ছোটো গল্পঃ ভোরের স্বপ্ন - সৌম্যদীপ


ভোরের স্বপ্ন


সৌম্যদীপ



“কী রে পিকু, কাল পরীক্ষা কেমন হল?” হেঁড়ে গলায় জানতে চাইলেন হিরুদাদু।

“ভালোই। তবে আইনস্টাইনের ওই ভর ও শক্তির নিত্যতা সূত্রটা আর কিছুতেই নামাতে পারলাম না খাতায়।” একটু ইতস্তত করে বলল পিকু।

শুনে তো রেগে কাঁই হিরুদাদু চেঁচিয়ে উঠলেন, “বলিস কী! জানিস আইনস্টাইন সাহেব বেঁচে থাকলে কী দুঃখটাই না পেতেন? জানিস কত বড়ো মনের মানুষ ছিলেন উনি? কোনো ধারণা আছে সেই বিষয়ে? যত সব অপোগণ্ডের দল! দূর হ হতভাগারা।”

নাহ্‌, আইনস্টাইন সাহেব বেঁচে কী হত জানলে তো আমরা আর এই শতাব্দীতে থাকতাম না। তবে সেসব কিছু না জানলেও এইটুকু বুঝলাম যে শুরু হয়ে গেছে হিরুদাদুর স্মৃতিরোমন্থন। বাবা-কাকার মুখে শুনেছিলাম যে দাদু ছিলেন বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। কোন বিজ্ঞান তা আমাদের কাছে আজও ভর ও নিত্যতা সূত্রের মতো অজানাই রয়ে গেছে। দাদু তো কখনো বলেন, তিনি একসময় কলকাতায় গবেষণারত বিদেশি খ্যাতনামা বহু বিজ্ঞানীর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বিজ্ঞানী ফ্লেমিংয়ের সঙ্গে বেশ যোগাযোগ ছিল বলেও শুনেছি। আমরা মনে মনে আন্দাজ করে নিই, নিউটন বেঁচে থাকলে হয়তো দাদুকে দিয়েই চতুর্থ সূত্র প্রমাণ করাতেন। যদিও দাদুর আমাদের এই এলাকার একজন সম্মানীয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি বলেই জানি। বাবা-কাকাদের মুখে আমাদের জ্ঞান হওয়া থেকে শুনে আসছি অবসরের পর বহু জায়গা থেকে আজও তাঁকে বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়।

দাদু একটু খিটখিটে স্বভাবের হলেও মানুষটা ছিলেন বড়োই সহজ-সরল। বয়স আশি-পঁচাশি ছুঁইছুঁই। বিয়ে করেননি সারাজীবন। কর্মরত অবস্থায় কলকাতায় থাকতেন শুনেছি। এখন সারাদিন নিজের পুরোনো পৈতৃক ভিটেতে বসে কী যে করেন ভগবান জানে! জিজ্ঞাসা করলে বলেন, “অপেক্ষা কর। তারপর দেখবি তোদের এই হিরুদাদু ফুঁ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে।”

আগেও দু-একটা গবেষণার কথা আমাদেরকে বলেছিলেন। জানি না সত্যি কি না। তবে আমাদের বার্ষিক পরীক্ষার পর প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় দাদুর বাড়িতে বসত খুদেদের আড্ডা। সঙ্গে চলত দাদুর জীবনের বহু রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার গল্প। এই তো ক’দিন আগে বিখ্যাত এক গণিতজ্ঞের জীবনের একটা বিরল ঘটনা দাদুর চোখ দিয়ে চাক্ষুষ করলাম আমরা। সত্যি-মিথ্যের দায় আমি নিতে পারব না। বাড়িতে এসে কাউকে সেসব জানালে এ ব্যাপারে কেউ তেমন কিছু বলতও না।

“কী রে গোলু, ওইরকম ক্যাবলা-মুখো হয়ে আছিস কেন?”

দাদুর খোঁচা খেয়ে ধড়মড় করে উঠে বুঝলাম আমাকে ছাড়াই বাকি সবাই দাদুর সঙ্গে অনেকটা সময় পিছিয়ে গিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে আমিও পৌঁছলাম যখন, বুঝলাম এটা বইয়ে পড়া বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের শহর। চোখ বুজে এদিক ওদিক চক্কর মেরে বুঝলাম, সালটা বোধ হয় উনিশশো পঞ্চান্ন।

দাদু বলা শুরু করলেন।

“তোদেরকে তো আগেই বলেছিলাম আমার নতুন গবেষণা, পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যাপারে।...”

চোখ খুলে দেখলাম, আমার মতো বাকিরাও মাথা চুলকোচ্ছে। বুঝলাম কেউই মনে করতে পারছে না।

“...ভেবেছিলাম শেষ বয়সে তাদের কয়েকজনকে দায়িত্বগুলো দিয়ে শান্তিতে চোখ বুজব। কিন্তু নাহ্‌, তোদের দ্বারা কিস্যু হবে না দেখছি।”

“তোমার সেই হাওয়া দিয়ে গাড়ি চালানোর ফন্দি?” দাদুর খোঁচানিতেই যেন মুখে আটকে থাকা কথাটা বেরিয়ে এল।

“যাক, এতগুলো গোবরগণেশের মাঝে একটা মাথা তো পাওয়া গেল।”

দাদুর কথা শুনে মনটা খুশিতে গদগদ হয়ে গেল।

আবার দাদু ফিরে এলেন পুরোনো কথায়। “তো যেটা বলছিলাম। মৃত্যুর আগে আইনস্টাইন সাহেব আমাকে এইরকম একটা ব্যাপারে কিছু করার উৎসাহ দিয়েছিলেন। কাজও শুরু হয়েছিল। আমি তখন বছর পঁচিশের তরতাজা যুবক। সদ্য একটা বড়ো কাজ শেষ করেছি। পরেরদিন ভোরে একটা স্বপ্ন দেখলাম। একটা বিশেষ কাজে অ্যাসিস্ট করার জন্য আইনস্টাইন সাহেব আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। দুপুরে বারান্দায় বসে একমনে ‘এক্সপ্ল্যানার অফ মডার্ন সায়েন্স’ পত্রিকায় আইনস্টাইন সাহেবের একটা আর্টিকেল পড়তে পড়তে ভোরের স্বপ্নটার কথাই ভাবছিলাম। এত বিজ্ঞান নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলেও কিছু কিছু অযৌক্তিক ব্যাপার পুরোপুরি উড়িয়ে দিই না। হয়তো তার পিছনে এমন যুক্তি আছে, আমরা যেটা জানি না। বহু জায়গায় তো শুনেছি ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। হঠাৎ পাশে থাকা টেলিফোনটা বেজে উঠল। একরকম বিরক্ত হয়েই কানের কাছে ধরলাম। উলটোদিকে ভদ্রলোক ইংরেজিতে কথা বলছেন। কিছুটা অপ্রস্তুত ছিলাম। একটু স্বাভাবিক হতেই বুঝলাম উনি জানতে চাইছেন আমি হিরুচরণ সেন কি না? আমি সম্মতি জানিয়ে ভদ্রলোকের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলাম।”

“আচ্ছা, ভদ্রলোক কারা হয় দাদু?” কথার মাঝে তিন্নি প্রশ্ন করে বসল।

দাদু এসব একদম পছন্দ করেন না। যা জানার সব শেষে। আজ তবে কিছু বললেন না তিন্নিকে। এড়িয়ে গেলেন পুরোটা।

“কিন্তু ভদ্রলোকের উত্তর শুনে শুধু অবাক নয়, আর একটু হলে চেয়ার থেকে মাটিতে পড়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল। অপর প্রান্ত থেকে উনি ইংরেজিতে বলছেন, ‘আমি আলবার্ট আইনস্টাইন। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি ব্যাপারে কথা বলতেই ফোন করলাম। সায়েন্টিস্টা পত্রিকায় আপনার আর্টিকেলটা পড়েই যোগাযোগ করছি। গতিবিদ্যায় এমন জ্ঞান খুবই কম দেখেছি। এইরকমই একজনকে আমি খুঁজছিলাম। আমি গতির জগতে নতুনত্ব আনতে চাই। আপনি কি আমাকে সঙ্গ দেবেন?’ কিন্তু ব্যাপারটা কী জানিস? এই কথাটা শোনার পর নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাহলে কি ভোরের স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে?”

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় দশটা বাজতে চলল। মা চিৎকার করে ডাকবে এইবার। নিতু ঘুমে ঢলে পড়েছে প্রিয়াংশুর কোলের উপর। সময় যত বাড়ছে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। আবার শুরু হল হিরুদাদুর গল্প।

“এমন সুবর্ণ সুযোগ! তাই দেরি না করে একবাক্যে সম্মতি জানিয়ে দিলাম। স্বপ্ন মনে হলেও ভাবলাম যতদূর এগোনো যায় এগিয়ে যাই। আইনস্টাইন সাহেব তখন প্রায় শেষ বয়সে। জানতে চাইলেন আমি কবে পৌঁছোতে পারব তাঁর ঠিকানায়। দিন পাঁচেকের মধ্যেই বিমানের টিকিট আর যাতায়াতের খরচ বাবদ কিছু অগ্রিম টাকাও পাঠিয়ে দিলেন। সাতদিন পর রওনা দিলাম পাশ্চাত্যের মায়া-ভূমিতে। পরেরদিন বিমান অবতরণের পর বুঝলাম, আর হয়তো স্বপ্নের মধ্যে নেই। আমার জন্য সে এলাহি ব্যবস্থা। ঘোড়ার গাড়িতে চেপে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছলাম সেই বিখ্যাত পরীক্ষাগারে, আজ বহু মানুষ বিদেশে যায় কেবল আইনস্টাইন সাহেবের ওই পরীক্ষাগার দেখতে। ছিপছিপে চেহারার মানুষ। মাথাভর্তি সাদা চুল, চওড়া গোঁফের উপর বার্ধক্যের চাপ উপচে পড়ছে। কথা কম বলেন। ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। সঙ্গে অগাধ জ্ঞান।

“কয়েকদিন বিশ্রামের পর শুরু হল কাজ। তাঁর তাৎক্ষণিক দৃষ্টিভঙ্গি, অসাধারণ সব চিন্তাভাবনা আমাকে প্রতিদিন তাক লাগিয়ে দিচ্ছিল। দিব্যি কাটছিল। তবে বাঙালি, তাই বিদেশি ভাষায় আড়ষ্টতাও একটু ছিল বৈকি। কাজ প্রায় মাঝামাঝি। তিন মাস আমি ওঁর বাড়িতে আছি। ১৯৫৪ পেরিয়ে ১৯৫৫-এর জানুয়ারি মাস শেষের পথে। বয়স বাড়ছে, শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না আইনস্টাইন সাহেবের। কাজও প্রায় শেষ। কিন্তু বাগড়া দিল নতুন তৈরি ইঞ্জিন। হাওয়ায় চালিত এই ইঞ্জিন বেশিক্ষণ বাতাস ধরে রাখতে পারে না। গাড়ি বেশি দূর এগোচ্ছে না। সমস্যার সমাধানে ১৯৫৫-এর সতেরোই এপ্রিল সরকারে তরফ থেকে বিশেষ সাহায্য দেওয়া হল আমাদেরকে।

“পরেরদিন সকালে তাঁর বাড়ির প্রধান পরিচারিকার ডাকে ঘুম ভাঙতেই ছুটে গেলাম দোতলার কোণের ঘরটাতে। আইনস্টাইন সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। দেখলাম নিথর দেহটি শায়িত রয়েছে প্রকাণ্ড একটা শ্বেত পাথরের মেঝেতে। ওঁর স্ত্রী এলসা একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। আমাকে তিনি গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার শেষ অনুরোধ জানিয়ে গেছেন কাল রাতে। সঙ্গে যাবতীয় খরচও দিয়ে গেছেন।

“গবেষণার যাবতীয় নথিপত্র নিয়ে খুব তাড়াতাড়িই দেশে ফিরে এলাম। জীবনে এইরকম একটা ঘটনার সাক্ষী থাকতে হবে ভাবতেও পারিনি। ওইরকম একজন মানুষের প্রয়াণ আমার বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর প্রায় বহুবছর এ-কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলাম। ইচ্ছে অনেক কিছু থাকলেও কিছুই করে উঠতে পারিনি। কিন্তু আমার শেষজীবনে তাঁর শেষ অনুরোধ রাখতে আবার শুরু করলাম আমার শেষ কাজ।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হিরুদাদু। বুঝলাম আজকের গল্পটা শেষ, গল্প কি না জানি না, তবে আগে কখনো হিরুদাদুর কাছে থেকে ফেরার পর এতটা কষ্ট লাগেনি। চোখের কোণটা জ্বালা করছিল।

স্কুল শুরু হল কয়েকদিন পর। হিরুদাদুর কাছে যাতায়াতও প্রায় বন্ধ হল। পরের বছর উচ্চমাধ্যমিক।


তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। জয়েন্ট এন্ট্রান্স ক্র্যাক করে আমি এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি কলকাতার একটা কলেজে। বাড়িমুখো হইনি বহুদিন। মায়ের মুখে শুনেছি দাদু নাকি এখনো সেই বাতাস চালিত গাড়ির গবেষণা চালাচ্ছে।

কলেজ থেকে হোস্টেলে ফিরতে প্রায়শই অনেক রাত হয়ে যায়। এটা সেটা কাজ করতে করতে ঘুম আসতে প্রায় দেড়টা দুটো বেজে যায়। সকালে ওঠা তাই অনভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নেহাত দরকার ছাড়া আর ভোরের আলো দেখাই হয় না।

কিন্তু আজ তো আমার কোথাও যাওয়ার নেই বা ভোরের ওঠার কোনো দরকার নেই। তাহলে এত সকালে ফোন করছে কে? কোনোভাবে ফোনটা কানে ধরে একরাশ রাগ উগরে দিলাম তিন্নির উপর। “কী হয়েছে রে? পাঁচ বছর পর ফোন করছিস, তাও এত সকালে কেন?”

“আজ খবরের কাগজ দেখিসনি?”

“ঠিক আছে পরে দেখে নেব। তুই এখন ফোনটা রাখ।”

তিন্নির কথার গুরুত্ব না দিয়ে ফোনটা কেটে দিলাম। ঘুম থেকে উঠতে প্রায় এগারোটা বেজে গেল আমার। প্রতিদিনের মতো খবরের কাগজটা খুঁজতে খুঁজতে আরও ঘণ্টা খানেক সময় গেল। কিন্তু হাতে পাওয়ার পর যা দেখলাম তাতেই একবারে ছিটকে গেলাম নিজের থেকে কয়েকশো হাত দূরে।

প্রথম পাতার হেডলাইনঃ বাঙালির হাত ধরে গতির জগতে আলোড়ন: ভারতের নোবেল তালিকায় নতুন সংযোজন হিরুচরণ সেন

খবরটা দেখে একেবারে হকচকিয়ে গেলাম। মনে হল সেদিন আইনস্টাইনের ফোন পেয়ে ঠিক যতটা অবাক হয়েছিলেন হিরুদাদু, আজ আমিও ততটাই চমকে গেছি। তবে কি বাতাস চালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার হল? গ্রাম থেকে ক্রমাগত ফোন আসতে থাকল। একই খবর একে একে প্রায় সবার মুখে শুনলাম। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন এল।

ঘুম ঘুম চোখে আড়মোড়া ভেঙে হাতড়াতে থাকলাম। এতক্ষণ কি তাহলে ঘুমোচ্ছিলাম? তাহলে দাদুর নোবেলপ্রাপ্তির খবরটা? ওটা কি তবে স্বপ্ন ছিল? ধুস, তাহলে ঘুমটা ভাঙল কেন? ভোরের স্বপ্ন। সত্যি হতে পারে। অতশত না বুঝে ফোনটা রিসিভ করতেই মা কাঁদো কাঁদো গলায় হাউমাউ করে উঠল। আমি জিজ্ঞাসা করতেই অস্পষ্ট স্বরে যা হোক করে বলল, “বাবু, তোর হিরুদাদু কাল রাতে ঘুমের মধ্যে মাইনর অ্যাটাকে মারা গেছেন।”

পাঁচ বছর আগের সেদিন রাতের মতো জ্বালা করে উঠল চোখের কোণদুটো। চুপ করে ছিলাম বেশ কিছুক্ষণ। কথা আসছিল না ভিতর থেকে। দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম হোস্টেল ইনচার্জকে জানিয়ে।

বাড়ি ফিরেই ছুটে গেলাম সেই এক্সপেরিমেন্টাল ইন্সট্রুমেন্টে ঠাসা উত্তরদিকের বড়ো ঘরটার দিকে। এদিক ওদিক হাতড়াতে হাতড়াতে চোখ আটকে গেল পাঁচটা চাকাওয়ালা অদ্ভুত আকৃতির একটা মডেল গাড়ির উপর। কাছে গিয়ে দেখলাম, গাড়ির পিছনে একটা নল বেরিয়ে আছে। আর পিছন দিকে আটকানো একটা কাঁপা সদৃশ শক্ত কাগজ। একরাশ কৌতূহল নিয়ে ফুঁ দিলাম নলটাতে। আমাকে অবাক করে দিয়ে তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে চলল গাড়িটা। তাহলে কি সত্যিই হিরুদাদু মারা যাওয়ার আগে আইনস্টাইনের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন? যেসব গল্প শোনাতেন, সবই সত্যি? হাজার প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে আমার ভিতরে। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। ভাবতেই অবাক লাগছে অত গুণী একজন মানুষকে আমি এত কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম!

ফিরে এসেছি তারপর হোস্টেলে। কাউকে কিছুই জানাইনি ও-ব্যাপারে। সেদিন চেয়েছিলাম একবার হলেও দাদুর নাম বিশ্বের দরবারে আলোচিত হোক। সেদিন রাত্রেই লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে চিঠি লিখে পাঠিয়েছি গাড়িটার বিস্তারিত বিবরণ সহ। কিছুদিন মধ্যেই উত্তর এল চিঠির। ভারতীয় সায়েন্স ফোরামের প্রতিনিধিদল সরকারের নির্দেশে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন ইতিমধ্যে। কাল সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার তাদের হাতে তুলে দেব আমি।

তারপর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। প্রচুর লেখালিখি চলছে এই নিয়েই। বহু বিদেশি ম্যাগাজিনে রোজ আর্টিকেল বেরোচ্ছে। আমার সঙ্গেও অনেকে যোগাযোগ করতে চাইছে।

বেশ কিছুদিন হল মনটা খুব ফুরফুরে লাগছে। দাদুর কাজ এত বড়ো একটা সম্মান পেল সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞান মহলে। দাদুর সঙ্গে কাটানো সময়গুলোর কথা খুব মনে পড়ছে আজ। সেসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি নিজেও। ঘুম ভাঙল তিন্নির ফোনে, আবার সেই ভোরবেলা। ভাবলাম স্বপ্ন নয়তো? ধরব কি ধরব না ফোনটা? দোনোমনা করে ফোনটা ধরতেই তিন্নির চিৎকার করে উঠল সেদিনের মতোই, “আজ খবরের কাগজ দেখেছিস?”

আর কিছু না শুনেই ধড়মড় করে উঠে ছুটে গেলাম খবরে কাগজের খোঁজ করতে। হাতে পেতেই হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। সেই একই হেডলাইন, তবে একটা নতুন শব্দের যোগ হয়েছেঃ ‘বাঙালির হাত ধরে গতির জগতে নতুন সংযোজন: মরণোত্তর নোবেলে স্বীকৃত বিজ্ঞানী হিরুচরণ সেন।'

তবে কি সত্যিই ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়? চোখে জলের ধারা যেন বাধা মানতে চাইছে না। কাগজখানা ভিজে যাচ্ছে, আমি কেঁদেই চলেছি।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল

No comments:

Post a Comment