে সুচরিতাকে আদর করে দিয়েই ইল্লির দিকে ফিরে গিন্নিমা বললেন, “ও! তোমার বুঝি হিংসে হচ্ছে? কই এসো দেখি, তোমার প্রাপ্যটা নিয়ে যাও।”

বলে হাতের থলে থেকে এই বড়ো বড়ো ছ’টা পেয়ারা বের করে টেবিলে রাখলেন। ব্যস! ইল্লি ছুট্টে এসে একটা নিয়ে বলল, “খাই?”

সুনেত্রা বললেন, “দাঁড়া! ধুয়ে কেটে দিই।”

“রাখো তো! কেটে দেবে কেন? তাহলে ওর দাঁতে জোর বাড়বে কেমন করে? শোনো বউ, এ যে-সে গাছের পেয়ারা নয়! কামড়ালেই দেখবে ভিতরটা কেমন টুকটুকে লাল। তুমিও একটা খাও না!”

সুনেত্রা দুটো পেয়ারা ধুয়ে এনে ইল্লি আর সুচরিতাকে দিয়ে পানের বাটা এনে পান সাজতে বসে গেলেন। আর গিন্নিমা ডাইনিং টেবিলের পাশের ছোটো তক্তপোষটায় বেশ করে গুছিয়ে বসে বললেন, “কালকে কখন এলি রে মা?”

“রাত্রিবেলা।”

“রাত্রি মানে ক’টা রে? আমরা তো মণ্ডপে ছিলাম ঠাকুর আসা পর্যন্ত। তা প্রায় ন’টা দশটা অবধি তো হবেই। নতুন কাউকে আসতে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”

“অনেক রাতে এসেছে দিদি।” সুনেত্রা বললেন।

“বাবা! অত রাতে রিক্সা-টিক্সা কিছু পেয়েছিলি রে মা?”

গিন্নিমার কথায় ফের একবার গতকাল রাতের সেই রিক্সার স্মৃতি ফিরে এল সুচরিতার। একটা ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে বলল, “হ্যাঁ, দামোদরের রিক্সা।”

“কার!” চোখে রসগোল্লার মতো চাউনি করে আকাশ থেকে পড়ার মতো স্বরে গিন্নিমা বলে উঠলেন।

“দামোদরের।” সুচরিতা ফের বলে উঠল।

“ও বৌ! কী বলছে গো! দামোদর যে গতমাসেই মরল!”

গতকাল রাতে যা যা ঘটেছে তাতে আর কোনো কিছুতেই অবাক হয় না সুচরিতা। কেবল ঠান্ডা গলায় বলল, “জানো বম্মা, দামোদর আবার বলছিল, বাবা নাকি ওকে খুব ভালো করেই চেনেন।”

“তোর বাবা কেন রে! ওকে আমরা সবাই চিনি। এই তো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকত। এই পাড়ার সবার প্রয়োজনে ওই তো একা! কারো বাজার হোক, কাউকে নিয়ে আসা হোক, ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া হোক—সবেতেই দামোদর। তা রিক্সা টানা ছাড়াও তার এক শখ ছিল। মাছের শখ। বর্ষার জল জমলেই হাতে কোঁচ নয়তো পলো নিয়ে বেরোবেই। আর যাই ধরুক, হাতে করে নিয়ে এসে ডাক দেবে ‘গিন্নিমা!’ ডাকটা এখনও কানে বাজে রে।”

আঁচলে কপাল আর চোখ মুছে নিয়ে গিন্নিমা বললেন, “ওই মাছ মাছ করেই চলে গেল। বেনেপাড়ার ধানবিলে সন্ধেবেলায় পলো থেকে মাছ বার করতে গেছিল। পদ্মগোখরো। আর বাঁচেনি।”

গিন্নিমার কথা শুনতে শুনতে সুচরিতা ভাবছিল এই যে তার হঠাৎ করে চলে আসা, হাওড়া স্টেশন থেকে বই পাওয়া, দামোদরের রিক্সা, তিন ভাইয়ের সঙ্গে রাতের ওই আলাপ পর্ব আর ওই চাবিকাঠি—সব মিলেমিশে কেমন যেন একটা দায় এসে পড়ছে ওর ওপর। দায় তো বটেই! ওই দুর্জন সিং আসার আগেই তাকে সব খুঁজতে হবে। কখন যে এসে পড়ে! এসে গেছেই কি না, অথবা এই পাড়ারই কেউ কি না তাই বা কে জানে! আচ্ছা, গিন্নিমাকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়?

“আচ্ছা বম্মা, দুর্জন সিং নামে এই পাড়ায় কেউ আছে?”

“কী? দুর্জন? না বাবা, অমন বিচ্ছিরি নাম এই কুমিরগঞ্জে কারো নেই। কেন রে?”

“এমনি গো। আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম এখানে থাকে বলে। সে তাহলে অন্য কুমিরগঞ্জ।”

“তাই হবে বাপু।” বলে সুনেত্রার দিকে ঘুরে বলতে লাগলেন, “ও বৌ! শোনো! এক কান্ডি হয়েছে।”

“কী গো দিদি?”

“আরে কাল কোত্থেকে এক গাগরা বাঘের মতো মুশকো এসে হাজির। উনি তখন ক্লাবের সভা করছিলেন। তা সে মুখপোড়া বলে কিনা অসুর সাজবে! আর শুনেছ তো, ও-পাড়া এবার জীবন্ত দুর্গা করছে? ব্যস! রেষারেষির ঠেলায় এরা সবাই তাকে নিয়ে নিয়েছে।”

“শুধু অসুর?” একমনে খেলতে খেলতে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে পাকা গিন্নির মতো প্রশ্ন করল ইল্লি।

“সেই নিয়েই তো চিত্তির! শেষ অবধি পাড়া থেকেই সব বন্দোবস্ত হল। ঘোষালদের বড়ো মেয়ে হচ্ছে মা লক্ষ্মী।”

“ভালোই গো দিদি। খুব লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটা। যেমন মিষ্টি দেখতে, তেমন নিরিবিলি।”

“হ্যাঁ, তা যা বলেছিস। ওর বাপ-কাকার কলহে তো কান পাতা যায় না! সেই পরিবারে এমন লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে!”

“আর গণেশ-কার্তিক?” ইল্লির প্রশ্ন।

“বলছি রে বাবা।” পানটা জিভ দিয়ে একগাল থেকে আরেক গালে ঠেসে গিন্নিমা বললেন, “রমেন হালুইয়ের ছেলে হয়েছে গণেশ।”

“বেশ মানাবে গো। যেমন টুকটুকে ছেলে, তেমন গোলগাল।”

“গোলগাল কী রে বৌ! বলের মতন ভুঁড়ি! ওর বাপের ঘি-মাখন খেয়ে খেয়ে এই দশা করেছে। তা যা হোক, মানাবে ভালো। কী বলিস?”

“খুব মানাবে।”

“আর ওই পুরকায়েতদের ছেলে হয়েছে কার্তিক। ওকে দেখিসনি তোরা। সত্যিই কার্তিক ঠাকুরটি।”

“আর দুর্গা মা?” সুচরিতা জিজ্ঞেস করল।

“আর বলিসনি মা! এই বয়সেও আমাকে রং-চং মেখে নাকি দুগগা মা সাজতে হবে! বল তো কী জ্বালা!”

এই কথা শুনে ইল্লি, সুচরিতা, সুনেত্রা সবাই খুশিতে হইহই করে উঠল। সুচরিতা বলল, “দারুণ হবে বম্মা! আমরা সবাই দেখতে যাব তোমায়।”

“উঁহু মণি! আর যারই হোক, তোমার জন্যে যে ওটি হচ্ছে না!”

“কেন? আমি যেতে পারব না?”

“উঁহু।” বলে গিন্নিমা সুচরিতার থুতনিটা নেড়ে দিয়ে বললেন, “কারণ, তোমাকেও লোকে দেখতে আসবে যে! তুমি তো আমাদের সরস্বতী ঠাকুর!”

“আমি! না না, বম্মা! ও আমাকে দিয়ে হবে না। আমার অন্য কাজ আছে গো।”

“কী কাজ তোমার দিদি? হও না, হও না! খুব মজা হবে।” ইল্লি তিড়িংবিড়িং নাচতে নাচতে লাফাতে লাফাতে বলল।

ইল্লি বলল, সুনেত্রাও হাসতে হাসতে রাজি হলেন। কেবল সুচরিতা কিছুতেই রাজি হল না। গিন্নিমাও পণ ধরলেন সুচরিতা মা সরস্বতী না হলে তিনিও দুর্গা হবেন না। তাইতে সুচরিতা মায়ের জন্য স্পেশাল জর্দা, ভিজে সুপুরি আর পানবাহার দিয়ে আরেক খিলি পান সাজিয়ে গিন্নিমার মুখে দিয়ে তাকে ঠান্ডা করলে।

কিছুতেই ভবি ভোলে না দেখে গিন্নি মা উঠে যাওয়ার উদ্যোগ করে বললেন, “তাইলে আর কী! তুমি মেয়ে তো কথা শুনলে না। কাজ দেখালে তোমার বম্মাকে। বম্মার তো আর বসে থাকলে চলবে না। মা সরস্বতীকে খুঁজতেই হবে। তোমার জেঠুকে তো নইলে আর সামলানোই যাবে না। কী যে করবেন কে জানে। এই তো আসার আগেই দেখলাম সেই মুশকো দুব্বল সিংহের সাথে জীবন্ত মা দুগগা আর অসুর নিয়ে কথা কইছেন আর মাঝে মাঝেই দুব্বল সিংহের হাতের গুলি টিপে টিপে দেখে ও-পাড়ার পুজোকে কেমন করে টেক্কা দেবেন ভেবে ঢ্যাঙস ঢ্যাঙস করে লাফালাফি করছেন। এখন বলো, মা সরস্বতী যদি না পাই, তাহলে আর তাকে সামলানো যাবে? আমার হয়েছে যত জ্বালা!” বলে তক্তপোষ থেকে কষ্ট করে উঠে সুনেত্রাকে ডেকে বললেন, “আসি গো বৌ!”

সুনেত্রা গিন্নিমাকে এগিয়ে দিতে চললেন। সুচরিতার খারাপ লাগছিল। কিন্তু কী করবে? কাজটা তো করতে হবে! কবে যে সেই দুর্জন সিং এসে ওঠে! দুর্জন সিংয়ের নামটা মনে হতেই সুচরিতার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। অসুরের নামটা কী বলল বম্মা? দুর্বল সিংহ! সে-ই দুর্জন সিং নয় তো? দেখতেই হবে একবার।

মনে হতেই দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে বম্মাকে বলল, “তোমায় না বলতে কষ্ট হচ্ছে বম্মা। কতক্ষণ থাকতে হবে গো মণ্ডপে?”

শুধু কথাটা শোনার অপেক্ষা। গাঙ্গুলী গিন্নি একেবারে অ্যাবাউট টার্ন নিয়ে আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে তক্তপোষটায় ফের কষ্ট করে বসে হাঁটুদুটোয় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, “ও বৌ! এবার আরেক খিলি পান সাজো দেখি! মা যে আমার রাজি হয়েছে!”

***


তপোধীরবাবু সাধারণত বাজারে যান না। বাড়িতেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে মাছ-সবজি কেনেন। আর বয়সের কারণে তো পাঁঠা জিভছাড়া হয়েই গেছে, কাজেই টোনাটুনি দু’জনার জন্যে বাজারে এসে আর কী হবে?

আসা হয় না বলে চেনাজানাও তেমন নেই। আজ মেয়ে এসেছে বলে গিন্নির সাধ হয়েছে মেয়েকে মৌরলা মাছের চচ্চড়ি আর টক খাওয়াবেন। সঙ্গে খানিকটা পাঁঠার হুকুমও আছে। কাজেই ব্যাগ বগলে সক্কাল সক্কাল টিফিন খেয়ে তপোধীরবাবু বাজার পানে।

আজ আবার ষষ্ঠী। ভিড় বেশ। আধঘণ্টাটাক দাঁড়িয়ে লাইন এল মাংসের দোকানে।

“কোহান থেকে দিব কত্তা?”

তপোধীরবাবু বললেন, “পাঁজর।” কিন্তু অদ্ভুতভাবে মুখ থেকে যে কথাটা বেরোল নিজের কানেই তা শুনতে পেলেন, “পিছনের পা থেকে দিন।”

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন তপোধীরবাবু। এটা কী হল! কে বলল কথাটা? তারপর কোনো কূলকিনারা না পেয়ে ভাবলেন, তা যাক গে যাক, মাংস নিলেই হল।

পাশেই গাদা ভরে কাঁটোয়া ডাঁটা নিয়ে বসেছে এক গাল তোবড়ানো বুড়ো। ওর নাম হরেন। বর্ণময় জীবন। যত্ত রকম অপকম্মো এই গাঁ-ঘরে ঘটতে পারে, তার সবেতেই হরেন মিশে। শোনা যায় আগে নাকি ডাকাতদলের বেতনভোগী খোঁচর ছিল। ধরা পড়ার পর শুধরে নিয়ে ভ্যান চালানো শুরু করে। তারপর কী জানি কী একটা দুর্ঘটনার পর থেকে বাজারে শাক, ডাঁটা নিয়ে বসে। যাই হোক, এখনও গাঁ-ঘরে ডাকাত গেরস্থের সহাবস্থান চলে, তাছাড়া হরেন তো ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছে। না ছাড়লেও জন্ডিস আর হাঁপানিতে ভুগে ভুগে ওর শরীরটার যা দশা হয়েছে, তাতে করে ডাকাতিতে যে ওর আর ঠাঁই হবে না, সে সবাই বোঝে। এখন সকাল সকাল এই শাক, ডাঁটার দোকান খোলে হরেন। লোকজন নেয়ও ওর থেকে। নেওয়াই উচিত, নইলে লোকটার চলে কী করে? গাঁ-ঘরে এখনও প্রতিবেশীর জন্যে মানুষের চিন্তা হয়। অবশ্য সেই হরেনের দোকান থেকেই বেশ কিছু আকর্ষণীয় কথা কানে এল তপোধীরবাবুর।

খুব বেশি বাড়ির বাইরে না বেরোলেও এই বছর দেড়েকে কুমিরগঞ্জের প্রায় প্রতিটা মানুষই মুখচেনা হয়ে গেছে। কিন্তু হরেনের সঙ্গে যারা কথা কইছে, সেই দু’জনকে কখনো কোথাও দেখেছেন বলে তো মনে হল না! অথচ এরা যাদের নিয়ে কথা বলছে তারা তপোধীরবাবুর পাড়ার লোক। ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে!

গোপালের মাংসের দোকানের দিকে ফিরে আড়চোখে কান খাড়া করে হরেনের ডাঁটার দোকানের দিকে চেয়ে রইলেন তপোধীরবাবু। চেয়ে রইলেন বটে, কিন্তু ঠিক কিছু ঠাওর করতে পারলেন না। লোকগুলো কথায় কথায় গন্ধরাজ গাঙ্গুলীর নাম করছে। অথচ তার সঙ্গে বস্তা, হাতি, পয়সা—এইসব হাবিজাবি কথা বলে কী যে আলোচনা করছে! ধুস!

“হাল ছাড়লে হবে না কত্তা! চেষ্টা চালান!”

কথাখানা এসেছে এক্কেবারে তপোধীরবাবুর ডান কানের গোড়া থেকে। তিড়িং করে ছোট্ট একটি লাফ দিয়ে ডানদিকে ঘুরেই একেবারে মিশমিশে কালো এক খেটো ধুতি পরা লোককে দেখতে পেয়েছেন তপোধীরবাবু।

“এই! কে হে তুমি?”

“আমি কে সেইটা বিবেচ্য নয় কত্তা। বিবেচ্য হচ্চে ওই গুহ্য কথাগুলো। শোনেন মন দিয়ে।”

এমন এক হাটুরের গলায় এমন কমান্ডিং টোন! সেদিক থেকে পাশ ফিরেও আঁতে লাগায় ফের ঘুরে তপোধীরবাবু জিজ্ঞেস করেন, “কে হে বাপু তুমি, ছায়ার মতো লেপটে রয়েছ?”

“আজ্ঞে বাবু, আমি তো আপনার ছায়াই। অসুবিধা হয় তো এই নেন, সেঁধোলাম আপনের ভিতরে।” বলেই কিনা সেই বেটা মিশকালো ভূত মিলে গেল তপোধীর তালুকদারের ভিতরে! একটু ঝেঁকে উঠলেন তপোধীর। ভিতর থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলেন, “আজ্ঞে বাবু, ঘাবড়ানোর সময় পরে অনেক পাবেন। এখন একটু না হয় ওদিকে মন দেন।”

ততক্ষণে হরেনের স্যাঙাতরা গলার স্বর আরও নামিয়ে এনেছে। পায়ে পায়ে আর একটু তাদের দিকে সরে এলেন, কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলেন ওদের কথা, কিন্তু ভালো করে শুনতে পেলেন না। ধুস! যদি আর একটু বেশি শোনা যেত!

ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই এতসব কিছু শুনতে শুরু করলেন তপোধীরবাবু, যে সে আর বলার অথবা বিশ্বাস করবার মতো নয়। এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজারের ওই কোনায় নিমাইবাবুর বেগুন দর করা শুনতে পাচ্ছেন, মলয় মুদির দোকানে খদ্দেরের দামদস্তুর শুনতে পাচ্ছেন, বাজারের বাইরে চিন্ময়ের চায়ের দোকানে বসা হাটুরে পার্লামেন্টের আর্গুমেন্ট শুনতে পাচ্ছেন।

“যে কাজের জন্য এমনধারা ক্ষেমতা পালেন সেই কথটায় এইবার কান দেন কত্তা।” ভিতর থেকে ছায়া বলে উঠল।

অমনি তপোধীরবাবু সচকিতভাবে কান পাতলেন হরেনের দোকানে। লোকগুলো হরেনকে কী একটা চাবির হদিশ জিজ্ঞেস করছে। আধ বিঘত লম্বা সোনার চাবি। নীচের দিকে একটা পাথরের কাছে খোদাই করে লেখা ‘মা লক্ষ্মীর চাবিকাঠি’। সেইটে যদি খুঁজে দিতে পারে, তো হরেন রাজা। আর যদি না পারে তাহলে হরেনের গুহ্য তথ্য সব ফাঁস থানার দারোগাবাবুর কাছে।

হরেন বলছে, “আজ্ঞে তেমন ধারা কোনো চাবির কথা তো শুনিনি এই পর্যন্ত! কার বাড়িতে লুকানো আছে, বা কেমন তালার চাবি সেইটা যদি বলেন, উপকার হয়।”

“সেসব জানলে আর তোমাকে দরকার কীসের? সে তো তখন আমরাই পারব!”

“তা হইলেও একখানা তো কুলু লাগে!”

দুইজনে তখন খানিক আলোচনা করে ফস করে ফোন করে বসেছে কাকে একটা। “স্যার! ক্লু চাইছে।”

সেই অজানা স্যার তাদের কী বলল সে তো আর শোনার উপায় নেই। একথা ভাবতেই তপোধীর পরিষ্কার শুনতে পেলেন একটা চিঁ চিঁ গলা এদের সঙ্গে কথা বলছে—

“ক্লু আবার কীসের?”

“স্যার কোন বাড়িতে জিনিসটা আছে তার একটা আন্দাজ।”

“আন্দাজ আবার কী? দুর্জন সিংয়ের রাডারে সব ধরা পড়ে। আন্দাজ নয়, এক্কেবারে পারফেক্ট খবর দে ওই ব্যাটাকে—জিনিসটা আছে একটা মেয়ের কাছে, কাল রাতেই সে ফিরেছে কলকাতা থেকে। বড়ো কত্তা মেয়েটাকে চাবি দিয়েছে।”

তপোধীরের মাথা হালকা হয়ে হাঁটুদুটোয় ঠোকাঠুকি লাগতেই ভিতর থেকে ছায়া ধমকে উঠল, “ওফ্‌, এতকিছু সাহায্য পেয়েও আপনের মনে বল হয় না! কী ভিতু বলেন তো আপনে! নেন, ওদিকে কান দেন আবার।”

সামলে নিয়ে ফের কান পাতলেন। সেই চিঁ চিঁ বসকে এই স্যাঙাত বলছে, “বাবা! কেমন করে জানলেন স্যার?”

“সে তো তোমাদের জানার কথা নয়। মনে রেখো, পৃথিবীর যে-কোনো মাত্রায় আমার সাহায্যকারীরা আছে। কাল যে মাত্রায় এইসব লেনদেন হচ্ছিল, সে মাত্রায় পাহারা দেয় আমার গুষ্টির ঊর্ধ্বতন লোকেরা, তারাই আমায় জানিয়েছে সেই চাবি এখন ওই মেয়ের কাছে। তবে সিন্দুকের হদিশের সংকেত সম্ভবত মেয়েটা জানে না। কারণ সেই কাগজ এখনও ছোটো কত্তার কাছে আছে।”

“সে তো ভালো কথা। চিন্তা তো তাহলে অনেক কম।”

“উঁহু। মেয়েটা লেখাপড়ায় ভালো। কাজেই চিন্তা থাকছে। যে করেই হোক চাবিটা হাসিল করা চাই। তারপর…”

চিঁ চিঁ বসের খোনা হাসি আর নিতে পারছিলেন না তপোধীরবাবু। ভাগ্যিস ফোনটা কেটে গেল। স্যাঙাতরা তাদের ওস্তাদের কছে শোনা কথাগুলো উগড়ে দিল হরেনের কাছে। হরেন খানিক ভেবে বলল, “তাইলে মনে হয়, ওই যে নতুন এইসেছেন ভোলাভালা তালুকদারবাবু, ওনার মাইয়া। হেই তো কাল অনেক রাতে বাসায় ফিরছে! তালুকদারবাবুরেও আজ যেন বাজারে দেখলাম মনে হ’ল!”

কথা শেষ হতে না হতেই ভিতর থেকে ছায়া বলল, “অন্যদিকে ঘোরেন শিগগির!”

হড়বড় করে গোপালের মাংসের দোকানের দিকে ফিরে মাংসের দাম চোকাতে লাগলেন তপোধীরবাবু। ফেরত সাড়ে তিন টাকা গুনে নিতে নিতে কানে এল হরেন তাকে দেখিয়ে লোকদুটোকে বলছে, “ওই তো তালুকদারবাবু! মাইয়া আইছে বইলা মাংস কিনতাছে।”

“ডাকো, ডেকে পুছো।”

“কাজটা আমারে দিছেন যহন, আমার মতোই কইরতে দেন। আর হ্যাঁ কর্তা, অগ্রিম ট্যাহা কিছু দিয়া যান।”

তপোধীরবাবু আড়চোখে দেখলেন, বেশ কতগুলো চকচকে রঙিন কাগজ হরেন সেই লোকগুলোর থেকে নিয়ে বোতাম খোলা জামার ভিতরের পকেটে রেখে একগাল হেসে বলল, “আয়েন।”


হন্তদন্ত উদ্ভ্রান্ত তপোধীর তালুকদার বাজার থেকে বাড়িতে ঢুকেই হাঁউ মাউ করে সুচরিতার খোঁজ জুড়লেন। সুনেত্রা স্বামীর এই অবস্থার সঙ্গে পরিচিত। নিশ্চয়ই কারো সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে, অথবা কেউ রঙ্গ ব্যঙ্গ করেছে। আগাগোড়াই তপোধীরবাবু বাইরে যেখানে যাই ঘটুক সেখানে হাসি ঝুলিয়ে বাড়িতে এসে ভিসুভিয়াসের মতো ফেটে পড়েন। এর ওষুধও জানা আছে সুনেত্রার। শরবত। আজ্ঞে হ্যাঁ! শরবতেই ঠান্ডা আমাদের তপোধীর তালুকদার। কলকাতা থাকতে তো প্যারামাউন্ট, নয়তো কপিলার সিরাপ রাখাই থাকত ঘরে। ঠান্ডা জলে তরিজুত করে গুলে কাচের গেলাসে দিলেই আদ্ধেক ঠান্ডা। আর দু-চুমুক দেওয়ার পরেই পুরো ঠান্ডা। কিন্তু এ বাড়িতে তো সে সুবিধা নেই। কাজেই তপোধীর ভিসুভিয়াস তালুকদারের হাত থেকে বাজারের ব্যাগদুটো নিয়ে রান্নাঘরে রেখে ঘরে পাতা দই, গুঁড়ো চিনি, এলাচ আর সামান্য আমের সুগন্ধি মিশিয়ে ঘোল বানিয়ে তার উপরে টপাং টপাং করে দু-খণ্ড বরফ ভাসিয়ে নিয়ে আসলেন সুনেত্রা।

ঘোলের গেলাসে পরপর চারটে চুমুক পড়েছে, অথচ তপোধীরবাবু কিছুতেই শান্ত হচ্ছেন না! কেবল এদিক ওদিক করে বেড়াচ্ছেন। সুনেত্রা বুঝলেন বিষয়টা বেশ গুরুতর। এই সময় নিজেকে শক্ত থাকতে হয়, নইলে অন্যের উদ্বেগ কমানো যায় না। কাজেই যতটা সম্ভব কম্যান্ডিং স্বরে বললেন, “আগে স্থির হয়ে বসো তো!”

তপোধীরবাবু দাঁত খিঁচিয়ে ঘুরেও সুনেত্রাকে দেখে সুড়সুড় করে এসে বসে পড়লেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “সুচি মা কোথায়? তাকে ডাকো।”

সে কী! তাহলে কি মেয়েকে নিয়েই কিছু শুনে এলেন? উৎকণ্ঠা যতটা সম্ভব চেপে রেখে সুনেত্রা বললেন, “ও তো একটু বেরোল ইল্লিকে নিয়ে পাড়াটা ঘুরে দেখবে বলে!”

“আহ্‌!” ধড়াম করে দাঁড়িয়ে পড়লেন তপোধীরবাবু। “বেরোতে দিলে কেন ওকে?”

“সে কী! নতুন জায়গা! একটু ঘুরে দেখবে না?”

“না, দেখবে না! ঘরে থাকবে। ঘরের বাইরে এক পাও না! বাড়িতে ফিরলেই দরজায় তালা লাগাবে। এই ক’দিন আমরা কেউ বেরোব না বাড়ি থেকে।”

“মাথাটা কি গেছে! পুজোর দিন ঘরে বন্ধ থাকতে যাব কেন সবাই?”

“আহ্‌! যা বলছি তাই করতে হবে। ভয়ানক বিপদ!”

“বিপদ! কী বিপদ?”

এরপর সামান্য কথার উপর কথা চড়ার পরে যতক্ষণ তপোধীরবাবু বাজার বৃত্তান্ত সুনেত্রাকে বলছেন, ততক্ষণ চলুন পাঠক আমরা একটু চোখ পাতি সুচরিতার দিকে। সে ঠিক কী করছে এই সময়, সেটাও তো জানা দরকার!

ইল্লিকে নিয়ে তো সুচরিতা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এদিক সেদিক ঘুরছে তা প্রায় আধঘণ্টা হল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা ওরা রাস্তায় উঠে ডানদিক ধরে হাঁটতে শুরু করেছে। প্ল্যানটা অবশ্য ইল্লির। ওই উতলা হয়ে পড়েছিল দিদিভাইকে কুমিরবিলের মাছ দেখাবে বলে। তা অবশ্য দেখিয়েওছে। শুধু মাছ কেন, মাছ ধরা অবধি দেখিয়েছে।

কুমিরগঞ্জের বিল, লোকে বলে কুমিরবিল। দিগন্তবিস্তৃত। টুকরো টুকরো ঢেউ উঠছে হাওয়ায়। ঢেউগুলো একজন আরেকজনের হাতে যেন রিলে রেসের ব্যাটন তুলে দিয়ে মিশে যাচ্ছে, আর সেই নবীন ঢেউখানা দুলে দুলে যাচ্ছে এগিয়ে। এইভাবে এগোতে এগোতে মৃদু শব্দ করে উঠে আসছে পাড়ের কাদায়; খানিক ভিজিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে সঙ্গী জলেদের কাছে। কাদার ভিতর থেকে মাটির শ্বাস উঠছে বুদবুদ করে। ছোটো ছোটো কী যেন মাছ বুকে হেঁটে ঘুরছে পাড়ের কাদায়। ইল্লি বলল ব্যাঙাচি।

ওগুলো ব্যাঙাচি নয় সুচরিতা জানে। অবশ্য কী যে মাছ তার নাম যদিও জানে না। এক ঝাঁক হাঁস সশব্দে পাড়ের কাদা থেকে গেঁড়ি-গুগলি ভোজনে ব্যস্ত, তাদের কেউ কেউ আবার খেয়েদেয়ে জলে মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে সাঁতারের কেতা দেখাচ্ছে। হাঁসের দলবল পেরিয়ে, ঢেউয়ের মিছিল পেরিয়ে অনেক দূরে জলরঙে আঁকা ছবির মতো ওই পাড়ের গাছপালা, ক্ষেত-খলিয়ান। বিলের মাঝামাঝি ডিঙি নৌকা। সেখান থেকে প্রায় আধখানা চাঁদের আকারে কেবল গলা ভাসিয়ে ভাসিয়ে দশ-বারোজন জেলে জাল টেনে চলেছে পাড়ের দিকে। বিলের পাড়ের গাছে গাছে নানান জাতের বকের ঝাঁক ‘ভাই ভাই হাই হাই’ করে গপ্পে মগ্ন। হঠাৎ কোত্থেকে একটা পানকৌড়ি উড়ে এসে জলে পড়েই হারিয়ে গেল; খানিক পর হুস করে ভেসে উঠল সেখান থেকে অনেকটা দূরে। ইল্লির সে কী আনন্দ! সে দিদিকে পানকৌড়ি চেনাচ্ছে, মাছরাঙার তপস্যা দেখাচ্ছে। সে যে ছোটো হলেও একজন মানুষ, যে কিনা তার গ্রামের নদীনালা, পাখপাখালি চেনে জানে, দিদিকে সেই বোঝানোর চেষ্টায় একটুও ত্রুটি রাখছে না।

বিল বরাবর হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা গেছিল ওরা। সেখান থেকে ফেরার সময় ইল্লি বলল, “দিভাই, শর্টকাট যাবে?”

“সে আবার কোথা দিয়ে রে ইল্লি?”

“এই তো! এই সামনে দিয়েই। ওই যে বিলের পাড়ে মাটির বাড়িটা দেখছ, ওটা ইসমাইলচাচার। ওখানে ইসমাইলচাচা আর নারানজ্যাঠা থাকে। ওরা যে দিন বিলে মাছ ধরে, রাত্তির বেলা এসে থাকে ওখানে।”

“তোর শর্টকাট?”

“বলছি তো! ইসমাইলচাচার বাড়ির পাশ দিয়ে দেখো একটা রাস্তা নেমে গেছে। দেখছ?”

“ও তো ধান মাঠে নেমেছে!”

“হ্যাঁ তো! ওখান দিয়েই আল ধরে ধরে যেতে হয়। যাবে?”

“তুই জানলি কেমন করে?”

“কেন? আমি গেছি তো বিশুকাকার সাথে।”

“বিশুকাকা আবার কে?”

“কেন তুমি চেন না? সকালবেলা আমাদের বাড়িতে মাছ দিতে আসে বিশুকাকা, দেখোনি?”

“ওই! আমি তো সবে এলাম। দেখব কী করে?”

“তাও তো! যাই হোক, ওই বিশুকাকার সাথেই অনেকবার বিলে মাছধরা দেখতে এসে ওই পথে ফিরেছি। অবশ্য বিশুকাকা আমায় ঘাড়ে তুলে নিয়ে যায়।”

“তা বলে আমি পারব না। আমি কিন্তু তোমার বিশুকাকা নই।”

“আমি তোমায় বলবও না দিভাই। বিশুকাকার মতো যে তোমার শক্তি নেই সেইটা আমি বুঝি।”

“ওহ্‌! পাকা বুড়ি!”

এইসব বলতে বলতে ওরা ইসমাইলের কুঁড়ে পার হয়ে ঢালু পথে নেমে গেল। নয়ানজুলিটা এখন প্রায় শুকিয়ে রয়েছে। শুরুর দিকের জমিগুলোয় এখন কোনো ফসল না থাকলেও একটু দূরেই জমিভর্তি ধানগাছে সবুজ হাওয়ার ঢেউ খেলছে। প্রকৃতির তাজা গন্ধ ভাসছে বাতাসে। সুচরিতা লম্বা লম্বা শ্বাস নিল কয়েকটা। তারপর ইল্লির তুলতুলে হাতটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে নির্জন ধানমাঠের আলে ছোটোবেলার মতো ছন্দে ছন্দে এগিয়ে চলল। ইল্লিও ওভাবে চলতে পেরে খুব খুশি।

চলেছে, চলেছে। দুই পাশে ধানের শিস দুলে দুলে ওদের দেখছে। হঠাৎ ইল্লি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে হাতের ইশারায় কী যেন দেখাচ্ছে। সুচরিতা দেখল, একটু দূরেই ডানপাশের ধানক্ষেত থেকে একটা সাপের মাথা দেখা যাচ্ছে! গা-টা কেমন শিউরে উঠল! চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ওরা। খানিক বাদে ওপাশের ক্ষেত থেকে আল পার হয়ে অন্য পাশের খেতে চলে গেল সাপটা। এই বড়ো কালো রঙের সাপ! সুচরিতা সাপ চেনে না। ইল্লির দৃষ্টিশক্তির তারিফ করতে হয়। ও যদি না দেখত তাহলে বেখেয়ালে ওখানে যদি পা পড়ত তবেই তো হয়েছিল আর কী! যেই চলে গেল অমনি ইল্লির হুড়োহুড়িতে ফের চলা শুরু। সুচরিতা ভীতু নয়, কিন্তু ইল্লি যেমন করে ভাত খাওয়া জল খাওয়ার মতো করে সাপের চলাফেরাটাকে সহজে নিয়ে নিল, সুচরিতা তা পারছে কই? চলার ছন্দ তো আর আসছে না, সজাগ দৃষ্টিতে দুই ধার দেখতে দেখতে বড়োদের মতো চলেছে। বেশ অনেকটা যাওয়ার পর ডানদিকে ধানজমি পার করে একটা ভাঙা ভাঙা অট্টালিকা দেখা গেল। ইল্লি বলল, “চলো দিভাই, এবার এইদিকে।”

“ইল্লি, ওই দূরে ভাঙা বাড়িটা কাদের রে?”

“কাদের আবার! কুমিররাজাদের!”

“কুমিররাজা!”

“আরে যাদের নিয়ে আমাদেরও এই গাঁয়ের কুমিরগঞ্জ নাম গো!”

সুচরিতার মনে পড়ে গেল তিন ভাইয়ের কথা। বলল, “চল তো একটু দেখে আসি।”

“ওইখান দিয়েই তো যাব! ওই বাড়ি পার হয়ে ডানদিকে বিলের পাড় দিয়ে পরপর সাতটা আমগাছ পার হলেই তো আমাদেরও বাড়ির পুকুরপাড়। আমাদেরও ছাত থেকেও তো এই বাড়িটা দেখা যায়। ওই জন্যেই তো এই পথটাকে শর্টকাট বললাম। বুঝেছ?”

“বুঝেছি রে বুড়ি!” বলে সুচরিতা ইল্লির ঝুঁটিটা দু-বার দুলিয়ে দিল।

তারপর দু’জনে এগিয়ে চলল কুমিররাজাদের ভাঙা প্রাসাদের দিকে।

প্রাসাদের আগেই আধভাঙা দেয়ালের পাশ থেকে কাশের বন মাথা তুলেছে। কাশফুলগুলো হালকা হাওয়ায় দুলছে। মোবাইলটা বার করে কয়েকটা ছবি তুলল সুচরিতা। তারপর কী মনে হতে ইল্লিকে দাঁড় করিয়ে কাশ ফুলের সঙ্গে কয়েকটা ছবি নিল। 

ভাঙা বাড়ির প্রাঙ্গণের ফোয়ারার পাথর ভেঙে গেছে কবে। কোনো পরিরই আর ডানা অবশিষ্ট নেই। পাথরের কলসি থেকে তেলাকুচোর লতা বেরিয়েছে। যত্নের বাগান ছিল বোঝা যায়। এই মোটা মোটা গুঁড়ির সব গাছ ঘিরে রয়েছে জায়গাটা। হাজার হাজার পাখি আপন আপন স্বরে কথা চালাচালি করছে।

ইল্লি বলল, “দিভাই, ঢুকবে নাকি? এখানে কিন্তু ঢুকতে মা বারণ করে। এখানে ভূত আছে।”

“ভূত!”

“হ্যাঁ গো! অনেকে দেখেছে। কেউ আসে না সেজন্য এখানে। কেমন ফাঁকা দেখছ না?”

“আমার কাছে ভূতের ওষুধ আছে। চল ঢুকি।”

“ভূতের ওষুধ? কই, দেখাও!”

“উঁহু। এত আলোয় বের করলে ওষুধের গুণ নষ্ট হয়ে যাব।”

“তার মানে ঢপ।”

“না রে, ঢপ কেন হবে?”

“তবে দেখাও!”

“দেখাব, ঠিক সময়মতো দেখাব।” বলে ইল্লিকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভিতরদিকে চলল। জীর্ণ গাড়িবারান্দার বেশিরভাগ জায়গা ভেঙে পড়েছে। বট-অশ্বত্থের শিকড় আর ঝুড়িতে ভিড় জমিয়েছে। চওড়া সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে গেছে নানা স্থানে। দেয়ালের পলেস্তারার কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। ভাঙা দাঁতের মতো ইট বেরিয়ে রয়েছে। কী মনে হতে একটু থমকে দাঁড়িয়ে মোবাইলটা বার করে খচাখচ কয়েকটা ছবি নিল সুচরিতা। তারপর ভিডিওটা অন করে ঢুকতে লাগল ভিতরে।

ইল্লির মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, এতটা ভিতরে আগে আসেনি। একটু ভয়ও পাচ্ছে, সুচরিতার কাছে ঘেঁষে ওড়নার একটা কোনা হাতে ধরে রেখেছে। সুচরিতা বলল, “কী রে বুড়ি! ভয় কীসের? আমি আছি তো!”

সুচরিতার কথা শেষ হতে না হতেই এক ঝাঁক পাখি ফড়ফড় করে উড়ে এল। কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল দু’জন। তারপর ধীরে ধীরে একতলার ঘরগুলোয় যেগুলো ঢোকা সম্ভব, সবগুলোয় ঘুরল ওরা। দোতলায় উঠবার সিঁড়িটার দশা খুবই খারাপ। তবুও একবার তো যেতেই হবে।

জোরে পা ফেললেও যেভাবে সুড়কি ঝরছে, তাতে উপরে ওঠা কতটা ঠিক ভাবছিল, হঠাৎ কী মনে হতে তিন ভাইকে স্মরণ করল সুচরিতা। কানের কাছে যেন রাধামোহনের অভয়বাণী শোনা গেল অমনিই। যেন রাধামোহন তাঁর মিষ্টি গলায় সুচরিতা আর ইল্লিকে উপরে যেতে বলছেন।

“দিভাই, সব ভেঙে পড়বে! উপরে গিয়ে কাজ নেই। মা জানতে পারলে খুব রাগ করবে!”

“কিচ্ছু হবে না। আমি আছি তো! চল।”

দু-বোনে হাত ধরে ধরে সেই সাতভাঙা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল। প্রতিমুহূর্তে ভয়, এই বুঝি সব একেবারে হুড়মুড়িয়ে গুঁড়ো হয়ে যায়! ঠেলায় পড়লে আর সব বাচ্চাকাচ্চার যেমন মাথা খোলে, ইল্লিরও তেমন বুদ্ধিটা হঠাৎ ডগমগ করে উঠল।

“দিভাই! তুমি সরস্বতী ঠাকুর হচ্ছ না?”

“হ্যাঁ, রে।”

“তাহলে আর কোনো ভয় নেই। ও আমাদের দুগগা মাই বাঁচিয়ে নেবে।”

সুচরিতার হাসি পেয়ে গেল। তবুও সেটা চেপে রেখে বলল, “কেন?”

“বা রে! তুমি ছাড়া কি দুগগা মার চলবে? চলবে না। তাই দুগগা মা আমাদের বাঁচাবে। কোনো ভয় নেই।”

“কিন্তু সে না হয় আমার...”

বাকি কথা সুচরিতার শেষ হল না। বলা ভালো, বলে লাভ নেই বলে বলা হল না। কারণ ইল্লি ততক্ষণে দুই কান দু-হাতে চেপে ধরে ‘বাঁচাবে বাঁচাবে বাঁচাবে-এ-এ-এ-এ’ বলে কথা না শোনার চিৎকার জুড়েছে। আর তার সেই আচমকা চেঁচানিতে দোতলার কোণের একটা ঘর থেকে কতগুলো পাখি ঝটপট করে উঠেছে। সেই উত্তেজনাতেই নাকি কে জানে সেই ঘর থেকেই একটা পেঁচাও গম্ভীর গলায় হুম-উম-হুতুম-থুম করে ডেকে উঠেছে। ব্যস। ইল্লির বীরত্বে জল। “ও দিভাই!” বলে সে একেবারে ভ্যা করে কেঁদে ফেলেছে। সে কী কান্না! সুচরিতা তখন তার পিঠ-টিঠ সাপটে-টাপটে কোনোরকমে সামলেছে। সামলেছে তো বটে, কিন্তু আর তো তাকে নড়ানো যায় না। শেষে বাড়ি ফিরেই আর একটা জিনিস দেবার কথা বলে ইল্লিকে রাজি করানো গেল। তবে দুই বোন উঠে এল কুমিররাজাদের বাড়ির দোতলায়।

উঠে যেখানে এল সেটা বোধ হয় হলঘর।

“আচ্ছা, রাজাদের কি হলঘর থাকে দিভাই?”

লাখ টাকার প্রশ্ন। ব্যাপারটা হল সেকথা সুচরিতাই বা বলে কী করে? যে বইখানা সে পড়েছে তাতে তো বাড়ির হালহদিশ দেওয়া নেই, তেমন বর্ণনাও নেই, আছে কেবল মানুষজন আর ঘটনার ইতিহাস। যাক গে, যা দেখা যায় দেখে তো নিই, এই ভেবে ভিডিও রেকর্ডিং করতে করতে একে একে দোতলার তা প্রায় খান দশেক ঘরে ঘুরে দেখল ওরা। ঘরগুলোই আছে, আসবাব আর কিছু অবশিষ্ট নেই। জানালা একটা দুটো আছে, আর আছে কিছু তৈলচিত্র। তাতেও ঝুল পড়ে, পাখির বিষ্ঠা লেগে একেবারে যা তা দশা। যাই হোক, স্বপ্নে দেখা তিন ভাইকে বেশ চিনতে পেরেছে সুচরিতা তৈলচিত্র দেখে। অবশ্য বংশের লোকজন ছাড়াও একদম কোনার ঘরের দেয়ালে শ্রীকৃষ্ণের একটা ভারি সুন্দর ছবি দেখেছে সুচরিতা। কোনো বড়ো শিল্পীর হাতে আঁকা। বিবর্ণ হয়ে এলেও শিল্পীর মুন্সিয়ানা সহজেই ধরা পড়ে। যেদিক থেকেই দেখা যায়, মনে হয় যেন শ্রীকৃষ্ণ সেদিকেই তাকিয়ে আছেন।

হঠাৎ রাধামোহনের পদটার কথা মনে হল। মোবাইল ঘেঁটে পদটায় একবার চোখ বুলিয়েও তেমন কিছু বুঝতে পারল না। কিন্তু যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের কথাই বার বার বলা হয়েছে, সুচরিতার কেন যেন মনে হল ওই ঘরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভাবনা যখন এসেছে তাকে আর রোখে কে? আরেকবার চলল মেয়ে সেই ঘরে। গিয়ে গোটা ঘরটা ভালো করে দেখতে থাকল। বেশ কিছু ছবি তুলল, শ্রীকৃষ্ণের ছবিটারও ফোটো নিল কিছু, তারপর মেঝের দিকে তাকিয়ে অবাক হল।

মেঝেতে জমে থাকা ধুলোয় পায়ের ছাপ পড়েছে। খোলা জানালা থেকে যে আলোটুকু চুঁইয়ে আসছে তাতে সেই পায়ের ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আর সেখানে সুচরিতা বা ইল্লি ছাড়াও আরো কতগুলো পায়ের ছাপ। একটা তো খালি পায়ের।

হতে পারে এমনি লোকজনের, কিন্তু ইল্লির কথা সত্যি হলে গাঁয়ের লোক এদিকে পা মাড়ায় না। এলেও একতলা থেকে দোতলায় আসবে না। তবে কি দুর্জন সাঁপুই, মানে দুর্জন সিংয়ের লোকজন? না, আর দেরি করা যাবে না। রাধামোহনের ধাঁধাটা আজকের মধ্যেই সমাধান করতে হবে।

“চল ইল্লি, বাড়ি যাই।” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতেই নীচে কাদের যেন কথা শুনতে পেল ওরা। যেন উপরের দিকেই আসছ।

ইশারায় ইল্লিকে চুপ থাকতে বলে সুচরিতা ওকে নিয়ে মাঝের ঘরটায় ঢুকে একটা ভাঙা দরজার আড়াল থেকে লক্ষ রাখল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন লোক এসে উঠল। সুচরিতা শব্দ শুনে আর এক ঝলক দেখে বুঝল চারজন। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা চলল তারা ওই কোণের ঘরটায়। লোকগুলোর মধ্যে যেন একজন বস। বাকিরা তাদের সারাদিনের কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছে তার কাছে। কে কোনদিকে গেছিল, কীভাবে কাকে হাত করছে, এমনকি এক মিনমিনে স্বর তো সুচরিতার নামও নিল!

তিনটে স্বর পেলেও চতুর্থ স্বরটা শোনা যায়নি এতক্ষণ। এবার গেল। এত চিঁ চিঁ যান্ত্রিক স্বর কোনো মানুষের হয়? শোনা গেল সেই চিঁ চিঁ স্বর বলছে, “ওসব জানি না। চাবিটা আমার চাই। নইলে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলব।”

ইল্লি ভয় পেয়েছে। ওরা ও-ঘরে গেছে, এই তালে বেরোনো যাক, এই ভেবে যেই উঠতে গেছে, কানের ভিতর থেকে যেন রাধামোহন বলে উঠলেন, “ওদিকে না গো! ওদিকে তো ওরা আছে। আমার সাথে এসো।”

এবার স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সুচরিতা রাধামোহনকে। আগে আগে সুমধুর ছন্দে তিনি এগিয়ে চলেছেন। দ্বিরুক্তি না করে ইল্লির হাত ধরে তাঁকে অনুসরণ করল সুচরিতা।

রাধামোহন কিন্তু সিঁড়ির দিকে গেলেনই না। যে ঘরটায় ওরা দাঁড়িয়ে ছিল, সেই ঘরেই দেয়ালে রাখা অবনীমোহনের তৈলচিত্রের পায়ের নীচে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাধামোহন। সেখানে যেতেই ইশারায় অবনীমোহনের নাগরা জুতোর তলায় একটা ছোট্টো কালো বোতাম দেখিয়ে দিলেন দেওয়ালে। পা একটু উঁচু করে সুচরিতা সেখানে চাপ দিতেই খানিকটা দেয়াল সরে একটা পথ দেখা গেল। রাধামোহন সেখানে ঢুকে পড়লেন। সুচরিতাও ঢুকতে গেল, কিন্তু ইল্লি ঢুকবে না। সে তো আর রাধামোহনকে দেখতে পাচ্ছে না। অবশ্য পাচ্ছে না যে সে একদিক থেকে ভালোই। নইলে হয়তো চিৎকার করে চিত্তির বাধাত।

ইল্লিকে আদর করে কানে কানে বলে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সেই সুড়ঙ্গপথে ঢুকে পড়ল সুচরিতা। খুব ছোটো পরিসর নয়, চলতে গিয়ে মনে হল কোনো সিঁড়ি। মোবাইলের আলোটা জ্বালল সুচরিতা। উত্তর কলকাতার বাড়িগুলোর পিছনদিকে যেমন ঘোরানো সিঁড়ি থাকে ঠিক তেমন। সেই সিঁড়ি দিয়েই রাধামোহন ততক্ষণে নেমে পড়েছেন। ওরাও টকাটক নেমে এল। তারপর রাধামোহনকে অনুসরণ করে সরু গলিপথে মিনিট তিনেক হেঁটে একটা বন্ধ দেয়ালের সামনে এসে পড়ল।

দেখল রাধামোহন মিষ্টি করে ইশারা করছেন আরেকটা জায়গায়, সেখানেও ছোট্টো একটা বোতাম। তাতে চাপ দিতেই ফের একটু দেয়াল সরে গেল আর খানিকটা তাজা বাতাস ঢুকে এল বদ্ধ গলিটায়। ইল্লিকে প্রথম বের করে তারপর নিজে বেরিয়ে আসতে আসতে শুনল রাধামোহন বলছেন, “তাড়াতাড়ি গো মেয়ে! তাড়াতাড়ি!”


আহ্‌! একবুক তাজা বাতাস ভিতরে নিয়ে তৃপ্তির শব্দটা করেই পিছনে তাকিয়ে আর সেই পথটা খুঁজে পেল না সুচরিতা। বরং দেখল ঠিক পিছনে ভাঙাচোরা একটা পাঁচিলে ছাতারেদের সাত বোনের তিন বোন বসে বসে কথা চালাচালি করছে মাটিতে বসে থাকা আরো চার বোনের সঙ্গে।

“এটা কোথায় রে ইল্লি?”

ইল্লি এখন অনেক স্বাভাবিক। বলল, “এমা! তুমি চিনতে পারছ না দিভাই! এ তো আমাদের বাড়ি। গোয়ালের পিছনের দিকটা। ওই যে আমাদের চিনি আমের গাছ। চিনতে পারছ না?”

এইসব কথা হতে হতেই কোত্থেকে এক হাড্ডিসার সাদা চামড়ার বাদামি ছোপওয়ালা নেড়ি কুকুর এসে হাজির। সুচরিতাকে আড়চোখে দেখে দুটো আলতো ‘ভুক ভুক’ করে সরু ন্যাজ নামিয়ে ইল্লির পায়ে গা-মাথা ঘষতে শুরু করল। ইল্লি দুই হাতে তার মাথা চটকে দিল, তাতে সে আবার শুয়ে গড়াগড়ি খেলা শুরু করল।

ইল্লি বলল, “দিভাই, এ হচ্ছে আমার বাঘা। খুব ভালো। আদর করো!”

হুম। বাঘাই বটে। সুচরিতা মনে মনে কথাটা ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই বাঘা আবার মাথা তুলে ভুক করে উঠল আর তার ন্যাজখানাও খাড়া হয়ে গেল। সুচরিতা তার অভিমান দেখে হাসতে হাসতে তাকে আদর করে দিল, আর অমনি সেই বাঘা ন্যাজ দুলিয়ে দুলিয়ে কী যে করবে ভেবে উঠতে পারল না। একবার সামনের দুই পা তুলে দেয় সুচরিতার গায়ে, একবার বোঁও-ও করে পাক খায়, একবার লুটোপুটি খায়—আরও কত কী!

ইল্লি তখন সুচরিতাকে নিয়ে সোজা একটুখানি যেতেই একটা ইটের গাঁথনি আর টালির ঘর সামনে এল। চারদিকে গরুর গন্ধ। সামনে গোবরের ঢিপি। পাশের সব দেয়ালে, গাছে মারি বিস্কুটের মতো সব ঘুঁটে দেওয়া। সেই গোবর রাজ্যকে ডানপাশে রেখে এগোতেই বাঁদিকে একটা ছোটো পুকুর। পুকুর বাঁয়ে রেখেই গোয়ালঘর ঘিরে ইউ টার্ন নিতেই একটা বড়ো দোতলা বাড়ির উঠোন। উঠোনে দুটো উনুনে কাঠের জ্বালে কী যেন রান্না হচ্ছে। ইল্লি বলল, “দিভাই, এই আমাদের বাড়ি।”

“তাই! কী সুন্দর রে! আর আমাদের বাড়িটা কই?”

“এই তো আমাদের বাড়ির পিছনেই। আমাদের বাড়িটা পার হলেই দেখতে পাবে।”

উঠোনে কী রান্না হচ্ছে দেখতে গিয়ে সুচরিতা দেখল একটায় ভাত হচ্ছে, আরেকটায় ধান সিদ্ধ। তার গন্ধ আর কাঠের জ্বালের গন্ধে উঠোনটা ম ম করছে। ধান সিদ্ধ করছে যে ইল্লি একছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। “আমিনাদিদি! আমিনাদিদি! এই দেখো, আমার দিভাই!”

ইল্লির আমিনাদিদিও তার মাথার ঘোমটা আরো খানিক নাড়াচাড়া করে বলল, “দেখিছি গো দিদি! তুমার দিদি তুমার মতুই ছোন্দর।”

সুচরিতা একটু হাসল। বাড়ির ভিতর থেকে যিনি হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছেন তিনি নিশ্চয়ই মামি! ইল্লির মা! সুচরিতা এগিয়ে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করল। তিনিও আদর করে ভিতরে নিয়ে যেতে চাইলেন। সুচরিতা তাঁকে বলল, “মামি, ও-বেলা না হয় আসব। অনেকক্ষণ বেরিয়েছি তো, মা চিন্তা করবে।”

মামি ছাড়লে তো! বললেন, “বেশ, আমি তোমার মাকে বলে দিচ্ছি। তুমি এখন এখানেই থাকো। হাতমুখ ধোও, জলখাবার খাও, তারপর না হয় বাড়ি যেয়ো।”

“না মা! দিভাই দুপুরেও এখানে খাবে, রাতেও খাবে।”

মামি হাসতে হাসতে বললেন, “তাহলে ওর বাবা-মা দুঃখ পাবে না! কালই যে এল। আজ নিশ্চয়ই ওর বাবা ওর জন্য অনেক বাজার করেছেন।”

“না! খাবে! খাবে! খাবে!”

“বেশ। তুইও আমার সাথে আমাদের বাড়ি যাবি, একসাথে খাবি, ঘুমোবি। তাহলে হবে তো?” সুচরিতা বলল।

ইল্লির মা হাসতে হাসতে বললেন, “হবে মানে! ও তো এক পায়ে রাজি দেখছ না? সারাদিনই তো তোমাদের বাড়িতেই পড়ে থাকে।”

“থাকবই তো। পিসেমশাই আমায় কত্ত ভালোবাসে!”

এইরকম নানান গল্প করতে করতে সুচরিতাকে ঘরে নিয়ে গেলেন মামি। তারপর বসার ঘর, ঠাকুরঘর, ভাঁড়ারঘর, মাঝ বারান্দা, টানা বারান্দা সব ঘুরিয়ে যখন দোতলার ঝুল বারান্দায় এলেন, সামনের দিকে তাকিয়ে সুচরিতার চোখ সেখানে আটকে গেল।

সে যে কেবল নারকেল আর তালগাছে ভিড় করা সবুজ পুকুরে হাঁসের দলের খেলাধুলো দেখে তা কিন্তু নয়, কেবল বিস্তৃত ধানের খেতে সবুজ হাওয়ার ঢেউ দেখে তাও কিন্তু নয়, এমনকি ওই যে টিট্টিট টুইই টুইই করে কত যে পাখপাখালি ডাকাডাকি করছে তাও কিন্তু নয়। এসব তো আছেই, তাছাড়াও এইসব মন ভালো করা ছবি পার হয়ে ওই যে কুমিরগঞ্জের ভাঙা প্রাসাদখানা দেখা যাচ্ছে খানিকটা সেইটা দেখেও সুচরিতা সেখানে দাঁড়িয়ে গেল। ইল্লি বলেছিল বটে ওদের বাড়ি থেকে দেখা যায়। একটা বায়নোকুলার থাকলে বেশ হত। একটু নজর করা যেত কারা আছে ওখানে।

অবশ্য তার থেকেও আগে দরকার ওই ধাঁধার সমাধান। কথাটা মনে হতেই বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল সুচরিতা। কিন্তু ব্যস্ত হলেই কি আর মামি ছাড়বেন? ততক্ষণে বারান্দায় রাখা টেবিলে থরে থরে ক্ষীরের সন্দেশ, আনন্দ নাড়ু, মুড়ির মোয়া, তিলের খাজা, নারকেলের তক্তি সাজানো হয়ে গেছে। আর কী করা!


পেট প্রায় বোঝাই করে সুচরিতা বাড়ি ফিরেই হাতমুখ ধুয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। বিছানায় পাশবালিশটায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসে মোবাইলটা খুলে রাধামোহনের পদটা পড়তে থাকল। একবার, দু-বার, বেশ কয়েকবার। কেমন একটা ছবি যেন মনে আসে, আবার চলে যায়। এইসব হেঁয়ালিগুলোর একটা প্যাটার্ন থাকে সাধারণত, সেই প্যাটার্নটাই খুঁজে বার করতে হবে ওকে।

ভাবছে, ভাবছে, এমন সময় তপোধীরবাবু একেবারে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকেই হইহই বাধিয়ে দিলেন। সুচরিতা বাবাকে চেনে। বুঝল, কিছু একটা নিয়ে বাবা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বার বার জানতে চাইলেও বাবা খুলে কিছু বলেন না, কেবল ‘এখন তো বড়ো হয়েছ,’ ‘সাবধানের মার নেই,’ ‘সাবধানে থাকা দরকার,’ ‘অচেনা অজানা জায়গায় ঘোরা যাবে না,’ ‘কার মনে কী আছে কেউ জানে না,’ এইসব বলতে থাকেন। এই এক জ্বালা! কোনোদিন সোজাসুজি কোনো ব্যাপারে সুচরিতাকে বারণ করেননি ওর বাবা। এভাবে বলা মানেই কোনো একটা জায়গা থেকে বাবা সরে আসতে বলছেন। কিন্তু ব্যাপারটা কী?

ভাগ্যিস সেই সময় সুনেত্রা এসে উপস্থিত হলেন। সোজা করে মেয়েকে বলতে পারেন না বলে তপোধীরবাবুকে খানিক বকেঝকে একদম স্পষ্ট কথায় বাজারে বাবা যা যা শুনেছেন সব সুচরিতাকে জানিয়ে দিলেন।

সুচরিতা সেই শুনে বাবাকে আশ্বস্ত করে সবকথা জানিয়ে বলল, “বাবা, আমার ওপর তো তেমনই নির্দেশ রয়েছে বলো! আমাকে তো চেষ্টাটা করতে হবে, তাই না?”

তপোধীরবাবু খানিক্ষণ গোঁ ধরে থেকেও শেষমেশ মেনে নিলেন। মনে মনে তাঁর পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে সবকথা বলেও রাখলেন। কী জানি কখন মেয়েটারও দরকার হয় তাঁদের! সুনেত্রাও নিজের কাজে চলে গেলেন। তপোধীরবাবুও ডাইনিং টেবিলে খবরের কাগজ নিয়ে বসলেন। কেবল সুচরিতারই মন বসল না আর। মা ঘোলের শরবত দিয়েছেন। তারই গেলাসটা হাতে নিয়ে রাধামোহনের পদখানা গুনগুন করতে করতে এসে দাঁড়াল জানালায়।

জায়গাটা সত্যিই সুন্দর। সকালে ইল্লির সঙ্গে গিয়ে প্রকৃতির এক রূপ দেখেছে, আর এখানে আরেক রূপ। প্রকৃতি কি আর কেবল গাছগাছালি, পাখপাখালি? মানুষও তো প্রকৃতিরই সন্তান। মানুষ যদ্দিন ছোট্টটি থাকে তদ্দিন তাকে প্রকৃতির মতোই নির্মল মনে হয়। আর যেই না বড়ো হতে থাকে, শহরের গ্যাঞ্জামের মতো হাজারো সব দূষণের ঠেলায় সৌন্দর্য যায় ঢেকে।

সুচরিতার জানালাটা থেকে খানিক দূরে রঙ্গন আর বোগেনভেলিয়ার ঝাড় পার হয়ে রাস্তা। ওখানে বোধ হয় টুনটুনির বাসা হয়েছে। মাঝে মাঝেই ফুড়ড় ফুড়ড় করে উড়ছে। রাস্তা পার হয়ে একটা মাঠ। বেলা তা এখন প্রায় একটা দেড়টা, তবুও কিছু ছেলেমেয়ে খেলা করছে। নতুন জামা পরেও অবলীলায় ধুলো মেখে খেলছে। ওদের খেলাই দেখছিল সুচরিতা। কী খেলা কে জানে। ইল্লি থাকলে ভালো হত। ভাবতে ভাবতেই ওড়নায় টান পড়ল। ইল্লি!

টেলিপ্যাথি আর কাকে বলে? সুচরিতা ওর ঝুঁটিটা নেড়ে দিয়ে বলল, “ইল্লি, ওরা কী খেলছে রে?”

“তুমি জানো না! ওরা তো গাদি খেলছে। আমিও খেলতে পারি। দেখবে চলো।”

“না রে। এখান থেকেই দেখব, তুই বুঝিয়ে দিবি। পারবি না?”

“কেন পারব না? ওই দেখো, ওখানে একটা বড়ো কোর্ট কাটা আছে। একটা বড়ো কোর্টের মাঝখানে আরও অনেকগুলো ছোটো ছোটো কোর্ট। কীভাবে বলি... দাঁড়াও, একটা খাতা পেন দাও আগে।”

সুচরিতা মৃদু হেসে ইল্লিকে ওর পেনটা আর একটা ডায়েরি দিল। ইল্লি পেনটা নিয়ে এ-পাশ ও-পাশ করে অনেকবার দেখে ডায়েরির পিছনের পাতাটাই যেভাবে বার করে নিল তাতে বেশ বোঝা গেল বাড়িতে ওর এসব কাজের জন্য ডায়েরির পিছন পৃষ্ঠাই বরাদ্দ থাকে।

সেই পাতায় ইল্লি একটা বড়ো খোপ এঁকেছে। তার মাঝে এঁকেছে ধানক্ষেতের আলের মটো গোটা ছয়েক সমান্তরাল আল। ফলে বড়ো খোপটা আরো পাঁচটা ছোটো খোপে ভেঙেছে। ইল্লি বলল, “শোনো। তোমাকে এই নীচ থেকে উপরের কোর্টে গিয়ে আবার ফেরত আসতে হবে। আর এই যে গর্তগুলো দেখছ, এখানে অন্য দলের একজন করে থাকবে, তারা তোমায় যেতে দেবে না। ছুঁয়ে দিলেই আউট। তুমি যতক্ষণ এই কোর্টগুলোয় আছ, সেফ। তবে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারে কিন্তু! আর যদি তুমি ছোঁয়া বাঁচিয়ে পাকা ঘরে গিয়ে ফিরে বেরিয়ে আসতে পারো, তাহলেই ব্যস!”

“বাহ্‌! দারুণ খেলা তো! কী নাম বললি? গাদি?”

“হ্যাঁ। আমরা তো তাইই বলি। কিন্তু আমার বন্ধু নরেশের মামাবাড়ি সুন্দরবনে। সেখান থেকে এসেছিল ওর এক ভাই। দারুণ খেলে। ও বলত, এই খেলার নাম নাকি গাজন। হে হে!” বলে সে কী হাসি ইল্লির। ছোটোদের কীসে যে হাসি পায়!

ইল্লি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “দিভাই, ওই দেখো! নতুন খেলা আরম্ভ হচ্ছে। দেখো, এই টিমে আছে ঘোঁতন, সমুদাদা, মোহরদিদি, সদাইদাদা আর মিতুল। ওরা শুরু করবে। আর দেখো মিঠুদি, বরুণদাদা, নেপলা, বিশুদাদা আর রানাদাদা কেমন করে দাঁড়িয়েছে। ওরা ওদের গাদি দেওয়া থেকে আটকাবে। হেব্বি খেলে। ওদের টপকে কেউই যেতে পারবে না।”

খেলাটা বুঝে গেছে সুচরিতা। সমান্তরাল আলগুলোয় মিঠু, বরুণ, নেপলারা দাঁড়িয়েছে জিগজ্যাগ প্যাটার্নে, সোজা দাঁড়ালে তো যেদিক দিয়ে খুশি দৌড়ে পার হয়ে যাবে!

ওদের দেখতে দেখতেই হঠাৎ সুচরিতার মাথায় একটা চিন্তা ঝিলিক খেয়ে গেল। হুড়মুড় করে লাফিয়ে পড়ল বিছানায়। তারপর মোবাইলটা সামনে ধরে ওই জিগজ্যাগ প্যাটার্নে দৃষ্টি ঘোরাতে ঘোরাতেই একটা আবিষ্কারের উজ্জ্বলতায় ছেয়ে গেল ওর মুখ। ইল্লি ততক্ষণে ফিরে এসে যেই না বলেছে, “কী হল দিভাই? দেখবে না?” অমনি তাকে কোলে তুলে বোঁ বোঁ করে পাক খেতে শুরু করেছে সুচরিতা। পাক খায় আর চেঁচিয়ে বলে, “বোন রে! তুই জিনিয়াস! তোকে কোয়ালিটি আইসক্রিম খাওয়াব। রামভাইয়ের ফুচকা খাওয়াব। আমিনিয়ার বিরিয়ানি খাওয়াব।”

যাকে খাওয়াবে সে তো ততক্ষণে হতভম্ব! সুচরিতার এই চেঁচামেচিতে ঘরে ঢুকে সুনেত্রা বলছেন, “আরে! হলটা কী! এই মেয়ে! ওকে ছাড়।”

ওকে ছেড়ে যখন বিছানায় বসল সুচরিতা তখন সে হাঁপাচ্ছে। সুনেত্রা তো ঘোর সংসারী। মেয়ের হাবভাব দেখেই কী একটা ভেবে ইল্লিকে বলল, “ইল্লি, তোর মা ডাকছিলেন রে তোকে।”

ইল্লিও দিদির কারবারে এখনো খানিক হতভম্ব। কাজেই দ্বিরুক্তি না করে সে গুটিগুটি হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।

সুনেত্রা বললেন, “কী? ধাঁধাটা মিলে গেছে, তাই না?”

সুচরিতাও মাকে চেনে। এমন বুদ্ধিমতী মানুষ খুব কম দেখা যায়। মায়ের কাছে সরে এসে বলল, “মিলে গেছে। তোমায় দেখাই দাঁড়াও।”

সুনেত্রা উঠে গিয়ে জানালা-দরজাগুলো ভালো করে বন্ধ করে এলেন। বলা যায় না বাবা! দেয়ালেরও কান আছে।

ততক্ষণে সুচরিতা রাধামোহনের পদটার একটা প্রিন্ট নিয়ে নিয়েছে। সেই প্রিন্টটা নিয়ে মাকে আগে দিল। সুনেত্রা সেটা পড়লেন। বললেন, “কী বুঝলি এর থেকে?”

“একটা প্যাটার্ন থাকে জানো নিশ্চয়ই এইসব হেঁয়ালিগুলোয়? সেই প্যাটার্নটাই পেয়ে গেছি! এসো তোমায় দেখাচ্ছি।”

বলেই সেই মেয়ে একটা হাইলাইটার পেন নিয়ে প্রথম লাইনের শুরু থেকে দ্বিতীয় শব্দ আর পরের লাইনের শেষ থেকে দ্বিতীয় শব্দগুলো মার্ক করতে শুরু করল। সব শব্দগুলো এরকম মার্ক করা হলে সত্যি সত্যি তা একেবারে গাদির ডিফেন্ডার টিমের সদস্যদের দাঁড়ানোর রীতির মতোই জিগজ্যাগ হলো।

হরে কৃষ্ণ নাম দিল প্রিয় বলরাম

রাখাল রাজা নাম দিল ভক্ত শ্রীদাম।।


কৃষ্ণ রাধা দুইজনায় আনন্দেরই যোগ

হরি বলে দাও গো সবে দোঁহে মোহন ভোগ।।


গুণী লেখেন জ্ঞানী জানেন কৃষ্ণ রাধা সার

কেমনে পার হতে হবে ধন পারাবার।।


আছেন দেব আছেন দেবী কীসের অসুখ?

উন্মুক্ত রাখিও সদা আপন গৃহের মুখ।।


দিক দক্ষিণ রাজা জেনো সুখের হাওয়া বয়

কৃষ্ণ ভজে গাঁথো যদি সুখের দেওয়াল হয়।।


জয় কৃষ্ণ জয় কৃষ্ণ শ্রী মধুসূদন

বুকে লইয়া তেয়াজিব শ্বাস কৃষ্ণ চিত্রে মন।।


শ্যাম বাঁশির ধ্বনি শুনি ধন্য চরাচর

বামে রহি রাই আমি দক্ষিণে দোসর।।


রাই কমলে কোমল মাণিক হৃদি শ্যামরাই

হরি ধন সাথে আছে নাই কোনো চাপ নাই।।


হরি দিলেই সব মেলে না দিলেও ভালো

হরি বিনে জগৎ মরু সকল দুয়ার কালো।।


হৃদয় খুলে নাম করো শ্রীরাধে শ্যাম রাই

কৃষ্ণ কৃপা বরষিলে দুঃখ যাবে ভাই।।


কৃষ্ণধন চাবি কাঠি যে পায় ঠিকানা

ধন্য ধন্য সেইজন সরস্বতীর বীণা।।


সুকাজে লাগিবে রতন কৃষ্ণ চাহেন তাই

ভণিছেন রাধামোহন হরি বলো ভাই।।


সুনেত্রার মুখ থেকে আর কথা সরে না। সুচরিতা বলল, “কী হল তাহলে? কৃষ্ণ ভক্ত রাধা মোহন লেখেন ধন দেব গৃহের দক্ষিণ দেওয়াল কৃষ্ণ চিত্রে বাঁশির দক্ষিণে কমলে চাপ দিলেই দুয়ার খুলে যাবে।”

“আর শেষ দু-পদ?”

“চাবিকাঠি তো আগেই তাঁরা আমায় দিয়েছেন মা! বাকি সুকাজে লাগানোর দায়টা আমাদের নিতে হবে। তোমরা আছ, গাঁয়ের মাথারা আছেন, সবাই মিলে যা হোক একটা ব্যবস্থা ঠিক করা যাবেই।”

সুনেত্রা কিছুক্ষণ কথা বললেন না। তারপর মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ রে মা, এই কাগজটা তো তোর আর দরকার নেই?”

“না। দাঁড়াও, এটার একটা ছবি তুলে নিই।”

“একদম না! যা আছে সে থাকুক তোর আর আমার মাথায়। আর এই কাগজখানা মিশে যাক পঞ্চ মহাভূতে।” বলেই শেলফ থেকে দেশলাই নিয়ে কাগজখানা দিলেন জ্বালিয়ে, আর ছাইটুকু নিয়ে গুঁড়ো করে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন দরজা খুলে। মেয়েকে বললেন, “চল, এবার স্নান সেরে দুপুরের খাওয়া সেরে নিবি।”

মা-মেয়ে দু’জনেই বেরিয়ে গেলেন। আর বলব কী, ঘরের ঘুলঘুলি থেকে একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখও অমনি টুক করে সরে গেল।


***


একতা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট শ্রীযুক্ত গন্ধরাজ গাঙ্গুলীর বাড়িতে একপ্রস্থ রিহার্সালের শেষে এখন প্রাথমিক পর্বের খ্যাঁটন চলছে। মাংসের চপ, মশলা মাখা কুচোনো শসা-পেঁয়াজ, মুড়ি-চানাচুর, ঝাল লঙ্কা আর লাল চা। হুস-হাস উল্লুস-ঝুল্লুসের মধ্যেই গন্ধরাজ গাঙ্গুলীর হম্বিতম্বি চলছে। অবশ্য এ নতুন কিছু নয়। ভালো হলেও আমরা ক’জনকে হারানোর খোয়াবে আর মন্দ হলেও হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় এমনটাই হাউকাউ হয়। মাঝেমধ্যে টুকটাক মাথা নাড়িয়ে-টাড়িয়ে সদস্যরা অভ্যেসমতো মূলত মুখ নাড়ানোতেই মন দেন।

রিহার্সালে বিশেষ কিছু চিত্তির হয়নি। কেবল গণেশ বাবাজী টুলে ওঠায় বয়স্ক টুলটির পঞ্চত্ব প্রাপ্তির ফলস্বরূপ গণেশ বাবাজী মানে রমেন হালুইয়ের নাদন গোপাল ছেলেটি একটু ধমাস হয়েছেন এবং ওঁর বাম গোড়ালির সাড়ে ছয় ইঞ্চি মাংসের নিচে লুকিয়ে থাকা লাজুক হাড্ডিতে সামান্য চোট লেগেছে। ফলত সামান্য খোঁড়াতে হচ্ছে বটে, তবে বড়ো বড়ো ব্যাপারে এটুকু মানাই যায়।

আর ধরুন পুরকায়েতের ছেলে, অর্থাৎ কিনা আমাদের দেবসেনাপতি কার্তিক ঠাকুরের অমন ধুতি-টুতি পরার তো আর অভ্যেস নেই! কাজেই ধুতির খুঁট টুলে আটকে পড়পড় করে পাড় ছিঁড়েছে। পুরকায়েতের বিয়ের ধুতিখানা ছিঁড়েছে কিনা, কাজেই বেদম রাগে তিনি একটি বেমক্কা অভিমান বসিয়েছেন ছেলের গালে। একে বাড়ন্ত ছেলে, তায় দেবসেনাপতি, মানবে কেন? গোঁজ হয়ে খানিক বসে হাজার সাধাসাধি উপেক্ষা করে হর দিন বিরিয়ানির শর্তে শেষমেশ বারমুডা পরেই টুলে উঠেছে।

দেবীদের নিয়ে কোনো ঝঞ্ঝাট নেই। তাঁরা যে যাঁর নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে এন্তার গপ্প জুড়েছেন, গন্ধরাজের সিংহনাদে সে গপ্প থামলেও চোখাচোখিতে গপ্পগাছা চলেছে। কেবল গন্ধগিন্নি অর্থাৎ মা দুর্গাকে নিয়ে একটু সমস্যা অবশ্য প্রথমটায় হচ্ছিল, তাঁকে ধারণ করতে পারে এমন চেয়ার বা টুল অপ্রতুল হচ্ছিল। শেষমেশ হাই স্কুলের হেড মাস্টারের বার্মা টিকের টেবিলটাই প্রথমে ঠিক হয়, কিন্তু সে আবার বেজায় উঁচু! তাছাড়া সেটায় আবার অসুরের পজিশন সেট করা যাচ্ছে না। কাজেই সেটি বিদেয় করে আপাতত ক্লাবের আড্ডাধারী তক্তপোষেই ম্যানেজ করা হয়েছে। গিন্নিমার আবার গেঁটে বাত। কাজেই থেবড়ে-থুবড়ে এবং ব্যথার তাড়নায় গন্ধরাজ এবং সেক্রেটারি লাবণ্যর আক্ষরিক অর্থে পূর্বপুরুষের তুষ্টি করে কোনোমতে উঠেছেন।

আর সেই গাম্বাট অসুর চিঁ চিঁ ভীম দুর্বল সিংহ এক্কেবারে প্রফেশনাল আন্দাজে দাঁত খিঁচিয়ে তক্তপোষের নীচে যাকে বলে পারফেক্ট পোজ দিয়েছেন। তার সেই মুখভঙ্গী দেখে দেবীদের হাস্যরোল কোনোপ্রকারে সামলালেও ফিঁচকে ফক্কড় ফণী মিত্তিরের ত্যাড়া কথা হজম না করতে পেরে এক লম্ফে সেই চিঁ চিঁ ভীম ফণী মিত্তিরকে পাকড়ে একেবারে হাঁটুদাবা করে ফেলেছেন। সেই দেখে সব্বাই ফণী মিত্তিরকে সেই দুর্দম অসুরের মহিষ স্থির করে ফেলেছেন।

সংঘের অ্যামেচার থিয়েটারের মেক-আপ ম্যান দুলালকে তার ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে আগেই ধরে আনা হয়েছিল, সব দেখে-টেখে মাপজোক সেরে সে তার খেরোর খাতা থেকে পাতা ছিঁড়ে কী কী মেক-আপ আর পোশাক লাগবে সবকিছু লিখে লাবণ্যকে দিয়ে দিয়েছে। বনমালী বাঁড়ুজ্যের রেফারেন্স নিয়ে নকুল মিত্তির সহ পাঁচজন অলরেডি শহরে রওনাও হয়ে গেছে। ডেকরেটর ভব পান খাওয়া দাঁতে নিচের ঠোঁট কামড়ে কড়-টড় গুনে হিসেব সেরে বেদি তৈরির জন্য চ্যালাচামুণ্ডাদের লাগিয়ে দিয়েছে। সব একেবারে কমপ্লিট ছকে এসে গেছে। বাকি এখন কেবল আলো। সেজন্য অবশ্য চিন্তা নেই। পাড়ার বিজ্ঞানী নারু বাছার এসে দেখে গন্ধরাজকে আশ্বস্ত করেছে যে এমন লাইটের কেরদানি দেখাবে যে মনে হবে একেবারে কৈলাস থেকে মা সটান এসে আকাশে অসুর বধ করছেন। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাবে, বাজ পড়বে, বৃষ্টি, ঝড়—একেবারে মহা প্রলয়ের ঝাকানাকা আবহ দাঁড় করাবে নারু বাছার।

সবই ঠিকঠাক, কেবল মা সরস্বতী সুচরিতার অসুরের চাউনিটা একদম সহ্য হচ্ছে না। কেমন বাঁকা একটা নজর। ত্রিশূলের খোঁচায় তার যখন যায় যায় দশা, কোথায় সে অসুর মা দুগগার কাছে জোড়হস্তে প্রাণভিক্ষা করবে তা নয়, হাতজোড় করে দাঁত খিঁচিয়ে তাকিয়ে থাকছে সরস্বতীর দিকে। থিয়েটার ডিরেক্টর অমল ধর তাকে যতই এক্সপ্রেশন ঠিক করতে বলেন, ততই সে আহাম্মক লুকিয়ে চুরিয়ে মা সরস্বতীর দিকেই তাকায়। চেপে ধরাতে শেষমেশ বলে কিনা, “আজ্ঞে আমি একটু নক্ষীট্যারা।”

যাই হোক, গন্ধরাজ এবং গিন্নিমার ধাতানিতে তার ট্যারা দৃষ্টি খানিক ঠিক হয়েছে বটে, কিন্তু সুচরিতার মনে বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে সেই অসুরব্যাটা বোধ হয় ওকে মাপছে। অবশ্য সুচরিতার মনে গেঁথে থাকা পূর্ব ধারণাটাও এই জন্য দায়ী হতে পারে। ওর তো কেবলই মনে হচ্ছে এ ব্যাটাই আসলে দুর্জন সিং, নাম ভাঁড়িয়ে দুর্বল সিং হয়ে এসে ভিড়েছে। আর আশ্চর্যের ব্যাপার যতবারই ওর এই কথাখানা মনে হয়েছে, ততবারই কোত্থেকে একটা টিকটিকি ‘ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক’ বলে উঠেছে!

তা সব মিলিয়ে মিশিয়ে ক্লাবের সদস্যরা আশাবাদী। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, তাদের এই কর্মসূচি এখনো গোপন। ঠিক হয়েছে, আগামীকাল সকাল থেকে মণ্ডপের মাইকে লাগাতার প্রচার চলবে। পঞ্চায়েতের পার্মানেন্ট মাইক প্রচারী মিন্টু সর্দার আর প্রবীর পালকে হায়ার করা হয়েছে। দু’জন দু-দিকে বেরোবে ভ্যান নিয়ে সকাল থেকেই। প্রচারবাণীর খসড়া লিখেছেন স্বয়ং গন্ধরাজ। ছন্দে ছন্দে একেবারে মাত করে দিয়েছেন। এমন বাণী কানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই অঞ্চলের, অঞ্চলের বাইরের লোক পিলপিলিয়ে আসবে বলে নিশ্চিত কর্মকর্তারা।

যাই হোক, খ্যাঁটন পর্ব সমাধা হতেই ডিরেক্টর অমলের বাঁশিতে ফুড়ড় ফুড়ড়। ধীরে ধীরে চরিত্ররা যে যার জায়গায়। অমল খুব কড়া ডিরেক্টর। গাফিলতি দেখলে আবার চড়াম চড়াম পিটিয়ে-টিটিয়ে দেওয়ার বদভ্যাস আছে। গন্ধরাজ তাঁকে পইপই করে সেসব করতে বারণ করে দিয়েছেন। আপাতত তাই খ্যাঁকানির উপরেই তিনি রয়েছেন। ক্রমাগত খিটখিট করছেন, হাততালি দিয়ে, বাঁশি ফুঁকে কুশীলবদের অ্যালার্ট করছেন, পশ্চার ঠিক করছেন ইশারায়। সব মিলিয়ে সে এক হইহই কাণ্ড, রইরই ব্যাপার।

বার পাঁচেকের রিহার্সালে মোটামুটি সবাই সড়গড় হল। অমলের যদিও আরেকবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু গিন্নিমার পা জবাব দেওয়াতে তা আর হল না। তিনি কুশীলবদের আগামীদিনের স্টেজ পারফরম্যান্স সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয় ব্রিফ করলেন। সকলকে ভালো করে আজ ঘুমোতে বললেন, কাল শ্যাম্পু করা, হালকা খাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আজকের মতো খতম করলেন।

এবার ক্লাবের কোর কমিটির বৈঠক। কাজেই অন্যদের সঙ্গে সুচরিতাও বাড়ি যাওয়ার উপক্রম করল। কিন্তু গিন্নিমা তার আর ঘোষালদের বড়ো মেয়ে নন্দিনীর হাত ধরে নিয়ে গেলেন ভিতরে। মা দুগগা ষষ্ঠীর রাতে কিছুতেই মা লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে না খাইয়ে ছাড়বেন না। সেই দেখে গণেশের মুখ ভার হওয়ায় তাকে আর কার্তিককেও নিয়ে গেলেন অন্দরমহলে।

কোথায় লাগে ডিরেক্টর অমলের হালকা খাওয়ার পরামর্শ। গাওয়া ঘি, আলুভাজা, বেগুন ভাজা, সোনা মুগের ডাল, সর্ষে পার্শে, কচি পাঁঠার মাংস, খেজুরের চাটনি আর রসগোল্লা। রমেন হালুইয়ের ছেলেটা সত্যিই গণেশ। এত তৃপ্তি করে গুছিয়ে খেতে দেখে গিন্নিমাও ওর উপরে বেজায় খুশি। সবকিছু খেতে হল সুচরিতাকেও, বম্মা তো আর ছাড়বার পাত্রী নন! স্বাদও ছিল বটে, ইল্লির কথা মনে হচ্ছিল বারবার। সুচরিতার বম্মা সেকথা বুঝতে পেরে বাড়ির কাজের মেয়েটার হাতে করে ইল্লির জন্যও খাবার পাঠিয়ে দিলেন। সুচরিতা হেসে বলল, “বম্মা, তুমি সত্যিই মা দুগগা।”

খাওয়াদাওয়া সেরে বাড়ি যাওয়ার সময় বম্মা সঙ্গে লোক দিচ্ছিলেন। তাইতে কার্তিক, গণেশ একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল। “আমরাই ওদের দিয়ে তারপরে বাড়ি যাব।”

শেষমেশ তাইই হল। চার নব্য নব্য ভাইবোন একসঙ্গে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলল যে যার বাড়িতে। গন্ধরাজ গাঙ্গুলী দেখে বাজখাঁই গলায় বললেন, “সাবধানে এসো সবাই। কাল কিন্তু অগ্নিপরীক্ষা! সব ঠিকঠাক হলে একেবারে গ্র্যান্ড পার্টি!”

ওরাও ‘সব ঠিক হবে, তুমি তৈরি হও জেঠু!’ বলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।

রাত্তির তখন কত হবে? এই সাড়ে দশটা এগারোটা। কিন্তু কুমিরগঞ্জের রাত্তির কিনা! এর মধ্যেই একেবারে ছমছমে নির্জন।

বম্মার বাড়ি থেকে একই রাস্তায় সবার আগেই পরে সুচরিতাদের বাড়ি। ওরা তাই ঠিক করল ওকেই আগে বাড়িতে দিয়ে তারপরে নন্দিনীকে দিয়ে আসবে। চারমূর্তি নানা গল্পগাছা করতে করতে পথে এগোল। অল্পই রাস্তা, মিনিট তিন-চারেকের। ওরা তাই খানিকটা গিয়ে মোড়ের মাথায় বটগাছটার কাছে যেখানটা অন্ধকার জমে আছে তার একটু আগে দাঁড়িয়ে খানিক গল্প করছিল। হঠাৎ কোত্থেকে মুখে গামছা বাঁধা একটা সিড়িঙ্গে লোক আর তার এক স্যাঙাত অন্ধকার ফুঁড়ে ভূতের মতো উদয় হয়েই সুচরিতার হাত চেপে ধরল। ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল হলেও মুহূর্তের মধ্যে একটা ব্যাক কিক করে হাত ছাড়িয়ে নিল সুচরিতা। ছেলেবেলায় স্বামীজী সংঘের মাঠে শেখা তাই-কন-ডোর রিফ্লেক্স।

মুহূর্তে একটা খণ্ডযুদ্ধ লেগে গেল। ওদের সমবেত প্রত্যাঘাত আশা করেনি আততায়ীদুটো। চেঁচামেচি শুনে ওদিকে বটগাছের পিছনের বাড়ির দরজা খুলে এক ভদ্রলোককে বেরিয়ে আসতে দেখে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে সেইদিকে আস্তে আস্তে হেঁটে গেল লোকদুটো। সুচরিতা স্পষ্ট দেখল লোকদুটো মুখ থেকে গামছ খুলে ফেলেছে আর ওই বাড়ির ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করছেন, “ব্যাপার কী রে হরেন?”

“কিছু না। ছেলেমেয়েগুলোকে রাত্তিরে দেখে কুত্তায় ধাওয়া দেছিল আর কী।’’ বলতে বলতেই ওরা মিশে গেল নিকষ অন্ধকারে।

নন্দিনী বলল, “হরেনকাকা!”

“চেনো তুমি?”

“আমরা সবাই চিনি।” গণেশ আর কার্তিক একসঙ্গে বলল, “বাজারে শাকের দোকান।”

ঝট করে বাবার কাছে শোনা বাজারের কথাগুলো মনে পড়ে গেল সুচরিতার। বলল, “তোদের এই হরেনকাকা কিন্তু সাংঘাতিক লোকেদের জন্য কাজ করছে।”

“কাদের জন্য?”

“বলব তোদের। অন্য দিন। আজ রাত্তির হয়ে গেছে। বাড়ি যা।”

“দিদি!” গণেশ বলে উঠল।

“কী?”

“পরে নয়, আজকেই শুনব। তুমি কালকেই এসেছ গ্রামে, আজকেই কী করে হামলা হতে পারে? নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে। তোমার ভাই যখন হয়েছি, বিপদে তো পাশে থাকতেই হবে, কী বলো?”

কার্তিকও ওর কথায় সায় দিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই। তুমি বলো আজকেই।”

সুচরিতা একটু থেমে কী মনে করে বলল, “বেশ, তবে এখানে নয়। আমাদের বাড়িতে চল। রাতে ওখানেই তোরা আজ থাকবি, বাবাকে দিয়ে তোদের বাড়িতে ফোন করিয়ে দেব। হবে তো?”

“হবে না মানে? আমরা গাঁয়ের ছেলে দিদি। বাড়িতে একটু শুধু খবর পেলেই হল।”

“নন্দিনী কী করবি?” সুচরিতা জিজ্ঞাসা করল।

“খুব ইচ্ছা করছে তো তোমাদের সাথে থাকতে।”

“তাহলে একটা কাজ করি,” কার্তিক বলল, “নন্দিনীর বাড়ি তো এই সামনেই, দিদি চলো আগে তোমায় দিয়ে আসি, তারপর নন্দিনীদের বাড়িতে গিয়ে কাকিমাকে বলে ওকে নিয়ে আসব। আমরা বললে কাকিমা না করবেন না।”

“আমরা বলব, আমরা রাত্রেও রিহার্সাল করব!” গণেশ বলল।

“তাহলে তাই কর।”


বটতলার অন্ধকারটা পার হয়েই বাঁদিকের গলিটায় কয়েক গজ গিয়েই সুচরিতাদের বাড়ি। ওকে ওখানে পৌঁছে দিয়ে ওরা বলল, “দিদি, আমরা আসছি কিন্তু।”

কলিং বেলটায় চাপ দিয়ে সুচরিতা বলল, “আয়, আমি ওয়েট করছি ভিতরে।”

বলতে বলতেই দরজা খুলে সুনেত্রা দেখলেন ওদের। বললেন, “ওই! এত রাত্তিরে আবার বাড়ি যাবি কী রে? সবাই ভিতরে আয়। আমি সবার বাবা-মাকে ফোন করে দিচ্ছি।”

সুচরিতা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এই জন্যই তো তুমি আমার মা।” তারপর ওদের বলল, “কী রে! চলে আয় সবাই!”

তারপর আর কী। সবাই মিলে হইহই করে ভিতরে ঢুকে এল; সুনেত্রা সবার মাকে ফোন করে বলে দিলেন। সুচরিতা সবার সঙ্গে পরিচয় করাতে গিয়ে খেয়াল করল সে কার্তিক-গণেশের আসল নাম জানেই না। একচোট হাসির পরে কার্তিক বলল তার নাম পুলক পুরকায়স্থ আর গণেশ বলল তার নাম অভিজিৎ হালুই। নন্দিনী অবশ্য বলল খাঁটি কথাটা, “যার নাম যাই হো্‌ক তুমি আমাদের সরস্বতীদিদি আর আমরা হলাম লক্ষ্মী, কার্তিক আর গণেশ।”

ওদের হইহই দেখে তপোধীরবাবু আর সুনেত্রা খুব খুশি হয়ে নিজেরা আলোচনা করলেন, কী সরল মনের ছেলেমেয়ে এরা। একদিনের রিহার্সালে কেমন আপন ভাইবোন হয়ে উঠেছে। তারপর সুনেত্রা যখন রাত্তিরের খাবার জন্য সবাইকে ডাকলেন, তখন সবাই যখন না না করে চেঁচিয়ে উঠল, কেবল গণেশেরই মুখটা ভার হয়ে গেল। সেই দেখে সুনেত্রা তাকে আদর করে বললেন, “ওরা যা করে করুক, তোমাকে তো আমি খাওয়াবই গনেশবাবা!”

গণেশ তখন অনিচ্ছা অনিচ্ছা মুখ করে বলল, “তা তুমি যখন ছাড়বেই না তাহলে খাইয়ো।”

ওর সেই মুখভঙ্গী দেখে সবার সে কী হাসি!

তারপর সুনেত্রা গণেশকে নিয়ে গেলেন খাবার টেবিলে আর ওদের দিলেন জলজিরার শরবত।

এখানেও গৃহকর্ত্রীকে খাওয়ানোর পরিপূর্ণ তৃপ্তি দিয়ে গণেশ যখন ভুঁড়িতে জল হাত ঘষতে ঘষতে সুচরিতাদের ঘরে এসে ঢুকল তখন ঘড়িতে রাত্তির বারোটা।

নন্দিনী গণেশকে বলল, “পারিসও বটে! পেটুক কোথাকার!”

খাওয়ার টেবিলে বাসন গোছাতে গোছাতে সুনেত্রা হাসতে হাসতে বললেন, “অ্যাই! ওকে অমনি বলছিস কেন রে? কত ভালো ছেলে!”

তাইতে সেই ভালো ছেলে ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলল, “ও দিদি! এবার গল্পটা বলো!”

সুচরিতা বিছানায় উঠে একটা তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে ওদেরকেও কয়েকটা বালিশ দিয়ে বলতে শুরু করল, “শোন তাহলে।”


***


ওদের গপ্পগাছা শেষ হতে নিশ্চয়ই অনেক রাত্তির হয়ে থাকবে, নইলে পুজোর দিন সকাল সাড়ে সাতটা বেজে যায় কারও ঘুম ভাঙে না কেন? সুনেত্রা এসে এর মাঝে দু-বার অবশ্য দেখে গেছেন, অঘোরে ঘুমোচ্ছে বলে ছেলেমেয়েগুলোকে ডাকেননি। কিন্তু এবার পুরকায়স্থবাবু এসে ছেলের খোঁজ করছেন দেখে ওদের ডেকে তুললেন।

সবাই উঠেই বাবা-মা খোঁজ করছে বলে বাড়ি দৌড়োল। সুনেত্রা অনেকবার বললেন সকালের জলখাবার খেয়ে যেতে, কিন্তু ওরা রাজি হল না। বলল পরে কখনো এসে ঠিক নেমন্তন্ন খেয়ে যাবে।

যাওয়ার আগে সুচরিতাকে গণেশ বলল, “দিদি, তাহলে বিকেলে দেখা হচ্ছে। চিন্তা কোরো না, আমরা আছি।”

হাসতে হাসতে ওদের বিদায় দিয়ে সুচরিতা দাঁত-টাত মেজে ফ্রেশ হয়েই মোবাইলে তোলা কুমিররাজাদের বাড়ির ফোটোগুলো ল্যাপটপে ট্রান্সফার করে জুম করে করে খুঁটিয়ে দেখতে থাকল। মা জোরাজুরি করাতে একবার গিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারে লুচি-আলুরদম আর রসগোল্লা খেয়ে এসে ফের মগ্ন হয়ে গেল কাজে।

সব ঘরগুলো দেখছিল সুচরিতা। দেখতে দেখতে মনে হল, না এভাবে নয়, বরং সমাধান করা সূত্রটা আগে একবার পড়ে নেওয়া যাক। মোবাইলে ছবিটা খুলে ঘরে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ সেদিনের সেই কোণের ঘরে দেখা শ্রীকৃষ্ণের ছবিটার কথা মনে এল। ওইদিকটা কোনদিক? ইল্লিদের বাড়ি যেতে পারলে বেশ হত। অবশ্য ছাদে গেলেও তো হয়!

যেই কথা সেই কাজ। ছাদে গিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই ইল্লিদের বাড়ি পেরিয়ে ভাঙা বাড়িটা চোখে পড়ল। ওদের বাড়ি থেকে প্রায় পুবেই বলা চলে। আর দোতলার ডানদিকের কোণের ঘর, মানে দক্ষিণেই তো হল! ওই ঘর, ওই কৃষ্ণচিত্রের কথাই সংকেতে লেখা। উত্তেজনায় আর না দাঁড়িয়ে ধাঁই ধাঁই করে নীচে নেমে এল সুচরিতা, আর মুহূর্তের মধ্যে আমের ডাল থেকে শিকারি বিড়ালের মতন সিড়িঙ্গে হরেন ছাদে নেমেই বলল, “ধুত্তোর! ফের মিস কল্লাম। আবার বকুনি খেতি হবেনে।”

সুচরিতা তো আর সেসব কিছু দেখতে পায়নি, সোজা ছাদ থেকে নেমে এসেছে। তাছাড়া এ ব্যাপারে যা বোঝার তা বোঝা হয়ে গেছে। গতকাল রাতে ছেলেমেয়েগুলোকে প্রায় সবকথাই বলেছে সে, বলেনি কেবল সংকেত সমাধান করে ফেলার কথাটা। সরল মনের ছেলেমেয়ে। কাকে কোন মনে বলে ফেলবে, তখন আরেক জ্বালা। ওদের সঙ্গে প্ল্যান হয়েছে যে, আজ রাত্রেও ওরা সুচরিতাদের বাড়িতেই ঘুমোবে আর কালকে ভোররাতে ওই বাড়িতে অভিযান।

সবই তো হয়েছে, মায়ের সঙ্গে কেবল একটু আলোচনা করতে হবে। মা অনেক লজিক্যালি ভাবতে পারে। এইসব ভেবে সুচরিতা টুকটুক করে ঢুকল গিয়ে মায়ের কাছে রান্নাঘরে।

মা মেয়ে সেখানে কী গল্প করে সেসবে আর আমাদেরও কান পাতা ঠিক হবে না, তাই না? তার চেয়ে বরং চলুন, হরেন আর তার বসের কাছে। তারাও যে ঠিক কী করছে সেটাও তো জানা-টানা একটু দরকার!

ওদের আড্ডা ঘনিয়েছে কুমিররাজার বাড়িতে। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা ভাঙা বাড়িটাই যখন পাখির চোখ, কাজেই এখানেই ঘাঁটি গাড়তে নির্দেশ দিয়েছিল দুর্জন সিং। কুমিররাজার বাড়ির দোতলার কোনার ঘরটা আজ তার আদেশে বেশ পয়-পরিষ্কার। হবেই তো! বসের উইশ হল ওদের কম্যান্ড। বস এসে বসবে, কাজেই ধুলোময়লা সব সাফ।

গাছ থেকে পাকা পাতা পড়ার মতোই নিঃশব্দে হরেন মণ্ডল যখন জানালা বেয়ে ওই ঘরে নামল, অন্যরা তো ওকে দেখে চমকে উঠেছে! এক স্যাঙাত তো আতঙ্কে হরেনকে এক মোক্ষম ঘুসোও ঝেড়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস হরেন রেডি ছিল, পাতলা কঞ্চির মতো বডিটাকে জাস্ট একটু হালকা হিলিয়ে রক্ষা পেয়েছে।

যাই হোক, ধাতস্থ হতেই হরেনকে নিয়ে হাসিতে ফেটে পড়েছে স্যাঙাতরা। তা এমনটা তো খানিক হবেই। এমন চলন-বলন যার তিনি তো একটু লোকের মুখে মুখে রঙ্গ ব্যঙ্গ হয়ে ফিরবেনই। অবশ্য হরেন সেসব গায়ে মাখে না। তার কেবল আক্ষেপ, বসকে দেয়া কথাখানা রাখতে পারল না। তালেকদারবাবুর মেয়েটাকে ধরে আনতে পারল না। লম্বা একখানা শ্বাস ছেড়ে ধপাস করে মেঝেতে বিছানো শতরঞ্জিতে বসে পড়ে বলল, “নিঘঘাত আমারে বাহাত্তুরে পাইছে।”

“তা বয়স কত হল? বাহাত্তর?” সর্বকনিষ্ঠ ফচকে স্যাঙাত চিমসে বাঁকা হাসি মাখিয়ে প্রশ্ন করল।

তার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টি দিয়ে হরেন বলল, “দিনকাল কী এল মা! নাক টিপলে দুধ বেরোয় সেই ছ্যামড়া হরেন সর্দারের লগে মশকরা দেয়! এর চেয়ে বাজারে শাক বেচাই ভালো ছেল আমার।”

“তাই করো গিয়ে! ওরই উপযুক্ত তুমি।” পিছন থেকে আসা দুর্জন সিংয়ের পেটেন্ট চিঁ চিঁ আওয়াজে সবাই একেবারে তটস্থ হয়ে উঠল। দেখল কখন যেন এসে উদয় হয়েছে এক্কেবারে ভাঙা দরজাটির গোড়ায়। হরেনের দিকে নজর দিতে গিয়ে দরজার দিকে সবাই পিছন দিয়ে ফেলেছিল।

দুর্জন সিং বলে চলেছে, “এলাকায় বিরাট নাম দেখে অনেক ভেবে তোমায় দলে টানলাম, কাজ দিলাম, অথচ দেখো, লম্ফঝম্পই সার! একটা বাচ্চা মেয়ের লাথি খেয়ে ভেগে যায়!”

“আজ্ঞে লাথি আমি খাইনি কত্তা। সে খেইয়েছে আপনের ডানহাত বটা।”

বলার সঙ্গে সঙ্গে হুমদো বটা চেঁচিয়ে উঠেছে, “মিথ্যে কথা বোলো না! তোমার গর্দানে রদ্দা খেয়ে সর্ষেফুল দেখনি? বলোনি আমাকে?”

“তা আজ্ঞে কত্তা ঘাড় তো নরম জায়গা, ক’ন!”

“উহ্‌! নরম জায়গা! গ্রামে থাকে, এটুকু জানে না যে মেয়েটা কারাটে জানে! আবার বড়ো বড়ো কথা বলতে এসেছে!” ভেঙচি কেটে কথাগুলো বলেই দুর্জনের দিকে তাকিয়ে বটা বলল, “বস, ভূতের মতো আসাযাওয়া ছাড়া এই লোকটা কোনো কম্মের নয়। এটাকে কিছু দিয়ে বিদেয় করুন।”

“আজ্ঞে, বিদায় দিতে চাইলে তা দেন। কিছু চাই নে। আমারটুকুন আমি ঠিক গুছিয়ে নেবনে।”

“কীভাবে গোছাবে শুনি?”

বটার কথায় পান খাওয়া কালো দাঁতগুলো বিকশিত করে হরেন বলল, “কী আর করব বটাবাবা! ইখান থিকে যামু প্রিসিডিন্টের বাসা! তারে কমু যা কওনের লাগে। তারপর যেকালে গুপ্তধন উদ্ধার হইব...”  আধভাঙা গাঢ় খয়রি দাঁত বের করে হাত কচলে কচলে হরেন বলল, “আইজ্ঞে এই হাতযশের উপরেই যা ভরসা। বাকি জেবনটা বাঁচনের মতো ধন ঠিকই জুটায়ে নিতে পারুমনে।”

“এই জন্যে আমি লোক বেশি করিনি দলে। দেখছিস তো বটা! সেদিন তুই বলছিলি না, স্যার আপনাকে নিয়ে মোটে চারজন, কী করে কাজ হবে? নে এবার বোঝ, যাকেই দলে নিতি সেই এরকম ভয় দেখাত।” ভয়ানক চিঁ চিঁ রবে চেঁচিয়ে উঠল দুর্জন। তারপর হরেনের দিকে ফিরে কঠিন দৃষ্টিতে বলল, “শোনো হে! ভয় দেখাতে এসো না। নতুন লোক বলে ক্ষমা করে দিলাম। নইলে এটা দেখছ তো?”

কথা বলতে বলতে কখন যে দুর্জনের হাতে পুঁচকে একটা পিস্তল এসে উঠেছে কেউ খেয়ালই করেনি। হরেনের দিকে শীতল দৃষ্টি রেখে দুর্জন বলছে, “এটাকে যা তা ভেবো না! দেগে দিলে শুধু যে চোখে তুলসিপাতা পরবে তাই নয়, তোমার বডিটাও পুরো হাওয়া হয়ে যাবে। দেখবে?”

“আইজ্ঞা না কত্তা। আপনের মুখের কথায় যে আমার কী বিশ্বেস সে আর ক্যামনে কই?” হাত কচলাতে কচলাতে বলল হরেন, “বুড়া মানুষ, ছ্যামড়াগুলার কথায় কী কইতে কী কইছি, ক্ষমাঘেন্না কইরা দেন কত্তা।”

ওর কথায় দুর্জনের নাক থেকে ফোঁস করে খানিকটা শ্বাস বের হবার সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ইশারায় শতরঞ্জিতে বসতে বলে স্যাঙাতদের বলতে শুরু করল, “গতকাল হরেনের কাছেই সবাই শুনেছিস যে মেয়েটা সংকেত উদ্ধার করে ফেলেছে। সংকেত পেয়েও যে জায়গায় পৌঁছবে, আমার পূর্বপুরুষরা সেই জায়গায় যাওয়ার সহজ হদিশ আগেই আমায় দিয়েছিল। এই ব্যাটা বটা সেটা হারিয়ে ফেলেছে।” বলেই এমন কটমট করে তাকাল যে বটা হেন ধামসা একেবারে গুটিয়ে কেঁচো।

দুর্জন বলতে লাগল, “শেষমেশ স্বপ্নে আমার পূর্বপুরুষ এই মেয়েটার কথা জানালেন। সেজন্যই তো এর উপর এখন ভরসা করতে হচ্ছে। তাও মেয়েটাকে ধরে আনতে এই হরেন ব্যাটাকে নিলাম, কিন্তু সেও হল একটা যাকে বলে যাচ্ছেতাই। মুখেই মারিতং জগৎ। ধুস!”

হরেন কী যেন আরেকটা সুযোগ-টুযোগ এই জাতীয় কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু দুর্জন একেবারে তাতে হাঁ হাঁ করে উঠল, “কিচ্ছু করতে হবে না তোমাদের ওসব! অস্ত্রশস্ত্রগুলো সব রেডি করে এখানেই রাখবে, হরেন ছাড়া বাকিরা সারাদিন শুধু এই ঘরে থাকবে, একেবারে নিঃশব্দে। কারো আসার শব্দ পেলেই লুকিয়ে তাকে দেখবে। খবরদার, সে যেন দেখতে না পায়। আর যদি মেয়েটা হয়, তাহলে তো সঙ্গে সঙ্গে আমায় ফোন করে জানাবে।”

“আর কত্তা আমি?”

“তুমি যা করছ তাই করে যাবে। সবসময় ছায়া হয়ে ফলো করে যাবে মেয়েটাকে। কিছু অন্যরকম দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আমায় জানাবে।” বলে খানিকটা অন্যমনস্কভাবে বলতে থাকল, “তবে মনে হয় আজ কিছু করবে না। বিকেল থেকে তো আবার সবাই ঠাকুর হবেন!” বলেই ফের তাচ্ছিল্যের হাসিটা ঠোঁটে ফোটাচ্ছে এমন সময় বটার ভাই সন্টা বলল, “আপনি তো বস অসুর হচ্ছেন!”

সন্টার কথায় বটা আর মন্টুর সঙ্গে সঙ্গে হরেনও হেসে ফেলেছিল ফ্যাঁক করে। কিন্তু দুর্জন এমন দৃষ্টি দিল যে হাসি একেবারে মাঝপথে আটকে গেল। সেই দেখে দুর্জন তার চিঁ চিঁ স্বরে হিক্কা তুলে তুলে এইসান হাসি জুড়ল যে মাঝরাত্তিরে শুনলে নির্ঘাত মনে হবে যে আশেপাশে হায়নার দলবল ঘাপটি মেরে আছে।

হাসি-টাসি থামলে দুর্জন বলল, “খাওয়াদাওয়ার কী করছিস রে তোরা?”

“আজ রেয়াজি খাসি হয়েছে বস! হরেনদা এনেছে আর আমি রেঁধেছি। একটু দিই, চেখে দেখুন?” দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য সন্টা স্যান্ডো গেঞ্জির উপর থেকে সরু গলাটা তুলে বলল।

“দিবি? দে। তবে ওই প্রেসিডেন্টের বাড়িতে যা খাচ্ছি না, আহা! কী রান্না! গিন্নিমার ভক্ত হয়ে গেলাম এই ক’দিনে! মাংস যা রাঁধেন না! আহা! আর সেদিনের ওই এঁচোড় চিংড়ি, কী যে স্বাদ! ইচ্ছে করে এখান থেকে যে ধনরত্ন পাব তার থেকে দুটো একটা গিন্নিমাকে দিয়ে যাই।”

“সে কী কত্তা! এ যে মহিষাসুর দুগগা মায়ের ভক্ত হয়ে উঠেছে!”

হরেনের খ্যাঁক খ্যাঁক হাসির উত্তরে যে তাইশানিটা প্রাপ্য ছিল সেটা আপাতত ঠেকিয়ে দিল সন্টার রান্না করা খাসির হাড্ডি। ম্যারোটা চুষতে চুষতে আড়চোখে হরেনকে দৃষ্টি দিয়ে দুর্জন বলল, “মূর্খ! মহিষাসুর মায়ের সবচেয়ে বড়ো ভক্ত ছিল রে।”

হরেনের সেকথা বোধ হয় কানেও গেল না। সে নিজের স্থূল রসিকতায় নিজেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগল। এতটাই অসহ্য সেই হাসি যে দুর্জন তিতিবিরক্ত হয়ে হাত থেকে খাওয়া হাড্ডিটা সজোরে ছুড়ে মারল হরেনকে।

আর অমনি, “যাই গিয়া কত্তা। পরে দেখা করুমনে।” বলে একেবারে ভ্যানিশ হয়ে গেল হরেন।

হাড্ডিটা ঠকাস করে গিয়ে লাগল দেয়ালে আর ঝ্যাপাস করে খানিকটা ঝুল ময়লা পলেস্তারা খসে পড়ল মেঝেতে। খাসির স্বাদটাই দিলে মাটি করে। ছুড়ে ফেলে দিতে গিয়েও কাঁসার জামবাটিটায় ফের মন দিল দুর্জন। খাবার হলেন মা লক্ষ্মী। তাঁর সঙ্গে রাগ করলে চলে?


***


একতা সংঘের পুজোয় একেবারে যাকে বলে মারকাটারি ভিড়! গন্ধরাজ অ্যান্ড কোম্পানির প্ল্যানিং একেবারে হিট। ভিড় সামলাতে ভলান্টিয়ারদের একেবারে হিমশিম দশা। লোকাল পুলিশ স্টেশনে তো জানানোই ছিল, পাশের ইশকুলের হেড মাস্টারমশাইকে অনুরোধ করে তাদের এন.সি.সি-র ছেলেদেরও শৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত করা হয়েছে।

ভিড় যত বাড়ছে গন্ধরাজ গাঙ্গুলীর মেজাজ তত ফুরফুরে হচ্ছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য যে মঞ্চ হয়েছিল, সেইটেতে সেই যে চড়েছেন আর নামছেন না। কেউ নামতে বলার সাহসও পাচ্ছে না। গন্ধরাজ গাঙ্গুলী মাঝেমধ্যেই চেয়ার ছেড়ে উঠে উঁকি দিয়ে দিয়ে দর্শনার্থীদের লাইন দেখছেন, আর একেবারে শিশুর মতো খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠছেন। ন্যাড়া নকুল নস্করের মুখখানা মনে করে বোধ হয় তাঁর এত আনন্দ। কে জানে!

এর মাঝখানে কর্মকর্তাদের অনুরোধে বার দুয়েক গিয়ে সপ্তমীর পুজো দেখে এসেছেন মণ্ডপ থেকে। প্রতিমাও গড়েছে বটে নিতাই পাল! টানা টানা চোখের একেবারে মাতৃরূপ। গন্ধরাজ পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, ‘দেখো, পুজোর সাথে কোনো আপোস নয়। ওসব সিনারি-টিনারি, থিম-টিম সব শহরে হোক, একতা সংঘে হবে সাবেকি পুজো।’ নিতাই পাল কথা রেখেছে। এমন ডাকের সাজে মাকে দেখার ইচ্ছে যে কতদিনের তাঁর! পুজোর শেষে ওকে মোটা বকশিস দেবেন বলে ঠিক করলেন গন্ধরাজ।

মঞ্চে বসে মণ্ডপের চার-চারটে ঢাক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের হারমোনিয়াম পাখোয়াজ, আর দূরের মাইকের সানাইর একটানা সপ্তম সুরের মাঝে মাঝে দর্শনার্থীদের দুটো একটা কথাও কানে আসছে তাঁর। বেজায় প্রশংসা করছে তারা, যেমন মাতৃ প্রতিমার, তেমনই জীবন্ত দুর্গার। এক বয়স্ক মানুষ দুটি ছোটো বাচ্চাকে নিয়ে ঠাকুর দেখে ফেরার সময় ভিড়ের ঠেলায় অসুস্থ বোধ করছিলেন। স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের মঞ্চে, গন্ধরাজের পাশে বসিয়ে গেছে। বাচ্চাদুটো নিজেদের মধ্যে গল্পগাছা করতে করতে যেই না বলেছে, “এখানকার জীবন্ত ঠাকুর আমরা ক’জনের থেকে অনেক ভালো হয়েছে, বল দাদা!” অমনি দাদা আর বলবে কী, তার আগেই গন্ধরাজ গাঙ্গুলী তার মুখের কাছে কান নিয়ে বলেছেন, “কী বললি আরেকবার বল তো শুনি!” সেই ছেলে যতবার বলে তিনিও খুশিতে হা হা হাসেন আর বলেন, “আবার বল তো শুনি!”

এসব দেখে সে ভদ্রলোক কোনোরকমে ছেলেদুটির হাত ধরে রওনা দেবেন বলে যেই দাঁড়িয়েছেন, অমনি গন্ধরাজ বাজখাঁই গলায় উঠছেন চেঁচিয়ে। ভদ্রলোক বোম পড়ল না বাজ পড়ল বুঝতে না পেরে ধপ করে বসে পড়তে পড়তে দেখলেন, গন্ধরাজ ফের অমনি চেঁচাচ্ছেন আর লাফিয়ে লাফিয়ে কাকে ডাকছেন।

না, ভয়ের কিছু নয়। বেলুনওয়ালা আর মুখোশওয়ালাকে ডাকছিলেন। বাচ্চাদুটোকে মুখোশ আর বেলুন কিনে দিয়ে ভদ্রলোককে কোল্ড ড্রিঙ্ক খাইয়ে তারপর ছেড়েছেন। ওদের ছেড়েই ভাবলেন, নাহ্‌, এবার একবার লুকিয়ে লুকিয়ে জীবন্ত দুর্গামাকে দেখেই আসা যাক। লুকিয়ে লুকিয়ে, কারণ গতকাল রিহার্সালের পর গিন্নির সঙ্গে একটু মশকরা করছিলেন যখন, তখনই গিন্নি একেবারে সত্যি সত্যি দুর্গামায়ের মতোই তাঁকে এইসা শাসিয়েছেন না যে ভাবলেও ভয় করছে! বলেছেন গিন্নি, ‘যদি একবারও দেখি যে মণ্ডপের নীচে দাঁড়িয়ে আমায় দেখছ, তাহলে তক্ষুনি নেমে চলে আসব। একদম ওই মণ্ডপে ঢুকবে না তুমি!”

কিন্তু না গিয়ে কি পারা যায়? তাছাড়া ও তো গিন্নির রাগের কথা। দুর্গারূপী গিন্নিকে না দেখতে পেলে তাঁরও যেমন খারাপ লাগবে, তেমন গিন্নিও ফেরত এসে কুরুক্ষেত্র বাধাবেন। এইসব উভয়সঙ্কট অবশ্য গন্ধরাজের মতো অভিজ্ঞ পতিদের খুব বেশি ভাবায় না। তবে একেবারেই বা ভাবায় না বলি কী করে! নইলে মণ্ডপে যেতে প্রেসিডেন্ট আবার লোকজনের খোঁজ করে কেন?

যাই হোক, শেষ অবধি লাবণ্যের সঙ্গে মণ্ডপে পৌঁছেছেন গন্ধরাজ। কিন্তু এইটুকু পৌঁছোতেই তাঁর প্রায় সাড়ে সাত মিনিট লেগেছে। একেবারে ঠাসাঠাসি! তার মধ্যে এই বাচ্চার চ্যাঁ, ওই বাচ্চার ভ্যাঁ, এর নস্যি নেওয়ার ছরছর ছরছর, ওর শ্লেষ্মার ঘরঘর, এর ঘাম, ওর হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ নাম—একেবারে কম্পলিট প্যান্ডিমোনিয়াম! হাঁপ ধরে গেছে গন্ধরাজের। তবুও বুকে শান্তি, মুখে বিজয়ীর হাসি।

মণ্ডপের এন্ট্রি পয়েন্টে নারকেল দড়িতে ভিড় আটকাচ্ছে না বলে একেবারে বলদ বাঁধার মোটা দড়ি নিয়ে এন.সি.সি-র দুই বাঘা ক্যাডেট। তারা প্রেসিডেন্টকেও রেয়াত করে না। একবারে দশজনের বেশি এন্ট্রি নেই। দায়িত্ববোধের জন্য তাদের স্পেশাল পুরস্কারের কথা ভাবছেন, এমন সময় ভিতরে ঢোকার সুযোগ এল।

দড়ি উঠেছে! দড়ি ওঠেনি তো যেন বাঁধ ভেঙেছে! লাবণ্য চটজলদি গন্ধরাজকে নিয়ে ভিতরে না ঢুকে এলে আজ ঠিক একটা কেলেঙ্কারি হত। হো-ও-ও করে ভাইকিং দস্যুদের মতো একেবারে সবাই ভিতরে ঢুকে পড়েছে। ভিতরে ঢুকেই সব একেবারে চুপ।

ওফ্‌! কী খেল দেখিয়েছে নারু! আলোয় আলোয় এমন কেরদানি করেছে যে একেবারে মহাপ্রলয়। তার সঙ্গে লাগসই আবহ। চারদিক একেবারে দুলছে যেন। অবশ্য তারপর গন্ধরাজ বুঝলেন দুলুনিটা নারুর স্পেশাল এফেক্ট নয়, শরীরের ধকল। যাই হোক, মেঘ-বৃষ্টি-বজ্রপাত পেরিয়ে উদয় হলেন সসন্তান মা দুর্গা।

আহ্‌! কী রূপ গিন্নির! থুড়ি দুর্গা মায়ের। হাত আপনিই বুকের কাছে উঠে এল। মেক-আপ ম্যান অন্যসময় বাজারে চাউমিন বেচলে কী হবে, জাদু আছে হাতে। শুধু মা দুর্গা কেন, সব্বাইকে কী মানান মানিয়েছে! আর কী আশ্চর্য, একবিন্দু নড়ছে চড়ছে না কেউ! গিন্নির জন্য কষ্ট হচ্ছে। ইস, গেঁটে বাত! তবুও এমনি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা! সব তাঁর জন্য। একরাশ ভালোলাগার মধ্যে একটু অপরাধবোধ যেন চাগাড় দিয়ে উঠল গন্ধরাজের। সে অবশ্য কয়েক লহমার। পরমুহূর্তেই ভাবলেন, রাতে অয়েল অফ উইন্টার গ্রিন মালিশ করে দেবেন নিজের হাতে। গতবছরই মেয়ে উটি থেকে এনে দিয়ে গেছে।

এক্সপ্রেশন দিচ্ছে কিছু চিঁ চিঁ ভীম দুর্বল সিং! গিন্নির হাতের ত্রিশূল একেবারে যেন ফুটে রয়েছে বুকে। মুখে তাও কেমন যুদ্ধ যুদ্ধ দাঁত খেঁচানো ভাব। হাতের গুলিগুলো গন্ধরাজ গাঙ্গুলীর গলার মতো। একরাশ বাবরি আর গালপাট্টা গোঁফে দুর্জন সিংকে একেবারে আগমার্কা অসুর মনে হচ্ছে। কিন্তু ও কী!

অসঙ্গতিটা চোখে পড়তেই ভুরু কুঁচকে গেল গন্ধরাজের। এত ঘন দুধে তো এই একবিন্দু চোনাও ফেলতে দেওয়া যাবে না! ভাবতে ভাবতেই বাঁশি ফুঁকে কোত্থেকে হাজির হয়ে গেল ডিরেক্টর অমল। অমনি বাইরে মোটা পর্দা পড়ে গেল। পাঁচ মিনিটের বিরতি। ভিতরের লোকেরা সবাই বেরিয়ে গেল, কেবল গন্ধরাজ আর লাবণ্য একটা কোণে দাঁড়ালেন এক্সিট গেটে থাকা ভলান্টিয়ারকে বলে।

বিরতি শুরু হতেই সবার আগে উঠে দাঁড়াল মহিষাসুর। উঠেই একটা কোণে গিয়ে ফস করে একটা বিড়ি ধরাল। গন্ধরাজের চোয়াল শক্ত। একবার যদি বাইরে রটে মহিষাসুর বিড়ি খাচ্ছে, কী হবে তাহলে! কত বড়ো বেয়াক্কেলে! মা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশের সামনে বিড়ি খায়! আরে অসুর হলেও তো মহিষাসুর! একটা আভিজাত্য থাকবে না! নেহাত গিন্নি আছেন, নইলে এক্ষুনি ওর ধূমপানের নেশা ঘুচিয়ে দিতেন গন্ধরাজ। তবুও দাঁত কিড়মিড়িয়ে সহ্য করেছিলেন, কিন্তু যখন দেখলেন ফের সেই মহিষাসুর থেকে থেকে মা সরস্বতীর দিকে নজর দিচ্ছে, মাথাটা গনগনিয়ে উঠল। তড়াং করে গিয়ে পড়লেন অসুরের সামনে।

“এই বেয়াদব! তখন থেকে দেখছি তোকে মা সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে থাকতে। ব্যাটা ত্রিশূলের খোঁচায় মরছিস তখন নজর তোর কোথায় থাকবে? যিনি মারছেন তাঁর দিকে, নাকি তাঁর বামপার্শ্বে থাকা দেবীর দিকে?”

লাবণ্য গন্ধরাজকে সামলাতে সামলাতে বলল, “আস্তে দাদা, আস্তে! বাইরে দর্শনার্থীরা শুনতে পাবে!”

মুহূর্তে গলা খাদে নামিয়ে খিঁচিয়ে বললেন গন্ধরাজ, “আর তোর হাতে ওটা কী? লোকে ঠাকুর দেখতে এসে তামাকের গন্ধ শুঁকবে? ওরে অবোধ, বোঝ তুই কত বড়ো অসুর! পারফেক্ট ব্লু ব্লাড রে তোর। এমন ওমন করিস না সোনা অসুর। কী যে মানিয়েছে না তোকে! ভুল করলে সব পণ্ড হয়ে যাবে!”

গন্ধরাজের এই বকার মধ্যে যে প্রশংসা আর ভালোবাসার ছোঁয়াটা ছিল, দুর্জন সিংহের মতো মানুষকেও তা গলিয়ে ফেলল। বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় কাত করে সে বলল, “আর হবে না। দেখবেন!”

গন্ধরাজ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “সবাই একেবারে জ্বালিয়ে দিচ্ছ। দারুণ হচ্ছে! সবার জন্য ভোজ ডিউ রইল।” তারপর গিন্নির দিকে তাকাতেই তিনি ঝাঁঝি দিয়ে বললেন, “প্রণামের আদিখ্যেতাটা আবার জুড়লে কেন?”

প্রত্যুত্তরে ঘামে ভেজা চিকনের পাঞ্জাবি ঢাকা মাখন মাখন ভুঁড়িতে ঢেউ খেলিয়ে বাজখাঁই হাসিতে ফেটে পড়লেন গন্ধরাজ।

ওদিকে আবার সময় হয়ে এসেছে পর্দা তোলার, কাজেই লাবণ্য গন্ধরাজ গাঙ্গুলীকে নিয়ে হাসতে হাসতে বের হয়ে এলেন এবার। কুশীলবরাও যে যার আসনে আসীন হলেন। খুশি মনে বাইরে আসতে না আসতেই ডিরেক্টর অমলের বাঁশি শোনা গেল।

বেরিয়ে এসেই ঘড়ি দেখে ‘ইস!’ করে উঠলেন গন্ধরাজ। লাবণ্য জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললেন, “সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। এত খাটছে ওরা! ওদের জন্য চাউমিন, মোগলাই, কোল্ড ড্রিঙ্ক-টিঙ্ক আনাও। পরের ব্রেকেই যেন সবাই খেয়ে নিতে পারে।”

বলেই ঠিক শিশুদের মতো তালি দিয়ে ছোট্ট একটা লম্ফ দিয়ে বললেন, “ইস! ন্যাড়া নকুলের মুখটা যদি একবার দেখা যেত!”


রাত প্রায় সাড়ে দশটা অবধি জীবন্ত দুর্গা দেখতে পেয়েছেন গাঁয়ের মানুষজন। কথা ছিল দশটা পর্যন্ত, কিন্তু ভিড়ের বহর দেখে তা আধা ঘণ্টা বাড়াতেই হয়েছে। পাশাপাশি মণ্ডপের ভিতরে থাকার সময়ও দর্শনার্থীদের জন্য কমাতে হয়েছে। যাই হোক, প্রথমদিনের বহর থেকে পুজো কমিটিও অনেক শিক্ষা নিয়ে পরের দিনের জন্য নানান নিয়মনীতি বেঁধেছেন। আমাদের সেদিকে গিয়ে কাজ নেই, আমরা বরং গপ্পের সঙ্গে এগিয়ে চলি।

যা বলছিলাম। রাত্তির সাড়ে দশটায় যখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেদিনের মতো জীবন্ত প্রতিমা দর্শনের পরিসমাপ্তি ঘোষিত হল তখন আর সুচরিতাদের আনন্দ দেখে কে? আর পারছিল না। টানা এই পাঁচ ঘণ্টা! উফ্‌! তবে সব ক্লান্তি ভোলা যায় দর্শকদের মুখগুলো আড়চোখে মাঝেমধ্যে দেখে আর তাদের কথাবার্তা শুনে।

ওরা তো সবাই নেমে এসেছে মঞ্চ থেকে, ওদিকে গিন্নিমা আর নামতে পারছেন না।

“ওরে! আমায় নামা রে!”

গিন্নিমার কাতর আবেদনে সবার আগে যে ছুটে এসেছে তার নাম দুর্জন সিং। আর কাকে লাগে? গিন্নিমার পায়ের কাছে হামাগুড়ি দেওয়ার মতো করে বসে বলছে, “আমার পিঠে পা দিয়ে নামেন মা।”

“মুখপোড়া হুমদোটাকে কেউ সরা তো!”

কে সরাবে? যেই এগোয়, সেই বাহুবলী চিঁ চিঁ ভীম দুর্জন সিংয়ের নজর দেখে পিছিয়ে যায়। তার জেদ গিন্নি মা ওর পিঠে চেপেই নামবেন। ওদিকে গিন্নিমাই তাকে বাবা সোনা বলে রাজি করিয়ে উঠিয়ে শেষমেশ তারই হাত ধরে নামলেন।

ব্যথার বহর খানিক কমলে কোঁচকানো মুখ সোজা করে হাসতে হাসতে বললেন, “এমন ন্যাওটা অসুর আর কোন দুগগা মায়ের কপালে জুটেছে কোনোদিন কে জানে!”

লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ সবাই মিলে দুর্গা মায়ের সঙ্গে সারা সন্ধ্যার গপ্পগাছা জুড়ল, রাতের খাবারের প্যাকেটও এসে গেল এরই মধ্যে। কর্মকর্তারাও সবাই হাজির হয়ে সাফল্যের ফাঁকফোকরের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। কেবল দুর্জন সিং ফ্রুটির পাউচে চুমুক দিতে দিতে দুর্গা মায়ের দিকে তাকাতে তাকাতে একবার অজান্তেই মা বলে ডেকে উঠল। অমনি চারপাশটা দেখে নিয়ে হাতের চেটো দিয়ে চোখদুটো ডলেও নিলে। কেউ লক্ষ করলে না। কেবল মণ্ডপের মোটা পর্দার পাশ থেকে কার একটা সিড়িঙ্গে ছায়া টুক করে সরে গেল।

সবকিছু মিটে গেলে বাড়ি যাবার পালা। আগে থেকেই তো কথা হয়ে আছে, সেইমতো লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ চার ভাইবোন চলল সরস্বতীদিদি মানে সুচরিতাদের বাড়ি।

বাড়িতে ঢুকে যথাবিধি হই-হট্টগোল, হাসিঠাট্টা, আনন্দ পর্বের শেষে খাওয়াদাওয়ার পর্ব পার করে সবাই এসে বসেছে সুচরিতার ঘরে। অবশ্য শুধু ছোটো ছেলেমেয়েগুলো একা নয়, সুনেত্রা এবং তপোধীরও তাদের সঙ্গে আছেন।

সুচরিতা সুনেত্রাকে বলেছিল, সুনেত্রা ভাবনা-চিন্তা করে তপোধীরবাবুকেও ব্যাপারটা জানিয়েছেন। কাজেই ওঁরা দু’জনেই ওদের আলোচনায় আজ সামিল।


***


দেয়ালঘড়িতে তখন রাত্তির প্রায় দেড়টা। লম্বা হাই তুলছেন তপোধীরবাবু। ছেলেমেয়েগুলোর মুখে কিন্তু ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। ওরা টানটানভাবে অপেক্ষা করছে ভোর রাতের। রাত তিনটে পনেরো নাগাদ ওরা বেরোবে ওই রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। তপোধীরবাবু আজ আর ঘাবড়াননি। কারণ, প্রথমে সুচরিতার সঙ্গে কুমিররাজা তিনভাইয়ের, তারপর বাজারে মাংস কিনতে গিয়ে নিজের সঙ্গেও কোন অশরীরীর মোলাকাতের পর তাঁর মনেও সাহস জুটেছে। 

উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে ছেলেমেয়েগুলো। দুটো বাজল। রাত ঘন বলে দূর থেকে হাই রোডে ছুটে চলা গাড়ির শোঁ শোঁ আওয়াজ কানে আসে। রাতচরা পেঁচার ডাক নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে দেয়। আরও কত মিহি আওয়াজ ভেসে ভেসে আসে। সুচরিতা কার্তিককে জিনিসগুলো গুছিয়ে নিতে বলে। জিনিস আর কী—টর্চ, দড়ি একটা শাবল আর দুটো ছেনি হাতুড়ি। এছাড়া মশা থেকে বাঁচতে ওডোমস আর পোকামাকড় থেকে বাঁচতে কার্বলিক অ্যাসিড। ছোটো ছোটো চারটে কিট ব্যাগে চারজনের পিঠে থাকবে। অবশ্য দুর্জন সিং এলে যে কী দিয়ে আত্মরক্ষা করা যাবে সে নিয়ে সুচরিতার একটু চিন্তা আছে। যদিও মা ব্রহ্মাস্ত্র ভরে দিয়েছেন চারটে কৌটোয়, সবার পকেটে তা আছেও, কিন্তু তা দিয়ে কতটা যে আটকানো যাবে ওদের সে কে জানে।

কার্তিক-গণেশের মতে দুর্জন সিং জানতেও পারবে না যে এই ভোররাতে তারা অভিযান চালাবে। কিন্তু সুচরিতার ধারণা অন্য। সে ভাবছে, যারা আগেরদিন রাতে প্রথম আসা একটা মেয়েকে পরদিন সন্ধ্যায় ঠিক চিনে নিয়ে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করে, তারা নিশ্চয়ই এতটা বুদ্ধু হবে না। নিশ্চয়ই নজর রেখেছে গোটা ব্যাপারটায়। অবশ্য সেদিন ওই বাড়িতে গিয়ে কৃষ্ণচিত্রের আশেপাশে তেমন কিছু দেখেনি। বোধ হয় ওরা গুপ্তধনের কক্ষ এখনো খুঁজে পায়নি। কাজেই সেটা না পাওয়া অবধি ওরা কিছু করবে না। কিন্তু তারপর? অবশ্য মায়ের সঙ্গে একটা প্ল্যান ছকা আছে, আশা আছে সেটা কাজে দেবে। দেখা যাক কী হয়।

আড়াইটে। রাত আরও গাঢ়। কাছেপিঠেই কোথাও থেকে সাপে ব্যাঙ ধরার চ্যাঁ চ্যাঁ আওয়াজ ভেসে আসছে। ইল্লিদের গোয়ালে বোধ হয় গরুটা ডাকছে। বাঘার চেঁচামেচিও শোনা গেল। কিছু কি দেখল? কী দেখল?

চারজনে দরজা খুলে বারান্দায় এল। শিউলির গন্ধে বারান্দা ভরে আছে। ওদের বাইরে আসার শব্দে অথবা দরজা চুঁইয়ে আসা একফালি আলোতে বারান্দার ঘুলঘুলিতে থাকা চড়ুইদুটো হঠাৎ খড়খড় করে উঠল। এরই মধ্যে হঠাৎ দুটো জ্বলন্ত চোখ এগিয়ে আসতে দেখা গেল এদিকে। সুচরিতা কার্তিককে জিজ্ঞেস করল, “এদিকে খাটাস আছে নাকি রে?”

“না তো! সেরকম তো শুনিনি কখনো দিদি।”

চোখদুটো হঠাৎ মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। সত্যিই, রাত্তিরে যে কতকিছু হয়!

সেরকম কিছু দেখল না বলে ওরা ঘরে ঢুকে পড়ল। তবে আর একটু ভালোভাবে যদি দেখত তাহলে কি আর ওদের জানালার উপর ঝুলে থাকা অমন ছায়ামূর্তি চোখে পড়ত না?

রাত তিনটে। যেমন কথা, তেমন কাজ। ওডোমস মেখে কিট ব্যাগ কাঁধে চারমূর্তি বেরিয়ে পড়ল বাইরে। ওদের ক্ষীণ টর্চের আলো যখন মিলিয়ে গেল ইল্লিদের বাড়ির বাঁকে সুনেত্রা তপোধীরকে বললেন, “কার একটা ছায়া ওদিকে সরে গেল না?”

তপোধীরবাবু সেকথার উত্তর না দিয়ে বললেন, “চলো। আমাদেরও যে বেরোবার সময় হল।”

খানিক বাদেই আরও দুটো ছোটো টর্চের আলো এগিয়ে চলল কুমিরগঞ্জের পথে। না, যেদিকে সুচরিতারা গেছে সেইদিকে নয়, ঠিক তার উলটোদিকে।

ইল্লিদের বাড়ির সামনে থেকেই বাঘা ওদের সঙ্গে জুটে গেছিল। সুচরিতাও বাধা দেয়নি। বরং ও থাকলে একটু সুবিধাও আছে। সামান্য থেকে অতি সামান্য শব্দও বাঘার কান এড়ানো ভার। কাজেই এই সমস্ত অভিযানে সঙ্গে একটি সারমেয় থাকা অনেক কার্যকরী। বাঘাই আগে আগে চলেছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। ভোররাতের আবছায়ায় চারটে ছায়ামূর্তি চলেছে বাড়ির উঠোন পেরিয়ে, পুকুর পেরিয়ে, আলপথ ধরে সোজা কুমিররাজার বাড়ির দিকে।

চারজনের কারোরই তেমন অভিজ্ঞতা নেই ঘোর রাতে এমনি অভিযানের। মাঝে মাঝেই পুকুরপাড় থেকে সড়সড় করে শব্দ হচ্ছে। ভয়ে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়ছে, কেউ-বা সরু টর্চ জ্বালিয়ে দেখে নিচ্ছে আশপাশ। সুচরিতা ওদের বলেছে যতটা সম্ভব কম টর্চ জ্বালাতে, ভাঙা বাড়ির আশেপাশে তো একেবারেই নয়।

সুচরিতা কেবল খুঁজে চলেছে সেদিনের সেই সুড়ঙ্গমুখটা। জায়গাটায় এসেও কিছুতেই ঠাওর করতে পারছে না।

“এখানে এলে কেন দি? ওই পাশটা দিয়ে তো সোজা ক্ষেত পার হয়ে রাজবাড়িতে ঢোকা যেত!” লক্ষ্মী বলল।

“ওই পথে নজরদারি থাকতে পারে। এখানে রাজবাড়িতে ঢোকার সুড়ঙ্গপথটা আছে। কিন্তু ঠিক কোন জায়গাটা ঠাওর হচ্ছে না। দাঁড়া, একটা কাজ করি।” কথাটা বলে চোখ বন্ধ করে সেই দিনের পথটা কোথায় শেষ হল সেই কথাটা মনে দেখতে চেষ্টা করল সুচরিতা।

মনে পড়ল, পুকুরের পাশ দিয়ে গিয়ে গোয়ালের পিছন দিকটার আশেপাশে কোথাও সেই পাঁচিলটা হবে। মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দিকটা ঠিক করে ইশারায় সেই দিকটা দেখিয়ে ধীরে ধীরে এগোল সুচরিতা। গোয়ালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা গরু এমন জোরে ডেকে উঠল যে সবাই একেবারে চমকে উঠল। এমনকি বাঘা অবধি ভৌউউউ করে ডেকে উঠল।

সেদিনের সেই জায়গাটায় এসে উঠল ওরা। পেনসিল টর্চের আলোয় সেই ভাঙাচোরা দেয়ালটায় দেখতে থাকল সুচরিতা, কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না। কী করা! চোখ বন্ধ করে স্মরণ করতে শুরু করল রাধামোহনকে।

খানিক বাদে পরিচিত গলার শব্দ শুনল, “কী গো মেয়ে? ডাকছ কেন বলো তো? ওমা! এ তো একেবারে সৈন্যসামন্ত নিয়ে এসেছ গো!” বলে একটু চুপ করে ফের হাসতে হাসতে বললেন, “তা ভালোই করেছ। তাদেরও তো সৈন্য কম নেই! তা তোমার সেনারা যুদ্ধ জানে তো গো মেয়ে?”

“আপনারা আছেন তো আমাদেরও সাথে!”

“না গো মেয়ে! ওই সাথে থাকা অবধিই, কিছু করার ক্ষমতা আমাদেরও আর নেই। মরে যাওয়ার পর সাধনা করে দেহ ধরার কৌশল আয়ত্ত্ব হয়তো করা যায়, কিন্তু তোমাদের জগতের কোনো কিছু ধরার আর ক্ষমতা থাকে না, বুঝলে? দুটো সময়ের যে বিস্তর ফারাক, তাই না?”

রাধামোহনের কথাগুলো ইন্টারেস্টিং হলেও এখন আর এগোতে দিল না সুচরিতা। হুড়মুড় করে বলল, “প্লিজ আমাকে সেদিনের সুড়ঙ্গটা একটু দেখান। খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই।”

“সে কী গো মেয়ে! তোমার তো দারুণ চোখ! শোনো তোমায় বলি, যা চোখে দেখতে পাওনা অথচ আছে বলে জানো তাদের খুঁজতে হয় চোখ বন্ধ করে। মনের চোখ দিয়ে। দেখো তো পারো কি না।”

রাধামোহনের কথা শুনে চোখদুটো বন্ধ করে একাগ্রচিত্ত হল সুচরিতা। যত একাগ্র হয় তত যেন ভাঙা দেয়াল গোটা হয়ে ওঠে। ওই তো দেয়ালের মাঝামাঝি একটা কুমিরের এমব্লেম!

“একদম ঠিক!” মনের ভিতর থেকে যেন শিশুর মতো আনন্দিত হন রাধামোহন। “এবার ওই কুমিরের সামনের দাঁতটায় চাপ দাও দেখি!”

যন্ত্রের মতো এগিয়ে গিয়ে তাই করল সুচরিতা, আর অমনি হালকা ঘড়ঘড় শব্দ করে খুলে গেল সুড়ঙ্গের দুয়ার!

সুচরিতার সঙ্গীসাথীরা তো হাঁ! ভাঙা দেয়ালের কোথায় কী করল দিদি! গণেশ তো বলেই ফেলল, “দিদি, তোমার তো অনেক ক্ষমতা!”

কথা না বাড়িয়ে ওদের নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ল সুচরিতা। বাঘা তো কিছুতেই ঢুকবে না! লেজ নামিয়ে, কান নামিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। শেষে সুচরিতা এসে মনে মনে ওকে সাহস দিল। রাধামোহন আজ দারুণ একটা শিক্ষা দিয়েছেন ওকে। সত্যি সত্যি সেই বাঘাও ওর কথা শুনে সুড়সুড় করে এসে ঢুকল সুড়ঙ্গে, আর অমনি ওদের পিছনের দরজাটা গেল বন্ধ হয়ে।

‘মা’! বলে হালকা চেঁচিয়ে উঠল লক্ষ্মী। সুচরিতা ওর ভাইবোনদের সবাইকে জড়িয়ে ধরে সাহস দিল। বলল, গোটা গ্রামের জন্য আজ ওদের এই গুপ্তধন উদ্ধার করতেই হবে। কোনো ভয় নেই। যাদের এই ধন, তাঁরা নিজেরা ওদের সহায়। বলেই রাধামোহনের কাছে অনুরোধ করল ওদের দেখা দেওয়ার।

তা তো হল না। তবে সুচরিতার আবেদন শেষ হতে না হতেই প্রদীপের শিখার মতো নীলচে সাদা এক আলো উঠল ফুটে।

সুচরিতাকে জড়িয়ে ধরল ওর ভাইবোনেরা। সুচরিতা ওদের মাথা নেড়ে দিয়ে বলল, “কোনো ভয় নেই। চল।”

সেই নরম আলোয় আজ সুড়ঙ্গটা মায়াময়, রহস্যপূর্ণ। সুড়ঙ্গের দেয়ালে, ছাদে গাছের শিকড় ঝুলছে। মৃদু আলোয় তাদের নানান দৈর্ঘ্যের স্থবির ছায়া। নিজেদের পায়ের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, সুচরিতা ইশারায় আওয়াজ কম করতে বলল। এবার শুধু পায়ের চাপে নুড়ি পিষে যাওয়ার শব্দ। মধ্যে মধ্যে খাঁজ-খোঁজ থেকে মেঠো ইঁদুরের জ্বলন্ত চোখ উঁকি দিচ্ছে। ভাগ্যিস বাদুড় নেই!

কয়েকটা বাঁক ঘুরে পথটা উঠছে। এখানে নুড়ি নেই, বোধ হয় পাথর বাঁধানো। নীলচে সাদা আলোর প্রতিফলনে উঁচু পথের সিঁড়িগুলোকেও আলোর সিঁড়ি মনে হচ্ছে। কোত্থেকে একটা টানা শিসের শব্দ শোনা যায়। বাঘার গলা থেকেও একটা হুম হুম শব্দ। বাঘার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুচরিতা দেখল সিঁড়ির পঞ্চম ধাপে দুটো লম্বা সাপ একে অন্যকে পেঁচিয়ে ফণা তুলে দুলছে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। যাবে কী করে? আর যদি সেই সাপ এদিকে আসে! বাবা রে!

আলোটা সাপদুটোর ঠিক মাথার উপরে গিয়ে দুলছে। কেমন এক ছন্দে দুলছে। সাপদুটো আলাদা হয়ে গেল। ফণা নামিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে ওদেরই দিকে। সুচরিতা সাবধান করল সবাইকে, “একটুও নড়বি না কেউ! যাই ঘটুক, নড়বি না।”

একেবারে গায়ের পাশ দিয়ে সরসরিয়ে চলে গেল সাপদুটো। কার্তিক অস্ফুটে বলল, “গোখরো!”

আলোটা ওখানেই দাঁড়িয়ে। ওরাও সেই দিকেই চলল। বেশ কয়েক ধাপ উঠে ওঠার পালা শেষ, সামনে দেওয়াল। এইবার কী হবে? সুচরিতার দিকে তাকাল সবাই।

সুচরিতা দেয়ালটা খুব ভালোভাবে দেখতে থাকল। দেখতে দেখতে যা খুঁজছিল পেয়েও গেল। কুমিরের এমব্লেম। মুখ, তবে এখানে তা আরো ছোটো। আগের মতোই দাঁতে চাপ দিতেই দেয়াল সরে পথ তৈরি হল। একে একে সবাই উঠে এল কুমিরগঞ্জের রাজবাড়ির দোতলার মাঝখানের ঘরটায়। আর যেই না সুচরিতা সবার শেষে এস ঢুকল, অমনি উপর থেকে একটা জাল এসে পড়ল ওদের উপর।

হরেনের গলা শোনা গেল, “আলোখান লইয়া আয়েন কত্তা! দ্যাহেন ক্যামন মাছ ধরছি ড্যাঙায়!”

সুচরিতা বুঝতে পেরে বাঘাকে বলল খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে ঘর থেকে পালিয়ে যেতে। বাঘাও কী বুঝল কে জানে, ভুক করে শব্দ করে তুমুল স্পিডে ঘরে ঢুকেই বেরিয়ে গেল।

খানিক চমকে উঠেই সামলে নিয়ে কালি পড়া হারিকেন নিয়ে এগিয়ে এল দুর্জন সিংয়ের স্যাঙাতরা। পিছনে এল দুর্জন নিজে। হারিকেনের টিমটিমে আলোয় ঠিক মূর্তিমান শয়তান মনে হচ্ছে প্রত্যেকটাকে।

এদিকে এইরকম অভ্যর্থনার জন্য তো আর ছেলেমেয়েগুলো তৈরি ছিল না! ওরা তো জানত এই ভোর রাত্তিরে নির্বিঘ্নে গুপ্তধনের খোঁজ করবে। কত কী নিয়ে এল খোঁড়াখুড়ি করার জন্য, অথচ এসেই ধরা পড়ে যাওয়া! সব এই হরেনকাকার জন্য।

লক্ষ্মী ভয়ানক রেগে গিয়ে বলল, “হরেনকাকা! তুমি এত মিটমিটে শয়তান! দাঁড়াও, বাবাকে বলে তোমার কী দশা করি দেখো।”

উত্তরে হরেন ওর পান-খয়েরে কালো হয়ে যাওয়া সাত ভাঙা দাঁত বের করে গা জ্বালানো হাসি দিতেই সুচরিতা প্রচণ্ড শীতল গলায় বলে উঠল, “দাঁতের যে দশা বানিয়েছেন তাতে আর ক’দিন এই হাসি থাকে আপনার সে আমরা দেখব। খুব বেশি হলে আর ছ’মাস। তারপরে আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই।”

ম্যাজিকের মতো হাসি শুকিয়ে গেল হরেনের। খিঁচিয়ে বলে উঠল, “এহ্‌! বড়ো আমার ডাক্তার এয়েচেন!”

“এসেছি কি না মিলিয়ে নিন। পান খেলে আপনার এখন মাড়ি জ্বলে, জিভে মাঝে মাঝে ফোঁড়া হয়, মাঝে মাঝে গলা ভাঙে, হয় কি না?”

হরেন বাসি শিঙাড়ার মতো দুর্জনের দিকে তাকায়।

“ওর দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। ওর কথাও না হয় পরে বলব। আগে আপনারটা সারি! নিত্যিদিন আপনার পেটব্যথা হয়, সকাল হলেই ঘং ঘং করে কাশি হয়। হয় তো?”

হরেন সত্যি সত্যি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

সুচরিতা বলে চলে, “বললাম তো আয়ু কদ্দিন আর! তবুও যে পরিমাণ পাপ জমাচ্ছেন এখানেও, তাতে তো ওপারে গিয়েও রৌরব নরকে গরম তেলে ছ্যাঁকাপোড়া হতে হবে! কেন করছেন? খুলুন আমাদের!”

হরেন কিংকর্তব্যবিমুঢ়ের ভাব করে খানিক দাঁড়িয়ে ফের গা জ্বালানি হাসিতে ফেটে পড়ে।

“কী শয়তান লোক গো মেয়ে! এতকিছু বললাম তবুও ভয় পেল না!” সুচরিতার কানে কানে রাধামোহন বললেন।

কথাটা সত্য বটে। সুচরিতার মনের ভিতর থেকে রাধামোহনই এতক্ষণ তথ্যগুলো সরবরাহ করছিলেন। কিন্তু হরেনের মতো দাগীর তাতে কিছুই হল না।

“ওসব ভয় আমার নাই গো দিদিমণি। তবুও তো আপনে ছয় মাস কইলেন, আমি তো কাশির ঠেলা আইলেই ভাবি আর বুঝি দম নেওয়া হইল না!” হরেন বলল।

কার্তিক, লক্ষ্মী, গণেশ এবার বিরক্ত হয়ে জাল ধরে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে।

“তোমরা যদি কথা দাও অকারণে হুজ্জুত করবে না তাহলে আমি তোমাদের জাল থেকে বের করে আনতে পারি।” চিঁ চিঁ গলায় শুরু করেও বেশ একটা ভারিক্কি গলায় কথাগুলো শেষ করল দুর্জন সিং।

“তুমিও তো কম শয়তান নও। দিদির কাছে শুনেছিলাম বটে, কিন্তু তুমিই সেই কি না এই নিয়ে আমরা সন্দেহে ছিলাম। কারণ তুমি আমাদেরও সাথে একসাথে ঠাকুর হয়েছিলে।” গণেশ বলল।

“একসাথে আমরা কত প্রশংসা পেলাম, দুগগা মা তোমায় কত ভালোবাসলেন, তারপরেও তুমি এই কাজ করছ আমাদেরও সাথে? ছিঃ দুর্বলদা!” কার্তিক বলে উঠল।

দুর্জন সেকথার উত্তর না দিয়ে স্যাঙাতদের বলল, “এদের জাল থেকে বার করে ওই কোণের ঘরে নিয়ে আয়।” তারপর ওদের বলল, “কোনোরকম চালাকি করতে যেয়ো না, ওরা কিন্তু কোনো দয়ামায়া করবে না।”

লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশকে জাল থেকে বার করে দাঁড় করানো হল। সুচরিতাকেও জাল থেকে বার করতে যেতেই হরেন চেঁচিয়ে উঠল, “অরে খুইলো না! সাংঘাতিক মাইয়া! আমারে যা একখান লাথি কষাইছিল না হেই দিন যে তার ব্যথা এহনো আছে! খুইলো না!”

দুর্জনের চেলাদুটো সেকথা শুনে থামতেই দুর্জন প্রচণ্ড রেগে হরেনকে ধমকে উঠে বলল, “তোমার সাহস তো কম নয়! যে কাজের জন্য এনেছিলাম তা তো পারোইনি, এখন আবার আমার উপর দিয়ে কথা বলছ?”

হরেনের চোখদুটো জ্বলে উঠল। গলা নামিয়ে বলল, “ভুল হয়ে গেছে কত্তা।”

সুচরিতাদের নিয়ে সেই ঘরটায় এলো সবাই। খুব ঠান্ডাভাবে দুর্জন সিং বলল, “দেখো, তুমিও জানো এই ঘরে গুপ্তধন আছে, আর কোথায় আছে সে উদ্ধার করা আমার ক্ষমতায় কুলোবে না। তুমি সত্যি সত্যিই মা সরস্বতীর বরধন্য। এই গুপ্তধনের উদ্ধার আমাদের পরিবারের কাজ। শেষ অবধি আমার উপর বর্তেছে। এই যাদের দেখছ এরা সবাই আসলে আমার বন্ধু। তুমি আমাদের এই কাজটায় সাহায্য করো। তোমাকেও কিছুটা ভাগ দেব আমি।”

“গুপ্তধন যদি উদ্ধার হয়, তবে তা হবে এই বাড়ির তিন ভাইয়ের ইচ্ছায় আর সাহায্যের জন্য। আর তা ব্যয় হবে পুরোপুরি এই কুমিরগঞ্জের উন্নতির জন্য, কারো একার জন্য নয়।” সুচরিতা উত্তর দিল।

“যা ভালো বোঝো। এখানে এসেছি যে উদ্দেশ্য নিয়ে তা তো আমাকে পূরণ করতেই হবে। ভালোভাবে বললাম, তোমরা শুনলে না। এবার বাধ্য হয়ে আমাকে অন্য পথে যেতে হবে।” কথাগুলো বলেই দুর্জন এক সঙ্গীকে ইশারা করল আর সেও মুহূর্তে লাফিয়ে এসে একটা বন্দুক ধরল গণেশের মাথায়।

গণেশ যে কী বিচ্ছু সে তো আর সে জানে না! মুহূর্তে মধ্যে সেও পকেট থেকে ব্রহ্মাস্ত্র বার করে ছুড়ে দিয়েছে সেই সঙ্গীকে। ব্যস! ঝাঁঝে অস্থির, চোখ জ্বলে ডুম্বো!

সুচরিতা বাদে বাকিরাও সেই চেষ্টা করতে গিয়ে ঘাড়ের কাছে পিস্তলের ঠান্ডা নল মালুম করতে পেরেছে। বন্ধুর ওই দশা দেখেও দুর্জন ঠান্ডা ছিল, কিন্তু যখন তার সামান্য অন্যমনস্কতার সুযোগে সুচরিতা তার তাইকুন্ডোর স্কিলে ধরাশায়ী করে ফেলেছে লক্ষ্মী আর কার্তিকের ঘাড়ে পিস্তল ধরে থাকা স্যাঙাতদের, তখন আর সে সহ্য করতে পারল না। যে হুঙ্কার শুনলে বাঘা বাঘা লোকের বাহ্যি হয়ে যায় তেমন এক হুঙ্কার দিয়ে লাফিয়ে পড়ে সুচরিতার সামনে। সেও কী সাধারণ মেয়ে! সমানে লড়ে যেতে থাকল ওই বাঘা দুর্জন সিংয়ের সঙ্গে।

লড়াইয়ের দমকে একসময় যখন সুচরিতা ছিটকে পড়েছে দরজার পাশে অমনি, “কী রে দুর্মুষা অসুর! তোর এত বড়ো সাহস আমার মেয়েকে মারিস?” বলে হঠাৎ সেখানে হাজির হয়ে পড়েছেন গাঙ্গুলীগিন্নি, একতা সংঘের দুর্গা মা। সুনেত্রাও এসে মেয়েকে মেঝে তুলে সাপটে দিচ্ছেন গোটা গা। তপোধীর, লাবণ্য আর গন্ধরাজ গাঙ্গুলীও এসে উঠেছেন। অদৃশ্য কোন গলা তপোধীরের কানে কানে বলছেন, “এই কাজটা খুব ভালো করেছ হে। এই যে ডেকে এনেছ সবাইকে, এটা প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।”

তপোধীর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছেন, “আমি নই, আমি নই! সব আপনার বৌমা আর সুচি মায়ের বুদ্ধি।”

ওদিকে দুর্গামায়ের ওই মূর্তি দেখে ওই গাগরা বাঘের মতো দুর্জন সিং হাতজোড় করে তাঁর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে বলছে, “মা গো! পূর্বপুরুষের ভূত তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না! গুপ্তধন উদ্ধার করতেই হবে গো মা! আমি কী করব?”

“কী করবি মানে? এখানে এসে আমাদেরও বলতিস! সবাই মিলে আসতাম, যেমন এখন এসেছি! তা না করে অসুরগিরি!”

“না মা, তেমন নির্দেশ ছিল না। এই যে পারলাম না, এর জন্যে ঠিক আমায় আবার জ্বালা সহ্য করতে হবে।”

“সে তো হবেই কত্তা! ভুল হাতে কি আর বাঁশি বাজে? এই দ্যাহেন এত মাইনষের মধ্যেও হরেন কেমন করে গুপ্তধন পায়!”

হরেনের গলা শুনে সবাই সেই দিকে তাকিয়ে দেখল কখন যেন সে মাটিতে পড়ে থাকা দুর্জনের পিস্তল হাতে তুলে নিয়ে লক্ষ্মীর মাথায় তা ধরে রেখেছে।

“বেইমান!” বলে বাজখাঁই চেঁচানি দিয়ে সে দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই হরেন গন্ধরাজকে বলল, “সাবধান কত্তা! যা গাল পাড়ার দূর থিকে পাড়েন, কাছে আইলেই কোল বন্দুকের ঘোড়া দাবাইয়া দিমু! আর আপনেরা তো জানেনই উই ধামসা মাদল দুজ্জন সিং যা দেহাইল, হেয়ার মতন দয়ামায়া লইয়া আর যেই আউক হরেন কামে আহে না।”

হরেন একেবারে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। ওকে বাগে আনা খুব একটা সহজ হবে না, সে কথা সুচরিতা বেশ বুঝল।

কিন্তু দুর্জনের কী হয়েছে কে জানে! সে গিন্নিমার পায়ের কাছ থেকেই ‘হরেন’ বলে চেঁচিয়ে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করতেই হরেন বন্দুক মাথার উপরে তুলে দিলে ফায়ার করে। পিছিয়ে এল সবাই। লক্ষ্মীও গুলির শব্দে ভয় পেয়ে বসে পড়ল মাটিতে। আর তখনই ঘটল সেই ঘটনা।

মান্ধাতার আমলের ভগ্ন বাড়ি। ছাদের চাঙড়ে ফাটল ধরেছিল এমনিই, গুলির আঘাতে একেবারে হুড়মুড় করে পড়ল হরেনের মাথায়। আর অমনিই সুচরিতা লাফিয়ে পড়ে লক্ষ্মীকে নিয়ে এল ওদের কাছে।

বাকিটা কি আর বলতে হয়? বাড়ি যখন মান্ধাতা আমলের, তার চাঙড়েই বা কী এমন কাঠিন্য থাকে যে হরেনের মাথা ভাঙবে? যা হল তা মূলত ভেঙে পড়ার শক আর ধুলো। হেঁপো রুগী হরেনের ধুলোই হল যম। ওইটেতেই একেবারে কাহিল হয়ে পড়ল হরেন। ওরে সে কী কাশি! ওর মধ্যেই আবার সুযোগ বুঝে লাবণ্য তার হাতদুটো বেঁধে দিলেন।

গন্ধরাজ পকেট থেকে চারটে লবঙ্গ বার করে দিয়ে বললেন, “ওর মুখে দিয়ে দে রে! নইলে কেশে মরে যাবে।”

সবচেয়ে বদখত দশা দুর্জনের তিন স্যাঙাতের। একজনের তো ব্রহ্মাস্ত্রের আঘাতে চোখের জল, নাকের জল দশা এখনো কাটেনি, আর বাকি দু’জনের একজনের ডান পাঁজর আর অন্যজনের ডানহাতের কনুইয়ে এমন আঘাত পেয়েছে সুচরিতার কাছে যে সেও আর ঠিক হচ্ছে না।

তপোধীরবাবু একবার তাদের দিকে যাচ্ছেন আর মাথা তুলে ছাদের দিকে কার সঙ্গে যেন বিড়বিড় করছেন দেখে সুমিত্রা তাঁকে বলল, “এই! তুমি এবার থামো! আর ওঁকে কিছু জানাতে হবে না। উনি এমনিই দেখছেন সুচি মাকে।”

“কার সঙ্গে কথা বলে গো ঠাকুরপো, বৌ?” গিন্নিমা জিজ্ঞাসা করলেন।

“সে আরেক গল্প দিদি। বলব পরে আপনাকে।”

সুনেত্রার কথা শেষ হতে না হতেই গন্ধরাজ গাঙ্গুলী দুর্জনের স্যাঙাতদের দেখিয়ে তাঁর পেটেন্ট বাজখাঁই হুকুম ঝাড়লেন, “এই লাবণ্য! এদের একটু জল দাও দেখি।” তারপর গিন্নিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে হয়ে গেল! এবার চলো। সন্ধ্যাবেলা মঞ্চে আবার দাঁড়াতে হবে তোমাদের। একটু না ঘুমোলে যে পারবে না!”

গিন্নিমা সুনেত্রাকে বললেন, “আক্কেলটা দেখেছ? এই যে এত বড়ো একটা কাণ্ড হল, তা যে জন্যে হল, তার একটা শেষ দেখব না?”

তারপর সুচরিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা রে! যা তো, এবার গুপ্তধনটা বার কর তো!”

একবার দুর্গামা আর একবার নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে সুচরিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দেওয়ালের সেই কৃষ্ণচিত্রটার দিকে। ভাঙা ঘরের অজস্র চোখ এখন শুধু ওর দিকে। সেইসব চোখের কিছু কিছু এই সময়ের, আর বাকিরা...

সুচরিতা সেই কৃষ্ণচিত্রের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। গন্ধরাজ একবার কবজিতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে দেখেন ভোর হয়ে এল প্রায়। চারটে বাজতে চলেছে। ইস! এরা একটু না ঘুমোলে সন্ধ্যাবেলা থেকে আর দাঁড়াতে পারবেই না! নেড়ু মিত্তির যদি আসে কী দেখবে! দুর্গা মা হাই তুলছে, অসুর ঢুলছে, গণেশ গা মোচড়াচ্ছে আর কার্তিক আড়মোড়া ভাঙছে—এইসব? না না, আর দেরি করা যাবে না।

গন্ধরাজ ব্যস্তসমস্ত হয়ে এগোতেই গিন্নিমা কঠিন গলায় বললেন, “কী হল? বললাম না এখানকার কাজ আগে সারা হোক! যদি চাও বিকেলে সব ঠিকঠাক হোক, তাহলে এখন চুপটি করে থেকে কাজ করতে দাও।”

জোঁকের মুখে নুন পড়লে যেমন হয়, কতকটা সেরকমই গুটিয়ে গেলেন গন্ধরাজ গাঙ্গুলী।

ওদিকে সুচরিতা এতক্ষণে মুখ খুলেছে। “তোমাদের সবাইকে একটা কথা আগে বলে নেওয়া দরকার। এই বাড়িতে কী গুপ্তধন আছে তা আমি জানি না। তবে গুপ্তধন যে আছে তার সম্পর্কে অদ্ভুতভাবে আমি জানতে পারি, বরং বলা ভালো জানানো হয় আমি যেদিন কলকাতা থেকে এখানে আসি সেইদিন ট্রেনে আর স্টেশান থেকে বাড়ির পথে। দুর্জন সিং যে বলছিল...”

লাবণ্য কথা থামিয়ে বলেন, “উঁহুহু! দুর্জন নয়, দুর্বল। দুর্বল সিং।”

“না! ওর নাম দুর্জন সিং। সঠিকভাবে বললে দুর্জন সাঁপুই। কুমিররাজাদের বাড়ি লুট করতে এসে তাঁদের হত্যা করেছিল যারা, তাঁদের সর্দার সরল সাঁপুইয়ের বংশধর। ওর উপর দায় দিয়েছিলেন ওর পূর্বপুরুষ এই গুপ্তধন উদ্ধার করতে। তবে ও-ই একা দোষী নয়, আরেকজন মহা দোষী এখানে উপস্থিত। তার কথা বলার আগে বলতে হয়, এই কুমিরগঞ্জের ইতিহাস আমি জানতে পারি একটা চটি বই থেকে। বিশ্বাস করবে কি না জানি না, হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠার আগে সেই বইয়ের লেখক শ্রীযুক্ত পঞ্চানন তর্করত্ন নিজে দেহ ধরে এসে আমাকে বইটা দিয়ে যান।”

“এ কেমন করে সম্ভব?” লাবণ্য বলে ওঠেন।

“সম্ভব, সম্ভব। আমি জানি।” তপোধীর বলে উঠলেন।

“আমিও জানি, সম্ভব।” দুর্জন সিং বলল।

সুচরিতা বলতে থাকল, “যাই হোক, সেই বইটার লেখক পঞ্চানন তর্করত্নর অপঘাতে মৃত্যু হয়, বলা ভালো কেবল গুপ্তধনের হদিশ দিতে পারেননি বলে তিনি এক নৃশংস আততায়ীর হাতে খুন হন। যে খুন করে তারও বংশধর এখানে উপস্থিত। সেও কম নিষ্ঠুর নয়! আজীবন সে এই গুপ্তধন খুঁজে চলেছে। এই বাড়ির সমস্ত আনাচ-কানাচ তার নখদর্পণে। কিন্তু পায়নি। তাই দুর্জন সিংয়ের লোক যখন তার কাছে গিয়ে আমাকে ধরে আনার প্রস্তাব নিয়ে গেল, তখন তার কারণটা জানতে পেরে নিজের প্রয়োজনেই ও কাজটা নেয়। যদি একবার ধরতে পারত আমায়, তাহলে দুর্জনকে নয়, আমায় এই বাড়িরই কোনো সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রেখে গুপ্তধন হাতানোর চেষ্টা করত। সেই নৃশংস আততায়ী করালি বাছারের হিংস্র বংশধর ওই হরেন। হরেন বাছার।”

সবার চোখ গিয়ে পড়ল হরেনের উপর। তার কাশির দমক থামলেও এখনো হাঁপাচ্ছে। বাঁধা হাতদুটো ঝাঁকিয়ে সে এক অমানুষিক চিৎকার করে উঠল, “ওই গুপ্তধন আমার! আর কারো নয়! সারাজীবন এই ভাঙা বাড়িতে ঘুরে বেড়িয়ে খোঁজ করেছি। সাপখোপের কামড় খেয়েছি। এ-বাড়ির ধুলোয় আমার হাঁপানি হয়েছে। ওই গুপ্তধন কেবল আমার। কাউকে নিতে দেব না আমি।”

ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে সুচরিতা বলল, “তোমার কাজ শেষ হরেনকাকা। ওই গুপ্তধন এই কুমিরগঞ্জের সবার। কুমিররাজারা আমায় নিজেরা বলেছেন। গাঁয়ের মাথারা যেভাবে ভালো হয় সেভাবে গাঁয়ের উন্নতির জন্য ব্যয় করবেন, এমনটাই কথা।”

“আমি সেকথা মানি না!” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল হরেন বাছার।

ওর কথাতেও তেমন মান্যতা কেউ দিলে না।

সুচরিতা বলতে থাকল, “আমি যা বললাম, সেটাই কিন্তু তাঁদের ইচ্ছা। তাঁরা নিজেরা আমাকে এই গুপ্তধনের একটা সংকেত আর একটি চাবিকাঠি দিয়েছেন। সংকেতটা ছোটোভাই রাধামোহনের তৈরি করা পদ। সেই পদ থেকে গুপ্তধনের স্থানে যাওয়ার হদিশ আমি উদ্ধার করেছি। আপনারা অনুমতি দিলে সেই পথেই এবার আমি এগোব।”

“এগোও মা গো! খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধিলাভ করে বাড়ি গিয়ে ঘুমোও।” গন্ধরাজ গাঙ্গুলী হইহই করে বললেন।

উপস্থিত আর সবাই হেসে উঠল গন্ধরাজের কথা শুনে।

সুনেত্রা বললেন, “যা মা, কাজটা শেষ কর।”

সুচরিতা সেই কৃষ্ণচিত্রের দিকে ঘুরতে গিয়েও একবার জিজ্ঞাসা করে নিল, “এইদিকটা নিশ্চয়ই দক্ষিণদিক?”

লাবণ্য বললেন, “হ্যাঁ, এইদিকটা দক্ষিণ, ওই দিকটা পুব। ইস! সুয্যি তো উঠব উঠব করছে একেবারে!”

গন্ধরাজ হুড়োহুড়ি করে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, দক্ষিণ। এগোও।”

সুচরিতা মনে মনে একবার আওড়ে নিল, ‘কৃষ্ণ ভক্ত রাধা মোহন লেখেন ধন দেব গৃহের দক্ষিণ দেওয়াল কৃষ্ণ চিত্রে বাঁশির দক্ষিণে কমলে চাপ দিলেই দুয়ার খুলে যাবে’। তারপর কৃষ্ণচিত্রের বাঁশীটিকে ভালো করে লক্ষ করে তার ডানদিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যি বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটি শতদল পদ্ম আঁকা আছে সেখানে। মনে মনে তিনভাইকে প্রণাম জানিয়ে সুচরিতা সেই কমলে চাপ দিতেই ঘড়ঘড় শব্দ করে সেই দেওয়ালের নীচের দিকে খানিকটা জায়গা ফাঁকা হয়ে গেল। ভিতরে একটা সুড়ঙ্গপথ। মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে সুচরিতা দেখল, কোনোক্রমে একজন সেই পথে ঢুকতে পারে।

“আমি ওই পথে যাচ্ছি।” বলে সুচরিতা এগোতে উদ্যত হল।

সুনেত্রা এগিয়ে এসে ওর আঁচলের গিঁট থেকে চাবিগাছটা খুলে ওর হাতে দিয়ে মাথাটা সাপটে দিলেন।

“সাবধানে যেয়ো মা গো!” গিন্নিমা উৎকন্ঠা নিয়ে বললেন।

“চিন্তা কোরো না মা! দুর্গাপুজো চলছে না!” বলে টর্চটা জ্বেলে ভিতরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ল সুচরিতা।

অনেকদিনের বদ্ধ ঘরের গুমোট। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

“আলোটা নেভাও মেয়ে। আমাদের কষ্ট হয় যে!”

পরিচিত কন্ঠস্বরে মোবাইলের টর্চটা নিভিয়ে সুচরিতা দেখল, তিনভাই দাঁড়িয়ে আছেন প্রসন্ন মুখ নিয়ে। তাদের তিনজনের গা থেকেই নীলচে সাদা শীতল আলো বেরোচ্ছে।

“মা গো! আমরাও আছি।”

সুচরিতা তাকিয়ে দেখল শুভ্র ধুতি-ফতুয়া পরিহিত তেজস্বী এক সৌম্য আর বেশ জমিদারি চেহারার শ্বেতশুভ্র বসনের পাকা ফিনফিনে চুল দাড়িওয়ালা এক পুরষ। দু’জনেই প্রসন্ন মুখে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।

“আমরা তো তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম মা। আমাদের পরিচয় তোমার বাবা-মা আর মামার কাছে জিজ্ঞাসা করলেই পাবে। আমি হলাম তোমার বাবার বড়ো দাদামশাই সর্বেশ্বর তর্কালঙ্কার। আর ইনি হলেন তোমার মায়ের দাদু। আমরা তোমার পূর্বপুরুষ। বাজারে মাংসের দোকানে আমিই ভর করেছিলাম তোমার বাবার ওপর।”

মায়ের দাদু সুচরিতাকে বললেন, “তুমি তো মা সাক্ষাৎ সরস্বতী গো! আমরা এই পাঁচ বুড়ো এতটা কাল শুধু তোমার আসার অপেক্ষাতেই রয়েছি।”

সুচরিতা দেখল এঁদের দু’জনের গা থেকেও নীলচে সাদা আলো বার হতে শুরু করেছে। যত এঁরা আলো হয়ে যাচ্ছেন, ততই এদের দেহাংশও যেন গলে আলো হয়ে যাচ্ছে। সুচরিতা বুঝল সময় বেশি নেই।

সামনে খানিকটা খুঁজতেই একটা সিন্দুক পেল ও। একদম নিরেট সিন্দুক। কোনো দরজাই নেই। কেবল চাবিগাছটা যেমন দেখতে ঠিক তেমনই আকারের একটা খাঁজ আছে সামনে। সুচরিতা রাধামোহনের চাবিখানা সেখানে রাখতেই সেখানা যেন খটাস করে আটকে গেল। আর অমনি মৃদু শব্দ করে সেই সিন্দুকের সমনের ডালাটা উপরে উঠে গেল। ভিতরে থরে থরে সোনাদানা ঘরময় বইতে থাকা নীলচে সাদা আলোয় ঝকঝক করছে!

অবনীমোহন বললেন, “দিদি! ওখানেই একটা থলি পাবে। ওতেই সব ভরে নাও। এই সম্পদ এই গ্রামের মানুষদের, তাদের কাজে লাগিয়ো।”

সুচরিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

রাধামোহন বললেন, “এই যে মেয়ে! ওখানে একটা লম্বা কাঠের বাক্সে একটা সোনার বাঁশি আর কিছু গয়না পাবে। ওগুলো সব তোমার জন্যেই আমি রেখেছি। কাউকে দিয়ো না।”

সুচরিতা হেসে সব ঐশ্বর্য ওদের কথামতো তুলে নিল। থলেটায় লম্বা কাঠের বাক্সটাও ভরছে দেখে রাধামোহন ফের বললেন, “ওটা কিন্তু তোমার মেয়ে। তুমি না নিলে আমার মুক্তি হবে না কিন্তু।”

সুচরিতা সেইখানা হাতে নিয়ে থলের মুখ বন্ধ করে সিন্দুকের ডালা নামিয়ে চাবিটা নিয়ে নিল। তারপর সবাইকে হাতজোড় করে প্রণাম করে কথা বলতে গিয়ে দেখল গলাটা কেঁপে যাচ্ছে। খুব একটা কষ্টে গলাটা ব্যথা করছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে জলে।

ঘরের সবাই এবার আলো হয়ে যাচ্ছেন। খুব কষ্ট হচ্ছে সুচরিতার। রাধামোহন আলো হতে হতে বলছেন, “এই মেয়ে! কাঁদবে না একদম, মুক্তি পাচ্ছি মানে কিন্তু ফুরোচ্ছি না। অন্য কোনোরূপে চলে যাচ্ছি রে দিদি! তুই চাইলেই আবার তোর কাছে আসা যাবে বলে বিশ্বাস আমার। কাঁদিস না দিদি।”

সুচরিতা চোখের জল হাতে মুছে সবাইকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে।

ঘরভর্তি সবাই ধন্য ধন্য করছে। গিন্নিমা, মা, লাবণ্য, তপোধীর, গন্ধরাজ সবাই সেই গুপ্তধন দেখছেন। সুচরিতার চোখে জল দেখে মা আর গিন্নিমা কী হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে সবকথা বলল।

গিন্নিমা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বললেন, “তুই সত্যি ধন্য রে মেয়ে! আর এইটা তোরই, তুই রাখ।” বলে সেই কাঠের বাক্সটা সুচরিতার হাতে তুলে দিলেন। আর গন্ধরাজকে ডেকে বললেন, “এই যে! সব তো শুনলে। এগুলোর ব্যবস্থা করো।”

তারপর আর কী! গন্ধরাজের তত্ত্বাবধানে সেই সম্পদ প্রথমে গেল থানা হয়ে রাজকোষে। আর সেখান থেকে যা এল তা দিয়ে গ্রামের নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুলের উন্নতি, বাড়িতে বাড়িতে জলের ব্যবস্থা, একটা সভাঘর ইত্যাদি নানা কাজ হয়েও অনেক টাকা রইল। সেই টাকা যাতে সঠিক খরচ হয় তাই কুমিররাজাদের নাম করে একটা ট্রাস্ট হল। সেই ট্রাস্টের কর্ণধার হলেন গন্ধরাজ গাঙ্গুলী আর ন্যাড়া নকুল নস্কর।

অবাক হবেন না পাঠক। যেদিন এই গুপ্তধন আবিষ্কার হল, সেদিন তো ছিল অষ্টমী! মায়ের হাতে অসুর নিধন যখন হল তখন আর ঝগড়া থাকে কী করে? অসুর তো আসলে থাকে মনে। কুমিরগঞ্জের সব মানুষের মনের অসুর সেদিন দুর্গা মা বধ করে দিয়েছিলেন, তাই তারা সবাই এখন শান্তিতে থাকে।

ব্যস! এই তো সব। সেবারের বিজয়া দশমীর উৎসবের বারোয়ারি ভোজ আর আনুষঙ্গিক খুঁটিনাটির বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারেন। বরং তার পরের কিছু কথা বলি। সুচরিতাদের বাড়িতে শ্রীকৃষ্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, হাতে তাঁর রাধামোহনের বাঁশি। রাধামোহনের বাক্সের গয়নাগুলো সুনেত্রা সুচরিতা আর ইল্লিকে ভাগ করে দিয়েছেন।

আরেকটা কথা তো বলাই হল না! সেই মহিষাসুর দুর্জন সিং কিন্তু ফের আদালতে এফিডেভিট করেছে। এবার পদবি বদলে ফের সাঁপুই হয়েছে আর নাম বদলে সুজন হয়েছে। গিন্নিমা তাঁর এই অসুরটিকে বড্ড স্নেহ করেন, গন্ধরাজ তাই ওকে একটি কোল্ড স্টোরেজ বানিয়ে দিয়েছেন। সুজন সাঁপুই আর তার স্যাঙাতরা এখন সেই হিমঘর দেখাশোনা করে আর কুমিরগঞ্জেই পাকাপাকিভাবে থাকে।

বিশ্বাস হল না বুঝি? বেশ, যে-কোনো দিন হাওড়া থেকে ট্রেনে চেপে কুমিরগঞ্জে যান। স্টেশনের বাইরে ছাতিমগাছের নীচে নিত্যর চা দোকানের বাঁশের বেঞ্চে বসা রোগা, সিড়িঙ্গে এক রিক্সাওয়ালা যদি দেখতে পান তবে তার রিক্সায় উঠুন, তার কাছে জানতে চান, সে সব আপনাকে গপ্প করে বলে দেবে।

কেমন করে? আরে তার নামটা একবার জিজ্ঞাসা করেই দেখুন না! দেখবেন সে বলবে, তার নাম হরেন বাছার।

___

অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক