যুগ্ম ষষ্ঠ স্থানাধিকারি গল্পঃ চন্দ্রাহতঃ প্রকল্প ভট্টাচার্য




“ধুত্তেরি! আর এখানে ভালো লাগছে না। চল, চাঁদেই চলে যাই!”
কথাটা শেষ করেই দাদা এমনভাবে হাতের ঢিলটা পুকুরে ছুড়ল, জলে যে আস্ত চাঁদের ছবিটা ফুটেছিল সেটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল। দাদার হাতের টিপ খুব ভালো। বলে বলে গাছ থেকে আম পাড়তে পারে। একবার গুলতি ছুড়ে একটা কাঁকড়াবিছে মেরেছিল, আমার চোখের সামনেই। সেই থেকে দাদাকে আমি গুরু মানি। শুধু হাতের টিপই বা কেন, দাদা তুখোড় সাঁতারু। এই তুখোড় কথাটা আমি পিটি-র রবি স্যারের কাছ থেকে শিখেছি। দাদা দৌড়োতেও পারে খুব জোরে। পাড়ার সমস্ত দৌড়ের প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়। টিফিন বাক্স, জলের বোতল প্রাইজ পায়। আমিও নাম দিই, তবে সান্ত্বনা পুরস্কারের কমলালেবু পাই শুধু। মোটের ওপর, দাদা সবকিছুতেই ভালো, শুধু পড়শোনাটাই যা আসে না।
শুধু ‘আসে না’ বললে নাকি বোঝানো যায় না। রমেশবাবু স্যার বলেন, একটা গাছকেও নাকি তিনি অঙ্ক শেখাতে পারেন, কিন্তু দাদাকে পারেন না। বাংলার হরিপদবাবু বলেন, দাদার লেখা বানানগুলো নাকি বাঁধিয়ে রাখার মতো। যাই হোক, এগুলো যে ভালো কথা নয় সেটা আমি বুঝি, তাই বেশি বলতে চাই না। হাজার হোক, আমার নিজের দাদা, আমার গুরু! আমি যখন ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হলাম, দাদা তখন ক্লাশ ফাইভে পড়ত। আমি পাশ করলাম, দাদা ফেল। পরের বছরও তাই। এইভাবে এখন আমি আর দাদা দু’জনেই ক্লাশ ফাইভে পড়ি। আমাদের ইস্কুলে কেউ ফেল করে না, শুধু দাদা করে। কারণ, সিক্সের মাস্টারমশাইরা নাকি বলেছেন, দাদা যদি কিচ্ছুটি না শিখে সিক্সে ওঠে, ওঁরা সবাই ইস্কুল ছেড়ে চলে যাবেন। তাহলে ইস্কুলে পড়াবে কে! সেই ভয়েই হেড স্যার দাদাকে সিক্সে উঠতে দেন না। এদিকে আমাদের বাবা ভীষণ রাগী। সারাবছর ব্যাবসার কাজে ব্যস্ত থাকে, তাই আমাদের খোঁজ নেয় না। শুধু রেজাল্ট বেরোবার দিন প্রত্যেক বছর দাদাকে মেরে আধমরা করে দেয়, শেষে ঠাম্মা এসে বাঁচায়। পরদিন থেকে আবার যে কে সেই।
এবার বাবা বলেছে, যদি দাদা আবার ফেল করে মেরে হাত-পা ভেঙে দেবে যাতে আর কোনোদিন সাঁতার বা দৌড়ঝাঁপ করতে না পারে। আজই রেজাল্ট বেরিয়েছে, আর ঘটনাচক্রে আমি পাশ করে গেছি আর আবার দাদা ফেল! ইস্কুল থেকে আমরা ভয়ে বাড়ি ফিরিনি, সোজা মাঠ পেরিয়ে বাদাবনে লুকিয়ে আছি। সন্ধে নামার পর বাবা আর কয়েকজন খুঁজতে এসেছিল আমাদের। ততক্ষণে নিশ্চয়ই কেউ জানিয়ে দিয়েছিল দাদার রেজাল্টটা। কেউ হয়তো আমাদের দেখেও থাকবে এদিকে আসতে। সে যাই হোক, আমরা ইস্কুলের জামা খুলে, খালি গায়ে কালো প্যান্ট পরে ঠায় চুপটি করে দাঁড়িয়েছিলাম। ভাগ্যক্রমে দু’জনেই আমরা এত কালো, অন্ধকারে কেউ আমাদের খুঁজে পায়নি। একটু ডাকাডাকি করে ফিরে গেছে। তাই এখন আমরা নিশ্চিন্তে পুকুরপাড়ে বসে আছি।
হরিপদবাবু রচনার ভূমিকার জন্য দুই নম্বর দেনーতো এই হল এখন আমাদের অবস্থার ভূমিকা। তবে আমাদের চাঁদে যাওয়া নিয়ে প্রস্তুতি অনেকদিনের। কাউকে যদি না বলো, তাহলে তোমাদের চুপিচুপি জানাই, আমরা একটা রকেটও বানিয়েছি। আমাদের বাড়ির পিছনে গোয়ালঘরের এককোণে একটা লোহার ড্রাম আছে। সাপখোপের ভয়ে সেদিকে কেউ বিশেষ যায় না। দাদা সেখানেই বিছেটাকে মেরেছিল। আমাদের সেটা কারখানা। ড্রামের একদিক খোলা, আমি আর দাদা ভিতরে ঢুকে উবু হয়ে বসতে পারি। আমাদের ফেলে দেওয়া টেবিল ফ্যানটা এখনও জোরে হাওয়া দিলে ঘোরে। আমরা ড্রামের ভিতরে বসে সেটা ফিট করে দিলেই প্রপেলার রেডি। এইসব বুদ্ধি দাদারই, আমি অ্যাসিস্টেন্ট। রকেট ওড়াবার জন্যে কালীপুজোর সময় কেনা দশটা বোম্বাই হাউইবাজি লাগানো আছে ড্রামের তলায়। তাদের সলতেগুলো এক করে ইলেক্ট্রিক তার বাজি দিয়ে বাঁধা, যাতে আগুন দিলেই সবকটা হাউই একসঙ্গে ফাটে। ড্রামের একটা ফুটো দিয়ে সেই ইলেক্ট্রিক তারের সলতেও বার করা আছে। যতই বোম্বাই হোক, আমাকে আর দাদাকে নিয়ে একসঙ্গে চাঁদ অবধি পৌঁছতে হবে তো! তাই একেবারে দশটাই হাউই লাগিয়েছি। সবই রেডি, দাদা ক্যাপ্টেন, আমি ভাইস ক্যাপ্টেন, এবার চাঁদে গেলেই হয়, কিন্তু এতদিন বাদ সাধছিল মহাকাশচারীর পোশাক আর খাওয়াদাওয়া। সেগুলো যোগাড় হচ্ছিল না। নইলে আমরা তো এতদিনে চলেই যেতাম চাঁদে!
এখন পরিস্থিতির গুরুত্বটা বুঝতে পারছি। ধরা পড়লেই দাদার হাত-পা ভেঙে দেবে বাবা, আর তাহলে আমাদের আর কোনোদিনই চাঁদে যাওয়া হবে না। সুতরাং যা করবার আজ রাত্তিরেই করতে হবে। তাই ভেবেচিন্তে বললাম, “দাদা, চাঁদে যাওয়ার পোশাক কী হবে?”
দাদা একটু চিন্তা করে বলল, “বাবা আর কাকার বাইকের হেলমেটদুটো দু’জনে পরে নেব। আর গায়ে টাইট করে রেইনকোট, পায়ে বুটজুতো।”
ভেবেই বেশ ভালো লাগল আমার। হ্যাঁ, এইবার মহাকাশচারীদের মতো লাগবে।
“আর খাওয়াদাওয়া?”
“বিস্কুট আর জলের বোতল, ব্যস। বেশি ওজন হলে চাঁদ অবধি পৌঁছনো যাবে না। বরং ওখানে নেমে কিছু কিনে-টিনে নেব।” এই বলে দাদা পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে দেখাল।
এইবার আমি নিশ্চিন্ত হলাম। সত্যিই তো, বেশি ওজন হলে আমরা অতদূর যাব কী করে? এইজন্যেই তো দাদা ক্যাপ্টেন!
আর একটু রাত্তির হলে আমরা চুপিচুপি পিছনের দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকলাম। বাইকগুলো বাইরেই ছিল, হেলমেটদুটো তুলে নেওয়া হল। রেইনকোট তো আমাদের ইস্কুল-ব্যাগেই, আর বুট পায়েই আছে, তাই ঝটপট দু’জনে মহাকাশযাত্রার জন্য তৈরি হয়ে গেলাম। দাদা বুদ্ধি করে কোথা থেকে একটা দেশলাইও যোগাড় করে রেখেছিল। এমনি এমনি কি আর গুরু মানি!
খুব উত্তেজনা নিয়ে দু’জনে ড্রামের ভিতরে ঢুকে বসলাম। উত্তেজনায় বুকটা ধুকপুক করছিল খুব। একটু ভয়ও করছিল। দাদাও দেখলাম একটু ভয় পেয়েছে। তবুও হাত-পা ভাঙার ভয় আরও বড়ো ভয়। শেষমেশ প্রপেলর ফিট করে, জলের বোতল আর বিস্কুটের প্যাকেট সামলে, কাঁপা হাতে দেশলাই জ্বালিয়ে দাদা সলতেয় আগুন ধরাল, আর তারপর একটা বিকট আওয়াজ আর আমাদের যেন কেউ ঝাঁকুনি দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। আমি প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম, “দাদা রে!” ব্যস, তারপর আর কিছু মনে নেই।
চোখ খুলে দেখি সকাল হয়ে গেছে। মা আর ঠাকুমা আমার খাটের ধারে বসে আছে। ধড়মড় করে উঠে বসতে যেতেই সবাই হাউমাউ করে উঠল। বললাম, “দাদা কই?”
“ঐ তো, হতভাগা তোর পাশেই শুয়ে আছে!”
বাবার গম্ভীর গলা শুনে বুঝলাম নির্ঘাত এতক্ষণে দাদার হাত-পা ভাঙা হয়ে গেছে। চোখ পিটপিট করে দেখি কই, দিব্যি শুয়ে পা নাচাচ্ছে আমার পাশে! ওদিকে বাবা বলেই চলল, “আহাম্মকের বুদ্ধি দেখো! রকেট বানিয়েছে! নাকি চাঁদে যাবে! আবার ছোটভাইটাকেও সঙ্গে নেওয়া হয়েছে! ভাগ্যিস মাথায় হেলমেট ছিল, নয়তো মাথাটা ফাটত দু’জনের। মাঝরাত্তিরে ওর’ম ভয়ানক আওয়াজ শুনে বাইরে এসে দেখি দুই মূর্তিমান কুমড়োগড়ান গড়াচ্ছেন উঠোনে! ভাগ্যি ভালো ভয়ানক কিছু হয়নি।”
তাহলে কিছুটা আন্দাজ করা গেল, যে আমাদের রকেট উড়তেই পারেনি। দাদাও নিশ্চয়ই ভয়ের চোটে আমাদের প্ল্যানটা বলে দিয়েছে বাবাকে। যাই হোক, আপাতত দাদার হাত-পা ভাঙা যে হয়নি, এই অনেক।
“শোনো, এই কুলাঙ্গারটার যেন আর মুখও না দেখতে হয় আমাকে, বুঝেছ? তোমরা ওকে নিয়ে যা করবে কোরো, আমি আর এর মধ্যে নেই।” এগুলো বাবা মা আর ঠাকুমাকে বলল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি চুপিচুপি দাদাকে বললাম, “দাদা, আমাদের চাঁদে যাওয়া হল না রে।”
দাদা নির্বিকার স্বরে জবাব দিল, “পরেরবার রকেটটা আরও ভালো করে বানাব, বুঝলি! যাব তো বটেই।”
“দাদা, কুলাঙ্গার মানে কী রে?”
“দুই ধরনের লাঙ্গার হয়। সুলাঙ্গার হলে ভালো আর কুলাঙ্গার হলে খারাপ।”
“কিন্তু লাঙ্গার মানেই বা কী!”
“ওসব ছাড়। বাংলা পরীক্ষায় ‘চন্দ্রাহত’ শব্দের অর্থ লিখতে দিয়েছিল, মনে আছে? আমি লিখেছিলাম ‘চন্দ্রে যেতে গিয়ে আহত’, হরিপদবাবু কেটে দিয়েছিলেন। এখন চল তো যাই ওঁর কাছে, যদি একটা নম্বর পাই।”

_____

অলঙ্করণঃ মৈনাক দাশ

No comments:

Post a Comment