যুগ্ম পঞ্চম স্থানাধিকারি গল্পঃ দোলগোবিন্দের কেরামতিঃ অর্ণব চ্যাটার্জী

দোলগোবিন্দের কেরামতি

অর্ণব চ্যাটার্জী

দোলপূর্ণিমার দিন হওয়ায় মা সাধ করে ভগবানের নামে নাম রেখেছিলেন দোলগোবিন্দ তা সেই দোলগোবিন্দের মাথায় ছোটোবেলা থেকেই কবিতার ভূত চেপে আছে স্কুলে, বাড়িতে অনেক বকাঝকা এমনকি মারধোরও সেই ভূতকে দোলগোবিন্দের ঘাড় থেকে নামাতে পারেনি কিন্তু লেখাপড়ার পাট চুকতেই ওঁর বাবা রাধাগোবিন্দ সাফ জানিয়ে দেন যে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, তারপর কবিতাচর্চা কারণ, কবিতা লিখে তো আর পেট ভরবে না!
তাই কষ্ট হলেও বাবার চোখ রাঙানির চোটে কবিতার শখ শিকেয় তুলে দোলগোবিন্দকে বসতে হয়েছে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় কবিতার ছন্দ মিলিয়ে নয়, তাঁর দিন কাটছিল নিরস ইতিহাসের পাতায়, দাঁত ভাঙা ইংরেজি, নয়তো দুরূহ অঙ্কের বাধা অতিক্রম করতে করতে একসময় দোলগোবিন্দের মনে হত এর চেয়ে এভারেস্ট জয় করা বোধহয় সহজ হত তিনি বাবাকে উদাহরণ দিয়ে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে বড়ো বড়ো কবিরা কেউই চাকরির পরীক্ষায় বসেননি তবুও তাঁরা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন চাকরির যাঁতাকলে পড়লে তাঁর মতো একটা প্রতিভা অকালে ঝরে যাবে দেশ একজন উদীয়মান কবিকে হারাবে
কিন্তু দেশ ও দশের এহেন সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনাও রাধাগোবিন্দকে টলাতে পারেনি দোলগোবিন্দের মিনমিনে প্রতিবাদ রাধাগোবিন্দের ধমকানির চোটে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে বেশি বেগড়বাই করাতে কবিতার খাতাগুলোর স্থান হয় জ্বলন্ত উনুনে জ্বলতে জ্বলতে পাতাগুলো যেন বাঁচার শেষ আর্জি জানায় দোলগোবিন্দকে কিন্তু অসহায় হয়ে দেখা ছাড়া দোলগোবিন্দের আর কোন উপায় ছিল না তাই চোখের জলে কবিতাকে সাময়িক বিদায় জানিয়ে শুরু হয় চাকরি খোঁজার লড়াই তবে মজবুত ও পেটানো চেহারার কারণে শেষমেশ পুলিশের চাকরিটা জুটেই গেল যে হাতে কলমে ধরার কথা সেখানে উঠল গিয়ে কিনা পুলিশের ব্যাটন ওঁর পোস্টিং হল এক গ্রামে
কিন্তু কবিতার পোকা যার মাথার মধ্যে সবসময়ই গিজগিজ করছে, তাঁকে আটকাবে কে? দোলগোবিন্দ থানায় একটু সময় পেলেই বসে পড়েন কবিতার খাতা নিয়ে থানার চৌকিদার থেকে ঝাড়ুদার অবধি জেনে গেছে সাহেবের কবিতাপ্রেমের কথা কোনও চোর-ডাকাত ধরা পড়লে তার শাস্তি হয় সারাদিন লক-পে বসে দোলগোবিন্দের লেখা কবিতাগুলো মুখস্থ করার দোলগোবিন্দ সন্ধেবেলায় এসে পড়া ধরেন যতক্ষ না কবিতা মুখস্থ হচ্ছে তাদের ছাড় নেই চোর-ডাকাতেরা এরকম অদ্ভুত শাস্তি আগে ভোগ করেনি তাদের মনে হয়, এই মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করার থেকে মার খাওয়াও অনেক ভালো ছিল তবে এরকম অভিনব শাস্তির ভয়ে কিন্তু গ্রামে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো অপরাধ ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল দোলগোবিন্দের উপরওয়ালাও খুশি সুখেই দিন কাটছিল কিন্তু বিপদ যে এভাবে ওত পেতে যাচ্ছে তা আর কে জানত?

কলকাতা পুলিশের হেড কোয়ার্টারে আজ মিটিং ডেকেছেন খোদ ডিজি সাহেব সারা বাংলা থেকে পুলিশের বড়ো কর্তারা এসেছেন সবার মনে কৌতূহল কী এমন হল যে মাত্র একদিনের নোটিসে সবাইকে জরুরি তলব করা হল? জল্পনা, চোরা টেনশন চলছে উপস্থিত সকলের মনের মধ্যে
একটু পরই ডিজি সাহেব ঢুকলেন ঘরে সবাই উঠে দাঁড়াল সবাইকে বসতে বলে ডিজি সাহেব কথা শুরু করলেন প্রথমেই আসার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন তারপর বলতে শুরু করলেন, জানি আপনারা আর কৌতূহল ধরে রাখতে পারছেন না তাই বেশি ভূমিকা না করে সোজা কাজের কথায় চলে যাই আমার কাছে পাকা খবর আছে যে একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্ফোরণের উদ্দেশ্যে বিস্ফোরক জড়ো করছে আর তার মূল পাণ্ডা মকবুল মিঞা এই রাজ্যেই ঘাঁটি গেড়েছে কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে অনেক চেষ্টা করেও আমরা এই ব্যাপারে এখন পুরো অন্ধকারে
ডিজি সাহেব যেন হলঘরের মধ্যে একটা বোমা ফাটালেন চারদিকে চাপা গুঞ্জন শোনা গেল মকবুল মিঞার নাম কে না শুনেছে? লোকটা অসম্ভব ধূর্ত, ছদ্মবেশ ধরতে ওর জুড়ি মেলা ভার এমনভাবে সাধারণের মধ্যে মিশে যায় যে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব আবার আচমকা গায়েব হয়ে যেতেও সে সিদ্ধহস্ত লোকটাকে দেখতে যে ঠিক কীরকম তাও বোঝা যায় না সে কিনা এই রাজ্যে? তাহলে কি এখানেও হামলার কোন প্ল্যান আছে? একটা আশঙ্কার চোরাস্রোত সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল
ডিজি সাহেব সকলের মুখে উদ্বেগ দেখে আশ্বস্ত করলেন, চিন্তার আপাতত কিছু নেই আপনারা শুধু চোখ-কান খোলা রাখুন, আর কোথাও কোনও নতুন লোক এলে একটু খেয়াল রাখুন বাকিটা আমি দেখছি আমার টিম ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে

আজকের আবহাওয়া বড়োই মনোরম সদ্য বৃষ্টি হওয়ায় হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে জলের ছোঁয়ায় গাছের পাতাগুলো আরও যেন সজীব ও সবুজ হয়ে উঠেছে সেগুলো থেকে টুপ টুপ করে জল ঝরছে মাটি থেকে একটা সোঁদা গন্ধ উঠছে পরিষ্কার নীল আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে
দোলগোবিন্দ থানার বাইরে বেরিয়ে এসে বাইরের প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ তাড়াতাড়ি পেন বার করে লিখতে বসলেন কিন্তু কিছুটা লিখেই আটকে গেলেন কত চেষ্টা করলেন, কিন্তু একটা শব্দের মিল কিছুতেই মাথায় আসছে না মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলার দশা কামড়ের চোটে পেন না হয়ে পেনসিল হলে বোধহয় ওটা অর্ধেক হয়ে যেত দোলগোবিন্দ খুবই অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন ইস! একটা মিলের জন্য এত সুন্দর একটা কবিতা আটকে থাকবে! হঠাৎ পাশ থেকে কেউ শব্দটা বলে দিল আরে! এটা তো এতক্ষণ মাথায় আসেনি তাড়াতাড়ি লিখতে বললেন বাহ! কী সুন্দর ছন্দে ছন্দে মিলে গেল কথাটা কে বলল, সে কোথা থেকে এসেছে এসব কিছুই দোলগোবিন্দের মাথায় এল না কবিতাটা শেষ করে উনি একটা পরিতৃপ্তির হাসি হাসলেন তখনই একটা গলাখাঁকারি শুনে চমকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন লোকটাকে একেবারে ছাপোষা ধরনের একটা লোক লুঙ্গি আর ফতুয়া পরনে গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি একগাল হেসে বলল, তা স্যারের কবিতা লেখার খুব শখ বুঝি? খাতাটা একটু দেখতে পারি?
দোলগোবিন্দ একটু কিন্তু কিন্তু করেও খাতাটা দিলেন লোকটাকে লোকটা কবিতাটা পড়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, না, স্যার সত্যি আপনি দারু কবিতা লেখেন তা আপনি তো বড়ো কবি হতে পারতেন মরতে এই পুলিশের চাকরিতে কেন?
একটা অচেনা অজানা লোকের থেকে এই অযাচিত উপদেশ শুনে অন্য কেউ হলে হয়তো রেগেই যেত তবে দোলগোবিন্দ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নিজের কষ্টের কথা এই লোকটাকে বলে কী লাভ? উনি কষ্টটা বুকে চেপে প্রশ্ন করলেন, তা আপনিও কি লেখেন?
লোকটা হেসে বলল, তা একটু আধটু লিখি বৈকি
দোলগোবিন্দ উৎসাহিত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ লোকটির সঙ্গে গল্প করলেন দেখলেন, শুধু কবিতা নয়, বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধেও ওই লোকটির জ্ঞান ভালোই আছে ফলে দোলগোবিন্দের লোকটিকে ভালো লেগে গেল এরপর থেকে সে মাঝেমধ্যেই থানায় আসত গল্প করতে থানার বাকি লোকজন দোলগোবিন্দকে বলেছিল একটা অচেনা, অজানা লোককে এভাবে থানায় ঢোকানো ঠিক হচ্ছে না কিন্তু দোলগোবিন্দ কোন কিছুতে কান দিতে রাজি নন এতদিন পরে উনি একজন কবিতার সমঝদার পেয়েছেন, এ কি কম কথা? কথায় কথায় জানলেন যে ওই লোকটির নাম হারাধন মণ্ডল প্যাকেজিংয়ের ব্যাবসা করে বিভিন্ন সংস্থার অর্ডার করা জিনিস সে প্যাক করে কাস্টমারকে পৌঁছে দেয় তাতে গৃহস্থালির টুকিটাকি জিনিস থেকে বড়ো মালপত্রও থাকে এই গ্রামটা বেশ নিরিবিলি বলে পছন্দ হওয়ায় এখানে আপাতত ঘাঁটি গেড়েছে গ্রামের শিবমন্দিরের পাশের জমিটায় ওর বড়ো গোডাউন দোলগোবিন্দ শুনেছেন, ওখানে গ্রামের কিছু বেকার ছেলে কাজও পেয়েছে খবরটা শুনে উনি খুশিই হন নাহ! লোকটি সত্যিই উপকারী

কিছুদিনের মধ্যে এক নতুন উপদ্রব এসে হাজির উপর মহল থেকে বলা হল, কোনও এক সন্ত্রাসবাদী এই রাজ্যে লুকিয়ে আছে সবাই যেন নিজের নিজের এলাকায় কোন সন্দেহজনক কিছু দেখলেই জানায় কোনও নতুন লোক এলে তার সম্বন্ধে খোঁজখবর নেয় থানার সবাই বলল, ওই হারাধনের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া দরকার কিন্তু দোলগোবিন্দ এতে কান দিলেন না আর এমনিতেও উনি হারাধনের গোডাউনে কয়েকবার গেছেন দেখেছেন ঘর-গৃহস্থালির জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, লোকেরা প্যাক করছে আর হারাধনবাবু সত্যি সজ্জন ব্যক্তি আশেপাশের লোকেরাও ওকে ভালোবাসে তাকে কিনা সন্দেহ?
কিন্তু উপর মহল থেকে ক্রমাগত চাপ  আসতে থাকায় দোলগোবিন্দ আর থানায় বসে থাকতে পারলেন না উনি রোজ সকালে বেরোন, রাতে ফেরেন সারা গ্রামের আনাচে কানাচে টহল দেন আর লোকের বিচিত্র প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে নাজেহাল হন একদিন দেখেন একটা উলোঝুলো পোশাক পরা, একমুখ দাড়িওয়ালা খ্যাপাটে লোক রাস্তায় গান গাইছে জঙ্গী বলে সন্দেহ হলেও পরে জানতে পারলেন ও হল নাড়ু, ভোলা ময়রার পাগল ভাই একদিন রাস্তার কোণে দুটি মুখ বাঁধা বস্তা পড়ে থাকতে দেখেলন দোলগোবিন্দের সহকারীরা বলে উঠল,হাত দেবেন না, স্যার! বোমা থাকতে পারে শুনেই উনি আঁতকে উঠলেন বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডকে খবর দেওয়া হল চারপাশে উৎসাহী মানুষের ভিড় কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা যায় ও-দুটো আর কিছুই নয়, দুই বস্তা ঘুঁটে ঘাঁটাঘাঁটি করায় বস্তা ছিঁড়ে মাটিতে ঘুঁটেগুলো ছড়িয়ে পড়ে আর তাই দেখে মোক্ষদা বুড়ি দৌড়ে এসে সকলের বাপবাপান্ত করতে থাকল যথারীতি এই নিয়ে খুবই হাসাহাসি হল কিন্তু দোলগোবিন্দ দমলেন না তিনি ক্রমাগত গ্রামের এদিক সেদিক ঘুরতে লাগলেন, যদিও সন্দেহজনক কিছুই পেলেন না
এরকমই একদিন টহল দিতে দিতে দোলগোবিন্দ মনে করল একবার হারাধনবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলতে হবে একটা কবিতা মাথায় ঘুরঘুর করছে, কিন্তু ছন্দের অভাবে সেটাকে দাঁড় করানো যাচ্ছে না এসব ব্যাপারে ওই হারুবাবু খুব দক্ষ এরকম কত সমস্যার উনি সমাধান করে দিয়েছেন! কিন্তু গোডাউনে গিয়ে শুনলেন  হারাধনবাবু নেই, কোথাও বেরিয়েছেন দোলগোবিন্দ হতাশ হলেন যাই হোক, এসেই যখন পড়েছেন গোডাউনটা একটু ঘুরে দেখতে লাগলেন
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটা প্যাকিং বাক্সের দিকে চোখ পড়তেই দোলগোবিন্দ চমকে উঠলেন আরে! কাগজের গায়ে কবিতা লেখা আছে না? এগিয়ে গিয়ে দেখলেন ঠিক তাই শুধু ঐটাই নয়, আর অনেক প্যাকিং কাগজেও কবিতা লেখা মানে কোন কবির অনেক কষ্টের ফসল এইভাবে নষ্ট হচ্ছে কারণ, মাল ক্রেতার কাছে পৌঁছে গেলে ওই কাগজগুলোর তো স্থান হবে ডাস্টবিনে কবি ও কবিতার এহেন অপমানে দোলগোবিন্দের মাথা ভয়ানক গরম হয়ে উঠল ওঁর চেঁচামেচিতে গোডাউনের কর্মচারীরা ছুটে এল উনি অবিলম্বে কবিতা লেখা কাগজগুলোকে খুলে ফেলতে বললেন ইতিমধ্যে মাতব্বর গোছের দুটো লোক চলে এসেছে তারা নাকি ওখানকার ম্যানেজার এসেই দোলগোবিন্দের সাথে তর্ক জুড়ে দিল, কোথায় বলা আছে যে কবিতার খাতা দিয়ে মাল প্যাক করা যাবে না? কোন আইনে উনি ওদের বাধা দেন?
কিন্তু দোলগোবিন্দের সাফ কথা, দেখো ভাই, হয় নিজেই প্যাকেট খোলো আর না হয় আমি খুলিয়ে নেব আমার চোখের সামনে কবিতার এই বেইজ্জতি আমি দেখতে পারব না
দোলগোবিন্দ জোর করলেও লোকগুলো কিছুতেই ওই প্যাকেটগুলো খুলতে রাজি নয় তখন উনি সহকারী পঞ্চাননকে বললেন হাত লাগাতে কিন্তু প্যাকেটগুলোতে হাত লাগাতে যেতেই লোকগুলো হুঙ্কার দিয়ে উঠল দোলগোবিন্দ তাতে পাত্তা না দেওয়ায় একজন আচমকাই ওঁর কপালে রিভলবার ঠেকাল দোলগোবিন্দ তো বটেই, এমনকি পঞ্চাননও এতে হকচকিয়ে গেল এই সামান্য ব্যাপারে এরা এরকম জেদ করছে কেন? দোলগোবিন্দের সঙ্গে একটা রিভলবার আছে বটে, কিন্তু ব্যবহার না হওয়ায় তাতে বোধহয় মরচে ধরেছে তাই ওদের কথামতো ওঁরা দুজনে হাত উপরে তুলে দাঁড়িয়ে রইলেন লোকদুটো বাকিদের বলল, তাড়াতাড়ি গাড়ি লোড কর এখুনি বেরোতে হবে
দোলগোবিন্দেরা অবাক প্যাকেটে কী এমন আছে যে এত তাড়াহুড়ো? ঠিক এমন সময় ঠক করে একটা শব্দ আর রিভলবারওয়ালা লোকটি, বাবা রে, মা রে! বলে হাত চেপে মাটিতে বসে পড়ল গোডাউনের পাশের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল বল্টু এদিকে পেয়ারা পাড়তে এসে রিভলবার হাতে এই লোকটিকে দেখেই সে বুঝে যায় যে কেস গড়বড় আর তখনই গুলতি ছোড়ে
লোকটি পড়ে যেতেই দোলগোবিন্দ ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এক রদ্দা লাগান লোকটি নেতিয়ে পড়তেই আরেকটি লোক পালাতে যায় কিন্তু এবারও বল্টুর অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ লোকটি একটু এগিয়েই মাথা চেপে বসে পড়ে বল্টুর সঙ্গী আর পঞ্চানন মিলে লোকদুটোকে বেঁধে ফেলে ইতিমধ্যেই দোলগোবিন্দ রিভলভার বার করে বাকিদের বলেন, খবরদার! কেউ নড়বে না
এর মধ্যে থানায় খবর দেওয়া হয়েছে ফোর্স আনতে এবার পঞ্চানন একটা প্যাকেট খুলে ফেলে আর প্যাকেট খুলতেই বেরিয়ে পড়ে অসংখ্য তার সম্বলিত ঘড়ির মতো কিছু বস্তু, কিছু লম্বা রড দেখে দুজনেই অবাক এগুলো আবার কী? একে একে বাকি প্যাকেটগুলো খুলতেও একই জিনিস দেখা গেল
এদিকে থানা থেকে ফোর্স চলে এসেছে ইন্সপেক্টর প্রসূন গাড়ি থেকে নেমে জিনিসগুলোকে দেখে তো আঁতকে উঠল ও বলে উঠল, সর্বনাশ! এগুলো তো এক্সপ্লোসিভ আরডিএক্স সহ আরও কত কী যে আছে! সরে দাঁড়ান সব
বাকিদের ততক্ষণে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে প্রসূনের কথামতো ধরা পড়া সেই রিভলভারধারীকে দিয়ে হারাধনকে ফোন করা হল বলা হল, গাড়ি লোড হয়েছে, একবার দেখে যান
সবাই গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করছে একটু পরেই হারাধন এল তবে এসেই বিপদের আঁচ পেয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করল কিন্তু ততক্ষণে লুকিয়ে থাকা পুলিশেরা গাড়ি ঘিরে ফেলে গুলি চালাতে শুরু করে ফলে একসময় হারাধন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়
পরে জানা যায় ওর আসল নাম হারাধন মণ্ডল নয়, সে-ই কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী মকবুল মিঞা দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলার উদ্দেশ্যে বিস্ফোরক জড়ো করছিল এরকম প্রত্যন্ত এলাকায় কারুরই নজর পড়বে না, এই ভরসাতেই ছিল প্রায় সফলও হয়েছিল কিন্তু সব কেঁচে দিল দোলগোবিন্দের কবিতা প্রেম
এক কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদীকে ধরিয়ে দেবার জন্যে এবং সম্ভাব্য নাশকতা থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য দোলগোবিন্দ সম্বর্ধনার জোয়ারে ভেসে গেলেন মিডিয়ায় ছবি, ইন্টারভিউ ছাপল সবার মুখেই ওঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা সরকার থেকে দোলগোবিন্দকে বড়ো পুরস্কার দেবার ঘোষণাও করা হল এতকিছু যে কবিতার কল্যাণেই হয়েছে সেটা দোলগোবিন্দ বাবাকে বুঝিয়ে বলাতে উনি শুধু হুম বলে ঘাড় নাড়লেন
তবে কিছুদিন যাবত দোলগোবিন্দ খুবই মুশকিলে পড়েছেন শোভিত শব্দের সঙ্গে মিল আছে এমন কোনও জুতসই শব্দ উনি খুঁজে পাচ্ছেন না এদিকে হারাধন থুড়ি মকবুল মিঞাও নেই যে তাকে জিজ্ঞেস করবেন কেউ কি সাহায্য করতে পারেন?

_____

অলঙ্করণঃ বিশ্বদীপ পাল

1 comment: