গল্পঃ বহুরূপেঃ কল্যাণ সেনগুপ্ত



“কে? কে?”
আধো অন্ধকারে রোগাটে ছোটোখাটো একটা ছায়ামূর্তি বারান্দার দরজার কাছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে গলা কেঁপে যায় শতদলের।
“আজ্ঞে আমি।”
মনে জোর পান। যাক মানুষের গলা। প্রশ্ন করেন, “আমিটা কে?”
উদ্বিগ্ন পাতলা কন্ঠস্বরে জিজ্ঞাসা, “আপনি ঘুমাননি এখনও?”
নিশ্চয় চোর ঢুকেছে। মানুষের কণ্ঠ হলে অবশ্য অন্ধকারেও এতটা ভয় লাগে না। “কেন, আমি ঘুমোলে কী সুবিধা হয়?”
“না না, ছি ছি, কী বলছেন স্যার!”
“এই আমিটা কে?”
“বিহারী, স্যার।”
“বাড়ি কোথায়? বিহার? এখানে কী উদ্দেশ্যে?”
“আজ্ঞে চুরি করা।”
অ্যাঁ! চমকে ওঠেন শতদল। নিজের মনের জোর ফিরে পান ফের। “বলিস কী! চোর? তাও আবার গলা খুলে বলছিস কী করে বল তো? হাততালি দেব, না নাচব? দিনে দিনে আর কত কী দেখব রে? সত্যি দেশ এগোচ্ছে। বুক ফুলিয়ে বলছিস, চুরি করি? বলি, দেশে আইনকানুন কি গোল্লায় গেছে? ওরে হতভাগা, আমি এখনও জেগে আছি। আর এলি কোথা দিয়ে?”
লজ্জিত উত্তর আসে, “আজ্ঞে আপনার বারান্দা।”
চোরের সাহস দেখে অবাক হবেন, না হতবাক হবেন বুঝতে পারেন না শতদল দলুই। দোতলা বাড়ি, ওপরে পুজোর আর শোবার ঘর, নিচে বসার ঘর, রান্নার ঘর, ঠাকুর-চাকরদের ঘর। স্ত্রী মিনতি গেছে পুনে, ছেলে আইটিতে চাকরি করেーতার সেবা করতে। সে কঠিন অসুখে আক্রান্ত। অদ্ভুত জ্বর আর মাথার যন্ত্রণা। সেখানকার হাসপাতালে শয্যাশায়ী। মন তাই শতদলের বেশ উদ্বিগ্ন। মিনতি নিত্য নারায়ণের পায়ে হত্যে দিয়ে আছে ছেলের মঙ্গল কামনায়। আজ এই মানত, কাল ওই উপোস।
ঠাকুর-দেবতাতে তেমন মন নেই ওঁর। আজ শুতে যাবার আগে আনমনা হয়ে শোবার ঘরের মিনতির ঠাকুরের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। ভাবছিলেন মিনতি যে কী শান্তি পায় কে জানে। ঠাকুর-দেবতা থেকে শতহস্ত দূরে থাকেন তিনি, কিন্তু মিনতি রোজ ঠাকুর-দেবতা পুজো উপোস, ব্রত এইসব নিয়েই আছে। বাধা দেন না। তবুও আজ ছেলে অর্ণবের কথা ভেবে শুতে যাবার আগে চেয়ে চেয়ে ভাবছিলেন এই মাটির মূর্তির কাছে কীই বা বা চাইবেন? কী পায় মিনতি?
শতদল দেখলেন, তাই তো! বারান্দার দরজাটা খোলা। ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গেছিলেন। চোর মনে হয় তখনই ঘরে ঢুকেছে, ঢুকে সে কাউকে দেখতে পায়নি। শতদল ছোটোখাটো বলে ঘরে ঢোকার পরও দেখতে পায়নি।
“সরি স্যার, ঘুমিয়ে থাকলে আমি আসতাম না।”
শতদল চোরের বুকের পাটা দেখে থ মেরে যান। “তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি বাবা! ভালো কাজে লাগালে তো তোমার অনেক কিছুই হত। তা আমি যদি ঠাকুর-চাকরদের ডাকি তাহলে কী হবে?”
অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে বলে, “আমি জানি আপনি ডাকবেন না, কারণ আমি তো কিছুই করিনি।”
“ওরে বাবা! আমার ঘরে রাতবিরেতে ঢুকেছ, সেটা? সেটা কি তোমার অধিকারের মধ্যে পড়ে? যাক আমি যখন ঘুমাইনি তখন তোমার তো কেটে পড়াই ভালো। যেদিক দিয়ে এসেছ, সেদিক দিয়েই চলে যাও। আমি এবার ঘুমোতে যাব।”
“স্যার।”
“কী চাও? আমি নিচের হরেন-মালতিকে ডাকব?”
চোর বেপরোয়া হয়ে ওঠে। “কিন্তু আমি স্যার চুরি করতে এসেছি।”
বিরক্ত হয়ে ওঠেন শতদল। শক্ত গলায় বলেন, “দেখো, রাতবিরেতে এইসব ঠাট্টা আমার ভালো লাগছে না। সাহসের বলিহারি তোমার। এবার আমি লোক ডাকব। তুমি যাবে কি না?”
হালকা অন্ধকারে বুঝতে পারেন এটা একটা রোগা পটকা ছেলে, গেঞ্জি আর ফুলপ্যান্ট পরা, একটা পা গোটানো, উসকোখুসকো চুল, খালি পাーআধো অন্ধকার ঘরে আর কিছু বোঝা যায় না। ছেলেটির কথায় খুব বিপদজনক মনে হয় না ওকে।
শতদল আলো জ্বালাতে যান। দেখে ছেলেটি পিছন ফেরে। “স্যার, আমার একটা আর্জি আছে।”
“কী আর্জি?” বিরক্তও লাগে, আবার মজাও পান।
“এসেছিলাম চুরি করতে।”
“তো?”
“না করে ফিরে যাই কী করে?”
শতদল স্বগতোক্তির মতো বলেন, “আর কি কিছু আছে চুরি করবার? সবই তো বহুদিন আগে চুরি হয়ে গেছে।”
ভাবলেন, ছেলেটা পাগল নাকি? মুখটা কেমন চেনা-চেনা মনে হয়। কোথায় দেখেছেন যেন। জিজ্ঞাসা করেন, “তোকে কোথায় দেখেছি বল তো? এই আশেপাশেই কোথায় যেন দেখেছি তোকে।”
দাঁত বেরিয়ে পড়ে বিহারীর। “আজ্ঞে, সামনের পার্কের গায়ে যে চায়ের দোকান, সেখানে।”
“চাকরি করিস? তা বেশ। কিন্তু চুরির নেশাটা কি উপরি?”
শতদল আলোর সুইচের দিকে যাবার উপক্রম করতেই সে বলে ওঠে, “থাক না স্যার। চাকরিটা গেছে, মানে ছাড়িয়ে দিয়েছে।”
“কেন, চুরির জন্যে?”
বিহারী মাথা চুলকায়। “বাবু চুরি করছিল। দুধে জল মেশাত, ডিমের অমলেট করতে দুটো বলে একটা ডিম দিত। বলে ফেলেছিলাম, তাই।”
শতদলের ঘুম চৌপট হয়ে যায়। “গুণী ছেলে রে তুই, অ্যাঁ! তা এখন তোকে পুলিশে তো আমিই দেব।”
এদিক ওদিক চেয়ে মাথা চুলকায় বিহারী। শান্ত গলায় বলে, “চেচাঁবেন না স্যার, আমাকে ধরা এত সোজা নয়।”
“কেন? সহজ নয় কেন? কী এমন লাটের বাট তুই?” শতদল স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেন। “তোর নাম কী রে?”
“আজ্ঞে বললাম যে।”
“নামের মানে জানিস? কার নাম এটা? এদিক ওদিক কী দেখছিস?”
“দেখছিলাম আপনার ঘরে তেমন কিছুই নেই ওই রাধাকৃষ্ণর মূর্তি ছাড়া।”
“তাহলে শেষ সুযোগ দিচ্ছি, কেটে পড় চটপট। নাহলে লোক ডাকব।”
“স্যার, অনেকবার বলছেন যখন তখন। ডাকুন কাকে ডাকতে চান।”
শতদল চিৎকার করতে গিয়ে দেখলেন উত্তেজনায় গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। আবার ভাবলেন, এত রাতে পাড়া আর বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে আবার কী বিড়ম্বনা হয় কে জানে। ততক্ষণে এই ছোঁড়া বারান্দা দিয়ে চম্পট দিতেই পরে।
বিহারী মুচকি মুচকি হাসছে কোমরে দু’হাত রেখে। “হল? এবার কী করবেন স্যার?”
শতদল গম্ভীর হয়ে বলেন, “কী কী নিয়েছিস বল এখন অবধি?”
উত্তর আসে, “স্যার, ভুল করছেন। আমি ছিঁচকে চোর নই।”
“তাহলে কী চুরি করতে এসেছিস?”
“আপনাকে।”
থ মেরে যান শতদল। “আমাকে চুরি করবি? আমাকে? কী বলছিস মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। নিয়ে যাবি কী করে? ওরে, হাসব না কাঁদব!”
“আপনাকে চুরি করব ঠিকই, তবে নিয়ে যাব না রেখে যাব ভাবিনি।”
এবার আত্মাভিমানে লাগে। ভীষণ রেগে যান শতদল। “ইয়ার্কি মারার জায়গা পাসনি? দেড় আঙুলের ছোঁড়া, রাতবিরেতে এসেছিস আমাকে চুরি করবি বলে? বলি, নেশাভাঙ করে এসেছিস নাকি? দড়ি এনেছিস?”
“দড়ি কেন স্যার?”
“তাহলে নিয়ে যাবি কী করে?”
বিহারী মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। “চুরি যখন যাবেন তখনই দেখতেই পাবেন।” বলে ঘরের নানা জিনিস পরখ করে দেখতে থাকে। শতদল স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে থাকেন এবং মজাও পান। দেখতে থাকেন বিহারী কী করে। খুব বড়ো কোনও ঝামেলা ওর তরফ থেকে আসবে না বুঝতে পারেন। ওকে অন্যমনস্ক করতে বলেন, “কে কে আছে তোর?”
বিহারী উত্তর দেয় না। দেখতে দেখতে মিনতির রাধাকৃষ্ণর মূর্তির সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। “একে আপনি মানেন?”
“না, মানি না।” শতদল দৃঢ়ভাবে উত্তর দেন।
“তাহলে এখানে উনি?”
“মিনতি মানে। দেবতা, মূর্তি পুজো আমি মানি না। ভগবান-টগবান এসব বাজে কুসংস্কার আমি মানি না।”
বিহারী মুচকি হাসে। “আমি দেখেছি আপনি মূর্তির দিকে চেয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। কিছু চাইছিলেন কি?”
“ওরে বাপস, সেটাও দেখেছিস! অনেকক্ষণ তাহলে ঘাপটি মেরে বসে আছিস!” অবাক হন শতদল। “ছেলের শরীরটা খারাপ, তাই চেয়েছিলাম যদি উনি ভালো কিছু করে দেন। আর ভাবছিলাম মিনতি কীভাবে ডাকে তাঁকে।”
“স্যার, আপনার মন দুর্বল হয়েছে।”
“ছেলে বলে কথা। হ্যাঁ, মনকে তো কী করে বেঁধে রাখতে হয় জানি না।”
“স্যার আপনি মূর্তি, ঠাকুর কিছুই মানেন না। তাহলে মন অসহায় হলে, অস্থির হলে আপনি কেন মূর্তির সামনে দাঁড়ান? অন্য কোনও ছবির সামনে তখন তো দাঁড়ান না! আসলে কোনও কোনও সময় সবাই একটা অবলম্বন খোঁজে মনকে সান্ত্বনা দিতে। তখন কেউ কেউ কোথাও কারুর একটা অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করে। তাকে যে নাস্তিক সে বুঝতে পারে, ধরতে পারে না আর যে তার উপস্থিতি উপলব্ধি করে সে তার অবয়ব খুঁজে নেয় কোনও মূর্তির বা ছবির মাধ্যমে।”
শতদল বিরক্ত হন। “বড়ো বাজে কথা বলছিস এই মাঝরাতে। কেটে পড় দেখি।”
বিহারী পিছন ফেরে। “যাক, আপনার সঙ্গে আলাপটা তো হয়ে গেল। পরে সময় করে আসব। তখন কিন্তু লোক ডেকে হুজ্জুত করবেন না। আর দেখে নিন, আপাতভাবে আমি কিছুই নিয়ে যাচ্ছি না।” বলে তিড়িং করে এক লাফে বারান্দায়, তারপর নিমেষে ভ্যানিশ।
শতদল তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বারান্দার দরজার ছিটকিনিটা লাগিয়ে দেন। বিহারী ছেলেটা অদ্ভুত।


সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই উঠে বসে শতদলের মনে পড়ে গতরাতের কথা। উঠে বারান্দায় আসেন। পুরনো আমলের দাদুর করা বাড়ি। বেশ উঁচু দোতলা। কেমন করে এল বিহারী আ্রর গেলই বা কী করে? সামনে তো কোনও পাইপও নেই যেটা ধরে নামা যায়।
সারাজীবন সরকারি চাকরি করেছেন শতদল। একটি মাত্র ছেলে অর্ণব। মিনতি সারাজীবন ঠাকুর-দেবতার পুজোআর্চ্চা নিয়ে থাকে, স্বামীর আর ছেলের মঙ্গল কামনা আর তাদের সুস্থ স্বাস্থ্য আর নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কামনা করে। সব সম্ভাব্য বিপদ কাটানোর উপায় খুঁজে চলে। ছেলে অর্ণব চাকরি করে পুনেতে। স্ত্রী গেছে সেখানে, তাই উনি এখন একা বাড়িতে। সারাজীবন ইট-কাঠ-পাথর দিয়ে ঢালাই করেই গভর্নমেন্টের চাকরি করেছেন। ছোটোবেলা থেকে বাড়িতে এত ঠাকুর পুজো দেখেও এতটুকু ভক্তিভাব জেগে ওঠেনি।
আবার সেই চিন্তাটা ফিরে এল। বিহারী এল কী করে? গেলই কী করে? কী করতে এসেছিল? চুরি করতে সে আসেনি। কী যেন বলতে চাইছিল বিহারী। ঘরের সমস্ত জিনিস একইরকম আছে। একটুও এদিক ওদিক হয়নি। আবার এটাও মনে হল, গতকাল রান্নার মাসি কি বারান্দার দরজা বন্ধ করেনি? বিহারী এল গেল, অথচ কোথাও কোনও প্রমাণ রেখে যায়নি। আকাশপাতাল ভাবতে লাগলেন শতদল।
রাধামাধবের মূর্তির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল, কাল কে এসেছিল? এ ছেলেটি কি চায়ের দোকানে সত্যি চাকরি করে বা করত? নাম তো বলল বিহারী। এমনভাবে এল আর চলে গেল, তাকে চেনা গেল না। বিহারী নামটা খুব চেনা। মনে পড়ল হঠাৎ, আরে, বিহারী তো কৃষ্ণর আরেক নাম! দম বন্ধ, চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায় নিমেষে শতদলের। তাহলে কি… আশায় উদ্বেলিত হয় মন। তাহলে এবার মিনতির একটা ফোন এল বলে যে অর্ণব এখন অনেকটা ভালোর দিকে।
বিহারীর কথা ভেবেই মনটা ভালো হয়ে গেল। কিন্তু নাস্তিক শতদল কাকে এই অভিজ্ঞতার কথা বলেবেন? কেই বিশ্বাস করবে যে বিহারী সত্যি বাঁকেবিহারী, আর এসেছিল ওঁর কাছে যিনি কিনা ঠাকুর-দেবতা বিশ্বাস করেন না! ওঁর উপস্থিতিও মানে না।
রোজকার মতো নিচে নেমে এলেন শতদল। মুখ ধুয়ে সকালের খাবার খেলেন, দুধ আনলেন, মুদি-সদাই আনলেন রোজকার মতো। কাগজ পড়ার চেষ্টা করলেন। না, কিছুতেই মন বসছে না। কাউকে বলতেও পারছেন না এমন ঘটনার কথা। এ-ঘর ও-ঘর পায়চারি করলেন। শেষে রান্নার লোক মালতীকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন, “গতরাতে দোতলার বারান্দার দরজা বন্ধ করেছিলি, মালতী?”
মালতী কিছুটা অবাক হয়ে বলে, “হ্যাঁ দাদাবাবু, এটা তো আমার রোজকার কাজ। কেন, খোলা ছিল মনে হচ্ছে?”
শতদল কোনও উত্তর দিলেন না। মালতী কিছুটা অবাক হয়। আনন্দে মনটাকে যেন মনে হচ্ছে আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। সবই মিলে যাচ্ছে, শুধু মিনতির ফোনটাই আর আসছে না। যত বেলা গড়াচ্ছে মনকে ধরে রাখতে পারছেন না শতদল।
শেষে দুপুরের দিকে ফোনটা করেই ফেললেন মিনতিকে। কালকের ঘটনাটা মিনতিকে বলেতেই হবে। কয়েকবারের চেষ্টায় লাগল ফোন। মিনতি একথা সেকথা বলছে, কিন্তু সেরকম তো কিছু বলেছে না দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করেই ফেলেন, “খোকা কেমন আছে তো বললে না? আমি তো ওটাই জানতে চাইছি। এখন একটু নিশ্চয়ই ভালো?”
মিনতিকে খুব একটা আশান্বিত লাগে না। “না, একইরকম। জ্বরটা কমবেশি হচ্ছে। তবে ডাক্তার বলেছেন, চিন্তার কিছু নেই। মাথার যন্ত্রণাটা একটু কম। কিন্তু তুমি কেমন আছ? ওষুধবিসুধ সব ঠিকমতো খাচ্ছ তো? এরকম গলার স্বর কেন তোমার?”
শতদল হতাশ ও উদ্বিগ্ন হন। “দু’দিন ধরে হাসপাতালে? তার মানে মেডিসিনে কাজ হচ্ছে না। তোমরা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছ না কেন? এরকম তো হবার কথা নয়। এতগুলো করে টাকা নেয়। আমি কি যাব?”
মিনতি শান্তভাবে বলেন, “চিন্তা কোরো না। ঠিক মেডিসিনই পড়েছে। একটু সময় তো দিতে হবে। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছ। আমি তো মা, আমি সামনে আছি। কিন্তু তুমি কেন এত উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছ? তোমাকে এত ব্যাকুল তো কখনও দেখিনি!”
একটু থেমে মিনতি বলেন, “তুমি কিছু বাধিয়ে বসো না, তাহলেই মুশকিল হবে।”
শতদল হতাশ হয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখেন। এমনটা একেবারেই ভাবেননি।
দুপুরটা কোনোরকমে এদিক ওদিক করে কাটিয়ে বিকেল হলেই বেরিয়ে পড়লেন চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যে। ছেলেটি নেই দোকানে। তাহলে কি ছেলেটি যা বলেছে সেটাই ঠিক?
চা খেলেন। একথা ওকথা বলে দোকানের মালিককেই জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার এখানে একটি ছেলেকে দেখেছিলাম আগে, এখন সে নেই?”
মালিক চা করতে-করতেই আক্ষেপ করে, “বুঝলেন, আজকাল আর কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। নেমহারাম মশায়! ঐ বিহারী মশাই খেতে পেত না। রাস্তা থেকে তুলে চায়ের দোকানে চাকরি দিলাম আর কিনা আমাকেই ঠকিয়ে চলে গেল! কী যে দিনকাল পড়ল কে জানে। তা আপনি মশাই চিনতেন নাকি ওকে?”
মাথা নাড়েন শতদল। উনি চেনেন না।
“কী করেছিল সে?”
“আর বলবেন না। নিজের দোকানের খাবার অন্য কাউকে বিলোচ্ছে দেখে আর মাথা ঠিক থাকে? দোকানের খাবার সরাচ্ছিল। পাকা চোর, বুঝলেন না? দিয়েছি ছাড়িয়ে।”
এদিক ওদিক ভাবতে ভাবতে ফিরে এলেন শতদল। বিহারী যা বলেছিল সে তো মিলে গেল। ভাবলেন, ভাগ্যিস কাউকে কিছু বলেননি। তাহলে হাসির খোরাকই হতে হত। হতাশ হলেন এই ভেবে যে বিহারীকে যা ভেবেছিলেন সে তেমন কিছুই নয়। ব্যাটা চোর, বাটপাড়ーস্রেফ চুরি করতেই এসেছিল। ধরা পড়ে নানা গল্প ফেঁদেছে যাতে পুলিশে না দেই। কোনও কিছু ভেবে না মিললে যে দুঃখটা হয় সেটাই মনকে ভারাক্রান্ত করে।
সেই দিনই রাত্রে বাথরুমে যাবেন বলে উঠে দেখেন আধা অন্ধকারে বিহারী। বারান্দার দরজার সামনে। আজ আর ভয় লাগে না। কিন্তু ভীষণ রেগে যান। বলেন, “আমি এবার লোক ডাকব। তোকে পুলিশে দেওয়া দরকার। চোর কোথাকার!”
বিহারী দেঁতো হাসি হাসে। “খুব হতাশ লাগছে স্যার? মিলিয়ে দেখলেন আমি চায়ের দোকানে কাজ করতাম কি না? এত অবিশ্বাস?”
শতদল উত্তর দেন না।
“আমি জানতাম আপনি খোঁজ নিতে যাবেন। আপনার ভগবান ও মানুষে দুটোতেই অবিশ্বাস। মনে এত অবিশ্বাস রাখবেন না স্যার।”
“আমি ভগবান মানি না। রাতদুপুরে তুই কি জ্ঞান দিতে এলি? যা যা, দিনের বেলা আসিস।”
বিহারীর মুখে হাসি লেগেই থাকে। “তাহলে স্যার এত আশা করেছিলেন কেন? আমি ভগবান হয়ে আপনার ছেলেকে ভালো করে দেব? আমি জানি আপনি রেগে যাচ্ছেন এই ভেবে যে আপনি যা ভেবেছিলেন আমি তা নই।”
“আমি যাকে ভেবেছিলাম সে তুই নোস। সবাই নিজের ভালো চায়, আমিও তাই চেয়েছিলাম।”
বিহারী হাসি মুখে বলে, “স্যার, এবার কিন্তু আপনাকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছি। আপনার ভিতরটাও দেখতে পাচ্ছি। জলের মতো।”
“কী দেখছিস?” শতদল জিজ্ঞাসা করেন।
“আপনি একজন দ্বিধান্বিত মানুষ, ভগবানেও নেই আবার মানুষকেও বিশ্বাস করেন না। মালিকশ্রেণী যা বলে তার কথাই বিশ্বাস করেন। পরিধানকে বেশি প্রাধান্য দেন।”
শতদল প্রতিবাদ করেন। “একদম ভুল কথা। আমি সব মানুষকে বিশ্বাস করি। প্রথমবার পারিসনি তাই আবার এসেছিস চুরি করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তোর, আজও আমি জেগে।”
“স্যার, আমি ফিরে এসেছি শুধু আপনার মনের ছবিটা পরিষ্কার করতে। দেখুন আমার কোনও সঠিক রূপ নেই। আমি আপনাতেও আছি আবার চাওয়ালাতেও আছি। তাছাড়া আপনি আমাকে তো চোর ছাড়া কিছুই ভাবেননি। বিহারী দোকানের খাবার চুরি করেছিল মৃত্যু পথ যাত্রী ভিখারিকে খাবার দিতে। তাই চৌর্যবৃত্তির কালিমা ওর গায়ে লাগে না।”
শতদল থমকে যান। বিহারীকে কেমন অচেনা মনে হয়। জিজ্ঞাসা করেন, “কে তুই?”
“ওই যে বললাম স্যার, বিহারী।”
“তুই তো চায়ের দোকানের বিহারীর মতো কথা বলছিস না। তোর কী পরিচয় বল।”
শান্ত শীতল গলায় বিহারী বলে, “আমার আলাদা কোনও পরিচয় নেই। আমি আপনাতেও আছি, চায়ের দোকানের বিহারীতেও আছি। আমি ফিরে এসেছি আপনাকে চেনাতে যে আপনার মধ্যেও আমি আছি। প্রতিটি মানুষের মধ্যে আমি আছি। শুধু আমাকে চিনে নিতে হবে নিজের আত্মা আর উপলব্ধি দিয়ে। মূর্তি তো মানুষের তৈরি, আর মানুষ?”
বিহারী মৃদু হেসে আস্তে আস্তে রাধাকৃষ্ণর মূর্তির সামনে দাঁড়ায়। সহসা ঘর ভরে যায় অদ্ভুত এক মায়াবী আলোয়। মূর্তির ছায়া বড়ো হয়ে ঢেকে ফেলে বিহারীকে। বিস্ফারিত চোখে শতদল দেখতে থাকেন বিহারী আর রাধাকৃষ্ণ মিলেমিশে একাকার। কাঁপতে থাকে সারা শরীর। এ কী, এ কী দেখছি আ... গলা জড়িয়ে যায়।
একবার বিহারী, আবার কৃষ্ণ পর্যায়ক্রমে রূপ পরিবর্তন দেখে শতদলের মাথা ঝিমঝিম করে। এ কী দেখছেন তিনি? এও সম্ভব? ইনিই কি সকল প্রাণীর মধ্যে নিরন্তর প্রাণের সঙ্গীত বাজিয়ে চলেছেন? তাকে ধরে রেখেছেন? সবার মধ্যে এঁরই কি উপস্থিতি?
বিহারী এগিয়ে আসে দু’হাত বাড়িয়ে। দু’হাত বাড়িয়ে দেয় শতদলের দিকে। “আর কোনও অবিশ্বাস নয়, আর কোনও দ্বিধা নয়। মূর্তির মধ্যে তো আমি নেই। এই বিশ্বচরাচর ঘিরে সমস্ত প্রাণী, পশুপাখি, জীবজন্তু, মানুষ সবার মধ্যেই আমার উপস্থিতি। সমস্ত উদ্বেগ, ভুল বোঝার শেষ হোক।” বলে বিহারী তাঁর আজানুলম্বিত দু’হাতে শতদলকে আলিঙ্গন করে বুকে টেনে নেন। দুই সত্বা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। শতদল জ্ঞান হারান চরম সত্যের আঘাতে।


_____

1 comment:

  1. আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া

    ReplyDelete