প্রবন্ধঃ বিখ্যাত যত আদিম মানুষ - তন্ময় ধর



মানব বিবর্তনের ইতিহাস বড়ো রোমাঞ্চকর। তেমনই বিস্ময়কর আদিম মানবদের ফসিলে লুকিয়ে থাকা তাদের জীবনযাত্রার কাহিনি, তাদের জন্ম-মৃত্যু-সংগ্রামের ইতিহাস। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া এরকমই কয়েকটি বিখ্যাত আদিম মানবের ফসিলের কথা লিখলেন তন্ময় ধর


এল গ্রেসিও


সেটা ১৯৪৪ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষলগ্নে জার্মান সৈন্যবাহিনী বুলগেরিয়ার আজমাকায় ট্রেঞ্চ খুঁড়তে গিয়ে খুঁজে পেল একটুকরো জীবাশ্মーএক পাটি দাঁত। নেহাতই ক্ষুদ্র এই দাঁতের পাটি যে মানবজাতির বিবর্তনের ইতিহাসকে কামড়ে ধরে রেখেছে, তা তখন কেউ বোঝেনি। দাঁতের মালিকের নাম রাখা হয়েছিল গ্রেসিওপিথেকাস। জীবাশ্মের আর কোনও অংশ পাওয়া যায়নি বলে বহুকাল অবহেলার অন্ধকারে পড়ে ছিল ওই আদিমানবের আত্মপরিচয়। সম্প্রতি ২০১৭ সালে তার অঙ্গসংস্থানবিদ্যার বিশ্লেষণ করে তাকেই মানবজাতির আদিপুরুষ মেনে নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ৭২ লক্ষ বছরের পুরনো ওই জীবাশ্ম। বানরজাতীয় প্রাণী থেকে দ্বিপদ মানুষের উত্থানের সূচনা গ্রেসিওর দাঁত ধরেই। সে অর্থে ওই দাঁতই মানবজাতির ‘আক্কেল দাঁত’। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০০২ সালে আবিষ্কৃত সুবিখ্যাত ‘ট্রাকিলোস পদচিহ্ন’ও নাকি এল গ্রেসিও-র জাতভাইদেরই। দাঁত পাওয়া গিয়েছে বলে দাঁতের ক্ষয় দেখে বোঝা গিয়েছে গ্রেসিওপিথেকাসের খাদ্যাভ্যাসও। মূলত সাভান্না তৃণভূমির শুষ্ক ও শক্ত শাকপাতা আর ফলমূলই ছিল তার খাদ্যতালিকায়।


তাউমাই


২০০১ সালে মধ্য আফ্রিকার জুরাব মরুভূমি থেকে শুধুমাত্র তার মাথার খুলির কিছুটা অংশ, চোয়ালের হাড়ের পাঁচ টুকরো এবং কয়েকটি দাঁত পাওয়া গিয়েছিল। আর তাই নিয়েই হৈচৈ শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রত্নতত্ত্ববিদ মহলে। কেননা, মানুষের দু’পায়ে চলার ইতিহাস নাকি শুরু হয়েছিল তার কয়েকটি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই। উত্তেজিত বিজ্ঞানীমহল প্রায় ৭০ লক্ষ বছরের পুরনো এই আদিমানবের ডাক নাম রেখেছেন ‘তাউমাই’ যার অর্থ ‘আশার আলো’। এর বয়স এবং খুলির গঠন প্রত্নতত্ত্ববিদদের ওই আলো জুগিয়েছে। বিবর্তন কালপঞ্জিতে শিম্পাঞ্জি এবং মানুষের বিভাজনকালের সাথে চমৎকারভাবে মিলে গিয়েছে তাউমাই মানবের সময়কাল। এর লম্বাটে মাথা, উঁচু ভুরুর হাড়, ঢালু মুখমণ্ডল, দাঁতের যে বৈশিষ্ট্য দেখা গিয়েছে, তা আদিম মানবের অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে আলাদা। খুলির তলার ভিতের মাঝামাঝি মহাবিবরের অবস্থান মানুষ ছাড়া অন্য যেকোনও প্রাইমেটের চেয়ে ওদের অনেক সামনের দিকে থাকায় প্রত্নবিজ্ঞানীরা তাউমাই মানবকেই দু’পায়ে পথ চলার পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করলেন। তাউমাই মানবের ছোটো শ্বদন্ত আর দাঁতে পুরু এনামেল থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝেছেন যে, তার খাদ্যতালিকায় নরম ফলমূল খুব একটা পাত্তা পেত না। শক্ত এবং শুকনো ফল ও বৃক্ষতন্তুই ছিল তার প্রধান আহার্য।


আর্ডি


ইথিওপিয়ার আবাশ নদীর ধারে শুকনো জমিতে আর্ডির হাতের হাড়ের টুকরো খুঁজে পেয়েছিলেন এক কলেজ ছাত্র ইয়োহান্নেস। পরে বিজ্ঞানী টিম হোয়াইট জীবাশ্মের অন্যান্য অংশগুলি খুঁজে পান এবং বিজ্ঞানী আওয়েন লাভজয় সেই প্রত্নমানবীর পুনর্নির্মাণ করেন। তার বিজ্ঞানসম্মত নাম রাখা হল ‘আর্ডিপিথেকাস রামিডাস’। স্থানীয় ইথিওপিয়ান ভাষায় তার অর্থ ‘ভূমিচারী শিকড়’, সে শিকড় মানব বিবর্তনের। ডাকনাম ‘আর্ডি’। বিস্তর চর্চা হয়েছে আর্ডির জীবাশ্ম নিয়ে। আর্ডির জীবনচর্চারও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তার দৈহিক উচ্চতা ছিল ৩ ফুট ১১ ইঞ্চি, ওজন ছিল প্রায় ৫০ কিলোগ্রাম। পায়ের আঙুলের হাড়ের গঠন দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সে মাটিতে হাঁটতে যেমন স্বচ্ছন্দ ছিল, তেমনি ছিল গাছে চড়তে ওস্তাদ। দাঁতের এনামেল দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, আর্ডির মূল খাদ্য ছিল ফল এবং দানাশস্য।


লীতোলি পদচিহ্ন


তানজানিয়ার লীতোলিতে আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের গায়ে ৩৭ লক্ষ বছরের পুরনো এই মানব পদচিহ্ন প্রত্নবিজ্ঞান মহলে অত্যন্ত সমাদৃত ও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৬ সালে প্রত্নবিজ্ঞানী মেরী লীকি ওই পদচিহ্নগুলি আবিষ্কার করেন। ৭৫ ফুট জুড়ে বিস্তৃত ওই চরণরেখায় কোনও একজন আদিমানবের পদচিহ্ন নয়, অন্তত তিনজনের পদচিহ্ন রয়েছে। একই পথে একজন আরেকজনকে অনুসরণ করে সম্ভবত তারা জলের খোঁজে চলেছিল। এই আদিম মানবগোষ্ঠীর বিজ্ঞানসম্মত নাম রাখা হয়েছে, ‘অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস’। পূর্ণবয়স্ক দু’টি মানুষের পদচিহ্নের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ২১.৫ সেন্টিমিটার এবং ১৮.৫ সেন্টিমিটার। তা থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ওই আদিমানবদের দৈহিক উচ্চতা অন্তত ১.১৫ মিটার থেকে ১.৫৬ মিটারের মধ্যে ছিল।


লুসি


১৯৭৬ সালে ইথিওপিয়ার হাদারে আবিষ্কৃত এই জীবাশ্ম আলোড়ন ফেলেছিল প্রত্নবিদমহলে। এই আদিমানবীর জীবাশ্মের নাম রাখা হয়েছিল ‘লুসি’। স্থানীয় আমহারিক ভাষায় যার অর্থ ‘তুমি বিস্ময়কর’। মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এত বিখ্যাত বোধহয় আর কোনও জীবাশ্ম হয়নি। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে লুসির প্রতিরূপ নিয়ে অনেক প্রদর্শনী হয়েছে, বই লেখা হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘরে ঘরে সুপরিচিত নাম হয়ে গিয়েছে লুসি। লুসিও ‘অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস’ গোষ্ঠীরই সদস্য। প্রায় কয়েকশো হাড়ের টুকরো পাওয়া গিয়েছে লুসির। মাথার খুলির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং সমস্ত দাঁতসহ নিচের চোয়াল পাওয়া গিয়েছে। আর্গন-আর্গন ডেটিং পদ্ধতিতে লুসির বয়স নির্ধারিত হয়েছে প্রায় ৩২ লক্ষ বছর। লুসির দেহ পুনর্নির্মাণ করে পুরাতত্ত্ববিদেরা বলছেন যে, লুসির পাকস্থলী ছিল বিশালাকৃতি এবং সে প্রচুর পরিমাণে শাকপাতা জাতীয় খাবার খেত। তার শরীরের রক্তপ্রবাহের ৬০ শতাংশ ব্যয়িত হত শুধু পৌষ্টিকতন্ত্রেই। মস্তিষ্কে ১০ শতাংশের বেশি রক্ত পৌঁছাত না, তাই মস্তিষ্কের তেমন বিকাশ হয়নি। বারো বছর বয়সে গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে তার মৃত্যু হয়।


তাউং শিশু


১৯২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার চুনাপাথরের খনিতে খনি শ্রমিকেরা এই জগদ্বিখ্যাত খুলিটি খুঁজে পান। বিজ্ঞানী রেমন্ড ডার্ট ৭৩ দিন ধরে অতি যত্নে সেই খুলিটি পরিষ্কার করেন। সুবিখ্যাত ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রে ডার্ট এই আদিমানবের বিজ্ঞানসম্মত নাম দেন ‘অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস’। মস্তিষ্ক-বিশেষজ্ঞ ডীন ফক ‘তাউং’ জীবাশ্মকে বলেছেন ‘বিংশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক জীবাশ্ম’। তাউং শিশুর দাঁতের পাটিতে দুধের দাঁত দেখে প্রথমে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন, তার বয়স ছ’বছর। পরে দাঁতের এনামেল বিশ্লেষণ করে তার বয়স দাঁড়াল চারে। শিশুটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৩ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং দেহের ওজন ছিল ১১ কিলোগ্রাম। সম্ভবত ঈগল বা অন্য কোনও শিকারি পাখির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিল শিশুটি। তার চোখের নিচে শিকারী পাখির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে তাউং জীবাশ্মের বয়স নির্ধারিত হয়েছে প্রায় ২৫ লক্ষ বছর।


দমানিসি মানবী


পশ্চিম-মধ্য এশিয়ার জর্জিয়ার রাজধানী ৎবিলিসি থেকে সামান্য দূরে দমানিসি প্রত্নস্থল। সেখানেই খননকার্য চালাতে গিয়ে ২০০১ সালে মিলেছিল এই মাথার খুলি। প্রায় ১৮ লক্ষ বছরের প্রাচীন এই আদি মানবকিশোরীর বিজ্ঞানসম্মত নাম রাখা হয়েছিল ‘হোমো ইরেক্টাস জর্জিকাস’। কিন্তু তার খুলি ও দাঁত পর্যবেক্ষণ করে প্রত্নবিজ্ঞানী মহলে তীব্র তর্কবিতর্ক শুরু হয় তার প্রজাতিগত অবস্থান নিয়ে। কেউ বলেন, দমানিসি মানবী হোমো এর্গাস্টার। কেউ বলেন, এটি বিশুদ্ধ হোমো ইরেক্টাস। কেউ আবার একে হোমো হ্যাবিলিস এবং হোমো ইরেক্টাসের মিশ্র প্রজাতি বলেছেন। বর্তমানে দমানিসি আদিমানবীকে পৃথক এক প্রজাতি ‘হোমো জর্জিকাস’ নামে নথিভুক্ত করার দাবি উঠেছে। করোটি ও দাঁতের গঠন থেকে এই মানবকিশোরীর বয়স নির্ণীত হয়েছে ১৫ বছর।


নাট ক্র্যাকার মানব ‘জিঞ্জ্যান্থ্রোপাস’


১৯৫৯ সালে তানজানিয়ার সুবিখ্যাত ওল্ডুভাই গর্জে এই জীবাশ্মটি আবিষ্কার করেন বিখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ মেরী লীকি। সাড়ে সতেরো লক্ষ বছরের পুরনো এই আদিমানবের নাম রাখা হয়েছিল ‘জিঞ্জ্যান্থ্রোপাস’ পূর্ব আফ্রিকার স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ ‘প্রিয় বালক’। তার ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল ‘নাট ক্র্যাকার ম্যান’ বা ‘বাদামপেষা মানুষ’। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘প্যারান্থ্রোপাস বয়সেই’ বা ‘অস্ট্রালোপিথেকাস বয়সেই’। বিজ্ঞানী মহলে সে অবশ্য জিঞ্জ ডাকনামেই পরিচিত। জিঞ্জের খুলিতে পেষক দাঁত বড়ো এবং শক্তিশালী হওয়ায় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, শুকনো ফলমূলই ছিল তার প্রধান খাদ্য। এই জীবাশ্মের আবিষ্কারের কাহিনি বড়ো রোমাঞ্চকর। আবিষ্কারের দিনটিতে, অর্থাৎ ১৯৫৯ সালের ১৭ জুলাই মেরী লীকি নিজের দলবল ছাড়া একাই, শুধুমাত্র দুটি ডালমেশিয়ান কুকুর সঙ্গে নিয়ে ঢুকেছিলেন ওল্ডুভাই গর্জের ওই গুহায়। আর গুহার দেয়াল থেকে খসে পড়ে মেরীর হাতে যেন নিজে থেকেই ধরা দিয়েছিল জিঞ্জ।


টুর্কানার বালক


কেনিয়ার টুর্কানা হ্রদের কাছে এই বিখ্যাত আদিমানব জীবাশ্মটি আবিষ্কৃত হয়। ১৬ লক্ষ বছরের পুরনো এই কঙ্কালই এযাবৎ প্রাপ্ত আদি মানবের কঙ্কালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গতম। প্রত্নতত্ত্ববিদ রিচার্ড লীকি এবং তাঁর সহযোগীরা ১৯৮৪ সালে এটিকে খুঁজে পান। টুর্কানার জীবাশ্ম একটি বালকের কঙ্কাল, যার বয়স ছিল ৭ থেকে ১১ বছরের মধ্যে। কঙ্কালটির উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। ওর আনুমানিক ওজন ছিল প্রায় ৬৮ কিলোগ্রাম। প্রাপ্ত ১০৮টি হাড় থেকে টুর্কানা বালকের শরীরের গঠন, দু’পায়ে হাঁটাচলা, অন্যান্য কাজকর্ম ইত্যাদি সুচারুভাবে নির্ণয় ও পুনর্নির্মাণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাচীন অস্ট্রালোপিথেকাস থেকে এর শরীরের সার্বিক গঠন অনেক আলাদা। আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সের কাছাকাছি এই আদিমানবের বিজ্ঞানসম্মত নাম রাখা হয়েছে ‘হোমো এর্গেস্টার’। জন্মগত একাধিক অসুখ ছিল টুর্কানা বালকের। হাড়ের গঠন থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, বামনত্ব বা স্কেলিটাল ডিসপ্ল্যাসিয়া ছিল তার। দাঁতের অসুখ ছিল। মেরুদণ্ডের গঠন থেকে এটা পরিষ্কার যে, কোনও দুর্ঘটনার ফলেই ওই বালকের মৃত্যু হয়েছিল।


জাভা ম্যান


জাভার ত্রিনিল দ্বীপের সোলো নদীর তীরে ১৮৯১ সালে আবিষ্কৃত জাভা ম্যানের জীবাশ্ম গোটা পৃথিবীকে আলোড়িত করেছিল। মাথার খুলির টুকরো, একটি দাঁত এবং উরুর হাড়ーজাভার আদিমানবের অবশেষ ছিল এটুকুই। আবিষ্কারক ইউজিন দুবোয়াঁ এই আদিমানবের নাম রাখেন ‘অ্যান্থ্রোপোপিথেকাস ইরেক্টাস’, পরে যার নাম রাখা হয় ‘পিথেকান্থ্রোপাস ইরেক্টাস’। যার বয়স তখন নির্ধারিত হয়েছিল অন্তত ৪ লক্ষ বছর, পরে উন্নত পরীক্ষানিরীক্ষায় তার বয়স নির্ধারিত হয়েছে ৭-১০ লক্ষ বছর। অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ছিল এই আদিমানব জীবাশ্ম আবিষ্কার। ইউজিন দুবোয়াঁ মিলিটারি ডাক্তারের চাকরি নিয়ে কয়েকজন যুদ্ধবন্দী সৈনিক এবং মিলিটারি ডাক্তারের সহায়তায় ত্রিনিল দ্বীপের পাণ্ডববর্জিত স্থানে যেভাবে এই আবিষ্কার করেন তা সিনেমার কাহিনিকেও হার মানাবে। উনবিংশ শতকের শেষভাগে, মানব-জীবাশ্ম আবিষ্কারের সেই আদিপর্বে তখন এত পুরনো জীবাশ্মের কথা কেউ দূর স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। তাই গোটা পৃথিবীর প্রত্নবিদমহলে বিস্ময়ের সীমা-পরিসীমা ছিল না। তিন টুকরো অস্থি থেকে জাভাম্যানের দেহ পুনর্নির্মাণ করে দেখা গিয়েছে, তার উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। শ্বদন্তের আকৃতি তার আমিষ খাদ্যাভ্যাসের দিকে ইঙ্গিত করছে।


পিকিং ম্যান


১৯২১ সালে চিনের বেইজিং শহরের অদূরে চৌকোনতিয়েন গুহায় প্রথম অনুসন্ধান চালান সুইডিশ বিজ্ঞানী যোহান অ্যান্ডারসেন। ১৯২৩-১৯৩৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রত্নতাত্ত্বিক খননে একাধিক আদিমানবের খুলি, চোয়াল, দাঁত এবং ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গিয়েছে। প্রথমে আদিমানবের বিজ্ঞানসম্মত নাম রাখা হয়েছিল ‘সিন্যান্থ্রোপাস পেকিনেন্সিস’ ডাকনাম ‘পিকিং ম্যান’। পরে ‘জাভা ম্যান’-এর সঙ্গে তার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়ে তাকে ‘হোমো ইরেক্টাস’ গোষ্ঠীভুক্ত করা হয়। সম্প্রতি নতুন অ্যালুমিনিয়াম-বেরিলিয়াম ডেটিং পদ্ধতিতে ওই জীবাশ্মগুলির বয়স নির্ধারিত হয়েছে ৬৮০০০০ - ৭৮০০০০ বছরের মধ্যে। পিকিং ম্যানের ফসিল নিয়ে নাটক-রোমাঞ্চ-উত্তেজনা কম হয়নি। ১৯৪১ সালে চিনে জাপানি আক্রমণের সময় ফসিলগুলি খোয়া যায়। পরে চৌকোনতিয়েনে একাধিক খনন চালিয়ে আরও অনেক জীবাশ্মের টুকরো আবিষ্কার করে তার প্রতিরূপ তৈরি করা হয়। বর্তমানে চৌকোনতিয়েন মিউজিয়ামে ওইরকমই একটি প্রতিরূপ সংরক্ষিত আছে। আন্তর্জাতিক প্রত্নবিদ মহলে একাধিক বহুমূল্য পুরষ্কার ঘোষণা করা হচ্ছে সেই ১৯৭২ সাল থেকে। কিন্তু সেই অপহৃত আদিমানবের এখনো কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা পিকিং ম্যানের পুনর্নির্মিত রূপ দেখে তার সঙ্গে বর্তমানের ইউরোপীয়দেরই সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন; বর্তমান এশিয়দের সঙ্গে তার মিল কম।


নর্মদা মানব


মধ্যপ্রদেশের নর্মদা উপত্যকায় হাথনোরা গ্রামে ১৯৮২ সালের ৫ ডিসেম্বর ভূতত্ত্ববিদ অরুণ সোনাকিয়া নর্মদা মানবের খুলির টুকরো খুঁজে পান। প্রায় ৫-৬ লক্ষ বছরের পুরনো এই আদি মানব ‘হোমো ইরেক্টাস’ গোষ্ঠীর। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। দুর্ভাগ্যবশত এই জীবাশ্ম নিয়ে পরবর্তীকালে খুব একটা গবেষণা বা বিশ্লেষণ হয়নি। সমগোত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ‘জাভা ম্যান’ বা ‘পিকিং ম্যান’-এর খ্যাতির সিকিভাগও জোটেনি নর্মদা মানবের কপালে। তার বিজ্ঞানসম্মত নাম রাখা হয়েছিল ‘হোমো ইরেক্টাস নর্মদেন্সিস’। জীবাশ্মে কোনও দাঁত পাওয়া যায়নি, শুধু খুলির বাঁদিকের অংশ এবং চোয়ালের হাড় থেকে তার মস্তিষ্ক প্রকোষ্ঠের আনুমানিক আয়তন দাঁড়িয়েছে ১১৫৫ থেকে ১৪২১ ঘন সেন্টিমিটারের মধ্যে। মস্তিষ্কের এতখানি আয়তন ‘হোমো ইরেক্টাস’ গোষ্ঠীর সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না, বরং পরবর্তী যুগের উন্নত ‘হোমো স্যাপিয়েন্স আর্কেইক’ গোষ্ঠীর সঙ্গে খাপ খায়। বিখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ ডি লুমলে অনেক বিচার-বিবেচনা করে তাই নর্মদা মানবকে ‘বিবর্তিত হোমো ইরেক্টাস’ বলেছেন।


শনিদার গুহামানব ‘ন্যান্ডি’


১৯৫৭ সালে ইরাকের জাগ্রোস পর্বতমালার দুর্গম শনিদার গুহায় এই প্রত্নমানব অবশেষ আবিষ্কার করেন মার্কিন প্রত্নবিজ্ঞানী র‍্যালফ সোলেকি এবং তাঁর সঙ্গীরা। এই আদিমানবের বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘হোমো স্যাপিয়েন্স নিয়ান্ডারথালেন্সিস’। ৪৫০০০ বছরের পুরনো এই জীবাশ্মটি ৪৫ বছর বয়স্ক এক পুরুষের। তার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাঁ চোখে তীব্র আঘাত পেয়ে ন্যান্ডি সম্ভবত অন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং মস্তিষ্কের একাংশে জোরালো আঘাত পেয়ে তার শরীরের ডান দিকটি পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ন্যান্ডির কর্ণকুহরের গঠন দেখে বিজ্ঞানীরা বলছেন, কর্ণকুহরের অস্থিবৃদ্ধির কারণে ন্যান্ডি সম্ভবত পুরোপুরি বধির হয়ে গিয়েছিল। ন্যান্ডির হাতের হাড়ও অত্যন্ত বিশীর্ণ। গবেষকদের মতে, শুধু শিকার করতে গিয়ে বা জীবনসংগ্রামে সে অমন আঘাত পায়নি, জন্মগত একাধিক অসুখ ছিল ন্যান্ডির। সেইসব অসুখ এবং আঘাত থেকে নিরাময়ের জন্য ন্যান্ডির সমাজের অন্যান্য মানুষেরা যে ঢের চেষ্টা করেছিল, তার নিদর্শন ওই জীবাশ্মে এবং গুহায় রয়েছে।


লা শ্যাপেলের ‘বুড়ো মানুষ’


১৯০৮ সালে ফ্রান্সের লা-শ্যাপেল-ও-সেন্ট-এ নিয়ান্ডার্টাল আদিমানবগোষ্ঠীর এই পূর্ণাঙ্গ খুলিটি আবিষ্কৃত হয়। খুলির মালিক আদিমানবের নাম রাখা হয় ‘বুড়ো মানুষ’ーদ্য ওল্ড ম্যান। যদিও তার শরীরের পুনর্নির্মাণ করে বোঝা গিয়েছে যে, সে খুব একটা বৃদ্ধ ছিল না। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। নিয়ান্ডার্টাল জীবনসীমার নিরিখে সেটাই নাকি বৃদ্ধ বয়স। একাধিক রোগে ভুগে তার মৃত্যু হয়েছিল। স্বাস্থ্য অত্যন্ত খারাপ ছিল। মারাত্মক অস্টিও-আর্থারাইটিসেও ভুগছিল বুড়ো মানুষটা। ফরাসি পুরাতত্ত্ববিদ মার্সেলিন বোউল দীর্ঘ গবেষণায় এই জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণ করেছেন প্রায় ৬০০০০ বছর। নিয়ান্ডার্টাল আদিমানবগোষ্ঠীর মানুষেরা বৃদ্ধ মানুষদের কোনও ধর্মীয় বা প্রতীকী কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে জোর করে কবর দিত কি না, সেই বিতর্ক প্রথম উসকে দিয়েছিল লা শ্যাপেলের বুড়ো মানুষটাই। পরবর্তীকালে কেবারা, কোয়াফজে, সেন্ট চেসেইরে, আমুদ প্রভৃতি প্রত্নস্থলের নিয়ান্ডার্টাল অবশেষ সেই বিতর্কে ইন্ধন জুগিয়েছে ঢের।


‘ওটজি’ তুষারমানব


এযাবৎ প্রাপ্ত আদিমানব-জীবাশ্মের মধ্যে পূর্ণাঙ্গতম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত ‘ওটজিーদ্য আইসম্যান’। সে শুধু হাড়ের টুকরো নয়, সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সমেত ৫৩০০ বছরের এক পূর্ণ মানবদেহ। আল্পস পর্বতের হিমবাহের প্রচুর বরফের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত ওটজির পাকস্থলীতে খাদ্য কণিকার অবশেষ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে। ১৯৯১ সালে ইতালি-অস্ট্রিয়া সীমান্তের ওটজ উপত্যকায় স্কেটিং করতে এসে দুই জার্মান পর্বতাভিযাত্রী এরিকা এবং হেলমুট সিমোন বাদামি রঙের এক শুষ্ক মৃতদেহ দেখে চমকে ওঠেন। মৃতদেহ এতটাই সতেজ ছিল যে, তাঁরা ভেবেছিলেন ওটি সদ্যমৃত কোনও পর্বতারোহীর। আবিষ্কারের চারদিন পর অস্ট্রিয়ার পুরাতত্ত্ববিদ তাকে পরীক্ষা করে চমকে উঠে বলেন যে, মৃতদেহটি অন্তত চার হাজার বছরের পুরনো। পরে অত্যাধুনিক ডেটিং পদ্ধতিতে ওটজির বয়স নির্ধারিত হয়েছে ৫৩০০ বছর। এই তুষারমানবকে ‘হোমো টাইরোলেনসিস’ নামে নতুন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত করা হবে, নাকি ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ প্রজাতিরই বিশেষ শাখায় রাখা হবে, তা নিয়ে প্রত্নবিদ মহলে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। এখনও সুষ্ঠু সমাধান মেলেনি। মৃত্যুকালে ওটজির বয়স ছিল প্রায় ৪৫ বছর। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। দেহের ওজন ছিল আনুমানিক ৬১ কিলোগ্রাম, যেটা ৫৩০০ বছর ধরে বরফে শুকিয়ে প্রায় ১৩.৫ কিলোগ্রামে দাঁড়িয়েছে। পাকস্থলীতে আইবেক্স ছাগলের অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত ঝলসানো মাংস, গমের চূর্ণ এবং ঢেঁকিশাক পাওয়া গিয়েছে। আল্পসের ওই চরম ঠাণ্ডা আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্যই ওটজি অমন অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত খাবার খেত।


___

1 comment:

  1. চমতকার ভাষায় সুন্দর বিবরণ

    ReplyDelete