ছোটো গল্পঃ কালোমানিকের গল্প - চুমকি চট্টোপাধ্যায়



কালোমানিক কাকড়াশি স্কুল থেকে ফিরে খুব উত্তেজিত হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মা, তুমি বলো আমাকে, ভগবান এরকম পার্শিয়াল কেন?”

কালোমানিকের মা একটু ঘাবড়ে গেল। পার্শিয়াল ব্যাপারটা ঠিক কী, মাথায় ঢোকেনি তার। আবার ভগবানের বিরুদ্ধে বলা কথা! প্রশংসা না অভিযোগ, না বুঝলে উত্তর দেবে কী? গলাটা ঝেড়ে নিয়ে কালোমানিকের মা বলল, “কী বলতে চাইছিস বাবু, পরিষ্কার করে বল।”

কালোমানিক বিরক্তির স্বরে বলল, “গায়ের রং তো আমাদের কালো করেই পাঠিয়েছে, যতই সাবান মেখে চান করো না কেন, দেখলে মনে হয় নোংরা। তার ওপর গলার আওয়াজ এমন দিয়েছে যে লোক শুনলে তাড়া করে। কেন বলো তো মা?

“আবৃত্তি, গানের কত কম্পিটিশন হয় স্কুলেーকোকিল, ময়না, টিয়া, দোয়েল আরও সবাই পার্টিসিপেট করে। কিন্তু আমি তো পারি না। সবাই বলে, ‘এই, কানের কাছে ক্যা ক্যা করিস না তো!’ এটা কি ভগবানের ঠিক হয়েছে?”

মাঝের একটা শব্দ না বুঝলেও ছেলের অভিমানের কারণ বুঝে যায় কালোননীদেবী। এ যুগের ছেলে, আগেকার দিনের মতো সবকিছুই মুখ বুজে মেনে নিতে চায় না। প্রশ্ন করে, প্রতিবাদ করে। কালোননীদেবী ছেলের পিঠে ডানা বুলিয়ে বলল, “শাস্ত্রে কী বলে জানিস মানিক? বলে, কালো জগতের আলো। কালো না থাকলে সাদার কোনও দামই নেই।”

মাথা ঝাঁকিয়ে কালোমানিক বলে, “শাস্ত্রে যা বলে বলুক, আমি ওসব মানি না। যুগ যুগ ধরে আমরা রং আর গলার স্বরের জন্য বুলিড হচ্ছি। একটা কিছু করা দরকার এবার।”

ছেলের কথা শুনে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে কালোননী। অভিমানে আবার কিছু উলটো-সিধে কিছু করে না বসে কালোমানিক। আজকাল আবার রং সাদা করার কীসব পাথর বেরিয়েছে, তাতে গা ঘষলে নাকি রং সাদা হয়। সেসব খুব খারাপ। কতজনের ছাল-চামড়া উঠে গেছে। কারুর আবার ঘা হয়ে গেছে গায়। মানিকের বাবা ফিরলে আলোচনা করবে, ভেবে রাখে কালোননী।

কালোমানিকের বাবা কালোচুনি কাকড়াশি এবং কালোননীদেবী, দু’জনেই ধার্মিক। ঈশ্বরে অগাধ আস্থা তাদের। স্ত্রীর মুখে সব শুনে কালোচুনিও একটু ভয় পেল। এসব লক্ষ্মণ তো ভালো নয়। ছেলের সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। কী চাইছে সে বুঝতে হবে।

“এই যে মানিক, কেমন চলছে পড়াশোনা?”

“পড়াশোনা ঠিকই চলছে। কিন্তু বাবা, ভগবানের বিরুদ্ধে আমার একটা নালিশ আছে। ওঁদের সব ডিসিশন চোখ বন্ধ করে মেনে নেওয়া ঠিক নয়।”

কালোচুনি তো প্রমাদ গুনল। সর্বনাশ করেছে! ভগবানের বিরুদ্ধে নালিশ! কী কোপ ঘাড়ে এসে পড়বে কে জানে। তাও মাথা ঠাণ্ডা রেখে ছেলেকে জিজ্ঞেস করে সব অভিযোগ শুনল। তারপর ছেলের গা ঘেঁষে বসে বলল, “দেখ বাবা, ভগবানের সব সৃষ্টির পেছনেই কোনও না কোনও কারণ থাকে, উদ্দেশ্য থাকে। আমদের সৃষ্টি করেছেন পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য। তাই তো আমরা ‘জমাদার পাখি’ খেতাব অর্জন করতে পেরেছি। এটা কি কম গর্বের! তুই মন খারাপ না করে পরিবেশের জন্য কিছু কর, দেখবি আনন্দ পাবি।”

“মানুষেরা কেমন নানারকমের কাজ করে। গুষ্টিসুদ্ধু মানুষ একই কাজ করে না। তাহলে আমরাই বা অন্য কাজ করতে পারব না কেন? আমি অন্য কোনও কাজ করতে চাই, ব্যস।”

***

মণ্ডলপাড়ার দয়ানিধি মণ্ডলের সাইকেলটা রাখা ছিল তার বাড়ির দাওয়ায়। চেন দিয়ে জানালার গরাদের সঙ্গে বাঁধাও ছিল। কিন্তু তাও চুরি হয়ে গেল। সকালে উঠে দয়ানিধি হাউমাউ করে পাড়ার লোককে তার সাইকেল চুরির কথা জানাল।

গ্রামেগঞ্জে সাইকেলটাই বেশি চলে। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই সাইকেল আছে। ইদানীং চুরি বেড়েছে। এর বাড়ির ঘটি, ওর বাড়ির বাটি মাঝেমধ্যেই হাপিশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাইকেল চুরি এই প্রথম। সকলেই বেশ ভয় পেয়ে গেল। আলোচনা করতে লাগল চুরি ঠেকাতে কী করা যেতে পারে। কেউ বলল, চার-পাঁচজনের দল তৈরি করে রাত জেগে পাহারা দিলে ভালো হয়। কিন্তু গ্রামের চৌহদ্দি তো কমখানি নয়। একরাতে কতটা ঘুরবে সেই দল! তাছাড়া পরদিন সবারই কাজ থাকবে। একটু না ঘুমোলে তো কাজ করা মুশকিল হবে। এমনতর নানা পরিকল্পনা হচ্ছিল আর নাকচ হয়ে যাচ্ছিল।

এই দয়ানিধির দাওয়ার একধারে ছিল একটা পাকুড়গাছ। সেই গাছে পরিবার নিয়ে বাস করত কালোচুনি কাকড়াশি। দয়ানিধির সাইকেল-কাণ্ড পুরোটাই শুনেছিল কালোমানিক। ইস্কুলে যাবার আগেই তো দয়ানিধি চেঁচামেচিটা করেছিল। তাই সবটাই শুনেছিল সে। খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল মনে মনে।

সেদিন পুরো দিনটাই এই সাইকেল চুরি নিয়ে কিছু করা যায় কি না সেই ভাবনায় ডুবে থাকল কালোমানিক। বন্ধুরা কত ডাকল খেলতে যেতে, কিন্তু শরীরটা ভালো নেই বলে এড়িয়ে গেল সে। তারপর মাথায় বুদ্ধির লাইটটা টিং করে জ্বলে উঠল তার।

বাসায় ফিরে মন দিয়ে লেখাপড়া করল কালোমানিক যাতে তার প্ল্যানে কোনও বাগড়া না দেয় মা-বাবা। কালোচুনি কাজ থেকে ফিরে একটু জিরিয়ে নেবার পর কালোমানিক শুরু করল বলতে। “বাবা, মা, শোনো। আমার কিছু বলার আছে।”

কালোমানিকের এধরনের কথা শুনে বেশ একটু ঘাবড়ে গেল দু’জনেই। কিন্তু শুনতে তো হবে ছেলে কী বলতে চাইছে। কালোচুনি বলল, “বল কী বলবি।”

“তোমরা তো শুনেছ যে এই বাড়ির সাইকেলটা চুরি হয়ে গেছে। মানুষের দেওয়া খাবার খেয়েই তো আমরা বেঁচে আছি। আমাদের তো একটা ডিউটি আছে ওদের যাতে ক্ষতি না হয় সেটা দেখার।”

কালোমানিকের মুখে এমন কথা শুনে অবাক হয়ে গেল ওর মা-বাবা। এইটুকুনি ছেলে কেমন গুরুগম্ভীর কথা বলছে বাবা! তবে কথাগুলো খুবই সত্যি। কালোচুনি জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে সাহায্য করার কথা ভাবছিস? আমাদের কতটুকুই বা ক্ষমতা?”

“যেটুকু আছে, সেটুকু দিয়েই কিছু করতে চাই বাবা। তোমরা বাধা দিও না।”

ভয়ে ঠোঁট হাঁ হয়ে গেল কালোননীর। ছেলে এবার কী বলবে কে জানে! রক্ষে করো ঠাকুর!

উলটোদিকের বাড়িটা দেখিয়ে কালোমানিক বলে, “ওই যে শঙ্করদের বাড়িটা, ওদের সাইকেলটাও বাড়ি আর পাঁচিলের মাঝখানের গলিটায় থাকে। চুরি করা মোটেই কঠিন নয়। আমি এখন থেকে রোজ রাতে ওই সাইকেলের সিটের ওপর বসে থাকব।”

কালোচুনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “তাতে কী হবে?”

“কী হবে সেটা না হওয়া অবধি তো বোঝা যাবে না। আমি তো কাছেই থাকব, তাই তোমরা ভয় পেও না প্লিজ।”

কালোননীদেবী ভয় পেয়ে কেঁদে বলে, “ওরে আমার মানিক রে, তোকে সুদ্ধু যদি চোর সাইকেল নিয়ে চলে যায়, তখন?”

কালোমানিক বিরক্ত হয়ে বলে, “মা, আমার তো দুটো ডানা আছে, বিপদ বুঝলে উড়ে যাব! আমাকে কী করে নিয়ে যাবে? কী যে বলো না!”


রাত্তিরের খাবার খেয়ে বাবা-মাকে শুভরাত্রি জানিয়ে শঙ্করের সাইকেলের দিকে উড়ে যায় কালোমানিক। গাছের বাসা থেকে জায়গাটা কোনাকুনি দেখা যাচ্ছে বটে, তবে অন্ধকার থাকায় সাইকেলটা দেখা যাচ্ছে না। চিন্তা নিয়েই ঘুমোতে গেল কালোচুনি আর কালোননী।

গাছের বাসার আরাম নেই ঠিকই, তবে ভালো কিছু করতে গেলে অত আরামের কথা ভাবলে চলে না। যতটা সম্ভব গুছিয়ে-গাছিয়ে সাইকেলের সিটের ওপর বসল কালোমানিক। খানিক পরে ঘুমিয়েও পড়ল।

সূয্যিমামা উঁকি দিতে না দিতেই কালোননীর ডাকে ঘুম ভেঙে গেল কালোমানিকের। যাক, সাইকেল নিজের জায়গাতেই আছে। সিটের ওপরেই ডানা ঝাপটে আড়মোড়া ভেঙে উড়ে এল গাছের বাসায়।


চার রাত্তির কেটে গেল কোনও অঘটন ছাড়াই। আজ যখন কালোমানিক যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে তখন কালোননী বলল, “সব যখন ঠিকই আছে তখন আজ নাহয় নাই গেলি। একটু আরাম করে ঘুমো একটা রাত। আবার কাল রাতে যাস।”

কালোমানিক কিন্তু নিজেকে নিজের দেওয়া ডিউটিতে অটল। মাকে বোঝাল, কাজে ফাঁকি দিতে নেই। একমাস এভাবেই চলবে। তার মধ্যে কোনও ঘটনা না ঘটলে তখন নতুন করে ভাববে। আর সেদিনই ঘটল অঘটন।

রাত তখন বেশ নিশুত। গভীর ঘুমোচ্ছিল কালোমানিক। ঘুমের ঘোরেই মনে হল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। ভয় পেয়েই জোর গলায় কা-কা-কা-কা ডাক ছাড়ল সে। কালোমানিকের ডাক শুনে ওর বাবা-মায়ের ঘুম ভেঙে গেল। তারাও ভয় পেয়ে তারস্বরে কা-কা-কা-কা ডাক ছাড়ল। অসময়ে কাকেদের চিৎকারে এলাকার কুকুরগুলোও ঘুম ছেড়ে চেঁচাতে শুরু করল। সে এক হইহই পড়ে গেল রাতদুপুরে।

“এই সেরেছে!” বলে চোর তো সাইকেল ফেলে পগারপার।

এত আওয়াজে শঙ্করদের বাড়ির সব আলো জ্বলে উঠল। হাতে লাঠি নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল শঙ্করের বাবা। পেছনে হাতুড়ি হাতে শঙ্কর। কালোমানিক তখন সাইকেল থাকা গলির করবীগাছের ডালে বসে সব দেখছিল। ওরা তো আর জানে না, কে চোর তাড়াল!

সাইকেল কাত হয়ে পড়ে আছে দেখে ওরা বুঝল চোর এসেছিল। কিন্তু এই মাঝরাতে এত কাক কেন ডেকে উঠল, সে রহস্য পরিষ্কার হল না ওদের। না বুঝলেও শঙ্কর বলল, “ভাগ্যিস কাকগুলো ডাকল আর তার জন্য কুকুরগুলোও চেঁচাল। তাই তো চোরটা পালাল। আজ তো বেঁচে গেলাম ক্ষতির হাত থেকে, কিন্তু সাইকেল রাখার অন্য কোনও ব্যবস্থা করতে হবে।”

শঙ্কররা বুঝুক না বুঝুক, একটা উপকার তো করতে পেরেছে কালোমানিক। এটাই চাইছিল সে, অন্যরকম কাজ। শুরু করাটা দরকার ছিল। ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি আর আনন্দ খেলা করতে লাগল ওর। বাবা-মাও অনেক আদর করল ছেলেকে। কাকেদের গুষ্টিতে খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হল না। কালোমানিককে প্রশংসায় ভরিয়ে দিল সবাই।

সমবয়সী কাকেদের হিরো হয়ে গেল কালোমানিক। তারাও সবাই এই কাজ করতে উৎসাহিত হয়ে খুঁজতে লাগল কোন বাড়ির কোন দামী জিনিস বাইরে থাকে। নিঃশব্দে সেসব পাহারা দেওয়া শুরুও করে দিল তারাও।

এখনও অনেক সময়েই মাঝরাতে কাক ডেকে ওঠে। তার মানে কারুর কোনও দামী জিনিস চুরির হাত থেকে বাঁচাচ্ছে কোনও কাক। ভগবান যে প্রাণীকে যা দিয়েছেন, বুদ্ধি করে কাজে লাগালে পৃথিবীটা যে আরও অনেক সুন্দর হয়ে উঠবে সেটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছে কালোমানিক কাকড়াশি।

___

অঙ্কনশিল্পীঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


No comments:

Post a Comment