গল্পঃ উদ্বোধনঃ প্রান্তিক বিশ্বাস



এক

স্কুলে একটা টয়লেটের উদ্বোধন হবে পরশু। ঋষির তাই ঘুম নেই।
ঋষিরাজ সাহা ক্লাস এইটে পড়ে, রেসিডেন্সিয়াল-স্কুলে। বন্ধুরা ভারি অসভ্য! টয়লেট যেতে হলে বলে ‘ঋষি করতে যাব।’ ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যে হলে তবুও একটা কথা ছিল। একবার তো জিওগ্রাফি ক্লাসে আচার্য-স্যারকে সুতনু বলল, “স্যার, ঋষি পেয়েছে। যাব?”
ক্লাসের ছেলেরা খিকখিক করে হেসে উঠল।
আচার্য-স্যারের এমনিতেই হাসি শুরু হলে থামে না। উনি বললেন, “আবার বল।"
সুতনু দুষ্টু নম্বর ওয়ান! কই কথা আবার বলল একটু জোরে। সারা ক্লাস এবার হো হো করে উঠল। স্যার প্রথমে মুখ চাপা দিলেন; তারপর আড়চোখে সেকেন্ড বেঞ্চে জানালার ধারে বসা ঋষির দিকে দেখলেন। ঋষির ফর্সা মুখটা ফ্যাকাসে, কানদুটো লাল হয়ে উঠেছে। ওর থেকে চোখ ফিরিয়ে দেখলেন যে সুতনু ওঁর পারমিশনের অপেক্ষা না করেই চম্পট দিয়েছে। জিজ্ঞাসু চোখে দরজার ধারে বসা দেবরূপের দিকে তাকালেন। গম্ভীর মুখের দেবরূপ রোবটের মতন বলল, “ঋষি করতে চলে গেছে।”
এবার স্যার আর সামলাতে পারলেন না। হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা ধরে গেল। পেটে হাত দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লেন। ক্লাসের ছেলেরাও কেউ মেঝেতে, কেউ বেঞ্চে, কেউ পাশের ছেলের ঘাড়ে পড়ে গেল। অন্য ক্লাস থেকে শোভন-স্যার ছুটে এলেন।
আচার্য-স্যারের ব্যায়াম করা শরীরছাত্রদের মতে ওঁর সারা শরীরেই নাকি গুল্লি গুল্লি মাসল। নেহাত ফুলহাতা পরেন বলে দেখা যায় না। আধবুড়ো রোগাপটকা শোভন-স্যার ওঁকে হাত ধরে টেনে তুলতে গেয়ে নিজেও মেঝে নিলেন। আচার্য-স্যার আর সারা ক্লাসের হাসি আরও জোর হল। এবারে ঋষিও ক্যাবলা ক্যাবলা মুখ করে হাসতে লাগল।
ঋষির সমস্যা হল ও চাপতে পারে না। একদম না। একটু পরপরই ওর পেটে চাপ পড়ে। অথচ বাবা বলেছে, ‘যত পারবি জল খাবি, জলই তো জীবন।’ বাবা জানে ওর সমস্যার কথা। বাবার বক্তব্য, ‘পেলে যাবি, কিন্তু জল খাওয়া কমাবি না। জল বেশি খেলে শরীরে ফ্যাট জমতে পারে না।’ বাবাও রাস্তায় ওর সঙ্গে বেরোলে ঠাট্টা করে বলে, ‘এখানে কোথায় টয়লেট পাব, বল?’ চেনা রাস্তায় ঋষি গুগল ম্যাপের থেকেও চটপট বলে দেয় কাছাকাছি কোথায় আছে।
সেদিন ডাইনিং রুমে রাতে খেতে বসে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড রীতেশকে ক্লাসের ঘটনাটা বলছিল ঋষি। রীতেশ অন্য সেকশনে পড়ে।
সব শুনে ও সান্ত্বনা দিয়েছিল ঋষিকে, “ভাগ্য ভালো তোর, কেউ তোকে হিসি বলে ডাকে না।”

দুই

এটা নিয়ে ঋষি প্রায়ই ভাবে। অন্যদের তো হয় না! প্রায় কারোর না। ওদের আগের ক্লাসের অর্কজ্যোতিদা, সে ক্লাস সেভেন অবধি রাতে বিছানা ভিজিয়ে ফেলত। তাই ওর বিছানায় সবসময় থাকত অয়েল ক্লথ। ক্লাস এইটে উঠে আর একদিনও করেনি। কী এমন হল যে হঠাৎ এটা থেমে গেল? অর্ককে একদিন ক্লাসের পর একা পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল কারণটা। অর্ক কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কোনও সদুত্তর না দিয়ে দৌড় দিল খেলার মাঠের দিকে।
পরেরদিন অ্যাসেম্বলি হলে ঢোকার মুখে আবার দেখা দু’জনের। অর্ক ওর কাঁধে সহানুভূতির হাত রাখল। “জল কম খা, তাহলেই তোর কমে যাবে।”
“জল তো অনেকেই বেশি খায়!” ঋষি আমতা আমতা করল।
“তোর ব্লাডারটা মনে হয় ছোটো। ডাক্তার দেখাস।”
বেল পড়ল অ্যাসেম্বলির। অর্ক আবার অ্যাসেম্বলির মনিটর। ছুটল ডায়াসের দিকে।

মাসে দুটো রবিবার বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজনরা ছেলেদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। পরের রবিবার বাবা-মাকে অর্কর বক্তব্যটা শোনাল। এর ফল হল তিন ঘণ্টার ভিজিটিং আওয়ারটা বাবা-মায়ের ঝগড়া করেই কেটে গেল। বাবার বক্তব্য এটা কোনও বড়ো ব্যাপার নয়, অন্তত ডাক্তারকে দেখানোর মতন তো নয়ই। সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে। অন্যদিকে মায়ের মতে অর্ক ঠিকই বলেছে। সবার এরকম হয় না। ব্লাডারের প্রবলেম হতেও তো পারে। ভগবান না করুন, খারাপ কিছু না হয়। খারাপ কিছুর দিকে যাতে না যায়, তার জন্য ডাক্তার দেখানো উচিত। অন্যান্য দিন দু’বার টয়লেট ঘুরে আসে ভিজিটিং আওয়ারে। সেদিন ঋষি গেল চার বার!

ওদের খেলার মাঠ বিশাল বড়ো। গরম আর বর্ষায় ফুটবল, অন্যসময় ক্রিকেট। চারটে ক্লাসের সব সেকশনের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা। ওদের হোস্টেলের বাড়িগুলো থেকে মাঠ বেশ দূরে। আর সেখানেই ঝামেলা। খেলতে খেলতে হিসি পেয়ে গেলে ছেলেরা চলে যায় মাঠের ধারে। ওখানেই কাজ সারে। মাঠের পাশেই একটা কবরস্থান। তার পাঁচিল বেশ নিচু। এক মানুষ উঁচু বড়োজোর। কয়েক জায়গায় উপরটা ভেঙে গেছে। দুষ্টু ছেলেরা ঠিক এই ভাঙা জায়গাগুলো বেছে নেয় হিসি করার সময়। চেষ্টা থাকে পাঁচিল পার করার। কোনও ক্লাসের কেউ সেটা পারে না ঋষি ছাড়া। এ ব্যাপারে তাই ওর একটা প্রছন্ন গর্ব আছে। একবার দু’বার নয়, গত দু’বছরে পাঁচিল পার করার হাফ সেঞ্চুরি হয়ে গেছে।
ক্লাস টেনের দাদারা একদিন ওকে স্কুলের পর ধরেছিল। ওদের মেকানিকস ক্লাসে নাকি প্রসূন-স্যার প্রজেক্টাইল বোঝাতে গিয়ে ওর কথা তুলেছিলেন। রীতিমতন ট্রিগোনোমেট্রির জটিল সব ফর্মুলা দিয়ে বুঝিয়েছেন যে ঋষির প্রজেক্টাইলের ম্যাক্সিমাম হাইট আর বেকহ্যামের ফ্রি-কিকের রেঞ্জ অন্যদের থেকে বেশি কেন। এইসব কথা শুনলে মনটা অনেক হালকা হয়ে যায়। ওর কীর্তির কথা এইজন্যেই হাওয়ায় ছোটে! মাঠ থেকে হোস্টেলে পৌঁছনোর আগেই ওর নামে নালিশ পৌঁছে যায়। হোস্টেলের ওয়ার্ডেনদের বেধড়ক মার অনেক সহ্য করতে হয়েছে।

তিন

বাবা বলছিল, মেকানিকস নাকি ফিজিক্সেরই একটা অংশ। ফিজিক্সে তাই এখন একটু বেশি আগ্রহ ঋষির। এই স্কুলে প্রত্যেক মাসে পরীক্ষা হয়। এবার ফিজিক্সে ছিল রেস্ট অ্যান্ড মোশন। ফার্স্ট বেঞ্চে বসে ছিল ঋষি। কোশ্চেন পেপার একটু দেখে নিয়েই বলল, “স্যার, টয়লেট?”
নেহাত ওর ব্যাপারটা সবাই জানে, তাই যেতে দেওয়া হল। বাকিরা যথারীতি খোরাক করছিল ওর। কিন্তু কোশ্চেন পেপার দেখে কয়েক মিনিট সবাই চুপ। তারপর পরীক্ষা হলে একটু হালকা গুঞ্জন তৈরি হল। ছেলেপিলে বিড়বিড় করতে শুরু করল, ‘এটা ফিজিক্স, নাকি ম্যাথস? অঙ্কের পর অঙ্ক, এমনকি গ্রাফও আঁকতে হচ্ছে!’
ফিসফিস ক্রমে হৈ-হৈয়ের পর্যায়ে যেতে লাগল। গার্ড দিচ্ছিলেন অতীন-স্যার। ইনি নাকি একাধিক সাবজেক্টে এম.একেউ বলে তিনটেতে, কেউ বলে পাঁচটাতে! তাই উনি সাধারণত লাইব্রেরি ক্লাস নেন, বুক স্টোরও মাঝে মাঝে সামলান। একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, “সবক’টাকে এবার নিলটি ডাউন করে রেখে দেব!”
যাই হোক, সেদিন তিনবার টয়লেট ঘুরে এসে পরীক্ষাটা বেশ ভালো দিয়েছিল ঋষি। বাকিরা সবাই যখন উত্তর মেলাচ্ছিল হল থেকে বেরিয়ে, ও দু’কানে আঙুল ঢুকিয়ে ছিল। সবক’টা অঙ্ক ভালোভাবে করেছে, কোশ্চেনগুলো খারাপ লেখেনি। পরেরদিন বাবা-মা এলে সগর্বে বলল যে এবার হয়তো ফিজিক্সে হাইয়েস্ট পাবে ক্লাসে।
নম্বর দেওয়ার দিন সবাই তটস্থ।
অরিজিৎ-স্যার বেশ গম্ভীর লোক, কখনও ওঁকে হাসতে দেখা যায়নি। সব খাতাই লালে লাল। পঞ্চাশে সবাই কুড়ির তলায়, তার মানে ফেল। একজন ছাড়া। সে পেয়েছে বাইশ। সবাই কেমন থম মেরে বসে আছে, ঋষি ছাড়া। একটা অঙ্কে পাঁচ ছিল। সব স্টেপ ঠিক করেছে, খালি লাস্ট স্টেপে গিয়ে একটা ছোট্ট ভুল। এখানে যদি অরিজিৎ-স্যার পার্ট মার্কিং করেন, তাহলে ওর হাইয়েস্ট পাওয়া আর তার সঙ্গে পাশ করে যাওয়া আটকায় কে!
অরিজিৎ-স্যার পায়ের উপর পা তুলে পান চিবোতে চিবোতে ক্লাস নাইন বা টেনের খাতা চেক করছেন। ঋষি আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে ওঁর সামনে দাঁড়াল। উনি মুখ তুললেন না।
“স্যার?”
কোনও উত্তর বা নিজের কাজের কোনও পরিবর্তন করলেন না উনি।
“স্যার, একটা জিনিস দেখাতে চাইছিলাম।”
“আমার সব দেখা হয়ে গেছে বলেই খাতা এখন তোদের হাতে।”
“মানে, একটা জায়গা…”
এবার উনি খাতার বান্ডিল পাশে সরিয়ে রাখলেন। ঋষি অঙ্কটা বার করে দেখাল। শেষ স্টেপে চারশো ষাটকে দুই দিয়ে ভাগ করে উত্তর লিখেছে তেইশ।
“স্যার, এই অঙ্কতে সবক’টা স্টেপ ঠিক করেছি। খালি লাস্টে একটা শূন্য মিস করে গেছি।”
স্যার মুখটা এবার তুলে ঋষির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাই তো আমি তোর জন্য বসিয়ে দিয়েছি ওটা। একটু পাশে।”

চার

কাছের চার্চ থেকে এই নিয়ে চারবার কমপ্লেন করে গেলেন ফাদার সহ বেশ কিছু লোক। দাবি, স্কুল যাতে কিছু একটা ব্যবস্থা করে। কবরস্থানের এদিকে কেউ আসতে পারে না, এত দুর্গন্ধ! হেড-স্যার নাকি ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন, কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন শিগগির।
পরদিন স্কুল চলাকালীন হেড-স্যারের ঘরে ঋষির ডাক পড়ল আবার। নতুন কিছু না সেটা। এবার অন্যরকম হল হেড-স্যারের, ‘ওকে, কাম-ইন।’ বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়া। যেন কোনও গেস্ট এসেছে এমনভাবে ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন। “চলো আমার সঙ্গে।” বলে আর দাঁড়ালেন না।
বেশ জোরে হাঁটেন। ঋষি মিনিট খানেক একটু থমকে গেছিল, তারপর সম্বিৎ ফিরতে প্রায় দৌড়ে হেড-স্যারকে ধরে ফেলল।
উনি স্কুল বিল্ডিং থেকে হেঁটে বাইরে গেলেন। ঋষি ওঁর পাশে পাশে হাঁটছে। পেটে একটু চাপ আসছে, কিন্তু হিসি এখন চাপতে না পারলে নির্ঘাত টিসি।
উনি খেলার মাঠের দিকে যাচ্ছেন। রাস্তায় পড়ল দু’জন দারোয়ান। তারা স্যালুট ঠুকল বড়সড়। আর পড়লেন দু’জন স্যার, তাঁরা ‘গুড মর্নিং’ বললেন। হেড-স্যার কিছু উত্তর করলেন না; ভালো করে কাউকে নজরও করলেন না মনে হয়। ঋষি অবশ্য দুই স্যারকে ‘গুড মর্নিং’ বলল।
এইসময় ঋষি মাঠে কখনও আসেনি। কেউ কোথাও নেই। কেয়ারটেকার-দাদু মাঠের পাশেই একটা ঘরে থাকেন, ওঁর দরজায় তালা দেওয়া। হেড-স্যার মাঠে ঢুকেও থামলেন না। হাঁটতে থাকলেন মাঠের উত্তর দিকে, যেদিকে কবরস্থানের পাঁচিল।
“তুমি জানো তো ওদিকে কবর আছে কতজনের?”
“হ্যাঁ, স্যার!”
“তাহলে এখানে টয়লেট করো কেন?”
“আমি একা করি না, স্যার।”
“বাকিদের কথা জিজ্ঞেস করিনি। তোমাকে করছি।”
“স্যার, চাপতে পারি না। হোস্টেল বা স্কুল অনেকটা দূর তো।”
“এখন পেয়েছে?”
ঋষি দু’পাশে মাথা নাড়ল। চাপটা যেন বহুগুণ বেড়ে গেল!
“লাস্ট কখন গেছ?”
“স্যার স্কুলে আসার আগে, হোস্টেলে।”
“ফেরা অবধি চাপতে পারবে তো?”
“না, স্যার।”
“যাও।”
“কোথায়, স্যার?”
মাথাটা ওদিকে ফিরিয়ে পাঁচিলের দিকটা বোঝালেন উনি। ঋষি ওঁর মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তারপর ছুট দিল পাঁচিলের ভাঙা জায়গাটার দিকে। প্রজেক্টাইলটা অন্যদিনের থেকেও যেন জোরালো হল।
হেড-স্যারের কাছে ফিরে আসতেই উনি আবার স্কুলের দিকে হাঁটা লাগালেন।
“এখানে করে হাত কোথায় ধোও?”
“হাত?”
“হ্যাঁ। এরপর হাত ধোয়া উচিত জানো না?”
“ইয়েস স্যার। এরপর থেকে ধোব।”
“এখানে তো কোনও কলও নেই।”
ঋষির মুখে কথা সরল না।
“এখানে যদি একটা টয়লেট করে দেওয়া হয় তাহলে পাঁচিলে করবে না তো?”
“না, স্যার। টয়লেট থাকলে খুব ভালো হয়।”
“হুম। প্রমিস করো তাহলে।”
ঋষি একটু বল পেল বুকে। “প্রমিস, স্যার। অন্য কেউ যাতে না করে সেটাও দেখব।”
এবার হেড-স্যারের মুখে হাসির ঝিলিক খেলে গেল। ঋষির মাথার চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিয়ে উনি বললেন, “বেশ। মিউজিকে কী আছে তোমার?”
ওদের স্কুলে তিনটে অপশন আছে মিউজিকেগান, তবলা আর সেতার।
“স্যার, তবলা ছিল দু’বছর। ভালো পারতাম না বলে আগের বছর গান নিয়েছিলাম। সেটাতেও ভালো করতে পারিনি।”
“আচ্ছা। তাহলে এবারে সেতার নিয়ে দেখো।”
“সেতার তো খুব শক্ত। সবাই বলে। তাছাড়া কয়েকদিন ক্লাস হয়ে গেছে।”
“সবাই কী পারে সেটা দিয়ে বিচার কোরো না। হতেই পারে তুমি সেতারে ভালো করবে। কে বলতে পারে? ক্লাস তো মনে হয় খান তিনেক হয়েছে। আর সেতার তো খালি ক্লাস এইটেই আমরা শেখাই। অ্যাপ্লাই করে দেখতে পারো।”
স্কুল এসে গেছে। হেড-স্যার এবারে ঢুকে গেলেন নিজের ঘরে।

রীতেশকে পুরো ঘটনাটা বলল ঋষি।
“তাহলে কি তুই সেতার নিবি?”
“হ্যাঁ। তুইও নিবি কিন্তু।”
“আমি কি পারব?”
“আমিও পারব, তুইও পারবি।”
ক্লাস এইটের প্রথমেই ওরা দু’জনা ঠিক করেছে, যা করবে একসঙ্গে করবে।

পাঁচ

মিউজিক ক্লাস সব সেকশন মিলে হয়। স্কুল বিল্ডিংয়ের পেছন দিকে দোতলায় ক্লাস হয় প্রতি সপ্তাহে দু’বার। করিডোরে সেতারের ক্লাসরুম সব থেকে আগে, তারপর গান, শেষে তবলা।
সেতারের ক্লাসে ঋষি আর রীতেশকে নিয়ে তিনজন। তৃতীয় জন সৌগত একটু মাতব্বরি করল প্রথম ক্লাসে। আগে চারটে ক্লাস করে ও এখন সিনিয়র। টিচার মৃণাল দত্ত চোখে দেখতে পান না। লাঠি নিয়ে হাঁটেন। একটু ভারী চেহারা, অনেকটা সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমার হিরোদের মতন। দু’জন নতুন জয়েন করাতে উনি ভীষণ খুশি।
“তা তোমরা হঠাৎ গান-তবলা ছেড়ে এখানে কেন?”
“স্যার, আমরা দুটোই করেছি আগে। ফাইভ-সিক্সে তবলা আর সেভেনে গান।” রীতেশ বলল।
“আর স্যার, দুটোতেই কোনোরকমে পাশ করেছি তো, তাই ভাবলাম সেতারটা যদি…” ঋষি ফস করে বলে ফেলল।
“চিন্তা কোরো না। মন দিয়ে শিখলে নিশ্চয়ই পারবে। ভালো কথা, আঙুলে কিন্তু খুব লাগবে, ব্যথা হবে, কেটেও যেতে পারে। একটু তেল নিয়ে আসবে ঘর থেকে, বাজানোর আগে লাগিয়ে নেবে আঙুলে। ব্যান্ড-এডও লাগাতে পারো প্রথম প্রথম। সৌগত, ওদের একটু বলে দিও কী কী করতে হবে।”
প্রথমে শেখানো হল সেতার নিয়ে ঠিকমতন পা মুড়ে বসা। এই বসার ধরনেই যন্ত্রটার প্রতি একটা ভক্তি আসে। মৃণালদার ব্যবহার, কথাবার্তায় ওরা সবাই মুগ্ধ। এরকম ভালো কোনও টিচার আগে কখনও দেখেনি। ভুল করলে হেসে ধরিয়ে দেন। চোখে না দেখতে পেলেও ওঁকে ফাঁকি মারা অসম্ভব মনে হচ্ছিল। সবচেয়ে বড়ো কথা, ওঁকে ফাঁকি দেওয়ার কথা মাথাতেই আসছিল না ঋষির। যত্ন করে উনি শেখালেন স্ট্রোক দুটো। “এই হল ডাঁ, আর এই হল রাঁ।”
সেতারের কাঁধ থেকে বুড়ো আঙুল খালি পিছলে যাচ্ছিল রীতেশের। উনি নিজে হাতে ওটা চেপে ধরে বসে থাকলেন ওর পেছনে। তাতে ডাঁ আর রাঁ দুটোই যেন প্রাণ পেল। সেই ডাঁ রাঁ চলল বাকি টানা কুড়ি মিনিট।
সৌগত বেশ ভালো বাজালো। ওদের মধ্যে সবথেকে বাজে হল ঋষির বাজানো। স্যার কিন্তু ওকে বললেন, “তোমার হবে। প্র্যাকটিস করতে হবে বেশি করে।”
এরপর আমীর খুসরোর উপর কিছুটা ডিকটেশন দিলেন উনি। ছেলেদের আঙুলগুলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

মাঠের ধারে টয়লেট তৈরি শুরু হয়েছে। বেশ জোরকদমে কাজ চলছে। হেড-স্যার ঋষিকে প্ল্যানটাও দেখিয়েছেন। এই প্রথম ও কোনও সিভিল প্ল্যান দেখল। দুটো পটি করার ঘর, তার সামনে লাইন দিয়ে চারটে ইউরিনাল আর পাশে দুটো বেসিন। কয়েকদিন বাদেই হয়ে যাবে তৈরি।

সেতারে উৎসাহ পেয়ে গেছে ঋষি। মৃণালদা ওকে বেশ স্নেহ করেন। বলেন ওর দ্বারা নাকি হবে। খালি প্র্যাকটিস আরও অনেক করতে হবে। ঋষির নিজের কানে এখনও ওর বাজনা বেসুরো লাগে। কিন্তু মনে হয় সেটা অন্য দু’জন বন্ধুর থেকে ভালো।
রীতেশ ওদিকে সেতারে হাল ছেড়ে দিয়েছে। ওর আঙুলগুলো বেশ নরম, তার উপর হাত ঘামে; বেচারা একদম সুবিধে করতে পারে না। আঙুল কেটে দু’বার রক্ত বেরিয়েছিল বলে ওর গার্জেন এসে কমপ্লেন করেছে হেড-স্যারকে। মৃণালদা তাই ওকে আর চাপ দেন না বাজাতে। ক্লাসে বসে ও গল্পের বই পড়ে, পা টিপে টিপে বাইরে চলে যায়।
যেদিন ঋষি ‘পুরানো সেই দিনের কথা’র প্রথম দিকটা প্রায় তুলে ফেলল, সেদিন মৃণালদাকে বলে রীতেশ গানের ক্লাসে ফিরে গেল।
রাতে খাওয়ার পর রীতেশ ওকে একপাশে নিয়ে বলল, “তুই সবকিছুতেই মাঝারি। এক্সট্রা-অর্ডিনারি হতে তুই পারবি না, সে যতই প্র্যাকটিস কর।”
ঋষি একটা পেল্লায় হাই তুলল।

ছয়

রীতেশ আর অন্বয় করিডোরে ঘোরাফেরা করছে। সেতারের ক্লাসের ঠিক সামনে এসে বলছে, “ডাঁ রাঁ… ডাঁ রাঁ… ডাঁ রাঁ… ডাঁ রাঁ।”
গানের আর তবলার ক্লাস সময়ের আগেই ছুটি দিয়ে দিয়েছে, তাই দু’জনা এই দুষ্টুমি শুরু করেছে।
মৃণালদা ওঁর ঘড়ির কাঁচটা তুলে হাত বুলিয়ে সময় দেখলেন, এখনও মিনিট দশেক বাকি ক্লাস শেষ হতে। দশ-বারোজন আরও জুটে গেল। করিডোরে দাঁড়িয়ে সবাই কাকেদের মতন ডাঁ রাঁ... ডাঁ রাঁ করতে লাগল।
সৌগত বিরক্ত হয়ে বাজানো থামিয়ে দিয়েছে। এবার দুই মূর্তি সোজা ক্লাসের ভেতর একটু ঢুকে এল। “ডাঁ রাঁ… ডাঁ রাঁ… কী রে, বাজা বাজা, থামলি কেন? ডাঁ রাঁ… ডাঁ রাঁ…”
“এই এই! কে রে? কে ওখানে?” মৃণালদার চোখমুখ পুরো লাল।

সেতারের ক্লাস হয়ে গেছে। সৌগত অনেকক্ষণ চলে গেছে। ঋষি তাও বাজিয়ে যাচ্ছে। ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ আজ তুলবেই পুরোটা। অনেকক্ষণ বাদে খেয়াল করল মৃণালদা ঘরে নেই। প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। উঠে আলো জ্বালাল। মন দিয়ে সেতার বাজাতে বাজাতে ঋষি ভুলে গেছিল হিসির কথা। পাশে গানের ক্লাস। দরজার অল্প ফাঁক দিয়ে দেখল মৃণালদা আর অপূর্বদা গল্প করছে। অপূর্বদা গান শেখান।
ইউরিনালের সামনে দাঁড়িয়ে কাজটা যখন ঠিক মাঝামাঝি, বেগ সবচেয়ে বেশি, পেছনে শুনল ঠক ঠক…। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছনে ক্যাঁক করে খোঁচা দিল ভিজে একটা লাঠির ডগা। অ্যাঁইক করে একটা আওয়াজ ঋষির মুখ থেকে বেরোতেই মৃণালদা পেছন থেকে বলে উঠলেন, “সরি সরি! ভেরি সরি!”
পাশেরটাতে গেলেন উনি।
ক্লাসে ফিরে ঋষি ওর ব্যাগ নিয়ে বেরোল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখল ছ’টা বাজতে পাঁচ। তার মানে খেলার সময় শেষ। হঠাৎ ওর মাথায় এল যে মাঠের টয়লেট কালই উদ্বোধন হবে। উদ্বোধন করতে আসবে মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। গত সপ্তাহেই কন্সট্রাকশন শেষ হয়ে গেছে। কাল রাতে যে কথা ভেবে ঘুম হচ্ছিল না, সেই টয়লেট উদ্বোধনের কথাটা বেমালুম ভুলে গেছিল! সকাল থেকে সেতার ক্লাসের জন্য অপেক্ষায় ছিল। পাগুলো এবার ওকে মাঠের দিকে টেনে নিয়ে চলল। মাথায় এখন উদ্বোধন শব্দটা পাক খাচ্ছে। কয়েকদিন আগে বাংলার ইন্দ্র-স্যার জিজ্ঞেস করেছিল, “স্যার, উদ্বোধন কি বোধন থেকে এসেছে?”
“ঠিক। আর বোধন এসেছে বোধ থেকে। কেন রে?”
“বোধ মানে কি বুদ্ধি, স্যার?”
স্যার এক মুহূর্ত ভেবে বললেন, “বোধ বুদ্ধির থেকেও একটু বেশি রে। ওর মধ্যে একটা চেতনা জাতীয় ব্যাপার আছে।”
“আমরা উদ্বোধন মানে তো ধরি কিছু একটার শুরু।”
“ঠিক। কোনও এক চেতনা বা উপলব্ধির শুরু।”

কেয়ারটেকার-দাদুর দেখা নেই। মাঠে অল্প আলো থাকলেও পাঁচিলের দিকটা এখন ভীষণ গা ছমছমে লাগছে। তার একটু আগেই ওদের মাঠের বাউন্ডারির মধ্যেই সাদা রঙের চুনকাম করা টয়লেটটা অন্ধকারের মধ্যে জেগে আছে। ভেতরের সদ্য লাগানো আলো বাইরে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল ও।
কোনও কিছু শুরু হলে কিছু একটা শেষও হয়। যেমন ওর এখন আর হিসি পাচ্ছে না। কিন্তু ওর মনটা কেমন মিইয়ে গেল। অনেক কিছু এবার ইতিহাসের পাতায় ঢুকে যাবে। খোলা জায়গা ছাড়া কি আর মাপা যায় প্রজেক্টাইল!
কে যেন আসছে বেরিয়ে আসছে টয়লেটটা থেকে। কন্সট্রাকশান কি তাহলে এখনও শেষ হয়নি?
আরেকটু কাছে যেতেই চিনতে পারল। অরিজিৎ স্যার। চেন লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে আসছেন। শিস দিতে দিতে, এদিক ওদিক দেখতে দেখতে। ঋষি একটু তেরছাভাবে আসছে বলে উনি প্রথমে দেখতে পাননি। দেখতে পেয়েই দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর একটু গলা তুলে বললেন, “সব কলেই জল ঠিকঠাক পড়ছে।”
ঋষির মুখ থেকে কথা সরল না।
“তা, তুই এখানে কেন? ফিতে কাটার আগে উদ্বোধন করতে এসেছিস নাকি?”

___


অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী

14 comments:

  1. Darun sundor golpo. Mone holo sei dingulote fire gechi

    ReplyDelete
  2. Darun laglo Prantik da, hostel er din mone pore galo.

    ReplyDelete
  3. ভালো লাগলো দাদা

    ReplyDelete
  4. অনবদ্য লেখা। প্রাঞ্জল ভাষা। ভীষণ ভালো লাগলো

    ReplyDelete
  5. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  6. Pradip BhattacharyaJuly 24, 2020 at 10:44 AM

    কি অসাধারণ গল্প লিখেছেন আপনি প্রিয় প্রান্তিক। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।
    একটা গল্পে কতো মোচড়।
    আপনার জীবন বোধের অনুভূতি প্রকাশ করার উদ্বোধন তো ক'বেই করেছেন।
    এখন আর সেটা ডাঁ, রাঁ র মধ্যে আবদ্ধ নেই।
    ঋষির মতন একেক দিন একেক টা নতুন সুর তুলছেন।
    ....... এত কাজ সামলে ও আপনার কলম সাহিত্য সৃষ্টি বেশীদিন চাপতে পারেনা; কর্মস্থানেই আপনার লেখার বিশেষ স্থানের উদ্বোধনের অপেক্ষায় রইলাম!

    ReplyDelete
  7. Darun laglo!!! Shotti Narendrapur er din gulo mone porlo!!! 👏👏👏

    ReplyDelete
  8. ছোট ছোট অনুভূতি দিয়ে মালা গাঁথা টা একটা অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছিস। খিদে টা বেড়ে গেল

    ReplyDelete
  9. Very nice. Khob bhalo laglo. Dustu misti.

    ReplyDelete