যুগ্ম অষ্টম স্থানাধিকারি গল্পঃ প্ল্যানচেটঃ অগ্নীশ্বর সরকার


প্ল্যানচেট


অগ্নীশ্বর সরকার

পুজোর ছুটিটা খুব ভালোই কাটছিল দক্ষিণ কলকাতার ‘নির্ঝর’ আবাসনের চার বন্ধুর। নীলাদ্রি, অর্ক, সম্বিত আর সম্রাট। চারজনই কলকাতার যোধপুর পার্ক বয়েজ স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। চার বন্ধু পড়াশোনাতেও একে অপরকে টেক্কা দেয়। সম্বিত আবার স্কুলের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন। সম্রাট স্কুলের ক্রিকেট টিমের নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। চার বন্ধু কিছুতেই একে অপরকে ছেড়ে থাকতে পারে না। পুজোর ছুটিতে সারাদিন পড়াশোনার পর সারা বিকেলটা শুধুই ক্রিকেট খেলা।
কালীপুজোর আর কয়েকদিন বাকি। আবাসনের মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। অর্ক আউট হয়ে নীলাদ্রির পাশে বসে বলল, “কাল একটা ম্যাগাজিনের পূজাবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্ল্যানচেট করা নিয়ে একটা লেখা পড়লাম। যদি আমরাও প্ল্যানচেট করতে পারতাম তাহলে আমরাও কোনও ভালো প্লেয়ারের কাছ থেকে টিপস নিতে পারতাম। দারুণ হত, বল?”
শুনে সকলে হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ল।
সম্রাট বলল, “গুড আইডিয়া ভাই। ইদানীং আমার ব্যাটিংয়ে কিছু সমস্যা হচ্ছে। আর প্ল্যানচেটে যদি সমস্যা মেটে, তবে উই শুড ট্রাই দ্যাট।”
অর্ক বলল, “গুড আইডিয়া। আমার পিসির বাড়িতে কালীপুজো হয়। গ্রামের বাড়ি। কালীপুজোর দিন প্ল্যানচেট। জাস্ট জমে যাবে। আমি বাড়ি গিয়ে মাকে বলব আমাদের সকলের যাওয়ার ব্যাপারে। পিসির বাড়িতে খুব ধুমধাম করে কালীপুজো হয়।”
নীলাদ্রি বলল, “কিন্তু পুজোর সময় বাড়িভর্তি লোক হবে। তাতে আমাদের অসুবিধা হবে না?”
অর্ক বলল, “শোন, কালীপুজোর সময় সবাই ঠাকুরঘরে পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আমরা ওই সময়ে…”
বাকি সকলে অর্কর কথা সমর্থন করল।


দু’দিন পর অর্করা পিসির বাড়ি যাবে। রাতে খাবার সময় অর্ক বাবাকে বলল, “এবার আমাদের সঙ্গে নীলাদ্রি, সম্বিত আর সম্রাটও যাবে।”
অর্কর মাও বললেন, “চলুক না। এখন ওদের পড়াশোনার চাপও একটু কম। ক’দিন একসঙ্গে ওরা হৈ-হুল্লোড় করে কাটাবে। আর এমনিতেও তিনদিনের ব্যাপার। তুমি বরং একবার ওদের সবার বাড়িতে ফোন করে কথা বলে নাও।”
অর্কর বাবা বললেন, “উত্তম প্রস্তাব। ওরা তো হরিহর আত্মা। ওদেরও খুব মজা হবে। আমি খেয়ে উঠেই ফোন করছি।”
অর্কর বাবার সঙ্গে কথা বলে সবাই রাজি।


অর্কর পিসির বাড়ি বহরমপুরের কাছে একটা গ্রামে। কালীপুজোর দু’দিন আগে বিকেলে হাওড়া-মালদা ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসে সবাই চেপে বসল। নীলাদ্রি, সম্বিত আর সম্রাটের মা-বাবা এসেছিলেন ওদের ট্রেনে তুলতে।
বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল।
রাতের খাবার খেয়ে চার বন্ধু একসঙ্গে তিনতলার ঘরে শুয়ে গল্প করছে। অর্ক বলে উঠল, “প্রথম স্টেপ সাকসেসফুল। এবার নেক্সট স্টেপ।”
নীলাদ্রি বলল, “একজাক্টলি। প্ল্যানচেট কীভাবে করতে হয় সেটা আগে জানা দরকার।”
সম্বিত বলল, “আমাদের গুগলবাবাকে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পেয়ে যাব।”
সকলে হো হো করে হেসে উঠল।
অর্ক বলল, “চল, তাড়াতাড়ি ঘুমো। কাল সকাল থেকেই শুরু করতে হবে। কালীপুজো আর একদিন বাকি আছে। পরশু ফাইনাল ডে। অতএব আমাদের যা করার কাল দিনের মধ্যেই করে ফেলতে হবে। আমি অবশ্য সেই ম্যাগাজিনটা সঙ্গে এনেছি। তোরা দেখতে পারিস। আমার তো মুখস্থ হয়ে গেছে।”
পরদিন সকাল থেকে চলল ইন্টারনেটে সার্চ। প্রায় সারাদিনই মোবাইলে মুখ গুঁজে পড়ে থাকল চার বন্ধু। এরপর বিকেল থেকে চলল মোমবাতি, টেবিল, সাদা কাপড় প্রভৃতি সংগ্রহের কাজ। ঠিক হল, নিচের যে ঘরে পিসিদের ধান থাকত সেই ঘরেই পুজো শেষের পরেই হবে ওদের প্ল্যানচেট। ওই ঘরে কেউ ঢুকবে না।
পুজোর দিন সকাল থেকেই আলোচনা শুরু হল প্ল্যানচেটে কাকে ডাকা হবে, কী কী প্রশ্ন করা হবে এইসব। সম্বিতের ইচ্ছে কোনও ডাকসাইটে ক্রিকেট ক্যাপ্টেন, আর নীলাদ্রির ইচ্ছে কোনও নামজাদা সাহিত্যিক। বাকি দু’জনের ইচ্ছে কোনও স্কলার সায়েন্টিস্ট। শেষে ঠিক হল, স্কুলের জ্যোতির্ময় স্যার সেই অলরাউন্ডার ব্যক্তি। উনি কিছুদিন আগেই মারা গেছেন। উনি কেমিস্ট্রির স্যার ছিলেন, একই সঙ্গে খেলা আর সাহিত্য পাগল মানুষও ছিলেন। অতএব সকলেই সন্তুষ্ট। তার চেয়ে বড়ো কথা হল, স্যার সকলেরই প্রিয়। অচেনা কেউ হলে আলাপ করতেই বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাবে। সুতরাং, জ্যোতির্ময় স্যার একদম পারফেক্ট চয়েস।
রাতে পুজো শুরু হল। সারারাত পুজো চলবে। ওদের মন পড়ে আছে পূর্বদিকের কোণের ঘরে।
অর্ক মাকে বলল, “আমরা খেয়ে শুতে চলে যাব।”
অর্কর মা বললেন, “হ্যাঁ। তোমরা সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছ, শুয়েই পড়ো। পরশু বাড়ি যেতে হবে। এই দু’দিন মন খুলে ঘুরে নাও।”


রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করে চারজনে গুটি গুটি পায়ে হাজির হল সেই ধানের ঘরে। ঘরের মাঝখানে টেবিল আর চারটি চেয়ার। ঠিক হল, নীলাদ্রির সামনেই থাকবে কাগজ আর পেন। ঘরের আলো নিভিয়ে চারজনে গোল করে চেয়ারে বসে পরস্পরের হাত ধরে জ্যোতির্ময় স্যারের কথা ভাবা শুরু করল। অক্টোবর মাসের শেষ, ঘর বেশ ঠাণ্ডা। ঘরের একটা জানালা খোলা। জ্যোতির্ময় স্যারকে আসতে দিতে হবে তো! সেই জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে মোমবাতির শিখাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। চারজনের হাত ঠাণ্ডা। কারোরই ভূতে বিশ্বাস নেই। কিন্তু আজকের ঘরের পরিবেশ ভূতের অস্তিত্ব প্রবল করতে বাধ্য করছে। মাঝে মাঝে নিস্তব্ধতার বুক চিরে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে।
হঠাৎ টেবিলটা যেন একবার অল্প নড়ে উঠল। ওদের হাতের গ্রিপগুলো আরও শক্ত হয়ে উঠেছে। চারজন সায়েন্সের ছাত্রর মনে দোলাচল তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানের পরিধির বাইরে কি অন্যকিছুর অস্তিত্ব আছে? ঘরের মধ্যে টুকটাক আওয়াজ শুরু হয়েছে। ওদের মাথার উপরে যেন কী একটা ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রতিমুহূর্তে নিস্তব্ধতাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে ওই আওয়াজটা। তার সঙ্গে মোমবাতির শিখার কেঁপে ওঠা। বিজ্ঞানের গণ্ডীর বাইরে যে জগতের অস্তিত্ব আছে, সেই জগৎ থেকে হয়তো আগমন ঘটেছে জ্যোতির্ময় স্যারের। হঠাৎ উপরের দিকে বিকট একটা শব্দ হল। সবার মুখ উপরদিকে। ওই আলো-অন্ধকারে সবাই দেখল একটা ছায়ামূর্তি নেমে আসছে ওদের টেবিলের দিকে। ওদের ওপরেই পড়বে। ঝুপ!
ছায়ামূর্তিটা নামল মোমবাতির উপরে। মোমবাতি নিভে গেছে। সবার হাতের সঙ্গে লোমশ ছোঁয়া। আর কিছু মনে নেই। চারজনই পড়ি কি মরি করে ছুট দিল ঠাকুরঘরের দিকে। দরদর করে ঘামছে।


ঠাকুরঘরে গিয়ে ওরা একটু দূরে বসল। চারজনেই বাকরহিত। চারজনের হৃৎস্পন্দনের মিলিত আওয়াজ বাড়ির ঢাকের চেয়েও জোরে শোনা যাচ্ছে হয়তো।  থিতু হতে কিছুক্ষণ সময় লাগল।
অর্ক কিছুক্ষণ বাদে বলে উঠল, “জোর বেঁচে গেছি। ওটা কী ছিল কে জানে! যাই থাক, আমরা বেঁচে গেছি। জ্যোতির্ময় স্যার মনে হয় চলে এসেছেন। এবার ওঁকে এই জগৎ থেকে ফেরত পাঠাব কীভাবে?”
সম্রাট করুণ মুখ করে বলল, “আমার মনে হয় বাড়ির সকলকে জানিয়ে দেওয়া দরকার।”
নীলাদ্রি বলল, “চল, আমরা শুতে যাই। তারপর যা হবে দেখা যাবে। আমরা বরং আজ দুটো খাটকে একসঙ্গে জুড়ে শোব।”


একটা বিনিদ্র রাত্রির অবসান হল। সকালে চারজন ঘরে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নীলাদ্রি, সম্বিত আর সম্রাটের হাতে লাঠি। অর্কর হাতে মা কালীর আশীর্বাদী পুষ্প। উঁকিঝুঁকি দিয়ে ঘরে ঢুকে হেসে গড়িয়ে পড়ল চারজনই।
পিসিদের ধানের বস্তাগুলো উপরে ঝোলানো ছিল। ইঁদুর চলাচলের ফলে বস্তাগুলো সোজা মোমবাতির উপরে পড়েছে। চটের বস্তার ছোঁয়া হয়ে উঠেছিল রোমশ ছোঁয়া। ওদের প্ল্যানচেটের ফলে আগমন ওই চটের তৈরি ধানের বস্তার।
বাড়ি ফেরার পথে চার বন্ধুর একটাই সান্ত্বনা, তারা প্ল্যানচেট করে জ্যোতির্ময় স্যারের আত্মার বদলে অন্তত বস্তাগুলোকে উপর থেকে নিচে নামাতে সক্ষম হয়েছে।


_____


অলঙ্করণঃ সুকান্ত মণ্ডল

No comments:

Post a Comment