তৃতীয় স্থানাধিকারি গল্পঃ সীতার আশীর্বাদঃ গোবিন্দ মণ্ডল



তারপর রামচন্দ্র তো বানর সৈন্য নিয়ে বন-বাদাড় ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলেছেন। বানর সৈন্যরা আগুপিছু স্লোগান দিতে দিতে চলেছে–রামাচন্দ্রজি কি, জয়! লক্ষ্মণজি কি, জয়! দুনিয়ার বানর, এক হও, এক হও। নারী ছিনতাইকারীর কালো হাত, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। বানর বাহিনীর স্লোগান, হুপ-হাপ দুড়দাড় শব্দে পাখিরা সব ভয়ে উড়ে পালাচ্ছে। বন্যজন্তুরা লেজ তুলে কে কোনদিকে ছুটছে তার ইয়ত্তা নেই। একজনকে ছুটতে দেখে অন্যজন ছুটছে। দিকে দিকে বনের মধ্যে রাষ্ট্র হয়ে গেলーআগ লাগা, আগ লাগা, পালাও, পালাও, জলদি পালাও! আবার কেউ শুনেছে এক আজব জন্তু আয়া, উনকো আঁখসে আগ নিকালতা হ্যায়। পালাও পালাও, জলদি পালাও।
অন্যদিকে রামচন্দ্র তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভারতের দক্ষিণদিকের একেবারে শেষপ্রান্তে উপনীত হলেন। স্থলভাগ শেষ। সামনে অগাধ জলরাশি। রামচন্দ্রের কপালে চিন্তার ভাঁজ। লক্ষ্মণ হতাশায় একটা ঢিপির উপর বসে চিন্তা করছে আর গতদিনের শূলপক্ব হরিণের মাংস দাঁতের ফাঁকে বেঁধে ছিল সেটা তিরের ফলা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করার চেষ্টা করছে। মহারাজ সুগ্রীবও চিন্তায় মগ্ন। চিন্তায় তিনি বারবার নিজের লেজের গোড়া চুলকোচ্ছেন। বানর সৈন্যরাও স্থানে স্থানে সব জড়ো হয়ে বসে আছে। তারাও সব চিন্তাকুল। দুয়েকজন চপল স্বভাব বানর পিছন দিকে একে অন্যের লেজে লেজ জড়িয়ে টানাটানি করছে।
চিন্তামগ্ন রামচন্দ্র বহুক্ষণ পরে নীরবতা ভঙ্গ করে ডাক দিলেন, “মিত্র সুগ্রীব!”
সুগ্রীব এগিয়ে এলেন। রামচন্দ্র বললেন, “আমাদের তো এভাবে বসে থাকলে চলবে না। যা হোক কিছু একটা ব্যবস্থা করুন। আমি যে আর ভাবতে পারছি না। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।”
এসব কথা বলতে বলতে রামচন্দ্র ‘হায় সীতা, হায় জানকী, কোথায় তুমি প্রিয়তমা!’ ইত্যাদি বাক্য সহযোগে বিলাপ ও ক্রন্দন করতে লাগলেন। সীতার বিরহে রামের বিলাপ ও ক্রন্দন দেখে সুগ্রীবেরও মনে পড়ে গেল তাঁর সদ্য বিবাহিত পত্নী তারার কথা। বন্ধুত্বের প্রতিদান দিতে বিয়ে করেই নতুন বউকে ঘরে রেখে রামের সঙ্গে সীতার খোঁজে সদলবলে বেরিয়ে পড়েছেন সুগ্রীব। এখন রামের পত্নী বিরহে সুগ্রীবের মনেও তারার বিরহ জেগে উঠল। তাঁরও তখন কান্না পেল। রামচন্দ্র এবং সুগ্রীব পরস্পরের গলা জড়িয়ে ধরে উভয়ে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে লাগলেন। মানুষ ও বানরের কান্নার সেই অদ্ভুত মেলবন্ধনের শব্দে বানর সৈন্যদের কিচিরমিচির থেমে গেল।
দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে আর সমুদ্রের শীতল বাতাসে লক্ষ্মণের দু’চোখ একটু ঢুলে আসছিল। হঠাৎ এই অদ্ভুত শব্দে তারও চটকা দিয়ে ঘুম ভেঙে গেল। সে তাড়াতাড়ি এক হাতে পিছনের কাপড়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে এল। তারপর অতি কষ্টে রামচন্দ্র ও সুগ্রীবকে পরস্পরের থেকে আলাদা করে সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে গেল। দু’জনের চোখে, মাথায়, ঘাড়ে, পিঠে ক্রমাগত জলের ঝাপটা দিয়ে তাঁদেরকে শান্ত করল লক্ষ্মণ। রামচন্দ্র তবুও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন দেখে লক্ষ্মণ তার মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করল। লক্ষ্মণ জানে, রামচন্দ্রের আত্মসম্মান বেশ টনটনে। কেবল মাঝে মাঝে সেটা একটু নেতিয়ে পড়ে। লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের সেই আত্মসম্মানকে জাগিয়ে তুলতে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে বেশ একটু উষ্মার সঙ্গে বলল, “ছিঃ দাদা! এমন বাচ্চাদের মতো যেখানে সেখানে কান্নাকাটি করো, আমার একদম ভাল্লাগে না। এইসব বানরেরা দেখছে। এরপর এই কথা দেশের বানরেরা শুনলে কী বলবে বলো দিকিনি?”
একথায় রামচন্দ্রের কান্না একটু থামল। তখন লক্ষ্মণ আবার বলল, “ইয়ে হম লোগো কা প্রেস্টিজ কা মামলা হ্যায়! ঘরের বউ লোকে তুলে নিয়ে গেছে–তার একটা বিহিত করা দরকার। সেসব না করে বসে বসে কাঁদছ? তোমাকে নিয়ে আর পারি না বাপু! নাও, এবার ওঠো।”
অন্যদিকে সুগ্রীব তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন আর থেকে থেকে নাক ঝাড়ছিলেন। লক্ষ্মণ রামের কান্না থামিয়ে এবার সুগ্রীবকে বলল, “ছিঃ, মহারাজা সুগ্রীব! আপনি কান্নাকাটি করে এভাবে বানর হাসাচ্ছেন!”
সুগ্রীবের কান্না এতে একেবারে থেমে গেল। তিনি চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন কেউ দেখছে কি না। যেসব বানররা এতক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, তারা সুগ্রীব তাকাতেই যে যার মতো চোখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে শুরু করল। যেন কিছু হয়নি, তারা কিছু শোনেনি, দেখেনি। লক্ষ্মণ তখন সুগ্রীবকে বলল, “নিন, এবার উঠুন। উঠে ঠাণ্ডা মাথায় সাগর পার হওয়ার উপায় বাতলান।”
কান্না থামিয়ে উঠে গিয়ে সুগ্রীব সাগর থেকে ভালো করে চোখমুখ ধুয়ে এসে গদা কাঁধে নিয়ে কয়েকবার পায়চারি করলেন। তারপর বড়ো উঁচু একটা পাথরের উপর বসে গদা দিয়ে নিচের ছোটো পাথরে ঠুক ঠুক করে ঠুকতে ঠুকতে চিন্তা করতে লাগলেন। চিন্তা করতে করতে সুগ্রীব হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “জয় শ্রীরাম!”
সুগ্রীবের এই চিৎকারে বানররাও মহা আনন্দিত হয়ে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
সুগ্রীব রামচন্দ্রকে গিয়ে বললেন, “পেয়ে গেছি।”
এই কথা কানে যেতে না যেতে বানর সৈন্যরা সব আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। যাক, তবে ঝামেলা মিটেছে। সীতাকে পাওয়া গেছে। আর বনে-বাদাড়ে ঘুরতে হবে না। এই আনন্দে বানররা কেউ পাথরের উপর ডিগবাজি খেতে লাগল; কেউ পাথর ঠেলে গড়িয়ে দিল। কেউ কেউ আবার হিসিতে হিসিতে কাটাকাটি খেলা শুরু করল। কোনও বানর লেজ দিয়ে গাছের ডাল জড়িয়ে দোল খেতে লাগল। কেউ বা গাছের ডালে দোল খেতে খেতে অন্যের কান ধরে টান দিল, অমনি সে তার পিছনে ছুটল। চারদিকে হুপ-হাপ দুড়দাড় কিচকিচ খি-খি ক্যা-ক্যা বহুরকম শব্দে আর দারুণ বিশৃঙ্খলায় ভরে গেল। রাম-লক্ষ্মণ দু’হাত তুলে বানরদেরকে বারবার শান্ত হতে বলছেন। কিন্তু কার কথা কে শোনে! তখন সুগ্রীব এক বৃহৎ শিলাখণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে কাঁধে গদা নিয়ে বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়লেন, “খামোশ!”
অমনি বানরেরা যে যেভাবে ছিল সেভাবেই থেমে গেল। চারদিকে নিস্তব্ধ। তখন সুগ্রীব রামচন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মিত্র রামচন্দ্র, আমি এতক্ষণ চিন্তা করে একটা উপায় পেয়ে গেছি। আমার মতে সীতাকে অনুসন্ধান করতে সকলের একসঙ্গে সাগর পার হওয়ার দরকার নেই। সকলের একসঙ্গে সাগর পার হওয়া একটা বিরাট হ্যাপা। তারপর বহুত মেহনত করে সাগর পার হয়েও যদি সীতার খোঁজ না পাই তাহলে সবটাই পণ্ডশ্রম হবে। তার চেয়ে আগে একজনকে পাঠানো হোক। সে খবর নিয়ে আসুক। খবর পেলে তার পরের ব্যবস্থা না হয় পরে নেওয়া যাবে।”
প্রস্তাবটা রামচন্দ্রের মনে ধরল। কিন্তু কথা হচ্ছে, কে যাবে এই খবর আনতে? এই বিরাট সাগর কে পার হবে? রামচন্দ্রের সৈন্যদের মধ্যে বানররা যেমন ছিল, তেমনি ছিলেন ভালুকদের রাজা জাম্বুবান। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, “আমি যেতে পারি। এই সাঁতার দিয়ে যাব আর আসব।”
লক্ষ্মণ তৎক্ষণাৎ জাম্বুবানের কথা নাকচ করে দিল। লক্ষ্মণ হাড়ে হাড়ে জাম্বুবানকে চেনে। পথে ঘাটে কখন যে তাঁর ভালুক-জ্বর আসবে তার ঠিক নেই। তাছাড়া ভালুকের যা মাছের লোভ! সমুদ্রে কত মায়া মৎস ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাম্বুবানকে ভুলিয়ে নিয়ে যেতে কতক্ষণ? লক্ষ্মণ তাই সরাসরি না করে দিয়ে মিষ্টি করে জাম্বুবানকে বলল, “আপনি অতিশয় প্রবীণ আর বিজ্ঞ ব্যক্তি, মহারাজ জাম্বুবান। আমরা এই সময় আপনাকে একটুও দল ছাড়া করতে চাই না। আমার মতে বানরেরা ভালো লাফাতে-টাফাতে পারে। ওরাই কাজটা করুক।” এই বলে লক্ষ্মণ সুগ্রীবের দিকে তাকাল।
সুগ্রীব তখন মনে মনে ভাবছেন, রামচন্দ্রের বউ খুঁজতে গিয়ে যদি মাঝখানে সমুদ্রে পড়ে বেঘোরে মরি তবে আমার বউটার কী হবে? তবে মনে যাই ভাবুন, মুখে সেই ভাবনাকে একটুও প্রকাশ করলেন না সুগ্রীব। তিনি বললেন, “কথাটা মন্দ নয়। কিন্তু…” এই বলে কিছু সময় থেমে সুগ্রীব নিজের লেজের গোড়া চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “আমি ভাবছি, আমি যদি যাই তবে আমার এই দলবল সামলাবে কে? একটু আগে দেখছিলেন তো কেমন বেয়াদব সব! একটু যদি মানুষের কথা শোনে!”
সুগ্রীবের কথাটা রামচন্দ্রের মনে ধরল। তিনি বললেন, “না না না, আপনার গিয়ে কাজ নেই। আপনি আপনার দল থেকে কাউকে পাঠান।”
একথা বলতেই সুগ্রীব বানর সৈন্যদের দিকে তাকালেন। অমনি বানরদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। যে সামনে ছিল সে ঠেলে-ঠুলে পিছনে যাওয়ার চেষ্টা করল। কেউ আবার সুগ্রীবের নজর এড়াতে অন্যের আড়ালে নিজের মুখ লুকাল। সুগ্রীব তাঁর পূর্বের পাথরের উপর দাঁড়িয়ে বানরদের উদ্দেশ্যে বললেন, “অ্যা-টেন-শন!”
সঙ্গে সঙ্গে বানরদের ঠেলাঠেলি বন্ধ হয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে বানররা সব সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সুগ্রীব সারবদ্ধ বানরদের মাঝে গদা হাতে প্রবেশ করলেন। বানরদের বুক ঢিপ ঢিপ। সুগ্রীব বেছে নিলেন নল, নীল, গয়, গবাক্ষ, অঙ্গদ এবং হনুমানকে। ইচ্ছে, এদের মধ্যে একজন ব্যর্থ হলে অন্যজনকে পাঠাবেন।
সুগ্রীব যাদেরকে বেছে নিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ পাশ কাটানোর জন্য নানারকম অজুহাত খুঁজতে লাগল। নীল ইতিমধ্যে খোঁড়াতে শুরু করল। বলল, তার পায়ে ভীষণ ব্যথা। লাফাতে পারবে না। গয় বলল, কাল বনের এক বিষফল খেয়ে তার পেট ছেড়ে দিয়েছে, পেটে ভীষণ ব্যথা করছে। অন্য বানরদের সঙ্গে লেজে লেজে জড়াজড়ি খেলতে গিয়ে গবাক্ষের লেজ একটু ছড়ে গিয়েছিল। সুগ্রীবকে সেটা দেখিয়ে সে বলল, “মেরা লাঙ্গুল মে থোড়া ইনফেকশান হ্যায়। আমার যাওয়াটা কি ঠিক হবে?”
নল কোনও অজুহাত খাড়া করতে পারল না। ভয়ে ভয়ে সে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেল। সুগ্রীব তার পিঠ চাপড়ে সাহস দিলেন এবং লেজ কামড়ে দিলেন, যাতে পথে কোনও অশুভ শক্তির নজর না পড়ে।
নল রেডি হয়েছে লাফানোর জন্য। পিছন থেকে বানররা সব তালে তালে হুপ হুপ শব্দ করছে নলকে উৎসাহ দিতে। সুগ্রীব কাউন্ট করছেন। ওয়ান… টু… থ্রি বলতে যাবেন অমনি সমুদ্রের ঢেউয়ের একটা ঝাপটা এসে নলকে নাকানি চোবানি খাইয়ে একেবারে তাল্লা মেরে ফেলে দিল। নল সমুদ্রের নোনা জল খেয়ে পেট ঢোল করে খি খি করে নাকমুখ ঝাড়তে ঝাড়তে আঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনওরকমে ডাঙায় উঠে এল।
এরপর এগিয়ে এল অঙ্গদ। কিন্তু সেও ব্যর্থ হল। লাফ দিয়ে কিছু পথ গিয়ে সে ঝপাং করে সমুদ্রে পড়ে গেল এবং কোনও প্রকারে সাঁতার দিয়ে সে ডাঙায় উঠে হাঁপাতে লাগল। রাম-লক্ষ্মণ-সুগ্রীব সকলের মুখ শুকিয়ে গেল। তখন এগিয়ে এল পবন পুত্র হনুমান।
হনুমান বুঝেছিল, লাফিয়ে দূরে যেতে গেলে কোনও নিচু জায়গা থেকে লাফালে চলবে না। সে একটা পাহাড়ে উঠল। একটা উচ্চ পার্বত্য বৃক্ষকে দেখিয়ে সে সুগ্রীবকে তার পরিকল্পনার কথা জানাল। সুগ্রীব সেই বৃক্ষে আরোহণ করে গাছের ডগায় লেজ পেঁচিয়ে ঝুলে পড়লেন। বানরেরা সুগ্রীবের হাত ধরে সুর করে টানতে লাগল নিচের দিকেーহেঁইয়ো মারো-হেঁইয়ো, জোরসে মারো-হেঁইয়ো, আউর থোড়া-হেঁইয়ো। সুবৃহৎ পার্বত্য বৃক্ষ ধীরে ধীরে নুইয়ে পড়ল। সুগ্রীবের লেজ টনটন করছে। আর একটু টান দিলেই হয়েছে আর কী। ফস করে টিকটিকির লেজের মতো লেজটা তার গোড়া থেকে খসে পড়বে। হনুমান নুইয়ে পড়া গাছের মাথায় চড়ে বসে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
সঙ্গে সঙ্গে সুগ্রীব লেজের বাঁধন খুলে দিলেন। অমনি নুইয়ে পড়া গাছটা তিরের বেগে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। আর হনুমান সেই বেগে চরকিবাজির মতো ঘুরতে ঘুরতে একেবারে লঙ্কায় গিয়ে পড়ল।

লঙ্কায় গিয়ে কীভাবে সীতার সঙ্গে হনুমানের মোলাকাত হল তা সকলের জানা আছে। হনুমানের সাক্ষাৎ পেয়ে সীতার মন আশা-আনন্দে দুলছে। হনুমানও সীতার কুটিরে পরম আদরে আছে। মাঝে মাঝে হনুমান খবর নিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য সীতার অনুমতি চায়। তবে হনুমান এইরকম যাই যাই করে বটে, কিন্তু যায় আর না। সীতা এই ক’দিনে লক্ষ করেছেন, তাঁর সহচরী হিলিম্পার সঙ্গে হনুমানের বেশ মাখো মাখো ভাব। হনুমান আর হিলিম্পাকে একসঙ্গে উদ্যানে প্রায়ই ঘুরতে দেখা যায়।
একদিন সীতা দেখেন উদ্যানে গাছের নিচে বসে বসে হনুমান তার লেজের ডগা দিয়ে হিলিম্পার কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সীতার মনে সন্দেহ প্রবল হল। তিনি একদিন হিলিম্পাকে ডেকে বললেন, “হিলিম্পে! আমাদের হনুমানকে তোর কেমন লাগে?”
হিলিম্পা কোনও কথা না বলে পায়ের বড়ো বড়ো নখ দিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে লাগল। হিলিম্পার মনের কথা বুঝতে আর বাকি রইল না সীতার। এরপর হনুমানকে কুটিরে ডাকলেন সীতা। নানারকম গল্প করতে করতে সীতা হনুমানকে বললেন, “দেখো বাবা হনুমান, তুমি এই যে বনে-বাদাড়ে ঘোরো, একা একা থাকো, এসব ঠিক নয়। অসুখটা বিসুখটা আছে, তখন কে তোমাকে সেবা করবে? সেবাযত্ন করা, সুখদুঃখের দুটো গল্প করা–এসবের জন্য একটা লোক তো চাই। বলি কী, তুমি একটা বিয়ে করো।”
সীতার কথার শুনে হনুমান বলল, “মা, বে করতি তো ইচ্ছে হয়, কিন্তু যা সব দেখতিছি তাতে বুজতি পারতিছি যে বে করার অনেক হ্যাপা আছে। এই দেখো না, আমাগো রাজা সুগ্রীব–সে তার নিজির দাদার বউডারে বে করার জন্যি দাদারে মারি ফিলেছে। তারপর ধরেন গে এই আপনার কথা। বাসায় একলা পাইয়ে রাবণ ধুরে নে আল। বে করলি এই সব হাজার ঝামেলা। তার চে মা, এই ভালো আছি। তোমারে উদ্ধার করি প্রভু রামচন্দ্র রাজা হলি আমার আর কের চিন্তা? আর গল্পগুজবের জন্যি…” এই পর্যন্ত বলে হনুমান চুপ করে গেল এবং একবার তার কান, একবার বগল চুলকাতে লাগল।
সীতা হনুমানের মনোভাব বুঝে বললেন, “ঠিক আছে, বাবা হনুমান। আমি হিলিম্পাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তোমার মন চাইলে তুমি তার সঙ্গে প্রাসাদের পাশের কদলী বনে বসে বসে গল্প কোরো।”
সীতার কথা শেষ হতে না হতেই হনুমান ‘জয় শ্রীরাম’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আমি তবে এক্ষুনি প্রভু রামচন্দ্রের কাছে ফিরি যাচ্ছি। সত্বরেই তোমারে উদ্ধার কুরে নে যাব আমরা।”
হনুমানের কথায় সীতা মুচকি হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, হনুমান এতদিন কেন যাই যাই করেও যেতে চাইছিল না।
তবে হনুমান যেতে চাইলেও সেদিন তার যাওয়া হল না। কেন হল না সে সীতা আর হিলিম্পা জানে। সে যাই হোক, সেদিন যেতে না পেরে হনুমান শেষবারের মতো ছদ্মবেশে আরেকবার রাবণের গোপন সব কুটির দেখতে গেল। ঘুরতে ঘরতে সে একটা বন্ধ ঘরের সামনে এল। বাইরে থেকে ঠেলা দিলেও কিছুতেই তার দরজা খোলে না। হনুমান তখন ‘জয় শ্রীরাম’ বলে মারল এক লাথি। অমনি দরজা হাট হয়ে খুলে গেল। দরজা খুলে যেতেই হনুমান দেখল, কয়েকজন রাক্ষস একগাদা রঙবেরঙের ফল ঘিরে বসে আছে। হনুমান মনে মনে ভাবল, ব্যাটারা, চুরি করে ফল খাওয়া হচ্ছে! দেখাচ্ছি মজা। এই বলেই সে একেকটাকে চক্ষের নিমেষে লেজে পেঁচিয়ে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলল। এরপর হনুমান বটফলের মতো লাল একটা বড়ো ফল হাতে তুলে নিল। বহু বন ঘুরেছে হনুমান, কিন্তু এমন আজব ফল তার চোখে পড়েনি। ফলটাকে সে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারল না। তখন সে সেটাকে মুখে পুরে যেই না এক কামড় দিয়েছে অমনি দ্রাড়ম করে বিকট একটা শব্দ হল। তার পরের কথা হনুমানের আর জানা নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন হনুমানের সারা শরীরে প্রবল যন্ত্রণা। গায়ের চামড়া পুড়ে গিয়ে ছাল ছাড়ানো কুকুরের মতো অবস্থা তার। আসলে ফল ভেবে হনুমান যাতে কামড় দিয়েছিল সেটা ছিল একটা বিরাট বোমা। সেই বোমা ব্লাস্ট করে হনুমান রাবণের গোলাবারুদ সব ধ্বংস করেছিল। বাল্মীকি রামায়ণের আদিতে এসবের উল্লেখ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সংস্করণে বাহুল্য জ্ঞানে এসব কথা পরিত্যক্ত হয়। সে যাই হোক, সীতার সেবায় হনুমান সুস্থ হল। গায়ে আবার লোম গজাল। কিন্তু মুখে আর লোম না গজানোয় মুখটা কালো হয়ে রইল। হনুমান তখন সীতাকে বলল, “এই কালো মুখ নে আমি কী করি ফিরি যাব? আমি এখানে গাছের ডালে ল্যাজে ঝুলে মরব সে বরং ভালো, তবুও আর ফিরি যাব না।”
সীতা হনুমানকে অনেক বোঝালেন। তারপর তাকে এক মুঠো বারুদ পোড়া ছাই দিয়ে কানে কানে একটা পরামর্শ দিলেন। হনুমান সীতাকে প্রণাম করে আকাশ পথে রওনা দিল। সাগর পার হয়ে হনুমান যখন ফিরে এল তখন রাত্রি আড়াই প্রহর। সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফিরে এসে হনুমান প্রথমে তার প্রত্যেক ঘুমন্ত আত্মীয়ের মুখে একটু করে বারুদ পোড়া ছাই দিল। কাজ শেষ করে সে বাইরে এসে জয়ধ্বনি দিল। অমনি সকলের ঘুম ভেঙে গেল। হনুমান সকলকে জানাল, সব খবর কুশল। আজ সে ক্লান্ত। কাল কথা হবে।
পরদিন সকালে রামচন্দ্র উঠে অপেক্ষা করছেন। বানররাও তাড়াতাড়ি উঠে হাতমুখ ধুয়ে রেডি হচ্ছে। আর হনুমান মটকা মেরে শুয়ে থেকে মাঝে মাঝে মুখের ঢাকনা সরিয়ে বাইরের দিকে দেখছে। হঠাৎ বানরদের মধ্যে ছুটোছুটি হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। হনুমান মুখের ঢাকনা সরিয়ে দেখল, তার সব আত্মীয়দের মুখ কালো হয়ে গেছে। যতই তারা মুখে জল দিচ্ছে ততই মুখ কালো হচ্ছে এবং সেই আতঙ্কে তারা ছুটোছুটি ও চিৎকার করছে। হনুমান তখন বাইরে বেরিয়ে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
অমনি বানর সৈন্য সব মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
সুগ্রীব তো নিজের লেজটাকে মাথার উপর দিয়ে বাঁকিয়ে এনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছেন। তখন হনুমান বলল, “মহারাজ সুগ্রীব ও আমার বানর ভাই সব। তোমরা অকারণে ভয় আর লজ্জা পাচ্ছ।”
হনুমান যখন একথা বলছে তখন সুগ্রীব লেজটা একটু সরিয়ে এক চোখ দিয়ে হনুমানকে দেখার চেষ্টা করছেন। অন্যান্য বানররাও হনুমানকে আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখছে। কিন্তু হনুমান কলার পাতার ঝালর দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে। সেই অবস্থায় সে বলছে, “আমি সীতা মায়ের দর্শন শুধু পাইনি, তাঁর আশীব্বাদও সঙ্গে আনিছি। মায়ের আশীব্বাদ, আমার সব জ্ঞাতিগুষ্ঠির মুখ কালো হবে। আর তাইতেই লোকে আমাগো রামভক্ত হিসেবে চেনবে ও পুজো করবে। তাই এই কালো মুখের জন্যি লজ্জা পাইও না। এই দেখো আমার মুখও কালো।” এই বলে হনুমান নিজের মুখ থেকে ঝালরটা সরিয়ে ফেলল।
অমনি হনুমানের সমস্ত আত্মীয়-বন্ধু একত্রে বলে উঠল, “জয় শ্রীরাম!”
তুমুল সেই হর্ষধ্বনির মধ্যে হনুমান কেবল ফিসফিস করে বলল, “জয় মা সীতা!”

_____

অলঙ্করণঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

No comments:

Post a Comment