কচিপাতাঃ গল্পঃ বন্ধু বোলতা - কৌশানি দেব


কৌশানি দেব


লকডাউন চলছে। বাড়িতে বসে বসে বোর হচ্ছি। মন ভালো রাখবার জন্য টেনিদা পড়ছি। পড়ছি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা সদাশিব। হঠাৎ একদিন চোখ পড়ল দোতলার ভেন্টিলেটরের দিকে। দেখি হলুদ বোলতার বাসা। এতদিন চোখেই পড়েনি! তবে কয়েকদিন ধরেই বাড়ির চারপাশে বোলতা ঘুরতে দেখছিলাম। বাসাটা পুরো বানানো হয়ে গেছে বলেই মনে হল। কী সুন্দর! অনেকটা ছোটো ঝুলন্ত ঝাড়বাতির মতো। বাবা বলেছে বোলতারা মাটি, কাঠের গুঁড়ো, নানা জৈব পদার্থের সঙ্গে নিজের লালা মিশিয়ে এই বাসা বানায়। বাসাটিতে অনেকগুলো কুঠুরি রয়েছে। প্রতিটা কুঠুরি ছ’কোনা, একই মাপের।

আমার তো বেশ আনন্দই হল। পড়ার ফাঁকে ওদের কীর্তিকলাপ দেখতে পাব। হয়তো ক’দিনের মধ্যেই ডিম পাড়বে। লার্ভা হবে। তারপর বেরোবে একটা জ্যান্ত বোলতা। ভেবেই আমার দারুণ মজা লাগছিল। তখুনি গিয়ে বাবা-মাকে বললাম।

এখন মাঝেমধ্যেই ওদের দিকে নজর রাখি। যদিও একটু অসুবিধা হয় ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে দেখতে, আবার বেশি কাছে যেতেও সাহস পাই না। পাছে হুল ফুটিয়ে দেয়। সারাক্ষণই দেখি ছ’-সাতটা বোলতা বাসাটাকে ঘিরে থাকে। বিকেলে আর সকালে যখন বাগানে জল দিতে যাই, কয়েকটা বোলতাকে বাগানে ঘুরতে দেখি। হয়তো ফুলের নেকটার কিংবা মধু সংগ্রহ করতে আসে।

কয়েকদিন পর দেখি কুঠুরির মুখগুলো সাদা একটা জিনিস দিয়ে ঢাকা। মনে হয় ডিম পেড়েছে। ডিমগুলো পড়ে যাওয়ার ভয়ে হয়তো ঢাকা দিয়ে রেখেছে।

ইতিমধ্যে আমি রিমিকে এ ব্যাপারে বলেছি। ও থাকে আমার পাশের বাড়িতে। খুব ভালো বন্ধু আমার। বারান্দায় গিয়ে ডাকলাম ওকে। রিমি এল। যা দেখেছি তা বললাম। রিমি বিমর্ষ মুখে বলল, “লকডাউনের জেরে আমার আর বোলতার বাসা দেখাই হল না।”

আমি একগাল হেসে আবার ঘরে ফিরে এলাম। সতিই আমার রিমির জন্য খারাপই লাগল।

সন্ধে হলেই বোলতাগুলো আমার পড়ার ঘরে আলোর কাছে ঘুরঘুর করে। সেটা আমার বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু একদিন দেখি ওরা শুধুই আমার চারপাশে ঘুরছে। মুখ-চোখের সামনে দিয়ে শাঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি ছুটে বাবার কাছে গিয়ে কাঁচুমাচু মুখে সে কথা বললাম। বাবা সব শুনে বলল, “ওরা একটু ওড়াউড়ি করছে বটে, কিন্তু তোমায় তো আর হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে না? তাই তুমিও ওদের আঘাত কোরো না।” এরপর বাবা একটু হেসে বলল, “ওরা আসলে দেখতে এসেছে তুমি ঠিকমতো পড়াশোনা করছ কি না, অঙ্ক কষছ কি না। নিশ্চয়ই তুমি তখন মন দিয়ে পড়ছিলে না, তাই ওরা তোমার চারপাশে ঘুরছিল।”

বাবার কথা আমার খুব একটা পছন্দ হল না। আবার পড়ার ঘরে চলে এলাম। দেখি এখন আর একটা নয়, চার-পাঁচটা বোলতা এসে পড়েছে। তার মধ্যে হঠাৎ একটা উড়ে এসে বসল আমার অঙ্ক বইয়ের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে পেনসিল বক্সটা চাপিয়ে দিলাম ওর গায়ে।

বোলতাটাকে মারতে পেরে সেদিন আমার বেশ গর্ববোধই হচ্ছিল। রাতে ঘুমোবার সময়ে মনে হচ্ছিল আরো কয়েকটাকে ওভাবেই মেরে ফেলি। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দক্ষিণের জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি হলুদ রঙের একটা ক্রিকেট বলের আকারের প্রাণী। ওটা জানালা দিয়ে ঢুকে আমার দিকেই আসতে লাগল। আমি তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। যখন একেবারে সামনে চলে এল, দেখি প্রাণীটার চোখদুটো আসলে পুঞ্জাক্ষি! গায়ে হলদের ওপর বড়ো বড়ো খয়েরি দাগ। আর দুটো লম্বা শুঁড়। এটা কি বোলতা?

বোলতা যে এরকম বিশাল হতে পারে তা এতদিন জানতামই না। মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল। আরে আজ সন্ধ্যাতেই তো রাগের চোটে একটা বোলতাকে মেরে ফেলেছি! এখনো পেন্সিল বক্স দিয়ে সেটা চাপা দেওয়া আছে। তারই কি প্রেতাত্মা নাকি ওটা?

আমি ঘামতে শুরু করলাম। ওদিকে বড়ো বোলতাটা আমার দিকে চেয়ে বলল, “আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি যে তুমি আমাকে মেরে ফেললে?”

আমার তখন কথা বলবার ক্ষমতা নেই। ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে। বোলতাটা কটমট করে তাকিয়ে এবার কড়া সুরে বলল, “তোমার মতো লোকেরাই আমাদের ভালোভাবে বাঁচতে দেয় না। একটা সময় আমরাও কত আনন্দে দিন কাটাতাম। চারদিকে গাছপালা, ফাঁকা মাঠ। কিন্তু এখন সেই সুন্দর পরিবেশ আর নেই। চারদিকে শুধু উঁচু উঁচু বাড়ি। গাছপালাও কমে গেছে। ফলে কমে আমাদের থাকার জায়গাও। তাই তো লোকের বাড়িতে গিয়ে বাসা বানাতে হয়। অনেকেই সেই বাসা ভেঙে দেয়। আমাদের তাড়িয়ে দেয়, মেরেও ফেলে তোমার মতো। আমরা ক্ষুদ্র প্রাণী বলে প্রতিবাদ করতে পারি না। তবে মনে রেখো, তোমাদের মতো আমাদেরও মন আছে, পরিবার আছে।”

বোলতাটার কথা শুনে আমার সারা গা কেঁপে উঠল। আর তখনই হঠাৎ মিলিয়ে গেল প্রাণীটা। আর আমার মুখের উপর এসে পড়ল সূর্যের আলো। মা ডাকছে।

আমি তাহলে এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিলাম! বোলতাটা তাহলে আমার স্বপ্নে এসেছিল। মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। কেন যে কাল বোলতাটাকে মারতে গেলাম! তক্ষুনি ঠিক করলাম, যা কিছুই হোক, আমি আর কক্ষনো বোলতা মারব না।

তারপর থেকে প্রতিদিন সন্ধে হলেই বোলতাগুলো আলোর কাছে ঘুরঘুর করে। আমার আশেপাশেও উড়ে বেড়ায়। কিন্তু আমি ওদের কাউকে আঘাত করি না। ওরাও আমাকে কিচ্ছু বলে না। কোনোদিন যদি ওদের না দেখতে পাই, তাহলে মনখারাপ হয়ে যায় আমার। বাসা থেকে নতুন বোলতা বেরোনোর অপেক্ষায় আছি।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ মৈনাক মজুমদার


4 comments: