সপ্তম স্থানাধিকারি গল্পঃ ভীষণ গণ্ডগোলঃ রাজর্ষি বর্ধন


দেরি করে ওঠা বিপদভঞ্জনবাবুর কোনদিনও অভ্যাসে নেই, সেটা তিনি পছন্দও করেন না। প্রতিদিন ঘড়ি ধরে ছ’টায় ওঠেন―বলা ভালো, তিনি ওঠার পরই ঘড়ির কাঁটা ছ’টায় এসে দাঁড়িয়ে যায়। অ্যালার্মের তো কোনও প্রয়োজনই নেই! কিন্তু আজ যখন উঠলেন তখন ঘড়িতে সময় আটটা পাঁচ। এও কী করে সম্ভব! ঘড়িতে কোনও গণ্ডগোল হয়নি তো?
তাঁর ভুলটা ভাঙল যখন তিনি উঠে গিয়ে তাঁর হাতঘড়িতেও একই সময় দেখলেন। তাছাড়া দিনের আলোও ফুটে গেছে, আটটা যে বেজে গেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর উঠতে এত দেরি হল কেন? গতরাতেও তিনি দেরি করে ঘুমোননি। তবে?
অন্যদিন তাঁর নিয়ম হল, ঘুম থেকে উঠে চটপট দাঁত মেজে ফ্রেশ হয়ে এক গ্লাস ছাতুর সরবত খেয়ে অন্তত একশবার ডনবৈঠক দেওয়া। কিন্তু আজ কেমন যেন আলস্য ভাব তাঁর শরীরে জাঁকিয়ে বসেছে, হাত-পায়ে কোনও সাড়ই পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, তিনি যেন অন্য কারও শরীরে প্রবেশ করে ফেলেছেন।
গণ্ডগোল যে হয়েছে তা তিনি খানিকক্ষণ বাদেই টের পেলেন, যখন তিনি নিজের মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেলেন। মায়ের গলার আওয়াজ পাওয়াটা সন্তানের কাছে গণ্ডগোলের নয়, কিন্তু বিপদভঞ্জনবাবুর কাছে সেটা ভীষণরকমভাবে গণ্ডগোলের, কারণ তাঁর মা দু’বছর হল প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী, কথা বলার ক্ষমতা নেই। সেই মা-ই যখন দোতলা থেকে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “টুবলু, ব্রাশ করে নাও, স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে!” তখন তিনি আনন্দে ছুটে যাবেন, না ভয়ে ভিরমি খাবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
তাছাড়া বিপদভঞ্জনবাবুর মাতৃদেবী কোনও দিনও তাঁকে স্কুলে যাবার জন্য তাড়া দেননি। স্কুলে তিনি সময়মতোই গিয়ে থাকেন এবং কলকাতার একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রিন্সিপাল হওয়ার দরুন তাঁকে সময়ানুবর্তীতাটা বজায় রাখতেই হয়। কিন্তু মা প্রভাবতীদেবীর গলা এবং সেই সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার তাড়া দেওয়া শুনে মনে হতে লাগল, কিছু একটা গণ্ডগোল আছেই।
আর সেটা যে ভীষণরকমের আছে, ব্রাশ করার সময় আয়নায় নিজেকে দেখেই বোঝা গেল। কারণ আয়নায় যার প্রতিবিম্ব দেখছেন, সেটা তাঁরই বটে, কিন্তু কিশোর বয়সের, এখনকার নয়। নিজের কিশোর বয়সের চেহারাটা তাঁর আবছা মনে ছিল। তাই তিনি দেখে বুঝতে পারলেন, তিনি তাঁর বারো বছর বয়সে ফেরত চলে গেছেন এবং কী করে গেলেন তাও যেমন বুঝতে পারছিলেন না, তেমনই তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে হতাশও হচ্ছিলেন। প্রথমে ভাবলেন, তিনি হয়তো স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু হাতে চিমটি কেটে ব্যথা পাওয়ার পর তাঁর ভুল ভাঙল।
একরকম ঘোরের মধ্যেই তিনি দাঁতটা মাজলেন, আর পাশাপাশি তাঁর এই আচমকা খোকা বনে যাওয়াতে কী কী অসুবিধায় পড়তে পারেন তার একটা আগাম হিসেব করতে লাগলেন। প্রথম সমস্যা, তিনি এই চেহারা নিয়ে প্রিন্সিপালের চেয়ারে বসতে পারবেন না। বসলেও তাঁকে কেউ পুছবে না, বরং হাসাহাসি করবে। তাই তাঁকে বসতে হবে ছাত্রদের মাঝে। তাছাড়া সমাজে তাঁর যে সম্মান, সেটারও বারোটা বাজবে।
এইসব যখন তিনি ভাবছেন তখন পেছন থেকে প্রভাবতীদেবীর জোরালো গলা শুনতে পেলেন, “টুবলু, হারি-আপ! এখনও ব্রাশ হয়নি! আজকেও বাস মিস করবে মনে হচ্ছে।”
কথাটা শোনার পর তিনি যেন বিষম খেলেন। তাঁর মা ছিলেন গ্রামের একজন সাধারণ মেয়ে, ক্লাস এইটের পর আর লেখাপড়া এগোয়নি। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল। তাঁর মুখে এমন ইংরেজি বুলি শুনে তিনি স্বাভাবিকভাবেই হকচকিয়ে গেলেন। কিন্তু খানিকক্ষণ বাদে যখন দেখলেন যে তাঁর মা আর গ্রামের সেই শাড়ি পরিহিতা লাজুক, ঘরোয়া গৃহবধূটি নেই, বরং কুর্তা-পায়জামা পরা, চুলে বব কাট করা অতি আধুনিকা শহুরে মহিলা হয়ে গেছেন, তখন তিনি প্রায় ভিরমি খেয়ে গেলেন। আরও একটা জিনিস লক্ষ করলেন, প্রভাবতীদেবীর বয়সও যেন চল্লিশ বছর কমে গেছে!
“নাও, চটপট ব্রেকফাস্টটা সেরে নাও, দিন-কে-দিন লেটুস হয়ে যাচ্ছ!” বলে প্রভাবতীদেবীর আধুনিক সংস্করণ টেবিলের ওপর খাবার সাজিয়ে দিতে লাগলেন। বিপদভঞ্জনবাবু দেখলেন, তাতে রয়েছে জ্যাম মাখানো পাউরুটি, ডিমের পোচ আর একটা কাঁঠালি কলা। মন্দ নয়। তিনি মনে করলেন, অন্তত নিজের ছেলেবেলায় তিনি যে বাসি রুটি আর পাটালি গুড় দিয়ে প্রাতরাশ সারতেন, তার থেকে ঢের ভালো। তবুও সবকিছুই কেমন ঘোর লাগা মনে হচ্ছিল।
সেই ঘোরের মধ্যেই তিনি ব্রেকফাস্টটা সারলেন। খাওয়া যথারীতি তাঁর গলা দিয়ে নামছিল না। তাঁর হঠাৎই নিজের বারো বছরে পৌঁছে যাওয়া, তাঁর মায়ের অতি আধুনিকা হয়ে ওঠা―এসবের ব্যাখ্যা তাঁর যুক্তিবাদী মন খুঁজে যাচ্ছিল। তাঁর মনে হল, কোন এক আশ্চর্য উপায়ে তাঁর বয়সটাই কমে গিয়ে বারো বছরে এসে থেমেছে, চারপাশের বাকি সবকিছু একইরকম আছে। কারণ, তাঁর নিজের ওই বয়সের ব্যাপারগুলো সব অন্যরকম ছিল। যেমন তিনি স্কুলে যাওয়ার আগের বাড়ির পাশের পুকুরে বারোমাস স্নান করতেন। এখানে স্নানটা তাঁকে মার্বেল বসানো বাথরুমে গিজারের হালকা গরম জলে সারতে হচ্ছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার তখন ঘটল, যখন স্কুল ইউনিফর্ম পরতে গিয়ে দেখলেন, তিনি তাঁর নিজের স্কুলেরই ক্লাস সেভেনের ছাত্র হয়ে গেছেন! স্কুলের খাতায় যে নামটা দেখলেন, সেটা তাঁর পিতৃদত্ত নাম বিপদভঞ্জন চক্রবর্তী নয়, বরং বিশ্বরূপ বসুরায়, ক্লাস সেভেন ‘বি’ লেখা রয়েছে! এতকিছুর পরিবর্তন একসঙ্গে তিনি বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। সকাল থেকে একটার পর একটা কাণ্ড দেখার পর তাঁর খুব গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু প্রভাবতীদেবীর বকুনিতে তা আর হয়ে উঠল না। “দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করছ কেন? হারি-আপ! তোমার জন্যই আমার রোজ অফিসে দেরি হয়ে যায়!”
তাহলে তাঁর মা এখানে অফিসেও যায়! তিনি আর বেশি কিছু চিন্তা করতে পারলেন না, মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে। সেই অবস্থাতেই তিনি স্কুল ইউনিফর্ম পরে রেডি হয়ে বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। একটু পরেই বাস এল। নিজের স্কুলের বাস তিনি প্রথম দেখাতেই চিনতে পারলেন। কিন্তু প্রিন্সিপাল হয়ে পিঠে স্কুল-ব্যাগ নিয়ে স্কুলের বাসে ওঠাটা তিনি মোটেই পছন্দ করছিলেন না। তবুও তাঁকে উঠতে হল। কে জানে আর কী কী জিনিস তাঁর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে সেটা জানার কৌতূহলে।
বাসে উঠে তিনি যখন বসার জন্য জায়গা খুঁজছিলেন, তখন বাসের পেছন দিক থেকে আওয়াজ পেলেন, “এ বিশু, ইধর আ যা!”
‘বিশু’ নামটা শুনে অবাক হয়ে গিয়ে তিনি পেছন দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন, ক্লাস সেভেন বি-র কুখ্যাত গ্যাং একসঙ্গে বসে আছে। তিনি প্রত্যেককে চিনতে পারলেন―অভিনব মিত্র, প্রদ্যোৎ চক্রবর্তী আর জ্যোতির্ময় আঢ্য―একেকজন যেন খুদে ডাকাত! প্রায়ই তাদের নামে নালিশ জমা পড়ে, এদের দৌরাত্ম্যে টিচাররা পর্যন্ত ক্লাস নিতে ভয় পান। বিপদভঞ্জনবাবু তখনও বুঝে পেলেন না, এরা সবাই মিলে তাঁকে কেন ডাকছে!
“কী রে ওস্তাদ, নিজের গ্যাংকে চিনতে টাইম লাগছে! বাসে উঠে সিট খুঁজছিস, জানিস না কোথায় বসিস! মতলবটা কী, দলবদল করার চেষ্টা করছিস নাকি?” এদের মধ্যে সবথেকে বেশি বাঁদর যে, সেই প্রদ্যোৎ চক্রবর্তী বলে উঠল।
তার কথার সূত্র ধরে জ্যোতির্ময় নামে ছেলেটা বলল, “সিজনের মাঝখানে দলবদল করলে কিন্তু মুশকিল আছে বস! দলের সঙ্গে গদ্দারি আমরা মেনে নেব না।”
এতক্ষণে ব্যাপারটা তাঁর পরিষ্কার হল, তিনি তাঁর নতুন ছাত্রজীবনে হয়ে পড়েছেন এই শয়তান ছেলেদের গ্যাংয়ের একজন। এটা মনে করতেই লজ্জায় তাঁর মুখ লাল হয়ে উঠল। তেমন হলে তো স্কুলে তাঁর ভারি দুর্নাম! অভিভাবকেরা তাঁর নামেও হয়তো নালিশ জানান, যেমন এই ছেলেগুলোর নামেও জানান!
“হাঁ করে দেখছিস কী? বাস ছেড়ে দিয়েছে, এসে বস।” এই বলে জ্যোতির্ময় তাঁর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাঁর পাশের সিটে বসিয়ে দিল।
ব্যাপারটা আচমকা হওয়াতে তাঁর হাতের পাশাপাশি বাকি শরীরটাও ঝনঝন করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এই ছেলেদের বেয়াদবি দেখে ইচ্ছে করছিল প্রত্যেকের কানগুলো মুলে দিতে। কিন্তু সে ইচ্ছে তাঁকে দমন করতে হল, কারণ তিনি এখন প্রিন্সিপাল বিপদভঞ্জন নন বরং ক্লাস সেভেনের বিশ্বরূপ। তাই চুপচাপ দেখতে লাগলেন কী হয়।
“তারপর বলো গুরু,” অভিনব বলে ছেলেটা তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে বলল, “তোমার খরুস বাপ তোমার মোবাইলটা যে এক হপ্তার জন্য সিজ করেছিল, সেটা কি ফেরত দিয়েছে?”
“তুইও যেমন অভি, এতদিনে বিশুকে চিনলি না! থোড়াই ওর বাপের কাছে মোবাইল আছে! ওর বাপ ওকে ফেরত দেওয়ার আগেই ও সেখান থেকে ঝেপে দিয়েছে। কী, তাই তো?” বলে প্রদ্যোৎ কনুই দিয়ে ওঁকে হালকা ঠেলা দেয়।
কথাগুলো শোনার পর উনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। উনি তো স্কুলে মোবাইল ফোন আনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তার মানে এরা তাঁর আদেশ অমান্য করে মোবাইল নিয়ে আসছে স্কুলে! ব্যাপারটা তাঁর রাগে ঘৃতাহুতি পড়লেও তিনি মুখ বুজে রইলেন। এখনও যে অনেক কিছু দেখা বাকি! খরুস বাপ! কী অশ্লীল ভাষা!
“তাহলে দেখাও না গুরু! শুনেছি পাবজির আপডেটেড ভার্শনটা তুমি নামিয়েছ?” বলে বাকি তিনজন তাঁর স্কুল-ব্যাগটা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে দিল।
খানিকক্ষণ বাদে জ্যোতির্ময় তাঁর ব্যাগ থেকে যে মোবাইলটা বের করে আনল, সেটা দেখে ওঁর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে উঠল। সে বের করে এনেছে একটা দামি স্মার্টফোন! বিপদভঞ্জনবাবুর কস্মিনকালেও এমন দামি ফোন ছিল না। তিনি সামান্য কি-প্যাডওয়ালা ফোন ব্যবহার করেন। কিন্তু এখানে এই দামি ফোন তাঁর ব্যাগে কী করছে?
“উরি না! এ তো পুরো সোনা-কা-খাজানা! এ তো তোমার ফোন মনে হচ্ছে না গুরু!” প্রদ্যুৎ বলল।
“আরে, ভুলে গেলি! সেদিন আমরা যে মলটায় গেলাম স্কুল পালিয়ে, এই মোবাইলটা তো সেখানেই দেখেছিলাম! আমার তো মনে হচ্ছে এটা সেখান থেকেই ঝাপা!” গলায় উত্তেজন নিয়ে অভিনব বলে উঠল।
“বলিস কী!” প্রদ্যুৎও কম উত্তেজিত নয়। “তাহলে তো আমাদের বিশুর হাতে জাদু আছে বলতে হবে! এত লোকের মাঝে, সাথে সিসিটিভির নজর এড়িয়ে মোবাইলটা ঝেপে এনেছে, আমরা হলে কি পারতাম? সত্যিই গুরু, পায়ের ধুলো দাও! ”বলে সে সত্যি-সত্যিই তাঁর পা ছোঁয়।
“সত্যিই মাইরি, তুমি একটা জুয়েল! এখনই যেভাবে মোবাইল ঝাপা আরম্ভ করেছে, দেখো তুমি একদিন শহরের সবথেকে বড়ো মাফিয়া হবে।” বলে অভিনব তাঁর থুতুনিটা ধরে নাড়িয়ে দেয়।
“এই চুপ চুপ, সবাই শুনতে পাবে!” জ্যোতির্ময় ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারা করে।
তারপর ওরা আরও কী কথা বলে সেটা শোনার অবস্থায় তিনি থাকেন না। তাঁর ব্যাগের মোবাইলটা যে চোরাই সেটা শোনার পর থেকেই তাঁর মাথার ভেতরে চরকি পাক খাচ্ছে। ছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল, হয়ে গেলেন মোবাইল চোর। আর কত যে নিচে নামতে হবে! তিনি মাটিতে মিশে যেতে চাইলেন সে মুহূর্তে।
স্কুল এসে গেল। বাসে সবার মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। তবে বিশ্বরূপ রূপী বিপদভঞ্জনবাবু আস্তে ধীরে নামলেন। সেই চেনা স্কুলে তাঁকে নামতে হচ্ছে। কিন্তু তাঁকে স্কুলে ঢুকে প্রিন্সিপালের রুমে ঢোকার বদলে সেভেন বির ক্লাসরুমে বসতে হবে, বাকিদের সঙ্গে ক্লাস করতে হবে। আর এই অবস্থা থেকে কী করে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে, সেটাও জানা নেই। তাঁর বারবার জানতে ইচ্ছে করছিল, তিনি যদি ক্লাস সেভেনের বেঞ্চে এসে বসেন, তাহলে এই মুহূর্তে তাঁর চেয়ারে কে বসে আছে? ভাইস প্রিন্সিপাল অম্বিকেশবাবু কি?
ক্লাসরুমে গিয়ে দেখলেন সেখানেও আরেক গেরো। বিপদভঞ্জনকে বসতে হচ্ছে সেই লাস্ট বেঞ্চে, এমনকি সেই বদমাইশ ছেলেগুলোর সঙ্গে। বাকি সিটে তাঁর কোনও জায়গা হল না।  তাঁর স্কুল জীবনে তাঁকে কোনও দিনও লাস্ট বেঞ্চে বসতে হয়নি, বরাবরই ফার্স্ট বেঞ্চে বসে এসছেন। কিন্ত না চাইলেও এখন লাস্টে বসতে হচ্ছে। কিন্তু বসেও তিনি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। ব্যাগের মধ্যে চোরাই মোবাইলটা তাঁর গলার মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধছে।
হঠাৎই ক্লাসরুমে একটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। বিপদভঞ্জনবাবু দেখলেন, ক্লাস টিচার সুমিতা মিস ঢুকলেন এইমাত্র, আর তাতেই ক্লাসের সবাই যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল। এমনকি সেই বিচ্ছুগুলোর মুখগুলোও কেমন শুকিয়ে আমসি পাকিয়ে গেল। বিপদভঞ্জনবাবু শুনেছেন বটে এই সুমিতা দাসগুপ্ত মেয়েটি খুবই কড়া টিচার, ছাত্রছাত্রীদের ত্রাস। তিনি অবশ্য সেরকমই পছন্দ করেন। আজ সামনাসামনি ওর ক্লাস দেখা যাবে। কিন্তু প্রদ্যুৎ, জ্যোতির্ময়রা, যারা একটু আগে ঠাট্টা-তামাসা করছিল, তারা মিস আসাতে কেন অমন চুপ হয়ে গেল তা বুঝে পেলেন না। তিনি প্রশ্ন করলেন, “চুপ হয়ে গেলি যে?”
“তো কি ভাংড়া নাচব!” প্রদ্যুৎ ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, “তুই কী করে এত রিল্যাক্সড আছিস বুঝে পাচ্ছি না! মিসের হোমওয়ার্ক সব করেছিস?”
সুমিতা মিসের হোমওয়ার্কের কথা বিপদভঞ্জনবাবুর জানার কথা নয়। কাল অবধি তিনি ‘বি চক্রবর্তী’ই ছিলেন, নট ‘বি বসুরায়’। তাই হোমওয়ার্ক করার কথা প্রশ্নই নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে, বিশ্বরূপ হোমওয়ার্কটি করেছে কি না। কীসের হোমওয়ার্ক জানতে চাইলে অভিনব বলল, “গ্রামার বই থেকে পঞ্চাশটা স্পিচ চেঞ্জ আর ন্যারেশন দিয়েছিলেন মনে নেই? আমি আর জ্যোতির্ময় পঁচিশটা মতো করে এনেছি, প্রদ্যুৎও গোটা কুড়ি করে এনেছে। তুই ক’টা করলি?”
অভিনবের কথা শুনে তাঁর কপালে ঘাম দেখা দিল। তিনি নিজের স্কুল জীবনে হোমওয়ার্ক করতে ভুলতেন না। কিন্তু এখানে বিশ্বরূপ কী করেছে, তা দেখার জন্য ব্যাগ থেকে ইংলিশ নোটবুক বের করে খুলতেই তাঁর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে উঠল। এ খাতা তো পুরো ফাঁকা ময়দান! প্রদ্যুৎ-অভিনবরা দশ-কুড়িটা ন্যারেশন করে আনলেও তাঁর, মানে বিশ্বরূপের খাতা তো ফাঁকা! বিপদভঞ্জনবাবুর সমস্ত রাগ তখন বিশ্বরূপের ওপর গিয়ে পড়ল। ভাবলেন, একবার যদি আগের জীবনে ফিরে যান, তাহলে এই বিশ্বরূপ ছেলেটাকে টিসি দিয়ে ছাড়বেন। খুব বাজে ছেলে।
সুমিতা মিস রোল কল করা আরম্ভ করলেন। একে একে সবার নাম ডাকার পর দু’বার ‘বিশ্বরূপ বসুরায়’ ডেকেও কোনও সাড়া না পেয়ে তিনি যখন অ্যাবসেন্ট মার্ক করতে যাচ্ছিলেন তখনই বিপদভঞ্জনবাবু হাই মাই করে, “প্রেজেন্ট মিস!” বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। ক্লাসে হাসির রোল উঠল ওঁর আচরণ দেখে। বিপদভঞ্জনবাবুর দু’কান লাল হয়ে উঠল। ছি ছি! শেষমেশ কিনা তাঁরই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে দেখেও হাসছে!
“আর ইউ স্লিপিং ইন দ্য ক্লাস, বিশ্বরূপ? তুমি কি দিবাস্বপ্ন দেখছ?” সুমিতা মিস কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
বিপদভঞ্জনবাবু ঢোঁক গিলে কোনওরকমে বললেন, “নো ম্যাম!”
“আই হোপ তুমি হোমওয়ার্ক করে এনেছ। নইলে তোমার কপালে অশেষ দুঃখ আছে।” বলে মিস রোল কলে ব্যস্ত হলেন।
কিন্তু তাঁর কথাগুলো বিপদভঞ্জনবাবুর পেটে মোচড় দিতে লাগল। দুয়েকবার বাথরুমে যাওয়ার কথাও তিনি ভাবলেন। সত্যিই, হোমওয়ার্ক জিনিসটা যে এত সাংঘাতিক হতে পারে আগে মনে হয়নি। তিনি নিজেই স্কুলে ছাত্রদের নিয়মিত হোমওয়ার্ক দেওয়ার নিয়ম চালু করেছিলেন। তার নিজের তৈরি করা নিয়মে নিজেই এমনভাবে জড়িয়ে পড়বেন তা ধারণা ছিল না।
“ওয়েল,” সুমিতা মিস রোল কল করা শেষ করে ক্লাসের উদ্দেশ্যে বললেন, “আশা করি প্রত্যেকে হোমওয়ার্ক করে এনেছ।”
উত্তরে সমবেত ছাত্রছাত্রীর ‘ইয়েস ম্যাম’ ধ্বনি যেন বজ্রপাতের মতো মনে হল বিপদভঞ্জনবাবুর। বোঝাই যাচ্ছে, সবাই হোমওয়ার্ক করেই এনেছে, শুধু তিনি বাদে।
“আমার মাথায় একটা জব্বর প্ল্যান এসেছে।” পাশ থেকে প্রদ্যুৎ ফিসফিস করে বলল, “তোর দাদু বা ঠাকুমা কেউ মারা গেছে? বা ওই স্থানীয় কেউ? দূর সম্পর্কের হলেও চলবে। তাঁর আত্মার শান্তির কামনা করে তাঁকে আরও একবার মেরে দে, নইলে তুই মারা পড়বি।”
জবাবে বিপদভঞ্জনবাবু কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তক্ষুনি সুমিতা মিস বলে উঠলেন, “আমি লাস্ট বেঞ্চ থেকে শুরু করব। লেট’স বিগিন উইথ মিস্টার ডে-ড্রিমার!”
আবার ক্লাসে একপ্রস্থ হাসির রোল। বিপদভঞ্জনবাবু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চারপাশে তাকাতেই সুমিতা মিস বলে উঠলেন, “আর এ-পাশ ও-পাশ তাকিয়ে লাভ নেই বিশ্বরূপবাবু, ডে-ড্রিমার বলতে আমি তোমাকেই মিন করেছি। নাও উইল ইউ কাইন্ডলি কাম আপ উইথ ইওর নোটবুক?”
বিপদভঞ্জনবাবুর প্রাণপাখি বুঝি খাঁচা ছাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড়! তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে খাতাখানা নিয়ে মিসের কাছে যেতেই মিস ছো মেরে খাতাখানা নিয়ে উলটেপালটে দেখে বললেন, “খাতাটা তো দেখছি তোমার মগজের মতোই ফাঁকা! হোমওয়ার্ক কি উড়ে গেল?”
বিপদভঞ্জনবাবু কোনও জবাব দিতে পারলেন না। তাঁর বারবার মনে হতে লাগল, এই সুমিতা মেয়েটা যে তাঁর সামনে চোখ তুলে কথা বলতে সাহস পায় না, সবসময় আড়ষ্ট হয়ে থাকে, আজ তাঁকে এইভাবে ধমক দিচ্ছে! কী সাংঘাতিক বিড়ম্বনা!
“বলি কানে কি খোল জমেছে? কথা কানে যাচ্ছে না?” বলে সুমিতা মিস বিপদভঞ্জনবাবুর বাঁ-কানটা মুলে দিলেন। গোটা ক্লাস হেসে উঠল।
কিন্তু বিপদভঞ্জনবাবু এ অপমান কিছুতেই সহ্য করতে পারলেন না। তিনি ভুলে গেলেন, তিনি এখন বিশ্বরূপ বসুরায়। এক ঝটকায় কান থেকে ম্যামের হাতটা সরিয়ে নিয়ে তাঁর মাথায় জোরসে একটা গাঁট্টা বসিয়ে দিলেন। ক্লাসের সবাই যেন বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেল। এ কী করল সে! ক্লাস টিচারকে গাঁট্টা!
গাঁট্টাটা তিনি বেশ জোরেই মেরেছিলেন। কারণ, সুমিতা মিস মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অগ্নি দৃষ্টি হেনে তাঁকে ভস্ম করে দিতে চাইলেন। ব্যথাটা একটু কমলে তিনি বিপদভঞ্জনবাবুর ওপর ফেটে পড়লেন। “হাউ ডেয়ার ইউ! ইউ আর হিটিং অন টিচার্স হেড উইথ ইওর ফিঙ্গার (গাঁট্টার প্রতিশব্দ না পেয়ে)! আমি এখুনি প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে যাব। ইউ উইল বি রাস্ট্রেকেটেড ফ্রম স্কুল!”
বিপদভঞ্জনবাবুর রাগের পারদটা তখনও নামেনি। তিনিও পালটা বলতে চাইলেন, স্কুলের প্রিন্সিপাল তার সামনেই দাঁড়িয়ে। কিন্তু বলতে গিয়ে তাঁর ভুলটা বুঝতে পারলেন। যে বিপদে তিনি পড়তে চলেছেন, তা ভঞ্জন করা স্বয়ং ভগবানেরও সাধ্য নয়। তাঁকে রাস্ট্রিকেটেড হওয়া থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। কোনও ছাত্র বা ছাত্রী যদি এমন কোনও কুকর্ম করে যাতে স্কুলের মান নষ্ট হয়, তাহলে তাকে অবিলম্বে বহিষ্কৃত করা হবে, এমন নিয়ম তিনিই বানিয়েছিলেন।
কিছু বলার আগেই সুমিতা মিস তাঁর জামার কলার ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে প্রিন্সিপালের রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। প্রিন্সিপালের রুম তিনতলায়, তাই তাঁদের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হচ্ছিল। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে বিপদভঞ্জনবাবুর হৃৎপিণ্ডটা যেন হাই-জাম্প মারতে লাগল। তিনি ভালোই বুঝতে পারছিলেন, তাঁর স্কুলে পড়ার আজকেই ইতি। পাশাপাশি একটা অদম্য কৌতূহল হতে লাগল বর্তমান প্রিন্সিপালকে দেখার জন্য।
অচিরেই তাঁর প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল। একটা সময় তারা প্রিন্সিপালের ঘরের সামনে এসে পৌঁছালেন। সুমিতা মিস দরজা খুলতেই প্রিন্সিপাল মশাই, যিনি কিনা পিছন ফিরে বসে ছিলেন, ঘুরে তাকালেন। সঙ্গে-সঙ্গেই বিপদভঞ্জনবাবুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। প্রিন্সিপালের চেয়ারে তাঁরই কোট-টাই পরে বহাল তবিয়তে বসে আছে হারু! অর্থাৎ হারাধন মণ্ডল, স্কুলের মেন গেটের দারোয়ান। দু’দিন আগেই যাকে স্কুলের দেওয়ালে পানের পিক ফেলার জন্য কড়া ধমক দিয়েছিলেন এবং চাকরি খেয়ে নেওয়ারও ভয় দেখিয়েছিলেন। এখন সে-ব্যাটাই তাঁর চেয়ারে অমন জাঁকিয়ে বসেছে, ব্যাপারটা তাঁর হজম করতে বেশ কষ্ট হল। এতক্ষণ যা কিছু গণ্ডগোল হচ্ছিল, তা তিনি মুখ বুজে সহ্য করছিলেন। কিন্তু এ জিনিস যেন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেল।
সুমিতা মিস হয়তো বিশ্বরূপ রূপী বিপদভঞ্জনবাবুর নামে নালিশ করতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তক্ষুনি বিপদভঞ্জনবাবু লাফিয়ে প্রিন্সিপাল সাজা হারাধনের কলার ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, “হতভাগা! কোন সাহসে তুই আমার চেয়ারে বসেছিস? এত বড়ো আস্পর্ধা!”
হারাধন চমকে উঠল। বিপদভঞ্জনবাবু কলারটা এতটাই জোরে চেপে ধরেছিলেন যে তার দম আটকে আসছিল। সে কোনওমতে বলল, “হোয়াট’স হ্যাপেনিং হিয়ার! দিস চাইল্ড হ্যাজ গন ম্যাড! গেট হিম আউট অব মাই সাইট!”
অশিক্ষিত হারাধনের মুখে ইংরেজি শুনে বিপদভঞ্জনবাবুর মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। হারাধনের গালে ঠাটিয়ে একটা চড় কষিয়ে বললেন, “মুখে ইংরেজির ফুলঝুরি ফুটছে! এক অক্ষর ইংরেজি লেখার ক্ষমতা নেই, দিনরাত খালি খৈনি ডলছে, আবার মুখে ইংরেজি! তোর ফাজলামি আমি বের করছি।” বলে তিনি কলারটা আরও চেপে ধরলেন।
হারাধন কোনওমতে, “হেল্প! সিকিওরিটি!” কথাগুলো বলতে পারল। সে বুঝে উঠতে পারছিল না, একটা ক্লাস সেভেনের বাচ্চার গায়ে এত জোর আসে কী করে!
“বটে, সিটিওরিটি ডাকবি! নিজে যে সিটিওরিটি, সেটা ভুলে গেছিস? আমার চেয়ারে বসে র‍্যালা বেড়ে গেছে!” বলে তিনি হারাধনের বুকের ওপর চেপে বসলেন।
পেছন থেকে সুমিতা মিস তাঁকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁর পিঠে কিল-চড়-ঘুসি সব এক এক করে পড়তে লাগল, কিন্তু তাঁর শরীরে যেন আসুরিক শক্তি ভর করেছিল, তিনি হারাধনের কলারটা ধরে ক্রমাগত ঝাঁকাতে লাগলেন। হঠাৎই দেখলেন, হারাধনের শরীরটা আস্তে আস্তে একটা কোলবালিশ হয়ে গেল! আর আশেপাশের চেয়ার-টেবিল সব ভোজবাজির মতো উবে গেলে তিনি দেখলেন তিনি তাঁর বিছানাতেই শুয়ে আছেন, হাতে কোলবালিশ ধরে!
তার মানে গোটাটাই একটা স্বপ্ন ছিল! উহ্‌, কী ভয়ানক দুঃস্বপ্ন! হঠাৎ খোকা বনে যাওয়াতে তিনি ভয়ানক বিপদে পড়েছিলেন। সবকিছু আগের মতো আছে কি না সেটা দেখার জন্য লাফ দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতে এবং নিজের সেই চেনা টাকমাথা আর ঝাঁটার কাঠির মতো গোঁফ দেখে আশ্বস্ত হলেন। সব ঠিকই আছে, কোনও গণ্ডগোল নেই। পাশাপাশি তাঁর এটাও মনে হল, তাঁর করা স্কুলের কয়েকটা নিয়ম খুবই কড়া হয়ে গেছে। অতটা না হলেও চলতে পারে।

_____

অলঙ্করণঃ শতদল শৌণ্ডিক

No comments:

Post a Comment