বিজ্ঞানের পাঠশালাঃ যা দেখি যা শুনি তারই উত্তর খুঁজি (৭ম পর্ব) - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়




কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


সপ্তম পর্ব



আমরা চোখ পিটপিট করি কেন?

আমরা সকলেই প্রায় বিরামহীনভাবে চোখ পিটপিট করি। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা প্রতি ৬ সেকেন্ডে গড়পড়তা একবার করে চোখ পিটপিট করি বা পলক ফেলি। অর্থাৎ, অধিকাংশ মানুষ প্রতি মিনিটে ১০ থেকে ১২ বার চোখের পলক ফেলে। কারও কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি (প্রায় ২৫ বার) হতে পারে। এই হিসাব অনুযায়ী, ঘু্মানোর সময়টুকু বাদ দিলে সারাজীবনে একজন মানুষ কম-বেশি ২৫ কোটিবার চোখের পলক ফেলে।
মানব শরীরে চোখ অত্যন্ত স্পর্শকাতর অঙ্গ। ধুলোবালি কিংবা অন্য কোনও অস্বস্তিকর পদার্থ চোখে প্রবেশ করে কর্নিয়ার যাতে কোনও ক্ষতি না হয় তাই আমরা অনবরত চোখের পাতা ফেলি। বলা যায়, ‘পলক পড়া’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চোখের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। ঝড়ের সময় ধুলোর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে যেমন বাড়িঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দিই, অনেকটা তেমনই।
চোখের মণি পরিষ্কার ও আর্দ্র যাতে থাকে সেই কারণেও আমরা পলক ফেলি। চোখের উপরের পাতার নিচে অনেকগুলো অশ্রুগ্রন্থি আছে। আমরা যখন চোখের পাতা বন্ধ করি তখন ওই অশ্রুগ্রন্থিগুলো সক্রিয় হয় এবং একপ্রকার লবণাক্ত তরল পদার্থ সৃষ্টি করে। এই লবণাক্ত তরল চোখে ছড়িয়ে পড়ে যাতে চোখ শুকিয়ে না যায়। প্রতিদিন আমাদের চোখ থেকে ০.৭৫ গ্রাম থেকে ১.১ গ্রাম তরল নিঃসৃত হয়। অধিক মাত্রায় তরল নিঃসৃত হলে তা অশ্রুতে পরিণত হয়।


ফুলদানির জলে অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট দিলে ফুল বেশি সময় তাজা থাকে কেন?

ফুল কে না ভালোবাসে? গরমের সময় বেল-যুঁই-চাঁপা, আর শীতকালে ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা-অ্যাসট্রা সবার প্রিয়। ঘর সাজাতে অনেকে ফুলদানিতে এইসব ফুল রাখেন। কিন্তু সমস্যা হল ফুলগুলি বেশিদিন তাজা থাকে না। এখন যা ফুলের দাম, রোজ রোজ কি আর ফুল কেনা যায়? তাহলে কী করবেন? ফুলদানির জলে একটা কি দুটো (ফুলদানির মাপ অনুযায়ী) অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট ফেলে দিন। ফুল অনেকদিন তাজা থাকবে। কেন এমন হয়? এর পিছনে দুটি কারণ আছে। প্রথমত, ফুলদানির জলে দ্রবীভূত অ্যাসপিরিন ফুলের ডাঁটির জাইলেম টিস্যু (xylem tissue) কিছুটা ফুলিয়ে দেয় অর্থাৎ ঢিলে করে দেয়। এর ফলে ফুলের জল শোষণের মাত্রা বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, অ্যাসপিরিনে থাকা কিছু উপাদান ফুলদানির জলের তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে দেয়। এই কারণেই অ্যাসপিরিন গোলা জলে ফুল বেশিদিন তাজা থাকে।


খিদে পায় কেন?

খিদে পেলেই বুঝতে হবে শরীর কিছু চাইছে। গাড়ি চালাতে যেমন জ্বালানির দরকার হয়, তেমন শরীরকে সচল রাখতে লাগে রসদ। এ অনুভূতির পেছনে একসঙ্গে কাজ করে মস্তিষ্ক আর পেট। আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় শরীরের খোঁজ নেয়। যখনই সে দেখে আমাদের রক্তে হরমোন ও পুষ্টির মাত্রা কমে আসছে, তখনই সে খিদের মাধ্যমে সংকেত দিতে শুরু করে। রসদ-স্বরূপ খাবার খেলেই হরমোন ও পুষ্টির মাত্রা সঠিক জায়গায় পৌঁছে যায়, আমাদের খিদে বোধ আর তখন থাকে না। তাই বলা যায়, খিদে একটি স্বাভাবিক জৈবিক সংকেত। যদিও পৃথিবীতে এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং এখনও হয়ে চলেছে। বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অনুসন্ধান করে দেখেছেন, খিদে নিয়ে একেক মানুষের শরীর একেকভাবে সাড়া দেয়। তাই খিদে পাওয়ার কারণকেও তাঁরা নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।


আজিনামোটোকে সাইলেন্ট কিলার বলা হয় কেন?

আজিনামোটোর বৈজ্ঞানিক নাম মোনোসোডিয়াম গ্লুটামেট। এটি একটি রাসায়নিক পদার্থ। এর নিজস্ব কোনও গন্ধ নেই, তবে কোনও খাবারে মেশালে একটা হালকা গন্ধ অনুভূত হয়। তাই একে বলা হয় ফ্লেভার এনহ্যান্সার। চাইনিস খাবারে এক চামচ আজিনামোটো মিশিয়ে দিলেই যেন অন্যরকম স্বাদ চলে আসে। কিন্তু জানেন কি, এই পদার্থটি ধীরে ধীরে আমাদের শরীরের কী মারাত্মক ক্ষতি করে? এটি নিয়মিত বেশি পরিমাণে খেলে পরিপাকের নানা সমস্যার সঙ্গে ‘চাইনিজ রেস্তোরাঁ সিনড্রম’ নামে একধরনের রোগ দেখা দিতে পারে। এই রোগে প্রথম প্রথম গা-হাত-পা-ঘাড়ে ব্যথা হয়, পরে গায়ের চামড়া ঝুলে গিয়ে অকাল বার্ধক্য দেখা দেয়। আজিনামোটো সবথেকে বেশি ক্ষতি করে শিশুদের। মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও ভ্রূণের বিকাশে সমস্যা হয়। তাই সন্তানসম্ভবা মহিলাদের এবং একবছরের কম বয়সের শিশুদের আজিনামোটো খাওয়ানো উচিত নয়। এই সময় শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম গেলে ব্লাড প্রেশার বেড়ে যায়। তার প্রভাব পড়ে গর্ভজাত শিশুর ওপর।
রাস্তা থেকে রেস্তোরাঁ, অধিকাংশেরই মনপসন্দ চাইনিজ ডিশ। স্বাদ বাড়াতে এইসব খাবারে যথেচ্ছ আজিনামোটো ব্যবহার করা হয়। শুধু চাইনিজ খাবারেই নয়, অন্যান্য খাবারেও সুগন্ধ ও স্বাদ বাড়াতে আজকাল যথেচ্ছ আজিনামোটো ব্যবহার করা হচ্ছে। আর তাতেই শরীরে ঢুকছে বিষ। বাড়ছে রক্তচাপ, সুগার, মাথাব্যথা, থাইরয়েড, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক ইত্যাদির মতো রোগগুলি। এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে এই মারাত্মক বিষ। অনেকসময় রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। যার জেরে নিউমোনিয়া হতে পারে। কমে যেতে পারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও।


শীতের সকালে কুয়াশা হয় কেন?

কুয়াশা ভূ-পৃষ্ঠতলের কাছাকাছি সৃষ্ট একজাতীয় মেঘ। উচ্চতর তাপাঙ্কে বাতাস অধিকতর জলীয়বাষ্প ধারণে সক্ষম, নিম্নতর তাপাঙ্কে ধারণক্ষমতা কম।  ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ু স্তর শীতল থাকলে বায়ুতে মিশে থাকা জলীয়বাষ্প ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। দিনের বেলায় উচ্চতর তাপাঙ্কে বাতাস অনেকখানি জলীয়বাষ্প ধরে রাখে। ভূ-পৃষ্ঠ রাতে দ্রুত তাপ বিকিরণ করে। তাই শেষরাতে আবহাওয়ার তাপাঙ্ক কমে যায়। তখন ধারণ ক্ষমতার তুলনায় জলীয়বাষ্প বাতাসে বেশি থাকে। সেটা তখন বাড়তি হয়ে বর্জিত হয়। এই বর্জিত জলীয়বাষ্পই বায়ুতে ধূলিকণা, লবণ ইত্যাদির সঙ্গে মিশে স্থির বাতাসে নিম্ন উচ্চতার মেঘ বা কুয়াশার সৃষ্টি করে। শীতের ভোরেই তাপাঙ্ক উপযুক্ত পরিমাণে নেমে যায়। আর শীতল পরিবেশে বায়ুর গতিও যথেষ্ট হ্রাস পাওয়ায় কুয়াশা সৃষ্টি হয়।
শীতের সকালে কুয়াশা সৃষ্টির কারণ আর একটু সহজভাবে বললে বলা যেতে পারে। জল তিন অবস্থায় থাকতে পারেーকঠিন এবং তরল, বায়বীয়। শীতকালে ঠাণ্ডায় বাতাসে থাকা জলীয়বাষ্প জমে বিন্দু বিন্দু জলে পরিণত হয়। এই জলের অণুগুলো জলীয় বাষ্পের চেয়ে ভারী হওয়ায় নিচে নেমে এসে ভূ-পৃষ্ঠের উপরে জমে থাকে। একেই আমরা কুয়াশা বলি।
দর্শনযোগ্যতার নিরিখে কুয়াশা আর ধোঁয়াশা এক জিনিস নয়। কুয়াশার ক্ষেত্রে দর্শনযোগ্যতা ১ কি.মি.-এর কম হয়, আর ধোঁয়াশায় সেটা ২ কি.মি.-এর বেশি কমে না। পৃথিবীর সর্বাধিক কুয়াশাচ্ছন্ন স্থান হল নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্রান্ড ব্যাঙ্কস। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া, আর্জেন্টিনা, পয়েন্ট রেয়স, নিউফাউন্ডল্যান্ড ও লাব্রাডর বছরে প্রায় ২০০ দিনই কুয়াশায় ঢাকা থাকে।


(চলবে)

No comments:

Post a Comment