চতুর্থ স্থানাধিকারি গল্পঃ লক্ষ্মী লাভঃ ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য


লক্ষ্মী লাভ

ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য



বীরশিবপুরে বিপিন হালদার এক মস্ত বিপদে পড়েছেন। আসছে মঙ্গলবার এই সময় ঘরে ঘরে সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়বে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয়, আর এরই মধ্যে কিনা হালদারবাড়ির পাঁচ-পাঁচটি নারকেলগাছ থেকে সমস্ত নারকেল একেবারে বেমালুম হাওয়া! এমনকি কচি কচি ডাবগুলো পর্যন্ত চুরির হাত থেকে রেহাই পায়নি! সকলের নাকের ডগা দিয়ে এই এত্ত নারকেল বেপাত্তা হয়ে গেল আর কিনা কাকপক্ষীতেও টের পেল না কিচ্ছুটি? বিপিন হালদারের বারবার মনে হল নারকেল তো নয়, যেন তাঁর মানসম্মানখানাই চোর বাবাজীবন ছ্যাঁদায় বেঁধে নিয়ে চম্পট দিয়েছে।
বীরশিবপুরে হালদারবাড়ির লক্ষ্মীপুজো প্রতিবছরই বেশ ধুমধাম করে সাড়ম্বরে পালন করা হয় বা বলা ভালো, তেমনটাই ফি-বছর হয়ে আসছে আর কী। গ্রামের বাড়িতে তাঁর এই লক্ষ্মীপুজোয় শহর থেকে মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনি সবাই চলে আসে বিজয়া দশমীর দিন। এখানেই গাঁয়ের আর পাঁচ ঘর মানুষের সঙ্গে বিজয়ার মিষ্টিমুখ সেরে কোমর বেঁধে সকলে নেমে পড়ে মা লক্ষ্মীর আবাহনে। বিপিনবাবু মানে পাড়ার আর সকলের হালদারদাদুর অর্ধাঙ্গিনী হালদারদিদার নারকেল নাড়ু শুধু পরিবারের মধ্যে নয়, পাড়ার সকলের কাছেই যাকে বলা যায় একেবারে মোস্ট ওয়ান্টেড জিনিস। সেই দেবভোগ্য নারকেল নাড়ু তৈরিই হয় হালদার-বাগানের পাঁচটি গাছের নারকেল দিয়ে। লক্ষ্মীপুজোর দিন দুয়েক আগে লোক লাগিয়ে পাড়ানো হয় গাছভর্তি সব ঝুনো নারকেল। বাজারের নারকেল বিপিনদাদুর বিচারে পুজোয় দেবার উপযুক্তই নয়। আর সত্যি বলতে কী, পাড়ার সকলে তাঁর সঙ্গে এই বিষয়ে একমত যে হালদার-বাগানের নারকেলের জাতই আলাদা। যেমন তালমিছরির মতো মিষ্টি জল, তেমনই ক্ষীরের মতো মিষ্টি নারকেলের শাঁস। বয়সের দরুন দিদা এখন আর একা হাতে নাড়ু পাকিয়ে উঠতে পারেন না। তাই দিদার তদারকিতে আর রেসিপি মেনে গ্রামের মেয়ে-বৌদের হাতে হাতে তৈরি হয় এই মহাপ্রসাদ। লক্ষ্মীপুজোর একদিন আগে থেকেই বাড়ির চারপাশ নারকেল পাক দেবার সুবাসে ম-ম করতে থাকে। গন্ধে গন্ধে ভিড় জমায় বাড়ির সুমুখে রথতলার মাঠে খেলতে আসা কচিকাঁচার দলও। এবার কিনা সেই নারকেলের ভাণ্ডারেই চুরি! একে তো চুরি বললেও কম বলা হয়। এ যেন একেবারে গলা কেটে ডাকাতির মতোই জঘন্য অপরাধ। নেহাত বিপিনবাবু শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাই এসব নিয়ে পুজোর মধ্যে থানাপুলিশ করে আর ঝামেলা বাড়াতে চাননি। এ যাত্রা তাই বাজারের গুটিকতক কেনা নারকেল দিয়েই নমঃ নমঃ করে পুজোর কাজ সারবেন ঠিক করেছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল মানে বিজয়া দশমীর দিন। পাড়ার দুর্গাঠাকুর যাত্রা করিয়ে বেশ রাত করে ক্লান্ত দেহে ফিরেছিলেন পাড়ার সকলে। আজ শুক্রবার সকালে বিপিন হালদার মাঠ থেকে প্রতিদিনের মতোই প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরে আসার পথে রীতিমতো ডেকে দাঁড় করিয়ে বিষয়টা নজরে আনেন পাশের বাড়ির কালীবাবু অর্থাৎ কালীপ্রসন্ন চক্কোত্তি। ঠোঁটের কোণে এঁটো হয়ে ঝুলে থাকা তেরছা হাসিখানা দেখে ভালোই মালুম হচ্ছিল যে তিনি মনে মনে বিপিনবাবুর নারকেল বিলুপ্তির ব্যপারটা বেশ আয়েশ করে উপভোগ করেছেন। যদিও মুখে বেজায় দুঃখ প্রকাশ করলেন এমন মর্মান্তিক ঘটনার জন্য।
বীরশিবপুরের লক্ষীপুজো সেই বাপঠাকুদ্দার আমল থেকেই প্রতিবছর হালদার আর চক্কোত্তিーএই দুই পরিবারকে কেন্দ্র করে দারুণভাবে জমে ওঠে। আগে চক্কোত্তিদের পুজোয় জাঁকজমক কিছু কম হলেও হালের কিছু বছরে দেখতে দেখতে হালদারগিন্নির নারকেল নাড়ুকে জোর টক্কর দিতে শুরু করেছে চক্কোত্তিগিন্নির তুলাইপাঞ্জি চালের ভুনি খিচুড়ি। তবে ধারে ভারে এখনও জনপ্রিয়তার নিরিখে টলমল করতে করতে হলেও সেরার শিরোপাটুকু ধরে রেখেছে বা বলা ভালো রেখেছিল এই হালদারবাড়ির নারকেল নাড়ুই। এই সত্যটা মন থেকে কোনও দিনই মেনে নিতে পারেননি কালী চক্কোত্তি আর তাঁর পরিবার।
যথারীতি প্রতিবছরের মতো এবছরও বিজয়া দশমীর পরদিন অর্থাৎ শুক্রবার সন্ধেবেলা হালদারবাড়িতে সপরিবারে শহর থেকে মেয়ে-জামাই এল। সেখানে নারকেলের জন্য শোক সত্ত্বেও ছিল ভালো আয়োজন। মনের দুঃখ মনেই চেপে বিপিনবাবু সকাল সকাল ফর্দ মিলিয়ে থলে ভরে বাজার করে এনেছিলেন। হালদারগিন্নিও জামাইয়ের পছন্দমতো একে একে তৈরি করেছিলেন চালকুমড়োর পুর ভাজা, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক, চিংড়ি দিয়ে মোচার ঘণ্ট, চিতল মাছের মুইঠ্যা, গোপালভোগ আর পায়েস। সেদিন রাতে তিনতলার ঘরে বসে পাত পেড়ে কব্জি ডুবিয়ে জামাই বাবাজীবন এতসব লোভনীয় খাবারদাবার খেতে খেতে একসময় বেজায় হাঁফিয়ে উঠল। তারপর যেই না পায়েসভর্তি জামবাটিতে মুখ দিতে গেল, হঠাৎই তারস্বরে কানে ভেসে এল একদম ছোটো কোনও বাচ্চার পরিত্রাহি কান্নার আওয়াজ। আচমকা সেই আওয়াজ শুনে জামাই বাবাজীবন ঘাবড়ে গিয়ে বেমক্কা বিষম খেয়ে গেলেন। হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল জামবাটি ভর্তি পায়েস। বাড়ির আর সকলে ব্যস্ত হয়ে উঠল অবস্থা সামাল দিতে। সকলেই একমত হল যে এমন বেয়াক্কেলে আওয়াজটা বেশ কাছ থেকেই হয়েছে। যদিও এত রাতে আওয়াজটা কোথা থেকে হয়েছে সেটা বোঝা গেল না কিছুতেই। নাতি-নাতনিরা সামনেই ছিল। তারা অত ছোটো নয়, আর কাঁদলে তো দেখতেই পেত সবাই। বাইরে আলো নিয়ে বাড়ির চারপাশেও ক’জন মিলে খুঁজে দেখল, কিন্তু কোনও বাচ্চাকেই চোখে পড়ল না কারুর।
এরপর গোটা তিনদিন ধরে এইরকম বিভিন্ন সময় একইভাবে বারবার সদ্যোজাত কোনও বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেতে লাগল হালদারবাড়িতে। কিন্তু বারবার বাড়ির সকলে মিলে চিরুনি তল্লাশি চালালেও কে কাঁদছে কিছুতেই বোঝা গেল না সেটা। হালদারবাড়ির সকলেই এরকম একটি অলুক্ষণে অদ্ভুতুড়ে ঘটনায় বিমর্ষ হয়ে পড়ল। কখনও মাঝরাতে তো কখনও ভোররাতে, কখনও ফুল তুলতে গিয়ে বা কখনও বাসন মাজতে গিয়ে, কখনও ঘুমের মধ্যে তো কখনও কাজের ফাঁকে আচমকা একটানা কিছু মুহূর্ত কান্নার আওয়াজ বারবার দিশাহারা করে দিতে লাগল হালদার পরিবারের সদস্যদের। উৎসবের মরসুমেও পরপর দুটো এমন ধারার ঘটনা ঘটতে দেখে চিন্তায় ভাবনায় নাওয়া খাওয়া মাথায় উঠল সবার। লক্ষীপুজোর আগে এমন সব আজব ব্যাপার গ্রামের কেউই শুভ লক্ষণ বলে মেনে নিলেন না। গ্রামের প্রবীণ মানুষ বলাইবাবু বা হালদারদাদুর বন্ধু গোবিন্দবাবু পরামর্শ দিলেন যে অসূয়া কাটাতে যাগ-যজ্ঞ করার।
এইরকমভাবেই মাঝের ক’টা দিন তালেগোলে কেটে গেল সকলের। লক্ষীপুজোর দিন এবার হালদারদাদুর পুজো কোনওরকমে সম্পন্ন হল। গ্রামে অভিবাবকদের নিষেধের কারণে কচিকাঁচার দলও ভয়ে ভয়ে ভিড় বাড়াল না হালদারবাড়িতে। যদিও নাড়ু হয়েছিল প্রায় পরিমাণ মতোই, কিন্তু বাড়ির কিছু লোক, আত্মীয়স্বজন আর দু-চার ঘর প্রতিবেশী ছাড়া খাবার তেমন লোক হল না মোটে। পুজোতে নিয়মমাফিক করা হয়েছিল সব কিছুই, কিন্তু এত সব কিছু ঘটে যাবার পর হালদারবাড়ির উৎসবের সুরটাই যেন কেটে গিয়েছিল।
বীরশিবপুরের এবারের লক্ষীপুজোর অঘোষিত বিজয়ী পরিবার তাই চক্কোত্তিবাড়ি। সেখানে এবছর আরও বড়ো আকারে হই-হই করে পালিত হয়েছিল লক্ষীপুজো। কালীবাবুর ছেলে লোকাল মিডিয়াতে তাদের বাড়ির পুজো নিয়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ব্যবস্থাও করেছিল। কালীবাবুর গিন্নির হাতে তৈরি খিচুড়ি ভোগ মাতিয়ে দিয়েছিল গোটা পাড়া। খিচুড়ির রেসিপি এবং পুজোর ফটো ফলাও করে বাড়ির নতুন প্রজন্ম প্রচার করেছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রসাদের বড়ো বড়ো থালা পৌঁছে গিয়েছিল পাড়ার সকলের বাড়ি। এক বড়ো কাঁসার থালা ভর্তি খিচুড়ি ভোগ এসেছিল হালদারবাড়িতেও। এবার সেই সঙ্গে নতুন একটা মিষ্টি যোগ হয়েছিল তাদের বাড়ির ভোগের মেনুতে, কেশর নারকেল বরফি। আবির্ভাবেই নাকি বাজিমাত করে দিয়েছিল সেটি। প্রসাদের থালায় রাখতে না রাখতেই নিমেষের মধ্যে ফুরিয়ে গেছিল তা। পাড়ার অনেকেই দেরি করে যাওয়ায় বরফি না পেয়ে দুঃখ করেছিলেন বেশ।
যাই হোক! লক্ষ্মীপুজো কেটে গেছে দিন দুই হল। হালদারবাড়িতে কান্নার শব্দ এখন আর পাওয়া যায় না। পাড়ায় এখনও কান পাতলেই শোনা যায় চক্কোত্তি পরিবারের সুখ্যাতি।
বিপিনবাবু বাজারে যাচ্ছিলেন সেদিন। হঠাৎ তাকে দেখে দৌড়তে দৌড়তে এসে হাজির হল পাড়ার কালু মল্লিক। কালু ছোটোখাটো ইলেকট্রিক দোকানে টুকটাক কাজ করে। বাকি সময় পয়সার গন্ধে গন্ধে পাড়ায় রাজনীতি থেকে শুরু করে ক্লাবের পুজো, ফুটবল খেলা সবেতেই অংশ নেয় সে। অল্পসল্প হাত টানেরও দোষ আছে তার। আর সেই কারণে হাজতবাসও হয়েছে কয়েকবার। অভাবের সংসার তার। বাবা গত হয়েছে সেই কোন ছোটোবেলায়। আপন বলতে আছে শুধু মা আর ছোটো বোন। কালুই কষ্টেসৃষ্টে দেখে তাদের।
বাজারে সেদিন বিপিনবাবুকে দেখেই একটা ঢিপ করে প্রণাম করে বলল কালু, “দাদু, একটা দরকারি কথা ছিল। যদি অভয় দেন তো বলি।”
বিপিনবাবু বুঝলেন নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে ব্যাটার। তাই শ্যামলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফুলকপি পছন্দ করতে করতে দায়সারাভাবে বললেন, “বলো কী বলতে চাও।”
কালু খানিক আমতা আমতা করে মাথা চুলকে বলল, “আসলে হয়েছে কী, আমার মোবাইলটা আপনার বাড়িতে ফেলে গেছি গত হপ্তায়।”
এমন কথা শুনে অবাক হয়ে বিপিনবাবু সবে শুধোতে যাবেন ব্যাপারখানা, সেই সুযোগ তাঁকে না দিয়েই বিপিনবাবুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কালু আবার বলতে শুরু করল, “তাহলে আর বলছি কী দাদু! আমি তো না পেয়ে পেত্থমে নিজের জিনিসপত্তর নেড়ে-ঘেঁটে খুঁজে খুঁজে হাল্লা হয়ে গেলাম। সেদিনের কেনা এসমার্ট ফোন বলে কথা! এখনও সব টাকা শুধতে পারিনি। এরই মধ্যে হারিয়ে ফেললে বড্ড বেপদ হয়ে যাবে। তারপর একদিন রাত্তির বেলা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে শুয়ে শুয়ে হঠাৎ মনে পড়ল, আরে! সেখানা তো সেদিন আপনার বাড়ির দক্ষিণদিকের একদম শেষ নারকেলগাছের কোটরে গুঁজে রেখে চলে এসেছি। তা যদি আজ্ঞা হয় তো একবার উঠে পেড়ে আনি সেখানা?”
কথাটা শুনে চমকে উঠলেন বিপিনবাবু। কালুর মুখের দিকে চেয়ে কড়াভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “তা তুমি বাপু আমার বাড়ির নারকেলগাছে উঠে কী করছিলে শুনি? আমি তো নারকেল পাড়ানোর জন্য তোমাকে কখনও ডেকেছি বলে মনে পড়ছে না।”
কালু প্রশ্নের এমন বাউন্সার সামলাতে সামলাতে মিনমিন করে বলল, “এই তো দাদু। আপনাদের না, মনে বড্ড সন্দ। এত কিছু জেনে কী করবেন বলুন তো? আপনারা পাড়ায় আছেন অ্যাদ্দিন। কোনওদিন কি পর ভেবেছি আপনাদের? জন্ম ইস্তক আপনার বাড়ির গাছগুলোকেও তো নিজের বলেই ভেবে এসেছি। তাই তো এবারেও লক্ষ্মীপুজোয় আর কেউ তেমন না গেলেও আমি কিন্তু পেট ভরে খেয়ে এসেছি দিদিমার হাতে পাকানো নাড়ু।”
হাত-পা নেড়ে আরও অনেক কিছুই উস্টুম-ধুস্টুম বকছিল কালু। এদিকে বিপিনবাবুর কাছেও নারকেল চুরির ব্যাপারটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বিপিনবাবু ফের একবার হাতের লাঠিখানা উঁচিয়ে ধমকে উঠলেন কালুকে।
ইতিমধ্যে হাটের মাঝে গোলমাল শুনে ধীরে ধীরে লোক জমতে শুরু হয়েছে। সকলের সামনে বিপিনবাবুর জেরার মুখে পড়ে অবস্থা বেগতিক বুঝে কালু কেঁদেকেটে বলে উঠল, “মায়ের নামে দিব্যি করেছিলাম। আপনেরা রাখতেও দিলেননি সে কথাখান। এখন হালদার কত্তা যদি দুটো নাড়ু দেন খেতে, তবে ভরসা পেয়ে দিব্যি ভাঙি। শুনেছি মায়ের প্রসাদ খেয়ে প্রিতিজ্ঞে ভাঙলে নাকি পাপ হয় না।”
বিপিনবাবু সজ্জন ব্যক্তি। কালুকে বললেন পিছু পিছু তাঁর বাড়ি আসতে। তারপর তাকে বাড়ির দাওয়াতে বসিয়ে নাড়ু, জল খাওয়ালেন। ততক্ষণে রগড় দেখতে একপাড়া লোক হুমড়ি খেয়ে জড়ো হয়েছে হালদারবাড়ির উঠোনে।
খান বিশেক প্রসাদী নাড়ু আর একঘটি জল খেয়ে লম্বা একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে কালু বলা শুরু করল, “আসলে দোষখানা সম্পূর্ণ আমার নয়। আপনার প্রেতিবেশী  চক্কোত্তিবাবু দুই হাঁড়ি চাল দিয়ে মহালয়ার দিন সওদা করেছিলেন আপনার বাড়ির ওই পাঁচ গাছ নারকেল পাড়িয়ে নেবার। নবমীর রাতে আমি সেইমতো কাজও করি। কিন্তু ভুলের ফেরে মোবাইলখানা ট্যাঁক থেকে খুলে সেই যে কোটরে গুঁজেছিলাম, সেটা নামার সময় ওখানেই ফেলে রেখে চলে আসি। সত্যি বলতে সেই সময় চিন্তায়, ভয়ে আর তাড়াহুড়োতে মোবাইলের কথা খেয়ালও ছিল নি। তারপর দশমীর দিন চক্কোত্তিবাবুর নির্দেশমতো বীরশিবপুর ছেড়ে পাশের গাঁয়ে মামাবাড়িতে গিয়ে গা ঢাকা দেই। দিন পাঁচেক পর লক্ষ্মীপুজোর দিন আমি বাড়ি ফিরি। মোবাইলটার কথা ততদিনে মনে পড়তেই খুঁজেছি অনেক। প্রথম প্রথম অন্য কোনও ফোন থেকে নম্বর লাগালে ওদিকে শব্দ শোনা যেত। এখন দু’দিন হল তাও বাজে না। তখন বুঝলাম আসলে ওর দম শেষ। হঠাৎ কানে এল যে পাড়ায় সকলে বলাবলি করছিল যে আপনাদের বাড়িতে নাকি ক’দিন যাবত যখন তখন বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এদিকে আমার মোবাইলেও তো ফোন এলে তেমনই আওয়াজ হত। তখনই মনে পড়ল যন্তরটার গাছে রেখে আসার কথাখানা। এদিকে মনে পড়লেও কীভাবে সেটা ফেরত পাব, মাথায় আসছিল নি কিছুতেই। আজ আপনাকে বাজারে দেখে শেষমেশ কপাল ঠুকে সাহস করে পেড়েই ফেললাম কথাটা।”
কালুর স্বীকারোক্তি শুনে জোর গুঞ্জন শোনা গেল ভিড়ের মধ্যে। এদিকে কালু তখন কথা শেষ করে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হালদারদাদুর মুখের দিকে। দাদু বললেন, “গাছে উঠে এখনই পেড়ে আনো তোমার মোবাইল। কিন্তু মায়ের নামে শপথ করে তার আগে সকলের সামনে বলতে হবে তোমাকে যে তুমি এই কাজ আর কখনও করবে না।”
কালু এবারে বিপিনবাবুর কথায় সম্মতি জানিয়ে সব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিপিনবাবুর সামনে কৃতজ্ঞ চিত্তে হাতজোড় করে দাঁড়াতেই বিপিনবাবু বললেন, “আজ থেকে আমার লক্ষ্মীমায়ের নিত্যপুজোর আয়োজন আর বাগান দেখাশোনার ভার তোমাকে দিলাম। তার বিনিময়ে উপযুক্ত মাসোহারা দেব তোমাকে যাতে আর কোনও অভাব না থাকে তোমাদের পরিবারে। দেখো বাবা, আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা কোরো না যেন। সে আমি এই বুড়ো বয়সে আর সইতে পারব না।”
কালু এবার কেঁদে ফেলল আনন্দে। লোকমুখে গোটা ঘটনার খবর পৌঁছল দেওয়াল লাগোয়া কালী চক্কোত্তিদের বাড়িতেও। এতসব কিছু জানাজানি হয়ে যাবার পর পাড়ায় তাঁদের আর মুখ দেখানোর জো রইল না। ওই বাড়ির সকলে কিছুদিন কাকপক্ষীর মুখ দেখাও বন্ধ রাখলেন। তারপর এক হপ্তার মাথায় হঠাৎই একদিন কেউ কিছু টের পাবার আগেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন। আর এরপর থেকে শুধু পরের বছর নয়, প্রতিবারের মতো লক্ষ্মীপুজোর সেরার শিরোপা জিতে নিল হালদার পরিবার। তোমরাও চাইলে সামনের বছর আসতে পারো হালদারবাড়ির লক্ষ্মীপুজোয়। সপরিবারে সকলের আমন্ত্রণ রইল।

_____


অলঙ্করণঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

1 comment:

  1. দারুণ লাগল, খুব সুন্দর হয়েছে।

    ReplyDelete