গল্পঃ স্কাউট বয় বড়োমামাঃ রাজীবকুমার সাহা



“আজ তবে গল্পটা স্কাউটিং নিয়েই হোক। কী বলিস রে, রাতুল?” বড়োমামা বাজারের থলেটা রান্নাঘরের দাওয়ায় চালান করে দিয়ে আমাদের ঘরে ঢুকলেন এসে।
বিশেষ কিছু না বুঝেও হৈ হৈ করে উঠলাম সবাই, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, হোক, হোক।”
গুছিয়ে বসতে বসতে বড়োমামা জবাব দিলেন, “বেশ। তবে তার আগে খানিক পরিচয় পর্বটা সেরে নেয়া যাক। কী?”
সে আমরা সবাই জানি। বড়োমামা যেদিন যে বিষয় নিয়ে গল্প বলবেন সেদিন সে বিষয়ে শুরুতেই খানিক জ্ঞানগম্যি বিতরণ না করে গল্প শুরু করেন না। রাতুল তখন যথারীতি নোটবুক আর পেন্সিল কোলে টেনে নিয়েছে। ইদানীং অল্পস্বল্প লেখালিখিতে হাত পাকাতে শুরু করেছে ও। ওসব কাঁড়ি কাঁড়ি তথ্য আজকাল অবশ্য ইন্টারনেট খুললেই মেলে। কিন্তু যে সময়কার কথা বলছি, তখন বড়ো বড়ো শহরেও ও-জিনিসটার ততটা চল ছিল না, এতটাই দুর্মূল্য ছিল। আর গাঁ-গঞ্জে তো নামই শোনেনি কেউ।
রাতুল তাড়া দিল, “শুরু করো, বড়োমামা। আমি রেডি।”
“বেশ। বুলি, তুই বল স্কাউটিং জিনিসটা কী।” বড়োমামা বাবু হয়ে বসে ডান হাঁটুতে হাতের তালু বুলোতে বুলোতে জিজ্ঞেস করেন।
উত্তর দেওয়ার বদলে বুলি ঘাড় চুলকে লাল করে ফেলল।
বড়োমামা নীরস মুখে বললেন, “অ, জানিস না দেখছি। এনিওয়ান?”
রাতুলটা মুখিয়েই ছিল। হাত তুলে গড়গড় করে বলতে শুরু করল, “স্কাউটিং হচ্ছে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেখানে ছেলেমেয়েদের সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থ মানসিক গঠনের সহায়ক কর্মসূচির মাধ্যমে যেকোনও আপদকালিন দুরবস্থা মোকাবিলা করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।”
উত্তর শুনে খুশি হলেন বড়োমামা। বললেন, “বেশ, বেশ। সংগঠনটা তৈরি করেছিলেন ইংল্যান্ডনিবাসী লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল। কবে বলত? ১৯০৭ সালে। আর ভারতবর্ষে এর প্রচলন হয় দু’বছরের মাথায়, ১৯০৯ সালে।”
এই বলে বড়োমামা খানিক থামতেই আশার সঞ্চার হল সব ব্যাজার মুখগুলোতে। এক রাতুল তখনও টুকে যাচ্ছে নোটবুকে পরম উৎসাহে। বড়োমামা চট করে সবার মুখে একবার করে চোখ বুলিয়েই হাত বাড়িয়ে রাতুলের মাথায় একটা চাঁটি মেরে বললেন, “অ্যাই টুকিরাম, বই আছে আমার কাছে একখানা। দুপুরে বের করে দোব’খন। টোকা বন্ধ করে গল্পটা শোন এবারে।”
ততক্ষণে মুড়িমাখা আর চায়ের কাপ নামিয়ে গেছেন মামিমা।
ছেলেবেলায় মামাবাড়ির সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ ছিল বড়োমামার গল্প। সেবারও স্কুলে ছুটি পড়তেই জনা ছয়েক তুতো ভাইবোন মিলে হামলে পড়লাম মামাবাড়িতে। বড়োমামার পড়ার ঘরটা ইয়া বিশাল। মেঝেতে শতরঞ্জি পেতে বসল গল্পের আসর।
বড়োমামা শেষ চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখলেন চায়ের কাপটা। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে শুরু করলেন গল্প। আমরা ততক্ষণে আরও ঘন হয়ে বসেছি বড়োমামার কাছে এসে।
“সালটা বুঝলি, উনিশশো বাহাত্তর কি তিয়াত্তর হবে। সঠিক মনে পড়ছে না এখন। পুরুলিয়ায় কংসাবতীতে বাঁধ ভেঙেছে, চাদ্দিক ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ডাক পড়ল। আমরা পনেরো জন স্কাউট বয়ের একটা টিম রওনা হয়ে গেলুম অঝোর ধারা মাথায় করেই। গাড়িতেই এ-জন ও-জন বলাবলি করছিল, বেশ কিছু জায়গায় রেললাইন ডুবে গেছে। আমাদের ক্যাপ্টেন ভবানীস্যার বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন তাতে। কাছাকাছি গিয়ে যদি ফিরেই আসতে হয় তবে আর মুখ থাকে না।”
“তুমি স্কাউটিং করতে, বড়োমামা!” বেশ গদগদ গলায় জানতে চাইল বিতু।
“সে কী রে! তোরা জানিস না বুঝি? আমি তো সেই ক্লাস সিক্সেই নাম লিখিয়েছিলুম।”
“পৌঁছতে পেরেছিলে তোমরা শেষপর্যন্ত, বড়োমামা?” সুমির আর সয় না।
“আরে, পুরুলিয়া জংশনে পৌঁছব কী, আদ্রা অবধিই তখন যেতে পারলে বাঁচি। তবে কষ্টেসৃষ্টে গড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড়ি অবিশ্যি আদ্রা অবধি পৌঁছেছিল। নেমে ভ্যান রিকশা ধরে এগোলাম যতটুকু পারি। তারপর কখনও হাঁটা, কখনও নৌকো কিংবা আবার ভ্যান রিকশাーএভাবে শেষপর্যন্ত স্পটে যখন পৌঁছলুম গিয়ে একেকজনের শরীরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই তখন।
“পৌঁছামাত্রই শুরু হয়ে গেল রিলিফের কাজ। গ্রামবাসীদের মালপত্তর সমেত শরণার্থী শিবিরে পৌঁছে দেওয়া, সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে চিঁড়ে গুড় সংগ্রহ করে এদের বিলি-বণ্টন করা, সাধারণ ওষুধপত্রের যোগান রাখা, পরিষ্কার পানীয় জলের ব্যবস্থা করাーআরও হেনা তেনা কত কী। আমরা তিনজনーভক্তি, কমল আর আমি দায়িত্ব নিলুম একটা উঁচুমতো জায়গা দেখে তাঁবু খাটাবার। অপরিসর তিনটে তাঁবুর ভেতরে ঘাসে শতরঞ্জি পেতে শোবার ব্যবস্থা। এই দলে আমরা তিনজনই ছিলুম একমাত্র স্কাউট। আর বাকিরা রোভার।”
“রোভার? সে আবার কী? স্কাউটের দলে অন্য দল ভিড়ল নাকি?”
মাছি তাড়াবার ভঙ্গিতে হাত নাচিয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দেন বড়োমামা, “আরে না। সবাই এক দলেরই। স্কাউটে চারটে ভাগ থাকে তো। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের বলে বানি। ছ’ থেকে দশ কাব-বুলবুল। একটু বড়ো ছেলেরা যেমন এগারো থেকে সতেরো যাদের বয়স তাদের বিভাগের নাম হল গে স্কাউট। আর রোভার হচ্ছে ঠিক পরের ধাপটা, মানে যারা আঠেরো থেকে পঁচিশের মধ্যে। আমরা তিনজনের বয়স তখন ধর পনেরো-ষোলো।”
“ইয়ে বড়োমামা, মেয়েদের হয় না ও’রম দল?” বুলির ইতস্তত প্রশ্ন।
“হুম। হয় বৈকি। ওদেরও এ’রমই কমপক্ষে ছ’টা বিভাগ। আমাদের সময়ে অবিশ্যি ছিল না কেউ দলে।”
“এরপর কী হল? তাঁবুতে মস্ত বড়ো সাপ ঢুকল বুঝি?”
বড়োমামা চোখ ঘুরিয়ে বিতুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জবাব দিলেন, “না রে, সাপ নয়। বাঘ। রীতিমতো দ্য রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার!”
অ্যাঁ! নড়েচড়ে বসল সবাই এবারে। বড়োমামাও সুযোগ বুঝে ব্রড থেকে ন্যারো গেজ হয়ে পড়লেন। বললেন, “অ্যাই ইয়ে, সুমি, যা তো মা, মামিমাকে বল গে আরেক কাপ চা পাঠিয়ে দিতে। শুকনো গলায় কাঁহাতক আর বকা যায়।”
আবার মিনিট দশেকের অপেক্ষা কমপক্ষে। ধেত্তেরি!
চা এল। বড়োমামা কাপের তলানিটুকুও গলায় ফেলে দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করলেন। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে গোঁফটা মুছে সোজা হয়ে বসলেন।
“প্রথম দু’দিন তো নিজেদেরই রান্নাবান্না করে নিতে হচ্ছিল পালা করে। তারপর স্থানীয় এক পঞ্চায়েত মেম্বার একজন পাকশি (রাঁধুনি) ধরে আনলেন। কাঁচুমাচু মুখে বললে এসে, বানে ওর খড়ের চালা, গাই-গরু সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমাদের ক্যাম্পে রান্নার কাজ চায়। ভবানীস্যার পত্রপাঠ বহাল করে দিলেন। ব্যাটার রান্নার হাতটা অবিশ্যি খাসাই ছিল বলতে হবে। এই আকালেও এটা ওটা সাধারণ তরিতরকারি যোগাড়যন্ত্র করে এনে দারুণ দারুণ সব পদ রেঁধে ফেলত। নাম ছিল তার কানাই।
“তো এই কানাই একটা ব্যাপারে ছিল খানিকটা অদ্ভুত। প্রয়োজনটুকু ছাড়া শত জিজ্ঞেস করলেও ওই হ্যাঁ হু ছাড়া রা কাড়ত না এক্কেবারেই। তবে বছর পঁচিশেকের ছেলেটিকে ভালোই লেগে গেল আমাদের।”
“বাঘটা কী করে এল, বড়োমামা? বলছিলে যে তখন!” বিতুর ছোটো পিতু এতক্ষণ চুপটি করে থেকে অধৈর্য হয়ে উঠল এবারে।
“বলছি রে বাবা, বলছি! ঘোড়ায় এক্কেবারে জিন দিয়ে এলি নাকি? ওভাবে গপ্প হয়!” পাঁচন গেলার মতো মুখ করে রাখলেন বড়োমামা।
পরক্ষণেই বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে ফের শুরু করলেন, “কানাই ছেলেটা দিন দুয়েকের মধ্যেই মন জয় করে ফেলল সবার। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। কারণ, সবাই বেরিয়ে গেলে ক্যাম্পটা পাহারা দেওয়ার মতো একজন বিশ্বস্ত লোকের অভাব ছিল আমাদের। কানাই সে অভাব মেটাল।
“এমনি করে দিন চারেক চলে গেল। কংসাবতীর ভয়ংকর ক্রোধ তদ্দিনে খানিক ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। জল আর নতুন করে বাড়ছে না। এভাবে স্থির বয়ে গেলে জল আর দিন দুয়েকের মধ্যেই নামতে শুরু করে দেবে। বৃষ্টিটাও ধরেছে। আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি পুরোদমে।
“এরই মধ্যে একদিন রোভার বয় অমিতদার জুতো ছিঁড়ে গেল বিচ্ছিরিভাবে কাদায় আটকে গিয়ে। মেরামত নিজেকেই করে নিতে হবে। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ অবধি সবকিছুর ট্রেনিং থাকে আমাদের। একটা টিনের তোরঙ্গের মধ্যে জরুরিকালে ব্যবহার্য সবকিছু সঙ্গেই আনা হয়েছে। অমিতদা তোরঙ্গের ডালায় হাত দিয়েই চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে ঢুকলুম সবাই অমিতদাদের তাঁবুতে। হতবাক চেয়ে বলল, ‘দ্যাখ। টাকাপয়সা সব হাওয়া। চামড়ার ছোট্ট ব্যাগটাই নেই। তালা ভাঙা।’
“এই তাঁবুতে যারা থাকত সবার টাকাপয়সা এই তোরঙ্গেই তোলা থাকত। আলাদা তাঁবুতে আলাদা তোরঙ্গ। হতভম্ব সবাই এ ওর দিকে তাকাতাকি করে একযোগে চোখ ফেলল আমাদের দিকে পিঠ রেখে বাইরে বসে থাকা কানাইয়ের দিকে। ইটের চুলোয় তখন রান্না চাপিয়েছে সে। চোখে চোখে ইশারা হয়ে গেল। সবাই সেই মুহূর্ত থেকেই কানাইয়ের ওপর কড়া নজর রাখতে শুরু করলুম।
“না, এরপর তিনদিন পর্যন্ত আর কোনও চুরিচামারি হয়নি। পাকা চোর হলে চুরিটা রোজ করবে না, এ তো জানা কথা। যার যার টাকা খোয়া গেছে সবাই একটু মনমরা। এরই মধ্যে এক ঘটনা হল। আর সেটা রাতের বেলায় যখন মড়ার মতো ঘুমোচ্ছিলুম সবাই তখন।”
“ইয়ে বড়োমামা, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, চুরিটা কানাই করেনি। তোমাদের মধ্যেই কেউ নয়তো?” বিতু এবারে হড়বড় করে উঠল।
বড়োমামা বেশ বিরক্ত হয়ে, “ইশ! অ্যাই, এটাকে বের করে দে তো ঘর থেকে। বড্ড ফেলুদা হয়ে গ্যাছো, তাই না?” বলেই আবার খেই ধরলেন। মুচকি হেসে বললেন, “তবে ধরেছিস ঠিক। চুরি কানাই করেনি। করেছে তিনটে বাঘ।”
“বাঘ! সে কি!” সমস্বরে একরাশ আশ্চর্য ঝরে পড়ল আমাদের গলা থেকে।
“হুম, হুমদো হুমদো তিনটে বাঘ। একটা ধরা পড়ল, আর বাকি দুটো পালিয়ে গেল।
“হয়েছিল কী, সেদিন নিশুতি রাতে টের পাচ্ছিলাম কে যেন শোওয়া থেকে উঠে বেরিয়ে গেল পাশটি থেকে। আমার সিক্সথ সেন্স স্পষ্ট জানান দিচ্ছিল ওটা কানাই। আমাদের তাঁবুতেই শোয়ার ব্যবস্থা ওর। সারাদিনের অসম্ভব ক্লান্তিতে উঠে বসার জোর ছিল না মোটেও। কখন চোখ বুজে ফেলেছিলুম আবার। কিন্তু তন্দ্রাটা ঘন হয়ে আসতেই উঠে বসতে হল তড়াক করে। একটা আকাশ বাতাস কাঁপানো চিৎকার এদিকপানেই আসছে দ্রুত। ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে দেখি আর সবাই যার যার তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে গোল করে ঘিরে ধরেছে কানাইকে। বেচারা থরথর করে কাঁপছে। ভাবলুম, ব্যাটা এবারে নিশ্চয়ই হাতেনাতে ধরা পড়েছে। ও হরি! শেষে দেখি ব্যাপার মোটেও তা নয়। কানাই বোঝাচ্ছে, ও উঠে গেছিল ঝোপের দিকে ইয়ে সারতে। পাশেই কোথায় খসখস আওয়াজ হতে কাঁপা হাতে টর্চ মারতে গিয়ে মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে পড়ে। তারপর খানিক সম্বিৎ ফিরে পেতেই পড়িমরি দৌড় দেয় চিৎকার করতে করতে। ততক্ষণে কী একটা বড়সড় জন্তু বিদ্যুৎবেগে লাফ মেরে ছুটে পালায় জঙ্গলের দিকে।”
“বাঘ কি সেখানেই ঘাপটি মেরে ছিল?” নাক বেয়ে নেমে যাওয়া চশমাটা ঠিক জায়গায় ঠেলে তুলতে তুলতে রাতুলের বিজ্ঞ প্রশ্ন।
“হুম। তবে একটা নয়, তিন-তিনটে।”
“খুঁজে পেলে কী করে?”
“কাছেপিঠেই কোথা থেকে একটা গোঙানিমতো আওয়াজ লাগাতার কানে আসতে কানাইকে নিয়ে হট্টগোলটা থেমে গেল আমাদের। ভবানীস্যারের টর্চটা পাঁচ ব্যাটারির। ওটা বাগিয়ে ঝোপের দিকে চললেন উনি আমাদের সঙ্গে করে। পাতলা ঝোপ ভাঙতে ভাঙতে একটু ঘন গাছপালার দিকে এগোতেই সভয়ে আচমকা তিন পা পিছিয়ে এলেন আবার। পিঠ ঠেকে গেল কমলের বুকে। নয়তো পড়েই যেতেন। একটু ইতস্তত করে এবার চার-চারটে টর্চের ফোকাস গিয়ে পড়ল লাল-হলুদে ডোরাকাটা বিকট স্বরে কাতরাতে থাকা জন্তুটার ওপরে। স্যার খানিক হতভম্ব দাঁড়িয়ে থেকে শেষে কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে আনলেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে। বাঘ ব্যাটা হাতজোড় করে অবিকল মানুষের গলায় কাকুতি করতে লাগল, ‘আমায় মারবেন না, স্যার। গরিব মানুষ, অভাবে পড়ে ও-কাজ করে ফেলেছি। আমায় মাপ করে দিন বাবারা। আর কখনও অমন কাজ করবনি। ডান পাটা বোধহয় ভেঙেই গেছে, স্যার। খুব যন্ত্রণা কচ্চে।’
“অ্যাঁ! মানুষ-চোর বাঘ সেজে এসেছিল?” সবার মুখে তখন একটাই প্রশ্ন আমাদের।
বড়োমামা হেসে বললেন, “হ্যাঁ রে, বাঘের ছাল গায়ে জড়িয়ে দেখতে অবিকল বাঘের মতো দেখাচ্ছিল। মুখোশটাও ব্যাটা অমন জুত করে এঁটেছিল যে অন্ধকারে যে-কেউ জ্যান্ত বাঘ ভেবে ভিরমি খাবে। ভেবেছিল হয়তো ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকলেও কেউ জ্যান্ত বাঘকে জাপটে ধরার সাহস পাবে না।
“ভবানীস্যার এক ধমকে চুপ করিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘একাই আছিস? নাকি সাঙ্গপাঙ্গও আছে? সত্যি বলবি ব্যাটা, নইলে…’ বাঘটা তাড়াতাড়ি বলল, ‘আরও দু’জন ছিল, স্যার। হুই যে পালাচ্ছে।’
“আমি খপ করে স্যারের হাত থেকে টর্চটা খামচে তুলে আলো ফেললাম চোরের দেখানো আঙুলের দিকে। আর সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, জলাজঙ্গল ভেঙে দুটো দু’পেয়ে বাঘ ততক্ষণে ডাঙায় উঠে টেনে দৌড় মেরেছে। একটা বড়ো শ্বাস ছেড়ে চোর বলল, ‘আমার কপালটাই ফাটা, স্যার। অন্ধকারে পালাতে গিয়ে পাতা ঢাকা অত বড়ো গর্তটা ঠাহর করতে পারিনি। গত পরশু রাতে তো দিব্যি…’
“চোর ব্যাটাকে রাতের বেঁচে যাওয়া ঠাণ্ডা ভাত-তরকারি আর একটা পেইন কিলার খাইয়ে রাতেই আদালত বসে গেল তাঁবুতে। রায় হল, রাতটুকু কোনোমতে কাটিয়ে ভোর ভোর ওকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে আগে। ওর পাটা ফুলে যেভাবে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে, তার অবিলম্বে চিকিৎসা দরকার।”
এটুকু বলেই বড়োমামা দু’হাতের তালু দিয়ে দু’জানুতে সশব্দে চাপড় মেরে গল্প শেষ করলেন।
আমাদের মধ্যে বিতুটা বরাবরই ফিচেল। আমার কানে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল, “এ যে ছিনাথ বহুরূপী কেস দেখছি। শরৎচন্দ্রর মেজদা থেকে ঝেড়ে দ্যায়নি তো রে!”
আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে গিয়ে যতটা সম্ভব ভালো মানুষের মতো মুখ করে রাখলাম। বড়োমামা টেরটি পেলে বিকেলের ট্রেনেই তুলে দেবেন সবক’টাকে কান ধরে।


রবিবারের দুপুর। চোখ লাল করে পুকুর থেকে দাপিয়ে উঠে এসে খেতে বসেছি সবক’টা। পাতে পাতে আস্ত মুড়ো। পাশে বাটিভর্তি পাঁঠার কষা। এমনি সময় কোত্থেকে বেয়াড়া এক টিকটিকি থুপ করে পড়ল মামিমার পায়ে কাছে। বিকট এক চিৎকার করে তিন লাফে মামিমা দরজার কাছে। বিতুটার সইল না। চোখ গোল গোল করে বলে ফেলল, “সে কি গো, মামিমা! যে মানুষ কিনা জীবনমৃত্যুর পরোয়া না করে পুরুলিয়া গিয়ে শত শত লোকের প্রাণ বাঁচালেন, বাঘ ধরলেন, তুমি তাঁরই স্ত্রী হয়ে তুচ্ছ এক টিকটিকিকে ভয় পেলে?”
দরজার কাছ থেকে জবাব এল, “আ ম’লো যা! যে কিনা সারাজীবনে ব্যান্ডেল পেরলো না, গাঁদাল পাতা আর শিঙ্গিমাছের ঝোল ছাড়া অন্য কিছু পেটে সয় না, সে গেল পুরুলিয়া?”
আমরা নির্বাক তাকিয়ে রইলাম একে অপরের মুখে। পাতের মুড়ো পাতেই পড়ে রইল।

_____

2 comments:

  1. মজার গল্প। ছেলে মেয়েকে শোনালাম, বেশ মজা পেয়েছে ওরা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. রাজীবকুমার সাহাJuly 4, 2020 at 11:43 AM

      অনেক ধন্যবাদ! যাদের জন্যে লেখা তারা মজা পেলেই কলমচির পুরস্কার পাওয়া হল।

      Delete