বড়ো গল্পঃ লেপসোনা - অন্বেষা রায়


এক


দিঘিপুরের চৌধুরীবাড়িতে ছিল এক গরম-ঘর। আর সেই গরম-ঘরে থাকত লেপসোনা। দিঘিপুর আমাদের এই বাংলারই এক ভীষণ সুন্দর গ্রাম। গ্রামে কাঁচা মাটির রাস্তা, ধানের ক্ষেত, আমের বাগান, জামের জঙ্গল আর কাঁঠালের বন ছাড়াও ছিল অনেক অনেক দিঘি। প্রতিটি পথের ডানে, বাঁয়ে, পাড়ার সামনে, পেছনে থাকত টলটলে জলের বড়ো, ছোটো, মাঝারি দিঘি, পুকুর, ঝিল। গ্রামবাসীরা জল থেকে মাছ তুলত; বাচ্চা ছেলেরা সাঁতার কাটত, স্নান করত। খুব সুখের জীবন ছিল তাদের।

সেই দিঘিপুর গ্রামের জমিদার ছিলেন চৌধুরীরা। বীরবিক্রম চৌধুরী, অপার সাহস চৌধুরী,  ত্রিলোকজয়ী চৌধুরীーএঁদের নামে আশেপাশের সব ডাকাত-দস্যুরা থরথর কাঁপত। কারও সাহস হত না দিঘিপুর আক্রমণ করার। জমিদারদের যেমন সাহস, তেমন শক্তি। যেমন রাগ, তেমনই প্রজাদের প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু এই জমিদার বংশের একটা দুর্বলতা ছিল। জমিদারদের প্রত্যেকেই ছিলেন ভীষণ শীতকাতুরে। দুর্গাপুজো পার করে যেই না কার্তিক মাস গেল, গুটিগুটি পায়ে গ্রামে ঢুকল অঘ্রাণ মাস, জমিদারদের হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। পৌষ মাসে তাঁরা ঘরে দোর দিতেন আর মাঘে তো তাঁদের খাওয়াদাওয়াই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হত।

কিন্তু এভাবে কি চলে? তাই শীতের মোকাবিলা করতে জমিদারবাড়িতে তৈরি হল গরম-ঘর। গরম-ঘর ভর্তি শুধু নানারকমের গরম পোষাক আর শীতের সরঞ্জাম। উলের মোজা, পশমের জামা, কান ঢাকা টুপি, মোটা মাফলার, দস্তানা, বালাপোশ, কম্বল, লেপ, শালーআরও কত কী। শীতের আগমন হলেই ঠাণ্ডার তীব্রতা অনুযায়ী জমিদারেরা গরম-ঘর থেকে প্রয়োজনমতো পোশাক আনাতেন।

সেই গরম-ঘরে একবার এক নতুন অতিথি এল। লেপসোনা। দিঘিপুরের বর্তমান জমিদার সংগ্রামজিৎ চৌধুরীর তখন মোটে ছ’মাস বয়স। বংশের নিয়ম মেনে ওইটুকু শিশুও শীতে কাবু হল। তার আরামের জন্য বানানো হল একটা ছোট্ট, পুঁচকি, তুলতুলে নরম, পালক পালক ওমের হালকা নীল রঙের লেপ। লেপের গায়ে চড়ানো হল ঘিয়ে রঙ মলমলের পাতলা জামা। গরম-ঘর আলো করে জুড়ে বসল সেই বাচ্চা লেপ, লেপসোনা।

লেপসোনাকে গায়ে দিয়ে তো শিশু সংগ্রামজিৎ খুব আরাম পেল। তার কান্না বন্ধ হয়ে গেল। আর সেটা বুঝতে পেরেই বাড়ির বড়োরা লেপসোনার যত্নে মেতে উঠল। নিয়ম করে লেপসোনাকে রোদে দেওয়া হত, তার জামা কাচা হত, আবার ব্যবহার হয়ে গেলে ঠিকঠাক ভাঁজ করে তুলেও রাখা হত। লেপসোনা তো খুব খুশি। কুমারের গায়ে তাকে ঢেলে দিলেই সে কুমারকে জড়িয়ে ধরত। নিজের শরীরের উষ্ণতা ছড়িয়ে দিত। শিশু সংগ্রামজিৎও লেপসোনাকে দেখলেই তার গায়ে শুয়ে আদর জানাত।

এইভাবে সংগ্রামজিৎ আর লেপসোনার ভারি বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বছর ঘুরতে লাগল। মাঘ মাস পেরিয়ে ফাল্গুন আসতেই শীত কমতে শুরু করল একটু একটু করে। সব গরম পোশাকদের ঝেড়ে, মুছে, ধুয়ে পরিষ্কার করে পাঠানো হল গরম-ঘরে। কিন্তু সংগ্রামজিতের কাছ থেকে লেপসোনাকে সরানো গেল না কিছুতেই। লেপসোনা বিছানায় না থাকলে ছোট্ট কুমার ভ্যা জুড়ে দেন। লেপসোনারও কুমারকে জড়িয়ে না ধরলে ঘুম আসে না। বসন্তকাল চলে গিয়ে যখন গরমকাল এল, তপ্ত হাওয়ায় ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল চারপাশ, লেপসোনাকে খাটের একপাশে ভাঁজ করে রাখা হল। গরম-ঘরে পাঠানো হল না। ঘুমের সময় ছোটো কুমার তাকে ছুঁয়ে চোখ বোজেন। লেপসোনার স্পর্শ না পেলে তার ঘুম আসে না।


দুই


ছোট্ট কুমারের বিছানায় কিন্তু লেপসোনা ছাড়াও আরও কয়েকজন সদস্য ছিল যারা লেপসোনাকে মোটে পছন্দ করত না। লেপসোনার এত আদর যত্ন দেখে, কুমারের সঙ্গে লেপসোনার এই ভাব-ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করে তাদের খুব হিংসে হত। দিনরাত তারা ভাবত কীভাবে লেপসোনাকে তাড়ানো যায়। এই হিংসুটেরা হল ছোটো কুমারের দুই যমজ কোল বালিশ পালু-পিলু আর মাথার বালিশ গোমেশ। গোমেশ এমনিতেই অহংকারী। কথায় কথায় সে শুধু সকলকে বলত, ‘যা যা, আমার সঙ্গে কথা বলতে আসিস নে, শরীর তো সবক’টার ভুসভুসে তুলোর তৈরি। জলে পড়লে চুপসে গিয়ে যা বিচ্ছিরি দেখতে হয়ে যাস, যে তাকালে চোখে ব্যথা করে।’

গোমেশের কথা শুনে পালু-পিলু মুখ ভ্যাঙাত। আসলে হয়েছে কী, গোমেশকে বানানো হয়েছিল সর্ষের দানা দিয়ে। জমিদারবাড়ির বুড়ি আইমা বলেছিলেন, ‘তুলোর নয়, সর্ষে দানার বালিশে শোয়ালে বাচ্চার মাথা গোল হবে৷’ ব্যস! যেই শোনা অমনি ফরমায়েশ গেল তোশক বালিশের দোকানে, সর্ষে দানার বালিশ চাই। জমিদারবাড়ির কাজ বলে কথা, দশ-দশজন কারিগর লেগে গেল ছোটো কুমারের জন্য সর্ষের বালিশ বানাতে। তিনজন গেল সর্ষে ক্ষেত থেকে বেছে বেছে দানা আনতে। তিনজন গেল তাঁতির বাড়ি থেকে বালিশের খোলের জন্য শক্ত কাপড়, জামার জন্য নরম কাপড় আর ঢাকার জন্য তুলতুলে কাপড় আনতে। বাকিরা বসল সুতো বানাতে। এইভাবে বিরাট আয়োজন করে বানানো হল গোমেশকে। আর বানানো হতেই সে যখন দেখল তাকে তৈরি করার জন্য এত তোড়জোড় তখন তার আর অহংকারের সীমা রইল না৷ তোশক দোকানের বৃদ্ধ কারিগর বাক্সে করে গোমেশকে পাঠাবার আগে গোমেশের গায়ের কাছে মুখ নিয়ে বললেনー

গোমেশ বালিশ, গোমেশ বালিশ

সর্ষে দানার কোল,

খেয়াল রেখো শিশু কুমারের

মাথা যেন হয় গোল।

বারবার তিনবার এই মন্ত্র পড়ে তবে গোমেশকে জমিদারবাড়িতে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পাঠালে কী হবে, গোমেশের মাথায় মন্ত্র ঢোকার জায়গা থাকলে তবে না! মাথা তো অহংকারে ঠাসা।

ওদিকে পালু-পিলু এসেছিল ছোটো কুমারের মামাবাড়ি থেকে৷ নীল রঙের বাহারি জামা পরা, একইরকম দেখতে দুই কোল বালিশ৷ তাদের দায়িত্ব ছিল ছোটো কুমারকে ঘুমের সময় সামলে রাখা৷ পাশ ফিরতে গিয়ে কুমার খাটের কিনারে চলে গেলেন কি না, দেওয়ালের দিকে বেশি ঘেঁষে গেলেন কি না এইসব দেখেশুনে রাখা। তারা তাদের কাজ নিয়ে খুবই ব্যস্ত হয়ে থাকত। সারাক্ষণ ছোটো কুমারকে ঘিরে রইত পালু-পিলু।

কিন্তু লেপসোনা? লেপসোনার কথা আলাদা। লেপসোনা আসার আগে ছোটো কুমারের জন্য কোনও গরম বিছানা ছিল না তা তো নয়, ছিল এক পেল্লাই কম্বল৷ ইয়া মোটা, ইয়া চওড়া। নাম তার কটোম্বো। শীতের প্রথম রাতে ছোটো কুমার ঘুমালে যেই না কটোম্বোকে তার গায়ে দেওয়া হল, অমনি কুমার ভ্যা করে কাঁদতে শুরু করলেন। কটোম্বোকে সরালে ঠাণ্ডায় কাঁদেন, আর গায়ে দিয়ে কুটকুট করে বলে কাঁদেন। সে কান্না আর থামে না। রাত কেটে সকাল হল, সারা জমিদারবাড়ি এক হল, ছোটো কুমারের আর কান্না থামে না।

সেই সময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল এক ধুনুরি। হৈ হৈ শুনে সে উঁকি দিল জমিদারবাড়িতে। সব ঘটনা শুনে আর কটোম্বোকে দেখে সে ছোটো কুমারের বাবার সামনে হাতজোড় করে বলল, ”জমিদারমশাই, আমার মনে হয় ওই মোটা কম্বলে ছোটো কুমারের কষ্ট হচ্ছে। যদি অনুমতি করেন তাহলে এই রমেশ ধুনুরি এক্ষুনি কুমারের জন্য একটি আরামদায়ক লেপ বানিয়ে দিতে পারে।”

বীরবিক্রম চৌধুরী আর কী করেন, দিলেন অনুমতি। ব্যস! কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জমিদার বাড়ির উঠোনে বসে রমেশ ধুনুরি তৈরি করে ফেলল লেপসোনাকে। ছোটো কুমার সংগ্রামজিৎ তখনও কেঁদে চলেছে। লেপসোনাকে সংগ্রামজিতের গায়ে মুড়ে দেওয়ার আগে রমেশ ধুনুরি ফিসফিস করে বললー

লেপসোনা, চুনি মানিক, লক্ষ্মী লেপছানা

ছোটো কুমারকে ভালোবেসে করবে দেখাশোনা।

আকাশ ভাঙুক, জমিন উঠুক, ঘটুক যাই কিছু

ভুলেও যেন ছোটো কুমারের ছেড়ো না তুমি পিছু।

এই বলে যেই লেপসোনাকে কুমারের গায়ে ঢেলে দেওয়া হল, অমনি থেমে গেল কুমারের কান্না। রমেশকে অনেক টাকা পুরস্কার দিয়ে বিদায় করলেন বীরবিক্রম চৌধুরী। তারপর থেকে কুমারের বিছানায় পাকাপাকিভাবে জায়গা হয়ে গেল লেপসোনার। গোমেশ তাকে ধাক্কা দিল, পালু-পিলু তাকে জব্দ করার জন্য দু’দিক থেকে চেপে ধরল, কিন্তু লেপসোনা ছোটো কুমারকে জড়িয়েই রইল।

ছোটো কুমার শোয়া থেকে বসা শিখলেন, বসা থেকে ধীরে ধীরে শিখলেন হাঁটা। তারপর কথা বলা, গান গাওয়া। বছর কাটতে লাগল। লেপসোনা সারাবছর বিছানার কোণে ভাঁজ হয়ে থাকে আর শীতকাল এলে ছোটো কুমারের গায়ে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিছানায় থাকা মানে কি আর এমনি বসে থাকা? মোটেই না। ওই যে গোমেশ বালিশ আর পালু-পিলু কোল বালিশ, তারা দিনরাত বিরক্ত করত লেপসোনাকে। কখনও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে নিচে, কখনও ঠেসে দিচ্ছে দেওয়ালে, কখনও সকলে মিলে চেপে বসছে তার ঘাড়ে। কিন্তু লেপসোনা হাসিমুখে মেনে নিত সব। তার মাথায় একটাই কথা, কুমারের দেখাশোনা করতে হবে।

একদিন হয়েছে কী, দুপুরবেলা খাটে বসে ছোটো কুমার খেলছেন। লেপসোনা বসে আছে এককোণে। পালু, পিলু আর গোমেশ গুজগুজ করে ফন্দি আঁটছে কোনও। হঠাৎ খেলতে খেলতে বেখেয়ালে পেছন দিকে পড়ে গেলেন কুমার। পাথরের মেঝেতে মাথা ঠুকে গেলেই ব্যথা লাগবে। পালু-পিলুর আটকানোর কথা কুমারকে, কিন্তু তারা তো ব্যস্ত গোমেশের সঙ্গে গল্পে। গোমেশেরও চোখ নেই কুমারের দিকে। কিন্তু তাহলে কী, লেপসোনা তো আছে। কুমার মাটিতে পড়ার আগেই লেপসোনা লাফিয়ে পড়েছে মেঝেতে। কুমারের মা, পরিচারিকারা ছুটে এসে কুমারকে ধরার আগেই লেপসোনা লুফে নিয়েছে সংগ্রামজিতকে৷

এই ঘটনার পর লেপসোনার আদর যেন আরও বেড়ে গেল। কিন্তু লেপসোনা জানত না অদূর ভবিষ্যতে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে ঘোর খারাপ দিন।


তিন


গোমেশকে যদিও মন্ত্র দেওয়া হয়েছিল কুমারের মাথা গোল করার, কিন্তু নিজের অহংকারের জেরে সেই মন্ত্র অল্পদিনেই ভুলে গিয়েছিল গোমেশ। তার মনে কেবল একটাই কথা, আমার মতন কেউ নয়, আমিই সেরা। আমিই সবার থেকে ভালো। সবার থেকে আলাদা। গোমেশ সারাদিন এই ভাবে আর তার ভাবনা ধীরে ধীরে ছোটো কুমারের মাথার মধ্যে ঢুকে যেতে থাকে। গোমেশের ভাবনা একটা ছোট্ট পোকা হয়ে ছোটো কুমারের মাথার কোটরে গিয়ে বাসা বাঁধল।

এদিকে কুমার বড়ো হতে লাগলেন। তাঁর বিছানা থেকে একে একে গোমেশ, পালু-পিলু সবাই বিদায় নিল। শুধু পড়ে রইল লেপসোনা। লেপসোনা ভাঁজ করা অবস্থায় রাখা থাকত খাটের এককোণে।

এদিকে সংগ্রামজিৎ লেখাপড়া শিখতে পণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ি যান। কুস্তি শিখতে ভীমা পালোয়ানের আখড়ায় যান, সাঁতার অভ্যেস করেন জমিদারের নিজস্ব পদ্মদিঘির জলে আর লাঠি চালানো শেখেন লেঠেল রব্জু শেখের কাছে। লেপসোনা সারাদিন অপেক্ষা করে কুমারের জন্য। সে তো আর মানুষ নয় যে হেঁটে চলে কুমারের পিছু পিছু সব জায়গায় যাবে। ঘরের বাইরে বেরোতেই তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। সেই যে রমেশ ধুনুরি কবে তাকে বলেছিল, ‘লেপসোনা, চুনি মানিক, লক্ষ্মী লেপছানা, ছোটো কুমারকে ভালোবেসে করবে দেখাশোনা। আকাশ ভাঙুক, জমিন উঠুক, ঘটুক যাই কিছু, ভুলেও যেন ছোটো কুমারের ছেড়ো না তুমি পিছু।’ সেই থেকে ভেবে আছে লেপসোনা কক্ষনও কুমারের পিছু ছাড়বে না।

কিন্তু শুধু ভাবলেই কি হয়? কুমার যেদিন প্রথম স্কুলে গেলেন, সেদিন তো লেপসোনা ঠিকই করে ফেলেছিল সেও যাবে কুমারের পিছু পিছু। গড়িয়ে গড়িয়ে নেমেছিল খাট থেকে। তারপর ঘষটে ঘষটে দরজা অবধি গেছে কি যায়নি, একজন পরিচারিকা এসে একটানে তুলে আচ্ছা করে ঝেড়ে সোজা বিছানায় তুলে দিল। লেপসোনা তাও হার মানেনি, আবার লাফিয়েছে। আর লাফানো মাত্র সেই একই লোক এসে তাকে তুলে দিয়েছে আবার। উপরন্তু গজগজ করতে করতে বলেছে, “এই ছোট্ট লেপটা তো বারবার পড়ে যাচ্ছে! নাহ্‌, এটাকে এবার গরম-ঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে৷”

ভয় পেয়ে গেছে লেপসোনা। সে যদি গরম-ঘরে চলে যায় তাহলে কুমারকে দেখে রাখবে কে? লেপসোনা তো আর জানত না কুমারের কী ক্ষতি গোমেশ করে গেছে। সংগ্রামজিৎ যত বড়ো হন, তাঁর মাথার ভেতর অহংকারের পোকাও তত বেড়ে ওঠে। সংগ্রামজিৎ বুদ্ধিমান, লেখাপড়ায় ভালো। সাঁতার, লাঠি চালানো, কুস্তি সবেতেই পারদর্শী। আর এইসব নিয়ে তাঁর গর্বের অন্ত নেই। যতদিন যেতে লাগল, সংগ্রামজিৎ ততই রূঢ় আর দুর্বিনীত হয়ে উঠতে লাগলেন। কারও সঙ্গে ভালো করে কথা বলেন না, অল্প ভুলেই কঠিন শাস্তি দিয়ে দেন আর যখন যেমন ইচ্ছে তেমন কাজ করে বেড়ান।

ছেলের এমন হাবভাব দেখে তো মা-বাবা চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমন মানুষ কি পারবে ভবিষ্যতে প্রজাদের খেয়াল রাখতে? যে দিঘিপুরের এত সুনাম এত বছর ধরে, তা কি ধরে রাখতে পারবে এই ছেলে?

দেখতে দেখতে সংগ্রামজিতের বয়স কুড়ি বছর হয়ে গেল। বিক্রমজিতের পর তিনি হলেন দিঘিপুরের জমিদার৷ আর জমিদার হয়েই তিনি বললেন, “এই দিঘিপুরকে নতুন করে সাজাব আমি। গ্রাম হয়ে যাবে শহর৷ ঢেলে সাজানো হবে জমিদারবাড়ি।”

ব্যস! হুকুম করতে যা দেরি, হৈ হৈ করে কাজে লেগে গেল শয়ে শয়ে মিস্ত্রি-মজুর। কেউ রাস্তা ভেঙে পাকা করে, কেউ দিঘি বুজিয়ে বাড়ি তোলে, আবার কেউ বন জঙ্গল কেটে বড়ো বড়ো স্থাপত্য বানাতে চায়।

জমিদার বাড়িতেও হুলুস্থুল পড়ে গেল। সমস্ত পুরনো আসবাবপত্র সরিয়ে আনানো হল নতুন কায়দার খাট, আলমারি, সোফা। আর সেইসব খাটের মানানসই বালিশ-বিছানা। দিনের শেষে লেপসোনাকেও পাঠিয়ে দেওয়া হল পরিত্যক্ত গরম-ঘরের অন্ধকারে।


চার


গরম-ঘরের দরজা বন্ধ হতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ। লেপসোনা ভয়ে কুঁকড়ে গেল একটু। আর তখনই খ্যাঁক খ্যাঁক করে বিচ্ছিরি একটা হাসি শুনে চমকে গেল ও। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। কাঁপা কাঁপা গলায় সে জিজ্ঞেস করল, “কে তুমি?”

হাসিটা থামল। তারপর খরখরে গলায় বলল, “চিনতে পারছ না?  আমি সেই কটোম্ব কম্বল যে তোমার কারণে নির্বাসিত হয়েছিল।”

কটোম্ব কম্বলের কথা শেষ হওয়ার আগেই পিঠে খোঁচা খেল লেপসোনা৷ সে ফিরে তাকাল। এতক্ষণে অন্ধকারে চোখ সয়েছে একটু। ঝাপসাভাবে সে দেখতে পেল তার দু’দিকে দাঁড়িয়ে আছে পালু আর পিলু। এতদিন গরম-ঘরে বন্দী থাকার কারণে তাদের গায়ের জামা মলিন ও ধুলোময় হয়ে গেছে। লেপসোনাকে দেখে ওরাও হাসতে লাগল। পালু বলল, “বেশ হয়েছে। সারাদিন খালি কুমারের গায়ে গায়ে লেগে থাকা৷ বিছানার কোণে সেজেগুজে বসে থাকা আর আমাদের হেয় করা। বেশ হয়েছে৷”

লেপসোনার ভয় এতক্ষণে একটু কমেছে। সে পালু-পিলুর থেকে একটু সরে এসে উদাস গলায় বলল, “দেখো, ছোটো কুমারের জন্য আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন বিরাট বিপদ অপেক্ষা করে আছে কুমারের জন্য। এই অহংকারের পোকা কীভাবে ঢুকল ওঁর মাথার মধ্যে?”

পালু-পিলু উত্তর না দিয়ে এগিয়ে এসে জোর এক ধাক্কা দিল লেপসোনার পিঠে। লেপসোনা উপুড় হয়ে পড়ে গেল আর হো হো করে হেসে উঠল সবাই। লেপসোনা ঘাবড়াল না। সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল, “বন্ধুরা, এখন এসব ছেড়ে নিজেদের কথা ভাবো৷ জমিদার সংগ্রামজিৎ দিঘিপুর ঢেলে সাজানোর নামে কী চরম ক্ষতি করছেন তোমরা ভাবতে পারছ?  সব গাছ কেটে ফেলছেন, সব দিঘি বুজিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি কারও কথাই শুনছেন না। আমাদেরও বন্দী করে দিয়েছেন এখানে। এসো, আমরা সবাই মিলে একটা উপায় বার করি।”

“কেন, তোমার কথাও শুনছেন না বুঝি?” খ্যানখ্যানে সুরে বলতে বলতে সামনে এল ধুলোময়লা মাখা গোমেশ। লেপসোনাকে দেখে মাথা গরম হয়ে গেছে তার৷ রাগে গরগর করতে করতে সে চিৎকার করে উঠল, “কেন এসেছ তুমি এখানে? যাও, চলে যাও!” বলে এমন গা ঝাড়া দিল যে গোমেশের গায়ের সমস্ত ধুলো উড়ে গিয়ে লাগল লেপসোনার গায়ে। যত্নে থাকা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন লেপসোনা চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে হয়ে গেল ধুলোময়লা মাখা কালচে ভূত।

লেপসোনাকে জব্দ করে গোমেশ তো চলে গেল। কিন্তু পরেরদিন সকালে এল আসল বিপদ। গরম-ঘর খালি করতে এল জমিদারের লোকজন। সঙ্গে দশজন ধুনুরি। প্রথমেই তারা টেনে টেনে বার করল সবাইকে। তারপর লাঠি, তুলো, সাটিনের কাপড় নিয়ে কাজে লেগে গেল। কী কাজ? সব পুরনো বালিশ, বিছানা, তোশক, লেপ ফাটিয়ে নতুন করে বানানো৷ চোখের নিমেষে কাজ শুরু হয়ে গেল। ফটাফট শব্দে কান পাতা দায়। ফড়ফড় করে কাপড় কাটছে কাঁচি, ফুস ফুস করে উড়ে যাচ্ছে তুলো আর পটপট করে সেলাই হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কাপড়। এইভাবে দেখতে দেখতে দিনের শেষে তৈরি হয়ে গেল সাটিনে মোড়া ফুলো ফুলো লেপ, নরম বড়ো বড়ো বালিশ, মোটা মোটা তোশক ইত্যাদি আরও কত কী। অনেকক্ষণ  কাজ করার পর প্রধান ধুনুরির নজর পড়ল পালু, পিলু, গোমেশ আর লেপসোনার ওপর। সে আগেই টেনে নিল গোমেশকে। গোমেশের তো আনন্দ আর গর্বের শেষ রইল না। ফিসফিস করে বাকিদের বলল, “দেখেছিস, যারা বালিশের কারবারি তারা জানে আসল বালিশ কে। তোদের তো পাত্তাও দিল না।”

ধুনুরি ভুরু কুঁচকে গোমেশকে নেড়েচেড়ে দেখে সকারীদের বলল, “এটাকে ফেলে দে। সর্ষের বালিশ কী কাজে লাগবে আর।”

তারা ছুড়ে দিল ময়লা ফেলার বস্তায়। এরপর সে দু’হাতে টেনে আনল পালু-পিলুকে। গোমেশের অবস্থা দেখে পালু-পিলুর তো ভয়ে মুখ সাদা৷ লোকটা ভালো করে তাদের দেখে আদেশ করল, “এ দুটো দিয়ে দুটো তাকিয়া বানিয়ে দে।”

বলতে যা দেরি। সহকারীরা মুহূর্তে পালু-পিলুর খোল পালটে, আরও তুলো ঠেসে ঝটপট সেলাই করতে লাগল। ইতিমধ্যে লোকটা দেখে ফেলেছে লেপসোনাকে। লেপসোনার সারা গায়ে গোমেশের মাখানো ময়লা আর ধুলো। লোকটা একহাতে নিজের নাক চেপে আর অন্য হাতে দুই নখ দিয়ে লেপসোনাকে তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে নাকি সুরে বলল, “ইঁশ কীঁ নোংরা লেঁপ রেঁ বাঁবা। মাঁপটাঁও ছোঁটো। কোঁনও কাঁজেই লাঁগবেঁনা। দূঁর কঁর এঁটাকেঁঁ।” বলে ছুড়ে ফেলে দিল।

লেপসোনা বাতাসে ভাসতে ভাসতে, হাকুপাকু করতে করতে গিয়ে পড়ল বাগানের এক কোণে। সেখানে ঝাড়ুদার রামকানাই সমস্ত ময়লা জড়ো করেছে৷ শুকনো পাতা, গাছের ভাঙা ডাল ইত্যাদি। লেপসোনা সেই ময়লার স্তূপে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। মনখারাপ৷ এ তো ছোটো কুমারের থেকে আরও দূরে চলে এল সে। এখন কী করবে? কীভাবে তাড়াবে কুমারের মাথার পোকা?

জমিদার বাড়িতে কাজ করত এক বুড়ি মেথরানী৷ দিনের শেষে বাড়ি ফেরার সময় তার চোখে পড়ল লেপসোনাকে৷ বুড়ির বাড়িতে বুড়ির নাতি আছে। গরিব বলে তার গায়ে দেওয়ার মতন কোনও লেপ নেই৷ তাই বুড়ি ধুলো ঝেড়ে লেপসোনাকে সঙ্গে নিয়ে নিল।


পাঁচ


বুড়ির বাড়িতে এসে লেপসোনা আশ্রয় আর ভালোবাসা পেল ঠিকই, কিন্তু তার মাথা থেকে চিন্তা দূর হল না। কীভাবে কুমারের মাথা থেকে অহংকারের পোকা তাড়ানো যায়, এই দুশ্চিন্তায় লেপসোনা গুম হয়ে থাকে৷ বুড়ির নাতিকে জড়িয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে তার কান্না পায়। কেবল মনে হয়, কীভাবে কুমারের মাথার পোকাটাকে মারবে সে। কী করে কুমারের কাছে যাবে সে? তার পা নেই, হাত নেই, খাট থেকে গড়িয়ে ঘরের বাইরে যাওয়াই এক বিরাট সমস্যা, আর জমিদার বাড়ি তো অনেক দূরের পথ।

বুড়ির বাড়ি গ্রামের একপ্রান্তে। ছোট্ট কুঁড়েঘরে মেয়ে আর নাতির সঙ্গে বাস করে বুড়ি৷ কুঁড়েঘরের একদিকে টলটলে পুকুর আর অন্যদিকে সবজির ছোটো বাগান। সবজি বাগানের গা থেকেই শুরু হয়েছে বন। আম, জাম, তেঁতুল, শিমুল, হিজল নানারকমের গাছ দিয়ে তৈরি এই বন কাঠবেড়ালিদের রাজ্য৷ হাজার হাজার কাঠবেড়ালি থাকে সেখানে। বুড়ির ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকতে থাকতে, কুমারের কথা ভাবতে ভাবতে লেপসোনার এই কাঠবেড়ালিদের সঙ্গে আলাপ হল।

লেপসোনা তাদের নিজের দুঃখের কথা বলল বটে, কিন্তু তারা ছোটো কুমারকে চিনতেই পারল না৷ লেপসোনা কত বর্ণনা দিল, কত গল্প বলল, কেউ কিছু মনে করতে পারল না। কেবল একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ করে রইল। শেষে এক পণ্ডিত কাঠবেড়ালি এগিয়ে এসে বলল, “দেখো, আমাদের সমাজে ওসব জমিদার বলে কেউ নেই৷ ওসব মানুষদের কারবার৷ আমরা তো কেবল খাই, দাই, খেলা করি আর ঘুমাই। তুমি যাবে আমাদের রাজ্যে? দারুণ সুন্দর এই বন। এখানে হাজার হাজার পাখি, অগুনতি ফুল আর নানারঙের প্রজাপতির বাস। চলো আমাদের সঙ্গে।”

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লেপসোনা গুম হয়ে গেল৷ উদাস মুখে বলল, “যেতে তো ইচ্ছে করে। কিন্তু যাব কেমন করে? আমি যে ঘরের ভেতরে বন্দী। আবার হাঁটতেও পারি না।”

কাঠবেড়ালির দল হতাশ হয়ে ফিরে গেল। লেপসোনাকে খুব পছন্দ হয়েছে তাদের। তারা তাই রোজ আসে বুড়ির বাড়ি৷ গল্প করে লেপসোনার সঙ্গে।


এইভাবে দিন কাটে। চিন্তায় চিন্তায় শুকিয়ে যেতে থাকে লেপসোনা। উপায় জানা নেই কুমারকে শোধরাবার। এদিকে রোজ বুড়ি জমিদারবাড়ি থেকে ফিরে এসে নানারকম খবর দেয়। আজ অমুক জঙ্গল কেটে ফেলা হল। সেইখানে নাকি আগামীদিনে এক বিরাট বাড়ি বানানো হবে। কাল তমুক পুকুর বুজিয়ে ফেলা হল। কেটে ফেলা বনের পাখিদের ধরে ধরে খাঁচায় পোরা হয়েছে৷ কিছু পশু মেরে ফেলা হয়েছে, আর কিছু পশুকে খাঁচায় করে চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। লেপসোনার কান্না পায়৷ এই কুমার সংগ্রামজিৎকেই কিনা এত ভালোবাসত সে! সবসময় জড়িয়ে থাকত, আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিত, শীত লাগলে উষ্ণতায় ঘিরে রাখত, মনে মনে ভাবত সারাজীবন একসঙ্গে থাকবে! সেই কুমার কিনা গোমেশের মতন অহংকারী আর দুর্বিনীত হলেন!

লেপসোনা আর কান্না আটকাতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে তার গা ভিজে গেল। ভিজতে ভিজতে গা সপসপে হয়ে গেল, লেপসোনার কান্না তবুও থামল না৷ এদিকে বুড়ির মেয়ে লেপ নিতে এসে দেখে লেপ ভেজা। সে তখন লেপসোনাকে নিয়ে বাইরে রোদের মধ্যে মেলে দিল।


ছয়


লেপসোনাকে বাড়ির বাইরে আসতে দেখেই কাঠবেড়ালিদের মধ্যে শোরগোল পড়ে গেল। বুড়ির মেয়ে ঘরে ঢোকামাত্র তুরতুর করে ছুটে এল তারা। তারপর সকলে মিলে ছোটো ছোটো হাতে লেপসোনাকে ধরে বয়ে নিয়ে চলল বনের দিকে। কাঠবেড়ালির পুচকি পুচকি হাতের স্পর্শে কাতুকুতু লাগে লেপসোনার আর সে খিলখিল করে হেসে ওঠে। কাঠবেড়ালিরাও মজা পায়।

এইভাবে কাঠবেড়ালিদের কোলে চেপে বনে এল লেপসোনা। বনজঙ্গল তো আগে কখনও দেখেনি সে, জমিদারবাড়িতেই থেকেছে চিরকাল। তাই মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখতে লাগল। রঙবেরঙের ফুল, প্রজাপতি, পাখি, কুলকুল করে বয়ে যাওয়া জলধারা, নরম ঘাসের গালিচা। লেপসোনা চোখ ভরে দেখতে লাগল সব। আহা, প্রকৃতির তৈরি এমনসব জিনিসই বুঝি নষ্ট করে দিচ্ছেন ছোটো কুমার!

বিকেলে যখন কাঠবিড়ালিরা বুড়ির ঘরে ফেরত দিয়ে গেল তাকে, তখন লেপসোনার মনে একদিকে যেমন খুশি, অন্যদিকে তেমনি চিন্তা রয়ে গেল। কীভাবে আটকাবে ছোটো কুমারকে?

সারাদিন কড়া রোদে থেকেও যখন লেপসোনার শুকোনোর নাম নেই, তখন বুড়ি আর বুড়ির মেয়ে বেশ চিন্তায় পড়ল। বুড়ি বলল, “আমি এক ওস্তাদ ধুনুরিকে চিনি। কালই তার কাছে এই বাচ্চা লেপটাকে নিয়ে যাব।”

পরদিন সকাল সকাল লেপসোনাকে থলেতে পুরে বুড়ি গেল সেই ওস্তাদ ধুনুরির কাছে লেপসোনার চিকিৎসা করাতে। ধুনুরির বয়স হয়েছে। চোখে ভালো দেখতে পায় না। কানেও ভালো শুনতে পায় না৷ বুড়ি অনেক জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে লেপসোনার সমস্যার কথা বলল। বুড়ো ধুনুরি ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, “আহা গো! বাচ্চা লেপটার মনখারাপ মনে হয়। দাও দেখি হাতে, কী বলছে শুনি।”

হাতে নিতেই চমকে উঠেছে সে৷ চমকেছে লেপসোনাও। এই ছোঁয়া যে তার চেনা। এইভাবে কোলে নিয়েছিল কে যেন, অনেক-অনেকদিন আগে? লেপসোনা জড়িয়ে ধরে ধুনুরিকে আর রমেশ ধুনুরিও এতদিন পর লেপসোনাকে পেয়ে তাকে চেপে ধরে বুকে। এইভাবে জড়িয়ে থাকতে থাকতে লেপসোনার মনের সবকথা জেনে গেল রমেশ ধুনুরি। আস্তে আস্তে মুখ তুলে সে চাইল বুড়ির দিকে। ধীরে ধীরে বলল, “তুমি কাল এসে একে নিয়ে যেও। আজ সারারাত ধরে আমি ওকে সুস্থ করে তুলব।”

বুড়ি চলে যেতেই রমেশ ধুনুরি কাজে লেগে গেল। তার বয়স হয়েছে অনেক। কাজ করতে গেলে হাত কাঁপে, তবুও বহুকষ্টে সে কাঁচি ধরল। লেপসোনার জন্য বড়ো খোল বানাল, আরও অনেক অনেক তুলো পুরে ভালো করে সেলাই করল। তারপর লেপসোনাকে বুকে জড়িয়ে বললー

“লেপসোনা, লেপসোনা সোনামানিক ধন

অহং পোকা শেষ করবে, এই করেছে পণ।

ছোটো কুমার গর্বে অন্ধ, বিচার নেইকো কিছু

যতক্ষণ না সেরে উঠছেন, ছেড়ো না তার পিছু।

ছোটো কাঁটা, বড়ো কাঁটা, টিক-টিক-টিক ঘড়ি

গোটা একদিন কুমার রাজার মাথা দিও মুড়ি৷

কানের কাছে ফুস-ফুস-ফুস, জাদুমন্ত্রের ধ্বনি

আলুম চিলুম, ডজ্ঞা দিলুম, দুষ্টু পোকা হানি।”

অর্থাৎ কিনা ছোটো কুমারের মাথা থেকে অহংকারের পোকাকে সরাতে হলে লেপসোনাকে গোটা একটা দিন কুমারকে জড়িয়ে থাকতে হবে, আর ওই মন্ত্র জপ করে যেতে হবে৷ লেপসোনা এখন আকারে আগের থেকে বড়ো হয়েছে। গায়ে চকচকে নতুন জামা থাকার কারণে তাকে দেখাচ্ছে চমৎকার। কুমারকে আপাদমস্তক মুড়ে ফেলা এখন তার কাছে কোনও সমস্যাই নয়। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়৷ কুমারের কাছে লেপসোনা পৌঁছবে কী করে? কিন্তু শুধু লেপসোনা নয়, কুমারকে নিয়ে চিন্তিত ছিল দিঘিপুরের সকল মানুষই। কারণ, কুমার সংগ্রামজিৎ যা করছিলেন তাতে কারোরই ভালো হওয়ার নয়।


সাত


পরেরদিন সকালবেলা বুড়ি এলে রমেশ ধুনুরি বলল, “বুড়িমা, একে তুমি ছোটো কুমারের কাছে পৌঁছে দাও৷ আর খেয়াল রেখো যেন গোটা একদিন ও ছোটো কুমারের সঙ্গে থাকে৷ তাহলেই ও সেরে যাবে।”

বুড়ি লেপসোনাকে কাঁধে ফেলে জমিদারবাড়ির দিকে হাঁটা লাগাল। হাঁটতে হাঁটতে বুড়ি দেখল, অনেকগুলো গাড়ি বোঝাই করে প্রচুর লোকলশকর বুড়ির বাড়ির দিকে চলেছে৷ বুড়ি অবাক হল। একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করাতে সে জানাল, গ্রামের শেষপ্রান্তে যে বিরাট বন আছে সেটা আজ কেটে ফেলা হবে। পুরো জঙ্গল সাফ করে সেখানে উঠবে আকাশ সমান উঁচু এক বাড়ি। কথা শুনে তো লেপসোনার ভিরমি খাওয়ার যোগাড়৷ এ তো বুড়ির বাড়ির পাশেই সেই কাঠবেড়ালির বন! সেই বন কেটে কিনা বাড়ি বানাবেন ছোটো কুমার? লেপসোনার কোনা ভিজে যায়। সে মনে মনে পণ করে, যেভাবেই হোক এই অনর্থ হওয়ার আগে আটকাতেই হবে সংগ্রামজিৎকে। কাঠবেড়ালিদের বিপদ রুখতেই হবে।

লোকটা আবার বলে, “বুড়িমা, বছর ঘোরার আগেই দেখবে দিঘিপুর গ্রাম থেকে নগর হয়ে গেছে৷”

লোকটার কথা শেষ হওয়ার আগেই একরাশ ধুলো উড়িয়ে জমিদার সংগ্রামজিতের মোটর গাড়ি ভুউউউস করে বেরিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। সেইদিকে তাকিয়ে লোকটা উত্তেজিত স্বরে বলল, “ওই দেখো ছোটো কুমার যাচ্ছেন। যেদিন যেখানে গাছ কাটার কাজ শুরু হয়, সেদিন সেখানে উপস্থিত থাকেন স্বয়ং জমিদার সংগ্রামজিৎ। ওঁর কড়া নজরের সামনে কাজ শুরু হয়।”

ছোটো কুমারের গাড়ির পেছন পেছন গেল বিরাট ধুলোর মেঘ আর অনেক লোকজন। বুড়ি কিছুক্ষণ ভেবে দিক পালটে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। কুমারের কাছে লেপসোনাকে পৌঁছতে হবে যে।

জঙ্গলের কাছে এসে যখন বুড়ি পৌঁছল তখন চারপাশ লোকে লোকারণ্য। এতদিনের পুরনো বন কেটে ফেলা হবে, সকলের মুখেই কালো ছায়া। এদিকে কুমার হাত তুলে নির্দেশ দেওয়া মাত্র তার লোকেরা কুঠার নিয়ে এগিয়ে গেল বনের দিকে। আর তখনই ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা।

হাজার হাজার কাঠবেড়ালি তীব্র গতিতে ছুটতে ছুটতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল কুমার ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের ওপর৷ পিল পিল করে তাদের গায়ে চড়ে মুহূর্তে মাটিতে ফেলে দিল তারা। কুমার ডানহাতে একটাকে সরান তো আরেকটা ঘাড় বেয়ে ওপরে ওঠে৷ বাঁহাতেরটা ঝেড়ে ফেলেন তো পায়ের ওপর দশটা কাঠবেড়ালি পিল পিল করে৷

ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও কিছুক্ষণ পরেই সবটা বুঝতে পেরেই তৎপর হল৷ গ্রামবাসীরাও কাঠবেড়ালিদের পক্ষ নিয়ে কাঠুরেদের সরাতে লেগে গেল। আর এই সুযোগে বুড়ি চুপি চুপি গিয়ে লেপসোনাকে ছুড়ে দিল মাটিতে গড়াগড়ি খেতে থাকা কুমার সংগ্রামজিতের ওপর৷

যেই না লেপসোনাকে ছুড়ে দেওয়া, অমনি লেপসোনা আদর করে জড়িয়ে ধরল কুমারকে। সেই ছোট্টবেলার মতন। মাথা পা, মুখ ঢেকে ফিসফিস করে পড়তে লাগল রমেশ ধুনুরির শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্রー

“...কানের কাছে ফুস-ফুস-ফুস, জাদুমন্ত্রের ধ্বনি

আলুম চিলুম, ডজ্ঞা দিলুম, দুষ্টু পোকা হানি।”

আর অদ্ভুত ব্যাপার, কুমারও যেন হঠাৎ সেই অনেক বছর আগেকার শিশুটি হয়ে গেলেন। কাঠবেড়ালি চলে গেল, পাইক-পেয়াদারা এসে ডাকাডাকি করতে লাগল, কুমারের হুঁশ নেই। বাচ্চা ছেলের মতন লেপসোনাকে মুড়ি দিয়ে কুমার অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লেন।


আট


কুমারের ঘুম ভাঙল পরেরদিন বিকেলবেলা। লেপ সরিয়ে সটান উঠে বসলেন তিনি। ভাসা ভাসা চোখে সবাইকে সবাইকে দেখতে লাগলেন। সকলে তো উন্মুখ হয়ে আছে, কুমার কী বলেন। কী বলবেন কুমার? এই বুঝি তেড়েফুঁড়ে উঠে চিৎকার করে উঠলেন, ‘গাছ কাটো!’ বা খিদের চোটে হুঙ্কার দিলেন, ‘খাবার আনো!’ বা নিজের গায়ের কাদা ময়লা  দেখে আদেশ করলেন, ‘সাবান আনো, স্নান করব।’

কিন্তু কুমার এসবের কিছুই বললেন না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে চোখ তুলে চাইলেন। কী সরল, কী সুন্দর সে দৃষ্টি! রাগ নেই, হিংসা নেই। কাছে বসে থাকা একটা কাঠবেড়ালির দিকে চেয়ে বললেন, “কী সুন্দর দেখতে!”

তারপর সব বদলে গেল। দিঘিপুরে গাছ কাটা বন্ধ হল। পুকুর বোজানো নিষিদ্ধ হল। রাস্তা পাকা হল, প্রজাদের ভাঙা বাড়ি সারানো হল, অনেক স্কুল আর হাসপাতাল খুলল কিন্তু দিঘিপুরের যা চিরন্তন সেই বন, দিঘি, পুকুর অক্ষত রইল। কুমার সংগ্রামজিতের নামে জয়-জয়কার পড়ল।

আর লেপসোনা?

লেপসোনা আবার ঠাঁই পেল কুমারের বিছানায়। তার স্পর্শ না পেলে কুমারের ঘুমই আসে না।

___

অঙ্কনশিল্পীঃ উপাসনা কর্মকার


3 comments: