দশম স্থানাধিকারি গল্পঃ কবিতাঃ মানবেশ মিদ্দার



নতুন বহুবার স্কুল বদল করে দশম শ্রেণীতে পদার্পণ করেছে বেশ কয়েক বছর, কিন্তু বহু চেষ্টাতেও দশম শ্রেণী থেকে সে কিছুতেই পদোত্তোলন করতে পারল না। প্রতিবছর টেস্ট পরীক্ষাতে পা হড়কে সেই দশম শ্রেণীতেই পদার্পণ করে।
পরীক্ষার ফলপ্রকাশের আগে নতুন সমস্ত শিক্ষক মহাশয়দের বাড়িতে পদার্পণ করে এবং শিক্ষক মহাশয়ের পদস্পর্শ করে প্রতিশ্রুতি দেয়, তাকে টেস্ট পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দিলে সে অবশ্যই একটা দীর্ঘ লম্ফনে মাধ্যমিক টপকে যাবে। কিন্তু পনেরো জন শিক্ষক মহাশয় পনেরো শত চেষ্টা করেও নতুনকে টেস্ট পরীক্ষা থেকে ঠেলেঠুলে, টেনে-হিঁচড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার কাঁধে ফেলতে পারলেন না।
যাই হোক, আসল গল্পে আসা যাক। শোনা যায় জীবনে প্রচণ্ড দুঃখ না পেলে নাকি গায়ক, কবি, শিল্পী হওয়া যায় না। দশম শ্রেণীতে বসে বসে নতুনের পায়ে গেঁটে বাত হয়ে গেছে। প্রতিবছর সরস্বতী পুজোয় সে অন্তত নিজের স্কুল ছাড়া আরও দশ-বারোটি মণ্ডপে ভক্তি গদগদ চিত্তে মা সরস্বতীর পাদপদ্মে শ্বেত পুষ্পে পুষ্পাঞ্জলি দেয়, কিন্তু নতুনের কথা ভাববার সময় মায়ের নেই। তাই নতুন ঠিক করেছে, অনেক দুঃখ পেয়েছে সে, অনেক কষ্টও সহ্য করেছে, সুতরাং সে এখন কবি হওয়ার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। এবার থেকে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করবে।
বাংলার মাস্টারমশাই গোলদারবাবু একবার রেগে গিয়ে নতুনকে বলেছিলেন, “তোর মাথায় এতদিন গোবর ভরা ছিল। এখন দেখছি গোবরগুলো শুকিয়ে একবারে ঘুঁটে হয়ে গিয়েছে।”
সেই দুঃখে নতুন একবার গোলদারবাবুর বাংলা খাতায় ছয় লাইন কবিতা লিখেছিলー
গাছে গাছে সবুজ পাতা,
মাথাটা তোর বেজায় ভোঁতা।
গ্রীষ্মকালে বেজায় খরা,
মগজটা তোর মরচে ধরা।
ঘুঁটের ব্যাবসা কর না গিয়ে,
তোর মগজের গোবর দিয়ে।
গোলদারবাবু সেই কবিতা পড়ে বলেছিলেন, “তোর ওই মোটা মাথার ভিতরে অনেক কবিতা ঠাসা আছে দেখছি। একবারে গজগজ করছে কবিতা। তুই কবিতা লেখ, বড়ো কবি হবি।”
আজ দুঃখের দিনে নতুনের সেকথা মনে পড়ে গেল। সে চিন্তা করল, সুখের অভাব অর্থাৎ দুঃখ সত্যিই একজন মানুষকে বড়ো কবি করে দিতে পারে। না হলে সে কেমন করে সেদিন কবিতা লিখেছিল, যা দেখে গোলদারবাবু তার মধ্যে ভবিষ্যৎ কবির পূর্বাভাস পেয়েছিলেন? সেদিন তাহলে শিক্ষক মহাশয় তাকে বকেননি, বরং আশীর্বাদ করেছিলেন!
নতুন যে পরিমাণ দুঃখ অর্জন করেছে তা একজন উপযুক্ত কবি হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তাই নতুন আজ থেকে সংকল্প করল, সে বড়ো কবি হবে।

পরের বছর প্রত্যেক পরীক্ষায় নতুন একটা করে কবিতা লিখেছে। ইংরেজিতে সে বরাবরই ভালো, কিন্তু কবিতা লেখার মতো জ্ঞান যে তার আছে তা কখনওই সাধনবাবু ভাবেননি। নতুন লিখেছেー
The afternoon sun is yellow
like as our school bell,
A thik has soll something
and has gone to jail.
The black cloud in the sky
like as our black board,
Ghosh Babu has bought a goat
through a hundred rupee note.
কবিতার অর্থটি বাদ দিলে নতুনের যে যথেষ্ট তাল জ্ঞান, মাত্রা জ্ঞান তথা ছন্দ জ্ঞান আছে, যা কবিতার একটা বিশেষ অঙ্গ, তা ইংরেজি কবিতাতেও সে সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
জীবন বিজ্ঞানে নতুন কোনও দিন দশ নম্বরের গণ্ডী পেরোতে পারেনি। এবারের পরীক্ষায় সে গোটা খাতায় প্রশ্ন-উত্তর প্রায় কবিতাতেই লিখেছে।
ক) গাছের পাতা সবুজ কেন?
সেখানে আছে ক্লোরোফিল।
খ) লোহিত কণিকা দেখতে কেমন?
ঠিক আকাশের মতো নীল।
গ) সুষম খাদ্যের উদাহরণ দাও।
ঘ) গ্লুকোজের সংকেত কী?
দুগ্ধ হল সুষম খাদ্য।
গ্লুকোজ হল GLUCON-D.
ঙ) রক্তের কী কী গ্রুপ লেখ।
চ) কোষ প্রাচীর কোথায় আছে?
A - B - AB - O.
হয়তো চিনের প্রাচীরের কাছে।
কবিতাটা অনেক দীর্ঘ। ঘোষালবাবু কবিতায় উত্তর পড়ে খুব খুশি হয়েছেন। তিনি সঠিক উত্তরের পাশে পাশে নম্বর দিয়েছেন, কিন্তু মোট নম্বর মাত্র বারো। ঘোষালবাবুও সুন্দর ছড়া লেখেন। তিনি নতুনের খাতার শেষে লিখে দিয়েছেনー
ঠিক লিখলে নম্বর পাবে
ভুল লিখলে শূন্য,
কবিতা লিখে সুনাম পাবে
স্কুল হবে ধন্য।
ফ্রি পয়সায় অনেক সুনাম
ছাপা হলে কবিতা,
পাস করে তুই করবি কী রে?
চালিয়ে যা কবিতা।
বাংলা পরীক্ষায় শিশুশ্রমিক রচনা পড়েছে। নতুন ওই বিষয় অবলম্বনেও একটা কবিতা রচনা করেছে। গোলদারবাবু তা পড়ে অত্যন্ত বিস্মিত এবং আনন্দিত। তিনি নিজেই উদাত্ত কন্ঠে সেই কবিতা আমাদের পাঠ করে শোনালেন। নতুন লিখেছেー
শিশুশ্রমিক হল কেন?
পেটের অন্ন পায় না তায়,
পোশাকআশাক, দু’মুঠো ভাত
পড়তে গেলে পায় কোথায়?
শিশুশ্রমিক হতে পারে
কোনও শ্রমই শিশু নয়,
পড়াশুনা করলে শিশু
শ্রমও সঠিক সঠিক হয়।
অনেক মানুষ অন্ধকারে
ভাত আর কাপড় নিচ্ছে কেড়ে,
সুযোগ পেলে গাঁটির মানুষ
গাঁটের কড়ি দিচ্ছে ঝেড়ে।
ব্যবস্থাহীন নিয়মকানুন
চারিদিকে ভুরি ভুরি,
শিশুশ্রমিক বেড়েই যাবে
লোক দেখানো কারিগরি।
এই জ্ঞানগর্ভ কবিতা পড়ে কেউ আর হাসতে পারল না। এমন একটা কবিতা যে নতুন দড়াম করে পরীক্ষার খাতায় লিখে ফেলবে তা ভাবেনি। এই অপূর্ব কবিতা শুনে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করল, নতুন নির্ঘাত বড়ো কবি হবে। কেউ আটকাতে পারবে না।

নতুন বছর। পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের নবীন বরণ। ওই দিনে স্কুলের পত্রিকা প্রকাশিত হল। সেখানে নতুনের একটি কবিতা ছাপা হয়েছেーভুলভাল নাম। কবিতাটি সবারই ভালো লেগেছে পড়ে। সবার হাসির পাত্র নতুন দিনে দিনে এমন কবিতা লিখবে তা কেউ ভাবতে পারিনি। এখন সকলে নতুনকে সত্য-সত্যই নতুন নতুন কবিতা লেখায় উৎসাহিত করে। নতুনের স্কুল পত্রিকার কবিতাটা অনেকটা সুকুমার রায়ের কায়দায় লেখা। কিন্তু তা হোক। ওরকমই বা ক’জন লিখতে পারে! নতুনের হাস্যরাসাত্মক কবিতাটা পড়া যাক।

ভুলভাল নাম

কাঠও নেই বিড়ালও নেই
আছে কাঠবিড়ালি,
পা কই? টালি কই?
তবুও নাম পাটালি!
কাকে কভু দাঁড় বায়?
নাম তবুও দাঁড়কাক?
পানকৌড়ির নাম
রাখল কে জলকাক?
ডালে যদি আম দাও
সেটা হবে আমডাল,
মগে যদি ডাল ঢালো
বলবে কি মগডাল?
কালোমেঘ নাম কেন?
মেঘ আছে ওখানে?
জলপাই নাম তবুও
জল নেই সেখানে।
আম ছাড়া আমলকি
জাম ছাড়া জামরুল,
আখরোটে আখ কই?
নামগুলো সব ভুল!
পান দিয়ে পান্তুয়া
হয় নাকি কখনও!
চোখ হয় ছানাবড়া?
যত্ত সব পাকামো।
চুন দিয়ে চুনকাম
ফল দিয়ে ফল ভোগ,
তাই বলে শুধু জলে
হয় নাকি জলযোগ?
আজগুবি গোলমাল
ডামাডোল নামধাম,
রেখেছিল কোন ব্যাটা
কী বা ছিল তার নাম?
মনে হয় তার নাম
হাতিনাথ ভট্ট,
তা না হলে নিশ্চয়
উদ্ভট দত্ত।

_____

অলঙ্করণঃ শতদল শৌণ্ডিক

No comments:

Post a Comment