গল্পঃ ভীমগড়ের পাঁচু ডাকাতঃ পবিত্র চক্রবর্তী




এক


পঞ্চেশ্বর পাখাধরা আদত নাম। এখানে সকলেই ওকে পাঁচু ডাকাত নামেই জানে। নামের শেষে ডাকাত বলাটার যদিও একটা বিশেষ কারণ আছে। খারাপ লোকেরা বলে, “পাঁচু দেখতে ছোটোখাটো হলে কী হবে, রাত হলেই ও একটা মস্ত বড়ো দৈত্যের ঘাড়ে চেপে ভীমগড়ে ডাকাতি করে বেড়ায়।”
না, বলার কিছুই নেই। ছেলেটা বেজায় বদরাগী আর তেমনই মিটমিটে দানো।
তবে খারাপের সঙ্গে সজ্জন ব্যক্তির সংখ্যাও কম নেই। তারা অবশ্য ভিন্ন মত দেয়। নানা আলোচনার মধ্যে পাঁচুর কথা উঠতেই তারাও জানায়, “ভাগ্যিস পাঁচু আছে, ভাগ্যিস পাঁচু ডানা মেলে উড়ে উড়ে সারারাত ভীমগড়কে পাহারা দেয়!”
মোদ্দা কথা হল, পঞ্চেশ্বরকে নিয়ে নানাপ্রকার জনশ্রুতি ওখানকার মাটিতে পা রাখলে কানে আসবেই। আপনারা যদি কখনও আগে গিয়ে থাকেন হয়তো দেখেছিলেন এখানকার লোকেদের ভালোই হোক আর খারাপই হোক, মুখটা কেমন যেন বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব। কাতুকুতু দিলে হয় ওদের পাঁজরে লাগত, নয়তো আমার-আপনার আঙুলের ডগা কাতুকুতু দেওয়ার বৃথা চেষ্টায় ব্যথায় কঁকিয়ে উঠত।
পাঁচুকে নিয়ে এই যে এত মানুষ নানান কথার ব্যঞ্জন সাজায়, তা নিয়ে ওর কোনও মাথাব্যথা নেই। সেই কবে থেকেই এর ওর ঘরে খেয়ে ছেলেটা মানুষ হয়েছে। বাপ-মা কে তাও জানে না। থাকার মধ্যে রয়েছে এক খুনখুনে বুড়ি। যে আয়লা ঝড়ের পরের দিন সকালে ভাঙা ডাল খুঁজতে গিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছিল। বুড়ির কোমর তখনও এখনকার মতো নুয়ে পড়েনি। শরীরে কিছুটা বল মজুতও ছিল। ছিল একটা ভাঙা ঘর। মাথায় ভেজা জবজবে ডাল আর শিশুটিকে আঁচলের তলায় ঢেকে নিয়ে আসে। পোষা ছাগলের দুধ খাইয়ে বড়োটি করে তোলে।
বুড়ির কেবল একটাই দুঃখ থেকে গেল, পাঁচুর শরীর প্যাকাটি থেকে নিদেন সজনেগাছের ডাল না করতে পারার জন্য। পাঁচুও বোঝে। তাই সে একদিন বলল, “বুড়ি মাসি, চিন্তা কোরো না। প্যাকাটি পাঁচুই এমন কাজ একদিন করবে যে গব্বে তোমার বুক ফুলে উঠবে।”
বুড়ি ভাবে এই তো চেহারা, বেচারা করবে কী? অবশ্য ওই প্যাকাটি কখন কী প্যাঁচ কষে আর লোকের নাকমুখ হুট করে রেগে ভাঙে তা একমাত্র ভবাই জানে।
ভীমগড়ে সবই সম্ভব। সম্ভাবনাময় জায়গা হওয়ার পিছনে কাহিনিটা একটু আলাদা। অনেকেই দেখেছে ভীমগড়ের উত্তরে যে পাহাড় আছে, ঠিক তার ডগায় আছে বিশাল এক কুয়ো। অনেকের মতে প্রাচীনকালে ভীম নাকি এক ঘুসিতে পাহাড়ের মাথা ফুটো করে ঘটৎকোচের মাকে এক অমূল্য রত্ন তুলে এনে দিয়েছিলেন। সেই থেকে লোকের মুখে মুখে এলাকার নাম হয় ভীমগড়। বর্তমানে ক’মাস ধরে এক সাধু ওই কুয়োর তলায় ধুনি জ্বালিয়ে তপস্যা করেন আর দিনের আলো ফুটলে কুয়োর পাশে বটগাছে ছায়ায় বকাসনে বসে লোকের দুঃখ-দুর্দশার নিদান দেন। সাধুর আশীর্বাদে অনেকের যা হওয়ার হয়েছে। সেটা কাকতালীয়, না ভীমের দৌলতে তা নিয়ে এখানে কেউ তর্ক করতে বসে না।
বুড়ি সেদিন হাটবারে হাটে একধামা শাক নিয়ে বসেছে। হঠাৎ কান খাড়া করে শুনতে পায়, পাঁচু নাকি সেই সাধুবাবার চ্যালা হয়েছে। যেই না কানের গোড়ায় কথা এসে ঠেকে অমনি বাঁকা কোমর টানটান করে কানের পোকা নাড়িয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে, “বলি, আমার পাঁচু কার গোয়ালের গোবর চুরি করেছে গা যে এমন বিটকেল কথা কয়ে বেড়াচ্ছ?”
গোবর! হ্যাঁ, এই কথাটা বলার একটাই কারণ, হাটবার ছাড়া বুড়ি এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঘুরে ঘুঁটের ডেলিভারি বিজনেস পাঁচুর পরামর্শে খুলেছে বুড়ি।
তবে এবার সত্যি অবাক হওয়ার পালা। পাঁচু দৈত্য বা দানোর জল্পনার অবসান ঘটিয়ে একদিন ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘরে এসে হাজির। কয়েকদিন বেপাত্তা আর সেই থেকে বুড়ির নাকি সুরে কান্না, সবকিছুকে ক্ষান্ত করে পাঁচু হাজির। মোরগ রগ ফুলিয়ে ডাকার আগেই পাঁচুর হাঁকডাকে খুনখুনে বুড়ি দরজা খুলতে দাঁতকপাটি লাগার জোগাড়। “ওরে পাঁচু রে! এ কী করেছিস রে? বাবা গো, পেলি কোথায়!”
বিস্ময় মেশানো বেসুরে কান্নায় সাতসক্কালে আশেপাশের লোকও জড়ো হতে শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে। দেখে পাঁচু মস্ত এক হাতির পিঠে বসে ফিকফিক করে হাসছে। কুলোর মতো কানের আড়ালে পাঁচুর মাথার ডগা আর কিছুই দেখা যায় না।
ওপর থেকেই ওর চিনচিনে গলা আসে ভেসে, “ভীমগড়ের ওষুধ পেয়েছি গো, ওষুধ। গুপ্তধন!”


দুই


এদিকে পাতালগঞ্জের চিনু চোর, অল্প বয়েসেই হাত পাকিয়েছে। পাকা টইটুম্বুর হাতে গঞ্জের লোকের প্রাণ এখন কণ্ঠায় এসে দাপাদাপি করে। আসলে ও ঠিক চুরি করতে চায় না। পাকা ফল থেকে চকমকে লাউ-কুমড়ো দেখলেই দুই হাত কোন এক অদৃশ্য শক্তিতে টেনে নিয়ে যায়। ধরাও পড়েছে বেশ কয়েকবার। মারের দাগ শুকিয়ে উঠলেই আবার গজিয়ে উঠতে বেশিদিন সময় লাগে না। কেই বা বুঝতে চায় স্কুল খেদানো চিনুর দুঃখের কথা! বুঝবেই বা কে? এখানে যে সবাই দুঃখী। ক্ষ্যাপা গয়লা তার গরু মরলেও কাঁদে, আবার বিশু মুদি নতুন দোকান উদ্বোধনে পাড়ার ছেলেছোকরাকে কুমড়োর ঘ্যাঁট দিয়ে মুড়ি গিলিয়েও পা ছড়িয়ে কান্না জুড়ে। কান্নাই পাতালগঞ্জের হাওয়ার কণায় উড়ে বেড়ায়, নদীর জলে ছোটে।
ইদানীং চিনুর হাত আর দুধ-লাউ, ফল-পাকুড়ে খুব একটা নিশপিশ করে না। মনটাও যেন অম্বলের রুগীর মতো ভারে প্রায় নুইয়ে পড়েছে। ভীমগড়ের পাঁচুর কথা এ গঞ্জেও ওঠে, আর তারপর থেকেই এমন কাণ্ড। ঠিক লোভ নয়, বরং বড়ো কিছু না করতে পারার জ্বালা।
কথায় আছে সব বেয়াদপরা আদতে মনে মনে টেলিপ্যাথি করতে পারে। হলও তাই। হাতির পিঠে সাধুর কাছে যাওয়ার পথে পাঁচুর সঙ্গে দেখা হয় চিনুর। সব শুনে বলে, “এই ব্যাপার! শোনো হে কাউকে বপলো না। আমার গুরুদেবও তাঁর গুরুর কাছ থেকে এমন এক অলৌকিক বিদ্যা জানেন…” মাঝপথে কথা থামিয়ে চিনুর মুখের রেখা বোঝার চেষ্টা করে পাঁচু।
“কেমন বিদ্যে?” উৎসাহের অন্ত নেই চিনুর। মনে মনে ভাবে, ইস, আমারও যদি দেখা হত। একটা বাঁদর চেয়ে নিতাম। যখন যেমন চাইতাম তেমনটাই হাতের মুঠোয় পেতাম।’


***


“হবে রে, হবে। তোরও হবে। কিন্তু পরীক্ষা বিনে আমি একটি জিনিসও দিই না। পাঁচুকেই জিজ্ঞেস করে দেখ।”
ফিনফিনে মিহি গলার স্বরে চিনু এদিক ওদিক চেয়ে দেখে একটা লোক। পরনে লাল নেংটি। কদম ছাট চুল। চোখগুলো কোটরের গর্তে বাসা বেঁধেছে।
হাতির পিঠ থেকে চটপট নেমে পাঁচু সাষ্টাঙ্গে শুয়ে পড়ে। পাঁচুর ইশারায় চিনুও পেন্নামের ঘটায় নাকে মুখে মাটি ঢুকিয়ে ফেলে।
সূর্যের আলো পাহাড়ের কোলে শেষ আলো দিয়ে পশ্চিমের কোলে ডুব দিচ্ছে। কেবল আধো অন্ধকারে জ্বলছে ভীম পাহাড়ে হিড়িম্বা গহ্বরের ক্ষীণ আলো। সাধু সামান্য ধুনির আলোয় চিনুকে বললেন, “দ্যাখো বাছা, পরীক্ষা বলাটা ভুল হবে, তবে তোমার মনে যে বাঁদর নাচানাচি করছে তা পাবে।”
“পাব প্রভু! নেংটি বাবা আপনি ধন্য!”
নেংটি কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়ায় টুক করে জিভ কাটে চিনু। কোনও মহামানবের নাম কি আর নেংটি হতে পারে? ভারি লজ্জার।
“তুমিও তো দেখছি মহাপুরুষ হে!” আগের মতোই মিনমিনে গলায় কোটর থেকে চেষ্টা করে চোখটা খানিক ঠেলে বার করে সাধু বলে উঠলেন।
“ছিঃ ছিঃ বাবা, আপনি অপরাধ নেবেন না।” গলায় খানিক ভয় আর কুণ্ঠা নিয়েই চিনু বলে ওঠে। মনে মনে ভাবে, যদি রেগেমেগে মনের ইচ্ছেটাই পূরণ না হয়!
আশ্বাস দিল পাঁচু। “ভাই চিনু, ওঁর সন্ন্যাস জীবনের নামটাই তো নেংটিশ্বর! বাবাই বলেছিলেন আমৃত্যু তিনি লাল নেংটি ছাড়া আর কিছুই পরবেন না। দেহের জন্য যতটুকু প্রয়োজন আর কী। তাই না বাবা?” শেষে বাবার দিকে তাকিয়ে সম্মতি আদায়ের সুরে কথাটা ছোড়ে।
“হা হা হা! যাই হোক শোনো চিনু, বাঁদর পাওয়ার পর তোমার হাতকে কিন্তু সংবরণ করতে হবে। মানে তোমার মনের কথামতোই বাঁদর ফল-টল, শাক-মুলো-লাউ যা চাইবে নিয়ে আসবে। কিন্তু... কিন্তু তুমি একদমই নাহ্‌। মনে থাকবে তো?”
“কিন্তু...” চিনু গলাটা আরেকটু ঝুঁকিয়ে দেয় সাধুর দিকে।


তিন


হাতির পিঠে স্যাঙাত চিনুকে নিয়ে চলল অবাকগড়ে পাঁচু। সাধুর আশীর্বাদে চিনু একটি মন্ত্রপূত বাঁদর পেয়েছে। পথে যেতে যেতে পাকা কলার কাঁদি দেখে হাত নিশপিশ করলেও খাটনির প্রয়োজন নেই আর। তবে বহুকালের অভ্যাস তো।
কিন্তু বাঁচোয়া এটাই রোগা প্যাংলা পাঁচু চোখ পাকিয়ে, “খবরদার! না, একদম না। নিজে করা চলবে না। নইলে বাঁদর ভ্যানিশ হয়ে যাবে।” বলতেই চিনু মনে মনে ভাবল, সত্যি তো। বাঁদর আছে কী জন্য!
নির্দেশের অপেক্ষামাত্রই বাঁদর টুক করে গাছে উঠে এক ছড়া কলা নিয়ে এল। তারপর গাছের ছায়ায় দুই বন্ধু পেটটি পুরে চিঁড়ে আর কলা মেখে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল।
একটা কথা বলা হয়নি, এখানে বলি। হাতি পাওয়ার পর থেকে পাঁচুর দাপট গেছে বেড়ে। বলা নেই, কওয়া নেই হাতি শুঁড় উঁচিয়ে এর দোকান ওর বারান্দা থেকে চিঁড়েটা মুড়িটা দিব্যি পোঁ করে ঘাড়ে বসা পাঁচুর হাতে তুলে দিচ্ছে। লোকে হইহই করলেই পাঁচু লেলিয়ে দিচ্ছে হাতি। ভীমগড় তো বটেই, বাকি এলাকাতেও পঞ্চেশ্বর এখন পাঁচু ডাকাত।
বুড়িও আর ভয়ে রা কাড়ে না। আজকালকার ছেলেপুলে, কখন আবার রেগেমেগে ভাঙা কোমরেই হাতির পা চাপিয়ে মট করে দিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়। কী আর করা। মনের কষ্ট মনেই চেপে রাখে।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম তখন, অবাকগড়। অবাকগড় এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে। ওখানেই যাবে ওরা। ওই পোড়ার ভীমগড়-পাতালগঞ্জে আছেইটা বা কী? থাকার মধ্যে হাড়ির মতো মুখ আর দিনরাত নাকি সুরে কাঁদুনি। ওরা শুনেছে অবাকগড় অবাক করার মতোই জায়গা বটে। দেদার খুশি সবাই। কারণে অকারণে খুশি। খাও-ঘুমাও-খেলো। পড়াশোনা করো, না করো কোই বাত নহি। আনন্দ আর আনন্দ।


***


শীত চলে গেছে কিছুকাল আগে। গরমের ছোঁয়া লেগেছে বাংলার বুকে। কালবৈশাখীর কালো মেঘ শহরের বুকে না দেখা গেলেও ম্যাপের বাইরে গাঁ-গঞ্জের আকাশে তিল-রঙা কালো মেঘ ক্রমশ বড়ো হতে হতে সোঁ সোঁ করে ঝড়ের রূপ নেয় এখনও। এই আজ যেমন লেগেছে।
ঝড় থামলেই চড়বড়িয়ে নামে বৃষ্টি। হঠাৎ এই জোড়া আক্রমণে পাঁচুর মেজাজ উঠছে খাপ্পা হয়ে। চিনু উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে ঝড়ে উড়ে আসা নারকেলের বগলো বা ছিঁড়ে পড়ে থাকা পাকা ফলের দিকে।
ঠিক তখনই হইহই রব ওঠে অবাকগড়ে। দেখতে হচ্ছে তো ব্যাপারটা কী। খানিক আগে যে ঝড় উঠেছিল তা এখন ক্ষান্ত হলেও ঝুনুখুড়ো মন্দিরের রোয়াকে বসে বিড়ি ফুঁকছিল মনের সুখে। খেয়ালই করেনি পাশের পুরনো বটগাছের ডাল ততক্ষণে মটমট শব্দ তুলে ঝপাৎ করে দাওয়ার চাল সমেত বুড়োর ঘাড়ে এসে পড়তে শুরু করেছে। বুড়ো মরেনি, কিন্তু ওই ভারী ডালের তলায় মমির মতো শুয়ে চিঁচিঁ স্বর তুলে একমাত্র গুণধর নাতির নাম ধরে হাঁক পাড়ছে।
কে শোনে তার ডাক। এমনিতেই নয় নয় করে আশির কোঠায় বয়স, তারপর ভারী ভাঙা ডালের চাপ। গলা গেছে আরোই বসে। শেষমেশ ছ্যাঁচকিখুড়ো মনের আনন্দে চুলোর কাঠ কাটার বাহানায় যেই না কয়েক কোপ মেরেছে, অমনি ঝুনুবুড়ো কাতর স্বরে বলে, “বলি মর্কট ছ্যাঁচকি, মারিসনি বাপ! আমি যে এখানে।”
“ওহো, তুমি এখানে? তা কী মনে করে? গাছের ডালে বসে শ্যামাসংগীত গাইছিলে নাকি এই ঝড়ে?”
অবাকগড়ের স্বভাবে রাগ বলে বস্তুই নেই। সুতরাং একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও ছ্যাঁচকিখুড়ো প্রায় খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে হাসতে জানতে চাওয়াতেই বিপত্তি।
পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল বখাটে নাতি কচি। বয়সে কচি না হলেও গুলি-মার্বেল খেলায় দিব্যি পাকা। পাকা তার দাঁতে দাঁত রেখে খোঁচা মারা হাস্যরস। চোখ পড়ে গাছের ডালের সঙ্গে ছ্যাঁচকিখুড়ো যেন কার সঙ্গে কথা বলছে। কাছে যেতেই চক্ষু চড়কগাছ। পোঁ করে গাঁয়ের রীতিনীতি-প্রথা সব ভুলে, কোমরে দু’হাত গুঁজে চিল চিৎকার করে বাঁকা হাসি মুখময় ছড়িয়ে বলতে থাকে, “তা খুড়ো, ব্যাপারটা কী? খুড়িকে ঘাড়ে করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় তো ড্যাং ড্যাং করে পা চালিয়েছিলে। আর আমার দাদু, মেরেকেটে ত্রিশ কেজির বেশি হবে না, তা ওই হাড় ক’টা তুলতে তোমার গায়ে ব্যথা, অ্যাঁ?”
দাদুও কম যায় না। বেচারা গাছের ডালে চাপা পড়েও মুখ খোলে, “ওই দ্যাখ না কচি, ওই ছ্যাঁচকি বলছে কিনা আমি গাছের ডালে বসে শ্যামাসংগীত গাইছিলাম। ওরে আমার কোমর গেল রে!” বলেই বুড়ো ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে।
দেখতে দেখতে লোক জমা হয়। কিন্তু বুড়োকে ওঠাবার ব্যবস্থা কী হবে তা না ভেবে আলোচনায় মেতে ওঠে সবাই।
ক্রমশ যখন বুড়ো চিঁচিঁ কাতর স্বর যখন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে ঠিক তখনই পাঁচু আর চিনুর আগমন।


চার


ঝুনুবুড়ো উদ্ধার হল শেষমেশ পাঁচু ডাকাতের এক ধমকে। হাতির পিঠ থেকে এক লাফে নিচে নেমে সপাটে চড় কষিয়ে কচিকে বলে উঠল, “বলি হ্যাঁ রে হাভাতে, দাদু নিচে, মরার ঘাটে উঠতে চলল, বাঁচানোর নাম নেই, গপ্প জুড়েছিস! আর আপনারাই বা কী, অ্যাঁ! এতকাল শুনে এসেছি অবাকগড়ের মানুষ সুখী, আনন্দ করে। কিন্তু এ কেমন! মরতে বসেছে বুড়ো আর আপনারা গালগল্পে মশগুল!” প্রথমে চরম রাগ আর শেষে বিস্ময়ে পাঁচু কাঁপতে শুরু করে দিল।
বখাটে কচি হেসে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই চিনুর বাঁদর দুম করে বসিয়ে দিল বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়। পাঁচুর হাতি শুঁড় দিয়ে চোখ বুজে পাতা সমেত ভাঙা ডাল তুলতেই হামাগুড়ি দিয়ে চিনু বুড়োকে বার করে আনল। ওর চোখেমুখে অদ্ভুত তৃপ্তি।
মনভরা হাসি মুখ দেখে পাঁচু ফিসফিস করে চিনুর কানে মুখ এনে জিজ্ঞেস করল, “অবাকগড়ের হাওয়া লেগে গেছে নাকি তোর এরই মধ্যে?”
“না দাদা, আগে চুরি করতে যাওয়ার সময় হামা দিয়ে ঢুকতে হত তো। ওই আর কী। ফল-পাকুড় না হোক বুড়োকে বার করে আনতেই মনটা খুশি হয়ে গেল। আর বাব্বা, তোমার কী রাগ গো!”
“রাগ হবে না! দেখলে তো বুড়ো মরতে বসেছে আর এই হতচ্ছাড়াগুলো কেমন দাঁত বার করে তামাশা করছিল!”
অদ্ভুত কাণ্ডটা ঘটল তার পরেই।
“কী স্যার, কী হল?”
আমি গল্প থামিয়ে তাকালাম শেষ বেঞ্চে। রীতেশ আজ ক্লাস ফাঁকি মেরে টয়লেট যায়নি। বরং গল্পটা মন দিয়েই শুনছিল।
আমি বললাম, “কী আর হবে। ওই থাপ্পড় আর রাগ দেখে অবাকগড়ের লোকজন তখনকার মতো হাসি ভুলে বুড়োকে নিয়ে ছুটল হাসপাতালে।”
“বেঁচে গেল তো স্যার?” রীতেশের মতো আরেক মহা বালক অনন্ত কাটাকুটি খেলা থামিয়ে আমার দিকে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়ল।
“হ্যাঁ রে বাবা, বাঁচল।” ঘাড় দুলিয়ে বললাম।
আমার ক্লাসের সবচেয়ে সিরিয়াস আর জিনিয়াস, পড়াশোনার বাইরেও যে একটা জগত আছে সেটাই জানে না, সেই ঋদ্ধি একটু গম্ভীর গলায় বলল, “স্যার গল্পটা বললেন, ভালো লাগল। কিন্তু টুইস্ট নেই একদম। অনেকটা ওই কাল্পনিক…”
আর কী করা। তাও খানিকটা চুপ থেকে বললাম, “এর থেকে বেশি আমি আর পারব না বাপু। তোরা শোনাতে বলেছিলি তাই…”
“ধুর, এর থেকে সিলেবাসটা শেষ হলে কাজ হত।” ঋদ্ধির গলায় বিজ্ঞ সুর।
“আবে ঋদ্ধি, ওপস, সরি স্যার! আমি শেষ করব গল্পটা? যদি বলেন।”
ঘাড় উঁচিয়ে দেখলাম, আমার হিরের টুকরো অনীশ। লুকিয়ে বিড়ি খেতে যে ওস্তাদ। অবাক হলাম। ও বলবে গল্প!
“বল, শুনি।”
সারা ক্লাস ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। বিড়ি তো ওঁর একমাত্র গুণ নয়, বরং একবছর ডাহা ফেল করে ক্লাসের মুখ উজ্জ্বলও করেছেন।
“স্যার, ধরুন ওই হাতি আর বাঁদর ভ্যানিশ হয়ে গেল বুড়ো বেঁচে ওঠার পর। আসলে ওই সাধু চেয়েছিলেন ওরা দু’জনে এমন কাজ করতে শিখুক যাতে অন্যের সাহায্যের দরকার অকারণে না নিতে হয়। আর সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যবহার করা উচিত  যেমন, পাঁচু না রাগলে বুড়ো বাঁচত না। আবার ধরুন গিয়ে চুরি করার সময় যে পদ্ধতির দরকার তার ব্যবহার না করলে ঝুনুবুড়োকে বার করাও মুশকিল হত। অবাকগড়ের লোকেরাও বুঝেছিল আনন্দ দরকার, হাসি মজা করাও উচিত, তবে সময় বুঝে।” একদমে অনীশ কথাগুলো শেষ করে আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
আমি চুপ। সারা ক্লাস চুপ। বিজ্ঞ ঋদ্ধি অবাক।
“স্যার...”
“হুম? হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস। যা বললি বুঝলি কি? বুঝে থাকলে বাংলার বাক্যরচনাগুলো এবার থেকে করে আনিস।” আমি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে একপ্রকার নির্দেশ দিলাম।
পিছন থেকে ভেসে এল, “যাহ্‌ কলা!”


ছুটির ঘণ্টা বেজেছে। বাড়ি ফিরছি। হঠাৎই হো হো করে হেসে উঠলাম। আশেপাশের লোকেরাও ‘যাহ্‌ কলা’র মতো মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজেকে মনে মনে সামলে ভাবলাম, আমিও তো ছিলাম ওদেরই মতো ফাঁকিবাজ। ফাঁকিবাজ না হলে ওদের মনের ভাষা আর কাজ করিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি শিখতামই না।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ শতদল শৌণ্ডিক

No comments:

Post a Comment