প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র

                                                               প্রচ্ছদঃ শতদল শৌণ্ডিক


সূচিপত্র

কমিকস
রাজুদা ও পল্টু শাশ্বত রায়

হাসির গল্প প্রতিযোগিতার গল্প
১ম ঐশ্বরিক রসাস্বাদন বিভাবসু দে
৩য় সীতার আশীর্বাদ গোবিন্দ মণ্ডল
৪র্থ লক্ষ্মী লাভ ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য
৫ম যুগ্ম বর্ণ-বিভ্রাট মধুরিমা চক্রবর্তী
৫ম যুগ্ম দোলগোবিন্দের কেরামতি অর্ণব চ্যাটার্জী
৬ষ্ঠ যুগ্ম ফুঁয়ের গুঁতোয় সুধাংশু চক্রবর্তী
৬ষ্ঠ যুগ্ম চন্দ্রাহত প্রকল্প ভট্টাচার্য
৭ম ভীষণ গণ্ডগোল রাজর্ষি বর্ধন
৮ম যুগ্ম ফাংশনে ফাটাফাটি শুচিস্মিতা চক্রবর্তী
৮ম যুগ্ম প্ল্যানচেট অগ্নীশ্বর সরকার
৯ম ইটালি সিদ্ধার্থ সিংহ
১০ম কবিতা মানবেশ মিদ্দার

ছড়া
সময় গাড়ি গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
সাতসকালে তনয় ভট্টাচার্য
দেখো এসে প্রিন্স মাহমুদ হাসান
হাঁকডাক মৃত্যুঞ্জয় হালদার
মেঘ ফুল সুব্রত দাস

লোককথা
দুঃখী রাজকন্যা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিজ্ঞানের পাঠশালা
যা দেখি যা শুনি... (৬ষ্ঠ) কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

না-মানুষের পাঁচালি
আছে হুঁশ না হই মানুষ (২য়) অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

কমিকসঃ রাজুদা ও পল্টুঃ শাশ্বত রায়



প্রথম স্থানাধিকারি গল্পঃ ঐশ্বরিক রসাস্বাদনঃ বিভাবসু দে



(১)

ব্যাপারটা মোটেই হাসির নয়। মানে শুনে কাশি পেতে পারে, এমনকি ভক্তি গদগদ হয়ে আপনি ভিরমিও খেতে পারেন, কিন্তু হাসি পাবে না। অন্তত রমেশ ডাক্তারের তো পায়নি। হাজার হোক এমন একটা যুগান্তকারী ঘটনায় হাসি পাওয়াটা মোটেই শোভন নয়।
যাক গে সেসব কথা, ঘটনাটা আগে খুলেই বলি। সেদিন সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে ডাক্তারবাবু সবে একমুখ ফেনা নিয়ে ব্রাশ চিবোতে চিবোতে পত্রিকার হেডিংগুলো দেখছিলেন। চোখের গোড়ায় তখনও ঘুম-ঘুম ভাব। আসলে যবে থেকে দেশে ডাক্তার পেটানোর রেওয়াজ হয়েছে, তখন থেকেই রমেশ ডাক্তারও বেশ মন দিয়ে নিয়মিত পত্রিকা দেখতে শুরু করেছেনーখোঁজখবর রাখা ভালো, পরিচিত কোনও বিটকেল বন্ধু মার-টার খেলে বেশ একটু ফোন করে খোঁচানো যাবে কিনা! ওই ওপাড়ার টেকো হারাধন ডাক্তারের টাকে ঘা দুয়েক পড়লে কিন্তু মন্দ হয় না। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ওই ব্যাটা রমেশবাবুর শার্টের ভেতর ইয়াব্বড় একটা টিকটিকি ভরে দিয়েছিল! উফ্‌, তিড়িংবিড়িং করে সারা কলেজ জুড়ে সেদিন কী নাচটাই না নেচেছিলেন তিনি! দেখলে মাইকেল জ্যাকসনও লজ্জা পেত। তারপর ওই সরকারি হাসপাতালের বুড়ো প্রতিম ডাক্তারটা…
“ডাক্তারকাকু, তাড়াতাড়ি চলুন। বাবাকে ভর করেছে।”
গেটের কাছ থেকে আচমকা কামানের গোলার মতো তেড়ে আসা মন্টুর বিকট চিৎকারে রমেশ ডাক্তারের মানসচক্ষে জ্বলজ্বল করতে থাকা গণধোলাইয়ের মনোরম দৃশ্যগুলো যেন এক ঝটকায় উবে গেল। সত্যি বলতে কী, শুধু উবেই গেল না, এমনই হকচকিয়ে গেলেন ডাক্তারবাবু যে মুখভর্তি টুথপেস্টের ফেনা একেবারে গপাৎ করে সরবতের মতো গিলে ফেললেন।
“চলুন চলুন, দেরি করবেন না। অবস্থা সিরিয়াস।” হাঁপাতে হাঁপাতে গেট ঠেলে ততক্ষণে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে মন্টু।
“কী বললি? কী হয়েছে ভূষণের?” খানিকটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তারবাবু।
“ভর করেছে। কীসব আবোলতাবোল বকছে।”
চোখদুটো গোল গোল হয়ে উঠল রমেশ ডাক্তারের। “ভর করেছে! কে?”
“বিষ্ণু ঠাকুর।”
“অ্যাঁ!” এবার ডাক্তারবাবুর হাত থেকে ব্রাশটাও গেল পড়ে। “বলিস কী রে! এতদিন ভূতের ভর, মা কালীর ভর, মায় মহাদেবের ভর অবধিও শুনেছিলাম, কিন্তু তাই বলে বিষ্ণু ঠাকুরের মতো ধুতি পরা ভদ্রলোক দেবতারাও আজকাল ভর করতে শুরু করেছেন! ঘোর কলি, ঘোর কলি।” মুখ দিয়ে একটা গভীর হতাশাব্যঞ্জক চুক চুক শব্দ করতে করতে ঘরে ঢুকে পড়লেন রমেশ ডাক্তার। আবার তড়িঘড়ি বেরিয়েও এলেন ডাক্তারি ব্যাগটা হাতে নিয়ে। “এমন কেসে দেরি করা একদম ঠিক নয়। হাজার হোক দৈব ব্যাপার বলে কথা।”
মন্টুদের বাড়ি খুব বেশি দূর নয়, ডাক্তারবাবুর বাড়ি থেকে মোটে কয়েক কদম। মন্টুর বাবা মানে ভূষণ পাল হলেন গে রমেশ ডাক্তারের স্কুল জীবনের জিগরি দোস্ত। তার ওপর পাড়া-বান্ধব তো বটেই। যেতে যেতে রমেশ ডাক্তার মন্টুকে জিজ্ঞেস করলেন, “তা হ্যাঁ রে, বিষ্ণুই যে ভর করেছেন সেটা বুঝলি কীভাবে?”
মন্টু বেশ বিজ্ঞের মতো ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, “গেলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।”
অবাক চোখে মন্টুর দিকে একবার তাকালেন রমেশ ডাক্তার। তবে কি ভূষণের চার হাত গজালো, নাকি গতর থেকে এল.ই.ডি বাতির মতো দিব্যজ্যোতি বেরোতে লাগল!
কিন্তু না। পাল-বাড়িতে ঢুকতেই যা ঘটল তা তার চেয়েও ভয়ংকর। ঘরের দুয়ারে ডাক্তারবাবু সবে পা রেখেছেন কি রাখেননি, শুনতে পেলেন কে যেন ভীষণ গলায় হুঙ্কার করে উঠল, “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত / অভ্যূত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।”
উফ্‌, গলা তো নয় যেন বি.আর. চোপড়ার মহাভারতের শঙ্খনাদ! কোনওক্রমে ব্যাগ-ট্যাগ সামলে ভেতরে ঢুকলেন রমেশ ডাক্তার। আর অমনি তাঁর দিকে তাকিয়ে আবার সেই বজ্রনির্ঘোষ, “অর্জুন, ভয় কী? অস্ত্র তোলো। কেউ কারও নয়, আমিই সব। এগিয়ে যাও অর্জুন, এগিয়ে যাও। যুদ্ধই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম।”
ভূষণবাবু তখন জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রমেশ ডাক্তারের দিকেーপরনে ধুতি, আঙুলের ডগায় ঝিলিক দিচ্ছে সুদর্শন চক্র (ইয়ে মানে পুরনো সিডি আর কী!), ললাটে চন্দনচিহ্ন। এক পা সোফার হাতলে তুলে মুহুর্মুহু সিংহনাদ করছেন। এই দিব্য রূপ দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে একেবারে বাক্যহারা হয়ে পড়েছিলেন ডাক্তারবাবু। চিকিৎসা করবেন না সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সেটাই বোধহয় ভেবে পাচ্ছিলেন না।
পাশ থেকে মন্টু ফিসফিস করে বলল, “বাবার এখন কৃষ্ণাবতার চলছে। একটু আগে রাম অবতারে ‘মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে’ বলে ব্যাপক চিৎকার করছিল।”
“সে কি! বিষ্ণু ঠাকুর আবার ভূষণের বডিতে ঢুকে অবতারও পালটাচ্ছেন নাকি?”
“হ্যাঁ, এই তো…” মন্টু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই…
“রমেশদা গো, আমার কী হবে গো!” বলে একেবারে আকুল নয়নে কাঁদতে কাঁদতে কোত্থেকে যেন হঠাৎ মালাবৌদি এসে আছড়ে পড়লেন রমেশবাবুর সামনে। বলা নেই, কওয়া নেই আচমকা এমন উৎকট সুরে রাগ ক্রন্দনির ঠেলায় আরেকটু হলেই প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হয়ে যেত রমেশ ডাক্তারের।
বৌদি আবার ডুকরে উঠলেন, “দেখো দেখো, তোমার বন্ধু সকাল থেকে কীসব বলে যাচ্ছে গো। একটু আগে তো আমাকে মা যশোদা বলে প্রণাম করতে তেড়ে এসেছিল! হায় ঠাকুর, আমার কী হবে গো! রোজ ভক্তিভরে নারায়ণ সেবা করে গেলুম আর ঠাকুর কিনা আমারই স্বামীর ঘাড়ে চাপলেন! হায় হায় গো!”
“আহা বৌদি, কেঁদো না। আমি দেখছি। যদিও দৈব ব্যাপার আমাদের এক্তিয়ারে পড়ে না, তবুও একবার…”
কিন্তু মুখের কথাটা শেষ করে যেই না স্টেথোখানা ব্যাগ থেকে বের করতে গেছেন রমেশ ডাক্তার, অমনি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন ভূষণবাবু। অর্ধনিমীলিত দৃষ্টি, একহাতে ধ্যানমুদ্রা, আরেক হাতে বরাভয়। শান্তকণ্ঠে বললেন, “হে বৈদ্যরাজ, জগত দুঃখময়। তুমি কার চিকিৎসা করিবে? কীসের চিকিৎসা করিবে? সর্ব দুঃখের যে মূল কারণ, আমি তাহাকে জানিয়াছি, তাহা হইতে মুক্তির পথও জানিয়েছি। অতএব আমার সঙ্গে উচ্চারণ করো, বুদ্ধম শরণম গচ্ছামি, ধম্মম শরণম গচ্ছামি, সংঘম শরণম গচ্ছামি।”
“এই সেরেছে! এ তো ভগবান বুদ্ধে চলে গেছে এবার।” পাশ থেকে মাথা নেড়ে সায় দিল মন্টু।
তবে ব্যাপারটা মন্দ হল না, রোগী অহিংস হলে ডাক্তারের ভারি সুবিধে কিনা। তাই এই সুযোগে চটপট কাজটা সেরে ফেললেন ডাক্তারবাবু। বেশ কিছুক্ষণ গভীরভাবে ভূষণকে পর্যবেক্ষণ করলেন; নাড়ি টিপলেন, বুকে স্টেথো লাগালেন, প্রেশারটাও মাপলেন আর তারপর একটা সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। “বৌদি, গতিক ভালো ঠেকছে না। না বুঝে ঐশ্বরিক ব্যাপারে আমাদের নাক গলানোটা ঠিক হবে না।”
শুনেই মালাবৌদি আবার নিজের সেই গিনিস বুকে তুলে রাখার মতো বুক কাঁপানো কান্না শুরু করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু রমেশবাবু থামিয়ে দিয়ে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও বৌদি, এখনই কেঁদো না, অন্য উপায় আছে।”
“উপায়!” মুহূর্তে মুখটা ঝলমল করে উঠল বৌদির। “কী উপায় গো রমেশদা?”
“কুক্কুটানন্দ বাবা। খুব উচ্চমার্গের সাধক, হিমালয় থেকে সদ্য নেমে এসে ওই তেমাথার মোড়ের দক্ষিণে যে শ্মশানটা, সেখানে আশ্রম খুলেছেন। বৈষ্ণব, শাক্ত, তন্ত্র, শৈব, বেদান্তーসব শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য।”
ভক্তিভরে কপালে হাত ঠেকালেন মালা বৌদি। “জয় বাবা! কী যেন নাম বললে?”
“কুক্কুটানন্দ। কুক্কুট মানে মুরগিতে বাবার গভীর ঈশ্বরীয় আনন্দ লাভ হয় কিনা, তাই তিনি কুক্কুটানন্দ।”
“আহা, নাম শুনলেই মনে ভক্তিভাব আসে গো। তা আর দেরি কোরো না রমেশদা, তাড়াতাড়ি খবর দাও বাবাকে, নইলে কখন আবার তোমার বন্ধুর ভেতরে ঠাকুর নরসিংহ রূপ ধরে কার না কার ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে বসবেন!”
নিজের পাকা তরমুজের মতো পুরুষ্টু নধর ভুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন আঁতকে উঠলেন রমেশ ডাক্তার। “না না, চিন্তা কোরো না, আমি এক্ষুনি খবর দিচ্ছি।”

খবর তো দিলেন, কিন্তু মিনিট দশেক পরে যখন আবার ঘরে ঢুকলেন রমেশবাবু তখন তো তাঁর চক্ষুস্থির! এ যে একেবারে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড বেধে গেছে! সোফার এককোণে ভয়ে সিঁটিয়ে বসে আছেন মালাবৌদি। পরিত্রাহি চিৎকার করতে করতে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে ছুঁচোবাজির মতো ছুটছে মন্টু। আর ভূষণবাবু? তাঁর এখন পরশুরাম রূপ। কোথা থেকে যেন একটা লাঠি তুলে ‘নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব’ বলতে বলতে মন্টুকে তাড়া করেছেন।
তা শেষমেশ মন্টু তো পালিয়ে বাঁচল, কিন্তু ভূষণবাবুর রোষ দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ল সোজা রমেশ ডাক্তারের ওপর। বাঘের মতো গর্জে উঠলেন, “কর্ণ, মিথ্যাচারী, তুই নিঃসন্দেহে ক্ষত্রিয়! তুই ছলনা করেছিস আমার সঙ্গে। ওরে নরাধম, আমি জমদগ্নিপুত্র ভার্গব পরশুরাম তোকে অভিশাপ দিচ্ছি যে জীবনের শেষ যুদ্ধে আমার শেখানো সব বিদ্যা তুই ভুলে যাবি। তোর রথের চাকা মাটিতে গেঁথে যাবে। তুই…”
অনবরত প্রায় আধঘণ্টা ধরে গর্জন করে গেলেন পরশুরামরূপী ভূষণ পাল। ভূষণবাবুর এমন মর্মস্পর্শী অভিশাপের ঠেলায় রমেশ ডাক্তার তো কিছুক্ষণের জন্যে সত্যি-সত্যিই নিজেকে কর্ণ ভাবতে শুরু করেছিলেন। হয়তো আরেকটু হলেই কর্ণকুন্তী সংবাদটাও আওড়াতে শুরু করে দিতেন!
কিন্তু এমন সময় হঠাৎ বাইরে বেশ একটা শোরগোল উঠল। কারা যেন জয়ধ্বনি দিচ্ছে, “জ্যায় বাবা কুক্কুটানন্দের জ্যায়! জ্যায় জ্যায় বাবার জ্যায়!”
ব্যস, একসঙ্গে ডাক্তারবাবু আর মালাবৌদি দু’জনেরই মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বাবা এসে গেছেন। উৎসাহের চোটে বৌদি তো একেবারে সোফা থেকেই লাফিয়ে গিয়ে পড়লেন বাবার পাদপদ্মে। এমন লাফ অলিম্পিকে দিলে ভারতের একখানা সোনা পাক্কা ছিল। বাবা দাড়ি নেড়ে বললেন, “মঙ্গল হোক বিটিয়া।”
বৌদি ভক্তি গদগদ মুখে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। আহা, বাবার কী অপূর্ব মূর্তি! গায়ে রক্তবস্ত্র, মাথায় জটা, মুখভর্তি দাড়ি, কপালে মুরগির পদচিহ্ন আঁকা। পেছন থেকে বাবার এক চ্যালা কে.এফ.সি-র চিকেন বাকেট থেকে একখানা আস্ত লেগপিস বৌদির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "লিজিয়ে মাই, বাবাজির প্রসাদ গ্রহণ করুন।”
বৌদি সেই দিব্য কুক্কুট-চরণ কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “বাবা, আমার স্বামীর ওপর বিষ্ণু ভর করেছেন। রক্ষে করুন বাবা!”
ডাক্তারবাবুও পাশ থেকে হাতজোড় করে বললেন, “এখন আপনিই একমাত্র ভরসা।”
বাবাও বেশ গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “চিন্তা মত করো। সব ঠিক কর দুঙ্গা।”
বললেন তো বটে, কিন্তু ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ব্যাপারটা একেবারে চিত্তির হয়ে গেল। দরজায় পা দেওয়ামাত্রই ভূষণবাবু হঠাৎ এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবাজির ওপর। জড়িয়ে ধরে আকুল কণ্ঠে বললেন, “ওরে, ওরে আমার জগাই রে, একবার হরি বল ভাই, একবার হরি বল। হরি বিনে জীবের যে আর গতি নাই রে।”
কুক্কুটানন্দ হয়তো হরি বলেও দিতেন, কিন্তু তার আগেই তাঁকে ঘাড় ধরে বিছানায় আছড়ে ফেললেন ভূষণবাবু। বাবার বুকের ওপর পা তুলে রণহুঙ্কার ছেড়ে বললেন, “বলবি না? বলবি না তো? আমি আজ সুদর্শনে শিরচ্ছেদ করব তোর।”
বাবার এমন অবস্থা দেখে তাঁর চ্যালাদ্বয় থেকে শুরু করে রমেশ ডাক্তার অবধি সবাই থ। তবে বাবা কিন্তু মোটেই ঘাবড়ালেন না। সেই অবস্থাতেই হাতজোড় করে বললেন, “প্রভু, আপকো হম পহচান গয়ে। আপ স্বয়ম নারায়ণ হ্যায়, জয় শ্রীহরি। শান্ত হোন ভগবন। হামি খোদ আপনার পূজা করবে। ওম বন্দে বিষ্ণুম ভবভয়হরম সর্বলোকৈকনাথম…”
কী আশ্চর্য! বাবার মন্ত্রপাঠে যেন একেবারে ওষুধের মতো কাজ হল। ক্ষিপ্ত মূর্তি সংবরণ করলেন ভূষণবাবু। আর তাই দেখে ব্যাপক উৎসাহে পেছন থেকে দুই চ্যালা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, “জ্যায় স্বামী কুক্কুটানন্দ মহারাজজি কি জ্যায়! জ্যায় শ্রীহরি বিষ্ণুজি কি জ্যায়!”
রাস্তা থেকে কোন হতভাগা ফোড়ন কেটে গেল, “জ্যায় বিষ্ণুমাতা কি জ্যায়!”
করজোড়ে ভূষণবাবুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন বাবা। “আদেশ কিজিয়ে, ক্যায়সে সেবা করেঁ আপকা?”
মালাবৌদি আর রমেশ ডাক্তারের তখন সেই চরম অবস্থা যাকে বিদ্যাসাগর বলে গেছেন, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কোথা থেকে যে কী হয়ে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
ভূষণবাবু তখন এমনভাবে টলছেন যেন সমাধিস্থ। বাবা আবার বললেন, “আদেশ কিজিয়ে প্রভু।”
এবার বজ্রনাদ উঠল, “ষোড়শোপচারে পুজো চাই।”
“হোগা প্রভু, সব হোগা। জয় জগন্নাথ!”
বাবার মুখের কথাখানা ফুরোতে না ফুরোতেই একেবারে কাটা কলাগাছের মতো বিছানায় ধুপুস করে উলটে পড়লেন ভূষণ পাল। দুই চ্যালাসহ বাবা আবার জয়ধ্বনি দিয়ে উঠলেন, “জয় জয় শ্রীহরির জয়!”
তারপর ভক্তিভরে ভূষণবাবুর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বাবা ফিরে তাকালেন মালাবৌদির দিকে। “সুনো বিটিয়া, তুম ভগবান বিষ্ণু কে বহুত বড়ি ভক্ত হো।”
বাবার মুখে এই গোপনতম রহস্যের কথাখানা শুনেই বৌদির ভক্তির পারদ চড়চড় করে আরও কয়েক ডিগ্রি চড়ে গেল। “হ্যাঁ বাবা, নারায়ণের পায়ে ফুল-তুলসী না দিয়ে আমি জলটুকুও খাই না। বাবা, আপনি অন্তর্যামী।”
“হম সব জানি।” দাড়িতে হাত বোলালেন বাবাজি। “তাই ভগবান বিষ্ণু খোদ তুমহারে পতিকে শরীর মে পধারে হ্যায়। প্রভু সেবা চাহতে হ্যায়। মূর্তি মে নহি, প্রত্যক্‌ষ মানব শরীর মে।”
“আমায় কী করতে হবে, বাবা?”
“খাওয়াতে হবে। ষোড়শোপচার মতলব সোলা আইটেমওয়ালা থালি দিতে হবে ইনকো। প্রভু যা চাইবেন তাই খাওয়াতে হবে। ইয়াদ রাখিস বিটিয়া, তেরে পতি মে স্বয়ম ভগবান বিষ্ণু কা অন্‌শ হ্যায়। এঁকে যা খাওয়াবি, খোদ নারায়ণ খাবেন।”
“দেব বাবা। নিশ্চয়ই দেব। রোজ ষোড়শোপচারে ভোগ দেব।” বৌদির গলায় ভক্তির রসধারা আরও রসায়িত হয়ে উঠছিল। “কিন্তু আমার স্বামী ঠিক হয়ে যাবে তো?”
“পূজা মিলনে সে তো খোদ মহাকালী ভি শান্ত হো যাতি হ্যায়, ইয়ে তো ফিরভি বিষ্ণুজি হ্যায়। বহুত জেন্টেলম্যান দেওতা হ্যায়। পর এক বাত…” ভীষণ বেগে একবার মাথা ঝাঁকালেন বাবা কুক্কুটানন্দ।
“কী কথা, বাবা?” গলাটা আবার যেন ভয়ে করুণ হয়ে এল বৌদির।
“হফতে মে দো দিন রাজসিক ভোজন, মতলব মাস-মচ্ছি কা ভোগ লগানা পঢ়েগা। বুধবার অওর রবিবার। ইয়ে নরসিংহ ভগবান কা দিন হোতা হ্যায়। বিষ্ণু কা বহুত খতরনাক রূপ হ্যায়। অগর জাগ গয়ে তো…”
“না না বাবা, আমি দেব। পুজোয় কোনও ত্রুটি হবে না। আজ থেকে উনিই আমার জ্যান্ত দেবতা। জয় শ্রীবিষ্ণু, জয় শ্রীবিষ্ণু।”
বাবাজি গম্ভীর ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন, “মঙ্গল হোক।”

(২)

সেদিনের সেই দেবত্ব প্রাপ্তির পর থেকে ভূষণবাবুকে আজকাল আর তেমন একটা দেখাই যায় না। মাঝে মাঝে শুধু বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এই পাপদীর্ণ পৃথিবীকে দেখেন আর অবসর সময়ে জীবের দুঃখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। চোখে মুখে সবসময় কেমন একটা গভীর স্বর্গীয় প্রশান্তির ছাপ, যেন সর্বদাই বৈকুণ্ঠের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই ক’দিনেই মালাবৌদির ষোড়শোপচার ভক্তিতে তাঁর গতরেও যে বেশ একটা ঐশ্বরিক প্রসারণ ঘটেছে, সেটাও চোখে পড়বার মতো।
তা কে জানে আজ কী মনে করে হঠাৎ এসে বসেছিলেন ঘন্টুদার চায়ের দোকানে। চায়ের কাপে সশব্দ চুমুক দিতে দিতে মাঝে মাঝে আলতো করে চোখ বোলাচ্ছিলেন আজকের কাগজটায়। তা এই সুযোগে ঘন্টুদা একবার হালকা গলায় বলল, “আমার কিন্তু কিছু বকেয়া আছে, ভূষণদা।”
মুহূর্তে ভূষণবাবুর চোখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত চাউনি ভেসে উঠল, যেন কেউ অনেক উঁচু থেকে এই লোভ-পঙ্কিল পৃথিবীকে দেখছে আর আয়েশ করে পান চিবোতে চিবোতে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলছে, সবই মায়া! অনেকটা সেই ভঙ্গিতেই ঘন্টুদার দিকে তাকিয়ে ভূষণবাবু বললেন, “ওরে অবোধ, টাকা মাটি, মাটি টাকা। প্রভুর কৃপা হলে সব পাবি রে ঘন্টু, সব পাবি।”
“তা এই অধমের ওপরও একটু কৃপা করুন, প্রভু।” পিঠের ওপর হঠাৎ একটা খসখসে হাতের ছোঁয়ায় চমকে উঠলেন ভূষণবাবু। পেছনে কখন যে রমেশ ডাক্তার এসে দাঁড়িয়েছেন টেরই পাননি।
“আরে রমেশ যে! আয় বোস। ঘন্টু, আরেক কাপ…”
“কাপ-টাপ পরে হবে, আগে আমাকে উদ্ধার করুন প্রভু। আপনার শরীরে তো স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু তাঁবু গেড়েছেন। সবই এখন আপনার ইচ্ছাধীন।” রমেশ ডাক্তারের কথায় আড়চোখে একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ভূষণবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “বলো বৎস, কী চাও।”
“কী আর বলব!” ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রমেশবাবু। মুখ দেখে মনে হল যেন ভগবান বুদ্ধ কথিত সেই শাশ্বত সত্য, জগৎ দুঃখময়, তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেছেন। তাঁর গলা ঠেলে যেন একটা নিদারুণ হাহাকার বেরিয়ে এল, “ভাই রে, জীবনে এখন শুধুই গ্রিন-টি আর বৌয়ের আরাধ্য বজরংবলীর প্রসাদী কলা দিয়ে মাখা ওটসーনাই চিকেন, নাই গোটস! এই রসহীন, মুরগিহীন, কচি পাঁঠাহীন জীবন থেকে উদ্ধার করে আমারও একটু ষোড়শোপচারের ব্যবস্থা করুন প্রভু।”
একচিলতে সরু হাসির রেখা যেন চকিত সৌদামিনীর মতো ভূষণবাবুর জ্যোতির্ময় মুখমণ্ডলে ঝিলিক দিয়ে উঠল। “এ তো অতি সামান্য ব্যাপার! ভূষণের দেহে শ্রীবিষ্ণু অবতীর্ণ হতে পারলে রমেশের দেহে সাক্ষাৎ হনুমানের আবির্ভাব ঘটতে আপত্তি কোথায়! পরশু সকালেই বাড়িতে একেবারে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিবি। তারপর বাকিটা আমি এসে... ঘন্টু, তুই তাহলে…”
মুখের কথাটা শেষ হবার আগেই ঘন্টুদা একেবারে লাফিয়ে এসে পড়ল রমেশবাবু আর ভূষণবাবুর সামনে। “আদেশ কিজিয়ে প্রভু। স্বামী কুক্কুটানন্দ বজরংবলীকে সেবা মে হাজির হ্যায়। বস ইসবার পুরনো বকেয়াসহ পুরা দক্ষিণা অ্যাডভান্স মে চাহিয়ে।”
আর তখনই কোথা থেকে কে একটা যেন খিটকেল গলায় চিৎকার করে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”

_____

অলঙ্করণঃ জয়ন্ত বিশ্বাস

তৃতীয় স্থানাধিকারি গল্পঃ সীতার আশীর্বাদঃ গোবিন্দ মণ্ডল



তারপর রামচন্দ্র তো বানর সৈন্য নিয়ে বন-বাদাড় ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলেছেন। বানর সৈন্যরা আগুপিছু স্লোগান দিতে দিতে চলেছে–রামাচন্দ্রজি কি, জয়! লক্ষ্মণজি কি, জয়! দুনিয়ার বানর, এক হও, এক হও। নারী ছিনতাইকারীর কালো হাত, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। বানর বাহিনীর স্লোগান, হুপ-হাপ দুড়দাড় শব্দে পাখিরা সব ভয়ে উড়ে পালাচ্ছে। বন্যজন্তুরা লেজ তুলে কে কোনদিকে ছুটছে তার ইয়ত্তা নেই। একজনকে ছুটতে দেখে অন্যজন ছুটছে। দিকে দিকে বনের মধ্যে রাষ্ট্র হয়ে গেলーআগ লাগা, আগ লাগা, পালাও, পালাও, জলদি পালাও! আবার কেউ শুনেছে এক আজব জন্তু আয়া, উনকো আঁখসে আগ নিকালতা হ্যায়। পালাও পালাও, জলদি পালাও।
অন্যদিকে রামচন্দ্র তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভারতের দক্ষিণদিকের একেবারে শেষপ্রান্তে উপনীত হলেন। স্থলভাগ শেষ। সামনে অগাধ জলরাশি। রামচন্দ্রের কপালে চিন্তার ভাঁজ। লক্ষ্মণ হতাশায় একটা ঢিপির উপর বসে চিন্তা করছে আর গতদিনের শূলপক্ব হরিণের মাংস দাঁতের ফাঁকে বেঁধে ছিল সেটা তিরের ফলা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করার চেষ্টা করছে। মহারাজ সুগ্রীবও চিন্তায় মগ্ন। চিন্তায় তিনি বারবার নিজের লেজের গোড়া চুলকোচ্ছেন। বানর সৈন্যরাও স্থানে স্থানে সব জড়ো হয়ে বসে আছে। তারাও সব চিন্তাকুল। দুয়েকজন চপল স্বভাব বানর পিছন দিকে একে অন্যের লেজে লেজ জড়িয়ে টানাটানি করছে।
চিন্তামগ্ন রামচন্দ্র বহুক্ষণ পরে নীরবতা ভঙ্গ করে ডাক দিলেন, “মিত্র সুগ্রীব!”
সুগ্রীব এগিয়ে এলেন। রামচন্দ্র বললেন, “আমাদের তো এভাবে বসে থাকলে চলবে না। যা হোক কিছু একটা ব্যবস্থা করুন। আমি যে আর ভাবতে পারছি না। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।”
এসব কথা বলতে বলতে রামচন্দ্র ‘হায় সীতা, হায় জানকী, কোথায় তুমি প্রিয়তমা!’ ইত্যাদি বাক্য সহযোগে বিলাপ ও ক্রন্দন করতে লাগলেন। সীতার বিরহে রামের বিলাপ ও ক্রন্দন দেখে সুগ্রীবেরও মনে পড়ে গেল তাঁর সদ্য বিবাহিত পত্নী তারার কথা। বন্ধুত্বের প্রতিদান দিতে বিয়ে করেই নতুন বউকে ঘরে রেখে রামের সঙ্গে সীতার খোঁজে সদলবলে বেরিয়ে পড়েছেন সুগ্রীব। এখন রামের পত্নী বিরহে সুগ্রীবের মনেও তারার বিরহ জেগে উঠল। তাঁরও তখন কান্না পেল। রামচন্দ্র এবং সুগ্রীব পরস্পরের গলা জড়িয়ে ধরে উভয়ে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে লাগলেন। মানুষ ও বানরের কান্নার সেই অদ্ভুত মেলবন্ধনের শব্দে বানর সৈন্যদের কিচিরমিচির থেমে গেল।
দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে আর সমুদ্রের শীতল বাতাসে লক্ষ্মণের দু’চোখ একটু ঢুলে আসছিল। হঠাৎ এই অদ্ভুত শব্দে তারও চটকা দিয়ে ঘুম ভেঙে গেল। সে তাড়াতাড়ি এক হাতে পিছনের কাপড়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে এল। তারপর অতি কষ্টে রামচন্দ্র ও সুগ্রীবকে পরস্পরের থেকে আলাদা করে সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে গেল। দু’জনের চোখে, মাথায়, ঘাড়ে, পিঠে ক্রমাগত জলের ঝাপটা দিয়ে তাঁদেরকে শান্ত করল লক্ষ্মণ। রামচন্দ্র তবুও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন দেখে লক্ষ্মণ তার মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করল। লক্ষ্মণ জানে, রামচন্দ্রের আত্মসম্মান বেশ টনটনে। কেবল মাঝে মাঝে সেটা একটু নেতিয়ে পড়ে। লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের সেই আত্মসম্মানকে জাগিয়ে তুলতে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে বেশ একটু উষ্মার সঙ্গে বলল, “ছিঃ দাদা! এমন বাচ্চাদের মতো যেখানে সেখানে কান্নাকাটি করো, আমার একদম ভাল্লাগে না। এইসব বানরেরা দেখছে। এরপর এই কথা দেশের বানরেরা শুনলে কী বলবে বলো দিকিনি?”
একথায় রামচন্দ্রের কান্না একটু থামল। তখন লক্ষ্মণ আবার বলল, “ইয়ে হম লোগো কা প্রেস্টিজ কা মামলা হ্যায়! ঘরের বউ লোকে তুলে নিয়ে গেছে–তার একটা বিহিত করা দরকার। সেসব না করে বসে বসে কাঁদছ? তোমাকে নিয়ে আর পারি না বাপু! নাও, এবার ওঠো।”
অন্যদিকে সুগ্রীব তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন আর থেকে থেকে নাক ঝাড়ছিলেন। লক্ষ্মণ রামের কান্না থামিয়ে এবার সুগ্রীবকে বলল, “ছিঃ, মহারাজা সুগ্রীব! আপনি কান্নাকাটি করে এভাবে বানর হাসাচ্ছেন!”
সুগ্রীবের কান্না এতে একেবারে থেমে গেল। তিনি চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন কেউ দেখছে কি না। যেসব বানররা এতক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, তারা সুগ্রীব তাকাতেই যে যার মতো চোখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে শুরু করল। যেন কিছু হয়নি, তারা কিছু শোনেনি, দেখেনি। লক্ষ্মণ তখন সুগ্রীবকে বলল, “নিন, এবার উঠুন। উঠে ঠাণ্ডা মাথায় সাগর পার হওয়ার উপায় বাতলান।”
কান্না থামিয়ে উঠে গিয়ে সুগ্রীব সাগর থেকে ভালো করে চোখমুখ ধুয়ে এসে গদা কাঁধে নিয়ে কয়েকবার পায়চারি করলেন। তারপর বড়ো উঁচু একটা পাথরের উপর বসে গদা দিয়ে নিচের ছোটো পাথরে ঠুক ঠুক করে ঠুকতে ঠুকতে চিন্তা করতে লাগলেন। চিন্তা করতে করতে সুগ্রীব হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “জয় শ্রীরাম!”
সুগ্রীবের এই চিৎকারে বানররাও মহা আনন্দিত হয়ে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
সুগ্রীব রামচন্দ্রকে গিয়ে বললেন, “পেয়ে গেছি।”
এই কথা কানে যেতে না যেতে বানর সৈন্যরা সব আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। যাক, তবে ঝামেলা মিটেছে। সীতাকে পাওয়া গেছে। আর বনে-বাদাড়ে ঘুরতে হবে না। এই আনন্দে বানররা কেউ পাথরের উপর ডিগবাজি খেতে লাগল; কেউ পাথর ঠেলে গড়িয়ে দিল। কেউ কেউ আবার হিসিতে হিসিতে কাটাকাটি খেলা শুরু করল। কোনও বানর লেজ দিয়ে গাছের ডাল জড়িয়ে দোল খেতে লাগল। কেউ বা গাছের ডালে দোল খেতে খেতে অন্যের কান ধরে টান দিল, অমনি সে তার পিছনে ছুটল। চারদিকে হুপ-হাপ দুড়দাড় কিচকিচ খি-খি ক্যা-ক্যা বহুরকম শব্দে আর দারুণ বিশৃঙ্খলায় ভরে গেল। রাম-লক্ষ্মণ দু’হাত তুলে বানরদেরকে বারবার শান্ত হতে বলছেন। কিন্তু কার কথা কে শোনে! তখন সুগ্রীব এক বৃহৎ শিলাখণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে কাঁধে গদা নিয়ে বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়লেন, “খামোশ!”
অমনি বানরেরা যে যেভাবে ছিল সেভাবেই থেমে গেল। চারদিকে নিস্তব্ধ। তখন সুগ্রীব রামচন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মিত্র রামচন্দ্র, আমি এতক্ষণ চিন্তা করে একটা উপায় পেয়ে গেছি। আমার মতে সীতাকে অনুসন্ধান করতে সকলের একসঙ্গে সাগর পার হওয়ার দরকার নেই। সকলের একসঙ্গে সাগর পার হওয়া একটা বিরাট হ্যাপা। তারপর বহুত মেহনত করে সাগর পার হয়েও যদি সীতার খোঁজ না পাই তাহলে সবটাই পণ্ডশ্রম হবে। তার চেয়ে আগে একজনকে পাঠানো হোক। সে খবর নিয়ে আসুক। খবর পেলে তার পরের ব্যবস্থা না হয় পরে নেওয়া যাবে।”
প্রস্তাবটা রামচন্দ্রের মনে ধরল। কিন্তু কথা হচ্ছে, কে যাবে এই খবর আনতে? এই বিরাট সাগর কে পার হবে? রামচন্দ্রের সৈন্যদের মধ্যে বানররা যেমন ছিল, তেমনি ছিলেন ভালুকদের রাজা জাম্বুবান। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, “আমি যেতে পারি। এই সাঁতার দিয়ে যাব আর আসব।”
লক্ষ্মণ তৎক্ষণাৎ জাম্বুবানের কথা নাকচ করে দিল। লক্ষ্মণ হাড়ে হাড়ে জাম্বুবানকে চেনে। পথে ঘাটে কখন যে তাঁর ভালুক-জ্বর আসবে তার ঠিক নেই। তাছাড়া ভালুকের যা মাছের লোভ! সমুদ্রে কত মায়া মৎস ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাম্বুবানকে ভুলিয়ে নিয়ে যেতে কতক্ষণ? লক্ষ্মণ তাই সরাসরি না করে দিয়ে মিষ্টি করে জাম্বুবানকে বলল, “আপনি অতিশয় প্রবীণ আর বিজ্ঞ ব্যক্তি, মহারাজ জাম্বুবান। আমরা এই সময় আপনাকে একটুও দল ছাড়া করতে চাই না। আমার মতে বানরেরা ভালো লাফাতে-টাফাতে পারে। ওরাই কাজটা করুক।” এই বলে লক্ষ্মণ সুগ্রীবের দিকে তাকাল।
সুগ্রীব তখন মনে মনে ভাবছেন, রামচন্দ্রের বউ খুঁজতে গিয়ে যদি মাঝখানে সমুদ্রে পড়ে বেঘোরে মরি তবে আমার বউটার কী হবে? তবে মনে যাই ভাবুন, মুখে সেই ভাবনাকে একটুও প্রকাশ করলেন না সুগ্রীব। তিনি বললেন, “কথাটা মন্দ নয়। কিন্তু…” এই বলে কিছু সময় থেমে সুগ্রীব নিজের লেজের গোড়া চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “আমি ভাবছি, আমি যদি যাই তবে আমার এই দলবল সামলাবে কে? একটু আগে দেখছিলেন তো কেমন বেয়াদব সব! একটু যদি মানুষের কথা শোনে!”
সুগ্রীবের কথাটা রামচন্দ্রের মনে ধরল। তিনি বললেন, “না না না, আপনার গিয়ে কাজ নেই। আপনি আপনার দল থেকে কাউকে পাঠান।”
একথা বলতেই সুগ্রীব বানর সৈন্যদের দিকে তাকালেন। অমনি বানরদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। যে সামনে ছিল সে ঠেলে-ঠুলে পিছনে যাওয়ার চেষ্টা করল। কেউ আবার সুগ্রীবের নজর এড়াতে অন্যের আড়ালে নিজের মুখ লুকাল। সুগ্রীব তাঁর পূর্বের পাথরের উপর দাঁড়িয়ে বানরদের উদ্দেশ্যে বললেন, “অ্যা-টেন-শন!”
সঙ্গে সঙ্গে বানরদের ঠেলাঠেলি বন্ধ হয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে বানররা সব সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সুগ্রীব সারবদ্ধ বানরদের মাঝে গদা হাতে প্রবেশ করলেন। বানরদের বুক ঢিপ ঢিপ। সুগ্রীব বেছে নিলেন নল, নীল, গয়, গবাক্ষ, অঙ্গদ এবং হনুমানকে। ইচ্ছে, এদের মধ্যে একজন ব্যর্থ হলে অন্যজনকে পাঠাবেন।
সুগ্রীব যাদেরকে বেছে নিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ পাশ কাটানোর জন্য নানারকম অজুহাত খুঁজতে লাগল। নীল ইতিমধ্যে খোঁড়াতে শুরু করল। বলল, তার পায়ে ভীষণ ব্যথা। লাফাতে পারবে না। গয় বলল, কাল বনের এক বিষফল খেয়ে তার পেট ছেড়ে দিয়েছে, পেটে ভীষণ ব্যথা করছে। অন্য বানরদের সঙ্গে লেজে লেজে জড়াজড়ি খেলতে গিয়ে গবাক্ষের লেজ একটু ছড়ে গিয়েছিল। সুগ্রীবকে সেটা দেখিয়ে সে বলল, “মেরা লাঙ্গুল মে থোড়া ইনফেকশান হ্যায়। আমার যাওয়াটা কি ঠিক হবে?”
নল কোনও অজুহাত খাড়া করতে পারল না। ভয়ে ভয়ে সে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেল। সুগ্রীব তার পিঠ চাপড়ে সাহস দিলেন এবং লেজ কামড়ে দিলেন, যাতে পথে কোনও অশুভ শক্তির নজর না পড়ে।
নল রেডি হয়েছে লাফানোর জন্য। পিছন থেকে বানররা সব তালে তালে হুপ হুপ শব্দ করছে নলকে উৎসাহ দিতে। সুগ্রীব কাউন্ট করছেন। ওয়ান… টু… থ্রি বলতে যাবেন অমনি সমুদ্রের ঢেউয়ের একটা ঝাপটা এসে নলকে নাকানি চোবানি খাইয়ে একেবারে তাল্লা মেরে ফেলে দিল। নল সমুদ্রের নোনা জল খেয়ে পেট ঢোল করে খি খি করে নাকমুখ ঝাড়তে ঝাড়তে আঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনওরকমে ডাঙায় উঠে এল।
এরপর এগিয়ে এল অঙ্গদ। কিন্তু সেও ব্যর্থ হল। লাফ দিয়ে কিছু পথ গিয়ে সে ঝপাং করে সমুদ্রে পড়ে গেল এবং কোনও প্রকারে সাঁতার দিয়ে সে ডাঙায় উঠে হাঁপাতে লাগল। রাম-লক্ষ্মণ-সুগ্রীব সকলের মুখ শুকিয়ে গেল। তখন এগিয়ে এল পবন পুত্র হনুমান।
হনুমান বুঝেছিল, লাফিয়ে দূরে যেতে গেলে কোনও নিচু জায়গা থেকে লাফালে চলবে না। সে একটা পাহাড়ে উঠল। একটা উচ্চ পার্বত্য বৃক্ষকে দেখিয়ে সে সুগ্রীবকে তার পরিকল্পনার কথা জানাল। সুগ্রীব সেই বৃক্ষে আরোহণ করে গাছের ডগায় লেজ পেঁচিয়ে ঝুলে পড়লেন। বানরেরা সুগ্রীবের হাত ধরে সুর করে টানতে লাগল নিচের দিকেーহেঁইয়ো মারো-হেঁইয়ো, জোরসে মারো-হেঁইয়ো, আউর থোড়া-হেঁইয়ো। সুবৃহৎ পার্বত্য বৃক্ষ ধীরে ধীরে নুইয়ে পড়ল। সুগ্রীবের লেজ টনটন করছে। আর একটু টান দিলেই হয়েছে আর কী। ফস করে টিকটিকির লেজের মতো লেজটা তার গোড়া থেকে খসে পড়বে। হনুমান নুইয়ে পড়া গাছের মাথায় চড়ে বসে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
সঙ্গে সঙ্গে সুগ্রীব লেজের বাঁধন খুলে দিলেন। অমনি নুইয়ে পড়া গাছটা তিরের বেগে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। আর হনুমান সেই বেগে চরকিবাজির মতো ঘুরতে ঘুরতে একেবারে লঙ্কায় গিয়ে পড়ল।

লঙ্কায় গিয়ে কীভাবে সীতার সঙ্গে হনুমানের মোলাকাত হল তা সকলের জানা আছে। হনুমানের সাক্ষাৎ পেয়ে সীতার মন আশা-আনন্দে দুলছে। হনুমানও সীতার কুটিরে পরম আদরে আছে। মাঝে মাঝে হনুমান খবর নিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য সীতার অনুমতি চায়। তবে হনুমান এইরকম যাই যাই করে বটে, কিন্তু যায় আর না। সীতা এই ক’দিনে লক্ষ করেছেন, তাঁর সহচরী হিলিম্পার সঙ্গে হনুমানের বেশ মাখো মাখো ভাব। হনুমান আর হিলিম্পাকে একসঙ্গে উদ্যানে প্রায়ই ঘুরতে দেখা যায়।
একদিন সীতা দেখেন উদ্যানে গাছের নিচে বসে বসে হনুমান তার লেজের ডগা দিয়ে হিলিম্পার কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সীতার মনে সন্দেহ প্রবল হল। তিনি একদিন হিলিম্পাকে ডেকে বললেন, “হিলিম্পে! আমাদের হনুমানকে তোর কেমন লাগে?”
হিলিম্পা কোনও কথা না বলে পায়ের বড়ো বড়ো নখ দিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে লাগল। হিলিম্পার মনের কথা বুঝতে আর বাকি রইল না সীতার। এরপর হনুমানকে কুটিরে ডাকলেন সীতা। নানারকম গল্প করতে করতে সীতা হনুমানকে বললেন, “দেখো বাবা হনুমান, তুমি এই যে বনে-বাদাড়ে ঘোরো, একা একা থাকো, এসব ঠিক নয়। অসুখটা বিসুখটা আছে, তখন কে তোমাকে সেবা করবে? সেবাযত্ন করা, সুখদুঃখের দুটো গল্প করা–এসবের জন্য একটা লোক তো চাই। বলি কী, তুমি একটা বিয়ে করো।”
সীতার কথার শুনে হনুমান বলল, “মা, বে করতি তো ইচ্ছে হয়, কিন্তু যা সব দেখতিছি তাতে বুজতি পারতিছি যে বে করার অনেক হ্যাপা আছে। এই দেখো না, আমাগো রাজা সুগ্রীব–সে তার নিজির দাদার বউডারে বে করার জন্যি দাদারে মারি ফিলেছে। তারপর ধরেন গে এই আপনার কথা। বাসায় একলা পাইয়ে রাবণ ধুরে নে আল। বে করলি এই সব হাজার ঝামেলা। তার চে মা, এই ভালো আছি। তোমারে উদ্ধার করি প্রভু রামচন্দ্র রাজা হলি আমার আর কের চিন্তা? আর গল্পগুজবের জন্যি…” এই পর্যন্ত বলে হনুমান চুপ করে গেল এবং একবার তার কান, একবার বগল চুলকাতে লাগল।
সীতা হনুমানের মনোভাব বুঝে বললেন, “ঠিক আছে, বাবা হনুমান। আমি হিলিম্পাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তোমার মন চাইলে তুমি তার সঙ্গে প্রাসাদের পাশের কদলী বনে বসে বসে গল্প কোরো।”
সীতার কথা শেষ হতে না হতেই হনুমান ‘জয় শ্রীরাম’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আমি তবে এক্ষুনি প্রভু রামচন্দ্রের কাছে ফিরি যাচ্ছি। সত্বরেই তোমারে উদ্ধার কুরে নে যাব আমরা।”
হনুমানের কথায় সীতা মুচকি হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, হনুমান এতদিন কেন যাই যাই করেও যেতে চাইছিল না।
তবে হনুমান যেতে চাইলেও সেদিন তার যাওয়া হল না। কেন হল না সে সীতা আর হিলিম্পা জানে। সে যাই হোক, সেদিন যেতে না পেরে হনুমান শেষবারের মতো ছদ্মবেশে আরেকবার রাবণের গোপন সব কুটির দেখতে গেল। ঘুরতে ঘরতে সে একটা বন্ধ ঘরের সামনে এল। বাইরে থেকে ঠেলা দিলেও কিছুতেই তার দরজা খোলে না। হনুমান তখন ‘জয় শ্রীরাম’ বলে মারল এক লাথি। অমনি দরজা হাট হয়ে খুলে গেল। দরজা খুলে যেতেই হনুমান দেখল, কয়েকজন রাক্ষস একগাদা রঙবেরঙের ফল ঘিরে বসে আছে। হনুমান মনে মনে ভাবল, ব্যাটারা, চুরি করে ফল খাওয়া হচ্ছে! দেখাচ্ছি মজা। এই বলেই সে একেকটাকে চক্ষের নিমেষে লেজে পেঁচিয়ে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলল। এরপর হনুমান বটফলের মতো লাল একটা বড়ো ফল হাতে তুলে নিল। বহু বন ঘুরেছে হনুমান, কিন্তু এমন আজব ফল তার চোখে পড়েনি। ফলটাকে সে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না। তখন সে সেটাকে মুখে পুরে যেই না এক কামড় দিয়েছে অমনি দ্রাড়ম করে বিকট একটা শব্দ হল। তার পরের কথা হনুমানের আর জানা নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন হনুমানের সারা শরীরে প্রবল যন্ত্রণা। গায়ের চামড়া পুড়ে গিয়ে ছাল ছাড়ানো কুকুরের মতো অবস্থা তার। আসলে ফল ভেবে হনুমান যাতে কামড় দিয়েছিল সেটা ছিল একটা বিরাট বোমা। সেই বোমা ব্লাস্ট করে হনুমান রাবণের গোলাবারুদ সব ধ্বংস করেছিল। বাল্মীকি রামায়ণের আদিতে এসবের উল্লেখ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সংস্করণে বাহুল্য জ্ঞানে এসব কথা পরিত্যক্ত হয়। সে যাই হোক, সীতার সেবায় হনুমান সুস্থ হল। গায়ে আবার লোম গজাল। কিন্তু মুখে আর লোম না গজানোয় মুখটা কালো হয়ে রইল। হনুমান তখন সীতাকে বলল, “এই কালো মুখ নে আমি কী করি ফিরি যাব? আমি এখানে গাছের ডালে ল্যাজে ঝুলে মরব সে বরং ভালো, তবুও আর ফিরি যাব না।”
সীতা হনুমানকে অনেক বোঝালেন। তারপর তাকে এক মুঠো বারুদ পোড়া ছাই দিয়ে কানে কানে একটা পরামর্শ দিলেন। হনুমান সীতাকে প্রণাম করে আকাশ পথে রওনা দিল। সাগর পার হয়ে হনুমান যখন ফিরে এল তখন রাত্রি আড়াই প্রহর। সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফিরে এসে হনুমান প্রথমে তার প্রত্যেক ঘুমন্ত আত্মীয়ের মুখে একটু করে বারুদ পোড়া ছাই দিল। কাজ শেষ করে সে বাইরে এসে জয়ধ্বনি দিল। অমনি সকলের ঘুম ভেঙে গেল। হনুমান সকলকে জানাল, সব খবর কুশল। আজ সে ক্লান্ত। কাল কথা হবে।
পরদিন সকালে রামচন্দ্র উঠে অপেক্ষা করছেন। বানররাও তাড়াতাড়ি উঠে হাতমুখ ধুয়ে রেডি হচ্ছে। আর হনুমান মটকা মেরে শুয়ে থেকে মাঝে মাঝে মুখের ঢাকনা সরিয়ে বাইরের দিকে দেখছে। হঠাৎ বানরদের মধ্যে ছুটোছুটি হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। হনুমান মুখের ঢাকনা সরিয়ে দেখল, তার সব আত্মীয়দের মুখ কালো হয়ে গেছে। যতই তারা মুখে জল দিচ্ছে ততই মুখ কালো হচ্ছে এবং সেই আতঙ্কে তারা ছুটোছুটি ও চিৎকার করছে। হনুমান তখন বাইরে বেরিয়ে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
অমনি বানর সৈন্য সব মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
সুগ্রীব তো নিজের লেজটাকে মাথার উপর দিয়ে বাঁকিয়ে এনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছেন। তখন হনুমান বলল, “মহারাজ সুগ্রীব ও আমার বানর ভাই সব। তোমরা অকারণে ভয় আর লজ্জা পাচ্ছ।”
হনুমান যখন একথা বলছে তখন সুগ্রীব লেজটা একটু সরিয়ে এক চোখ দিয়ে হনুমানকে দেখার চেষ্টা করছেন। অন্যান্য বানররাও হনুমানকে আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখছে। কিন্তু হনুমান কলার পাতার ঝালর দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে। সেই অবস্থায় সে বলছে, “আমি সীতা মায়ের দর্শন শুধু পাইনি, তাঁর আশীব্বাদও সঙ্গে আনিছি। মায়ের আশীব্বাদ, আমার সব জ্ঞাতিগুষ্ঠির মুখ কালো হবে। আর তাইতেই লোকে আমাগো রামভক্ত হিসেবে চেনবে ও পুজো করবে। তাই এই কালো মুখের জন্যি লজ্জা পাইও না। এই দেখো আমার মুখও কালো।” এই বলে হনুমান নিজের মুখ থেকে ঝালরটা সরিয়ে ফেলল।
অমনি হনুমানের সমস্ত আত্মীয়-বন্ধু একত্রে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
তুমুল সেই হর্ষধ্বনির মধ্যে হনুমান কেবল ফিসফিস করে বলল, “জয় মা সীতা!”

_____

অলঙ্করণঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

চতুর্থ স্থানাধিকারি গল্পঃ লক্ষ্মী লাভঃ ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য


লক্ষ্মী লাভ

ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য



বীরশিবপুরে বিপিন হালদার এক মস্ত বিপদে পড়েছেন। আসছে মঙ্গলবার এই সময় ঘরে ঘরে সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়বে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয়, আর এরই মধ্যে কিনা হালদারবাড়ির পাঁচ-পাঁচটি নারকেলগাছ থেকে সমস্ত নারকেল একেবারে বেমালুম হাওয়া! এমনকি কচি কচি ডাবগুলো পর্যন্ত চুরির হাত থেকে রেহাই পায়নি! সকলের নাকের ডগা দিয়ে এই এত্ত নারকেল বেপাত্তা হয়ে গেল আর কিনা কাকপক্ষীতেও টের পেল না কিচ্ছুটি? বিপিন হালদারের বারবার মনে হল নারকেল তো নয়, যেন তাঁর মানসম্মানখানাই চোর বাবাজীবন ছ্যাঁদায় বেঁধে নিয়ে চম্পট দিয়েছে।
বীরশিবপুরে হালদারবাড়ির লক্ষ্মীপুজো প্রতিবছরই বেশ ধুমধাম করে সাড়ম্বরে পালন করা হয় বা বলা ভালো, তেমনটাই ফি-বছর হয়ে আসছে আর কী। গ্রামের বাড়িতে তাঁর এই লক্ষ্মীপুজোয় শহর থেকে মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনি সবাই চলে আসে বিজয়া দশমীর দিন। এখানেই গাঁয়ের আর পাঁচ ঘর মানুষের সঙ্গে বিজয়ার মিষ্টিমুখ সেরে কোমর বেঁধে সকলে নেমে পড়ে মা লক্ষ্মীর আবাহনে। বিপিনবাবু মানে পাড়ার আর সকলের হালদারদাদুর অর্ধাঙ্গিনী হালদারদিদার নারকেল নাড়ু শুধু পরিবারের মধ্যে নয়, পাড়ার সকলের কাছেই যাকে বলা যায় একেবারে মোস্ট ওয়ান্টেড জিনিস। সেই দেবভোগ্য নারকেল নাড়ু তৈরিই হয় হালদার-বাগানের পাঁচটি গাছের নারকেল দিয়ে। লক্ষ্মীপুজোর দিন দুয়েক আগে লোক লাগিয়ে পাড়ানো হয় গাছভর্তি সব ঝুনো নারকেল। বাজারের নারকেল বিপিনদাদুর বিচারে পুজোয় দেবার উপযুক্তই নয়। আর সত্যি বলতে কী, পাড়ার সকলে তাঁর সঙ্গে এই বিষয়ে একমত যে হালদার-বাগানের নারকেলের জাতই আলাদা। যেমন তালমিছরির মতো মিষ্টি জল, তেমনই ক্ষীরের মতো মিষ্টি নারকেলের শাঁস। বয়সের দরুন দিদা এখন আর একা হাতে নাড়ু পাকিয়ে উঠতে পারেন না। তাই দিদার তদারকিতে আর রেসিপি মেনে গ্রামের মেয়ে-বৌদের হাতে হাতে তৈরি হয় এই মহাপ্রসাদ। লক্ষ্মীপুজোর একদিন আগে থেকেই বাড়ির চারপাশ নারকেল পাক দেবার সুবাসে ম-ম করতে থাকে। গন্ধে গন্ধে ভিড় জমায় বাড়ির সুমুখে রথতলার মাঠে খেলতে আসা কচিকাঁচার দলও। এবার কিনা সেই নারকেলের ভাণ্ডারেই চুরি! একে তো চুরি বললেও কম বলা হয়। এ যেন একেবারে গলা কেটে ডাকাতির মতোই জঘন্য অপরাধ। নেহাত বিপিনবাবু শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাই এসব নিয়ে পুজোর মধ্যে থানাপুলিশ করে আর ঝামেলা বাড়াতে চাননি। এ যাত্রা তাই বাজারের গুটিকতক কেনা নারকেল দিয়েই নমঃ নমঃ করে পুজোর কাজ সারবেন ঠিক করেছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল মানে বিজয়া দশমীর দিন। পাড়ার দুর্গাঠাকুর যাত্রা করিয়ে বেশ রাত করে ক্লান্ত দেহে ফিরেছিলেন পাড়ার সকলে। আজ শুক্রবার সকালে বিপিন হালদার মাঠ থেকে প্রতিদিনের মতোই প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরে আসার পথে রীতিমতো ডেকে দাঁড় করিয়ে বিষয়টা নজরে আনেন পাশের বাড়ির কালীবাবু অর্থাৎ কালীপ্রসন্ন চক্কোত্তি। ঠোঁটের কোণে এঁটো হয়ে ঝুলে থাকা তেরছা হাসিখানা দেখে ভালোই মালুম হচ্ছিল যে তিনি মনে মনে বিপিনবাবুর নারকেল বিলুপ্তির ব্যপারটা বেশ আয়েশ করে উপভোগ করেছেন। যদিও মুখে বেজায় দুঃখ প্রকাশ করলেন এমন মর্মান্তিক ঘটনার জন্য।
বীরশিবপুরের লক্ষীপুজো সেই বাপঠাকুদ্দার আমল থেকেই প্রতিবছর হালদার আর চক্কোত্তিーএই দুই পরিবারকে কেন্দ্র করে দারুণভাবে জমে ওঠে। আগে চক্কোত্তিদের পুজোয় জাঁকজমক কিছু কম হলেও হালের কিছু বছরে দেখতে দেখতে হালদারগিন্নির নারকেল নাড়ুকে জোর টক্কর দিতে শুরু করেছে চক্কোত্তিগিন্নির তুলাইপাঞ্জি চালের ভুনি খিচুড়ি। তবে ধারে ভারে এখনও জনপ্রিয়তার নিরিখে টলমল করতে করতে হলেও সেরার শিরোপাটুকু ধরে রেখেছে বা বলা ভালো রেখেছিল এই হালদারবাড়ির নারকেল নাড়ুই। এই সত্যটা মন থেকে কোনও দিনই মেনে নিতে পারেননি কালী চক্কোত্তি আর তাঁর পরিবার।
যথারীতি প্রতিবছরের মতো এবছরও বিজয়া দশমীর পরদিন অর্থাৎ শুক্রবার সন্ধেবেলা হালদারবাড়িতে সপরিবারে শহর থেকে মেয়ে-জামাই এল। সেখানে নারকেলের জন্য শোক সত্ত্বেও ছিল ভালো আয়োজন। মনের দুঃখ মনেই চেপে বিপিনবাবু সকাল সকাল ফর্দ মিলিয়ে থলে ভরে বাজার করে এনেছিলেন। হালদারগিন্নিও জামাইয়ের পছন্দমতো একে একে তৈরি করেছিলেন চালকুমড়োর পুর ভাজা, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক, চিংড়ি দিয়ে মোচার ঘণ্ট, চিতল মাছের মুইঠ্যা, গোপালভোগ আর পায়েস। সেদিন রাতে তিনতলার ঘরে বসে পাত পেড়ে কব্জি ডুবিয়ে জামাই বাবাজীবন এতসব লোভনীয় খাবারদাবার খেতে খেতে একসময় বেজায় হাঁফিয়ে উঠল। তারপর যেই না পায়েসভর্তি জামবাটিতে মুখ দিতে গেল, হঠাৎই তারস্বরে কানে ভেসে এল একদম ছোটো কোনও বাচ্চার পরিত্রাহি কান্নার আওয়াজ। আচমকা সেই আওয়াজ শুনে জামাই বাবাজীবন ঘাবড়ে গিয়ে বেমক্কা বিষম খেয়ে গেলেন। হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল জামবাটি ভর্তি পায়েস। বাড়ির আর সকলে ব্যস্ত হয়ে উঠল অবস্থা সামাল দিতে। সকলেই একমত হল যে এমন বেয়াক্কেলে আওয়াজটা বেশ কাছ থেকেই হয়েছে। যদিও এত রাতে আওয়াজটা কোথা থেকে হয়েছে সেটা বোঝা গেল না কিছুতেই। নাতি-নাতনিরা সামনেই ছিল। তারা অত ছোটো নয়, আর কাঁদলে তো দেখতেই পেত সবাই। বাইরে আলো নিয়ে বাড়ির চারপাশেও ক’জন মিলে খুঁজে দেখল, কিন্তু কোনও বাচ্চাকেই চোখে পড়ল না কারুর।
এরপর গোটা তিনদিন ধরে এইরকম বিভিন্ন সময় একইভাবে বারবার সদ্যোজাত কোনও বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেতে লাগল হালদারবাড়িতে। কিন্তু বারবার বাড়ির সকলে মিলে চিরুনি তল্লাশি চালালেও কে কাঁদছে কিছুতেই বোঝা গেল না সেটা। হালদারবাড়ির সকলেই এরকম একটি অলুক্ষণে অদ্ভুতুড়ে ঘটনায় বিমর্ষ হয়ে পড়ল। কখনও মাঝরাতে তো কখনও ভোররাতে, কখনও ফুল তুলতে গিয়ে বা কখনও বাসন মাজতে গিয়ে, কখনও ঘুমের মধ্যে তো কখনও কাজের ফাঁকে আচমকা একটানা কিছু মুহূর্ত কান্নার আওয়াজ বারবার দিশাহারা করে দিতে লাগল হালদার পরিবারের সদস্যদের। উৎসবের মরসুমেও পরপর দুটো এমন ধারার ঘটনা ঘটতে দেখে চিন্তায় ভাবনায় নাওয়া খাওয়া মাথায় উঠল সবার। লক্ষীপুজোর আগে এমন সব আজব ব্যাপার গ্রামের কেউই শুভ লক্ষণ বলে মেনে নিলেন না। গ্রামের প্রবীণ মানুষ বলাইবাবু বা হালদারদাদুর বন্ধু গোবিন্দবাবু পরামর্শ দিলেন যে অসূয়া কাটাতে যাগ-যজ্ঞ করার।
এইরকমভাবেই মাঝের ক’টা দিন তালেগোলে কেটে গেল সকলের। লক্ষীপুজোর দিন এবার হালদারদাদুর পুজো কোনওরকমে সম্পন্ন হল। গ্রামে অভিবাবকদের নিষেধের কারণে কচিকাঁচার দলও ভয়ে ভয়ে ভিড় বাড়াল না হালদারবাড়িতে। যদিও নাড়ু হয়েছিল প্রায় পরিমাণ মতোই, কিন্তু বাড়ির কিছু লোক, আত্মীয়স্বজন আর দু-চার ঘর প্রতিবেশী ছাড়া খাবার তেমন লোক হল না মোটে। পুজোতে নিয়মমাফিক করা হয়েছিল সব কিছুই, কিন্তু এত সব কিছু ঘটে যাবার পর হালদারবাড়ির উৎসবের সুরটাই যেন কেটে গিয়েছিল।
বীরশিবপুরের এবারের লক্ষীপুজোর অঘোষিত বিজয়ী পরিবার তাই চক্কোত্তিবাড়ি। সেখানে এবছর আরও বড়ো আকারে হই-হই করে পালিত হয়েছিল লক্ষীপুজো। কালীবাবুর ছেলে লোকাল মিডিয়াতে তাদের বাড়ির পুজো নিয়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ব্যবস্থাও করেছিল। কালীবাবুর গিন্নির হাতে তৈরি খিচুড়ি ভোগ মাতিয়ে দিয়েছিল গোটা পাড়া। খিচুড়ির রেসিপি এবং পুজোর ফটো ফলাও করে বাড়ির নতুন প্রজন্ম প্রচার করেছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রসাদের বড়ো বড়ো থালা পৌঁছে গিয়েছিল পাড়ার সকলের বাড়ি। এক বড়ো কাঁসার থালা ভর্তি খিচুড়ি ভোগ এসেছিল হালদারবাড়িতেও। এবার সেই সঙ্গে নতুন একটা মিষ্টি যোগ হয়েছিল তাদের বাড়ির ভোগের মেনুতে, কেশর নারকেল বরফি। আবির্ভাবেই নাকি বাজিমাত করে দিয়েছিল সেটি। প্রসাদের থালায় রাখতে না রাখতেই নিমেষের মধ্যে ফুরিয়ে গেছিল তা। পাড়ার অনেকেই দেরি করে যাওয়ায় বরফি না পেয়ে দুঃখ করেছিলেন বেশ।
যাই হোক! লক্ষ্মীপুজো কেটে গেছে দিন দুই হল। হালদারবাড়িতে কান্নার শব্দ এখন আর পাওয়া যায় না। পাড়ায় এখনও কান পাতলেই শোনা যায় চক্কোত্তি পরিবারের সুখ্যাতি।
বিপিনবাবু বাজারে যাচ্ছিলেন সেদিন। হঠাৎ তাকে দেখে দৌড়তে দৌড়তে এসে হাজির হল পাড়ার কালু মল্লিক। কালু ছোটোখাটো ইলেকট্রিক দোকানে টুকটাক কাজ করে। বাকি সময় পয়সার গন্ধে গন্ধে পাড়ায় রাজনীতি থেকে শুরু করে ক্লাবের পুজো, ফুটবল খেলা সবেতেই অংশ নেয় সে। অল্পসল্প হাত টানেরও দোষ আছে তার। আর সেই কারণে হাজতবাসও হয়েছে কয়েকবার। অভাবের সংসার তার। বাবা গত হয়েছে সেই কোন ছোটোবেলায়। আপন বলতে আছে শুধু মা আর ছোটো বোন। কালুই কষ্টেসৃষ্টে দেখে তাদের।
বাজারে সেদিন বিপিনবাবুকে দেখেই একটা ঢিপ করে প্রণাম করে বলল কালু, “দাদু, একটা দরকারি কথা ছিল। যদি অভয় দেন তো বলি।”
বিপিনবাবু বুঝলেন নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে ব্যাটার। তাই শ্যামলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফুলকপি পছন্দ করতে করতে দায়সারাভাবে বললেন, “বলো কী বলতে চাও।”
কালু খানিক আমতা আমতা করে মাথা চুলকে বলল, “আসলে হয়েছে কী, আমার মোবাইলটা আপনার বাড়িতে ফেলে গেছি গত হপ্তায়।”
এমন কথা শুনে অবাক হয়ে বিপিনবাবু সবে শুধোতে যাবেন ব্যাপারখানা, সেই সুযোগ তাঁকে না দিয়েই বিপিনবাবুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কালু আবার বলতে শুরু করল, “তাহলে আর বলছি কী দাদু! আমি তো না পেয়ে পেত্থমে নিজের জিনিসপত্তর নেড়ে-ঘেঁটে খুঁজে খুঁজে হাল্লা হয়ে গেলাম। সেদিনের কেনা এসমার্ট ফোন বলে কথা! এখনও সব টাকা শুধতে পারিনি। এরই মধ্যে হারিয়ে ফেললে বড্ড বেপদ হয়ে যাবে। তারপর একদিন রাত্তির বেলা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে শুয়ে শুয়ে হঠাৎ মনে পড়ল, আরে! সেখানা তো সেদিন আপনার বাড়ির দক্ষিণদিকের একদম শেষ নারকেলগাছের কোটরে গুঁজে রেখে চলে এসেছি। তা যদি আজ্ঞা হয় তো একবার উঠে পেড়ে আনি সেখানা?”
কথাটা শুনে চমকে উঠলেন বিপিনবাবু। কালুর মুখের দিকে চেয়ে কড়াভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “তা তুমি বাপু আমার বাড়ির নারকেলগাছে উঠে কী করছিলে শুনি? আমি তো নারকেল পাড়ানোর জন্য তোমাকে কখনও ডেকেছি বলে মনে পড়ছে না।”
কালু প্রশ্নের এমন বাউন্সার সামলাতে সামলাতে মিনমিন করে বলল, “এই তো দাদু। আপনাদের না, মনে বড্ড সন্দ। এত কিছু জেনে কী করবেন বলুন তো? আপনারা পাড়ায় আছেন অ্যাদ্দিন। কোনওদিন কি পর ভেবেছি আপনাদের? জন্ম ইস্তক আপনার বাড়ির গাছগুলোকেও তো নিজের বলেই ভেবে এসেছি। তাই তো এবারেও লক্ষ্মীপুজোয় আর কেউ তেমন না গেলেও আমি কিন্তু পেট ভরে খেয়ে এসেছি দিদিমার হাতে পাকানো নাড়ু।”
হাত-পা নেড়ে আরও অনেক কিছুই উস্টুম-ধুস্টুম বকছিল কালু। এদিকে বিপিনবাবুর কাছেও নারকেল চুরির ব্যাপারটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বিপিনবাবু ফের একবার হাতের লাঠিখানা উঁচিয়ে ধমকে উঠলেন কালুকে।
ইতিমধ্যে হাটের মাঝে গোলমাল শুনে ধীরে ধীরে লোক জমতে শুরু হয়েছে। সকলের সামনে বিপিনবাবুর জেরার মুখে পড়ে অবস্থা বেগতিক বুঝে কালু কেঁদেকেটে বলে উঠল, “মায়ের নামে দিব্যি করেছিলাম। আপনেরা রাখতেও দিলেননি সে কথাখান। এখন হালদার কত্তা যদি দুটো নাড়ু দেন খেতে, তবে ভরসা পেয়ে দিব্যি ভাঙি। শুনেছি মায়ের প্রসাদ খেয়ে প্রিতিজ্ঞে ভাঙলে নাকি পাপ হয় না।”
বিপিনবাবু সজ্জন ব্যক্তি। কালুকে বললেন পিছু পিছু তাঁর বাড়ি আসতে। তারপর তাকে বাড়ির দাওয়াতে বসিয়ে নাড়ু, জল খাওয়ালেন। ততক্ষণে রগড় দেখতে একপাড়া লোক হুমড়ি খেয়ে জড়ো হয়েছে হালদারবাড়ির উঠোনে।
খান বিশেক প্রসাদী নাড়ু আর একঘটি জল খেয়ে লম্বা একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে কালু বলা শুরু করল, “আসলে দোষখানা সম্পূর্ণ আমার নয়। আপনার প্রেতিবেশী  চক্কোত্তিবাবু দুই হাঁড়ি চাল দিয়ে মহালয়ার দিন সওদা করেছিলেন আপনার বাড়ির ওই পাঁচ গাছ নারকেল পাড়িয়ে নেবার। নবমীর রাতে আমি সেইমতো কাজও করি। কিন্তু ভুলের ফেরে মোবাইলখানা ট্যাঁক থেকে খুলে সেই যে কোটরে গুঁজেছিলাম, সেটা নামার সময় ওখানেই ফেলে রেখে চলে আসি। সত্যি বলতে সেই সময় চিন্তায়, ভয়ে আর তাড়াহুড়োতে মোবাইলের কথা খেয়ালও ছিল নি। তারপর দশমীর দিন চক্কোত্তিবাবুর নির্দেশমতো বীরশিবপুর ছেড়ে পাশের গাঁয়ে মামাবাড়িতে গিয়ে গা ঢাকা দেই। দিন পাঁচেক পর লক্ষ্মীপুজোর দিন আমি বাড়ি ফিরি। মোবাইলটার কথা ততদিনে মনে পড়তেই খুঁজেছি অনেক। প্রথম প্রথম অন্য কোনও ফোন থেকে নম্বর লাগালে ওদিকে শব্দ শোনা যেত। এখন দু’দিন হল তাও বাজে না। তখন বুঝলাম আসলে ওর দম শেষ। হঠাৎ কানে এল যে পাড়ায় সকলে বলাবলি করছিল যে আপনাদের বাড়িতে নাকি ক’দিন যাবত যখন তখন বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এদিকে আমার মোবাইলেও তো ফোন এলে তেমনই আওয়াজ হত। তখনই মনে পড়ল যন্তরটার গাছে রেখে আসার কথাখানা। এদিকে মনে পড়লেও কীভাবে সেটা ফেরত পাব, মাথায় আসছিল নি কিছুতেই। আজ আপনাকে বাজারে দেখে শেষমেশ কপাল ঠুকে সাহস করে পেড়েই ফেললাম কথাটা।”
কালুর স্বীকারোক্তি শুনে জোর গুঞ্জন শোনা গেল ভিড়ের মধ্যে। এদিকে কালু তখন কথা শেষ করে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হালদারদাদুর মুখের দিকে। দাদু বললেন, “গাছে উঠে এখনই পেড়ে আনো তোমার মোবাইল। কিন্তু মায়ের নামে শপথ করে তার আগে সকলের সামনে বলতে হবে তোমাকে যে তুমি এই কাজ আর কখনও করবে না।”
কালু এবারে বিপিনবাবুর কথায় সম্মতি জানিয়ে সব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিপিনবাবুর সামনে কৃতজ্ঞ চিত্তে হাতজোড় করে দাঁড়াতেই বিপিনবাবু বললেন, “আজ থেকে আমার লক্ষ্মীমায়ের নিত্যপুজোর আয়োজন আর বাগান দেখাশোনার ভার তোমাকে দিলাম। তার বিনিময়ে উপযুক্ত মাসোহারা দেব তোমাকে যাতে আর কোনও অভাব না থাকে তোমাদের পরিবারে। দেখো বাবা, আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা কোরো না যেন। সে আমি এই বুড়ো বয়সে আর সইতে পারব না।”
কালু এবার কেঁদে ফেলল আনন্দে। লোকমুখে গোটা ঘটনার খবর পৌঁছল দেওয়াল লাগোয়া কালী চক্কোত্তিদের বাড়িতেও। এতসব কিছু জানাজানি হয়ে যাবার পর পাড়ায় তাঁদের আর মুখ দেখানোর জো রইল না। ওই বাড়ির সকলে কিছুদিন কাকপক্ষীর মুখ দেখাও বন্ধ রাখলেন। তারপর এক হপ্তার মাথায় হঠাৎই একদিন কেউ কিছু টের পাবার আগেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন। আর এরপর থেকে শুধু পরের বছর নয়, প্রতিবারের মতো লক্ষ্মীপুজোর সেরার শিরোপা জিতে নিল হালদার পরিবার। তোমরাও চাইলে সামনের বছর আসতে পারো হালদারবাড়ির লক্ষ্মীপুজোয়। সপরিবারে সকলের আমন্ত্রণ রইল।

_____


অলঙ্করণঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী