লোককথাঃ দুঃখী রাজকন্যাঃ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আফ্রিকান উপকথা-১

দুঃখী রাজকন্যা

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


কমবেশি তিন লক্ষ বছর আগে বিবর্তনের হাত ধরে, বর্তমান মনুষ্য প্রজাতি, অর্থাৎ হোমোস্যাপিয়েন্সদের উদ্ভব হয়। গুহাবাসী মানুষ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে থাকে। খাদ্য আর বাসস্থানের খোঁজে এরপর তারা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে সব জায়গার মানুষের সমান উন্নতি হয় না। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে, কোথাও প্রাকৃতিক সম্পদ, উপযুক্ত জলবায়ু এবং আরও বিভিন্ন কারণে এক জায়গায় মানুষের উন্নতি ও বিকাশ দ্রুতবেগে ঘটতে থাকে, আবার আফ্রিকার মতো দুর্গম প্রাকৃতিক পরিবেশে বিবর্তনের চাকা ঢিমেতালে ঘুরতে থাকে। 
হাজার হাজার বছর আগে মানুষে পড়তে ও লিখতে জানত না। কিন্তু মনের মণিকোঠায় জমা হত গল্প-কাহিনি। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মুখে মুখে বয়ে চলত সেই সব কাহিনি। সব কাহিনির ভিত্তি যে সঠিক ছিল না তা কিন্তু নয়। কোথাও কোথাও কাহিনির ব্যবহার হত লোকশিক্ষার জন্য। উপকথা বা লোককথায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় হাজার হাজার বছর আগে মানব সমাজের ইতিহাস আর সংগ্রামের।
সভ্য মানুষ ইউরোপ থেকে হানা দিল আফ্রিকার জঙ্গলে। উদ্দেশ্যーপ্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ। কখনও কখনও নেহাত রোমাঞ্চকর অভিযানের পিপাসা থেকেও মানুষ অজানাকে চেনা ও জানার জন্য পাড়ি জমাল। তারা আফ্রিকার অধিবাসীদের ভাষা শিখল। কলম খুলে আধুনিক মানুষ লিখে ফেলল অজানা অচেনা প্রাচীন সভ্যতার বাহকーআফ্রিকান উপকথা
ধারাবাহিকভাবে আফ্রিকার এমনই কিছু চমকপ্রদ গল্প তুলে ধরা হবে একপর্ণিকার পাতায়।

আন্নালিজা ছিল ওয়াগানার রাজকন্যা। অপূর্ব সুন্দরী আন্নালিজার রূপের কথা যেন বাতাসের ভেলায় চড়ে আশেপাশের সব রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজকন্যা আন্নালিজাকে বিয়ে করার জন্য অন্য রাজ্যের রাজপুত্রদের কাছ থেকে ওয়াগানার রাজার কাছে প্রস্তাব আসতে লাগল। রাজকন্যা যার কথা শোনে, তার উপরেই বিদ্রূপের বাণ ছুড়ে দিয়ে বলে, “এ আমার যোগ্য পাত্র নয় বাপু। আমার বর হবে সারা পৃথিবীর অধীশ্বর।”
ওয়াগানার রাজার মনে খুব কষ্ট। একমাত্র মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে, তাকে সুযোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দিলে তিনি নিশ্চিন্ত হন। তার রাজ্যও এমন কিছু বড়ো নয়। কয়েকটা ছোটো ছোটো গ্রাম আর একটা শহর নিয়ে রাজপাট। রাজারাজড়ার জীবনে অনিশ্চয়তা চরম। মাঝেমধ্যেই খাদ্যাভাব দেখা দেয়। পাশের রাজ্য থেকে দস্যুর দল এসে হানা দেয় রাজার রাজ্যে। তখন বাধে ভয়ানক যুদ্ধ। বলা তো যায় না, তেমন একটা যুদ্ধে যদি রাজা মরেই যান, তবে রাজ্য সামলানোর জন্য একটা যোগ্য রাজা তো চাই! আন্নালিজার বরকে হতে হবে রাজার ছেলে। তার হাতেই দিতে হবে রাজ্যের ভার। এইসব ভাবনাচিন্তায় রাজার কপালে পড়ল ভাঁজ, চুল গেল পেকে। কিন্তু রাজকন্যার আর কোনও পাত্রই পছন্দ হয় না।
সে বছর পাশের রাজ্যে ফসল ফলল না। সেই রাজ্যের রাজা দাবি করে বসল, ওয়াগানার একটা গ্রাম নাকি তারই রাজ্যে পড়ে, কিন্তু আন্নালিজার বাবা অন্যায়ভাবে সেটা দখল করেছেন। ওয়াগানার রাজার কাছে দূত এল সেই রাজ্য থেকে। সে রাজার ফরমান শোনাল, “নিয়ানি গ্রাম আসলে আমার দখলে। এই গ্রাম অন্যায্যভাবে নিজেদের দখলে রেখে ওয়াগানার রাজা ভারি অনর্থ ঘটিয়েছেন। অবিলম্বে নিয়ানি গ্রাম আমাকে ছেড়ে না দিলে, রাজা যেন আমার সাথে লড়াই করেন সামনাসামনি। রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে ফয়সালা হোক। অযথা সৈনিকের রক্ত ঝড়িয়ে লাভ নেই।”
ফরমান শুনে ওয়াগানার রাজা মুচকি হাসলেন। তিনি জানেন, এই বছর তাঁর রাজ্যের নিয়ানি গ্রামে ফসল ফলেছে দারুণ। এদিকে শত্রু রাজার রাজ্যে খাদ্যাভাব ঘটায় তাঁর পক্ষে রাজ্য চালানো ভারি মুশকিল হয়ে পড়েছে। নিয়ানির পর্যাপ্ত ফসল হয়েছে শত্রু রাজার ঈর্ষার কারণ। একবার যদি নিয়ানি গ্রাম দখলে আসে, তবেই হবে তাঁর রাজ্যের খাদ্যাভাবের সমাধান। তাই তিনি লড়াইতে নেমেছেন। তবে ওয়াগানার রাজা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। হিংসুটে রাজাকে নিয়ানি গ্রাম ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না।
ওয়াগানার রাজা, রাজকুমারী আন্নালিজার বাবা, আটদিন একনাগাড়ে ডনবৈঠক দিয়ে, শরীরে হাতির বল সঞ্চয় করে শত্রু রাজাকে লড়াইয়ের মাঠে ডাক দিলেন। লড়াইয়ের দিন দুই দেশ থেকে দলে দলে প্রজা এসে ভিড় করল রাজায় রাজায় যুদ্ধ দেখবে বলে। কেউ কারও চাইতে কম যান না। অস্ত্রবিহীন ছিল সেই যুদ্ধ। খালি হাতে মুষ্টিযুদ্ধ চলল আট ঘণ্টা ধরে। শেষে হার মানলেন শত্রু রাজা। ওয়াগানার রাজা বিজয়ী হলেন। কিন্তু ওয়াগানাবাসীদের বিজয়োৎসব দীর্ঘস্থায়ী হল না। বেশি রাতের দিকে রক্তবমি হয়ে মারা গেলেন ওয়াগানা রাজ। হয়তো তার বুকে শত্রু রাজার ঘুসি একটু জোরেই লেগে থাকবে। রাজবৈদ্য এসেও কিছু করতে পারলেন না। ভোররাতে মারা গেলেন রাজা।
রাজা মারা যেতে সুযোগ বুঝে নিয়ানি গ্রাম দখল করে নিলেন শত্রু রাজা। এদিকে ওয়াগানার রাজা মারা যেতে তাঁর উত্তরসূরি হল রাজকন্যা আন্নালিজা। শোক-টোক কাটিয়ে রাজকন্যা রাজেন্দ্রাণী হয়ে বসল রাজদরবারে। এবার তার বিয়ের জন্য আরও বেশি করে নানা রাজ্য থেকে প্রস্তাব আসতে লাগল। রাজকন্যা ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করে দিল, ‘যে পুরুষ নিয়ানি গ্রাম সহ আশিটা গ্রামকে নিজের দখলে আনতে পারবে, সে রাজা হোক বা প্রজা—তার গলাতেই মালা পরিয়ে দেবে আন্নালিজা।’
রাজ্যে রাজ্যে বার্তা পৌঁছল, কিন্তু একজন রাজপুত্রও আন্নালিজার শর্ত মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহস পেল না। আশিটা গ্রাম দখল করার মানে হল প্রবল রক্তক্ষরণ। বিনা যুদ্ধে কেই বা আশিটা গ্রাম দান করবে? তাই রাজকন্যার কোনও পাত্র জুটল না, সে অনূঢ়াই থেকে গেল। তবে প্রতিবছর তার সৌন্দর্য আরও বাড়তে লাগল। কিন্তু বাবাকে হারানোর শোকে রাজকন্যা আন্নালিজার মুখ থেকে হাসি চলে গেল। রাজকন্যাকে গোমড়া দেখে ওয়াগানার মন্ত্রী-সান্ত্রী, সভাসদ-পারিষদ, সভাকবির দল সবাই হাসি হারিয়ে ফেলল। রাজ্য জুড়ে কেউ আর হাসে না। রাজদরবারের গায়কেরা গান গাওয়া ভুলে গেল। চাকরি হারিয়ে তারা সবাই ক্ষেতখামার আর পশুপালন করতে লাগল। এমনকি ওয়াগানার গাছে গাছে পাখিদের গানও আর শোনা গেল না।
দূর রাজ্য ফারাকায় ছিল এক রাজকুমার, তার নাম শাম্বা। সেই রাজ্যের নিয়ম ছিল, রাজকুমার প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তাকে একা একা রাজ্য জয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। রাজ্যের মানুষের ভরণপোষণের জন্য খাদ্য জোটাতে হবে। শাম্বা ছোটোবেলা থেকেই খুব সাহসী ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল অনেক কসরত করে। একদিন শাম্বা বাবা-মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল দূর দেশের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে গেল দুইজন চাকর, আর তার শিক্ষক ফারাকার সভা গায়ক, তারারাফে।
একটা ছোট্ট রাজ্যে এসে সেই রাজ্যের রাজকুমারকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করল শাম্বা। ভীষণ সেই যুদ্ধ দেখতে ভিড় করল রাজ্যের যত মানুষ। শাম্বা যুদ্ধে জয়ী হল। পরাজিত রাজকুমার শাম্বার অধীনতা স্বীকার করে নিয়ে বলল, “এই রাজ্য তোমার। এখন তুমিই এই রাজ্যের অধীশ্বর।”
শাম্বা হাসতে হাসতে পরাজিত রাজকুমারকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমাকে তোমার হাসিটুকু দাও। রাজ্য দিয়ে আমি কী করব? সব দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আমি জন্ম নিয়েছি। সব জমি, সম্পদ, তোমারই থাক। আমরা আজ থেকে বন্ধু হলাম।”
এরপর শাম্বা একের পর এক রাজ্য জয় করতে লাগল, আর প্রতিবারই পরাজিতকে রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “তোমার হাসিটুকু আমার, বাকি সব তুমি রেখে দাও। কী হবে রাজ্যে, কী আছে সম্পদে?”
এমনি করে দিন কাটে। আট মাস পর শাম্বা ও তার দল নাইজের নদীর ধারে এসে পৌঁছল। নদীর পাড়ে গাছের ছায়ায় শরীর এলিয়ে দিল শাম্বা। তারারাফে তাকে গান শোনাল। সেই গানে ছিল রাজকন্যা আন্নালিজার কথা, তার সৌন্দর্যের বিবরণ, তার হাসিবিহীন দুঃখের জীবনের বেদনাগাথা। আন্নালিজার জন্য মনখারাপ হয়ে গেল শাম্বার, বুক তার মুচড়ে উঠল ব্যথায়। শিক্ষক তারারফেকে সে অনুরোধ করল, “চলুন, বরং আন্নালিজার রাজ্য ওয়াগানায় যাওয়া যাক। তার মুখে হাসি ফোটানোই আমার কর্তব্য।”
এই বলে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল শাম্বা। তার পিছন পিছন ভৃত্যরা আর তারারাফে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে চলল ওয়াগানা রাজ্যের দিকে। অনেক অনেক ক্রোশ পথ পেরোল তারা। মরুভূমি পেরিয়ে, সাপের মতো প্যাঁচানো নাইজের নদীকে কখনও ডাইনে, কখনও বা বাঁয়ে রেখে ঘোড়া ছুটতে থাকল। অবশেষে আশি দিন পর তারা এসে পৌঁছল ওয়াগানায়।
রাজকন্যা আন্নালিজার রূপ দেখে শাম্বা মোহিত হয়ে গেল। সে স্থির করল আন্নালিজাকেই বিয়ে করবে। কিন্তু সবার আগে তার মুখে হাসি ফোটাতে হবে। রাজকন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতেই সে গোমড়া মুখে হুকুম জারি করল, “আগে আমার জন্য আশিটা গ্রাম অধিকার করে নিয়ে এস, তবেই বিয়ের কথা পাড়বে, নইলে পথ দেখো বাপু।”
শাম্বা বীরের মতো বুক চিতিয়ে গর্ব ভরে বলল, “আমাকে আশিটা গ্রাম দেখিয়ে দাও, যেগুলো তোমার পছন্দের। তারপর দেখো এক এক করে সব তোমার পায়ের তলায় না এনে দিয়েছি তো আমার নাম শাম্বা নয়।”
আশিটা গ্রামের হদিস জেনে নিয়ে শাম্বা তার শিক্ষক তারারাফেকে বলল, “আপনি এখানেই থেকে যান। রোজ আপনি রাজকুমারীকে গল্প শোনান, গানে গানে মাতিয়ে রাখুন। আমি চললাম দেশ বিজয়ে। ফিরে এসে রাজকন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেব।”
রাজকুমার শাম্বার ঘোড়া রুক্ষ ধুলো উড়িয়ে দিগন্তরেখায় অদৃশ্য হয়ে গেল। তারারাফে রাজকন্যাকে গান শোনাতে বসে গেল। সভাসদ-পারিষদ, রাজ্যের প্রজা সেই গান শুনে মাতোয়ারা হল। কিন্তু কারও মুখে হাসি ফুটল না, কারণ রাজকুমারী আন্নালিজার মুখ তখনও কালো আঁধারে ছেয়ে, হাসির বিন্দুমাত্র সেখানে নজরে এল না।
রাজকুমার শাম্বা এরপর এক নতুন রাজ্যে গিয়ে সেই রাজ্যের রাজপুত্রকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করল। আবার পরাক্রমী শাম্বা বিজয়ী হল। পরাজিত রাজপুত্র শাম্বাকে নিজের রাজ্য দিয়ে দিলে শাম্বা মিষ্টি হাসি দিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “কী হবে তোমার রাজ্যে? শুধু তোমার মুখের হাসিটুকু বাঁচিয়ে রেখ বন্ধু। তবে রাজকন্যা আন্নালিজাকে সংবাদ পাঠাও যে এই রাজ্য আমার দখলে।”
পরাজিত রাজকুমার রাজ্য ফিরে পাওয়ার আনন্দে, শাম্বার বন্ধুত্ব অটুট রাখতে, সঙ্গে সঙ্গে দূত পাঠিয়ে দেয় আন্নালিজার কাছে।
একের পর এক রাজ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে রাজকুমার শাম্ব পরাজিত রাজপুত্রদের বন্ধুত্বের বন্ধনে বেঁধে, তার মুখে হাসি ফুটিয়ে আবার চলে নতুন রাজ্যে। প্রতিটি বিজিত রাজ্য থেকে রাজকুমারী আন্নালিজার কাছে শাম্বার বিজয়ের খবর পৌঁছে যায়। আন্নালিজার মুখে তবুও হাসি ফোটে না। তারারাফে রাজকুমারীকে গান শোনায়। সেই গানে সে গল্প বলে ফারাকা গ্রামের মানুষের কথা, সেখানকার সমৃদ্ধির কথা, শাম্বার ছেলেবেলার দুষ্টুমির কথা। তবুও হাসির লেশমাত্র দেখা যায় না রাজকুমারীর ঠোঁটের কোনায়। তারারাফে গানের গল্পে আন্নালিজাকে শোনায় ইসসা বীরের ভয়ানক সেই সাপের কথা, যার ইচ্ছেয় নাইজের নদীতে একবছর বান আসে, আর আরেক বছর আসে খরা। একবছর নদীর পাড়ে মানুষের চাষের জমিতে উপচে পড়ে সোনালি ফসল, আর পরের বছর প্রচণ্ড দাবদাহে শুকিয়ে যায় মাইলের পর মাইল জমি। খাদ্যাভাবে লোক মরে অনাহারে, মহামারী গ্রাস করে গ্রাম-কে-গ্রাম।
আশিতম গ্রামও যেদিন দখল হয়ে গেল, শাম্বা ঘোড়া ছুটিয়ে আট দিন পর ফিরে এল ওয়াগানায়। রাজকুমারী আন্নালিজার সঙ্গে তার দেখা হয়নি মাসের পর মাস। তার সঙ্গে বিচ্ছেদের দিনগুলো রোজ শাম্বার একঘেয়ে বিস্বাদ, নিরানন্দের মনে হয়েছে। রাজকুমারীর কাছে ফিরে এসে শাম্বা বলে, “আন্নালিজা, এবার তোমার শর্ত পূরণ করেছি। তোমার কথা রাখার পালা এখন। আশিটা গ্রাম আমার অধীনে। এখনও কেন তোমার মুখে দুঃখের কালো মেঘ ভিড় করে আছে?”
রাজকুমারীর মুখে হাসি ফোটে না। সে বলে, “আমার শর্ত পূরণ করেছ তুমি। এবার আমি তোমার সঙ্গে ঘর বাঁধব। কিন্তু আমার মনে আনন্দ নেই। কারণ, আমার রাজ্যে একবছর কেন ফসল ফলে, আর একবছর আসে খরা, সেকথা আমাকে শুনিয়েছে তারারাফে। হে বীরশ্রেষ্ঠ, তুমি ইসসা বীরের সাপকে মেরে আমাদের দুঃখের দিন ঘোচাও। যেদিন শুনব সেই শয়তান সাপ মারা গেছে, সেদিন আমার মুখে জ্বলে উঠবে আনন্দের আলো। যে হাসি দেখার জন্য সুদূর দেশ থেকে ছুটে এসেছ, সেই হাসির দরজা তোমার জন্য খুলে যাবে। যাও, বিজয়ী হও।”
ইসসা বীরের দিকে ছুটে চলে রাজকুমার শাম্বা। সঙ্গে চলে গায়ক তারারাফে। এবার সে কোমরে বেঁধেছে তলোয়ার আর হাতে নিয়েছে তীক্ষ্ণ বল্লম। নাইজের নদীর ভয়ানক সাপের সঙ্গে খালি হাতে লড়া যায় না, সেকথা শুনিয়েছে গায়ক তারারাফে। নদীর ধার দিয়ে ছুটতে থাকে রাজকুমার শাম্বার ঘোড়া। আট দিন আট রাত একটানা ঘোড়া ছুটিয়ে তবেই সেই বিশালাকৃতি সাপের মুখোমুখি হয় শাম্বা। তারপর শুরু হয় সাপে মানুষে ধুন্ধুমার লড়াই। লড়াইয়ে বাতাসে ঝড় ওঠে, ধুলোয় ঢেকে যায় আকাশ। নদীর জল তোলপাড় হয়, পাহাড় ভেঙে পড়ে। আট ঘণ্টা একনাগাড়ে চলে তবে সেই লড়াইয়ের অবসান হয়, যখন শাম্বার তলোয়ারের আঘাতে দুই টুকরো হয়ে যায় সাপের মাথা। শাম্বা বল্লমে গেঁথে ফেলে সাপের দেহ। ছটফট করতে করতে নাইজের নদীর দুর্ধর্ষ সেই সাপ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। শাম্বা তারারাফের হাতে সাপের রক্তে লাল হয়ে ওঠা বল্লম দিয়ে বলে, “যান, রাজকুমারী আন্নালিজাকে এই বল্লম দেখিয়ে বলুন আমি তার কথা রেখেছি। সাপের সাথে যুদ্ধে এখন আমি ক্লান্ত। যদি শুনি সাপের মৃত্যু তার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে, তবেই আমি ওয়াগানায় ফিরব। নইলে কী হবে আমি জানি না।”
রাজকুমার শাম্বার পরোয়ানা নিয়ে ছুটে যায় তারারাফে। ওয়াগানা রাজ্যে ফিরে রাজকুমারী আন্নালিজাকে শাম্বার বল্লম দেখিয়ে বলে, “ইসসা বীরের সাপ মৃত। তার রক্ত লেগে আছে এই ধারালো বল্লমে। রাজকুমার শাম্বা প্রচণ্ড সেই যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। এবার আর রাজ্যে রাজ্যে খরা হবে না, না খেয়ে মরবে না মানুষ।”
রাজকুমারীর মুখে হাসি ফোটে না। সে অবিশ্বাসের সুরে বলে, “শাম্বাকে বলো যতক্ষণ না সেই মরা সাপ আমি নিজের চোখে দেখছি, ততক্ষণ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না সে মৃত। তাই শাম্বা যদি সাপের মৃতদেহ নিয়ে ওয়াগানায় আসে, তবেই আমার মুখে ফুটবে হাসি, তার গলায় পরাব মালা।”
আন্নালিজার বার্তা বহন করে আবার ছুটে চলে তারারাফের ঘোড়া। সব শুনে মনের দুঃখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাম্বা বলে, “রাজকুমারী আন্নালিজাকে কিছুতেই আমি খুশি করতে পারব না, এই সার আমি বুঝেছি। সবার মুখে হাসি ফুটলেও তার মুখে কোনোদিন ফুটবে না হাসি। আমার গলায় উঠবে না তার মালা।” এই বলে হাতের তলোয়ার নিজের বুকে আমূল বিঁধিয়ে দিয়ে মাটিতে পড়ে যেতে যেতে শাম্বা বলে, “যান তারারাফে, রাজকুমারীকে গিয়ে বলুন, এই আমার তলোয়ার, এতে লেগে আছে ভয়ংকর সেই সাপের রক্ত। মিশে আছে আমার শরীরের রক্তও।”
রাজকুমার শাম্বা পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলে তলোয়ার নিয়ে ওয়াগানায় যায় তারারাফে। রাজকুমারী আন্নালিজার হাতে তরোয়াল তুলে দিয়ে বলে, “এই সেই তলোয়ার, যাতে লেখা আছে সাপ ও রাজকুমারের মৃত্যুর ইতিহাস। এর প্রতিটি রক্তবিন্দু বহন করছে আপনার প্রতি শাম্বার ভালোবাসা। জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত সে চেয়েছিল রাজকুমারীর মুখে হাসি ফোটাতে।”
ওয়াগানা থেকে ফিরে আসে তারারাফে। ফিরে গিয়ে সুর করে গান গেয়ে সে মানুষকে শোনায় শাম্বার বীরত্বের কাহিনি, যা আজও পৃথিবীর বুকে অমলিন। যুদ্ধ নয়, মানুষের মুখে সে ফোটাতে চেয়েছিল নির্মল হাসি।

(লক্ষণীয় বিষয় হল, গল্পে আটের হিসাবেই সব গণনা করা হয়েছে। হয়তো তখন মানুষ আট সংখ্যা দিয়েই সব হিসেব করত। তবে এটা অনুমান মাত্র।)

অলঙ্করণঃ অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

No comments:

Post a Comment