ছোটো গল্পঃ অমৃতস্য পুত্রাঃ - বুদ্ধদেব চক্রবর্ত্তী


আজ সকাল থেকে নন্দীর শরীরখানা ভালো নেই, তার উপর হালকা গলাব্যথা ও কাশি। গায়ের তাপমাত্রা সেরকম বাড়াবাড়ি কিছু না হলেও সাবধানের মার নেই তাই দেবাদিদেব মহাদেবের আদেশে নন্দীকে কৈলাস পর্বতের একধারে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এমনিতেই কৈলাসে ঠান্ডা, তার উপর মর্তে যা চলছে, এক্কেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। এবার স্বর্গে এই অবস্থা হলে তো বেজায় মুশকিল।

মর্ত্যের মানুষ পটল তুললে স্বর্গে আসে, কিন্তু স্বর্গের বাসিন্দাদের কিছু একটা ভালোমন্দ হয়ে গেলে তারা কোথায় যাবে? আর তাছাড়া স্বর্গের বাসিন্দাদের সংখ্যা তো আর কম নয়, তেত্রিশ কোটি! আর হেলথ স্টাফ ক’জন? মাত্র দু’জন। দু’জন অশ্বিনীকুমার। তাঁদের দু’জনেরই বয়স হয়েছে, আর দীর্ঘকাল ওই পোস্টে নতুন কোনো নিয়োগও নেই। তাঁরা আর কত দেবতার চিকিৎসা করবেন? তাছাড়া চিকিৎসা পদ্ধতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, অথচ ব্যাধি তো আর থেমে নেই।

তাই শেষপর্যন্ত মর্ত্যের দেবমন্দিরের দরজা বন্ধ হতেই স্বর্গেও লক ডাউন ঘোষণা করলেন দেবরাজ ইন্দ্র।

এখন দেবতারা সব কর্ম হারিয়ে বেকার, হাতে এখন বিশেষ কাজকর্ম নেই। মর্ত্যের মানুষ তাদের এই দুর্দিনে নিজেদেরই বাঁচাতে ব্যস্ত, দেবভক্তি তো দূরস্ত। তাই এই অবস্থায় দেবতাদের চুপটি করে ঘরে বসে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই।

অমরাবতীতে ইন্দ্রের সভা পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। সোমরসের জোগান অপ্রতুল। যেটুকু স্টক ছিল তা ক্রমে নিঃশেষের দিকে। ভক্তের দল নৈবেদ্য, উপাচার, আহুতি বন্ধ করায় দেবধামে ঘরে ঘরে আর্থিক অনটন। ইন্দ্রের দেওয়া ত্রাণে কোনোরকমে দিনপাত করছেন তাঁরা। তাকিয়ে আছেন কবে আবার কাজে ফিরে যাবেন।

এমতাবস্থায় আমোদ-প্রমোদ শোভা পায় না। তাই গন্ধর্বদের গান এবং অপ্সরাদের নাচ ছাড়া স্বর্গের চারদিক যেন শ্মশানের নিঃস্তব্ধতা।

এদিকে রম্ভা, মেনকা প্রভৃতি অপ্সরাদের বিনা ডায়েটিংয়ে ওয়েট বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। তাঁদের আর সেই তন্বী চেহারা নেই। ঘরে বসে তাঁরা স্বর্গের টিকটকে নৃত্যরস পরিবেশন করলেও ঘর থেকে নট নড়নচড়ন।

পুরন্দরের রাজ্যে সবাই লক ডাউন ঠিকমতো মেনে চলছেন কি না তার জন্য বায়ুর দেবতা পবনকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন দেবরাজ। কারণ তিনিই তো একমাত্র সর্বত্রগামী।

তবে ইন্দ্রের নির্দেশ সবাই যে অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন এমনটাও নয়। দু-একজন ফাঁক গলে ঠিক বেরিয়ে পড়ছেন নানা অছিলায়।

যেমন দেবর্ষি নারদ। দু-একদিন তিনি বেশ গম্ভীর মুখে বাড়িতেই হরিনাম করে কাটিয়ে দিলেন, কিন্তু দিন তিনেক যেতে না যেতে তাঁর উশখুশ শুরু হল। ওই যে কথায় বলে না, পায়ের তলায় সর্ষে! ঘরেতে কি তাঁর মন টেকে? সারাক্ষণ এর ঘরে ওর ঘরে উঁকি মারা যাঁর অভ্যেস, তাঁর কি ঘরের ভিতর থাকতে ভালো লাগে? শেষে যখন বাইরে বেরোতে না পেরে বুক পেট আইঢাই অবস্থা, তখন আর থাকতে পারলেন না ব্রহ্মার মানসপুত্র।

ব্যস, অমনি ঢেঁকি বাগিয়ে চলে গেলেন মর্ত্যে আড্ডা দিতে। আর যাবি তো যাবি সোজা গিয়ে পৌঁছলেন নয়াদিল্লির রেড জোনের এক বিষ্ণু মন্দিরে। চত্বরের দিকে ঢুঁ মারতেই তার উপর হানা দিল অদৃশ্য বীজাণু। সেটি নিজের শরীরে বহন করে সোজা হাজির হলেন বিষ্ণুলোক ঘুরে কৈলাসে।

বেচারা নন্দী তখন বিশাল খলে বসে বাবার সিদ্ধি কুটছিল। সামনে সিদ্ধির পুকুর ভরে আছে। মুখে অবশ্য মাস্ক ছিল নন্দীর, নারদ মহাপ্রভুর তাও ছিল না। তাঁর নাকি মাস্ক পরতে ভীষণ আপত্তি। মুখে মাস্ক চড়ালে হরিনাম জপে কষ্ট হয়।

তিনি এসেছিলেন শিব দর্শনে। কিন্তু যবে থেকে মর্ত্যে করোনার দাপট বেড়েছে এবং মন্দিরের দরজা সব বন্ধ, ভোলে বাবা বাইরের কারো সঙ্গে বিশেষ দেখা করেন না। যাই হোক, দু-চার কথা নন্দীর সঙ্গে বলে নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময়ের পর বিদায় নিলেন নারদ মুনি।

তার ঠিক দিন দুয়েক পরে নারদের করোনা সংক্রমণ ধরা দিল। স্বর্গের প্রথম কোভিড পজেটিভ বলে সনাক্ত হলেন দেবর্ষি। আর তারপর থেকেই সমগ্র স্বর্গ জুড়ে স্বর্গবাসীদের মধ্যে সর্বক্ষণের একটা আতঙ্ক। সকলের শরীর কেমন যেন শুধুতেই জ্বর জ্বর ভাব হতে শুরু করল। একটু হাঁচি হলেও পাশের দেবতারা দশ হাত দূরে পালান।

বার বার ফালতু পেশেন্ট দেখে অশ্বিনীকুমাররা যত না ক্লান্ত তার থেকে বেশি বিরক্ত, অথচ দেব কর্মচারী রূপে ডিউটিতে না এসেও উপায় নেই। দেবরাজ একশো শতাংশ হাজিরার ফরমান জারি করেছেন।

আবার বিষ্ণুলোকে বিষ্ণু সোশাল ডিস্টেন্সিং-এর জেরে তক্ষক নাগের নীচে যোগনিদ্রায় যেতেই পারছেন না। তার কোমর, সারা শরীর জুড়ে টনটনানি ভাব। কিছুতেই অন্য কোথাও শুয়ে সেই আরাম পাচ্ছে না।

ক্ষণে ক্ষণে ডাক পড়ছে লক্ষ্মীর, কিন্তু তিনিও আর বাতের ব্যথার মালিশে নারাজ। বাজার মন্দা, তাই তাঁর মান্থলি ইনকামে টান পড়েছে।

তবে স্বর্গের চেয়ে মর্ত্যের শ্রীক্ষেত্রে থাকা জগন্নাথ প্রভুর অবস্থা কিছুটা মন্দের ভালো। যেহেতু তাঁর হাত এবং পা নেই, তাই সেগুলি বার বার সাবান দিয়ে ধোয়ার ঝামেলাও নেই। তবে ভক্ত বিনে তিনি যে খুব একটা সুখে আছেন তা বলা যায় না। এদিকে রত্রযাত্রাও অনিশ্চিত।

তবে এই মরসুমে যাঁর কাজের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে, তিনি হলেন স্বয়ং যম। তাঁর আর নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই, মহাচন্দ্র আর কালপুরুষ মানুষ ধরে ধরে আনছে তো আনছেই, যেন তার শেষ নেই।

আর এনেই কি আর শান্তি আছে? যম লোকে আসা নতুন আত্মা, মানুষ্যকুল থেকে যম লোকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। আগত আত্মাদের থার্মাল স্ক্রিনিং করে, চৌদ্দ দিন আইসোলেশনে রেখে তবেই তাদের বিচারের খাতা খুলতে হচ্ছে। ফলে দেরি হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়াতে। অন্যদিকে নশ্বর আত্মাদের এই ক’টা দিন যে জামাই খাতির করতে হচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, কে যে পুণ্যবান আর কে যে পাপী তা চিত্রগুপ্তের খাতা না উলটানো অবধি বোঝার উপায় নেই। তাই যমের ফান্ড থেকে বিস্তর টাকা খরচা হচ্ছে। তিনিও তিতিবিরক্ত।

এদিকে কৈলাসের অবস্থা যে খুব একটা ভালো তা বলা যায় না। নন্দী হোম কোয়ারেন্টাইনে যাবার পর ভৃঙ্গী লক ডাউনের জেরে কাজে আসছে না। তাই মা দুর্গার মাথা পাগল হবার জোগাড়। তার উপর আবার তাঁর দশ হাত। হাত ধুতে ধুতে তার প্রায় সারাটা দিন কেটে যাচ্ছে। ওদিকে কার্তিক-গণেশের স্কুলে তালা। তাঁরা সারাদিন তারা কৈলাস মাথায় তুলে রেখেছেন। এদিকে আবার শুটিং বন্ধ থাকায় স্বর্গের টিভি সিরিয়ালে নতুন কোনো প্রোগ্রাম নেই।

ওদিকে আবার স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় সরস্বতীরও মুখ ভার। তাঁর বাহন হাঁসটাকেও কাছে এনে যে একটু আদর করবেন তার উপায় নেই।

তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেবাদিদেবকে নিয়ে। তিনি আবার শ্মশানের বাসিন্দা। স্যানিটাইজেশনের নামগন্ধ নেই। তবে যবে থেকে করোনার লাশ শ্মশানে পুড়তে শুরু করেছে তিনি সেখানেও যেতে পারচ্ছেন না, পাছে তিনি তার থেকে সংক্রমিত হন। আবার বাড়িতে থাকলেও মহা জ্বালা। সারাক্ষণ হর-পার্বতির খিটিরমিটির লেগেই আছে। শেষে কিনা মহারুদ্রকে ঘর সাফাইয়ের কাজে মহামায়া লাগিয়ে দেন সেই ভয়ে তিনি অস্থির। নন্দী ছাড়া তাঁর গাঁজা-কলকে কে আর তোয়াজ করে দেবে? সেইরকম এই লক ডাউনে তার গিন্নির তিরিক্ষি মেজাজ যেন সবসময় সপ্তমে চড়ে আছে।

এমনটা নয় যে ভোলা মহেশ্বর কাজে ফাঁকি দেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ভোলে বাবা, তাই কাজগুলো বেশিরভাগই ভুলে ভরা। যেমন সেদিন কৈলাস চত্বরের সাফাই করতে গিয়ে মুছো খুঁজে না পেয়ে ভুলে নিজের ব্যাঘ্রাসনটি দিয়ে মুছে ফেললেন চারদিক। আবার সংক্রমণের ভয়ে কোথায় যে তাঁর মাথার  চাঁদখানা খুলে রেখেছিলেন বেমালুম ভুলে গেলেন। সেটি খুঁজে পেতে বিস্তর কাঠ-খড় পোড়াতে হল তাঁকে। ওদিকে গাঁজা-সিদ্ধির তেষ্টায় তাঁর প্রাণ ওষ্ঠাগত। অথচ ছেলেমেয়েদের সামনে নেশা-ভাঙ করা যায় না।

এইসব নিয়ে স্বর্গের এক্কেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা।

এ অবস্থা চিরকাল চললে ‘পিথিবি’র পাশাপাশি দেবতাদের ‘সগগোলোক’ রসাতলে যাবে। অতএব দেবতারা স্বয়ং বিষ্ণুর অভিভাবকত্বে প্রজাপ্রতি ব্রহ্মার স্মরণাপন্ন হলেন। কারণ যদি এর কোনো প্রতিকার থাকে তবে কেবল ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি।

কিন্ত ব্রহ্মার অবস্থা তখন তথৈবচ। চার মুখ নিয়ে তিনি বেশ সমস্যায় পড়েছেন। তাঁর চতুর্মুখে মাস্ক পরতে গিয়ে তার একেবারে নাজেহাল অবস্থা। কেনার খরচাটাও খুব একটা কম নয়। সাবান-স্যানিটাইজারের খরচটা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল।

অতএব দেবগণের আলোচনা শেষে কারো কাছে কোনো উপায় না পেয়ে দেবতারা মহামায়ার স্মরণাপন্ন হলেন। আবির্ভূতা হলেন দেবী। প্রথমে এসেই তিনি সকলের চারিদিকে লক্ষ্মণ গণ্ডি নিজের হাতে টেনে এই মর্মে ঢ্যাঁড়া দেওয়ার বন্দোবস্ত করলেন যে, যদি কেউ এই সমস্যার সমাধান করতে পারে তাকে অমৃতের ভাগ দেওয়া হবে। দলে দলে অসুর, তপস্বী, ভূতপ্রেত, গন্ধর্ব, দেবতা সকলে ঢ্যাঁড়া শুনে এসে হাজির হলেন কৈলাসে। কৈলাসে কারণ, সেখানেই ঠান্ডা বেশি।

ত্রিদেব মাস্ক আর পিপিই পরে বসে গেলেন ইন্টারভিউ নিতে। কতরকমের টোটকা, তন্ত্র, মন্ত্র, কালোজাদু, জড়িবুটি নিয়ে তাঁরা হাজির হলেন, কিন্তু সমস্যা যেই কে সেই।

শেষ এক বৃদ্ধ এসে হাজির হলেন দেববৃন্দের সামনে। সকলে তখন নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। দেবরাজ ইন্দ্র তো বলেই ফেললেন, “এত বড়ো রথী-মহারথী, এমনকি দেবশক্তি পর্যন্ত হার মানল, তুমি কে হে বাপু যে এ রোগের নিরাময় তোমার হাতে?”

বৃদ্ধ তখন সকলকে নমস্কার জানিয়ে অল্প মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “আমি বিজ্ঞানের সাধক প্রভু। আমি সেই মনুষ্যজাতির প্রতিনিধি, যারা যুগযুগান্তর ধরে সমস্ত প্রতিকূলতা হারিয়ে এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। আমি সে জাতির প্রতিনিধি যারা অন্ধকারে জ্ঞানের আলোক জ্বেলে আঁধার কাটিয়ে তোলে।”

এরপর মানুষ আর বিজ্ঞানের অক্লান্ত পরিশ্রমে আবিষ্কৃত হল করোনা বধের অস্ত্র। হার মানল অপরাজেয় ব্যাধি। স্বস্তি ফিরে এল দেবলোকে। চেনা ছন্দ ফিরে এল তাদের সাধের মর্ত্যে। মন্দিরের দরজা উন্মুক্ত হল সকলের জন্য। আবার কাজ ফিরে পেলেন দেবতারা। মর্ত্যের মানুষ সুস্থ হয়ে দেবমন্দিরে ছুটল দেবতাদের মাহাত্ম্যের গুণকীর্তন করতে। আবার তারা মেতে উঠল দেবতাদের উৎসব নিয়ে।

বিজ্ঞান তখনো নির্বিকার। সে তখন পুরস্কারের অর্থস্বরূপ অমৃতের কথা বেমালুম ভুলে গেছে। আর দেবতারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। মনে মনে ভাবলেন, ভাগ্যিস অমৃতের কথা মনে নেই ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’-দের।


___


No comments:

Post a Comment