আলোর দিশারিঃ ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিদ দেবলা মিত্র - ড. উৎপল অধিকারী

ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিদ দেবলা মিত্র

ড. উৎপল অধিকারী



সমগ্র পৃথিবীব্যাপী পুরাতত্ত্ব গবেষণায় পুরুষদের আধিপত্য চিরকালীন। দেবলা মিত্র এমন একজন মহিলা বিজ্ঞানী যিনি ভারতীয় পুরাতত্ত্বের সর্বোচ্চ পদে উন্নীত হয়েছিলেন নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায়, কর্মকুশলতা ও দক্ষতায় এবং সর্বোপরি মানসিক দৃঢ়তার জোরে। তিনি ছিলেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রথম মহিলা ডাইরেক্টর জেনারেল ও ইউনেস্কোর উপদেষ্টা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিরভিমানী, নিরহংকার, সাদামাটা ও প্রচারবিমুখ মানুষ। কেবল দেশে নয়, বিদেশেও তাঁর সুখ্যাতি ও সুনাম ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯২৫ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের খুলনার বিখ্যাত মিত্র পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। খুলনায় প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পূর্ণ করে তিনি কলকাতায় আসেন ও ১৯৪০ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন প্রথম বিভাগে দ্বাদশ স্থান পেয়ে। ১৯৪২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন, এক্ষেত্রে তিনি ১৯তম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে বি.এ এবং ১৯৪৬ সালে এম.এ পাশ করলেন। এই ক্ষেত্রে তিনি প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এম.এ-তে বিষয় ছিল ‘অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার’। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি তাঁর গবেষণাকার্য সম্পাদন করেন। ১৯৬৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ‘গ্রিফিথ পুরস্কার’ এবং ১৯৭৫ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের ওপর তাঁর গবেষণা ছিল বিশ্বমানের। তিনি যেমন সুকর্মী ছিলেন, তেমনি ছিলেন সুলেখিকাও। তাঁর ইংরেজিতে লেখা ও সম্পাদিত মোট বইয়ের সংখ্যা ১২টি। লেখালেখির জন্য ও তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছিলেন ‘হরসুন্দরী রৌপ্যপদক’, ‘ইনগ্লিস পুরস্কার’, ‘রায় রাধিকাপ্রসন্ন মুখার্জি স্বর্ণপদক’ ও ‘জ্যোৎস্না পাঠক স্মৃতি পুরস্কার’ ইত্যাদি। ১৯৫২ সালে তিনি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণে যোগদান করেন। সুদীর্ঘ ৩১ বছর ছিল তাঁর উজ্জ্বল কর্মজীবন। ১৯৭৫ সালে তিনি ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘এ.এস.আই’-এর সর্বোচ্চ পদ ‘ডাইরেক্টর জেনারেল’ হন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ছিল উড়িষ্যার উদয়গিরি, খণ্ডগিরি ও রত্নগিরি অঞ্চলে খননকার্য, সমগ্র পূর্ব ভারতব্যাপী ভারতের বৌদ্ধবিহার ও সঙ্ঘগুলিতে তিনি খননকার্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশের বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক কীর্তি যথা মন্দির, মসজিদ, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মস্থানের সংরক্ষণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অন্যান্য অনেক কাজের মধ্যে আরো কয়েকটি মহান কাজ হল কোনারক মন্দির, ভুবনেশ্বর মন্দির, উদয়গিরির গুহাকার্য, গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের মসজিদ ও সমাধি স্থান সংরক্ষণ, ত্রিপুরার উদয়পুরের মন্দির ইত্যাদি সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। ডক্টর মিত্র এশিয়াটিক সোসাইটি, ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়াম, সেন্ট্রাল অ্যাডভাইজারি বোর্ড অফ আর্কিওলজি এবং ন্যাশনাল কমিটি ফর লুম্বিনী ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট সহ আরো অনেক প্রজেক্টের এর সঙ্গে সারাজীবন নিজেকে সংযুক্ত রেখেছিলেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন স্বকীয়তায় ভাস্বর। পুরাতত্ত্ব, মিউজিয়াম, মনুমেন্ট, সৌধ ইত্যাদি দর্শনের জন্য তিনি প্রায় সারা বিশ্ব চষে ফেলেছিলেন। গিয়েছিলেন রোম, গ্রিস, লন্ডন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি। তিনি পড়াশোনা করতে ভীষণ পছন্দ করতেন। তাই নিজের প্রচেষ্টাতেই তিনি শিখেছিলেন ফরাসি ভাষা। তিনি প্যারিস গিয়েছিলেন আর্ট অফ কলাম্বিয়া নিয়ে পড়াশোনা করতে, কম্বোডিয়ার শিল্প এবং স্থাপত্য নিয়ে তাঁর গভীর পড়াশোনা ছিল। তাঁর খননকার্যের ফলে উড়িষ্যার ‘পুষ্পগিরি বিশ্ববিদ্যালয়’ সম্বন্ধে নানান অজানা তথ্য আমরা জানতে পারি। তিনি দাবি করেছেন এই পুষ্পগিরি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তিনি দেশি-বিদেশি প্রায় ১১৬টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন।

সবদিক সঠিক বিচার করে বলা হয় পুরাতত্ত্ব গবেষণায় বাঙালি বিজ্ঞানী হিসাবে ডক্টর দেবল মিত্র এক মহীরুহ। সকল মানুষ তাঁকে আরো বেশি বেশি করে মনে রাখবে, এ আশা করা  যেতেই পারে।


___


No comments:

Post a Comment