গল্পঃ পালকের দুলঃ সুস্মিতা কুণ্ডু



শেকু একটা ছোট্ট মিষ্টি ছেলে। মা-বাবার সঙ্গে থাকে। একটা ঘন জঙ্গলের ধারে ওদের বাড়ি। শেকুর বাবা সূর্যের আলো ফুটলেই একটা ইয়াব্বড় চটের বস্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। জঙ্গলে পড়ে থাকা শুকনো কাঠ, শুকনো পাতা কুড়িয়ে হাটে বিক্রি করে। আগে শেকুর বাবা জঙ্গলে কাঠ কাটত, কিন্তু চারদিকে মানুষেরা নাকি জঙ্গলের গাছপালা কেটে শেষ করে ফেলছে; বনের পশুপাখিরা থাকার জায়গা পাচ্ছে না আর। এ তো ভারি অন্যায়। তাই শেকুর বাবা এখন শুধু ভেঙে পড়া ডালপালা কুড়োয় বা মরা শুকনো গাছগুলো কেটে আনে। আর যদি বা প্রয়োজনে বড়ো কোনও গাছ কাটতে হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গায় আরও অনেকগুলো গাছের বীজ বা চারা পুঁতে দেয়।
ছোটো থেকেই শেকুকে ওর মা-বাবা গাছপালাকে, পশুপাখিকে, এই প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
শেকুর বাবা সেই কোন ভোরে শেকু ঘুম থেকে ওঠার আগে বেরোয় আর সন্ধে গড়িয়ে গেলে তবে বাড়ি ফেরে। ততক্ষণে শেকু ঢুলতে শুরু করে দেয়। আবার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে ভোর। বাবার সঙ্গে শেকুর আর দেখাই হয় না প্রায়।
একদিন বাবা বাড়ি ফিরতে শেকু বলল, “বাবা আমি তো এখন অনেএএএক বড়ো হয়ে গেছি। আমিও এবার থেকে তোমার সঙ্গে জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে যাব।”
শুনে তো বাবা হাঁ হাঁ করে উঠল, “না না! এই এত্তটুকুনি ছেলে আবার ওই ঘন জঙ্গলে যায় নাকি! কী থেকে কী বিপদ ঘটবে। না সোনামাণিক, তুমি বাড়িতে মায়ের কাছে বরং খেলাধুলো করো। আমি ফেরার সময় তোমাদের জন্য জামরুল পেড়ে আনব।”
শেকু অভিমান করে গম্ভীরমুখে বসে রইল।
শেকুর মা অবশ্য বেশ কড়া ধাতের মানুষ। মা বাবাকে বকে দিয়ে বললে, “এত্তটুকুনি আবার কী? তুমি জানো আমাদের শেকুসোনা কত্ত কী পারে? শেকু নিজে নিজে চান করে, চুল আঁচড়ায়, নিজের হাতে ভাত মেখে খায়, একা-একাই অন্ধকার ঘরে ঘুমোতে পারে। আমি কাল সকালে ঘুম থেকে তুলে ওকে তৈরি করে দেব, তুমি ওকে নিয়ে যেও তোমার সঙ্গে। জঙ্গলের বেশি ভেতরদিকে যেও না, একটু চোখে চোখে রেখো আর তাড়াতাড়ি ফিরে এসোーতাহলেই আর ভয় নেই। এত যখন ইচ্ছে হয়েছে যাক না একটা দিন।”
বাবা আর কী করবে, অগত্যা মায়ের কথাতেই রাজি হল। শেকুও আনন্দে লাফিয়ে উঠে মা-বাবা দু’জনেরই গলা জড়িয়ে হামি খেয়ে শুয়ে পড়ল ঝটপট। কাল ভোর ভোর উঠতে হবে না?


পরেরদিন সকালে শেকুকে মা ডাকার আগেই শেকু উঠে চোখেমুখে জল নিমকাঠিতে দাঁতন করে জামাকাপড় পরে তৈরি। বাবা তারপর তৈরি হতে মা ওদের দু’জনকে অনেক অনেক নিয়ম বলে বুঝিয়ে হাত নেড়ে টাটা করল। বাবার পিছু পিছু শেকু চলল জঙ্গলে। বাবার চটের বস্তার মতো একটা ছোট্ট বস্তা শেকুকেও দিয়েছে মা। কাজে যাচ্ছে না শেকু? তাই বস্তার ভেতরে টিফিন কৌটোয় মা শেকুর সবচেয়ে প্রিয় খাবার গরম গরম ফুলকো আটার রুটি আর গোল গোল চাকা চাকা করে কেটে আলুভাজা ভরে দিয়েছে। কত কাজ করবে ওই পুচকু ছেলেটা, খেতে হবে তো পেট ভরে!
অনেকটা পথ হেঁটে জঙ্গলে পৌঁছল শেকু আর শেকুর বাবা। এতটা পথ শেকু কিন্তু নিজে নিজে হেঁটে এসেছে, একবারও বাবার কোলে চাপার বায়না করেনি। এমনকি বাবা বললেও রাজি হয়নি।
জঙ্গলের ভেতরে পৌঁছে বাবা শেকুকে বলল, “শেকুসোনা, তুমি এখানেই আমার আশেপাশে খেলা করো। চোখের আড়ালে যেও না। জঙ্গলে অনেকরকম পশু আছে। কেউ খুব শান্ত মিশুকে, আবার কেউ কেউ ভীষণ রাগী। সাবধানে থাকতে হবে আমাদের তাই। কেমন?”
শেকু ভারি লক্ষ্মী ছেলে, বাবা-মায়ের কথার অবাধ্য হয় না কখনোই। বাবার দেখাদেখি ওর ছোটো চটের বস্তাটায় শুকনো পাতা, কাঠিকুটি সব জমা করতে থাকে। মাঝেমাঝে এই গাছ ওই পাতা সেই ফুল ওই ফল দেখিয়ে বাবাকে নাম জিজ্ঞেস করে।
এদিক ওদিক পাতা কুড়োতে কুড়োতে কখন যেন শেকু ওর বাবার চোখের আড়াল হয়ে যায়। নিজেও লক্ষ করেনি কখন দূরে চলে এসেছে। যখন পেছন ফিরে বাবাকে ডাকতে যায় শেকু, দেখে আশেপাশে কোথাও বাবা নেই। এই রে! তাহলে কি শেকু হারিয়ে গেল? নাহ্, এত সহজে ঘাবড়ে গেলে চলবে না। চারপাশটা ভালো করে চেয়ে দেখে শেকু। মনে করার চেষ্টা করে কোন পথ ধরে এসেছে ও।
এমন সময় হঠাৎ চোখে পড়ে সামনের ছোটো টিলার গায়ের ঝামরিঝুমরি গাছপালার আড়ালে একটা কী যেন রঙিন কিছু সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে একটা ভারি সুন্দর বাহারি রঙিন পালক পড়ে রয়েছে ঘাসের ওপর। কতরকমের রঙ সেই তুলোর মতো হালকা ফুরফুরে পালকটার গায়ে! হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে শেকু। মনে মনে ভাবে এই পালকটা দিয়ে ভারি সুন্দর একটা কানের দুল বানিয়ে দিলে কেমন হয় মায়ের জন্য! মা রাজি হল বলেই না শেকু আসতে পারল জঙ্গলে।
এই দ্যাখো শেকু কীরকম পাগল ছেলে! কানের দুল তো দুটো চাই, দু’কানের জন্য। কিন্তু একটা পালক দিয়ে তো দুটো দুল হবে না। আরেকটা পালক চাই শেকুর। ইতিউতি উঁকিঝুঁকি মেরে আরেকটা পালক খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু নাহ্! কোত্থাও নেই। এমন সময় নজর পড়ে যে ঝামরিঝুমরি ঝোপের সামনে পালকটা পড়েছিল সেটার দিকে। হয়তো এই পালকের মালিক পাখিটার বাসা ওই ঝোপে। একটু খুঁজলে হয়তো ওখানে পালক মিলতে পারে। ঝোপটা নাড়াতে গিয়েই শেকু দেখল ঝোপটার পেছনেই একটা গুহার মুখ। ওই টিলার গায়ের একটা গুহার প্রবেশদ্বার। তবে কি পাখিটার বাসা গুহার ভেতর? পাখিরা তো গাছের ওপর বাসা বাঁধে এমনটাই জানত শেকু। অবশ্য এমন সুন্দর পালক যার সে-পাখি নিশ্চয়ই বিশেষ কোনও ধরনের পাখিই হবে। পা টিপে টিপে গুহায় ঢোকে শেকু। একটু একটু করে এগোয় ভেতর দিকে।
খানিকটা যাওয়ার পরই একটা মৃদু ‘টুই টুই’ আওয়াজ শুনতে পায় শেকু। তার মানে পাখিটা গুহাতেই আছে। গুহাটা খুব সরু বা গভীর নয়, তাই ভেতরে সূর্যের আলোর হালকা আভা আছে। আর একটুখানি এগোতেই শিকুর চোখে পড়ল, ওর হাতের পালকটার মতো রঙিন পালকওয়ালা একটা পুচকে পাখি একটা বিশাল বড়ো মাকড়সার জালে আটকে পড়ে ছটফট করছে। এরকম বিশাল বড়ো মাকড়সার জাল শেকু আগে দেখেনি কখনও। যেমন মোটা তেমন শক্ত! এমনিতে তো মাকড়সার জাল পাতলা রেশমি সুতোর মতো হয়। ফুঁ দিলেই ছিঁড়ে যায়। কিন্তু এই জালটা এত পলকা মোটেই নয়। কীরকম আবার আঠালো জালটা। আহা রে, পাখিটার ভারি কষ্ট হচ্ছে বুঝি।
শেকু পাখিটাকে ছাড়াতে এগিয়ে যায়। কিন্তু পাখিটা বলে ওঠে, “ও ছেলে! এই জালটা তুমি ছুঁয়ো না, তাহলে তুমিও আমার মতো আটকে পড়বে। এ এক রাক্ষুসে মাকড়সার জাল। কারোর সাধ্যি নেই এই জাল ছেঁড়ার। তুমি এই গুহায় এলে কী করে? বাঁচতে চাও তো মাকড়সা ফেরার আগে পালাও।”
শেকু বলে ওঠে, “না না রঙিন পাখি, আমি তোমায় এই অবস্থায় ফেলে কিছুতেই যাব না। আমি গুহার বাইরে তোমার ওই রঙিন পালক একখানা কুড়িয়ে পেয়ে ভাবলুম আমার মায়ের জন্য কানের দুল বানাব। তাই আরেকটা পালক খুঁজতে খুঁজতে এই গুহার ভেতর ঢুকে পড়েছি। এখন তোমাকে উদ্ধার করে তবেই আমি যাব। আমার বাবার কাছে কুড়ুল আছে, এক কোপেই বাবা জাল কেটে দিতে পারবে। কিন্তু আমি আসলে এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে বাবার কাছছাড়া হয়ে পড়েছি। বাবাকেও কোত্থাও খুঁজে পাচ্ছি না।”
রঙিন পাখি আর শেকু কথার মাঝেই হঠাৎ একটা জোরে খড়খড় সড়সড় আওয়াজ হতে লাগল। রঙিন পাখি ভয়ে চিৎকার করে উঠল, “মাকড়সাআআআ!”
মাথার ওপর তাকিয়ে দেখে শেকু গুহার ওপরদিক থেকে একটা বিশাআআআল বড়ো মাকড়সা তার আট পায়ে খচরমচর আওয়াজ তুলে নেমে আসছে। সে মাকড়সার পেটটা শেকুদের বাড়িতে যে তাওয়াতে মা রুটি বানায় তার থেকেও বড়ো। মাথাটা শেকুর খেলার বলের মতো। গোটা গায়ে খোঁচা খোঁচা শক্ত রোঁয়া।
শেকুকে দেখে মাকড়সা বলল, “মানুষের পো! আটপেয়ের গুহায়! তুই নির্ঘাত আমার খাবার চুরি করতে এসেছিস? দাঁড়া তোকেও তবে জালে জড়িয়ে বেঁধে রাখব।”
শেকুকে লক্ষ্য করে সাদা আঠালো জাল ছোড়ে মাকড়সা। শেকুর পা দুটো বাঁধা হয়ে যায়। কী শক্ত জাল রে বাবা! যে দড়ি দিয়ে বাবা গাছের বোঝা বাঁধে, তার থেকেও শক্ত। চটচটে আঠালো।
শেকু ঘাবড়ে যায়, কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রাখে। মা বলেছে বিপদে উত্তেজিত হতে নেই, ধীর-স্থিরভাবে চিন্তা করে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ ভাবতে হয়।
শেকু বলে, “মাকড়সা রাজা, তুমি ওইটুকু ছোট্ট পাখিকে বন্দী করেছ কেন? ও তোমার কী ক্ষতি করেছে? কী সুন্দর গান গায় ও, কেমন রঙিন পালক। ওকে ছেড়ে দাও।”
মাকড়সা বলে, “আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। তাই আমি ওকে ধরেছি। আমি খাব ওকে।”
শেকু বলে, “এ ম্যাঅ্যা! এসব আবার খাবার জিনিস নাকি? চাট্টি পালকেই তো গলায় সুড়সুড়ি দেবে। পেট ভরবে কি? তুমি মাকড়সা রাজা হয়ে এইসব খাও! আহা রে, তোমার মা বুঝি তোমায় আটারিরুটারি করে খাওয়ায়নি কখনও? তুমি বুঝি চাকালুভাজিতংও খাওনি কোনোদিন?”
মাকড়সা তো জন্মে এসব খাবারের নাম শোনেনি। সে বলে, “আমি তো এসব কক্ষনও খাইনি। ভারি ভালো খেতে বুঝি? এই দ্যাখো না, এই ফাঁদে যা পোকামাকড় মশা-মাছি পড়ে তাই খেয়েই দিন গুজরান করি। বয়স হয়েছে আমার, আজ আছি কাল নেই। আমার একটু ভালোমন্দ খেতে সাধ যায় না, বলো দেখি মানুষের পো?”
শেকু দেখল মাকড়সা ফাঁদে পা দিয়েছে। বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি যদি কথা দাও যে রঙিন পাখি আর আমাকে ছেড়ে দেবে তাহলে আমি তোমায় আটারিরুটারি আর চাকালুভাজিতং খাওয়াতে পারি।”
শুনে তো মাকড়সা আট পায়ে লাফ মেরে উঠে বলল, “এক্ষুনি দেব ছেড়ে।” 
বলে একটা পায়ের তীক্ষ্ণ নখের ডগা দিয়ে শেকুর পায়ে বাঁধা জালটা কেটে দিল। শেকু তখন কাঁধের বস্তা থেকে টিফিন কৌটো বার করে তাই থেকে একটা আটার রুটি আর দুটো গোল আলুভাজা নিয়ে মাকড়সার সামনে রেখে বলল, “এবার পাখিকে ছেড়ে দাও।”
মাকড়সা ঝটপট পাখির চারপাশের জাল কেটে দিয়ে হামলে পড়ল খাবারের ওপর। পাখিও ফুড়ুৎ করে এসে লুকলো শেকুর পেছনে। দু’জনে এবার ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার জন্য তৈরি হতে লাগল। মাকড়সা রুটি আলুভাজা খাক, এই সুযোগ ওদের। কিন্তু মাকড়সা রুটি আলুভাজা ততক্ষণে গপগপিয়ে খেয়ে আট হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছে। “ও মা গো! ও বাবা গো! তোমরা এমন অমৃত খাবার আমায় কোনোদিন খাওয়ালে না কেন গো! সেই এক ঢোল এক কাঁসি পোকামাকড় খেয়ে আমার পেটে চড়া পড়ে গেল।”
মাকড়সার অবস্থা দেখে এবার একটু মায়াই লাগল শেকুর। ওরও তো দোষ নেই। জঙ্গলের পশুপাখিদের নানা নিয়ম। শিকার ওদের করতেই হয় খাদ্যের জন্য। মাকড়সাও তো শিকার ধরতে গিয়েছিল। আবার নিরীহ প্রাণীদের বাঁচানোও কর্তব্য। রঙিন পাখিকে তাই উদ্ধার করেছে শেকু।
শেকু মাকড়সাকে বলল, “মাকড়সা রাজা, তুমি যদি সারা হপ্তা গুহার ভেতরের পোকামাকড় খেয়ে কাটাও তাহলে আমি তোমায় রবিবার রবিবার এই আটারিরুটারি আর কাটালুভাজিতং খাবার পাঠাব।”
রঙিন পাখি বলল, “হ্যাঁ, আমি উড়ে এসে গুহার মুখে রেখে দিয়ে যাব।”
মাকড়সা খুব খুশি হয়ে ওর জালের খানিকটা রেশমি সুতো ওদের উপহার দিল। মাকড়সার জাল শুকিয়ে গেলে একদম চকচকে শক্তপোক্ত সাদা রেশমি সুতো হয়ে যায় একদম।
“তোমরা যা বলবে আমি তাই শুনব। শুধু খাবার পাঠাতে ভুলো না যেন।”


শেকু আর রঙিন পাখি গুহার বাইরে এল। রঙিন পাখি শেকুকে একটা পালক দিয়ে বলল, “এই নাও তোমার মায়ের কানের দুলের জন্য পালক। আর চলো দেখি আমি আকাশপথে রাস্তা খুঁজে তোমায় বাবার কাছে পৌঁছে দিই।”
শেকু পালকদুটো আর মাকড়সার জালের রেশমি সুতো পকেটে লুকিয়ে রঙিন পাখির পিছু নিল। একটু দূরে যেতেই দেখল বাবা এদিক সেদিক যাচ্ছে আর ‘শেকু শেকু’ করে ডাকছে।
শেকু রঙিন পাখিকে টাটা করে ছুট্টে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বাবা বলল, “কোথায় ছিলি শেকু? আমি যে তোকে খুঁজছি তখন থেকে!”
শেকু বলে, “এই তো এখানেই ছিলুম। চলো চলো সব কাঠকুটো বস্তায় ভরে ফেলি।”
বাবা বলে, “তুই বসে বিশ্রাম নে। আমি করে ফেলছি সব।”
শেকু চুপটি করে ঘাড় নেড়ে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে বসে রইল। টুকটুক করে পকেট থেকে সুতো আর পালকদুটো বার করে দু’খানা কানের দুল বানিয়ে ফেলল মায়ের জন্য। তারপর বাবার হাত ধরে তিড়িংবিড়িং করে বাড়ি ফিরে এল।


বাড়ি আসতেই তো মা একশো চুমু দিয়ে শেকুকে আদর করল। যতই সাহস করে শেকুকে জঙ্গলে পাঠাক, মা তো সারাদিন আনচান ঘরবার করেছে। শেকুকে জড়িয়ে মা বলল, “কী করলি শেকুসোনা জঙ্গলে?”
শেকু মায়ের গলা জড়িয়ে বলল, “আমার জঙ্গলে অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে মা। তারা তোমার জন্য কী উপহার দিয়েছে দেখো।”
এই বলে পকেট থেকে কানের পালকদুল দুটো বার করল শেকু। মা তো এমন সুন্দর কানের দুল দেখে অবাক।
“এক বন্ধু পালক দিল, আরেক বন্ধু দিল রেশমি সুতো। তাই দিয়ে আমি বানালুম তোমার জন্য কানের দুল।”
মা তো আরও খুশি!  “বা রে বা! তাহলে তো শেকুর বন্ধুদেরও কিছু দিতে হয় আমাদের।”
বাবা মাথা চুলকে বলল, “তুই কখন আবার এত বন্ধু পাতালি! কিছুই তো জানতে পারলুম না আমি।”
শেকু খিলখিলি হেসে মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, “মা, রবিবার রবিবার তুমি আটারিরুটারি আর চাকালুভাজিতং বানিয়ে দিও। আর বাবা, তুমি ওই টিলার ধারে বড়ো বটগাছটার তলায় যেখানে আমরা পাতা কুড়োচ্ছিলাম সেখানে কলাপাতায় করে রেখে দিও। আর সেই সঙ্গে কিছু গমের দানা আর ছোলার দানাও রেখে দিও।”
মা-বাবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলল, “সে নাহয় রাখব, কিন্তু ওগুলো কী খাবার? নামই তো শুনিনি কক্ষনও! বানাব কী করে?”
শেকু ফিকফিকিয়ে হেসে বলে, “আটারিরুটারি হল গিয়ে আটার রুটি আর চাকালুভাজিতং হল...”
শেকু শেষ করার আগেই বাবা আর মা একসঙ্গে বলে উঠল, “গোল গোল চাকা চাকা আলুভাজা!”


_____

5 comments:

  1. কি মিষ্টি গল্প। মন ভালো হয়ে গেলো

    ReplyDelete
  2. আরেব্বাস। দারুণ সুন্দর গল্প।

    ReplyDelete
  3. Khuub sundar mon valo kora ekta galpo

    ReplyDelete
  4. বেড়ে হয়েছে, রুটি আর আলুভাজা আমার খুব প্রিয়।

    ReplyDelete