না-মানুষের পাঁচালিঃ আছে হুঁশ না হই মানুষ (২য়) - অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


দ্বিতীয় পর্ব


অক্টোপাসের বুদ্ধি



আগের পর্বে প্রাণীদের বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উদাহরণ স্বরূপ আমরা দেখেছিলাম ডলফিনদের বুদ্ধির কিছু নমুনা। এবারের আলোচনায় উঠে আসছে অক্টোপাসদের বুদ্ধি নিয়ে বিজ্ঞানীদের কিছু অত্যাশ্চর্য নিরীক্ষণ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, অক্টোপাসই কেন? এর উত্তর পাওয়া যাবে অত্যাধুনিক, বহুচর্চিত বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দিকে একটু তাকালেই।
মানুষের মস্তিষ্ককে মডেল হিসাবে ধরে নিয়ে কম্পিউটর বানাতে গিয়ে সমস্যায় পড়ল প্রযুক্তিবিদেরা। দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে হবে কম্পিউটারের গণনা, তবেই না মানুষের চাইতে আরও বেশি ঝটপট কষে ফেলা যাবে সব জটিল অঙ্ক। সমস্যা হল, মানুষের মস্তিষ্কের জায়গা নিল কম্পিউটারের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বা সিপিইউ। একই জায়গা থেকে বিভিন্ন অংশে তথ্যের আদানপ্রদান করলে সিপিইউ-এর উপর চাপ পড়ে, তাই অঙ্ক কষতে দেরি হয়। তখন বিজ্ঞানীরা আরও শক্তিশালী কম্পিউটার বানানোর জন্য এমন একটা মডেল খুঁজছিলেন, যেখানে শুধু সিপিইউ-এর উপর নির্ভর করে গণনা না করে, বিভিন্ন ছোটো অংশে কাজ ভাগ করে দেওয়া হবে, যারা হচ্ছে কো-প্রসেসর। মানে, কম্পিউটারে অনেক ছোটো ছোটো প্রসেসিং ইউনিট থাকবে যারা স্বাধীনভাবে কাজ করবে। এই ‘দশে মিলি করি কাজ’ করতে যে মডেলটা বাছা হল, সেটা হল অক্টোপাসের স্নায়ুতন্ত্রের অনুকরণে।
অক্টোপাসের একটা বিরাট মাথা আর তার আট-আটটা হাত আছে, এটা আমাদের সবার জানা। কিন্তু তাদের হাতগুলোর একটা বিশেষ গুণ আছে—সব হাতই আলাদা-আলাদাভাবে স্বাধীন। আর একটু বুঝিয়ে বলতে গেলে, ধরা যাক একটা অক্টোপাস ঠিক করেছে সে আজ একটা ক্যাট ফিশ ধরে খাবে। সেই মাছটা যেই না অক্টোপাসের নাগালের মধ্যে চলে এল, অমনি অক্টোপাসের একটা হাত তাকে চেপে ধরে মুখের গহ্বরে চালান করে দিল। এই কাজটা করতে গিয়ে তাকে খুব বেশি মাথা খাটাতে হয় না। দেখা গেছে এক বা একাধিক হাত দিয়ে একই সময়ে অক্টোপাস অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে করতে পারে। হয়তো অক্টোপাসের একটা বা দুটো হাত শিকার ধরছে, তখন তার মাথা খাটিয়ে হয়তো সে একটা জুতসই বাসা খুঁজছে, কিম্বা তাকে কেউ গিলে খেতে আসছে কি না সেটার দিকে লক্ষ রাখছে। অনেকগুলো কাজ বিভিন্ন হাত দিয়ে একসঙ্গে করতে পারার অক্টোপাসের এই ক্ষমতা শুধু মানুষ কেন, অন্য কোনও প্রাণীর আছে কি না বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
তাহলে দেখা গেল, অক্টোপাসের হাতগুলোও ভাবনা-চিন্তা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, মাথাটা তো পারেই। শরীরের এই বিশেষ গঠনের জন্য অক্টোপাস অনেক অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করে থাকে। প্রাণীদের বুদ্ধির জন্য শরীরের যে কোষ কাজ করে, তার নাম নিউরন। অক্টোপাসের মাথায় যত নিউরন আছে তার দ্বিগুণ তার আটটি হাতে ছড়িয়ে দিয়েছে প্রকৃতি। আরেকটি বিশেষত্ব হল, আটটি হাতই সমানভাবে কাজ করতে ইচ্ছুক, কেউ কুঁড়েমি করে গুটিয়ে বসে থাকে না।
এবারে দেখে নিই, অক্টোপাসের উপর গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা কী কী অদ্ভুত ঘটনা দেখতে পেয়েছেন।
মিউনিখে একটি চিড়িয়াখানায় অক্টোপাসের জলের ট্যাঙ্কে একটা কাচের বোতলে বন্দী করে কিছু জ্যান্ত চিংড়িমাছ রেখে দেওয়া হয়। পাঁচ মাস বয়সের একটা মেয়ে অক্টোপাস সেই বোতলটাকে কিছুক্ষণ দেখে-টেখে চিংড়িমাছ খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে সেই বোতলটাকে হাত দিয়ে পেঁচিয়ে বোতলের ঢাকনা খুলে ফেলল। এই কাজে তার অধ্যবসায়ও ছিল দেখবার মতো। পুরো পাঁচ ঘণ্টা লেগেছিল অক্টোপাসটার এই কাজ করতে।
ইন্দোনেশিয়াতে সমুদ্রের জলে অক্টোপাসের গতিবিধি লক্ষ করছিলেন কিছু প্রাণীবিজ্ঞানী। তাঁরা দেখলেন, নারকোলের ফেলে দেওয়া মালা টেনে নিয়ে যাচ্ছে একটা অক্টোপাস। এটা সে নিয়মিত করতে থাকে। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, নারকোলের অর্ধেক মালার উপর আরেক অর্ধেক চাপিয়ে অক্টোপাসটা তার বাসা বানিয়ে ফেলেছে। উদ্দেশ্য, যাতে অন্য জলজ প্রাণীর নজরে এসে সে নিজেই না শিকার হয়ে যায়।
জার্মানিতে অক্টোপাসের একোয়ারিয়ামে রোজই উপরে লাগানো হাই-পাওয়ার বালব ফিউজ হয়ে যাচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে কর্তৃপক্ষ নজর রাখতে শুরু করলেন। দেখা গেল, একটা অক্টোপাস মাঝরাতে একোয়ারিয়ামের কোনায় চড়ে বসে মুখ দিয়ে জলের ফোয়ারা ছিটিয়ে বালবে ফেলছে, আর তাতেই বালব ফিউজ হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় বালবের জোরালো আলো তার মোটেই সহ্য হচ্ছিল না। ঠিক একই ঘটনা দেখতে পাওয়া যায় নিউজিল্যান্ডের একটি গবেষণাগারে। সেখানে তো অক্টোপাসদের জল ছোড়াছুড়িতে গোটা গবেষণাগারে শর্ট সার্কিট হওয়ার দরুন সব অক্টোপাসদের শেষমেশ জলে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
একোয়ারিয়ামে বন্দী অক্টোপাসেদের ট্রেনিং দিয়ে রঙিন বল সনাক্ত করানো গেছে। দেখা গেছে পাঁচ বা ছয়বার দেখিয়ে দেওয়ার পর তারা সঠিক বলটাকে তুলে আনতে পারছে। তাই বোঝা যায়, অক্টোপাসদের অনুকরণ করবার ক্ষমতা আছে। তবে যেহেতু অক্টোপাসরা মিশুকে প্রকৃতির নয়, একা-একাই তারা থাকতে বেশি পছন্দ করে, মুক্ত প্রকৃতিতে বাস করবার সময় তারা যত না অন্যকে দেখে শেখে, তার চাইতে বেশি নিজেরাই বুদ্ধি খাটিয়ে নিত্যনতুন কাণ্ড ঘটিয়ে থাকে।
সমুদ্রের জলে অনেক অক্টোপাসের মধ্যে অন্য প্রাণীদের নকল করবার স্বাভাবিক আচরণও দেখা গেছে। যেসব মারণাত্মক সাপ বা মাছের শিকার হয় অক্টোপাস, তাদের অঙ্গভঙ্গি নকল করে কিছু কিছু অক্টোপাস শিকারিদের চোখে ধুলো দিয়ে দিতে পারে। আবার কিছু প্রজাতির অক্টোপাস নিজেদের শরীরের রঙ ও আকার বদলে ফেলে শিকারি সাপ বা মাছেদের বোকা বানিয়ে দেয়।
বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের চাইতে পৃথিবীর বুকে অনেক পুরনো বাসিন্দা হল অক্টোপাস। আফ্রিকায় প্রথম হোমোস্যাপিয়েন্স বা দু-পেয়ে মানুষের উদ্ভব হয় প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে। কিন্তু ঊনত্রিশ কোটি বছরের আগের ফসিলে অক্টোপাসের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অক্টোপাস নিয়ে মানুষের আগ্রহের হদিস পাওয়া যায় পুরনো পুঁথিপত্রে। ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রাণীদের ইতিবৃত্ত নিয়ে একখানা গুরুত্বপূর্ণ বই লিখে ছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করে গেছেন, অক্টোপাসেরা খুবই বুদ্ধিমান প্রাণী। তারা মানুষের কাছাকাছি এলে হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করে। নিজেরা খুব গুছানো। নিজেদের বাসায় খাবার যত্ন করে জমিয়ে রাখে, কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলে সব হাড়গোড় বাসার বাইরে ফেলে দিয়ে ঘর পরিষ্কার রাখে।
প্রাণীবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, অক্টোপাস সামনে কিছু দেখতে পেলে প্রথমে একটা বা দুটো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে জিনিসটাকে পরখ করে। তারপর পছন্দ হলে হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে গিলে ফেলতে চায়, সে মানুষের হাতই হোক, বা অন্য যেকোনও প্রাণী বা বস্তু। এতে বোঝা যায়, যে তারা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই কাজে অবশ্যই তাদের শরীরের স্নায়ুতন্ত্র তাদের সাহায্য করে, যেটা অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রাণীবিজ্ঞানীরা বলেন, শরীরের বিভিন্ন গঠন আর সুযোগ সুবিধা কাজে লাগিয়ে মাথা খাটিয়ে বিশেষ একেকটা কাজ করার ক্ষমতার মধ্যে দিয়ে প্রাণীদের বুদ্ধিবৃত্তি বোঝা যায়। দেখা গেছে, একেকরকম প্রাণীর একেকদিকে কাজের উৎকর্ষ আছে। কারও সঙ্গে কারও মিল না খোঁজাই ভালো। সবাই আলাদা আলাদা স্বাধীন জগতে নিজস্ব বুদ্ধির খেলা দেখায়।


(ক্রমশ)

No comments:

Post a Comment