লোককথাঃ গান গাওয়া কচ্ছপ ও শিকারির গল্পঃ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আফ্রিকার লোককথা-২


গান গাওয়া কচ্ছপ ও শিকারির গল্প


অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সে অনেক অনেকদিন আগের কথা। আফ্রিকা মহাদেশে চারদিকে ঘন জঙ্গলে ভরা এক গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের মানুষ জঙ্গল থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে আর শিকার করা পশুর মাংস খেয়ে পেট ভরাত। ফলমূল বলতে ছিল মাটির নিচে জন্মানো বড়ো বড়ো আলু, বুনো আনারস, কলা আর কাঁঠাল। গ্রামের মেয়েরা যেত ফল কুড়োতে আর মাটি খুঁড়ে আলু তুলতে। জোয়ান পুরুষেরা যেত শিকারে।
একবার প্রবল বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। মুষলধারে বৃষ্টি চলেছিল সাত-সাতটা দিন ধরে। বৃষ্টি থামতে গ্রামের এক শিকারি গ্রাম ছেড়ে, কাঁধে তির-ধনুক ঝুলিয়ে জঙ্গলে গেল শিকার ধরতে। রোজ যেদিকটায় সে শিকারে যেত, সেদিকটা জলে ভরে থাকায় শিকারি অন্যদিকে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে সে ঢুকে পড়ল আরও এক গভীর জঙ্গলে। সেখানে দিনের বেলাতেই যেন রাতের আঁধার। বড়ো বড়ো ঝুপসি গাছের নিচে, লতাপাতায় জড়ানো জমিতে শিকারির পায়ে হাঁটা দায় হয়ে উঠল। এদিকে একটাও জন্তুজানোয়ারের দেখা নেই যে সে শিকার ধরবে। একটানা বৃষ্টিতে বাইরে বেরনো যায়নি বলে শিকারির ঘরে খাবারদাবার গিয়েছিল ফুরিয়ে। একটা না একটা শিকার না ধরে নিয়ে গেলে না খেয়েই মরতে হবে―এই ভেবে শিকারি ভয় পেয়ে একজায়গায় জড়সড় হয়ে ভাবছিল শিকার ধরার জুতসই উপায়। আসলে সব প্রাণীরাই সেদিন বৃষ্টি থেকে বাঁচতে জঙ্গলের ভিতরে সিঁধিয়েছিল। একটা লম্বা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে শিকারি যখন খিদের জ্বালায় প্রায় অবসন্ন হয়ে পড়ল, ঠিক তখুনি জঙ্গলের ভিতর থেকে একটা মিষ্টি গান ভেসে এল―
মানুষগুলো বড্ড পাজি,
যা দেখে সব তাতেই ঝাঁপায়।
বাকিরা সব আত্মভোলা,
পেট ভরলেই নিদ্রা যে যায়।


গান শুনে শিকারি বেজায় ভয় পেয়ে লম্বা গাছ বেয়ে সোজা উপরে উঠে গেল। উঁহু, এ তো মানুষের কণ্ঠস্বর নয়! নিশ্চয়ই কোনও ভূত বা প্রেত হবে—এই ভেবে গাছের মগডালে উঠে শিকারি ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। এদিকে গানের গলা গাছের আরও কাছে আসতে লাগল। ভয়ে ভয়ে নিচে তাকিয়ে শিকারি দেখে, হেলেদুলে গান গাইতে গাইতে চলেছে এক বিশাল কচ্ছপ। তার গায়ের সুন্দর সবুজ রঙের খোলসের উপর কে যেন যত্ন করে পাটকিলে রঙের আঁকিবুঁকি কেটে রেখেছে। গলায় ঝুলছে হলদে রঙের ছোট্ট একটা থলে। শিকারি এর আগে অনেক কচ্ছপ মেরেছে; কচ্ছপের নরম মাংস আগুনে ঝলসে খেতে দারুণ লাগে। কিন্তু এমন বিচিত্র কচ্ছপ সে তার জীবনে দেখেনি।
শিকারি যে গাছে চড়ে বসেছিল, ঠিক তার নিচে এসে কচ্ছপটা গলা বাড়িয়ে সুর করে আবার সেই গান গাইতে লাগল। শিকারি বুঝল, কচ্ছপের বেজায় রাগ মানুষ জাতটার উপর। তবে কচ্ছপ মানুষের ক্ষতি করতে পারবে না, শিকারিমাত্রই জানে। তাই সে সাহস পেয়ে গাছ থেকে সটান নেমে এসে কচ্ছপের সামনে এসে বলল, “এই যে গজকচ্ছপ মহাশয়, মানুষকে অত গালমন্দ করাটা কি খুব ভালো হচ্ছে?”
কচ্ছপের গলার থলেটা একটু নড়ে উঠল, কিন্তু সে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে গুটিগুটি পায়ে এগোতে লাগল। সে জানে, মানুষ বড়ো ভয়ানক জীব। একবার সুযোগ পেলেই কপাত করে কচ্ছপ ধরে থলেতে ভরে ফেলে। তারপর কী করে, সেটা অবশ্য তার জানা নেই।
কচ্ছপকে চলে যেতে দেখে শিকারি বলল, “আরে গজকচ্ছপ মহাশয়, চললে কোথায়? একে তুমি কথা বলা কচ্ছপ, তার উপর গায়ক...  এ তো জীবনে দেখিনি বাপু। তবে আমি তোমায় কিছু করব না। শুধু একটু বন্ধু পাতাব, ব্যস। আর শিকার আমার জীবনধারণের উপায় হলেও বন্ধুর ক্ষতি করার কথা আমি ভাবতেও পারি না।”
শিকারির কথায় কচ্ছপের মন গলে গেল। সে বলল, “আচ্ছা, নাহয় আমরা বন্ধু হলাম। তবে একটা শর্ত আছে। আমার কথা কাউকে ঘুণাক্ষরেও জানাতে পারবে না। মানুষের ভাষায় কথা বলা বা গান গাওয়ার ক্ষমতা গোটা কচ্ছপকুলে একমাত্র আমারই আছে। শুধুমাত্র তোমাকেই আমি গান শোনাব, আর কাউকে নয়।”
শিকারি মহাখুশি। সে আনন্দে কচ্ছপের বিশাল শক্ত পিঠে চড়ে বসল। পেটের খিদে ভুলে কচ্ছপের সঙ্গে জঙ্গলময় ঘুরে বেরাল সারাদিন। কচ্ছপ তাকে অনেক নতুন ফলের সন্ধান দিল। জঙ্গলের সেই মিষ্টি ফল খেয়ে পেট ভরিয়ে, কিছু ফল কোঁচড়ে গোঁজা থলেতে ভরে সন্ধেবেলা গ্রামে ফিরে এল শিকারি।
গ্রামে তখন বিরাট ফাঁকা জমিতে গ্রামবাসীরা সব জড়ো হয়েছে। এখন খানাপিনা, নাচাগানা করার সময়। দূরে দূরে দেখা যাচ্ছে গ্রামবাসীদের পাতার কুঁড়েঘর। শিকারি সেইখানে এসে পৌঁছতেই সবাই জিজ্ঞেস করল, আজ সে কী শিকার করে এনেছে। থলে থেকে রঙবেরঙের ফল বার করে তাদের দেখাতেই সবাই এ ওর গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে শিকারির পিছনে লাগল। কেউ কোনোদিন শুনেছে, জোয়ান মদ্দ লোক শিকারে গিয়ে জন্তু না মেরে ফলমূল বোঝাই করে ঘরে ফিরছে? অপমানটা কাঁটার মতো বুকে বেঁধে গেল শিকারির। কিন্তু সে মুখ ফুটে তার জঙ্গলের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলতে পারল না। বলে দিলে কচ্ছপের গলায় মিষ্টি গান আর শোনা যাবে না, হারাতে হবে বন্ধুত্ব।
সারারাত গাঁসুদ্ধু লোকের কাছে নিজের অপমানের কথা মনে করে ঘুম এল না শিকারির। তার মনে হল নিজের বীরত্ব কোথায় যেন ছোটো হয়ে গিয়েছে। এই যে জঙ্গল ঘেঁটে এক বিচিত্র কচ্ছপের দেখা মিলেছে, কারও জীবনে তো এমন ঘটেনি! অনেক ভেবে সে ঠিক করল, রোজ রোজ অপমানিত হওয়ার চাইতে বরং সব্বাইকে বলেই দেওয়া যাক কচ্ছপের কথা। পরদিন সকাল হতেই এক এক করে গাঁয়ের লোককে ডেকে ডেকে তার আগের দিনের অভিজ্ঞতার কথা ফলাও করে সে গল্প করল। শোনাল বিচিত্র সেই কচ্ছপের মিষ্টি গান শোনার পরম সৌভাগ্যের কথা। একজন লোকও শিকারির কথা বিশ্বাস করল না। এমন কথা বলা কচ্ছপ তারা কেন, তাদের বাপ-ঠাকুরদা কোনোদিন দেখা তো দূরের কথা, শোনেনি পর্যন্ত। সবাই শিকারিকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল।
শিকারি আর কচ্ছপের কথা সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। গ্রামের মোড়লমশাইয়ের কানে বিচিত্র কচ্ছপের কথা যেতে তিনি শিকারিকে তক্ষুনি ডেকে পাঠালেন। শিকারির মহা আনন্দ। মোড়লমশাই বিচক্ষণ লোক, অনেক বয়স হয়েছে, নিশ্চয়ই শিকারির কথা বিশ্বাস করবেন। তখন আর তাকে পায় কে! বুক ফুলিয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেরাবে সে। সবাই তাকে ডেকে ডেকে শুনতে চাইবে কচ্ছপের গল্প। পরম শত্তুরও হয়ে উঠবে বন্ধু।
গাঁয়ের মোড়ল শিকারির কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কচ্ছপের সব বিবরণ শুনে বললেন, “শুধু গল্প শোনালে তো হবে না বাপু। গাঁয়ের লোকে তা মানবে কেন? তুমি প্রমাণ করে দেখাও। সাক্ষাৎ সেই কচ্ছপকে হাজির করো এই গাঁয়ে। তবে না বুঝি তোমার মুরোদ!”
শিকারি বলল, “হুজুর, আপনি যা বলছেন তাই হবে। আজই হাজির করব সেই কচ্ছপকে। এমন গান আপনি কোনোদিন শোনেননি। জীবন সার্থক হয়ে যায় তার গান শুনে, তাকে চোখে দেখে। আমিই বা মিথ্যে বলে কী পাব বলুন?”
মোড়ল বলেন, “কিন্তু যদি তোর কথা মিথ্যে প্রমাণিত হয়, তবে তোর দণ্ড হচ্ছে মৃত্যু। আর যদি তোর কথা সত্যি হয়, তবে যারা তোকে নিয়ে মজা করেছে, তাদের যা খুশি শাস্তি হতে পারে, বিধান দিবি তুই।”
মোড়লের কথায় স্বস্তি পেয়ে শিকারি আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছুট দিল গভীর জঙ্গলে, সেই বড়ো ঝাঁকড়া গাছটার কাছে। তারপর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, “কই বন্ধু, কোথায় তুমি? কোথায় তোমার গান?”
জঙ্গলে হঠাৎ যেন হাজারো বাঁশির সুর বেজে উঠল। অপূর্ব মাদকতাময় সুরের মূর্ছনায় গাছেরাও গা দোলাতে লাগল। মাথা নাড়াতে নাড়াতে, গান গাইতে গাইতে, আলোর রামধনু চারদিকে ছড়িয়ে কচ্ছপ এল গাছের তলায়। শিকারি ছল করে তাকে গাঁয়ের লোকের কথা না বলে বেজায় উৎসাহে বলল, “চলো বন্ধু, আজ তোমার পিঠে চেপে, গান শুনতে শুনতে একটা নতুন জায়গা থেকে ঘুরে আসি।”
সরলমতি কচ্ছপ শিকারির কথায় ভুলে গেল। তাকে পিঠে বসিয়ে পরমানন্দে চলল নতুন জায়গায় বেড়াতে। শিকারি এদিক ওদিক জঙ্গলে ঘুরে, একথা-সেকথায় কচ্ছপকে ভুলিয়ে সোজা ঢুকে পড়ল গাঁয়ে। সবাই কচ্ছপের পিঠে বসা শিকারিকে দেখে ছুটে এল। বিস্ময়ে কচ্ছপকে দেখে মনে মনে তারিফ না করে পারল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাঁয়ের মোড়লমশাই ভিড় ঠেলে এসে হাজির হলেন। কচ্ছপের পিঠ থেকে নেমে সানন্দে শিকারি বলল, “এই যে হুজুর আমার বন্ধু, গায়ক কচ্ছপ। বন্ধু এবার তুমি শুনিয়ে দাও তো তোমার সুরেলা গান। সবাই উৎসুক হয়ে আছে তোমার গান শুনবে বলে।”
কচ্ছপ মুখ ঘুরিয়ে দূরের জঙ্গল দেখতে থাকল, একটা কথাও বলল না। শিকারি অধৈর্য হয়ে উঠে কচ্ছপের পিঠে খোঁচা দিয়ে বলল, “কী রে ব্যাটা, বললাম না গান শোনাতে! চুপ করে আছিস কেন?”
শিকারির খোঁচাখুঁচি, অনুনয় বিনয়―কিছুই কচ্ছপের গলা দিয়ে একটা শব্দও বার করতে পারল না। শাস্তির কথা ভেবে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দিশেহারা শিকারি পা দিয়ে কচ্ছপকে লাথি মারতে মারতে গালমন্দ করল। মার খেয়েও চুপ করে রইল কচ্ছপ। ভিড়ের ভিতর শিকারির অপদার্থতা নিয়ে গুঞ্জন উঠল। ভীষণ হুঙ্কার দিয়ে মোড়ল বললেন, “এই কে আছিস, তলোয়ার দিয়ে এক কোপে ব্যাটার মুণ্ডু উড়িয়ে দে। ব্যাটা মিথ্যুক!”
কান্নায় ভেঙে পড়ে শিকারি মোড়লের পা ধরে জীবন ভিক্ষা করতে লাগল। কিন্তু মোড়লমশাইয়ের কথা আর হাতে ছোড়া বর্শা—অব্যর্থ। পিছন থেকে এক গ্রামবাসী এসে এক কোপে ধড় থেকে আলাদা করে দিল শিকারির মুণ্ডু। রক্তে ভেসে গেল প্রাঙ্গণ। সবাই শিউরে উঠতে না উঠতে দূর থেকে ভেসে এল কচ্ছপের গলায় গান―
মানুষগুলো বড্ড পাজি,
যা দেখে সব তাতেই ঝাঁপায়।
বাকিরা সব আত্মভোলা,
পেট ভরলেই নিদ্রা যে যায়।


কচ্ছপ তখন সকলের অলক্ষ্যে জঙ্গলের ভিতর গান গাইতে গাইতে অদৃশ্য হয়ে গেছে। গাঁয়ের লোকেরা এবার সবাই মিলে কাঁদতে বসে। ভাবে, শিকারি তো ঠিকই বলেছিল, এ ছিল কথা বলা গান গাওয়া কচ্ছপ, যা তারা কোনোদিন দেখেনি।


_____


অঙ্কনশিল্পীঃ অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

No comments:

Post a Comment