গল্পঃ পোষ্যঃ অরিন্দম দেবনাথ



যে বছর ‘দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজ’ স্থাপিত হল, সেই ১৯৭০-এ কলেজে ভর্তির লাইনে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্ব হয়েছিল রঞ্জন আর তমালের।
তমালের ডট পেনের কালি যে শেষ হয়ে গেছিল, সে খেয়াল ওর ছিল না। ভর্তির ফর্মের এক জায়গায় সই করতে গিয়ে বেচারা টের পেল যে, ও পেনের রিফিল পালটাতে ভুলে গেছে। বোকা বোকা মুখ করে লাইনে ওর ঠিক পেছনে দাঁড়ানো রঞ্জনকে বলেছিল, “তোমার পেনটা একটু দেবে ভাই? রিফিলে কালি নেই। আরও একটা সই করতে হবে। আগে খেয়াল করিনি। বাইরে কিনতে গেলে দেরি হয়ে যাবে।”
“শোন, আমার নাম রঞ্জন। একটা কথা বলি। আমার দাদু বলেন, ‘আইন পড়তে যাচ্ছ, আর যাই করো কলমের কালি শেষ হতে দিও না। কলমের জোর সবচাইতে বেশি। আর চোখ-কান সবসময় খোলা রেখ।’ এই নে, এই পেনটা রাখ আর কথাটা মনে রাখিস।”
পেনটা আর ফেরত নেয়নি রঞ্জন। কিন্তু সেই যে বন্ধুত্ব হল, আজ পঞ্চাশ বছর পরেও সে বন্ধুত্ব অটল।
দু’জনেই পেশায় সফল। যদিও দু’জনের বিশেষজ্ঞতা ছিল আলাদা আলাদা বিষয়ে। রঞ্জন ক্রিমিন্যাল লইয়ার হিসেবে দেশে ও বিদেশে খ্যাতি পায়। বিশেষ করে আলিগড়ের মুজারফ আহমেদ হত্যা রহস্যে যেভাবে সে পুলিশের ওপর টেক্কা দিয়ে আসল খুনিকে ধরায়, তা রঞ্জনকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দেয়।
মুজারফ আহমেদ ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। রঞ্জনের পুরনো বন্ধু। বিশাল পৈতৃক সম্পত্তি ছিল ওঁদের। ওঁর ভাই মোক্তার ছিলেন আলিগড়ের বিখ্যাত শিশুবিশেষজ্ঞ ডাক্তার। দু’জনেই যে যাঁর পেশায় সাফল্যের চূড়ায় ছিলেন।
মুজারফের একটা শখ ছিল। বাড়ির কোনও কিছু খারাপ হলে মিস্তিরি না ডেকে তিনি নিজেই তা মেরামত করতেন। ওঁদের পুরনো দিনের তিনতলা চকমিলানো বাড়ির ঝুলবারান্দার বাইরে ঝুলন্ত একটি লাইট গ্রিলের বাইরে ঝুলে ঠিক করার সময় একদিন পড়ে গিয়ে মারা যান।
পুলিশ দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে কেসটার ইতি টানে। কারণ, সে সময় তাঁর ভাই ডাক্তার মোক্তার উপস্থিত ছিলেন বারান্দায়। তিনিই দাদাকে হাত পিছলে পড়ে যেতে দেখেন।
মুজারফের ভাই ডাক্তার মোক্তারের চেম্বার ছিল বাড়ির নিচে একটা ঘরে। তিনি দাদাকে তিনতলার চকমেলানো বারান্দায় বাইরে ঝুলে বাল্ব বদলাতে দেখে উপরে উঠে এসে দাদাকে বারণ করার করার আগেই হাত পিছলে সোজা তিনতলা থেকে নিচের চাতালে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা যান মুজাফর। পুলিশ শহরের নামকরা শিশু চিকিৎসকের বয়ান মেনে নেন। কারণ, তিনি ছিলেন ঘটনার সাক্ষী।
কিন্তু মোক্তায়ের বয়ান অনুযায়ী পুলিশের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি মুজারফের স্ত্রী। মুজারফ ছিলেন একজন দক্ষ পর্বতারোহী। সে কারণেই তিনতলা থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যাবার তত্ত্বটা তিনি মেনে নিতে পারনেনি। তিনি মুজারফের বন্ধু রঞ্জনকে বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে একবার দেখা করতে বলেন। রঞ্জন গিয়ে একটি বাল্বের সূত্র ধরে প্রমাণ করেন ওটা দুর্ঘটনা ছিল না, ওটা আসলে ছিল একটা খুন।
মোক্তারের জবানবন্দী মেনে না নেবার কোনও কারণ ছিল না। কারণ, দাদার মৃত্যুর পর ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কিছুদিন চেম্বারেও বসেননি।
রঞ্জন মোক্তারকে ভালোই চিনতেন। দাদার বন্ধু হিসেবে মোক্তারও যথেষ্ট পছন্দ করতেন রঞ্জনকে। মুজারফদের বাড়িতে বেশ কয়েকবার আড্ডাও মেরেছেন মোক্তারের সঙ্গে। তাই প্রথমে রঞ্জনও মোক্তারের কথা সত্য বলে ধরে নেন। কিন্তু যে বাল্ব পালটাতে গিয়ে মুজাফর পড়ে যান, সেই বাল্বটি দেখে রঞ্জনের সন্দেহ হয়। বাল্বটি একদম নতুন, কিন্তু ফিউজ হয়ে গেছে। অথচ বাড়ির লোকেরা জানিয়েছিল বাল্বটি বহুদিন পালটানো হয়নি এবং মুজাফর বাল্বটি পালটানোর আগেই পড়ে যান। নতুন বাল্বটি পড়ে ছিল বারান্দার একটি টেবিলে। মুজারফ ফিউজ হয়ে যাওয়া বাল্বটি খুলে নিয়ে এসে নতুন বাল্বটি লাগাতেন। কিন্তু ফিউজ বাল্বটি খোলার আগেই তিনি পড়ে মারা যান।
ফিউজ বাল্বটি খুলে নিয়ে রঞ্জন সেটিকে বিশেষজ্ঞদের দেখান। তাঁরা জানান, বাল্বটি নতুন এবং হাই ভোল্টেজ পাঠিয়ে বাল্বটির ফিলামেন্ট কাটা হয়েছে।
রঞ্জন খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন নিঃসন্তান মুজারফ ও তাঁর স্ত্রী একটি শিশুকে দত্তক নেবেন বলে দিল্লিরর একটি অনাথ আশ্রমে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু দত্তক নেবার বিষয়টি সমর্থন করেননি তাঁর পরিবারের গোঁড়া সদস্যরা। বিশেষ করে মোক্তার। দাদাকে বারবার বোঝালেও দাদা একটি শিশুকে দত্তক নিতে অনড় ছিলেন।
রঞ্জনের মোক্তারের আচার-আচরণে সন্দেহ হয়। খানিক জেরা করতেই ভেঙে পড়েন মোক্তার। স্বীকার করেন, রাগের মাথায় দাদাকে তিনিই খুন করেছেন।
মোক্তার ভালো করেই জানতেন দাদার ক্ষ্যাপামিーবিশেষ করে বাড়ির কোনও কিছু খারাপ হলে তা নিজে ঠিক করার নেশার কথা। তাই একটি বাল্ব কিনে সেটিকে ফিউজ করেন তিনি। তারপর ফিউজ বাল্বটি ঝুলিয়ে দেন তিনতলায় রাতের অন্ধকারে। জানতেন দাদা বাল্ব জ্বলছে না শুনলেই সেটা নিজেই পালটাতে চাইবেন।
তক্কে তক্কে ছিলেন মোক্তার। যেই নিজের চেম্বার থেকে দাদাকে তিনতলার বারান্দায় দেখেন, অমনি ওপরে ছোটেন উনি। ভাবখানা ছিল যেন দাদাকে ওই কাজটা করতে বারণ করতে যাচ্ছেন। তারপর তিনতলার বারান্দায় পৌঁছে চেঁচিয়ে দাদাকে বারণ করতে করতে টুক করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। কেউ ধরতে পারেনি মোক্তারের কীর্তি। কারণ, সবাই শুনেছে মোক্তার দাদাকে গ্রিলের বাইরে ঝুলতে বারণ করছে। মোক্তার দাদাকে খুব ভালোবাসতেন। রাগের বসে দাদাকে মেরে ফেলে তিনি মনের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তাই রঞ্জনের কথার ফাঁদে সত্যি ঘটনাটা বলে ফেলেছিলেন।


তমাল একজন পরিবেশ সংক্রান্ত আইন বিশেষজ্ঞ। মানালিতে বিপাশা নদীর গতিপথ বদলে হোটেল বানিয়েছিল একটি সংস্থা। পুরো বেআইনি কাজটার পেছনে ছিলেন এক ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তমাল ওই কেসে সংস্থাটিকে বাধ্য করেছিলেন হোটেল ভেঙে ফেলে নদীর গতিপথকে আবার তাঁর নিজস্ব ধারায় ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু তাঁর আগেই ক্ষতি হয়ে গেছিল ওই অঞ্চলের অনেক। হিমালয়ের ওই অঞ্চলে বন্যায় নদী-কিনারার গ্রামের পর গ্রাম ভেসে গিয়েছিল নদীর স্রোতে। 


***


সম্প্রতি দু’জনেই পেশা থেকে অবসর নিয়ে ফিরে এসেছেন কলকাতায়। ফলে আড্ডা মারার জন্য দু’জন দু’জনের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছেন।
আইনজ্ঞদের লাইব্রেরি সবসময় বিশাল হয়। আর এই লাইব্রেরিতেই সাধারণত আড্ডা চলে।
“বুঝলি তমাল, আমার লাইব্রেরির দফারফা হয়ে গেছে। এত বই, পোকায় কেটে সব শেষ করে দিয়েছে। টেরই পাইনি। আর এটা হয়েছে বছর দুয়েকের মধ্যে।” তমালের সঙ্গে নিজের লাইব্রেরি ঘরে আড্ডা মারতে মারতে বলেন রঞ্জন।
“এত বড়ো লাইব্রেরি বানিয়েছিস আর এত বই পোকায় কেটে দিল টের পাসনি? আরে এসব ব্যাপারে আগে সাবধান হওয়া উচিত ছিল।”
তমালের কথা শুনে খানিক উত্তেজিত হয়ে ওঠেন রঞ্জন। “সাবধান! তুই জানিস না, প্রতিমাসে নিয়ম করে পেস্ট-কন্ট্রোলের লোক এসে ওষুধ ছড়িয়ে যায় এঘরে। ইঁদুর, টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শাーকিচ্ছু নেই আমার বাড়ির ত্রিসীমানায়।”
“বেশি ওষুধ ছড়িয়ে ছড়িয়ে সর্বনাশটা করেছিস রঞ্জন, ওদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে। পোকামাকড় মারার বিষ আর সেরকম কোনও কাজ করবে না ওদের ওপর।” তমাল বলেন।
“আরে না, এখন আর ওষুধ স্প্রে করাই না। ঘরের সব দরজা-জানালায় নেট লাগিয়েছি, তাও মশা আটকাতে পারছি না। ইঁদুর, আরশোলা তাড়াবার জন্য অন্য হাতিয়ার রেখেছি। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। মনে হচ্ছে ওই ওষুধ স্প্রে করাই ভালো ছিল।” রঞ্জন বলেন।
“ক্রিমিনাল কেস করে করে তুই খুন-জখম-হাতিয়ার ছাড়া আর কিছু বুঝিস না নাকি, রঞ্জন?” তমাল হাসতে হাসতে বলেন।
“হাসছিস! হাস, কিন্তু আমার হাতিয়ারটা কী তা তো শোন!”
“কী আর হবেーইঁদুর ধরার কল, স্টিকি প্যাডーযার ওপর দিয়ে ইঁদুর, আরশোলা, টিকটিকি হাঁটলেই আটকে যায়। ওটা কিন্তু একটা ক্রিমিনাল অফেন্স।” তমাল বলে ওঠেন।
“আরে ওসব কিছু না। জানিস তো, আমার গিন্নির বেড়ালের শখ। মায়ের ষাট বছরের জন্মদিনে আমার ছেলে আমেরিকা থেকে একটা লাপার্ম বেড়াল আনিয়ে দিয়েছিল। ওঁর আবার হাঁপানির রোগ। ডাক্তার বাড়িতে একদম পেস্টিসাইড স্প্রে করাতে মানা করে দিয়েছে। তাই অনেক পড়াশুনা করে এই লাপার্ম বেড়াল আনিয়েছিল ছেলে। এই বেড়াল ইঁদুর, টিকটিকি, আরশোলা তাড়াতে ওস্তাদ। টিকটিকি দেখলে আর রক্ষা নেই। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে একশা করে। পরশুদিন টিকটিকির পিছনে ছুটে একটা ফুলদানি ভেঙেছে।”
“ঠিকই তো! তোর বাড়িতে তো একটাও টিকটিকি নেই। তবে যাই বল, পেস্টিসাইড স্প্রে বন্ধ করার পর তোদের বাড়িতে মশার উপদ্রব খুব বেড়েছে।” তমাল বলেন। “তা আয় না সামনের সপ্তাহে আমাদের বাড়ি। অনেকদিন আসিস না। নতুন অনেক বই আনিয়েছি। এবার আর আইনের কেস হিস্ট্রি নয়। সব নভেল। অ্যামাজন থেকে।”


***


“আরে, তোর লাইব্রেরি তো একদম ফিট! একটা বইও নষ্ট হয়নি!” তমালের লাইব্রেরির বইগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে রঞ্জন বলেন, “অনেকদিন পর তোদের বাড়ি এলাম।”
“ঘরে মশা আটকানোর নেট লাগাসনি?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন রঞ্জন।
“না, লাগাতে পারিনি। মশা আটকানোর নেট লাগালে নাকি দমবন্ধ দমবন্ধ লাগে আমার গিন্নির।” তমাল বলেন।
“তুই ভাগ্যবান। তোদের বাড়ি খুব একটা মশার উপদ্রব নেই।” রঞ্জন হাসতে থাকেন।
“আরে, সবটাই আমার পুষ্যির গুণ!” হাসতে থাকেন তমালও।
“সে কি রে! কী পুষ্যি রেখেছিস বাড়িতে যে সব মশা আর পোকা উধাও?”
“পুসি ক্যাট!”
“পুসি ক্যাট! মানে বেড়াল পুষে!”
“ঠিক। পুসি ক্যাট পুষে আমার ঘরে আর খুব একটা পোকামাকড় বা মশা নেই। তবে ঘরবাড়ি একটু নোংরা হয়, এই যা।”
“তোর রহস্য করে কথা বলার স্বভাবটা কোনোদিন যাবে না তমাল। আমার বাড়িতেও তো বেড়াল আছে। সে বেড়ালের জন্য টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শার উপদ্রব প্রায় নেই বললেই চলে। তবে আমার বেড়াল মশাকে বাগে আনতে পারেনি। বেড়ালটাকে এমন ট্রেনিং দিয়েছি যে সে ঘরদুয়ার খুব একটা নোংরা করে না। টুক করে বাগানে চলে যায়।” গর্বিত ভাব রঞ্জনের গলায়। “পশুপাখিকে ট্রেনিং দেওয়া একটা আর্ট, বুঝলি পরিবেশপ্রেমী?” এর আগের দিন তমালের ক্রিমিনাল বলে খোঁচা মারার বদলা নেন রঞ্জন।
“একদম ঠিক শিকারি ট্রেনার। আমার পুসিকে দেখ, বইয়ের আলমারির ওপর উঠে শুয়ে আছে। ও খালি আদর, মাছ আর দুধ খেতে ভালোবাসে। ব্যাটা এমন ভীতু যে টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শা মারা তো দূরের কথা, দেখলেই ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।” তমাল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন। “তবে তোর বেড়ালের মতো আমার পুসিও বাথরুম ব্যবহার করতে জানে।”
রঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে যেন কোনও ক্রিমিনালকে জেরা করছেন এরকম ভঙ্গীতে বলেন, “তবে যে বললি তোর পুষ্যি ঘর নোংরা করে!”
“অস্বীকার করছি কোথায়? বরং জোর গলায় বলছি, আমার পুষ্যিরা ঘর নোংরা করে।” হাসতে হাসতে উত্তর দেন তমাল।
“পুষ্যিরা! তার মানে আরও কিছু পুষেছিস? আর সেটা আমার কাছে চেপে গেছিলি। ভাবলি কী করে আমার কাছ থেকে চেপে থাকতে পারবি? বল আর কী কী পুষছিস।” খানিক উত্তেজিত হয়ে ওঠেন রঞ্জন।
“আরে চেপে থাকব কেন? তোর সামনেই তো ওরা ঘুরে বেড়াচ্ছে!” তমাল শান্ত গলায় বলেন।
“আমার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে! কী বলতে চাইছিস তুই? আমার চোখ খারাপ, না ওরা ভূত যে সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমি দেখতে পাচ্ছি না!”
“আরে না, ওসব ভূত-টুত কিছু নয়, আমি যাদের পুষছি তারা তোর আশেপাশেই আছে। ওরাই আমার মশা তাড়ায়, বই বাঁচায়।”
খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে রঞ্জন বলেন “অনেক বয়স হয়েছে, এখন মিথ্যে বলাটা বন্ধ কর তমাল। আর এটা তোর এজলাস নয় যে কথার ফাঁদ পাততে হবে।”
“ভুলে গেছিস রঞ্জন, তোর সাথে ল কলেজে সেই প্রথমদিন দেখা হবার কথা? একটা পেন দিয়ে তুই তোর দাদুর একটা উক্তি আমাকে শুনিয়েছিলিー‘আইন পড়তে যাচ্ছ, আর যাই করো কলমের কালি শেষ হতে দিও না। কলমের জোর সবচাইতে বেশি। আর চোখ কান সবসময় খোলা রেখ।’ আমি সেকথা ভুলিনি। শুধু তাই নয়, সেই পেনটা এখনও রেখে দিয়েছি বন্ধুত্বের প্রথম উপহার হিসেবে। তোর সেই পেনটার কথা মনে নাও থাকতে পারে। আমার আছে। এই দেখ।” ড্রয়ার খুলে একটা ভেলভেটের বাক্স থেকে একটা পেন বের করেন তমাল।
পেনটা হাতে নিয়ে খানিক চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন রঞ্জন।
“আমি সত্যিই ভুলে গেছিলাম পেনটার কথা। তুই যে একটা তুচ্ছ প্লাস্টিকের পেন এত যত্ন করে রেখে দিবি আমি ভাবতে পারিনি। আমায় ভুল বুঝিস না তমাল। কিন্তু তোর কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কাদের কথা বলছিস তুই?”
“দেখ, আমি পেশা হিসবে বেছে নিয়েছিলাম পরিবেশ আইনকে। কারণ, আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসি। বহুদিন আগে শিলং গেছিলাম একটা কেস লড়তে। সেখানে গিয়ে আমার এক লেখক বন্ধু তার লাইব্রেরি সে কী করে পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচায় তার পন্থা দেখায়। আমি সেটা আমার লাইব্রেরিতেও অ্যাপ্লাই করেছি। তাই একটা বইও আমার নষ্ট হয়নি।”
খানিক চুপ করে থেকে আবার শুরু করেন তমাল। “আমি আমার ঘরে একটা বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলেছি শুধু। সেটা সাধারণ লোকের চোখে ধরা পড়ার নয়। ভেবেছিলাম তোর মতো এক দুঁদে ক্রিমিনাল লইয়ার ধরে ফেলবে। তুই একটা বাল্ব দেখে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া একটা কেসকে প্রমাণ করেছিলি ওটা দুর্ঘটনা ছিল না। ছিল খুন। মধ্যে আমাদের বহুবছর দেখা হয়নি ঠিকই, কিন্তু আমি তোর সব খবর রাখতাম। আমি তোকে একটা নোংরা পরিষ্কার করার কথা বলেছি, সেটা ওই বাস্তুতন্ত্রের ফল।” একনাগাড়ে বলে যান তমাল।
“কিন্তু এই পোষ্যগুলো কী সেটা তো এবার বল। আমিও একবার আমার লাইব্রেরিটা বাঁচানোর চেষ্টা করে দেখি।”
“ধীরে বন্ধু, ধীরে। এই কাজটা করতে গেলে প্রথমে যে কাজটা করতে হবে সেটা হল তোমার লাইব্রেরি ঘর থেকে ওই আমেরিকান শিকারি বেড়ালটা সারানো।”
“কী বলছিস তুই, লাইব্রেরি বাঁচানোর সঙ্গে ওই বেড়ালের কী সম্পর্ক?”
“আছে বন্ধু, আছে। এতদিন ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করছি। এটাই আমার স্পেশালিটি। ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন গাছ থাকে। কোনও নষ্ট হয়ে যাওয়া জঙ্গলকে নতুন করে গড়ে তুলতে যদি ভুল গাছ লাগানো হয় তাতে গাছগুলো হয়তো বাঁচবে, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হয়ে যাবে। যেমনি হয়েছে ইউক্যালিপটাস গাছ লাগিয়ে। তাতে মাটি থেকে রস শুষে ওই গাছ অন্য গাছকে মেরে ফেলেছে, নয়তো সেই জায়গাটার চরিত্র বদলে দিয়েছে।
“তোর ওই শিকারি বেড়ালটাও টিকটিকি, আরশোলা, মাকড়শা মেরে ঘরের বাস্তুতন্ত্রটা নষ্ট করে দিয়েছে। মাকড়সা তোর বইয়ের ক্ষুদে পোকাগুলো খেয়ে নিত। আর ওই মাকড়সাগুলোকে খেত আরশোলারা। আর আরশোলাগুলোকে খেত টিকটিকিরা। কিন্তু এখন সেই মাকড়শা, আরশোলা আর টিকটিকিগুলোকে তোর ওই শিকারি বেড়ালটা মেরে ফেলে ঘরের বাস্তুতন্ত্র দিয়েছে ধ্বংস করে। তাই ওই মাকড়শার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ক্ষুদে পোকার দল বাসা বেঁধেছে তোর বইয়ের আলমারিতে। এতে যা হবার তাই হয়েছে। যেই তুই পেস্টিসাইড ছড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিস, ক্ষুদে পোকার দল ফিরে এসে বাসা বেঁধেছে বইয়ের র‍্যাকে। কেটে শেষ করেছে তোর সম্পদ। হু হু বাওয়া, পুষ্যি বাছাই অত সহজ নয়। না হয় রোজ খানিক টিকটিকির ময়লা পরিষ্কার করতে হয়।”


___


অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

No comments:

Post a Comment