ছোটো গল্পঃ পিকনিক - অনুষ্টুপ শেঠ


“কোম্পানি, অ্যাটেনশন-ন-ন!”

যেই না সোনু হাঁক পাড়ে, অমনি তুরতুরি, পুন্নি, বুইয়া, চিন্টু, বুবুন সবাই সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ে। সব্বার ফিটফাট জামা, চুল আঁচড়ানো, বড়ো চুল হলে ক্লিপ দিয়ে সুন্দর করে ঝুঁটি বাঁধা। পা সোজা করে, হাত পাশে রেখে টানটান দাঁড়িয়ে ফুরফুর করে ডানাগুলো একবার ঝেড়ে নিয়েই ওরা তৈরি হয়ে যায় কম্যান্ডারের পরের অর্ডারের জন্য।

ডানা?

হ্যাঁ তো! পরি হবে, আর ডানা থাকবে না? তুমি কী গো!

ওরা সব্বাই হল গে’ এই মহুলবনের বনপরির দল। সব বনজঙ্গলে এমন পরিরা ঘুরে বেড়ায় জানো তো? যে যার অঞ্চলের দেখভাল করে, গাছপালাদের চান-টান করিয়ে দেয়, জীব-জানোয়ারদের ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করায়, পাখপাখালিদের গানের রেওয়াজের সময় তাল-লয়ের ভুল ধরে দেয়। তেমনি আবার আছে জলপরিরা, তারা তাদের ভাগের জলের খবরদারি করে–ছানা মাছদের গল্প শোনায়, ধেড়েদের রক্ষা করে যথাসম্ভব। সেইরকম হাওয়াপরি, আকাশপরি, ফুলপরি–এমনি কত কত বিভাগ আছে পরিরাজ্যের।

কী বলছ? দেখতে পাও না কেন? আরে দূর! আমরা মনিষ্যি না! আমাদের চোখে পরি দেখা যায় না, ফিল্টার করা আছে। মনিষ্যি কিনা খুব খিটকেল প্রাণী!

তবে খুব খুব লক্ষ্মী বাচ্চা হলে, এই আমাদের তিতিরের মতো, হয়তো পরিরা কখনও দেখা দিলেও দিতে পারে। সে আলাদা কথা। এখন যা বলছি, শোনো।

সেদিন ভোর থেকে ওরা অনেক কাজ করে ফেলেছে। পুরো পুবদিকের পিঁপড়ে কলোনিতে আজ ঝাড়পোঁছের দিন ছিল। সে কি পিঁপড়েরা একা পারে? তারপর সেসব মিটলে সব গাছেদের এক চামচ করে কালমেঘ খাওয়ানোও ছিল আবার, একেকটা চারাগাছ এত দুষ্টু না, গোড়ায় কালমেঘ ঢাললেই কেঁদেকেটে পাতা-টাতা নেড়ে একশা হয়ে যায়, তখন আবার তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে, ডানা দিয়ে হাওয়া করে করে ভোলাতে হয়।

সেসব সেরে এখন ওদের ছুটি হয়ে যাওয়ার কথা। একটু খেলবে, ঘুমোবে নিজেদের মতো। কিন্তু কম্যান্ডার আবার নতুন কী বলছে এখন!

“পরিরা, একটা বিরাট বড়ো ঘোষণা আছে। এই রোববার একটা দারুণ কাণ্ড হতে চলেছে। দারুণ মানে দারুণ শুধু নয়, সে এক বিশাল হই হই ব্যাপার। তোমরা আছ তো আমার সঙ্গে?”

এইটুকু বলে সোনু চুপ করে মিটিমিটি হাসে। আছে যে সব্বাই, সে আর বলে দিতে হয় না। ‘কী, কী’ করে প্রায় লাফিয়ে পড়ে আর কী!

দু’হাত তুলে সবাইকে চুপ করায় সোনু। তারপর চোখ গোল করে, গলা নিচু করে ষড়যন্ত্রকারীর মতো বলে, “পিকনিক!”

অ্যাঁ!

অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ!

পরিরাজ্যের পরিরা নাকি সবাই মিলে পিকনিক করতে যাবে। রাজামশাই সেরকমই বলেছেন, পরিরা এত খেটেখুটে সব সুন্দর করে রাখে, ওরা নিজেরা একদিন মজা করুক! সব ব্যবস্থা রাজামশাইয়ের খাস মন্ত্রীমশাইয়েরা করে দেবে।

শুনে তো তুরতুরিরা সবাই হেসে, নেচে অস্থির। পিকনিক! কী মজা, কী মজা! তারপর থেকে রোববার অবধি রোজ রোজ সবার মুখে খালি ওই কথা, কী জামা পরবে, কী গয়না পরবে, কী খাবে…

দেখতে দেখতে রোববার এসেও গেল। ওরা সবাই এসে জড়ো হয়েছে তালদিঘির পাড়ে। এসে দেখে, মস্ত দিঘির টলটলে কালো জলে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি মেঘ।

মেঘই তো। পিকনিকের জন্য রাজামশাই সমস্ত মেঘের পানসি ভাড়া করে করে ফেলেছেন। তারা এসে জড়ো হয়েছে আকাশের উপর, যেন একদল তেজি ঘোড়া। একটা করে মেঘ নিচু হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, আর লম্বা ঝকঝকে দড়ির মই নেমে আসে পরিদের উঠে আসার জন্য।

আহা, উড়ে গিয়ে বসতে তো ওরা পারেই। কিন্তু সারাক্ষণই তো উড়ে উড়ে চলাফেরা করছে! পিকনিক বলে একটু স্পেশাল কায়দা হতে হবে না?

কী যে সুন্দর সেই মেঘের ভেলা! মাথার উপর দুই পরত হালকা ফুলকা চাঁদোয়া, নরম নরম ফুলো ফুলো গদি বসার জন্য, ফুরফুর করে হাওয়া দিচ্ছে, মিঠে মিঠে বাজনা বাজছে লুকোনো স্পিকার থেকে।

সবাই উঠে বসার পর ক্যাপ্টেন পরি সেই লুকোনো স্পিকারে অ্যানাউন্স করল, “নমস্কার যাত্রীগণ! আমরা আমাদের যাত্রার জন্য প্রস্তুত। মুম্বই থেকে কলকাতার এই উড়ান আপনাদের যতক্ষণ ইচ্ছে ততক্ষণ সময়ে পুরো করা হবে। উড়ানের সারাক্ষণ আপনাদের সামনে লাগাতার আপেল, আঙুর, ললিপপ, ফিশফ্রাই, রসগোল্লা, ‘কোল্ডিং’, চানাচুর সব আপনা আপনি সাপ্লাই হতে থাকবে। আনন্দ করুন।”

ক্যাপ্টেন পরি শুনে হাসছ? অমন গোঁফ, অমন মাসল, অমন চৌকো সানগ্লাস আর দেখেছ? বাঁই করে স্টিয়ারিং ঘোরাল আর মেঘের পানসি বোঁ করে উঠে গেল আকাশে একদম উপরদিকে, হেলেদুলে ভাসতে ভাসতে রওনা দিল আরব সাগরের ঢেউয়ের উপর দিয়ে।

পরিরা তো আনন্দে কী করবে ভেবে পায় না। এত সুন্দর সুন্দর দৃশ্য, এত সুন্দর সুন্দর খাবারদাবার। খাবে, না নিচে দেখবে?

এই দেখা যাচ্ছে পশ্চিমঘাট পর্বত। কতদূর ছড়িয়ে আছে তার শাখাপ্রশাখা! এই আবার কী পাথুরে অঞ্চল জুড়ে জঙ্গল, মধ্যপ্রদেশ পেরোয় বুঝি?

উত্তেজনায় তুরতুরি পরি বুইয়া পরির ‘কোল্ডিং’ খেয়ে ফেলল; ঝুঁকে দেখতে গিয়ে পিকলু পরির মুখ থেকে ললিপপটা পড়েই গেল নিচে।

এই করতে করতে অনেক রাস্তা ঘোরা হয়েছে ওদের। একটু বেলা ঢলেছে বলে মেঘের পানসি নেমে এসেছে মাটির অনেকটা কাছাকাছি, ধীরে ধীরে থেমে থেমে ভেসে চলেছে। পরির দল দেখছে কোথাও ছোট্ট গ্রামটি, একলা গরু গোয়ালে জাবর কাটতে কাটতে মুখ তুলে দেখছে ওদের ভেসে যাওয়া। কোথাও হাট বসেছে, কত দোকান পসরা, কত লোক, ধুলো উড়ছে, নাগরদোলা ঘুরছে ক্যাঁচ ক্যাঁচ ক্যাঁচ। কোথাও বা ক্ষেতের পর ক্ষেত সবুজ ফসল, জোয়ার বাজরা ক্ষেতি, নুয়ে পড়ে কাজ করছে চাষারা, পথের ধারে তাদের খাবার টুকরি পাহারা দিচ্ছে কানঝোলা বাদামি নেড়ি কুকুর। ঝিলে হাঁস চরছে, তার পিছনে পিছনে তাল রাখতে হিমসিম খাচ্ছে কচি ছানা হাঁসেরা। টেলিগ্রাফের তারে বসে আছে ল্যাজঝোলা ফিঙে, তার পিছনের ঝোপেই পোকা খুঁজে বেড়াচ্ছে সবুজ বাঁশপাতি।

দেখতে দেখতে আলো আরও পড়ে এল। আর তখনই মাথায় খেয়াল চাপল বিন্নু পরির।

“তাহলে নাচ গান হোক?”

অমনি সবাই সমস্বরে বলে উঠল, “হোক হোক!”

গান ধরল বিন্নু নিজেই। অন্যরাও গলা মেলাল তার সঙ্গে। লাফিয়ে উঠে ঘুরে ঘুরে নাচ জুড়ে দিল তুরতুরি। এর হাত ধরে, ওর বিনুনি টেনে বাকি সবাইকেই তার সঙ্গে নিয়ে এল নাচের আঙিনায়। কেউ বসে থাকতে পারল না আর শেষ অবধি। দেখা গেল সমস্ত পরিরাই গলা ছেড়ে গান গাইছে, আর ধেই ধেই করে নাচছে পুরো মেঘ জুড়ে।

যা জমে উঠেছিল না ব্যাপারটা! একদল পরি বাঁই বাঁই করে গোড়ালি ঠুকে পাক খায় তো আরেকদল এই দু’হাত লাফিয়ে ওঠে হাতে তাল দিয়ে। পুরো মেঘ থরথর করে কাঁপতে লাগল সে নাচের ধাক্কায়। আর গান? মনে হতে লাগল যেন পঞ্চাশটা লাউড স্পিকার একসঙ্গে চিল্লাচ্ছে।

ক্যাপ্টেন পরি আর থাকতে না পেরে হাঁ হাঁ করে উঠল, “এই এই, এসব কী হচ্ছে! থামো থামো! সব মাটি করবে তোমরা দেখছি!”

কিন্তু কে শোনে তার কথা! পরিরা তখন পিকনিকের আনন্দে মশগুল। আরও উদ্দাম হয়ে উঠল তাদের নাচ, গলা সপ্তমে চড়িয়ে চেল্লাতে লাগল সব, আরও জোর হয়ে উঠল গানের হাঁকার।

সেই গুরু গুরু আওয়াজে মেঘের ডাক ভেবে ভয় পেয়ে নিচে গাঁয়ের লোকেরা তড়িঘড়ি গরু-হাঁস সব নিয়ে তাদের ঘরে ঢুকে দরজা দিল।

ভাগ্যিস গেছিল। পরিদের অমন বেদম নাচের ঠেলায় শেষে মেঘে গেল ফুটো হয়ে।

তাও কি একটুখানি? অত পরি, অত লাফঝাঁপ! গাদা গাদা ফুটো হয়ে গেল ক্যাপ্টেনের সাধের পানসির বুক জুড়ে।

আর মেঘ ফুটো হলে তো বৃষ্টি হয়। ঝরঝর করে বৃষ্টি শুরু হল সব ভাসিয়ে।

যত বৃষ্টি হয়, মেঘ তত ছোটো হয়ে যায়।

হতে হতে মেঘটা ছোটো হয়ে হয়ে ফুরিয়ে গেল। পরিরা সবাই অনেক আগেই বেগতিক দেখে আকাশে উড়ে পড়েছিল, এবার তারা দল বেঁধে উড়ে উড়ে নিজেদের জায়গায় ফিরে এল।

পরদিন সবার মুখে খালি পিকনিকের গল্প–কী মজাটাই যে হল!

খালি ক্যাপ্টেন পরি খুব রেগেমেগে গজ গজ করতে করতে আবার একরাশি নতুন কুচোকাঁচা মেঘ ধরে এনে সেলাই করতে বসল। নইলে নতুন করে আবার মেঘের পানসি ভাড়া দেবে কী করে!

___


অঙ্কনশিল্পীঃ সুমন দাস


2 comments:

  1. কি দ্দারুণ গল্পটা...👌👌👌

    ReplyDelete
  2. ছোটবেলা যেন ফিরে এলো। কী স্নিগ্ধ অনুভূতি। খুব ভালো লাগলো দিদি। 😊😊

    ReplyDelete