গল্পঃ লিওবাবুর প্রাপ্তিযোগঃ ধূপছায়া মজুমদার


লিওবাবুর প্রাপ্তিযোগ


ধূপছায়া মজুমদার

লিওবাবু আড়মোড়া ভেঙে এপাশ ওপাশ উলটেপালটে খানিকক্ষণ গড়াগড়ি খেয়ে চোখ খুললেন। বেলা অনেক হল, এবার বিছানা না ছাড়লেই নয়। সংসারের এত কাজ, যেদিকটায় তিনি নজর দেবেন না, সেটাই এরা ভণ্ডুল করে রাখবে। একা হাতে আর কত সামলাবেন! বেশ যদি দুয়েকজন অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকত তাঁর, ভালো হত। কিছুটা বোঝা হালকা হত। এই ধরো, তিনি নিজে গেলেন বারান্দায় গাঁদাগাছটাকে চান করাতে, তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট তাঁর পিছু পিছু চলল গামছা আর চিরুনি নিয়ে। চানের পর গাঁদাগাছের পাতাগুলো কেমন জড়িয়ে-মড়িয়ে যায় না? গামছা দিয়ে বেশ করে গাছের মাথা, মানে পাতা মুছিয়ে তাদের পাতাগুলোকে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে তবে শান্তি।
হ্যাঁ, বাড়িতে তিনি একেবারে একা নন, একটা বেজায় লম্বা লোক আর এক দজ্জাল মহিলা তাঁর সঙ্গে থাকেন বটে। লোকটা খারাপ নয়, মোটামুটি সর্বক্ষণই হুটোপুটি চালায়। ফ্রিজ খুলে চকোলেট খাওয়া বলো বা পাড়াতুতো বেড়াল ন্যাজেশ্বরকে দুধের সর খাইয়ে দেওয়াই বলোㄧভালো ভালো কাজগুলোয় লোকটার সাহায্য পাওয়া যায়। কিন্তু ওই মহিলা? বাপ রে! যেমন তার মেজাজ, তেমনি গলার আওয়াজ। শুনলে শরীর কেমন করে। একদিন লিওবাবু গাঁদাগাছের পাতা আঁচড়ে দিচ্ছেন দেখে ওই মহিলা এমন চেঁচিয়েছিলেন, যেন টবের মাটি থেকে কেঁচো বেরিয়েছে! সেইদিনই লিওবাবু ঠিক করে ফেলেছিলেন, অ্যাসিস্ট্যান্ট তাঁর চাইই।
এবার কি মা সরস্বতীকে বলে দেখবেন, কাজ হয় কি না? এরা সবাই বলছে খড়ি ফুটবে সরস্বতীপুজোর দিন, সেদিনই বলবেন কি? আচ্ছা, খড়ি তো তেল না মাখলে গায়ে ফোটে। রোজ মা, মানে ওই চেঁচামেচি করা মহিলা চেপ্পে চেপ্পে তাঁকে ধরে তেল মাখান, আর গা-হাত-পা ডলে দেন। জ্যাবজেবে করে সারা গায়ে তেল মাখতে লিওবাবুর একদম ভালো লাগে না। সুযোগ পেলেই তেলের বাটি উলটে দিয়ে তিনি ছুট্টে পালান; আর ওই মহিলা পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে গজগজ করেন, “মাখতে হবে না তেল। চানটান কিচ্ছু করতে হবে না। ফেলে রেখে দেব। গায়ে-হাতে-পায়ে খড়ি ফুটবে, খ্যাসখ্যাস করে গা চুলকোবি, তখন মজা বুঝবি!”
সেই খড়ি সরস্বতী পুজোর দিন ফুটবে? মানে সেদিন তেল মাখার ছুটি? বাহ্‌ বাহ্‌, তবে ওই দিনটাই ভালো। হাতজোড় করে পা মুড়ে বসে ঠাকুরের কাছে বলতে হবে, ঠাকুর যেন অ্যাসিস্ট্যান্ট এনে দেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে গেলে তিনি তাকে দুটো, না না, তিনটে বাতাসা একটা নারকেল নাড়ু দেবেন। আচ্ছা, অ্যাসিস্ট্যান্ট কি উচ্ছে খায়? তাহলে তাকে নিজের ভাগের উচ্ছেটাও খাইয়ে দেবেন।
মুখটুখ ধুয়ে লিওবাবু কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে পড়লেন। অ্যাসিস্ট্যান্টের একটা ছবি এঁকে রাখতে হবে তো! নইলে ঠাকুর যখন জিজ্ঞেস করবেন, ‘তোমার কেমন অ্যাসিস্ট্যান্ট চাই?’ তখন কী উত্তর দেবেন?
ছবিটায় লিওবাবু দাঁড়িয়ে আছেন মাঝখানে, দুইপাশে দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট ভারি বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। ছবিটা আঁকতে আঁকতে লিওবাবুর মনে হল, একটু একটু ক্ষিদে পাচ্ছে। মা তো এক্ষুনি একবাটি দুধে রুটি আর কলা চটকে নিয়ে আসবে। ও-জিনিস মানুষে খায়? ছ্যা ছ্যা! একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট পেলে লিওবাবু রোজ সকালে লুচি-আলুভাজা খাবেন। তিনি আটা মাখতে পারেন, মা কোথায় আটা রাখে তাও জানেন। গামলায় আটা-জল নিয়ে মেখে ফেলবেন, আর অ্যাসিস্ট্যান্ট লুচি বেলে ভেজে ফেলবেন। এই ছবিতেও বরং লুচির ব্যাপারটা একটু ঢুকিয়ে রাখা যাক।
“লিওবাবু, কী করছ সক্কাল সক্কাল?”
বড্ড মন দিয়ে আঁকছিলেন তো, বেয়ালীপিসির ডাকে একটু চমকে উঠলেন। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “আসিস্তা আঁকছি।”
“বাহ্‌ বাহ্‌, খুব ভালো। আসিস্তা এঁকে কী কাজ হয় বাবা?”
বেয়ালীপিসি লিওবাবুকে কাঠবেড়ালি ছড়া শেখান, মাঝেমাঝে ঘোড়া হয়ে তাঁকে পিঠে চড়িয়ে ঘুরে বেড়ান, তাই তাঁকে লিওবাবু পছন্দ করেন, তা বলে অ্যাসিস্ট্যান্ট এঁকে কী কাজ হয় জিজ্ঞেস করবেন! এ ভারি অন্যায়।
গম্ভীর গলায় লিও বলেন, “আসিস্তা লুচি করে, বল করে, আমার সঙ্গে হামা দেয়, গাছের চুল আঁচড়ালে বকে না, বিট্টুর জামাটা পিঠের দিকে আটকে দেয়, বকুমকে দুপুরে ডেকে ভাত দেয়।”
বিট্টু লিওবাবুর ফুটবলার পুতুল, তার জার্সিটি পিঠের কাছে ছেঁড়া। আর বকুম হল লিওবাবুর অঘোষিত পোষা পায়রা। সে মাঝে মাঝে বারান্দায় এসে বসে। মা দেখলেই হুশ হুশ করে তাকে তাড়িয়ে দেয়।
“বাব্বা! তোর আসিস্তা তো অনেক কাজের! আচ্ছা, যদি কাউকে পাস যে লুচি ভাজতে পারে না, পুতুলের জামা আটকাতে পারে না, কিন্তু তোর সঙ্গে খেলবে, তাকে তোর আসিস্তা করবি?”
বেয়ালীপিসির কথায় লিওবাবু চিন্তায় পড়লেন। লুচি-টুচি ভাজতে না পারলে আর অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়ে কী লাভ? আবার পরের মুহূর্তেই মনে হয়, লুচি না পারুক গে, বল করতে তো পারবে! তাহলেই হবে।
“হ্যাঁঅ্যাঅ্যা।” বলে লম্বা করে ঘাড় নাড়েন তিনি।
“আচ্ছা।” বলে পিসি বাইরে গিয়ে কাদের যেন নিয়ে আসেন ভেতরে।
ততক্ষণে মা আর বাবাও লিওবাবুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
“দাদা, ইনিই মিস্টার বড়ুয়া। আমাদের ফ্লোরে নতুন এসেছেন। কালকেই এসে পৌঁছেছেন। নাগপুর থেকে বেহালা, কম রাস্তা তো আর নয়, তাই কাল আর এঁদের ব্যস্ত করিনি। আজ সক্কাল সক্কাল হাজির হলাম।” হেসে বলেন বেয়ালীপিসি, “ইনি বউদি, আর এই যে, দুই যমজ ছেলেㄧলবকুশ। লিওবাবু, লবদাদা আর কুশদাদা দু’জনে আজ থেকে তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। কী, খুশি তো?”
আর খুশি! লিওবাবু তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না যে সত্যি সত্যি তিনি দু’জন অ্যাসিস্ট্যান্ট পেয়েছেন। এবার থেকে খেলতে ইচ্ছে হলে বাবার কাছে গিয়ে বায়না করতে হবে না, মাকে আর কাজ ফেলে তাঁর পিছনে দৌড়তে হবে না। লিওবাবু সব কাজ তাড়াতাড়ি সেরে ফেলবেন। এদের দু’জনের সঙ্গে রোজ বিকেলে তাঁকে খেলতে হবে যে!
আহ্লাদে ডগমগ হয়ে তিনি টেবিলে পড়ে থাকা কাগজটায় আঁকতে থাকলেন চার-পাঁচটা লুচি, গোল্লা পাকিয়ে তাতে হিজিবিজি কেটে খোসা ছাড়ানো আলুভাজা, থালা, থালার ওপরে উলটে রাখা গেলাস, মাথার ওপরে খালি জায়গাটায় এঁকে ফেললেন গ্যাসের ওভেন, লুচি ভাজার কড়াইটাকে তার ওপরে বসিয়ে দিলেন। ব্যস, লুচি ভাজা শেষ, এবার খাওয়া পর্ব।
মুখ তুলে লিওবাবু দেখলেন লুচি-আলুভাজা প্লেটে নিয়ে মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন সামনে। সবার মুখেই মিটিমিটি হাসি। মায়ের মুখটা রাগী রাগী হলেও চোখ দেখে মনে হচ্ছে হাসছেন। লিওবাবু মনের আনন্দে তাঁর দুই অ্যাসিস্ট্যান্টকে জড়িয়ে ধরলেন, আর টেবিলের ওপর থেকে হাসতে লাগল তাঁদের তিনজনের ছবিটা।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ রাখি পুরকায়স্থ

1 comment:

  1. মিষ্টি গল্প। ভালো লাগলো

    ReplyDelete