প্রথম স্থানাধিকারি গল্পঃ ঐশ্বরিক রসাস্বাদনঃ বিভাবসু দে



(১)

ব্যাপারটা মোটেই হাসির নয়। মানে শুনে কাশি পেতে পারে, এমনকি ভক্তি গদগদ হয়ে আপনি ভিরমিও খেতে পারেন, কিন্তু হাসি পাবে না। অন্তত রমেশ ডাক্তারের তো পায়নি। হাজার হোক এমন একটা যুগান্তকারী ঘটনায় হাসি পাওয়াটা মোটেই শোভন নয়।
যাক গে সেসব কথা, ঘটনাটা আগে খুলেই বলি। সেদিন সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে ডাক্তারবাবু সবে একমুখ ফেনা নিয়ে ব্রাশ চিবোতে চিবোতে পত্রিকার হেডিংগুলো দেখছিলেন। চোখের গোড়ায় তখনও ঘুম-ঘুম ভাব। আসলে যবে থেকে দেশে ডাক্তার পেটানোর রেওয়াজ হয়েছে, তখন থেকেই রমেশ ডাক্তারও বেশ মন দিয়ে নিয়মিত পত্রিকা দেখতে শুরু করেছেনーখোঁজখবর রাখা ভালো, পরিচিত কোনও বিটকেল বন্ধু মার-টার খেলে বেশ একটু ফোন করে খোঁচানো যাবে কিনা! ওই ওপাড়ার টেকো হারাধন ডাক্তারের টাকে ঘা দুয়েক পড়লে কিন্তু মন্দ হয় না। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ওই ব্যাটা রমেশবাবুর শার্টের ভেতর ইয়াব্বড় একটা টিকটিকি ভরে দিয়েছিল! উফ্‌, তিড়িংবিড়িং করে সারা কলেজ জুড়ে সেদিন কী নাচটাই না নেচেছিলেন তিনি! দেখলে মাইকেল জ্যাকসনও লজ্জা পেত। তারপর ওই সরকারি হাসপাতালের বুড়ো প্রতিম ডাক্তারটা…
“ডাক্তারকাকু, তাড়াতাড়ি চলুন। বাবাকে ভর করেছে।”
গেটের কাছ থেকে আচমকা কামানের গোলার মতো তেড়ে আসা মন্টুর বিকট চিৎকারে রমেশ ডাক্তারের মানসচক্ষে জ্বলজ্বল করতে থাকা গণধোলাইয়ের মনোরম দৃশ্যগুলো যেন এক ঝটকায় উবে গেল। সত্যি বলতে কী, শুধু উবেই গেল না, এমনই হকচকিয়ে গেলেন ডাক্তারবাবু যে মুখভর্তি টুথপেস্টের ফেনা একেবারে গপাৎ করে সরবতের মতো গিলে ফেললেন।
“চলুন চলুন, দেরি করবেন না। অবস্থা সিরিয়াস।” হাঁপাতে হাঁপাতে গেট ঠেলে ততক্ষণে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে মন্টু।
“কী বললি? কী হয়েছে ভূষণের?” খানিকটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তারবাবু।
“ভর করেছে। কীসব আবোলতাবোল বকছে।”
চোখদুটো গোল গোল হয়ে উঠল রমেশ ডাক্তারের। “ভর করেছে! কে?”
“বিষ্ণু ঠাকুর।”
“অ্যাঁ!” এবার ডাক্তারবাবুর হাত থেকে ব্রাশটাও গেল পড়ে। “বলিস কী রে! এতদিন ভূতের ভর, মা কালীর ভর, মায় মহাদেবের ভর অবধিও শুনেছিলাম, কিন্তু তাই বলে বিষ্ণু ঠাকুরের মতো ধুতি পরা ভদ্রলোক দেবতারাও আজকাল ভর করতে শুরু করেছেন! ঘোর কলি, ঘোর কলি।” মুখ দিয়ে একটা গভীর হতাশাব্যঞ্জক চুক চুক শব্দ করতে করতে ঘরে ঢুকে পড়লেন রমেশ ডাক্তার। আবার তড়িঘড়ি বেরিয়েও এলেন ডাক্তারি ব্যাগটা হাতে নিয়ে। “এমন কেসে দেরি করা একদম ঠিক নয়। হাজার হোক দৈব ব্যাপার বলে কথা।”
মন্টুদের বাড়ি খুব বেশি দূর নয়, ডাক্তারবাবুর বাড়ি থেকে মোটে কয়েক কদম। মন্টুর বাবা মানে ভূষণ পাল হলেন গে রমেশ ডাক্তারের স্কুল জীবনের জিগরি দোস্ত। তার ওপর পাড়া-বান্ধব তো বটেই। যেতে যেতে রমেশ ডাক্তার মন্টুকে জিজ্ঞেস করলেন, “তা হ্যাঁ রে, বিষ্ণুই যে ভর করেছেন সেটা বুঝলি কীভাবে?”
মন্টু বেশ বিজ্ঞের মতো ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, “গেলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।”
অবাক চোখে মন্টুর দিকে একবার তাকালেন রমেশ ডাক্তার। তবে কি ভূষণের চার হাত গজালো, নাকি গতর থেকে এল.ই.ডি বাতির মতো দিব্যজ্যোতি বেরোতে লাগল!
কিন্তু না। পাল-বাড়িতে ঢুকতেই যা ঘটল তা তার চেয়েও ভয়ংকর। ঘরের দুয়ারে ডাক্তারবাবু সবে পা রেখেছেন কি রাখেননি, শুনতে পেলেন কে যেন ভীষণ গলায় হুঙ্কার করে উঠল, “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত / অভ্যূত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।”
উফ্‌, গলা তো নয় যেন বি.আর. চোপড়ার মহাভারতের শঙ্খনাদ! কোনওক্রমে ব্যাগ-ট্যাগ সামলে ভেতরে ঢুকলেন রমেশ ডাক্তার। আর অমনি তাঁর দিকে তাকিয়ে আবার সেই বজ্রনির্ঘোষ, “অর্জুন, ভয় কী? অস্ত্র তোলো। কেউ কারও নয়, আমিই সব। এগিয়ে যাও অর্জুন, এগিয়ে যাও। যুদ্ধই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম।”
ভূষণবাবু তখন জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন রমেশ ডাক্তারের দিকেーপরনে ধুতি, আঙুলের ডগায় ঝিলিক দিচ্ছে সুদর্শন চক্র (ইয়ে মানে পুরনো সিডি আর কী!), ললাটে চন্দনচিহ্ন। এক পা সোফার হাতলে তুলে মুহুর্মুহু সিংহনাদ করছেন। এই দিব্য রূপ দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে একেবারে বাক্যহারা হয়ে পড়েছিলেন ডাক্তারবাবু। চিকিৎসা করবেন না সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সেটাই বোধহয় ভেবে পাচ্ছিলেন না।
পাশ থেকে মন্টু ফিসফিস করে বলল, “বাবার এখন কৃষ্ণাবতার চলছে। একটু আগে রাম অবতারে ‘মন্দির ওয়হি বনায়েঙ্গে’ বলে ব্যাপক চিৎকার করছিল।”
“সে কি! বিষ্ণু ঠাকুর আবার ভূষণের বডিতে ঢুকে অবতারও পালটাচ্ছেন নাকি?”
“হ্যাঁ, এই তো…” মন্টু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই…
“রমেশদা গো, আমার কী হবে গো!” বলে একেবারে আকুল নয়নে কাঁদতে কাঁদতে কোত্থেকে যেন হঠাৎ মালাবৌদি এসে আছড়ে পড়লেন রমেশবাবুর সামনে। বলা নেই, কওয়া নেই আচমকা এমন উৎকট সুরে রাগ ক্রন্দনির ঠেলায় আরেকটু হলেই প্রাণপাখি খাঁচাছাড়া হয়ে যেত রমেশ ডাক্তারের।
বৌদি আবার ডুকরে উঠলেন, “দেখো দেখো, তোমার বন্ধু সকাল থেকে কীসব বলে যাচ্ছে গো। একটু আগে তো আমাকে মা যশোদা বলে প্রণাম করতে তেড়ে এসেছিল! হায় ঠাকুর, আমার কী হবে গো! রোজ ভক্তিভরে নারায়ণ সেবা করে গেলুম আর ঠাকুর কিনা আমারই স্বামীর ঘাড়ে চাপলেন! হায় হায় গো!”
“আহা বৌদি, কেঁদো না। আমি দেখছি। যদিও দৈব ব্যাপার আমাদের এক্তিয়ারে পড়ে না, তবুও একবার…”
কিন্তু মুখের কথাটা শেষ করে যেই না স্টেথোখানা ব্যাগ থেকে বের করতে গেছেন রমেশ ডাক্তার, অমনি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন ভূষণবাবু। অর্ধনিমীলিত দৃষ্টি, একহাতে ধ্যানমুদ্রা, আরেক হাতে বরাভয়। শান্তকণ্ঠে বললেন, “হে বৈদ্যরাজ, জগত দুঃখময়। তুমি কার চিকিৎসা করিবে? কীসের চিকিৎসা করিবে? সর্ব দুঃখের যে মূল কারণ, আমি তাহাকে জানিয়াছি, তাহা হইতে মুক্তির পথও জানিয়েছি। অতএব আমার সঙ্গে উচ্চারণ করো, বুদ্ধম শরণম গচ্ছামি, ধম্মম শরণম গচ্ছামি, সংঘম শরণম গচ্ছামি।”
“এই সেরেছে! এ তো ভগবান বুদ্ধে চলে গেছে এবার।” পাশ থেকে মাথা নেড়ে সায় দিল মন্টু।
তবে ব্যাপারটা মন্দ হল না, রোগী অহিংস হলে ডাক্তারের ভারি সুবিধে কিনা। তাই এই সুযোগে চটপট কাজটা সেরে ফেললেন ডাক্তারবাবু। বেশ কিছুক্ষণ গভীরভাবে ভূষণকে পর্যবেক্ষণ করলেন; নাড়ি টিপলেন, বুকে স্টেথো লাগালেন, প্রেশারটাও মাপলেন আর তারপর একটা সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। “বৌদি, গতিক ভালো ঠেকছে না। না বুঝে ঐশ্বরিক ব্যাপারে আমাদের নাক গলানোটা ঠিক হবে না।”
শুনেই মালাবৌদি আবার নিজের সেই গিনিস বুকে তুলে রাখার মতো বুক কাঁপানো কান্না শুরু করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু রমেশবাবু থামিয়ে দিয়ে বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও বৌদি, এখনই কেঁদো না, অন্য উপায় আছে।”
“উপায়!” মুহূর্তে মুখটা ঝলমল করে উঠল বৌদির। “কী উপায় গো রমেশদা?”
“কুক্কুটানন্দ বাবা। খুব উচ্চমার্গের সাধক, হিমালয় থেকে সদ্য নেমে এসে ওই তেমাথার মোড়ের দক্ষিণে যে শ্মশানটা, সেখানে আশ্রম খুলেছেন। বৈষ্ণব, শাক্ত, তন্ত্র, শৈব, বেদান্তーসব শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য।”
ভক্তিভরে কপালে হাত ঠেকালেন মালা বৌদি। “জয় বাবা! কী যেন নাম বললে?”
“কুক্কুটানন্দ। কুক্কুট মানে মুরগিতে বাবার গভীর ঈশ্বরীয় আনন্দ লাভ হয় কিনা, তাই তিনি কুক্কুটানন্দ।”
“আহা, নাম শুনলেই মনে ভক্তিভাব আসে গো। তা আর দেরি কোরো না রমেশদা, তাড়াতাড়ি খবর দাও বাবাকে, নইলে কখন আবার তোমার বন্ধুর ভেতরে ঠাকুর নরসিংহ রূপ ধরে কার না কার ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে বসবেন!”
নিজের পাকা তরমুজের মতো পুরুষ্টু নধর ভুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন আঁতকে উঠলেন রমেশ ডাক্তার। “না না, চিন্তা কোরো না, আমি এক্ষুনি খবর দিচ্ছি।”

খবর তো দিলেন, কিন্তু মিনিট দশেক পরে যখন আবার ঘরে ঢুকলেন রমেশবাবু তখন তো তাঁর চক্ষুস্থির! এ যে একেবারে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড বেধে গেছে! সোফার এককোণে ভয়ে সিঁটিয়ে বসে আছেন মালাবৌদি। পরিত্রাহি চিৎকার করতে করতে ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে ছুঁচোবাজির মতো ছুটছে মন্টু। আর ভূষণবাবু? তাঁর এখন পরশুরাম রূপ। কোথা থেকে যেন একটা লাঠি তুলে ‘নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব’ বলতে বলতে মন্টুকে তাড়া করেছেন।
তা শেষমেশ মন্টু তো পালিয়ে বাঁচল, কিন্তু ভূষণবাবুর রোষ দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ল সোজা রমেশ ডাক্তারের ওপর। বাঘের মতো গর্জে উঠলেন, “কর্ণ, মিথ্যাচারী, তুই নিঃসন্দেহে ক্ষত্রিয়! তুই ছলনা করেছিস আমার সঙ্গে। ওরে নরাধম, আমি জমদগ্নিপুত্র ভার্গব পরশুরাম তোকে অভিশাপ দিচ্ছি যে জীবনের শেষ যুদ্ধে আমার শেখানো সব বিদ্যা তুই ভুলে যাবি। তোর রথের চাকা মাটিতে গেঁথে যাবে। তুই…”
অনবরত প্রায় আধঘণ্টা ধরে গর্জন করে গেলেন পরশুরামরূপী ভূষণ পাল। ভূষণবাবুর এমন মর্মস্পর্শী অভিশাপের ঠেলায় রমেশ ডাক্তার তো কিছুক্ষণের জন্যে সত্যি-সত্যিই নিজেকে কর্ণ ভাবতে শুরু করেছিলেন। হয়তো আরেকটু হলেই কর্ণকুন্তী সংবাদটাও আওড়াতে শুরু করে দিতেন!
কিন্তু এমন সময় হঠাৎ বাইরে বেশ একটা শোরগোল উঠল। কারা যেন জয়ধ্বনি দিচ্ছে, “জ্যায় বাবা কুক্কুটানন্দের জ্যায়! জ্যায় জ্যায় বাবার জ্যায়!”
ব্যস, একসঙ্গে ডাক্তারবাবু আর মালাবৌদি দু’জনেরই মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বাবা এসে গেছেন। উৎসাহের চোটে বৌদি তো একেবারে সোফা থেকেই লাফিয়ে গিয়ে পড়লেন বাবার পাদপদ্মে। এমন লাফ অলিম্পিকে দিলে ভারতের একখানা সোনা পাক্কা ছিল। বাবা দাড়ি নেড়ে বললেন, “মঙ্গল হোক বিটিয়া।”
বৌদি ভক্তি গদগদ মুখে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। আহা, বাবার কী অপূর্ব মূর্তি! গায়ে রক্তবস্ত্র, মাথায় জটা, মুখভর্তি দাড়ি, কপালে মুরগির পদচিহ্ন আঁকা। পেছন থেকে বাবার এক চ্যালা কে.এফ.সি-র চিকেন বাকেট থেকে একখানা আস্ত লেগপিস বৌদির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "লিজিয়ে মাই, বাবাজির প্রসাদ গ্রহণ করুন।”
বৌদি সেই দিব্য কুক্কুট-চরণ কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “বাবা, আমার স্বামীর ওপর বিষ্ণু ভর করেছেন। রক্ষে করুন বাবা!”
ডাক্তারবাবুও পাশ থেকে হাতজোড় করে বললেন, “এখন আপনিই একমাত্র ভরসা।”
বাবাও বেশ গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “চিন্তা মত করো। সব ঠিক কর দুঙ্গা।”
বললেন তো বটে, কিন্তু ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ব্যাপারটা একেবারে চিত্তির হয়ে গেল। দরজায় পা দেওয়ামাত্রই ভূষণবাবু হঠাৎ এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবাজির ওপর। জড়িয়ে ধরে আকুল কণ্ঠে বললেন, “ওরে, ওরে আমার জগাই রে, একবার হরি বল ভাই, একবার হরি বল। হরি বিনে জীবের যে আর গতি নাই রে।”
কুক্কুটানন্দ হয়তো হরি বলেও দিতেন, কিন্তু তার আগেই তাঁকে ঘাড় ধরে বিছানায় আছড়ে ফেললেন ভূষণবাবু। বাবার বুকের ওপর পা তুলে রণহুঙ্কার ছেড়ে বললেন, “বলবি না? বলবি না তো? আমি আজ সুদর্শনে শিরচ্ছেদ করব তোর।”
বাবার এমন অবস্থা দেখে তাঁর চ্যালাদ্বয় থেকে শুরু করে রমেশ ডাক্তার অবধি সবাই থ। তবে বাবা কিন্তু মোটেই ঘাবড়ালেন না। সেই অবস্থাতেই হাতজোড় করে বললেন, “প্রভু, আপকো হম পহচান গয়ে। আপ স্বয়ম নারায়ণ হ্যায়, জয় শ্রীহরি। শান্ত হোন ভগবন। হামি খোদ আপনার পূজা করবে। ওম বন্দে বিষ্ণুম ভবভয়হরম সর্বলোকৈকনাথম…”
কী আশ্চর্য! বাবার মন্ত্রপাঠে যেন একেবারে ওষুধের মতো কাজ হল। ক্ষিপ্ত মূর্তি সংবরণ করলেন ভূষণবাবু। আর তাই দেখে ব্যাপক উৎসাহে পেছন থেকে দুই চ্যালা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, “জ্যায় স্বামী কুক্কুটানন্দ মহারাজজি কি জ্যায়! জ্যায় শ্রীহরি বিষ্ণুজি কি জ্যায়!”
রাস্তা থেকে কোন হতভাগা ফোড়ন কেটে গেল, “জ্যায় বিষ্ণুমাতা কি জ্যায়!”
করজোড়ে ভূষণবাবুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন বাবা। “আদেশ কিজিয়ে, ক্যায়সে সেবা করেঁ আপকা?”
মালাবৌদি আর রমেশ ডাক্তারের তখন সেই চরম অবস্থা যাকে বিদ্যাসাগর বলে গেছেন, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কোথা থেকে যে কী হয়ে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
ভূষণবাবু তখন এমনভাবে টলছেন যেন সমাধিস্থ। বাবা আবার বললেন, “আদেশ কিজিয়ে প্রভু।”
এবার বজ্রনাদ উঠল, “ষোড়শোপচারে পুজো চাই।”
“হোগা প্রভু, সব হোগা। জয় জগন্নাথ!”
বাবার মুখের কথাখানা ফুরোতে না ফুরোতেই একেবারে কাটা কলাগাছের মতো বিছানায় ধুপুস করে উলটে পড়লেন ভূষণ পাল। দুই চ্যালাসহ বাবা আবার জয়ধ্বনি দিয়ে উঠলেন, “জয় জয় শ্রীহরির জয়!”
তারপর ভক্তিভরে ভূষণবাবুর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বাবা ফিরে তাকালেন মালাবৌদির দিকে। “সুনো বিটিয়া, তুম ভগবান বিষ্ণু কে বহুত বড়ি ভক্ত হো।”
বাবার মুখে এই গোপনতম রহস্যের কথাখানা শুনেই বৌদির ভক্তির পারদ চড়চড় করে আরও কয়েক ডিগ্রি চড়ে গেল। “হ্যাঁ বাবা, নারায়ণের পায়ে ফুল-তুলসী না দিয়ে আমি জলটুকুও খাই না। বাবা, আপনি অন্তর্যামী।”
“হম সব জানি।” দাড়িতে হাত বোলালেন বাবাজি। “তাই ভগবান বিষ্ণু খোদ তুমহারে পতিকে শরীর মে পধারে হ্যায়। প্রভু সেবা চাহতে হ্যায়। মূর্তি মে নহি, প্রত্যক্‌ষ মানব শরীর মে।”
“আমায় কী করতে হবে, বাবা?”
“খাওয়াতে হবে। ষোড়শোপচার মতলব সোলা আইটেমওয়ালা থালি দিতে হবে ইনকো। প্রভু যা চাইবেন তাই খাওয়াতে হবে। ইয়াদ রাখিস বিটিয়া, তেরে পতি মে স্বয়ম ভগবান বিষ্ণু কা অন্‌শ হ্যায়। এঁকে যা খাওয়াবি, খোদ নারায়ণ খাবেন।”
“দেব বাবা। নিশ্চয়ই দেব। রোজ ষোড়শোপচারে ভোগ দেব।” বৌদির গলায় ভক্তির রসধারা আরও রসায়িত হয়ে উঠছিল। “কিন্তু আমার স্বামী ঠিক হয়ে যাবে তো?”
“পূজা মিলনে সে তো খোদ মহাকালী ভি শান্ত হো যাতি হ্যায়, ইয়ে তো ফিরভি বিষ্ণুজি হ্যায়। বহুত জেন্টেলম্যান দেওতা হ্যায়। পর এক বাত…” ভীষণ বেগে একবার মাথা ঝাঁকালেন বাবা কুক্কুটানন্দ।
“কী কথা, বাবা?” গলাটা আবার যেন ভয়ে করুণ হয়ে এল বৌদির।
“হফতে মে দো দিন রাজসিক ভোজন, মতলব মাস-মচ্ছি কা ভোগ লগানা পঢ়েগা। বুধবার অওর রবিবার। ইয়ে নরসিংহ ভগবান কা দিন হোতা হ্যায়। বিষ্ণু কা বহুত খতরনাক রূপ হ্যায়। অগর জাগ গয়ে তো…”
“না না বাবা, আমি দেব। পুজোয় কোনও ত্রুটি হবে না। আজ থেকে উনিই আমার জ্যান্ত দেবতা। জয় শ্রীবিষ্ণু, জয় শ্রীবিষ্ণু।”
বাবাজি গম্ভীর ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন, “মঙ্গল হোক।”

(২)

সেদিনের সেই দেবত্ব প্রাপ্তির পর থেকে ভূষণবাবুকে আজকাল আর তেমন একটা দেখাই যায় না। মাঝে মাঝে শুধু বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এই পাপদীর্ণ পৃথিবীকে দেখেন আর অবসর সময়ে জীবের দুঃখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। চোখে মুখে সবসময় কেমন একটা গভীর স্বর্গীয় প্রশান্তির ছাপ, যেন সর্বদাই বৈকুণ্ঠের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই ক’দিনেই মালাবৌদির ষোড়শোপচার ভক্তিতে তাঁর গতরেও যে বেশ একটা ঐশ্বরিক প্রসারণ ঘটেছে, সেটাও চোখে পড়বার মতো।
তা কে জানে আজ কী মনে করে হঠাৎ এসে বসেছিলেন ঘন্টুদার চায়ের দোকানে। চায়ের কাপে সশব্দ চুমুক দিতে দিতে মাঝে মাঝে আলতো করে চোখ বোলাচ্ছিলেন আজকের কাগজটায়। তা এই সুযোগে ঘন্টুদা একবার হালকা গলায় বলল, “আমার কিন্তু কিছু বকেয়া আছে, ভূষণদা।”
মুহূর্তে ভূষণবাবুর চোখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত চাউনি ভেসে উঠল, যেন কেউ অনেক উঁচু থেকে এই লোভ-পঙ্কিল পৃথিবীকে দেখছে আর আয়েশ করে পান চিবোতে চিবোতে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলছে, সবই মায়া! অনেকটা সেই ভঙ্গিতেই ঘন্টুদার দিকে তাকিয়ে ভূষণবাবু বললেন, “ওরে অবোধ, টাকা মাটি, মাটি টাকা। প্রভুর কৃপা হলে সব পাবি রে ঘন্টু, সব পাবি।”
“তা এই অধমের ওপরও একটু কৃপা করুন, প্রভু।” পিঠের ওপর হঠাৎ একটা খসখসে হাতের ছোঁয়ায় চমকে উঠলেন ভূষণবাবু। পেছনে কখন যে রমেশ ডাক্তার এসে দাঁড়িয়েছেন টেরই পাননি।
“আরে রমেশ যে! আয় বোস। ঘন্টু, আরেক কাপ…”
“কাপ-টাপ পরে হবে, আগে আমাকে উদ্ধার করুন প্রভু। আপনার শরীরে তো স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু তাঁবু গেড়েছেন। সবই এখন আপনার ইচ্ছাধীন।” রমেশ ডাক্তারের কথায় আড়চোখে একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ভূষণবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “বলো বৎস, কী চাও।”
“কী আর বলব!” ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রমেশবাবু। মুখ দেখে মনে হল যেন ভগবান বুদ্ধ কথিত সেই শাশ্বত সত্য, জগৎ দুঃখময়, তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেছেন। তাঁর গলা ঠেলে যেন একটা নিদারুণ হাহাকার বেরিয়ে এল, “ভাই রে, জীবনে এখন শুধুই গ্রিন-টি আর বৌয়ের আরাধ্য বজরংবলীর প্রসাদী কলা দিয়ে মাখা ওটসーনাই চিকেন, নাই গোটস! এই রসহীন, মুরগিহীন, কচি পাঁঠাহীন জীবন থেকে উদ্ধার করে আমারও একটু ষোড়শোপচারের ব্যবস্থা করুন প্রভু।”
একচিলতে সরু হাসির রেখা যেন চকিত সৌদামিনীর মতো ভূষণবাবুর জ্যোতির্ময় মুখমণ্ডলে ঝিলিক দিয়ে উঠল। “এ তো অতি সামান্য ব্যাপার! ভূষণের দেহে শ্রীবিষ্ণু অবতীর্ণ হতে পারলে রমেশের দেহে সাক্ষাৎ হনুমানের আবির্ভাব ঘটতে আপত্তি কোথায়! পরশু সকালেই বাড়িতে একেবারে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিবি। তারপর বাকিটা আমি এসে... ঘন্টু, তুই তাহলে…”
মুখের কথাটা শেষ হবার আগেই ঘন্টুদা একেবারে লাফিয়ে এসে পড়ল রমেশবাবু আর ভূষণবাবুর সামনে। “আদেশ কিজিয়ে প্রভু। স্বামী কুক্কুটানন্দ বজরংবলীকে সেবা মে হাজির হ্যায়। বস ইসবার পুরনো বকেয়াসহ পুরা দক্ষিণা অ্যাডভান্স মে চাহিয়ে।”
আর তখনই কোথা থেকে কে একটা যেন খিটকেল গলায় চিৎকার করে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”

_____

অলঙ্করণঃ জয়ন্ত বিশ্বাস

3 comments:

  1. বাহ বাহ ফাটাফাটি! বিভাবসু মহারাজ কি ...জয়! লেখার সময়ে তোমার মধ্যেও বিষ্ণুর আবির্ভাব হয়েছিল :-)

    ReplyDelete
  2. দাদা দারুন লিখলে, তবে বুদ্ধিটা তুমি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে না কি 😃😃

    ReplyDelete
  3. বাঃ, দারুণ প্লট, খুব ভালো।

    ReplyDelete