যুগ্ম পঞ্চম স্থানাধিকারি গল্পঃ বর্ণ-বিভ্রাটঃ মধুরিমা চক্রবর্তী



সকাল থেকে ছেলেটা ঘ্যান ঘ্যান করে মাথা ধরিয়ে দিল বিভূতিবাবুর। এই অবস্থায় আজ তিনি অফিস যেতে পারবেন না। চিৎকারের ঠ্যালায় ঘনঘন মাথা ঘুরছে তাঁর। অফিসে ফোন করলেন, “আমি বিভূতি বলছি। ছেলেটা খুব অসুস্থ। আজ আমি অফিস যেতে পারব না, ডাক্তারবাবু। ছেলেকে স্যারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তাই যদি আজ ছুটি দেন…”
ও-প্রান্ত বলে উঠল, “কী, বলছেন কী আপনি! হাঃ হাঃ! আমি ডাক্তার! আমিই আপনার স্যার। তবে ছুটির সঙ্গে ডাক্তারের হদিসও দিতে পারি। শিশু-চিকিৎসক।”
“দয়া করে বলুন, স্যার। কুটুরকে আজই দেখিয়ে নিতে চাই।” বিভূতিবাবু ব্যগ্র হলেন।
“বেশ তো, যান না। ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। আমাদের কলকাতারই গাছতলায় ওঁর চেম্বার। নাম নক্ষত্র মণ্ডল।”
“সে কি, গাছতলা! কিন্তু কলকাতায় কি একটা গাছ, স্যার? জানব কী করে কোন গাছের তলায় উনি বসেন? প্রতিটা গাছের তলা খুঁজে দেখতে যত সময় লাগবে তাতে আমার ছেলে আর শিশু থাকবে না। শেষপর্যন্ত খুঁজে পেলেও তখন আর ওঁকে দরকার লাগবে না। আমার কুটুর তখন বড়ো হয়ে যাবে।”
স্যার খানিক রেগেই বললেন, “আরে ধুর মশাই, কলকাতায় থাকেন আর গাছতলা বলে একটা জায়গা আছে জানেন না? বৈষ্ণবঘাটা যাওয়ার পথে।”
বিভূতিবাবুর এবারে মনে পড়ল গাছতলা বলে একটা জায়গা আছে বটে। তিনি বললেন, “হ্যাঁ স্যার, এবার মনে পড়েছে।”
“তাহলে আজকেই ছেলেকে দেখিয়ে আনুন। আমি বহুদিন আগে ওই পথ দিয়ে একবার যাচ্ছিলাম। তখন চোখে পড়েছিল নেম-প্লেট লাগানো রয়েছে ‘নক্ষত্র মণ্ডল, শিশু চিকিৎসক’। সন্ধের অন্ধকারেও দেখে রেখেছিলাম ভাগ্যিস। তাই আজ আপনার কাজে এসে গেল। সৌভাগ্য বলতে হয়।”
বিভূতিবাবু জানালেন, তিনি আজই ছেলেকে নিয়ে নক্ষত্র মণ্ডলের উদ্দেশে পাড়ি দেবেন।
তত্ত্বতালাশ করে বিভূতিবাবু নক্ষত্র মণ্ডলের ফোন নম্বর জোগাড় করলেন। লাগালেন ফোন। রিং হচ্ছে। একটু পরেই উত্তর এল। “হ্যালো।”
“বলছিলাম, এটা কি…”
“হ্যালো... হ্যালো... কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না।”
“হ্যালো-ও-ও...বলছিলাম এটা কি…”
“হ্যালো… হ্যালো…”
“এত হ্যালো-হ্যালো করবেন না। সকাল থেকে ছেলের চিৎকারে হেলেই আছি।”
“হ্যাঁ, এবার শোনা যাচ্ছে। বলুন।”
“আপনি কি ডাক্তার নক্ষত্র মণ্ডল?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল, “উঁহু। ডাক্তারবাবু রোগী দেখছেন। আমি তারা মণ্ডল।”
নাম শুনে বিভূতিবাবু কেমন ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, “তারা আর নক্ষত্র একই তো! ছোটোবেলায় ভূগোলে পড়েছিলাম।”
তারা মণ্ডল বললেন, “আমি নক্ষত্র মণ্ডলের কম্পাউন্ডার তারাচরণ মণ্ডল, ওরফে তারা মণ্ডল।”
“আপনারা দু’জনেই মণ্ডল?” জানতে চান বিভূতিবাবু।
তারা মণ্ডল বললেন, “আমি ওঁর আত্মীয়।”
বিভূতিবাবু অবাক হয়ে বললেন, “আপনি একই সঙ্গে আত্মীয় আবার কম্পাউন্ডার!”
তারা মণ্ডল বেশ গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করলেন, “আমি ওঁর আত্মীয়-কাম-কম্পাউন্ডার-কাম-কেয়ারটেকার-কাম-রাঁধুনি-কাম…”
বিভূতিবাবু তাড়াতাড়ি কথার মাঝেখানেই বললেন, “বুঝেছি, বুঝেছি। আর বলতে হবে না। আপনি ওঁর সব কামেই আছেন।”
“ওঁর সৌরজগত, ছায়াপথ সব আমি।”
এবারের কথাতেও বোঝা গেল তারা মণ্ডল খুবই গর্বিত। হঠাৎই তিনি একটু খাপ্পা হয়ে বললেন, “আপনি কী বলতে ফোন করেছেন বলুন তো?”
“আমার কুটুরের শরীরটা সকাল থেকে ভালো নেই। তাই ডাক্তারবাবুর কাছে একবার নিয়ে যেতাম।”
“নাম বলুন।”
“আজ্ঞে?”
“যাকে দেখাবেন তার নাম বলুন। তালিকাভুক্ত করতে হবে তো।”
“ভালো নাম? মৃগাঙ্ক।”
“বাহ্! অভিনব নাম।”
“ধন্যবাদ।”
তারা মণ্ডল কুট করে ফোন কেটে দিলেন। বিভূতিবাবু ভাবতে লাগলেন, মৃগাঙ্ক নাম তো ঘরে ঘরে শোনা যায়। কী আর নতুনত্ব আছে তাতে!
অ্যাপয়েন্টমেন্ট হল আজই সন্ধেবেলা। ছ’টা নাগাদ। কুটুরকে কোলে নিয়ে খানিক সময় হাতে নিয়ে বেরোলেন তিনি। বাস ধরলেন। বাস-কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করতেই নক্ষত্র মণ্ডলের বাড়ির স্টপেজে নামিয়ে দিল। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ওই বাড়ি। বিভূতিবাবু কুটুরকে কোলে নিয়ে বাস থেকে নামলেন। যথার্থ গাছতলা। রাস্তার পাশে বড়ো বড়ো গাছ। নিচে ঝোপ হয়ে আছে। বিশাল একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে বিভূতিবাবু পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন নক্ষত্র মণ্ডলের বাড়ি। শুধু দূরবীনটাই নেই, এই যা। হুঁ, এই বাড়িটাই। লোকেদের ঢুকতে-বেরোতে দেখা যাচ্ছে। ওরা যে রোগী বা রোগীর বাড়ির লোক সে বিষয়ে বিভূতিবাবু নিশ্চিত। আদরে-গোবরে থাকা সবে ধন নীলমণি তো। তাই বাচ্চা একবার হাঁচলে, একদিন কম খেলে, দুষ্টুমি না করলে অথবা বকুনি খেয়ে না কাঁদলে পিতামাতার দল ডাক্তারের শরণ নেন।
রাস্তা পেরিয়ে বিভূতিবাবু বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন। সামনের ঘরটাই চেম্বার। আকারে বেশ বড়ো। দরজায় লেখা ঝুলছে ‘জুতা খুলিয়া প্রবেশ করিবেন’। বিভূতিবাবু বাইরে জুতো খুললেন। জোড়ায় জোড়ায় জুতো ছাড়া রয়েছে। তিনি ছাড়া আরও অনেক রোগী বসে আছে। এত পসার যখন, ডাক্তার বেশ ভালো বলেই মনে হচ্ছে। পার্টিশনের আড়ালে ডাক্তার নক্ষত্র মণ্ডল তখনও দর্শন দেননি। তবুও এটাও নিশ্চিতভাবে জানা যে তিনি ওখানেই আছেন। ঠিক যেন মেঘের আড়ালে নক্ষত্র। আরও ভালো করে বলতে গেলে মেঘে ঢাকা তারা। এই রে! তারা তো আবার তাঁর কম্পাউন্ডার! ধুত্তোর বলে বিভূতিবাবু ভাবনা ত্যাগ করলেন। রোগীদের একেকজন সঙ্গে করে কুকুর, বিড়াল, খরগোশ নিয়ে এসেছে। বড়োলোকের আদিখ্যেতা যত! বিভূতিবাবু তত বড়োলোক নন। কিন্তু আজ তিনি নিজেকে ওদের থেকে বেশি বড়োলোক মনে করলেন। ওদের কোলে পশু আর তাঁর কোলে মানুষ। সকাল থেকে চিৎকার করে কুটুরও ক্লান্ত, চিৎকার শুনে তিনিও ক্লান্ত। মাঝে মাঝে তারা মণ্ডল এসে নাম ডাকছেন। তাছাড়া সবাই চুপ। দেওয়ালে পোস্টার লাগানো ‘সাইলেন্স প্লিজ’। তাই সবই কেমন নিঝুম নিঝুম।
বসে থাকতে থাকতে বিভূতিবাবুর ঢুল এসে গেল। কুটুরও কোলে ঘুমিয়ে কাদা। তারা মণ্ডল এসে যখন বিরাট হাঁক পাড়লেন তখন বিভূতিবাবুর নিদ্রা একেবারে ছুটে গেল। দেখেন, তিনি একাই বসে আছেন। আর কোনও রোগী নেই। তারা মণ্ডল বললেন, “তাড়াতাড়ি চলুন। চেম্বার বন্ধ করব তো, নাকি!”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ,” করে বিভূতিবাবু কুটুরকে নিয়ে ভেতরে গেলেন। এই ঘরটিও আকারে বড়োই। গিয়ে দেখেন সমস্ত দেওয়াল জুড়ে অনেক পশুর ছবি। দেওয়ালের ধারে ধারে খাঁচায় পাখি রয়েছে নানা জাতের। একটা খাঁচায় খরগোশ। একটা অ্যালসেশিয়ানের বাচ্চা গলায় বকলস পরে বসে আছে। এমনকি বাঁদরও রয়েছে একটা। ঘরটায় বদখত গন্ধ। বিভূতিবাবুর সন্দেহ হল তিনি ডাক্তারখানায় এসেছেন, না চিড়িয়াখানায়। চকিতে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলেন। তারপর হাঁফ ছাড়লেন। নাহ্, বাঘ-সিংহ চোখে পড়ল না। অর্থাৎ, প্রাণ হারানোর ভয় নেই।
যাই হোক, ডাক্তারবাবু বললেন, “হয়েছে কী?”
বাব্বা! গলা তো নয় যেন সিংহের গর্জন। পশুশালায় সিংহরাজা রাজত্ব করছেন। এত পশুর সমাহারে বিভূতিবাবুও এক লহমায় বিড়াল হয়ে গেলেন। মিউ মিউ করে বললেন, “সকাল থেকে বড্ড কাঁদছে। কী যে হয়েছে বলতে তো আর পারছে না। তাই আপনার কাছে নিয়ে এলাম, ডাক্তারবাবু।”
“হুম, কোথায় সে? দেখি তাকে।”
“এই যে।” বলে বিভূতিবাবু কোলে ঘুমন্ত তিন বছরের কুটুরকে দেখালেন।
নক্ষত্র মণ্ডল সাংঘাতিক অবাক হয়ে বললেন, “এই আপনার কুকুর!”
“আজ্ঞে?”
“আপনার কুকুর কই? অসুস্থ কুকুর?”
“কুকুর হবে কেন? অসুস্থ আমার ছেলে। কুটুর। ভালো নাম মৃগাঙ্ক।”
নক্ষত্র মণ্ডল থেকে যেন উল্কাপাত হল। “তবে এখানে এনেছেন কেন? এই দেখুন কী লেখা আছে।”
বিভূতিবাবু নক্ষত্রের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে দেখলেন ওটা রোগীদের নামের তালিকা। তেতাল্লিশ নম্বরে লেখা আছে, ‘মৃগাঙ্ক (কুকুর)’। বিভূতিবাবুর বুঝতে বাকি রইল না তারা মণ্ডল কুটুরকেই কুকুর শুনেছেন। কুকুরের নাম মৃগাঙ্ক শুনে তিনি নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। রোগীর থেকে কিছুই লাভ হল না দেখে নক্ষত্রের আলো নিভে গেল। তিনি টর্চ নিয়ে বাইরে এসে নেম-প্লেটের ওপর আলো ফেললেন। “দেখুন।”
বিভূতিবাবু দেখলেন, পরিষ্কার বাংলায় লেখা আছে, ‘নক্ষত্র মণ্ডল, পশু-চিকিৎসক’। ব্র্যাকেটে ছোটো করে ইংরেজিতে লেখা ভেটরেনারি।
“আপনি শিশু-চি…”
নক্ষত্র কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, “বললাম না? পশু।”
বিভূতিবাবু চিন্তা করলেন, স্যার কি এতখানি ভুল দেখবেন! “আচ্ছা, কখনও কি আপনি শিশু ছিলেন না? মানে কয়েক বছর আগেও?”
“না। জন্মলগ্ন থেকেই পশু।”
“জন্মলগ্ন!”
“এতে অবাক হওয়ার কী আছে? আমার ডাক্তারির জন্মলগ্ন থেকে। খুলে না বললে কি কিছুই বোঝেন না নাকি? কতক্ষণ ধরে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছি। তাতেও তো যাওয়ার নামটি নেই।”
বিভূতিবাবু কোনওমতে সেখান থেকে কেটে পড়লেন। বুঝলেন পশুপাখি সমাহারের কারণ। এক্কেবারে সমাহার দ্বিগু সমাস। সেদিন আর কুটুরের ডাক্তার দেখানো হল না। বাড়িতে এসেই তিনি অফিসের বসকে ফোন করলেন। “স্যার, আপনি যাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন সেই নক্ষত্র মণ্ডল শিশু-চিকিৎসক নন। পশু-চিকিৎসক।”
বসের গলায় বিস্ময় ঝরে পড়ল, “সে কি মশাই! আপনি ঠিক বলছেন?”
“না তো কী, স্যার? সারাটা দিন বেকার হয়রানি হল।”
বস মানতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, “কী জানি! আমি যে নেম-প্লেটে দেখেছিলাম শিশু-চিকিৎসক!”
বিভূতিবাবু ক্ষীণভাবে প্রতিবাদ জানালেন, “না, স্যার। উনি শিশু নন।”
“না, না না। এ কখনও হতেই পারে না। পশু হোক বা মানুষ, সকলেরই শিশু অবস্থা থাকে। ওঁর নেই বলতে চান আপনি?”
“না স্যার, তা নয়। আমি বলছি উনি শিশু ইয়ে নন।”
“একই তো কথা হল। নক্ষত্র মণ্ডল একেবারে যুবক হয়েছেন, বলছেন? ভীমপুত্র ঘটৎকোচের মতো? নাকি দ্রৌপদী বা ধৃষ্টদ্যুম্নের মতো?”
স্যারের প্রিয় মহাভারত এসে পড়েছে আলোচনাতে, এটা বিভূতিবাবু বুঝতে পারলেন। তাঁর আবার এ বিষয়ে তেমন জানা নেই। ধৃষ্ট বলে কী একটা বললেন স্যার? যতই হোক, স্যারের সঙ্গে তর্ক করাটা তাঁর ঠিক হয়নি। তিনি বললেন, “আমার ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, স্যার।”
“না, না। মার্জনা করার ব্যাপার নয়। আমাকে বুঝতে হবে তো ঘটনাটা ঠিক কী।”
“কী আর ঘটনা, স্যার। উনি শিশু ইয়ে নন। তাই তো বললেন। দেখালেনও।”
তালেগোলে ‘চিকিৎসক’-এর মতো কঠিন শব্দ বিভূতিবাবুর মাথা থেকে খোয়া গেছে।
“উনি কী তাহলে?”
শিশু-পশু, পশু-শিশু করতে করতে বিভূতিবাবু ছোট্টো করে শুধু বললেন, “পশু।”
“শুনুন বিভূতিবাবু, আমি বলছি আপনাকে, উনি এককালে শিশুই ছিলেন। এখন বড়ো হয়ে নিজেকে পশুতে কনভার্ট করে নিয়েছেন।”
“তবে স্যার, একটা কথা আপনাকে বলতে পারি, তাঁকেও বেশ সিংহের মতো লাগল।”
“লাগবেই তো। আমরা সকলেই একেকটি পুরুষসিংহ। ভুল হতেই পারে না। নক্ষত্র মণ্ডল যদি শিশু-চিকিৎসকের ‘শি’ মুছে ‘প’ লিখে নিজেকে পশু-চিকিৎসক করে তোলেন তাতে আমার কী করার আছে বলুন?”
বিভূতিবাবু ভাবলেন কেবল একটা ‘শি’ আর ‘প’-এর গোলমাল বই তো নয়। কী আর করা যাবে! তিনিও তো যখন কুটুর বললেন, তারা মণ্ডল শুনলেন কুকুর। এও তো স্রেফ ‘টু’ আর ‘কু’-এর গোলমাল। এই ‘টুকু’ বিভ্রান্তি না থাকলে জীবন ঠিক পথে এগোয় কী করে!

_____

অলঙ্করণঃ বিশ্বদীপ পাল

2 comments: