যুগ্ম অষ্টম স্থানাধিকারি গল্পঃ ফাংশনে ফাটাফাটিঃ শুচিস্মিতা চক্রবর্তী


ফাংশনে ফাটাফাটি

শুচিস্মিতা চক্রবর্তী


নেড়ির মনে বড়ো দুঃখ। নিয়ম করে নেড়ির মা বছরে ছয় বার নেড়িকে ন‍্যাড়া করিয়েই ছাড়ে। যদিও মায়ের কোনও দোষ নেই। চুল একটু বাড়লেই মাথাভর্তি উকুনের ঠেলায় বাড়ির লোকজন, স্কুলের বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী সমেত নেড়িও অস্থির। অগত্যা ন‍্যাড়া হওয়াই একমাত্র রাস্তা।
এই ন‍্যাড়া মাথার চক্করে নেড়ি ও তার আশেপাশের সবাই নেড়ির অত সুন্দর আসল নামটাই ভুলতে বসেছে। নেড়ির ঠাকুরদা বড়ো সাধ করে একমাত্র নাতনির নাম রেখেছিলেন ‘এলোকেশী’। শখ ছিল ঘন কালো একঢাল চুল উড়িয়ে নাতনি উঠোনময় খেলে বেড়াবে। কিন্তু উকুনের অত‍্যাচারে সে তো আর হল না, বরং বছরভর নাতনির ন‍্যাড়া মাথা দেখে দেখে দুঃখে, মনোকষ্টে সময়ের আগেই উনি দেহ রাখেন।
তবে ন‍্যাড়া মাথা কিনা নেড়ির অভ‍্যাস হয়ে গেছে, তার দুঃখের কারণ অন্য। তার এই ন‍্যাড়া মাথার কারণেই স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশনে সে কোনও বছর অংশগ্রহণ করতে পারে না। তাই এবারও চুল কাটিয়ে আসার পর হাত-পা ছুড়ে নেড়ি কাঁদতে বসেছে। এই বছরও তার ফাংশনে অ্যাক্টো করা হবে না। নেড়ি কাঁই কাঁই করে কাঁদতে কাঁদতে তার মা ভবতারিণীকে বলছে এবার তাকে স্কুলের ফাংশনে একটা রোল দিতেই হবে। সে অ্যাক্টো করবেই করবে। মা যেন একথা গিয়ে হেড-স‍্যারকে বলে।
ভবতারিণী মেয়ের দুঃখ বোঝে। আহা রে! বন্ধুরা সবাই ফাংশন করবে, অট্টুকুনি মেয়ে, ন‍্যাড়া বলে কি ওর বছর বছর অ্যাক্টো করা মানা? ভবতারিণী মনস্থ করে সে যাবে হেড-স্যারের কাছে মেয়ের হয়ে সুপারিশ করতে। পাশের বাড়ির পান্তি, পুন্তি, পেনি, গুবলে, পটকা মায় টুনিটা পর্যন্ত ফি-বছর অ্যাক্টোতে চান্স পায়। কী সব দেখতে! তার নেড়ির চুল কাটাতে হয় বটে, কিন্তু দেখতে তো ঠিক মা দুগ্গার মতো। ঠিকই তো, এবারে হেড-স‍্যারকে বলে নেড়িকে ফাংশনে নামাতেই হবে।
ভবতারিণীর নামসুলভ হম্বিতম্বিতে রীতিমতো ভয়সঙ্কুল হয়ে হেড-স্যার নেড়িকে ফাংশনে নামাতে রাজি হন বটে, কিন্তু সমস্যা হল অ্যাক্টোতে ন‍্যাড়া মাথায় উনি নেড়িকে কী রোল দেবেন? ভবতারিণীর স্থূলকায় শরীরের উপর রসগোল্লার মতো চক্ষুদ্বয়ের চাউনির দিকে তাকিয়ে হেড-স্যারের হৃৎপিণ্ড শুকিয়ে আসে। তিনি কোনওপ্রকারে ঢোঁক গিলে ভবতারিণীকে আশ্বস্ত করেন যে এবছর নেড়ি, থুড়ি এলোকেশীকে একখান সুযোগ দেওয়া হবে।
অতঃপর স্কুলের ফাংশনে যে নাটক মঞ্চস্থ হবে, তা ঠিক হল ‘সংক্ষিপ্ত রামায়ণ’। রাবণের সীতাহরণ, হনুমানের সীতা উদ্ধার, রাম-রাবণের যুদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ অংশ ছেলেপুলেরা অ্যাক্টো করে দেখাবে।
স্কুলের ডাকাবুকো দুই ছেলে দাশু আর গুবলে যথাক্রমে রাম আর রাবণের জন্য মনোনীত হয়েছে। পান্তি হবে সীতা। হনুমান হবে পটকা। নেড়িকে অবশেষে একটা রোল দেওয়া হয়েছে। তা হল জটায়ুর। খড় দিয়ে বড়ো বড়ো দুটো পাখনা তৈরি করা হবে। নেড়ি হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে তার ডায়লগ বলবে। তবে কিছুতেই যেন তার ন‍্যাড়া মাথা দেখা না যায় সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। সে রাবণ সীতাকে হরণ করে নিয়ে যাওয়ার সময় পাখনাগুলোকে জোরে জোরে নেড়ে রাস্তা অবরোধ করবে, তাতে তার ন‍্যাড়া মাথাও আর দেখা যাবে না। অ্যাক্টো করাও হবে। নেড়ি তাতেই খুশি।
জোর কদমে রিহার্সাল চলছে। সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ঝামেলা হল হনুমানের লেজ নিয়ে। খড় দিয়ে বাঁকিয়ে, পেঁচিয়ে যতই লম্বা লেজ বানানো হোক, পটকার প‍্যাংলা শরীর কিছুতেই লেজের ভার বহন করতে পারছে না। যতবারই সে সমুদ্র পার হওয়ার জন্য লাফাতে যাচ্ছে, ততবারই লেজের ভারে পিছন দিকে ধপাস করে চিৎপটাং হয়ে পড়ছে। লেজ নিয়ে কিছুতেই আর সমুদ্র পেরোতে পারছে না। কিন্তু সমুদ্র পার না হলে সীতাকেই বা কী করে উদ্ধার করা হবে?
যাই হোক, অবশেষে হেড-স্যারই একখানা বুদ্ধি বাতলে দিলেন। ওঁর কথামতো ঠিক হল, লেজটাকে ভালো করে পেঁচিয়ে গলার সঙ্গে একটা পাতলা দড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হবে। তাহলে পেছনের দিকে বেশি ভার হবে না, শরীরের ভারসাম্য ঠিক থাকবে, আর দূর থেকে কেউ বুঝতেও পারবে না। পটকাও ধপাস হওয়া থেকে বাঁচবে।
পান্তি ফাংশনে সীতার রোল পেয়ে ভীষণই গর্বিত। সে প্রতিদিন পুন্তি আর পেনিকে নিয়ে শ‍্যাম্পু করা চুল উড়িয়ে নেড়ির বাড়ির সামনেই খেলাধুলা আর ঘোরাঘুরি করে। নেড়ি বোঝে, তার গা জ্বালানোই ওদের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু নেড়িও এবার দেখিয়ে দেবে যে অ্যাক্টো কাকে বলে!
এভাবেই ফাংশনের দিন আগত। পুরো গ্রাম উপচে পড়েছে ছেলেমেয়েদের অ্যাক্টো দেখার জন্য। স্কুলের বাইরে মাঠে বাঁশ দিয়ে সামিয়ানা খাটিয়ে বিশাল একখানা স্টেজ বানানো হয়েছে। বাঁশ দিয়ে চারদিকে ঘেরাও হয়েছে। স্টেজের মুখ উত্তরের দিকে, যেদিকে বেশি গাছপালা আছে সেদিকে। কিছু চেয়ারের ব‍্যবস্থা আছে স্কুলের স‍্যার আর দিদিমণিদের জন্য। বাকি ছাত্রছাত্রী ও দর্শকরা মাঠেই শতরঞ্জি আর বেঞ্চ পেতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়া গ্রামের ছেলে-ছোকরার দল স্কুলের আশেপাশের পাঁচিলে, বাড়ির ছাদে, বড়ো বড়ো গাছের মগডালে বাদামভাজা, মুড়ির কৌটো, ভুট্টা ভাজা সব বগলদাবা করে বহু আগে থেকেই নিজেদের জায়গা দখল করে রেখেছে। ফাংশনে উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইবেন স্কুলেরই দিদিমণি লতাকন্ঠী মিসেস কোকিলা সুরদাস মহাশয়া। সেই সময় ন‍্যাপলার কাজ হল ফাংশনের গেট পাহারা দেওয়া। কোনওক্রমেই যেন কোনও কুকুর তখন ফাংশনের গেটের ভিতরে ঢুকতে না পারে। কারণ, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে যখনই মিসেস কোকিলা গান ধরেন, আশেপাশের সমস্ত কুকুর আবেগপ্রবণ হয়ে তারাও ভৌ ভৌ করে ওঁর সুরে সুর মেলাতে শুরু করে। তাই এই ব‍্যবস্থা।
একে একে উদ্বোধনী সঙ্গীত, কচিকাঁচাদের কবিতা আবৃত্তি, মাস্টারমশাইদের ভাষণ সমস্ত হয়ে সর্বশেষ আকর্ষণ হল রামায়ণ পালা।
ফি-বছর স্কুলের এই পালা দেখার জন‍্যই এত ভিড় হয়। ন‍্যাপলা গেট ছেড়ে স্টেজের সামনে এসে হাজির হয়েছে। গেটের চক্করে তার পালাটাই না মিস হয়ে যায়!
শুরু হল বহু আকাঙ্ক্ষিত রামায়ণ পালা। স্টেজের পর্দা তোলা-পড়ার কাজ গোবরার। সে স্টেজের একপ্রান্তে দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো পালাও দেখা হবে, আর ঠিক সময়মতো পর্দা ওঠাবে আর নামাবে।
প্রথম পর্দা ওঠার পর স্টেজে এল রাম, লক্ষ্মণ আর সীতা। তারা পিতার আদেশ পালনের জন্য বনবাসে গমন করছে। ভরত রামের পাদুকা দুইখান সিংহাসনে রেখে রাজপাট সামলাচ্ছে। দর্শকেরা প্রত‍্যেকে আবেগে হেসে, কেঁদে হাততালি দিচ্ছে, বাহবা দিচ্ছে। হেড-স্যারের বুক গর্বে ভরে উঠছে। বেশ ভালো অ্যাক্টো করছে তাঁর স্কুলের ছেলেমেয়েরা। গাছের উপর থেকে ছেলে-ছোকরার দল বাটি বাজিয়ে, সিটি বাজিয়ে চিয়ার করে চলেছে। খুব ভালোভাবে প্রথম ভাগ সমাপ্ত হল। পর্দা পড়ল।
এরপর হবে সীতাহরণ। নেড়ি ভীষণ উৎসাহিত। সে প্রথমবার ফাংশনে অ্যাক্টো করার সুযোগ পেয়েছে। বারবার নিজের লাইনগুলো আওড়াচ্ছে উত্তেজনায় যাতে কোনও ভুলভ্রান্তি না হয়ে যায়। মায়ের কথায় হেড-স্যার তাকে জটায়ুর রোল দিয়েছেন, কোনও গণ্ডগোল হলে মা আর আস্ত রাখবে না। এদিকে মেয়ের অ্যাক্টো দেখবে বলে একদম প্রথমের দিকে বসেছে ভবতারিণী। কিছু গড়বড় হলে স্টেজ থেকেই কান ধরে টানতে টানতে বাড়ি নিয়ে যাবে।
পর্দা ওঠাল গোবরা। এবার শুরু হল সীতাহরণ পালা। দাশু ওরফে রাম দৌড়ল সোনার হরিণের পেছন পেছন। শুঁটকে লক্ষ্মণ দাদার ‘হায় লক্ষ্মণ! হায় লক্ষ্মণ!’ শুনে পান্তি ওরফে সীতার সামনে খানিক আস্ফালন করে চক দিয়ে গণ্ডী টানে আর সাবধান বাণী দেয়ー
“করিবে না কদাপি এ গণ্ডী পার,
না শুনিলে রামরাজ‍্য হবে ছারখার।”
বলেই লক্ষ্মণ স্টেজের পেছনে চলে যায়। এবার ব্রাহ্মণ বেশে স্টেজে আসে গুবলে, মানে রাবণ। সে ভিক্ষুক সেজে কথার ছলে সীতাকে গণ্ডীর বাইরে এনে হরণ করে নিয়ে চলে। এবার স্টেজে আগমন হয় জটায়ু ওরফে নেড়ির। নেড়িকে দেখেই নেড়ির মা আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে। নেড়ি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়েই সামলে নেয় নিজেকে। সে তার খড়ের তৈরি বড়ো বড়ো পাখনা দুটো নাড়িয়ে যথাসম্ভব ন‍্যাড়া মাথা ঢেকে রাবণের উদ্দেশে গর্জে ওঠেー
“যতক্ষণ জটায়ুর দেহে আছে প্রাণ,
রক্ষা করিব মা সীতার সম্মান।
ছল করে করিলি তুই সীতারে হরণ,
রামের হস্তে হইবে অচিরে মরণ।”
রাবণ অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে তরবারি উঁচিয়ে জটায়ুর দিকে তেড়ে যায়ー
“পথ ছাড়, ওরে দুষ্ট, পরিণতি নাই কি তোর জানা?
উঁচিয়ে তরবারি এইক্ষণে কাটিব তোর ডানা!”
এত লোকের মাঝে, হইচইতে ডানা কাটার কথা শুনে হঠাৎ করে নেড়ি তার পরের সমস্ত ডায়ালগ বেমালুম ভুলে যায়। তার দিকে রাবণের উদ্যত তরবারি দেখে আরও ভড়কে যায়ー
“কাটিবি না, কাটিবি না কিছুতেই ডানা,
ন‍্যাড়া মাথা অ্যাক্টোতে দেখা যাওয়া মানা!”
এই অপ্রত্যাশিত উত্তরে রাবণও ভড়কে গিয়ে সীতার হাত ছেড়ে তার পরের ডায়ালগ ভুলে গিয়ে ভেবলে দাঁড়িয়ে পড়ল। পান্তি ওরফে সীতা কী করবে কিছু ভেবে না পেয়ে পুরো স্টেজে, “রাম, রাম” করে দৌড়তে আরম্ভ করল।
এইসব কাণ্ডকারখানা দেখে স্টেজের বাইরে সকলে হো হো হাসিতে ফেটে পড়ল। হেড-স্যার তো রেগেমেগে দু’চোখ দিয়ে আগুন বের করতে লাগলেন। গোবরা বরং নিজের গোবর মাথার বুদ্ধি প্রয়োগ করে সে-যাত্রায় তাড়াতাড়ি পর্দা ফেলে তখনকার মতো পরিস্থিতি সামলে দেয়।
নেড়ির মা পেছন দিক দিয়ে স্টেজে গিয়ে কান ধরে নেড়িকে হিড়হিড় করে নামিয়ে আনে। নেড়ি ভয়ের চোটে ভ‍্যাঁ করে কেঁদে বলে, “ডানা কেটে দিলে তো ন‍্যাড়া মাথা পুরো দেখা যেত! আমি কী করব? ভ‍্যাঁ…”
ততক্ষণে পরের অংশের জন্য আবার স্টেজের পর্দা উঠে গেছে। এইবার হবে হনুমানের সমুদ্র-লম্ফন আর সীতা উদ্ধার। পটকা খুব সামলে-সুমলে হেড-স্যারের কথামতো লেজটাকে গলার সঙ্গে একটা পাতলা দড়ি দিয়ে বেঁধে ব‍্যালেন্স করে স্টেজে উঠেছে। সামনে নীল রঙের একটা কাপড় বিছিয়ে সমুদ্দুর বানানো হয়েছে। পটকাকে লেজ সামলে ঐ কাপড়, থুড়ি সমুদ্দুর পার হতে হবে।
পটকা বেশ ব‍্যালেন্স করে সমুদ্র পার হতে যাবে, ব‍্যস তক্ষুনি কোন এক চ‍্যাংড়া ছেলে গাছের উপর থেকে একটা লঙ্কা পটকা ফাটিয়ে দেয়। আগের পর্বের হইচই শুনে ফাংশন গেটের বাইরে কালু, টম, ভুলু, রোজি সবাই ঘটনার সরেজমিনে তদন্ত করার জন্য দল ভারী করছিল। এমন সময় অকস্মাৎ বাজির শব্দে ভোলাদের ভিতু ভুলুটা ঘেউ ঘেউ ভুলে কাঁই কাঁই করে এক লাফে সোজা স্টেজের উপর। বেচারা ভেবেছিল, ওইটাই বোধ হয় আত্মগোপন করার মোক্ষম জায়গা।
সেখানে পটকা ওরফে হনুমান ততক্ষণে সদ‍্য লাফ দিতে উদ‍্যত। এমন সময় ভুলুকে স্টেজে লাফ দিতে দেখে পটকা ঘাবড়ে গিয়ে হনুমানের কথা ভুলে গলা দিয়ে যত জোরে সম্ভব ‘হালুম হালুম’ আওয়াজ বার করতে থাকে। উদ্দেশ্য, বাঘের আওয়াজে ভুলুকে সেখান থেকে তাড়ানো। কিন্তু বেচারা ভুলু স্টেজের বাইরে লঙ্কা পটকা, স্টেজের উপর ‘হালুম হালুম’ শুনে নিজের প্রাণ বাঁচাতে ধরবি তো ধর হনুমানের লেজে বসায় এক কামড়। বেচারা হনুমান সামনে লাফ না দিয়ে পুরো ডিগবাজি খেয়ে উলটে পড়ে পেছন দিকে। হেড-স্যারের বুদ্ধিতে লেজে লাগানো দড়ি চেপে বসে পটকার গলায়। পটকা বেচারা ওরে বাবারে করে চিৎকার করে ওঠে। এতক্ষণে মানুষের আওয়াজ পেয়ে ভুলু একটানে হনুমানের লেজ মুখে করেই স্টেজ থেকে আবার নিচে লাফ দিয়ে একদম গেটের বাইরে পালায়। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ভুলুর মুখে খড়ের লেজের সাথে পটকার পরনের ধুতিটাও খুলে চলে গেছে।
হেড-স‍্যার রে রে করে তেড়ে আসেন। “বলি হচ্চেটা কী? ন‍্যাপলা, গেট দিয়ে কুকুর ঢুকল কী করে?”
ন‍্যাপলা তখন কোনওক্রমে স্টেজের সমুদ্দুর বানানো নীল কাপড়টা দিয়ে পটকার লজ্জা বাঁচাতে ব‍্যস্ত। ওদিকে স্টেজের বাইরে কেউ কেউ হাসিতে ব‍্যস্ত তো কেউ কেউ পটকা ফাটানোর অপরাধী খুঁজতে ব‍্যস্ত। বেশ খানিকক্ষণ পর গোবরা তার উন্নত বুদ্ধি প্রয়োগ করে আবার পর্দা নামিয়ে ফেলে। কিন্তু দাশু আর গুবলে রাম-রাবণের যুদ্ধটা তাহলে স্টেজে হবে, না অতঃপর মাঠেই করবে সে নিয়ে দোটানায় ভুগতে থাকে। দু’জনেই ঢাল-তলোয়ার, তির-ধনুক নিয়ে হেড-স্যারের সামনে উপস্থিত হয়।
“স‍্যার, আমাদের যুদ্ধের কী হবে?”
“কচুপোড়া হবে!”
দু’জনেই বুঝতে পারে, হেড-স্যার ভীষণ রেগে আছেন। তাই হেড-স‍্যারকে তুষ্ট করতে দাশু আর গুবলে আর কিছু না পেয়ে মাঠের মধ্যে স‍্যারের সামনেই যুদ্ধ আরম্ভ করে দেয়। রাম-রাবণকে মাঠেই যুদ্ধরত দেখে গোবরা স্টেজের পর্দা ওঠাবে কি ওঠাবে না ঠিক করতে পারে না। ওদিকে সীতা পর্দার ওপার থেকেই চিৎকার করতে আরম্ভ করে, “আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও…”
সেই শুনে রাম-রাবণ দু’জনেই স্টেজের দিকে দৌড়ে যেতে যায়, আর তখনই রাবণের দশ মাথার ধাক্কায় সামনে দাঁড়ানো হেডস্যার, “ওরে বাবা রে, মরে গেলাম রে!” বলে মাঠের মধ্যেই চিৎপটাং হয়ে উলটে পড়লেন।
চারদিকে হুলুস্থুল কাণ্ড হয়ে এবারের মতো স্কুল ফাংশন সমাপ্ত হয়। হেড-স‍্যারকে তৎক্ষণাৎ গ্রামের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যেতে যেতে তিনি বারংবার একটা কথাই বলতে থাকেন, “সবক’টাকে ন‍্যাড়া করে মাথায় ঘোল ঢালব, দেখে নিস!”

নেড়ির মা এরপর শহর থেকে ‘বাঁদর ছাপ’ উকুন মারার তেল মেয়ের জন্য আনান। প্রতিদিন দাওয়ায় বসে সকাল বিকেল নেড়ির ন‍্যাড়া মাথাতেই বেশ করে ঐ তেল মালিশ করতে থাকেন, যাতে চুল গজানো থেকেই যেন আর কোনও উকুন না হয়।
স্কুলে হেড-স্যার মাথায় পট্টি বেঁধে শাস্তি স্বরূপ পরের সাতদিন ন‍্যাপলা, দাশু, গুবলে, গোবরা, পটকা আর নেড়িকে দিয়ে নিজের মাথায় একটানা বাতাস করান।
নেড়ির মা খুব লজ্জিত হয়ে স্কুলে এসে হেড-স্যারের কাছে নেড়ির ভুলভাল অ্যাক্টোর জন্য খুব করে ক্ষমা চায় আর এক বোতল ‘বাঁদর ছাপ’ উকুন মারার তেল হেড-স্যারের হাতে তুলে দেয়। পরের ফাংশনে নেড়ির আর ন‍্যাড়া মাথা থাকবে না। একমাথা ঘন কালো চুল হবে আর তাও একদম উকুন ছাড়া। এর পরেরবার আর কোনও ভুল করবে না নেড়ি, থুড়ি এলোকেশী। পরেরবার কিন্তু নেড়িকে একটা মেইন পার্ট দিতেই হবে, এই শর্তে কথা নিয়ে তবেই ভবতারিণী স্কুল থেকে বিদেয় নেয়।
ভবতারিণী চলে যাওয়ার পর হেড-স্যার তাঁর ফাটা টেকো মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে উকুন মারার তেলটা আলমারিতে যত্ন করে তুলে রাখেন। আর খাতা-পেন নিয়ে বসেন, যত শীঘ্র সম্ভব এই গ্রামের বাইরে অন‍্য কোথাও স্কুলে বদলির জন্য আবেদন জানাতেই হবে।

_____

অলঙ্করণঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment