বড়ো গল্পঃ কুম্ভঘোষকের গুপ্তধন - নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী


এক

বৈভার পর্বতের উত্তর-পূর্ব পাদদেশে পাহাড়ের উপরে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি উষ্ণপ্রস্রবণ কুণ্ড আছে। শীতের রাত। রাজগৃহে তীব্র ঠাণ্ডা পড়েছে। শীতে কাঁপতে কাঁপতে সেই উষ্ণপ্রস্রবণে ডুব দিলেন মেঘীয় শ্রেষ্ঠী। তাঁর কিছুটা পেছনে একটি ঘোড়ার পিঠে বেশ কয়েকটি ঝোলা ঝুলছে, ঘোড়ার উপরে একটি অর্ধমৃত কিশোরী প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। কিশোরীটি ঘুমন্ত না মৃত, নাকি জ্ঞানহারা তা বোঝা যাচ্ছে না। তীব্র শীতল বাতাসে প্রস্রবণের গরম জল থেকে ধোঁয়ার আকারে বাষ্প বের হচ্ছে।

প্রস্রবণে স্নান সেরে মেঘীয় বললেন, “ওং নমো ব্রহ্মা!”

রাজগৃহের সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, ব্রহ্মার তপস্যার ফলেই তপোদার এই উষ্ণপ্রস্রবণগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। শুভ কাজ শুরু করার আগে এই জলে স্নান করলে কার্যসিদ্ধি হয় বলে তাদের বিশ্বাস। শ্রেষ্ঠী একটি পাত্রে খানিকটা জল নিয়ে এসেছেন। এবার তিনি কিশোরীর গায়ে কুণ্ডের সেই জল ছিটিয়ে দিলেন। জলের স্পর্শ পেয়ে মেয়েটি এতক্ষণ পরে চোখ মেলে চেয়েছে। তারপর ইঙ্গিতে সে দেখাল, তার পিপাসা পেয়েছে, জল খাবে।

শ্রেষ্ঠী সামান্য গরম জলটুকু মেয়েটির গলায় ঢেলে দিলেন। জল খেয়েই হতচেতন মেয়েটি বমি করে ফেলল।

তার গতকাল রাত থেকে ভেদবমি হচ্ছে। এই রোগে গত তিনদিনে শ্রেষ্ঠীর বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও চারজন দাসদাসী মারা গেছে। সবথেকে আগে মারা গেছে বাড়ির পোষ্য প্রাণীরা। গরু, ছাগল, কয়েকটি ঘোড়া ও ভেড়াগুলো। একটিমাত্র বুড়ো ঘোড়া কেবল এখনও সুস্থ আছে, আর সুস্থ আছেন শ্রেষ্ঠী নিজে। তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর মেয়েটির পরমায়ুও আর বেশিক্ষণ নয়।

শ্রেষ্ঠী চোখের জল সংবরণ করতে করতে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন। তারপর গভীর অন্ধকারে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। চারদিকে কোনও শব্দ নেই। নিস্তব্ধ নিশীথের বাতাসে কনক চম্পার সুবাস ভেসে আসছে। মহারাজ বিম্বিসার রাজগৃহের সর্বত্র ভগবান বুদ্ধকে নিবেদন করার জন্য এই সুগন্ধী ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। পাহাড়ি পথে ঘোড়ার খুরের কপ কপ ধ্বনি জেগে উঠল।

অনেকটা পথ এগিয়ে শ্রেষ্ঠী নগরের উত্তরদিকে এসে পৌঁছেছেন। চারদিকে ঘন জঙ্গল। ময়নাকাঁটা আর বাঘনখের বনে ঘোড়া সামনে এগোতে চাইছে না। শ্রেষ্ঠী ক্রমাগত ঘোড়ার গায়ে চাবুক মেরে ঘোড়াকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। তাঁর শরীর আর চলছে না, তবুও দুর্জয় মনোবল নিয়ে তিনি পথ চলেছেন। কৃষ্ণপক্ষ। পথে কেবল নক্ষত্রের মৃদু আলো ছাড়া অন্য কোনও আলো নেই।

একটি পার্বত্য পথের উপর বেশ কয়েকটি গুহা। এখানে চারদিকে মারাত্মক বিষাক্ত সাপের ভয়। মেঘীয় তাঁর হাতে সাপের ঔষধি শেকড় বেঁধেছেন, এতে সাপ কাছে আসবে না। সামনের একটি গুহা যক্ষ মণিভদ্রের গুহা। এদিকে বনজঙ্গল কিছুটা কম। কারণ, মণিভদ্র প্রতিবছর বসন্ত পঞ্চমী তিথিতে পুজো পান। বছরের বাকি সময় এই সাপের রাজত্বে কেউ পা রাখে না।

অনেকে এখানে ধনসম্পদ পুঁতে রেখে যায়। তাদের বিশ্বাস, যক্ষের অনুগত সাপেরা সেই ধন রক্ষা করে। ঘোড়া থেকে নেমে কন্যা সুমগধিকে কোলে করে সেই অন্ধকার গুহার ভেতর ঢুকলেন মেঘীয়। তারপর গুহার দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসালেন মেয়েকে। একটি পাথরের ফলক তিনি তার হাতে দিলেন। তাতে লেখা ‘ভগিনী সুমগধি’। এবার মেয়ের কোলে শ্রেষ্ঠী ঝোলাগুলো রাখলেন। প্রতিটি ঝুলি প্রচণ্ড ভারী। শ্রেষ্ঠী বহুকষ্টে অত্যন্ত সাবধানে ঝুলিগুলো এনে সুমগধির চারপাশে সেগুলো রেখে উচ্চ কণ্ঠে মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। জপ শেষ হলে ঝোলাগুলোকে তিনি উপুড় করে দিলেন। হাজার হাজার সোনার মুদ্রা। এগুলো মগধের রাজার মুদ্রা নয়, তবে খাঁটি সোনার। বহুদূর সুবর্ণদ্বীপে বাণিজ্য করতে গিয়ে এগুলো তিনি ধীরে ধীরে সঞ্চয় করেছিলেন। গুহার মাটি খুঁড়ে মণিভদ্রের মূর্তির চারপাশে সোনার মুদ্রাগুলোকে পুঁতে দিলেন শ্রেষ্ঠী। মেয়ের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে বললেন, “সুমগধি! আজ থেকে এই বিরাট ধনরাশির দায়িত্ব তোমার। কেবল তোমার সহোদর সুমন্ত ছাড়া অপর কেউ এই ধন যেন নিতে না পারে। যতদিন সুমন্ত এই ধন না নিয়ে যাবে, তুমি ততদিন এই ধনের রক্ষক যক্ষিণী হও।”

তারপর সুমগধিকে সেই অন্ধকার গুহার ভেতর রেখে তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। এখনও বসন্তের কৃষ্ণা পঞ্চমী আসতে অনেক দেরি। তার আগে এই দুর্গম পর্বতের গুহার ভেতর সাপের ভয় উপেক্ষা করে কেউ আসবে না। ততদিনে সুমগধির লাশটি পচে কঙ্কালে পরিণত হবে এবং সুমন্তও ধনরাশি তুলে নিয়ে তা অবশ্যই সুরক্ষিত করবে।

নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে ঊর্ধ্বমুখে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন শ্রেষ্ঠী। তার দু’চোখ থেকে অবিরল জলধারা নামতে লাগল। হঠাৎ তীব্র বমন শুরু হল তাঁর। এবার আর নিস্তার নেই। প্রাণঘাতী রোগ তাঁকেও স্পর্শ করেছে। আজ সারাজীবনের অর্জিত ধনরত্ন যক্ষ মণিভদ্রের গুহায় গচ্ছিত রেখেছেন শ্রেষ্ঠী। রাজা বিম্বিসার যদি একবার জানতে পারেন, এই ধন অবশ্যই অধিকার করে নেবেন। অথচ এই সম্পদের অধিকারী একমাত্র তাঁর পুত্র সুমন্ত। ধনসম্পদ সুরক্ষিত রইল কি না জানা নেই। তবে যক্ষ মণিভদ্রকে তিনি পরম শ্রদ্ধা করেন, তিনি অত্যন্ত জাগ্রত। সমস্ত বিপদ থেকে তিনি রাজগৃহবাসীদের সর্বদা রক্ষা করে থাকেন।

পুত্র সুমন্তকে খবর দেওয়া হয়েছে। তক্ষশিলায় শিক্ষালাভের জন্য সে গেছে বলেই একমাত্র তার প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। একজন পণ্যবাহী গরুর গাড়ির চালকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে শ্রেষ্ঠী পুত্রকে খবর দিয়েছেন। তবে সুমন্ত একান্তই শিশু, মাত্র বারো বছর বয়স। এত ধন উদ্ধার করা তার একার পক্ষে অসম্ভব। শ্রেষ্ঠী আর ভাবতে পারলেন না। সারাদিনের অসম্ভব পরিশ্রম ও ভেদবমি তাকে একেবারে অচল করে দিয়েছে। শ্রেষ্ঠী তাড়াতাড়ি ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন। ঘোড়াটি তাঁর কথা বোঝে। শ্রেষ্ঠী ঘোড়াকে গৃহে যাবার নির্দেশ দিলেন। ঘোড়াটি নির্দেশ অনুধাবন করে নিমেষের মধ্যে চলতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পথ চলার পর মেঘীয় শ্রেষ্ঠীর শরীর একেবারে বিকল হল। তিনি তীব্র শক্তিতে ঘোড়াটির গলা জড়িয়ে ধরে বসলেন। ঘোড়ার পিঠে আর সোজা হয়ে বসার শক্তিও তাঁর নেই। ঘোড়া পার্বত্য পথ ছাড়িয়ে নগরের ভেতর প্রবেশ করেছে। সামনে কিছুটা পাথুরে জমি, ওইটুকু পথ যেতে পারলেই সামনের পথ মসৃণ, কারণ সামনেই রাজপুরীর উত্তর দুয়ার ও বিত্তবানদের বাসস্থান। কিন্তু শ্রেষ্ঠী আর এগোতে পারলেন না। অবসন্ন শরীরে তিনি মাথা ঘুরে পাথুরে জমির উপরে পড়ে গেলেন। মাথায় তীব্র আঘাত পেয়েছেন মেঘীয় শ্রেষ্ঠী। তাঁর চারদিকে সহসা অন্ধকার নেমে এল। ধীরে ধীরে সুশীতল মৃত্যু এসে তাঁকে কোলে তুলে নিল।


দুই


আজকের কথা নয়। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেকার কথা। ভারতবর্ষ তখন জম্বুদ্বীপ নামে পরিচিত ছিল। দেশের আকারও এখনকার মতো ছিল না। তখন ষোলোটি শক্তিশালী রাজাদের রাজত্ব ছিল ভারতবর্ষে। এখনকার ইতিহাসবিদেরা সেই রাজ্যগুলিকে ষোড়শ মহাজনপদ বলে থাকেন। এদের মধ্যে উত্তর ভারতের চারজন রাজা ছিলেন প্রবল ক্ষমতাশালী, আর তাঁদের রাজত্বের পরিধিও ছিল সবথেকে বিস্তৃত। সেই রাজ্যগুলো হল কোশল, মগধ, বৎস ও অবন্তী। কোশল রাজ্যের রাজা ছিলেন প্রসেনজিৎ, মগধ রাজ্যের রাজার নাম ছিল বিম্বিসার, বৎস দেশের রাজা ছিলেন উদয়ন এবং অবন্তী রাজ্যের রাজা প্রদ্যোৎ।

আজ যে কুম্ভঘোষকের গুপ্তধনের গল্প বলব, তা মগধ রাজ্যের এক অধিবাসীর গল্প।

মগধের রাজধানীর নাম ছিল রাজগৃহ। বৌদ্ধ সাহিত্যে কুম্ভঘোষকের নাম আছে। এমনকি তাঁর সম্পর্কিত বুদ্ধদেবের উক্তিও আছে সেখানে। তাই কুম্ভঘোষকের এই গুপ্তধন আবিষ্কারের গল্পকে বলা যেতে পারে একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা।

আজকের ভারতের বিহার প্রদেশের আধুনিক রাজগীর শহরের সঙ্গে সে-যুগের রাজগৃহের ছিল বিস্তর তফাত। তখন রাজগৃহের পার্বত্য উপত্যকা জুড়ে ছিল বহু প্রবাহিনী নদী। এখন আর তাদের চিহ্নমাত্র নেই। তপোদা, সপ্পিনি, বাণগঙ্গা, সরস্বতী প্রভৃতি নদীর জলে পুষ্ট ছিল রাজগৃহের উর্বর মাটি। বেণুবন বৌদ্ধ সংঘের পাশ থেকে বয়ে যেত পবিত্র তপোদার জলে পুষ্ট সরস্বতী নদী।

বেণুবনটি ছিল রাজপুরী থেকে বেশ কিছুটা দূরে। সেখানে ছিল অনেক গাছের সঙ্গে প্রচুর বেণু বা বাঁশগাছের বন। মগধরাজ বিম্বিসার বুদ্ধ ও সংঘকে সেই নির্জন বনটি দান করেন। তিনি সেখানে ভিক্ষু ও বুদ্ধের থাকবার জন্য বিহার তৈরি করে দেন। সারি সারি বাঁশের কাণ্ডের মধ্যে দিয়ে বাতাস চলাচল করার সময় একধরনের বংশী ধ্বনির মতো শব্দ সেই বনে মাঝে-মাঝেই পাওয়া যেত। বনটিকে সেই বংশী ধ্বনির জন্য খুবই মঙ্গলজনক বলে মানা হত।

নির্জন বেণুবনে সেই সময় অনেক কাঠবিড়ালি থাকত। তখনকার দিনে সমাজ জীবনে কাঠবিড়ালিকেও খুব শুভ বলে মানা হত। তখন প্রতিটি গৃহস্থ বাড়ির প্রধান ছিলেন পুরুষেরা। তাঁদের বলা হত গহপতি। গহপতি গৃহে সব সময় আগুনের সংরক্ষণ করতেন। অর্থাৎ একটি অগ্নিশিখা তিনি সর্বদা গৃহে জ্বালিয়ে রাখতেন। প্রতিটি বাড়িতে যজ্ঞ হত এবং যজ্ঞে ইন্দ্রের ও অন্যান্য দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য নিবেদন করা হত। সেই নৈবেদ্যের অগ্রভাগ কেউ খেত না, তা কোনও বৃক্ষ চাতালে বা বনভূমিতে গিয়ে রেখে আসা হত। পুজোর সেই নৈবেদ্য যদি কাঠবিড়ালিরা খেয়ে যেত, তবে তাকে খুব শুভ ঘটনা মনে করা হত, তাই কাঠবিড়ালিদের সংরক্ষণ করা হত। বেণুবনে তখন প্রচুর কাঠবিড়ালি বাস করত।

হাজার হাজার বছর আগেকার রাজগৃহেও এখনকার মতো উষ্ণপ্রস্রবণগুলো ছিল। এখন তাদের সংখ্যা কমেছে, কিন্তু তবুও তারা আজও বর্তমান। সেই উষ্ণপ্রস্রবণে স্নান করতে আসতেন ভগবান বুদ্ধ। স্নানের পরে তিনি একটি শিলাখণ্ডে তাঁর স্নানবস্ত্রটি শুকানোর জন্য রোজ মেলে দিতেন। হিউয়েন সাঙ এসেও সেই শিলাখণ্ডটি দেখেছিলেন। তপ্তকুণ্ডের কাছাকাছি তখন একটি বৌদ্ধ সংঘারাম ছিল, তার নাম তপোদারাম।


***


সুমন্তকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন তার পিতা। কাপড়ের উপরে মগধের রাজভাষায় কালো তরল কালিতে সেই চিঠি লিখেছেন পিতা। চিঠিটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সুমন্ত। পিতা লিখেছেনー

ভগিনী সুমগধির হাতে রইল সমস্ত রত্নভাণ্ডার। মণিভদ্রের গুহার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মাটির নিচে আছে হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও নানাবিধ রত্ন। মগধ রাজ্যের মুদ্রার চেয়ে এই মুদ্রাগুলো তিনগুণ চওড়া এবং ওজনে প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু সাবধান! খুব সাবধানে ধন রক্ষা করবে। রাতের অন্ধকার ছাড়া ওই পথে কখনও যাবে না। পত্রের সঙ্গে সাপের ঔষধি শেকড় পাঠালাম, শরীরে বেঁধে নেবে। গুহার ভেতরে দেখার জন্য চকমকি পাথর নিয়ে অগ্রসর হবে। পৃথিবীতে কাউকে বিশ্বাস করবে না, একমাত্র নিজের উপর ভরসা রাখবে। ধনের খোঁজ যেন প্রাণান্তেও কেউ না পায়, এমন ব্যবস্থা করবে। এই চিঠি পড়ামাত্র নষ্ট করে দেবে।

সুমন্ত চিঠি থেকে মুখ তুলতেই বাড়ির বাকি দুঃসংবাদ পেল। মায়ের মৃত্যু, বোনের অসুস্থতা ইত্যাদি। তার মন অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। কেমন আছে সুমগধি? সে কি এখন আর বেঁচে নেই? সুমগধি ছিল সুমন্তের অত্যন্ত প্রিয় ও আদরের ছোটো বোন।


***


রাজপুরীর নিভৃত আলাপ কক্ষে গুপ্তচরদের সঙ্গে কথা বলছেন সেনাপতি উগ্রসেন। আলোচনার বিষয়বস্তু মেঘীয় শ্রেষ্ঠীর মৃত্যু। গুপ্তচর চিত্রক ও বিপ্পসী দু’জনে একসঙ্গে কথা শুরু করতেই সেনাপতি হাত তুলে বিরক্ত স্বরে বললেন, “অযথা গোলযোগ কোরো না। এক এক করে কথা বলো। কী দেখেছ তোমরা?”

“মেঘীয় শ্রেষ্ঠীর ঘোড়াটি পাগল হয়ে গেছে। সেটি বৈভার পর্বতের বনে বনে পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে, আর কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে।”

“বটে!”

“আজ্ঞে আরও একটি জিনিস আমি পেয়েছি। শ্রেষ্ঠীর বাড়ির উঠোন থেকে আমি এইটি পেয়েছি।”

“কী এটা?”

“আজ্ঞে একটি বিদেশি স্বর্ণমুদ্রা। শ্রেষ্ঠী গতকাল রাতে মারা গেছেন। নগরের শ্রেষ্ঠী পরিষদ তাঁর দেহ সৎকার করেছে, কিন্তু রোগের ভয়ে তাঁর গৃহে আজও পর্যন্ত কেউ পা রাখেনি। নাহলে এটা ওখানে পড়ে থাকত না।”

উগ্রসেন চ্যাপ্টা ও ভারী সোনার মুদ্রাটি দেখে মনে মনে উল্লসিত হলেন। হাতে নিয়ে বুঝলেন, একটি মুদ্রারই বিরাট ওজন! বললেন, “তোমরা শ্রেষ্ঠীর বাড়িটি সর্বদা ঘিরে রাখো। দিনরাত চারপাশ তল্লাশি করো। ওই মুদ্রাগুলো আমার চাই। শ্রেষ্ঠীর এক পুত্র ছিল না?”

“হ্যাঁ, সেনাপতি! সে তক্ষশিলায় থাকে। শুনেছি সে সেখান থেকে রওনা হয়ে রাজগৃহে আসছে।”

“শ্রেষ্ঠীর অপর কোনও নিকটাত্মীয় নেই?”

“না।”

“এমতাবস্থায় কী করা উচিত বলো তো।” সেনাপতির মুখে হাসি।

গুপ্তচর দু’জন এবার আর কোনও কথা বলল না। এমনটা একেবারেই শোভনীয় নয়। সেনাপতিকে মতামত দেবার তারা কেউ নয়।

সেনাপতি উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ তিনি কক্ষের ভেতর পায়চারি করলেন। নিজের মনে বিড়বিড় করে বললেন, “মহারাজ হয়তো শেষপর্যন্ত এই কাজে সায় দেবেন না, তবে এত ধন কি অনর্থক ছেড়ে দেওয়া হবে? মহারাজ বুদ্ধের ধর্ম গ্রহণ করার পর থেকে পরের ধন ভোগ থেকে বিরত হয়েছেন। তিনি এখন একজন ধার্মিক মানুষ।”

সেনাপতি উগ্রসেন এবার গুপ্তচরদের বললেন, “দেখতে হবে শ্রেষ্ঠীর পুত্র যেন কিছুতেই নগরে ঢুকতে না পারে। তার আগেই দস্যুদের হাতে যেন তার প্রাণ যায়। যদি কোনোক্রমে সে নগরে ঢুকেও পড়ে, তাহলেও সে যেন প্রাণে না বাঁচতে পারে। কথাগুলো মনে রেখো। এর যেন অন্যথা না হয়, আর শ্রেষ্ঠী তাঁর ধনরত্ন কোথায় রেখে গেছেন তা উদ্ধার করো যত তাড়াতাড়ি পারো। এ রাজ্যের মহারাজ ধার্মিক মানুষ। কিন্তু আমি হলাম চরম অধার্মিক। এ রাজ্যের মঙ্গল করাই আমার একমাত্র ধর্ম।” কথা শেষ করে ভুঁড়ি দুলিয়ে হা হা করে হাসলেন উগ্রসেন।

কথামতো মেঘীয় শ্রেষ্ঠীর বাড়িতে গুপ্তচরের দল মোতায়েন হয়েছে। তারা ঘরের মাটি খুঁড়ে, পালঙ্ক সরিয়ে, থালা-বাসন নেড়েচেড়ে কোনোভাবেই কোথাও একটাও স্বর্ণমুদ্রা খুঁজে পায়নি। বাড়ির উঠোনের গাছের গোড়াগুলো পর্যন্ত উপড়ে দেখা হয়েছে। শ্রেষ্ঠী কোথায় ধনরত্ন রেখেছেন? এখনও জানা যায়নি। রাজগৃহে আসার পথে দস্যুর বেশে রাজার সৈন্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। তারা খোলা তরবারি হাতে মেঘীয়র ছেলে সুমন্তকে হত্যা করার জন্য বনের ভেতর অপেক্ষা করছে রাতদিন।

এদিকে সুমন্ত একটি ঢাকা রথে চড়ে রাজগৃহের পথে রওনা হয়েছে। তার গুরুদেব তাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। ছাত্রের বিপদের কথা শুনে তিনি সুমন্তকে কয়েকটি মুদ্রা দিয়ে রথটি ঠিক করে দিয়েছেন। বহুদূর পথে যাত্রা শুরুর আগে সুমন্তের গুরুপত্নী তার যাত্রাপথের সামনে জলপূর্ণ মঙ্গল কলস রেখে মঙ্গলাচরণ করে তাকে পেট ভরে নানারকম খাবার খাইয়ে তবে বিদায় দিয়েছেন।

সুমন্ত বিষণ্ণ মনে পথ চলেছে। পুরুষপুর, সিংহপুর হয়ে কাশী নগর ঘুরে তারা এসেছে বৈশালী নগরে। এখানে কূটাগারশালা মহাবিহারে বুদ্ধ অবস্থান করছেন এখন। রথের চালক তাকে সেই বিহারে নিয়ে গেল। সকাল থেকে তাদের খাওয়া হয়নি। বিহারের অন্ন শুদ্ধ। রথ চালক সুমন্তকে বুদ্ধের কথা বলল। সুমন্ত আগে বুদ্ধের নামই শোনেনি। তাদের পরিবারে বৈদিক মতে পুজো ও যজ্ঞ হত। তার পিতা বিষ্ণু মন্দিরে যেতেন।

বুদ্ধকে দেখে সুমন্ত মুগ্ধ হয়ে গেল। তিনি দূর থেকে সুমন্তকে দেখেই বুঝেছেন যে সে ক্ষুধার্ত। সুমন্তর খাওয়া হলে তিনি সহজ সুরে তার সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপ করলেন। বললেন, “তুমি কোন পথে বাড়ি ফিরবে বালক?”

মহাবিহারের কাছে আছে এক বিরাট বন। সেই বন দিনের আলোতেও অন্ধকার থাকে। তাই তার নাম হল অন্ধবন। বুদ্ধ সুমন্তকে বললেন তার রথটিকে ছেড়ে দিতে। তিনি সুমন্তকে সময়মতো তার বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। বুদ্ধের সঙ্গ সুমন্তের খুব ভালো লাগছিল। সে বিনা বাধায় তাই রথটি ছেড়ে দিল। সেই রাতে সে বুদ্ধের সঙ্গে বিহারেই থেকে গেল। খুব ভোরে সে বুদ্ধ এবং ভিক্ষুসংঘের সঙ্গে বন পেরিয়ে রাজগৃহের পথে যাত্রা করল।

সুমন্ত যেতে যেতে পিতার চিঠির সবকথা বুদ্ধকে খুলে বলল। সে বুঝতে পেরেছিল, বুদ্ধকে সে বিশ্বাস করে সব বলতে পারে। সমস্ত কথা শুনে বুদ্ধ তাকে বললেন, “বালক! এখন তবে তোমার বাড়ি ফেরার প্রয়োজন নেই। তবে ধনরত্নগুলো উদ্ধার করা দরকার।”

তারপর তিনি তাকে কী করতে হবে সব বুঝিয়ে বললেন। পথে বুদ্ধের সঙ্গে থাকায় সুমন্তের কোনও বিপদ হল না। রাজরক্ষীরা তাকে সংঘের ভিক্ষুদের দলে নজরই করল না।

বুদ্ধের কথামতো সুমন্ত বাড়িতে ফিরে না এসে নগরের ঘোড়ার ঘাস সরবরাহকারীদের সঙ্গে থাকতে লাগল। বুদ্ধ নিয়োজিত কয়েকজন ভিক্ষুদের মাধ্যমে সে একরাতে সমস্ত ধনরত্ন তুলে বেণুবন বিহারের কাছাকাছি কলন্দক সরোবরে পদ্মবনের ভেতর মাটির নিচে পুঁতে রাখল। সুমগধিকে গুহার ভেতর দেখতে পেয়েছিল সুমন্ত। ততদিনে তার দেহটি পচে বিকৃত হয়ে গেছিল। বোনের মৃতদেহ দেখে তার ভয়ানক কষ্ট হল। দুঃখিত মনে সুমন্ত ভিক্ষুদের সাহায্যে সহোদরার দেহটিও সৎকার করল। পাথরের সুমগধি লেখা ফলকটিকে গুহার ভেতরেই রেখে দিল সে, যাতে ধনের খোঁজে কেউ সেখানে এলে সে বিভ্রান্ত হয়। ধনের কথা কেবল বুদ্ধ এবং কয়েকজন ভিক্ষু ছাড়া আর কেউ জানল না।


তিন


এক নতুন জীবন শুরু হয়েছে সুমন্তর। বুদ্ধ তার পাশে আছেন, এই চিন্তা তার মনকে অসামান্য শান্তি ও জোর দিয়েছে। সারাদিন তাকে অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয়। এখনও সুমন্ত নিজের নাম কাউকে বলেনি। বুদ্ধ তাকে সংঘে আসা যাওয়া করতেও বারণ করেছেন, কারণ এতে রাজার কর্মীকদের সন্দেহ হতে পারে। সুমন্ত বুদ্ধের কথা মেনে চলতে লাগল। সে সারাদিন ঘোড়ার ঘাস কেটে রাখে, খড় ও বিচালি কুচিয়ে রাখে। কখনও বিরাট বিরাট জলের আধারগুলোকে নদী থেকে জল এনে ভর্তি করে।

ঘেসেরাদের দল তাকে বেশ ভালোবাসে। তারা একদিন সুমন্তকে ডেকে বলল, “বালক! তুমি রাজবাড়ির দাসেদের থাকবার জায়গায় যাও। সেখানে গেলে তুমি থাকবার ঘর পাবে। এভাবে খোলা জায়গায় থাকবে কী করে? সামনে বর্ষা আসছে। তোমাকে এখনই তাদের কাছে গিয়ে নিজের জন্য একটা ঘরের ব্যবস্থা করতে হবে।”

ঘেসেরাদের কথা শুনে সুমন্তের মনে পড়ে গেল তার নিজের বাড়ির কথা। রাজপুরী থেকে কিছুটা দূরেই তাদের সুবিশাল প্রাসাদ এখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। তবে তাকে ছদ্মবেশে থাকতে বলেছেন বুদ্ধ, সুমন্ত তাই চুপ করে থাকল। অতীতের চিন্তা তার মুখে বেদনার ছায়া ফেলেছিল। তা দেখে ঘেসেরাদের একজন তাকে সঙ্গে করে রাজবাড়ির ভৃত্যদের আবাসে নিয়ে গেল। রাজবাড়ির দাসেরা মহাসুখে বিরাট একটি জায়গায় অনেকগুলি ঘর বেঁধে তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করে। রোজ রাজবাড়ির ভালোমন্দ খাবার খেয়ে তারা সবাই অলস হয়ে পড়েছিল। ঘেসেরাদের দল সেখানে গিয়ে সুমন্তের খুব প্রশংসা করতে লাগল। রাজার দাসেরা তখন সুমন্তকে একটা ঘরে থাকতে দিয়ে বলল, “আজ থেকে তোমার কাজ হল আমাদের সাহায্য করা। সকাল হলে তুমি আমাদের সবাইকে ডেকে তুলবে। তারপর গা-হাত-পা টিপে দেবে, তেল মাখিয়ে দেবে। আমরা স্নান করে সবাই কাজে গেলে তুমি ঘরে থেকে রান্নাবান্না করে খাবে। আমাদের খাবার তৈরি করার দরকার নেই। রাজবাড়িতেই আমরা সারাদিনের খাবার পাই। তবে সেখানে সারাদিন খুব কাজ করতে হয়, তাই ফিরে এলে আবার আমাদের গা-হাত-পা টিপে দেবে তুমি যতক্ষণ আমাদের ঘুম না আসে। সকাল হলেই আবার আমাদের সবাইকে ডেকে তুলবে। এই কাজের জন্য আমরা সবাই তোমাকে কিছু কিছু কার্ষাপণ দেব।”

সুমন্ত রাজার চাকরদের কথা মেনে নিয়ে তাদের চাকর হিসেবে নিযুক্ত হল। ভোর হলেই সুমন্ত একটা বড়ো কলসির ভেতর মুখ রেখে গম্ভীর স্বরে চাকরদের ডাকতে থাকে। কুম্ভ বা কলসির ভেতর মুখ রেখে উচ্চৈঃস্বরে ডাকে বলে চাকরেরা সুমন্তের নাম দিল কুম্ভঘোষক। এই পদ্ধতি খুব জনপ্রিয়ও হল। কলসির ভেতর থেকে ডাকা সেই গম্ভীর স্বর শুনে সবার তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যেত।

কয়েকদিনের মধ্যেই ঘোষক চাকরদের কাছে খুব প্রিয় হয়ে উঠল। তারা ঘোষকের জন্য রাজবাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে ভালোমন্দ খাবারও নিয়ে আসে। কিন্তু সেই খাবার ঘোষক খায় না। সে খাবার হাতে নিয়ে বলে, “আমার জন্য এই খাবার আনার কথা কি মহারাজ জানেন?”

চাকরেরা তা শুনে হাসে। তারা অবাক হয় এমন কথায়। তারা বলে, “মহারাজের কি খাবারের অভাব নাকি? রাজবাড়িতে রোজ যা খাবার ফেলে দেওয়া হয়, তা থেকে দুয়েকটা পরিবার অনায়াসে সারা মাস খেতে পারে। এই সামান্য দু-চারটে পিঠে বা শুকনো মিষ্টির কোনও হিসেবই নেই। এমন সামান্য কথা কি রাজাকে কখনও বলা যায়!”

একথা শুনে ঘোষক বলে, “তা হয় না। রাজার বাড়ির খাবার খেতে হলে রাজার অনুমতি লাগবে, নয়তো আমি সেই খাবার খেতে পারব না।”

চাকরেরা ঘোষকের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে আর তার সততা দেখে তারা বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়। ঘোষক নিজের রান্না করা যব সেদ্ধ খেতে খেতে মায়ের কথা মনে করে। আজ সে এক নতুন মানুষ। তার অতীত চিরকালের মতো মুছে গেছে।


দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়। ঘোষকের বয়স এখন আঠারো বছর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে লম্বায় অনেক বড়ো হয়েছে। এখন তার দাড়ি ও গোঁফ গজিয়েছে। তার মুখে দাড়িগোঁফ গজানোয় এখন তাকে দেখতে অন্যরকম লাগে। আত্মগোপনে সুবিধে হবে বলে সুমন্ত মুখে সবসময় বড়ো বড়ো দাড়িগোঁফ রাখে, কখনও কেটে ফেলে না।

একদিন ভোর হতেই ঘোষকের ডান চোখ নাচতে লাগল। নতুন কোনও শুভ খবর আসবে আজ! কী সেই খবর? তার মন আনন্দে ভরে উঠল।

এদিকে সেদিন মগধরাজ বিম্বিসারের ঘুম খুব ভোরে ভেঙে গেছে। তাঁর বয়স এখন পঞ্চাশ বছর ছাড়িয়েছে। তিনি এবং বুদ্ধ হলেন সমবয়স্ক। বয়স পঞ্চাশ হলেও রাজার দেহ সুঠাম এবং সুন্দর। তিনি এখনও যেকোনও অস্ত্রচালনায় দক্ষ। ঘুম থেকে উঠে তিনি রাজপুরীর অলিন্দে এসে দাঁড়ালেন। সাতমহলা পাথরের রাজপ্রাসাদ। পঞ্চপর্বতের দিকে সেই প্রাসাদের মুখ। বৈভার, বৈপুল্য, রত্নগিরি, ইষিগলী এবং গিজ্ঝকূটーএই পাঁচটি পাহাড় রাজপুরীর অলিন্দে দাঁড়ালে চমৎকারভাবে দেখা যায়। পাহাড়ের বুকে সকালের সূর্যোদয় দেখে রাজার মন আনন্দে ভরে উঠল।

মহারানী বৈদেহীর সঙ্গে বহুকাল আগে তাঁর কয়েকজন অনুচরী মগধ রাজ্যে এসেছিল। তারা কেউ ছিল রানির সখী, কেউ বা তার দাসী। দাসী শুভাগতা ছিল অপূর্ব সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী। বিম্বিসার বহুবার তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি দাসী শুভাগতাকে মর্যাদা দিয়ে একটি পৃথক ভবনে রেখে রানির সমান সম্মান দিয়েছেন। দাসী শুভাগতার গর্ভে বিম্বিসারের একটি কন্যা জন্মেছে। তার নাম কনকলতা, তার বয়স এখন ষোলো বছর।

রানিদের প্রাসাদগুলোর সঙ্গে বিম্বিসারের প্রাসাদ সংযুক্ত। সকাল হতেই শুভাগতা স্নান সেরে অলিন্দে এসে দাঁড়াতেই সামনে মহারাজকে দেখতে পেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিম্বিসারকে প্রণাম জানালেন। শুভাগতার আমন্ত্রণে রাজা সেদিন তাঁর প্রাসাদের কক্ষে গিয়ে বসলেন। সবে ভোর হয়েছে। শুভাগতার কক্ষের জানালা থেকে বহুদূরে রাজপুরীর ভৃত্যদের আবাসগুলো দেখা যায়। এমন সময় কুম্ভঘোষক রোজকারমতো কলসির ভেতর মুখ রেখে গম্ভীর স্বরে ভৃত্যদের ঘুম থেকে ডাকতে লাগল। রাজা দূর থেকে কুম্ভঘোষকের গলা শুনে অবাক হয়ে রানিকে বললেন, “এ কে?”

রানি হেসে বললেন, “ও তো ঘোষক! রাজবাড়ির ভৃত্যরা কয়েক বছর হল ওকে ওদের সেবক হিসেবে রেখেছে। ছেলেটি বড়ো সদাশয়। সবসময় ওর মুখে হাসি। কোনও কাজে আপত্তি নেই।”

রাজা বললেন, “আমি ছেলেটিকে দূর থেকে একবার দেখতে চাই।”

রানি শুভাগতা বললেন, “এ আর এমনকি! ওই জানালার পাশে দাঁড়ালেই ওকে আপনি সহজেই দেখতে পাবেন।”

রাজা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ঘোষককে দেখে বিস্মিত স্বরে বারবার বলতে লাগলেন, “আশ্চর্য! ভারি অদ্ভুত!”

শুভাগতা তা শুনে বললেন, “কেন মহারাজ? কী হয়েছে? আমাকে বলুন!”

বিম্বিসার বললেন, “শুভাগতা, আমি একসময় দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রজ্যোতিষ চর্চা করেছিলাম। তাতে মানবদেহের চিহ্ন বা লক্ষণ দেখে অনেক কথা জানা যায়। তাছাড়া ধনশালী ব্যক্তির লক্ষণশাস্ত্রও আমি বিশেষভাবে শিক্ষা করেছি। এই ঘোষক যুবকের গলার স্বর একজন সুবিশাল ধনী ব্যক্তির স্বরের মতো। তাছাড়া ওর চলা, হাঁটার ভঙ্গিমা সবই একজন জ্ঞানী ও উচ্চবংশীয় মানুষের মতো। এই যুবক নীচকুলজাত হতেই পারে না। এ কী করে ভৃত্যদের ভৃত্য হয়েছে? এ দেখছি এক বিস্ময়!”

“'মহারাজ, আপনি যদি অনুমতি করেন, আমি এই যুবকের সম্পর্কে সমস্ত খোঁজখবর নিতে শুরু করব।”

“বেশ শুভাগতা, আমি এই কাজের ভার তোমাকে দিলাম। তিনদিন পরে কী কী জানতে পারলে আমাকে অবশ্যই জানাবে। এই কাজের জন্য আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব।”

কথামতো কাজে লেগে গেলেন রানি। তিনি একটু পরেই ভৃত্যদের কয়েকজনকে তাঁর মহলে ডেকে পাঠালেন।


চার


ভৃত্যদের দলটিতে নানা বয়সের মানুষ আছে। শুভাগতা সব থেকে বয়স্ক ভৃত্যকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের পরিচারক ওই ঘোষকের আসল নাম কী?”

“আজ্ঞে জানা নেই মাতা।”

“সে কোথা থেকে এখানে এসেছে?”

“তাও বলা শক্ত মাতা। সে ঘেসেরাদের একটি দলের সঙ্গে আমাদের কাছে প্রথম এসেছিল। ঘেসেরার দল তখন ওর খুব প্রশংসা করেছিল। তখন ওর বয়সও ছিল একেবারে কম। দেখে মায়া হয়েছিল, তাই ওকে আমরা কাজ দিয়েছিলাম। তবে সত্যিই সে কাজের ছেলে। মুখে কথা কম বলে আর আমরা কিছু বলা মাত্র সেই কাজটি করে ফেলে।”

“বেশ। তোমরা তার পূর্বপরিচয়, নাম ইত্যাদি জেনে আসবে এবং আগামীকাল আমাকে এসে বলবে।”

পরেরদিন ভৃত্যদের দলপতিকে আবার ডেকে পাঠালেন রানি। “বলো, কী খবর এনেছ।”

“আজ্ঞে সে বলেছে, সে বৈশালীর কলন্দক গ্রামের বাসিন্দা ছিল। ওর নাম ছিল বপ্প। পিতার নাম কীলক। ওরা নীচু জাতি। গ্রামের শেষপ্রান্তে ওদের গৃহ ছিল। হঠাৎ আগত এক ভয়ানক রোগে ভেদবমিতে ওর পরিবারের সবাই একসঙ্গে মারা গেছে। একমাত্র ও-ই পালিয়ে প্রাণে বেঁচেছে।”

রানি সঙ্গে সঙ্গে দু’জন চরকে কলন্দক গ্রামে পাঠালেন। অনেক অনুসন্ধান করেও সেই গ্রামে ওই নামে কোনও পরিবারের খোঁজ পাওয়া গেল না যাদের পরিবারের সকলে রোগে মারা গেছে।

রানি তখন রাজার কাছে গেলেন এবং সবকথা জানালেন। রাজা এবার আরও দু’জন গুপ্তচরকে ঘোষকের খবর নিতে পাঠালেন। গুপ্তচরেরা ঘোষকের ছবি এঁকে চারদিকে খোঁজ করতে লাগল। একজন বিদেশি বণিক ঘোষকের ছবি দেখে চমকে উঠে বললেন, “ইনি হচ্ছেন মেঘীয় শ্রেষ্ঠী। তবে শুনেছি উনি বহুবছর আগেই মারা গেছেন। তবে এটি কি তাঁর পুত্র?”

কথাগুলো শুনে এক মুহূর্ত দেরি না করে তারা বিম্বিসারকে এসে খবর দিল। রাজা গভীর চিন্তামগ্ন হলেন। চর দু’জন গোপনে ঘোষকের পাকশালা ও কক্ষের চারপাশও ঘুরে দেখল। তার রান্না করার জায়গা, পোশাক, পরিচ্ছদ সবই অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। নীচু জাতের মানুষদের মতো অপরিচ্ছন্ন বা অগোছালো নয়। রাজা বুঝলেন, ঘোষক কোনও উচ্চবংশীয় সন্তান। রাজা তবুও নিঃসন্দেহ হতে চাইলেন। তিনি এবার মেঘীয় শ্রেষ্ঠীর প্রতিবেশীদের ডেকে আনলেন। তারা দূর থেকে দেখে জানালেন, কুম্ভঘোষকই হল মেঘীয় শ্রেষ্ঠীর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া পুত্র সুমন্ত। নিঃসংশয় হয়ে রাজা এবার রানি শুভাগতার প্রাসাদে গেলেন।

কনকলতা এখন পূর্ণ যৌবনা। এখনই তার বিবাহ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সে দাসীকন্যা, তাই তার জন্য উপযুক্ত পাত্র পাওয়া বেশ কঠিন। কনকলতা অত্যন্ত যত্নে মানুষ হয়েছে, সাধারণ কোনও পরিবারে তার বিবাহ দেওয়াও যাবে না। তাছাড়া তাতে রাজারও অপমান। সবদিক ভেবে বিম্বিসার একটি সিদ্ধান্ত নিলেন।

প্রাসাদের কক্ষে কনকলতা তখন তার সহচরীদের সঙ্গে কাঠের পুতুল নিয়ে খেলা করছিল। রাজা এসে দাঁড়াতেই কনকলতার সহচরীরা যে যেদিকে পারল দৌড়ে পালাল। কনকলতা এসে তার পিতাকে প্রণাম জানাল। বিম্বিসার বললেন, “কনকলতা! তোমার আর এখন পুতুল খেলার বয়স নেই। এখন তোমাকে অন্য পরিবারে গিয়ে বসবাস করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। আজ তোমাকে এক আশ্চর্য মানুষের কথা বলব। তুমি মন দিয়ে শোনো।”

কনকলতা পিতার আসনের নিচে বসে তাঁর কথা শুনতে লাগল। বিম্বিসার বললেন, “এই চিত্রটা দেখো।”

বিম্বিসারের হাতে তখন চিত্রকরের আঁকা কুম্ভঘোষকের একটি ছবি। কনকলতা একবার তাকিয়ে তাড়াতাড়ি তার মুখ নামিয়ে নিল। পিতার সামনে কোনও পুরুষের চিত্র দেখা অশোভনীয়। বিম্বিসার বললেন, “এই মানুষটি হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রার অধিকারী। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সে নিজের পরিচয় গোপন করে রেখেছে এবং তার সব ধনসম্পদও গুপ্ত রেখেছে। এত বিত্তশালী হয়েও সে ভৃত্যদের সেবক হয়ে নিজের জীবন কাটাচ্ছে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সে একজন বিখ্যাত শ্রেষ্ঠীর পুত্র এবং এই যুবকের চরিত্রও অতি উত্তম। সে সৎ, কর্মবীর, পরোপকারী এবং সুদর্শন। আমি এই যুবকের সঙ্গেই তোমার বিবাহ দিতে চাই। এতে কি তোমার আপত্তি আছে?”

পিতার কথা শুনে কনকলতা লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। তখন রানি এসে বললেন, “মহারাজ, আপনার ইচ্ছেই আপনার কন্যার ইচ্ছে। কিন্তু ঘোষক যে শ্রেষ্ঠীপুত্র তা সবার কাছে প্রমাণ করা দরকার। না হলে তাকে রাজকন্যা সমর্পণ করলে আপনার মান থাকবে না। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে, অভয় দেন তো বলি।”

“বলো রানি। আমি জানি তুমি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী।”

“মহারাজ, আমি আমার কন্যাকে নিয়ে ছদ্মবেশে ঘোষকের ঘরে গিয়ে থাকতে চাই। একসঙ্গে বসবাস না করলে তার কাছ থেকে প্রকৃত সত্য জানা যাবে না।”

বিম্বিসার বললেন, “আমি তোমাকে প্রয়োজনমতো যেকোনও কাজ করার অনুমতি দিলাম। যদি কোনোভাবে ঘোষকের সেই বিশাল ধনরত্ন তুমি উদ্ধার করতে পারো, তবে আমি নিজে তোমাকে একহাজার স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেব।”

পরেরদিন ভৃত্যরা কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর রানি একটি ছেঁড়া কাপড় পরে, গায়ে কালিঝুলি মেখে কনকলতাকে সঙ্গে নিয়ে ঘোষকের ঘরের সামনে এসে কান্নাকাটি করতে লাগলেন। ঘোষক তার রান্নাঘরে তখন যবাগু তৈরি করছিল। সে কান্নার শব্দ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

“কী হয়েছে মা? কাঁদছেন কেন?”

“আমার স্বামী আমাদের দূর করে দিয়েছেন বাবা! আমার এই সুন্দরী মেয়েটাকে নিয়ে এখন আমরা কোথায় আশ্রয় পাব? তাই কাঁদছি। পথে কত বিপদ। দস্যু তস্করের ভয়! এখন কী করব বুঝতে পারছি না।”

“আপনাদের কোনও আত্মীয় পরিজন নেই?”

“না বাবা। থাকলে কি আর রাস্তায় বসে কাঁদতাম!”

“বেশ। একটা দিনের জন্য আপনারা আমার ঘরে থাকুন। আমি আজ বাইরের উঠোনে শুয়ে থাকব। আগামীকালই কিন্তু আপনারা অন্যত্র চলে যাবেন। আমি একা থাকি, আর দ্বিতীয় কোনও ঘরও নেই যে আপনাদের থাকতে দেব।”

“আচ্ছা বাবা। অনেক ভালো কাজ করলে। আমাদের মানসম্মান রক্ষা করলে তুমি। এই উপকার আমি জীবনেও ভুলব না।”


পাঁচ


রানি ঘোষকের ঘরে থাকবার স্থান পেলেন। তিনি কনকলতাকে বললেন, “শোনো মা কনকলতা, ইনিই হলেন তোমার ভবিষ্যৎ স্বামী। এর কাছে কখনও লজ্জা করবে না, বরং এর সেবাযত্ন করবে।”

কনকলতা তবুও মাথা নিচু করে রইল। সে স্বভাবে অত্যন্ত লাজুক, তবে তার কুম্ভঘোষককে ভালো লেগেছে। মানুষটা নিরীহ এবং পরোপকারী। মায়ের বলা মিথ্যে কথাগুলো বিনা বিচারে মেনে নিয়ে তাদের থাকতে দিয়েছে।

পরেরদিন রানি সকাল হতেই রান্নার জ্বালানি সমস্ত কাঠে জল ঢেলে দিলেন। তারপর ঘোষককে বন থেকে কাঠ আনতে বললেন। কাঠ ভেজা দেখে ঘোষক অবাক হয়ে গেল। রানি বললেন, “আমার অসাবধানতায় কাঠে জল পড়ে গেছে যখন, আজ আমিই রান্না করব। তুমি বনে যাও। এক বোঝা কাঠ কেটে আনো।”

ঘোষক আর কী করে, বনে গেল কাঠ আনতে। আজ সে এদের চলে যেতে বলেছিল। কিন্তু আশ্চর্য! মহিলা একবারও চলে যাবার নাম করছে না!

এদিকে রানি ঘোষক চলে যেতেই রাজবাড়ির দাসীদের দিয়ে রাজবাড়ির পাকশালা থেকে নানারকম ঘি মিশ্রিত খাবার, পোলাউ, মাংস, মাছ, পিঠে ইত্যাদি আনিয়ে ঘরে সাজিয়ে রাখলেন। ঘোষক তাড়াতাড়ি কাঠ এনে দেখল, রানির রান্নাবান্না সারা হয়েছে। চতুর্দিকে খাবারের অপূর্ব সুগন্ধ! ঘোষক তো একেবারে অবাক।

রানি বললেন, “আমি কাঠের গাদার নিচ থেকে শুকনো কাঠ পেয়ে রান্না করে ফেলেছি।”

“এতসব উপকরণ আপনি কোথায় পেলেন? আমি খুব গরিব মানুষ, আমার রান্নাঘরে ঘিও নেই, এতসব আমিষও নেই।”

“এইসব আমিষ খাবার একজন ভিক্ষুক আমাকে আজ উপহার দিয়ে গেছেন, আর রান্নায় আমি ঘি দিইনি। আমার উপর দেবতাদের আশীর্বাদ আছে। আমি যা রান্না করি, তাতেই এমন সুগন্ধ বের হয়।”

ঘোষক সরল মনে রানির কথা বিশ্বাস করল। তার খুব খিদেও পেয়েছিল। ভালো ভালো খাবারের গন্ধ পেয়ে সে আর থাকতে পারছিল না। রানি খাবার বেড়ে দিতে সে তাড়াতাড়ি খেতে বসে গেল। খেতে খেতে ঘোষকের চোখ জলে ভরে উঠল। তার হঠাৎ তার মায়ের রান্নার কথা মনে পড়ে গেল। এমন করে তার মা তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে খেতে দিতেন। এতদিন নিজের রান্না সেদ্ধ যবাগু খেয়ে খেয়ে তার মুখ পচে গেছিল। বহুবছর পরে এমন ভালো খাবার খেয়ে ঘোষক ভীষণ খুশি হল। তবুও অতিথিকে দিয়ে কাজ করাতে নেই বলে সে বলল, “মা! কাল আর আপনাকে রান্না করতে হবে না। কাল আমিই রান্না করব।”

“না না বাছা, আমার রান্না করার অভ্যাস আছে। আগে একবার আমি বৈশালীর রাজার পাকশালায় কাজ করেছিলাম। আমার রান্না করতে বেশি সময়ও লাগে না।”

রানি আগের রাতে দাসীকে খবর দিয়ে রেখেছিলেন। সে রানি উনুন জ্বালানোর পরেই গোপনে নানারকম খাবার এনে পাকশালায় হাজির করল।

খেতে বসে ঘোষক একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। সে ভাবল, মায়েদের হাতে সত্যিই জাদু থাকে। কত সামান্য উপকরণে কী অসামান্য রান্না করতে পারেন তারা! সে শুভাগতার রান্না খেয়ে ধন্য ধন্য করতে লাগল। কনকলতা রানির ছলচাতুরি জানে, সে ঘোষকের প্রশংসা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে। রানি তাকে ধমক দিয়ে চলে যেতে বলেন, না হলে সবকথা ফাঁস হয়ে যেতে পারে।

এভাবে ঘোষকের ঘরে রানি আর কনকলতার পাকা জায়গা হয়ে গেল।


একমাস পরে রানি একদিন বললেন, “বাছা ঘোষক! কনকলতার জন্য একটা পাত্র পেয়েছি। খুবই সুপাত্র। আগামীকাল বিকেলে তারা কনককে আশীর্বাদ করতে আসবেন।”

রানির কথামতো রাজবাড়ির দাসীরা পাত্রের আত্মীয় সেজে এল, সঙ্গে পাত্র সেজে এল একটি কানা ও খোঁড়া বৃদ্ধ। একজন ভিখারিকে দাসীরা কনকের পাত্র সাজিয়ে এনেছে। ঘোষক পাত্র দেখে একেবারে হতবাক! কনকলতাকে দেখে তার বারবার নিজের বোন সুমগধিকে মনে পড়ে। এমন সুন্দর মেয়ের জন্য এমন কুপাত্র! ঘোষক রানিকে ডেকে তা জানাতেই রানি পাত্রপক্ষদের অপমান করে দূর করে দিলেন। ঘোষক এতে মনে মনে খুশি হল।

রানি এরপর ঘোষকের কাছে এসে বললেন, “বাছা ঘোষক! তোমার কথা শুনে পাত্র যে বিদায় করে দিলাম! এখন কী উপায় হবে? আমার মেয়ের কি তবে বিয়ে হবে না?”

ঘোষক বলল, “বেশ মা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি ঠিক আমার বোনের জন্য পাত্র খুঁজে আনব।”

শুনে রানি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন, আর কনকলতা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল। ঘোষক কিছুই বুঝতে পারল না। কনকলতাকে ঘোষক প্রথম থেকেই নিজের বোনের আসন দিয়েছে, তাই তো সে বলেছে, অন্য পাত্র খুঁজে আনবে। তা শুনে কনকলতা কাঁদছে কেন? তবে কি ওই কানা বৃদ্ধকেই কনকলতার বেশি পছন্দ ছিল? ঘোষক ঠিক করল, পরেরদিন যেখান থেকে পারে সেই কানা পাত্রকেই সে খুঁজে আনবে।


ছয়


সকাল হতেই ঘোষক কানা ও খোঁড়া সেই বৃদ্ধের খোঁজে চারদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। সারাদিন খুঁজেও সে কোথাও তাকে পেল না। তখন সে ভাবল, এই পথেই যখন এসেছি, একবার বুদ্ধের চরণে প্রণাম জানিয়ে যাই।

বেণুবন বিহারে বর্তমানে বুদ্ধ এসেছেন। তিনি মাঝে-মাঝেই জেতবন বিহার, কখনও পূর্বারামে, কখনও আবার ঘোষকারামে থাকেন। কৌশাম্বীর ঘোষক শ্রেষ্ঠী সেই বিহারটি তৈরি করে দিয়েছেন। ঘোষক শ্রেষ্ঠী ছিলেন অনাথ। সেখান থেকে তিনি বিশাল ধনের অধিকারী হয়েছিলেন, অথচ সেও সমনামী, কারণ তার নামও ঘোষক। কিন্তু সে সব থেকেও নিঃস্ব, অনাথ। ঘোষকের মনে নানা পুরনো কথা ভেসে আসতে লাগল এবং সে ধীরে ধীরে বিহারের ভেতর এগিয়ে যেতে লাগল।

কিছুটা দূরে একটি বৃক্ষ-চাতালে বুদ্ধ বসে বসে ভিক্ষুদের উপদেশ দিচ্ছিলেন। তিনি ঘোষককে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখেছেন। ঘোষক বুদ্ধকে দূর থেকে প্রণাম করল। বুদ্ধ বললেন, “কুম্ভঘোষক! শোক কোরো না। সময়ের অপেক্ষা করো। সর্বদা সত্য ও ধর্মের পথে থেকো।”

ঘোষক বুদ্ধকে প্রণাম করে চলে যাবার সময়ে বিহারের পশ্চিম দুয়ারের সামনে সেই কানা ও খোঁড়া ব্যক্তিটিকে খুঁজে পেল। ঘোষকের মনে তখন আনন্দ আর ধরে না। সে তাড়াতাড়ি লোকটিকে চেপে ধরল। লোকটি তখন বিহারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছিল। সে কিছুতেই যাবে না, ঘোষকও তাকে ধরে টানাটানি করতে লাগল। শেষে ঘোষক তার কাপড়ের ভেতর থেকে একটি সোনার মুদ্রা বের করে বলল, “এই মুদ্রাটি রাখো, আর দয়া করে আমার বোনকে বিয়ে করো। সে তোমার জন্য কাঁদছে।”

ভিখারি সোনার মুদ্রা দেখে অবাক হয়ে গেল। আসলে ভিখারিও ছিল রাজার চর। নানা সময়ে সে রাজার জন্য খবর সংগ্রহ করে আনে এবং পরিবর্তে পুরস্কার পেয়ে থাকে। সে এবার ঘোষকের সঙ্গে যেতে রাজি হল।

রানি ভিখারিকে আবার দেখেই একেবারে জ্বলে উঠলেন। তাকে তিনি দূর করে দিলেন। ভিখারি সোজা রাজার কাছে গিয়ে ঘোষকের দেওয়া মুদ্রাটি দেখাল। সেনাপতির দেওয়া মুদ্রা ও ভিখারির মুদ্রা একইরকম দেখতে। রাজা দুটি মুদ্রা এক জায়গায় রাখলেন।

রানি ঘোষককে বললেন, “বাছা, কনকলতাকে দেখতে কেমন?”

ঘোষক কনকলতার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ্ঞে খুব সুন্দর।”

“বাছা, তুমি আমার পুত্রের মতো, তবে পুত্র নও। তাই কনকও তোমার বোন নয়। তুমি ওকে বিয়ে করো। এতে গরিবের একটা মেয়ে উদ্ধার হবে, আর আমিও শান্তি পাব। তোমার মতো সুপাত্র আমি আর কোথাও পাব না।”

ঘোষক ভেবে দেখল, এর আগে কনকলতার বিয়ের কথা শুনে তার মনে একটু একটু দুঃখ হয়েছিল। আবার এখন ভিখারিকে দূর করে দেওয়াতে তার মনে বেশ আনন্দও হয়েছে। নিজের মনের কাছে একথা স্বীকার করতে দোষ নেই।

ঘোষক কিছু বলছে না দেখে রানি আবার বললেন, “বাছা ঘোষক, তোমার যেমন জীবনসঙ্গী দরকার, আমার মেয়েরও তেমন সুপাত্র প্রয়োজন। এখন তোমাদের চার হাত এক করতে পারলে আমি নিশ্চিন্ত হই।”

এরপর বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। রানি বললেন, “বাছা, আমি স্বপ্ন দেখেছি, আমার মেয়ের বিয়েতে একশো লোক বসে বিশ পদে ভোজ খাচ্ছে। এই ইচ্ছে পূরণ না হলে আমার মন ভেঙে যাবে।”

ঘোষক কথা দিল, সে সব ব্যবস্থা করবে।

ঘোষকের বিয়েতে চাকরদের খুব আনন্দ। তারা বিয়ের সব কেনাকাটার দায়িত্ব নিয়েছে। ঘোষককে তারা বলল, “বিয়ের খাওয়াদাওয়ার জন্য ঘি, দুধ, মধু, মাছ, মাংস, চাল এইসব যা যা আনতে হবে আমাদের বলবে, আমরাই কিনে আনব।”

ঘোষক চাকরদের হাতে খরচের জন্য তিনটে সোনার মুদ্রা দিল। চাকরদের সর্দারকে রানি আগেই সব বলে রেখেছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই মুদ্রা রানির হাতে এনে সে জমা করল। রানি বিশ্বাসী দাসীকে দিয়ে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। রাজা তখন দাসীর হাতে একটি গোপন লিপি পাঠালেন রানিকে। রানি সেই লিপি পাঠ করে খিলখিল করে হাসলেন।

এদিকে মহা ধুমধাম করে কুম্ভঘোষকের সঙ্গে কনকলতার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের রাতে একশোর চেয়েও বেশি লোকে ভোজ খেল। ছদ্মবেশে রাজা, সেনাপতি, মন্ত্রী সবাই বিয়েতে ব্রাহ্মণ সেজে উপস্থিত থাকলেন। বর ও বধূ সবার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিল।

বিবাহ সম্পন্ন হতেই ঘোষকের বাড়িটি ঘিরে ফেলল রাজার সেনারা। তারা রাজার আদেশনামা দেখিয়ে ঘোষক, কনকলতা ও তার মাকে বন্দী করে রাজপুরীতে নিয়ে গেল।

বন্দী ঘোষক কিছুই বুঝতে পারছে না। ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেছে। নবপরিণীতা বধূকেও সে আর দেখতে পাচ্ছে না এবং তার মাকেও না। এরা দু’জন কোথায় গেল? ঘোষককে একটি ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তবে সেটা বন্দীশালা নয়।

পরদিন ভোর হতেই ঘোষককে রাজদরবারে নিয়ে যাওয়া হল। ঘোষক অবাক বিস্ময়ে দেখল, কনকলতা ও তার মা রাজার দু’পাশে বসে আছে। তাদের পরনে সোনার জরির কারুকার্য করা বহুমূল্য পোশাক, সারা শরীর ভারী ভারী সোনার গয়নায় ঢাকা। রাজার কর্মীকেরা সবাই তাদের প্রণাম জানাচ্ছে। ঘোষক এবার সব বুঝতে পারল। এতদিন রানিই তার মেয়েকে নিয়ে ছদ্মবেশে তার ঘরে অতিথি হয়ে থেকেছেন!

রাজা গম্ভীর স্বরে বললেন, “তোমার কাছে কতগুলি স্বর্ণমুদ্রা আছে?”

“আজ্ঞে আমার কাছে তো কিছু নেই।”

“তাহলে এগুলো কী?”

রাজা তাঁর কাছে জমা হওয়া স্বর্ণমুদ্রাগুলো দেখালেন। সেগুলো দেখে ঘোষকের মুখ শুকিয়ে গেল। সে বলল, “মহারাজ যদি আমাকে প্রাণে না মেরে ফেলেন, তাহলে সব বলব।”

“তোমাকে প্রাণে কেন মেরে ফেলব? তুমি আমার জামাতা। কনকলতা আমার কন্যা। ইনি রানি শুভাগতা, কনকলতার মা। তোমার ধন আমি অধিকার করব না। তোমার ধন তোমারই থাকবে, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। এখন বলো ধন কোথায় রেখেছ।”

এরপর রাজার ঢাকা রথে চড়ে লোকজন গিয়ে সেই সমস্ত ধন আহরণ করে আনল। রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করা হল, কুম্ভঘোষকের অভূতপূর্ব ধনভাণ্ডার প্রজাদের দেখার জন্য উন্মুক্ত আছে। তখন দলে দলে রাজ্যের প্রজারা এসে দূর থেকে সেই ধনরাশি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। সবাই বলাবলি করতে লাগল, এত ধনের অধিকারী ঘোষক কীভাবে ভৃত্যদের অধীনে থেকে এতদিন কাজ করতেন? তাদের প্রশ্ন আর কৌতূহল যেন ফুরাতেই চায় না। রাজা সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মহামান্য সভাসদ ও বিশিষ্ট প্রজাবর্গ, এবার আপনারাই বলুন এত ধনের অধিকারী ঘোষককে আমি কীভাবে সম্মান জানাতে পারি।”

প্রজারা সমস্বরে বলল, “মহারাজ, কুম্ভঘোষককে শ্রেষ্ঠী পদ দেওয়া উচিত।”

রাজা বললেন, “আমারও তাই মত।”

রাজা তখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষককে শ্বেত ছত্র দান করে নগরের বিশিষ্ট শ্রেষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করলেন। ঘোষক তার ধনরত্ন থেকে বেশ কিছুটা অংশ রাজকোষে দান করল। রাজা এবার কন্যা ও জামাতাকে নিয়ে আনন্দ উৎসবে মাতলেন।


সন্ধ্যা আগত। দলে দলে মানুষ ছুটছেন বেণুবনের দিকে, সেখানে গিয়ে বুদ্ধের সুধামাখা ধর্মোপদেশ শুনতে, তাঁকে দর্শন করতে ও শ্রদ্ধা জানাতে। প্রজারা ফুলের মালা, সুগন্ধী ধূপ ইত্যাদি নিয়ে উদ্যানের পথে চলেছে। বিম্বিসারও পায়ে হেঁটে রানি, কন্যা ও জামাতাকে নিয়ে বুদ্ধের পদতলে প্রণাম জানাতে চলেছেন।

বিহারে পৌঁছে বুদ্ধের পায়ে প্রণাম জানিয়ে বিম্বিসার বুদ্ধকে সমস্ত কথা খুলে বললেন। “প্রভু! এই পরিশ্রমী মানুষটি এত ধন থাকা সত্বেও একটা সাধারণ কাপড় পরে দিনমজুরি করে জীবন কাটাচ্ছিল।”

সব শুনে বুদ্ধ কুম্ভঘোষকের উদ্যোগ ও পরিশ্রমের প্রশংসা করে বললেনー

“উট্ঠানবতো সতিমতো সুচিকম্মস্স নিসম্মকারিনো।

সঞ্ঞতস্স চ ধম্মজীবনো অপ্পমত্তস্স যসো’ভিবড্ঢতি।।”

অর্থাৎ, উদ্যমী, স্মৃতিমান, নির্মল-হৃদয়, কর্তব্য সচেতন, সংযত, ধর্মপরায়ণ ও আসক্তিশূন্য ব্যক্তির যশ ক্রমশ বর্ধিত হয়।

মানুষের জীবন হল এক বিরাট পরিব্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র। এখানে যিনি উদ্যোগী ও বিবেকবান ও সংযত-ইন্দ্রিয় হয়ে কালযাপন করেন তিনিই সবার প্রশংসা লাভ করেন।

গাথাটির অবসানে কুম্ভঘোষক বুদ্ধের পদতলে প্রণতি জানিয়ে তাঁর শরণাগত উপাসক হল। বুদ্ধের কথা শুনতে শুনতে সে কেমন তন্ময় ও বিবশ হয়ে পড়ছিল।

সম্বিৎহারা ঘোষককে দেখে বুদ্ধ বললেন, “কুম্ভঘোষক আজ সাধনার প্রথম ধাপ সহজেই উত্তীর্ণ হয়েছে। সে স্রোতাপত্তি ফল লাভ করেছে।”

___

অঙ্কনঃ https://www.scorpydesign.com/


No comments:

Post a Comment