গল্পঃ সাদা ভূতঃ অমিতাভ সাহা



মাধ্যমিক পরীক্ষার পর মাস খানেক পড়াশোনার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলাম। সেই সময়টা সকাল-বিকাল বন্ধুদের সঙ্গে মজলিস বসাতাম। অন্য সময় পড়ার চাপে খুব বেশি গল্পগুজব করার অবকাশ পেতাম না। খোশগল্পের আসর বসত সুমনের বাড়িতে। ওর বাড়ি ছিল শহর ছেড়ে একটু বাইরে গ্রামাঞ্চলে। ও মামাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। মামার বাড়ি থেকে একটু তফাতে মামার একটি বড়ো আম-কাঁঠালের বাগান ছিল। বাগানে বিঘে তিনেক জমিতে আম, জাম, কাঁঠাল মিলে পঞ্চাশ-ষাটটা গাছ ছিল। খোলামেলা জায়গায় বেশ সুন্দর সবুজের আচ্ছাদন। বেশ একটা জঙ্গলের অনুভূতি আসত। বাগানের মাঝখানে একটি মাটির ঘর ছিল। মাটির মেঝের ঘর, মাটির দেওয়াল। মেঝেতে বাঁশের খুঁটির উপর খড়ের ছাউনি দেওয়া। ঘরে একটা কাঠের চৌকি, বসার জন্য বেঞ্চি রাখা ছিল। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম-কাঁঠাল পাকলে সেগুলি পেড়ে এই ঘরে চৌকির নিচে ঢালাও করে বিছিয়ে রাখা হত। এই ঘরটি ছিল আমাদের আড্ডা দেবার প্রিয় জায়গা।
বিকেলবেলা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে শহরের পিচের রাস্তা ছেড়ে মাটির রাস্তায় ধরে প্রায় দেড় কিলোমিটার এগিয়ে ঐ বাগানে হাজির হতাম। সুমন চাবি নিয়ে এসে ঘরের তালা খুলে দিত। তারপর আমরা ক’জন বন্ধু মিলে ঘরটিতে বসে গল্পগুজব করতাম। ঘরটা বাইরের তুলনায় এত ঠাণ্ডা ছিল, যে খুব আরামদায়ক মনে হত। মাটির ঘরে খোপ করে বাঁশের বাতা দেওয়া জানালা ছিল। কী সুন্দর হাওয়া আসত! জানালা দিয়ে আশেপাশে ধানের ক্ষেত দেখা যেত। গ্রাম্য এলাকা হওয়াতে পরিবেশ ছিল বেশ নিরিবিলি।
বিকেলবেলা বেশ ভালো লাগলেও সন্ধে হলেই ধীরে ধীরে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসত। ঘরে একটি চল্লিশ ওয়াটের টিমটিমে বাল্ব জ্বলত। ঐ এলাকায় তখনও অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। তাই ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত হ্যারিকেন কিংবা কেরোসিন তেলের কুপি। আমাদের আড্ডার ফাঁকে সুমন মামাবাড়ি থেকে আমাদের জন্য কেটলিতে করে চা নিয়ে আসত। সঙ্গে মুড়ি, চানাচুর কিংবা নিমকি।
একদিন চা খাওয়ার সময় বাইরে বৃষ্টি আরম্ভ হল। লোডশেডিংও হয়ে গেল। আমরা চৌকির ওপর হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বসলাম। অন্ধকার বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় একটা ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হল। পরেশ, গৌরাঙ্গ, বাপি মিলে ভূতের গল্প আরম্ভ করল।
গৌরাঙ্গ বলল, “আমি স্বচক্ষে একবার একটা মেয়েকে ভূতে ধরতে দেখেছি। তিন-চার বছর আগে আমার মামাবাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম। পাশের গ্রামেই একটি মেয়েকে ভূতে ধরেছিল। অনেকে দেখতে গেছিল। আমারও খুব ইন্টারেস্ট হল, দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি, বাড়ির উঠোনে মেয়েটা হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেーবয়স সতেরো-আঠারো হবে। মাথার চুল আলুথালু, চোখের দৃষ্টি কী ভয়ংকর! মাথা নিচু করে চোখ পাকিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। কিন্তু গলার আওয়াজ শুনে অদ্ভুত লাগছিল। মনে হচ্ছিল, কোনও পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চা মেয়ে কথা বলছে। আশেপাশের লোকজনরা বলছিল, মাস খানেক আগে ঐ গাঁয়ে একটি বাচ্চা মেয়ে টাইফয়েডে মারা গেছিল। একদম অবিকল ওই বাচ্চা মেয়েটার গলার আওয়াজ। বাচ্চা মেয়েটির আত্মা এই মেয়েটির উপর ভর করেছিল। বাচ্চা মেয়েটি খুব গরিব পরিবারের ছিল। বাবা-মা পয়সার অভাবে মেয়েকে শহরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসাও করাতে পারেনি। মৃত বাচ্চাটির মা খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে এই মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তুই? তুই কি আমার আমিনা মা এসেছিস?’
“হ্যাঁ, মা।’
“তুই কেন আমাকে নিঃস্ব করে চলে গেলি মা? তুই ছাড়া আর কে আছে আমার!’
“কী করব মা! জ্বরের যন্ত্রণা যে আর সইতে পারলুম নে।’
“মা হাউহাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। এই অবিশ্বাস্য কথোপকথন দেখে আমি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। মা আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন আছিস মা তুই?’
“খুব একা লাগে মা। আমার সঙ্গে খেলা করার কেউ নেই। তোমরা তো আমার খেলনা পুতুলটা আমার কবরে দাওনি। ওটা থাকলে তাও আমার একটা খেলার সাথী হত।’
“মা মনোকষ্টে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। চলে এসেছিলাম। পরে শুনেছিলাম, পুতুলটি মেয়েটির কবরের পাশে গোর দেওয়ার পর বাচ্চা মেয়েটি এই মেয়েটিকে ছেড়ে গেছিল। আর আসেনি।”
গল্পটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমারও খুব হৃদয় স্পর্শ করেছিল। কিন্তু ঘটনাটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে বললাম, “আমি এসব আত্মা ভর করার গল্প বিশ্বাস করি না। এর পেছনে এক ধরনের সাইকোলজি আছে। বড়ো মেয়েটি মানসিক বিকারগ্রস্ত ছিল। ও নিশ্চয়ই বাচ্চা মেয়েটিকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চিনত এবং বাচ্চাটার খুঁটিনাটি গতিবিধি লক্ষ করত। বাচ্চাটার মারা যাবার কথাও মেয়েটা জানত। বাচ্চাটার মৃত্যু বড়ো মেয়েটির মনে খুব নাড়া দিয়েছিল। বাচ্চাটা মারা যাবার পরেও বড়ো মেয়েটি বাচ্চাটার কথা সবসময় ভাবত। তাই নিজের অজান্তেই বাচ্চাটির সত্বা মেয়েটির উপর কাজ করেছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে সিজোফ্রেনিয়া বলে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অনেক সময় দ্বৈত সত্বা কাজ করে। মনে হয়, আরেকজন কেউ আক্রান্ত ব্যক্তির (মিডিয়াম) মাথার ওপর ভর করেছে। মিডিয়াম জাস্ট রানিং কমেন্ট্রির মতো তার নির্দেশ ফলো করছে বা তার ইচ্ছেনুযায়ী কথা বলছে। এধরনের উপসর্গ অনেকসময় দেখা যায়।”
সুমন বলল, “তুই যাই বল ভাই, বিজ্ঞান দিয়ে সব ঘটনার ব্যাখ্যা করা যায় না। পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। বিজ্ঞান তো বলে ভূত বলে কিছু হয় না। তাই বলে কি ভূত নেই! তুই ভূত মানিস কি মানিস না?”
আমি কনফিডেন্সের সঙ্গে বললাম, “আমি ভূত মানি না। মানুষের মনের ভয় থেকেই ভূতের জন্ম হয়। মানুষ লোকের কাছে গল্প শুনে বা ভূতের সিনেমা দেখে মনে মনে ভূতের একটা কাল্পনিক চিত্র এঁকে ফেলে। যখন রাত্রিবেলা একা থাকে, তখন ভয় মনটাকে গ্রাস করে ফেলে আর মনের কাল্পনিক ছবিটা বাস্তবে দেখছি বলে বিভ্রম হয়। ভূত বলে কিছু হয় না।”
সুমন বলল, “এখনও দেখিসনি, তাই একথা বলছিস। যেদিন দেখবি, সেদিন আর একথা বলতে পারবি না। এই যে সামনে রাস্তার ধারে পুকুরটা আছে না, ওই পুকুরপাড়ে সন্ধেবেলা অনেকে ভূত দেখেছে। সবাই তো আর এমনি এমনি বলে না।”
আমি বললাম, “আমি মানি না ভাই। যেদিন নিজের চোখে দেখব, সেদিন বিশ্বাস করব।”
সেদিনকার মতো আমরা সবাই বিদায় নিলাম।
পরেরদিন সন্ধেবেলা যখন আড্ডাখানায় গিয়ে হাজির হলাম, তখন দেখি বাকি বন্ধুরা আগেই চলে এসেছে। আমাকে দেখেই পরেশ বলল, “আমরা ভাবলাম, তুই বুঝি আজ আর এলিই না। কাল ভূতের গল্প শুনে ভয় পেয়ে গেছিস।”
আমি বললাম, “তোরও যা কথা! ভূতের ভয়ে আর এলামই না! হুঁহ!”
সেদিনও যথারীতি ভৌতিক প্রসঙ্গ উত্থাপিত হল। আসলে ভূত জিনিসটা এত ইন্টারেস্টিং, যে ভূত নিয়ে গল্পগুজব করতে আর নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে অনেকেই খুব পছন্দ করে।
সেদিন বাপি একটা গল্প বলল। বলল, “আমি বছর পাঁচেক আগে একবার আমাদের দেশের বাড়িতে গেছিলাম। একদম গণ্ডগ্রাম এলাকা। ওখানে একজন বিবাহিতা মহিলাকে জীনে ধরেছিল।”
পরেশ জিজ্ঞেস করল, “জিন বলতে? জিন তো জীবনবিজ্ঞান বইতে পড়েছি, বংশগতির একক যা ক্রোমোজোমের মধ্যে থাকে, মানে ডিএনএ যাকে বলে।”
গৌরাঙ্গ উত্তর দিল, “আরে সেই জিন না রে। জীন হল ভূতের মতোই একধরনের অদৃশ্য জীব যারা মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে। ইসলাম ধর্মগ্রন্থ কোরানে এদের উল্লেখ আছে। এরা মূলত দুষ্ট প্রকৃতির। মানুষের ক্ষতিসাধন করাই এদের কাজ।
“এখন গল্পটা শোন। মহিলা একদিন বিকেলবেলা মাঠে গরু চরাতে বেরিয়েছিল। একটা বিশাল ফাঁকা মাঠ ছিল। লম্বা লম্বা সবুজ ঘাস। গরু-ছাগলে খেয়ে নাদুসনুদুস হয়ে উঠত। ওই মাঠের মাঝখানে একটা বহুদিনের পুরনো পাকা ঘর ছিল। ওই মাঠে আর্মির জওয়ানরা মাঝে মধ্যে শারীরিক কসরত ও ফায়ারিং প্র্যাকটিস করার জন্য আসত। ওদের সরঞ্জাম সাময়িকভাবে রাখার জন্য ওই ঘরটা ব্যবহার করত। দিনের শেষে প্র্যাকটিসের পর তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যেত। ঘরটি পরিত্যক্ত, কেউ থাকত না। গরু বাঁধার খুঁটি পোঁতার জন্য ইটের টুকরো সংগ্রহ করতে মহিলা ঐ ঘরে ঢুকেছিল। পিঠে চুল ছাড়া ছিল, অত খেয়ালও করেনি। ঐ ঘরটিতেই সম্ভবত ওঁর উপর জীন ভর করেছিল। গরু চরিয়ে বাড়ি ফেরার পর থেকেই কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরণ করতে লাগল। মাটির কলসি আছড়ে ভেঙে ফেলছিল, বিছানার ওপর উঠে নৃত্য করছিল এবং আপন মনে হাসছিল। পাড়াগাঁয়ে বিবাহিতা মেয়েরা সচরাচর এরকম করে না। বাড়ির লোকের সন্দেহ হল, নিশ্চয়ই ভূতে ধরেছে। ওঁর বর গিয়ে এলাকার বিখ্যাত ওঝা ডেকে নিয়ে এল। ওঝাকে দেখামাত্র মহিলা এক লাফে বাড়ির টিনের চালে উঠে গেল। কোনও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এক লাফে চালে ওঠা সম্ভব নয়। ওঝা জীনের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী ঘোষণা করল, ‘নেমে আয় ওখান থেকে ভালোয় ভালোয়। আর বাড়ির বৌকে ছেড়ে দে। নাহলে এখুনি আমি তোর গুষ্টি উদ্ধার করব।’
“বউটা হাসতে হাসতে চাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে এক দৌড়। ওঝাও বউটার পিছনে দৌড়। ওঝাও দৌড়ায়, বউও দৌড়ায়। অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর ওঝা হাঁপিয়ে উঠল। তবুও বউটা হাঁপাল না। বউটার বর কায়দা করে সামনের দিক থেকে ছুটে এসে বউটাকে জাপটে ধরে আটকাল। বউটা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না। গ্রামবাসীরাও পিছু পিছু এসে সবাই জড়ো হয়ে গেল।
“ওঝা গ্রামবাসীকে বলল, ‘এই, একটা ঝাড়ু নিয়ে আসুন তো। এ জীন ভীষণ বদ। এমনি এমনি যাবে না।’
“তারপর বউটার হাত শক্ত করে ধরে চোখের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, ‘কী রে, কোথায় ধরলি বউটাকে? শিগগির বল।’
“বউটা বলল, ‘ছাড়, আমার হাত ছেড়ে দে।’
“ওঝা বলল, ‘তামাশা করিস আমার সঙ্গে, অ্যাঁ!’ বলে এক থাপ্পড় লাগাল।
“বউটার বর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, ‘এ কি! আমার বউটাকে মারছেন কেন?’
“ওঝা বলল, ‘ওকে মারছি না। ওর মধ্যে যে জীন বসে আছে, তাকে মারছি।’
“বউটা বিকট দৃষ্টিতে ওঝার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আরেকবার আমার গায়ে হাত তুললে খুন করে ফেলব বদমাশ!’
“ওঝা বলল, ‘কী! এত বড়ো সাহস! তুই আমাকে মারবি? দাঁড়া, তুই এমনিতে যাবার লোক না। তোর ট্রিটমেন্ট শুরু করছি। বাপ বাপ করে পালাবি।’
“বউটা উঠে পালাতে যাচ্ছিল। ওঝা দড়ি দিয়ে বউটার হাত-পা বেঁধে ফেলল। একজন এসে একটা ফুল ঝাড়ু দিয়ে গেল।
“ওঝা ঝাড়ু হাতে নিয়ে বউটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভালোয় ভালোয় বল, তুই যাবি কি না।’
“বউটা কটমট করে তাকিয়ে বলল, ‘আমি যাব না।’
“ওঝা রেগে গিয়ে ঝাড়ুটা মুখের কাছে নিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করে ঝাড়ু দিয়ে একবার ঝাড়া দিল বউটাকে। ‘যাবি না? তোকে যেতেই হবে।’ বলে বউটাকে আরও আট-দশবার ঝাড়ু দিয়ে বেদম ঝাড়াঝাড়ি করল। বউটা মাঝেমাঝে চিৎকার করে উঠছিল। তারপর হঠাৎ চোখ উলটে উঠোনের উপর সটান অজ্ঞান হয়ে গেল।
“ঠিক তখনই আচমকা একটা দমকা বাতাস উত্তরদিকে বয়ে গেল। ওঝা বললে, ‘ঐ দেখেন সবাই, আমার মন্ত্রবলে জীন বাবাজী বাপ বাপ করে পালাল। এখন বউটাকে ঘরে নিয়ে যান। জ্ঞান ফিরলেই একদম স্বাভাবিক।”
এই গল্প শোনার পর আমরা সবাই হেসে গড়াগড়ি যাচ্ছিলাম। বললাম, “এটা তুই কী শোনালি রে! এটা কি ভূতের গল্প, না হাসির গল্প? এরকম গাঁজাখুরি গল্প তুই কোথায় পাস বল তো।” বলে আরেক প্রস্থ হাসাহাসি চলল।
সুমন বলল, “আমি আজ উঠি রে। মামি ডেকেছে। বাড়িতে একটু কাজ আছে। তোরা বস। পরেশ, তুই যাবার সময় তালা দিয়ে চাবিটা তোর কাছে রাখিস।”
সুমন চলে গেল। আমরা ভূতের গল্প ছেড়ে হাসিঠাট্টায় মন দিলাম। ঘণ্টা খানেক পর আড্ডা শেষে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। সাইকেলে চেপে আসছিলাম। জোছনা রাত ছিল। মাটির রাস্তার মোড়ের বাঁদিকে একটা পুকুর ছিল। পুকুরপাড়ে একটা চালতাগাছ ছিল। গাছের পাতার খসখস আওয়াজ শুনে হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, সাদা কাপড় পরা কী যেন একটা গাছের ডালের উপর বসে ডাল সমানে ঝাঁকাচ্ছে। মুখটা কঙ্কালের মুখের মতো দেখতে, চোখের কোটরদুটো ও নাকের ছ্যাদা কালো, মুখের হাঁ প্রকাণ্ড লম্বা ও কালো, সারা গায়ে ধবধবে সাদা কাপড় জড়ানো। জোছনার আলোয় দেখা যাচ্ছিল। এমনিতে আমি ভয় পাই না। কিন্তু নির্জন রাতে এমন অদ্ভুত জিনিস দেখে আমার পিলে চমকে উঠল। ভালো করে লক্ষ করলাম, মনে হল আমাকে দেখতে পেয়ে আরও জোরে জোরে গাছের ডাল ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে আর লাফানোর চেষ্টা করছে। এ কি সত্যিই ভূত-টুত নাকি! ভয়ে সাইকেল ফেলে পেছনের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে আরম্ভ করলাম। রাস্তায় লোকজন ছিল না। যদি ওটা আবার গাছ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পিছু ধাওয়া করে! বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটাতে আরম্ভ করে দিল। অনেকটা দৌড়নোর পর পরেশ-বাপিকে দেখতে পেলাম। ওরা হেঁটে হেঁটে আসছিল।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বাপিকে জড়িয়ে ধরলাম। ও বলল, “কী হয়েছে তোর?”
আমি দম নিতে নিতে বললাম, “পুকুরপাড়ে গাছের উপর কী যেন একটা...”
বাপি বলল, “কই, চল তো গিয়ে দেখি।”
আমি খুব ব্যতিব্যস্তভাবে ওদের নিয়ে পুকুরপাড়ে এসে দেখি গাছে কিছু নেই। আঙুল দিয়ে ইশারা করে বললাম, “ঐ গাছের ডালে সাদা কাপড় পরা কী যেন একটা বসে ডালটা সমানে নাড়াচ্ছিল!”
পরেশ জবাব দিল, “সুমন সেদিন বলল না, সন্ধেবেলা এখানে অনেকে ভূত দেখেছে। চল সরে পড়ি তাড়াতাড়ি।”
আমি নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আর আমার মধ্যে আগে থেকে কোনও ভয়ও কাজ করেনি। তাই ভুল দেখার প্রশ্ন ওঠে না। মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব কাজ করতে লাগল, ওটা কি সত্যিই ভূত ছিল?
পরেশের সুরে সুর মিলিয়ে বললাম, “ভূতই হবে হয়তো। এখন আবার কোথায় ভ্যানিশ হয়ে গেল?”
আমার হাত-পা তখনও কাঁপছিল। ওরা আমাকে অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়ে গেল। ভয়ের রেশ বাড়ি ফেরার পরেও ছিল।


পরেরদিন বিকেলবেলা সুমনের বাড়ি যাবার পর ও জিজ্ঞেস করল, “কী রে, কী হয়েছিল কালকে? পরেশের কাছে শুনলাম। ভয় পেয়েছিলি নাকি? আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম ওখানে অনেকে ভূত দেখেছে।”
“হ্যাঁ রে, ভাই। স্বচক্ষে দেখেছি। গাছের উপর সাদা কাপড় পরা কী যেন।”
“এরপর থেকে সন্ধেবেলা ঐ রাস্তা দিয়ে যাস না আর। ঐদিকটা নির্জন তো। হাইস্কুলের পাশের রাস্তা দিয়ে যাস। যদিও একটু ঘোরা হবে। তা হোক।”
পরেশ সুমনের আরও এক কাঠি ওপরে উঠে বলল, “যারা ভূতে বিশ্বাস করে না, ভূত তাদেরকেই বেশি করে ধরে তাদের ভুল ভাঙানোর জন্য। ভূতেদেরও তো একটা প্রেস্টিজ আছে, নাকি? কেউ যদি ওদের পাত্তাই না দেয়, তাহলে ওরা ভূত-সমাজে মুখ দেখাবে কী করে? এজন্য ‘ভূত মানি না’ এধরনের কথাবার্তা আর বলিস না। স্বচক্ষে দেখলি তো?”
আমি চুপ করে গেলাম।
কিছুক্ষণ পরে সুমনের মামা হন্তদন্ত হয়ে এসে সুমনকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে, কাল আমার ধুতিটা নিয়ে কোথায় গিয়েছিলি, এত নোংরা কাদা লাগল কীভাবে?”
সুমনের ছোটো মামাতো ভাইটা সাইকেলের টায়ারে লাঠি মেরে মেরে গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বাচ্চাটা আচমকা এসে বলল, “গাছে চড়েছিল। মেলা থেকে আমাকে যে মুখোশটা কিনে দিয়েছিলে, ওটাও নিয়েছে।”
সুমনের কারসাজি ধরা পড়ে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে জিভে কামড় দিয়ে হাসতে লাগল।
বাকিরা এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আগে থেকেই জানত। ভাব করছিল যেন কিছু জানে না। সুমনের সঙ্গে ওরাও হাসতে লাগল।
আমি তেড়ে গিয়ে সুমনকে মারতে গেলাম। “তবে রে! মিছিমিছি ভয় দেখানো! দাঁড়া, মজাটা দেখাচ্ছি।”
সুমন ছুট্টে পালাল।


_____

No comments:

Post a Comment