ছোটো গল্পঃ বুলেট রিকশ - কিশোর ঘোষাল



বুলেট রিকশ


কিশোর ঘোষাল



এক


জামাকাপড় ছেড়ে আবার শুয়ে পড়ব ভাবছিলাম। বাইরে থেকে ডাক এল, “ছোড়দা, ও ছোড়দা!”

গলা শুনেই বুঝলাম, বাদলদা, আমাদের খুবই পরিচিত রিকশওয়ালা। বাদলদাকে বলে রেখেছিলাম, পৌনে দুটোর সময় আসতে, দুটো দশের ট্রেনটা ধরতেই হবে। ওটা ধরতে পারলে কলকাতায় সকাল ছ’টা নাগাদ পৌঁছে যাওয়া যায়। তার পরে গেলে আমার কাজ হবে না, কলকাতা যাওয়ার কোনও মানেই থাকবে না। আর হতভাগা এল দেখো, এখন বাজছে দুটো পাঁচ। বাদলদার জন্যে আমিই বা হা-পিত্যেশ করে বসে ছিলাম কেন? পাড়ায় আর কি রিকশ নেই? আছে বৈকি, বিস্তর আছে। কিন্তু রাত দুটোর সময় কাকে পাব? কে আসবে? সেইজন্যেই বাদলদাকে বলে রেখেছিলাম। বাদলদা এমন করে না। এবারেই এত দেরি করে ফেলল।

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললাম, “এত দেরি করে এলে? ট্রেন কি আমার জন্যে ওয়েট করবে নাকি? আর এখন গিয়ে লাভ নেই বাদলদা।”

“তুমি বেরিয়ে এসো তো। ট্রেন আমাদের ছেড়ে কোথায় যায় একবার দেখি।”

“হাতে পাঁচ মিনিট সময় বাদলদা। মানছি এখন রাত, রাস্তাঘাট ফাঁকা, তাহলেও কুড়ি মিনিটের রাস্তা পাঁচ মিনিটে পৌঁছে দেবে? কী যে বলো না!”

“অযথা বকবক না করে বেরিয়ে এসো দিকি, চেষ্টা করে দেখতে ক্ষেতি আছে?”

তা নেই। আমি কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রিকশয় চেপে পড়লাম। দরজায় দাঁড়িয়ে মা বললেন দুগ্‌গা দুগ্‌গা, আর বাবা হাত নাড়লেন। দেখা যাক কী আছে কপালে।


ফাঁকা রাস্তায় ভয়ংকর স্পিডে চালিয়েও ট্রেনটা ধরা গেল না। প্রত্যেকবারই ট্রেন আসার শিডিউলড টাইমের আগে এসে দেখেছি, ট্রেনটা প্রায়ই দশ-পনেরো মিনিট লেট করে। আজ আমিই লেট কিনা, তাই আজ ট্রেন লেট করেনি।

বাদলদা জিজ্ঞেস করল, “কী করবে, বাড়ি ফিরে যাবে? নাকি স্টেশনে ওয়েট করে, পরের ট্রেনে যাবে?”

“পরের ট্রেন তো প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে। তার ওপর ওটা সব স্টেশনে দাঁড়ায়, এটার মতো গ্যালপিং নয়। কলকাতা পৌঁছোতে দশটা-সাড়ে দশটা বেজে যাবে। অত দেরি হলে আজ আমার কলকাতার কাজটাই হবে না। নাহ্‌, আজকের দিনটাই বরবাদ গেল। চলো বাড়ি ফিরে যাই, কাল আবার চেষ্টা করব। আজকের মতো কালও আবার ডুবিও না বাদলদা, খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।”

বাদলদা আমার কথায় বেশ লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, তুমি রিকশয় বসো দেখি, একটা কোনও উপায় ঠিক বের করে ফেলব।”

আমি চটপট রিকশয় উঠে পড়লাম। যা হয়ে গেছে, তার জন্যে অনুতাপ করে তো লাভ নেই। বরং ঘরে ফিরে বকেয়া ঘুমটা মিটিয়ে নিলে হয়।

আমি উঠে পড়তে বাদলদা রিকশ চালু করল, কিন্তু বাড়ির দিকে নয়, উলটোদিকে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, “এ কী, ওদিকে কোথায় চললে?”

বাদলদার রিকশ তখন হাওয়ার বেগে ছুটছে।

“বকবক করে মাথা খারাপ কোরো না তো। সিট বেল্ট বেঁধে চুপটি করে বসো। একটু ঘুমিয়েও নিতে পারো নিশ্চিন্তে। আমাকে আমার মতো চালাতে দাও।”

রিকশয় সিট বেল্ট! বাদলদার মাথাটা গেছে। তবে রিকশটা চালাচ্ছে খাসা। এত স্পিডে চালাচ্ছে, কিন্তু এতটুকু ঝাঁকুনি নেই। দু’কানে হাওয়ার শোঁ শোঁ ঝাপটা, হাওয়ার দাপটে ঠিকমতো তাকানো যাচ্ছে না। এমনকি শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের দরজা দিয়ে মুখ বাড়ালে যেমন হয়। কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। যতই হোক সাইকেল রিকশ, যা স্পিডে চলছে, ছিটকে পড়লে আর দেখতে হবে না!

ঘুটঘুটে অন্ধকারে সিটের ডানপাশে হাতড়ে সত্যিই সিট বেল্টটা পেয়ে গেলাম। টেনে নিয়ে লক করে দিলাম বাঁদিকের পিঠের কাছে। বেশ টাইট, পোক্ত বেল্ট। কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মতো ল্যাতপেতে পৈতের মতো নয়। বেল্টটা এঁটে কিছুটা স্বস্তি পেলাম।

আমাদের শহর ছাড়িয়ে কতদূরে চলে এসেছি কে জানে। দু’পাশেই অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দেখতে পাওয়ার কথাও নয়। রাস্তার দু’পাশে ধানজমি। দিনের বেলা হলে চোখ জুড়োনো সবুজ চোখে পড়ে, এখন এই রাত আড়াইটের সময় কে আর আমার জন্যে মাঠের মধ্যে আলো জ্বালিয়ে রাখবে! আর চলন্ত গাড়ি থেকে, সে ট্রেনই হোক বা রিকশ, দু’পাশে কিছুই দেখা না গেলে আমার খুব ঘুম পায়। কানের মধ্যে বোঁ বোঁ হাওয়ার প্রবল ঝাপটার মধ্যেও আমার চোখ বুজে এল।

চোখ বুজলেও ঘুমুইনি। একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। এত হাওয়ার মধ্যে ঘুম আসে নাকি? তন্দ্রা কেটে গেল ট্রেনের আওয়াজে। আজকাল ট্রেন আর কুউউউ করে না, ভোঁওঁওঁওঁ আওয়াজ করে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখলাম, বিশাল একটা কেন্নো যেন দৌড়ে চলেছে অন্ধকার মাঠের মধ্যে দিয়ে। তার মাথায় আলো, সারা গায়ে আলোর চৌখুপি। হেডলাইট আর ট্রেনের জানালাগুলো। কিন্তু ট্রেনটা আমাদের থেকে অনেকটা নিচে দিয়ে দৌড়োচ্ছে। আমরা কী কোনও পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি? এই রাস্তা দিয়ে বাসে এবং ওই লাইনের ট্রেনে বহুবার যাতায়াত করেছি, কিন্তু এদিকে কোনও পাহাড় আছে কোনোদিন চোখেও পড়েনি। কী মনে হতে ঘাড় ঝুঁকিয়ে নিচে তাকালাম, আর শিউরে উঠলাম ভয়ে। হাত-পা অবশ হয়ে এল। সিট বেল্ট বাঁধা ছিল, তা না হলে টুপ করে খসে পড়তাম কালবোশেখির ঝড়ে ঝরে পড়া কচি আমের মতো। কী দেখলাম? দেখলাম, আমাদের থেকে অনেকটা নিচে কালো ফিতের মতো রাস্তা, আর রাস্তা দিয়ে লাইন দিয়ে হেড লাইট আর টেল লাইট জ্বালিয়ে দৌড়ে চলেছে লরি, আর কিছু ছোটো গাড়িও!

এসব কী করে সম্ভব! মাটি থেকে এতটা ওপরে, এত স্পিডে একটা সাইকেল রিকশ কী করে উড়ছে? আমি এ কার পাল্লায় পড়েছি? আমার সামনে যে রিকশ চালাচ্ছে, সে কি বাদলদা? আমি যত ভাবতে লাগলাম, ততই আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হতে লাগল। তার মানে, অনেক গল্পে-টল্পে যেমন পড়েছি, কিন্তু বিশ্বাস করিনি, বাদলদাও এখন সেরকম কিছু! আমি চোখ বন্ধ করে রামনাম জপতে লাগলাম। আর কিছু করার কথা মাথাতেও এল না।


দুই


ট্রেনটার শেয়ালদা পৌঁছোনোর শিডিউলড টাইম ছিল পাঁচটা পঞ্চাশে, কিন্তু ঢুকল কুড়ি মিনিট লেটে। তাহলেও আমার কোনও অসুবিধে হয়নি। যে কাজের জন্যে এসেছিলাম, সে কাজও মিটে গেল এগারোটার মধ্যে। দেড়টার সময় ফেরার ট্রেন। হাতে কিছুটা সময় ছিল বলে কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া থেকেও ঘুরে এলাম। বাচ্চুদা দুটো বই কিনতে দিয়েছিল, সে দুটো কিনলাম। আর আমার জন্যে কিনলাম ‘অশরীরী অমনিবাস’। বইটা সম্পর্কে আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম। তখন গা করিনি। কিন্তু ট্রেন ধরতে গিয়ে আজ রাত্রে যে অভিজ্ঞতা হল, তার পরে বোকার মতো, ‘ভূত বলে কিছু আছে নাকি’ বলে হ্যা হ্যা করে হাসার অবস্থা অন্তত আমার আর নেই। বরং তেনাদের সম্পর্কে খুব সিরিয়াসলি চিন্তাভাবনা করা উচিত বলেই আমার এখন মনে হচ্ছে।

এই ফাঁকে বলে রাখি, গতকাল রাত্রে চোখ বন্ধ করে কতক্ষণ রামনাম করেছিলাম জানি না। তবে বাদলদার ডাকে চমকে উঠেছিলাম, “ছোড়দা, ও ছোড়দা, স্টেশন চলে এসেছে। তোমার ট্রেন ঢুকতে এখনও মিনিট পাঁচেক দেরি আছে। দৌড়ে যাও।”

খুব ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে দেখলাম, আমি পরের স্টেশনের রিকশ স্ট্যান্ডে বাদলদার রিকশয় বসে আছি! তার মানে আমার বাড়ির স্টেশন ছেড়ে পরের স্টেশন ঝিঙেরদহে ট্রেন এসে পৌঁছোনোর মিনিট পাঁচেক আগেই বাদলদা আমাকে এখানে এনে পৌঁছে দিয়েছে। আমার অবস্থা তখন ভূতে পাওয়া লোকের মতো। মাথা ঝিমঝিম করছিল।

বাদলদা আবার তাড়া দিল, “কী ভাবছ বলো তো? এখানেও ট্রেনটা ফেল করবে নাকি?”

একথার পর আমি আর দাঁড়ালাম না। রিকশ থেকে লাফিয়ে নেমে দৌড়োলাম স্টেশনের দিকে। রাতের ট্রেনের জন্যে লোকজন তেমন নেই। তার থেকে আশেপাশে অনেক বেশি নেড়ি কুকুর রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল। ভাগ্যিস ওরা কামড়ায় না। টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে আমি যখন প্ল্যাটফর্মে ঢুকলাম, তখন ট্রেনও প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে।


বেলা দেড়টার ট্রেনে ভিড় একটু কমই হয়। কাজেই সিট পেতে অসুবিধে হল না। ট্রেন যখন ঠিক সময়েই ছাড়ল, গুছিয়ে ‘অশরীরী অমনিবাস’ খুলে বসলাম। প্রথম অধ্যায় ‘বাঙালি ভূতের উৎপত্তি এবং তাদের ক্রমবিকাশ’, পড়তে শুরু করলাম। যদিও বেশিক্ষণ পড়তে পারলাম না, ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। ট্রেন ধরার তাড়ায় রাত দেড়টায় উঠে পড়ার পর যা যা হল, তাতে ঘুমের আর দোষ কী?

ঘণ্টা দুয়েক পর যখন ঘুম ভাঙল, দেখি কামরায় অনেক লোক। সব সিট ভরে গিয়ে দুয়েকজন লোক সিট না পেয়ে দাঁড়িয়েও আছে। আমার উলটোদিকের সিটে একটি পরিবার বসেছেন। তাঁদের দুটি ছেলেমেয়ে। বড়োটি ছেলে, সে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি ছোটো, সেও বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছে, আর ভয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরছে। খুব আশ্চর্য হলাম, বাচ্চাদুটোর এমন অবস্থা যেন ভূত দেখছে! মহিলার বয়স আমার দিদির মতোই, তিনিও আমার ঘুম ভাঙতে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন মনে হল। বললেন, “বাবা, আপনি যা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলেন, আওয়াজে ভূত পালাবে।”

আমি একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, “না মানে, ইয়ে গতকাল রাত্রে দেড়টায় উঠে দুটো দশের ট্রেনে কলকাতা এসেছিলাম, এই ফিরছি। অনেক দৌড়োদৌড়ি...”

দিদি টাইপ ওই মহিলার স্বামী হাসতে হাসতে বললেন, “বুঝেছি, তার মানে মাঝরাত থেকে যাকে বলে ভূতের কেত্তন। তাই ট্রেনে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?”

আমি লাজুক হেসে ঘাড় নাড়লাম ঠিকই, কিন্তু একটু দমেও গেলাম। আমাকে ঘিরে এত ভূত কেন রে বাবা! আমার নাকের আওয়াজে ‘ভূত পালাবে’, মাঝরাত থেকে ‘ভূতের কেত্তন’...

ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “কতদূর যাওয়া হবে?”

আমি আমার স্টেশনের নাম বললাম। শুনে ভদ্রমহিলা বললেন, “আমাদের তিনটে স্টেশন আগেই নামবেন, কিন্তু আর ঘুমোবেন না প্লিজ। আমার মেয়েটা এত ভীতু, ভূতে পাওয়ার মতো আমাকে আঁকড়ে ধরছে বার বার।”

ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “অদ্ভুত আবদার তো তোমার, আমাদের মেয়ে ভয় পাচ্ছে বলে উনি ঘুমোবেন না!”

দিদিভাই একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “তা ঠিক, তবে রিকোয়েস্ট করছিলাম আর কী।”

এ প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেল কামরায় ঝালমুড়িওয়ালা আসাতে। দিদিভাইয়ের ছেলেটি বায়না ধরল ঝালমুড়ি খাবে। আমি বললাম, “ঝালমুড়ি খাবেন তো? চারটে মুড়ি বানান তো কাকু।”

দিদিভাই খুব আপত্তি করে উঠলেন, “না না। আপনি খাওয়াবেন কেন?”

আমি হাসতে হাসতে বললাম, “মাথায় ভূত চেপেছে দিদিভাই।”

বোঝো কাণ্ড, আমিও ভূত বলে ফেললাম!

দিদিভাইও হেসে ফেললেন। বললেন, “তা কেন? আমরা খাওয়াব আপনাকে। দিবানিদ্রার পর ঝালমুড়ি আর চা না হলে জমবে কেন? আপনি তিনটে বানান কাকু, কিন্তু আমরা দাম দেব।”

শেষ কথাগুলো দিদিভাই ঝালমুড়িওয়ালাকে বললেন। ভদ্রলোক মুড়ির টিনের ঢাকনা খুলে মুঠো করে মুড়ি তুলে গোল স্টিলের ডাব্বায় ভরতে লাগলেন।

“আমারটায় কিন্তু লঙ্কা বেশি দেবেন, আজকাল আপনাদের কাঁচা লঙ্কা আর শসায় একইরকম টেস্ট লাগে।”

দিদিভাইয়ের কথায় আমি চমকে উঠলাম, বাপ রে এত ঝাল খান!

ঝালমুড়িওয়ালা স্টিলের ডাব্বায় নানান বক্কাল মেলাতে মেলাতে বললেন, “আমার কাছে ওসব লঙ্কা পাবেন না বৌদি। আমার লঙ্কা মানে লঙ্কাদহন, দাউ দাউ জ্বলবে!” প্লাস্টিক বোতলের ছিপির ফুটো দিয়ে সরষের তেল ঢালতে ঢালতে বললেন, “একবার আমাদের পাশের গাঁয়ের এক বউকে ভূতে ধরেছিল। এই বছর তিন-চার আগের কথা। ওঝা এল, ঝাড়ফুঁক চলল। সরষে ছেটানো, হলুদ আর শুকনো লঙ্কা পোড়ানো সব হল। ঝ্যাঁটাপেটাও চলল বেশ কিছুক্ষণ।” ভদ্রলোক ডাব্বার মধ্যে কাঠের ডাণ্ডা দিয়ে মুড়ি ঘাঁটতে লাগলেন ঘট, ঘট, ঘট। “কিস্যু হল না।”

ঝালমুড়ি রেডি, এবার কাগজের ঠোঙা নিয়ে তাতে মুড়ি ভরার জন্যে ফুঁ দিয়ে ঠোঙার মুখ খুলতে খুলতে বললেন, “ফু, ফু, আমাদের গাঁয়ের করিমচাচা জামাইবাড়ি যাচ্ছিলেন, ক্ষেতের সবজি-টবজি নিয়ে… ফু ফু, তাঁর থলিতে কিছু কাঁচা লঙ্কাও ছিল। তার থেকে চার-পাঁচটা লঙ্কা ওঝাকে দিয়ে করিমচাচা বললেন, ফু ফু, এই লঙ্কাগুলো বৌমার গায়ে একে একে ছোড়েন তো, দেখি ভূতবাবাজি কতক্ষণ থাকে। তিরিশ টাকা।”

তিনটে মুড়ির ঠোঙা আমাদের তিনজনের হাতে দিয়ে মুড়িওয়ালা তার দাম চাইলেন। দিদিভাই সেটা বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ভূতটা তিরিশ টাকা নিয়ে ছেড়ে দিল?”

দিদিভাইয়ের স্বামী পার্স থেকে তিনটে নোট বের করে মুড়িওয়ালার হাতে দিয়ে বললেন, “তিন লঙ্কাতেই ভূত বাছাধন কুপোকাত, ওঝার হাতে পায়ে ধরে পালিয়ে উঠল শ্যাওড়াগাছের মগডালে।”

“ঝালমুড়িইই... মশলামুড়িইই...” হাঁকতে হাঁকতে ঝালমুড়িওয়ালা চলে গেলেন অন্যদিকে।

দিদিভাই আরও অবাক হয়ে বললেন, “বা রে, তুমি কেমন করে জানলে?”

“আমাদের অফিসের গদাইয়ের বাড়ি ওদিকেই। তার মুখে শুনেছি।” একমুঠো মুড়ি গালে পুরে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আরও বললেন, “আর সেই লঙ্কার ঝাঁঝে ওই ওঝার কী হল জানো?”

দিদিভাই জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?”

“ওঝাগিরি ছেড়ে দিয়ে এখন ট্রেনের কামরায় ঝালমুড়ি বেচে।”

“সে কি? কেন?”

“গায়ে তিনটে লঙ্কা ছুড়লেই যেখানে ভূত পালায়, সে গাঁয়ে ওঝার আর দরকার কী? ওঝা হয়ে ভূতের বেগার খেটে লাভ কী?”

“তা ঠিক। তবে লঙ্কাগুলোয় ভালোই ঝাল আছে।” ঝাল লাগা জিভে সি সি আওয়াজ করতে করতে দিদিভাই বললেন।

আমি লঙ্কাগুলো বেছে জানালার বাইরে ফেলতে ফেলতে খুব ভাবনায় পড়ে গেলাম। গদাই যে ঝালমুড়িওয়ালার পাশের গাঁয়ের লোক, সেটা দিদিভাইয়ের স্বামী জানলেন কী করে? ঝালমুড়িওয়ালা কোনও গাঁয়ের নাম তো বলেননি!


তিন


ট্রেনের মধ্যে আমি আর কথাবার্তা না বলে বই মুখে নিয়ে পড়তে লাগলাম। কারণ আমার আশেপাশে কেমন একটা যেন ভৌতিক পরিবেশ ঘিরে রয়েছে বুঝতে পারছিলাম। যাই বলছি, যাই করছি, কোথা থেকে যেন বারবার ভূতের প্রসঙ্গ চলে আসছিল। আমার স্টেশন চলে আসাতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দিদিভাইদের বিদায় জানিয়ে, আবার দেখা হবে বলে নেমে পড়লাম স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে রিকশ স্ট্যান্ডে অনেক রিকশ, কিন্তু গতরাত্রের কথা ভেবে কোনও রিকশতেই আর উঠতে ভরসা হচ্ছিল না। ঠিক করলাম টোটোয় যাব। টোটোয় উঠে মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখি বাচ্চুদার চারটে মিসড কল রয়েছে। চলন্ত ট্রেনের আওয়াজে শুনতে পাইনি। কল ব্যাক করলাম বাচ্চুদাকে।

বাচ্চুদা কানেক্ট করেই খুব ঝাড়তে লাগল, “কোথায়, থাকিস কোথায় হতভাগা? কল করলে ফোন তুলিস না কেন?”

“ট্রেনে ছিলাম তো। এইমাত্র স্টেশনে নামলাম। টোটোয় উঠে দেখলাম তোমার চারটে মিসড কল।”

“অ। কলকাতার কাজ মিটল?”

“হ্যাঁ, ঠিকঠাক মিটে গেছে।”

“বাদলদার মুখে শুনলাম, ওর জন্যে তোর ট্রেন মিস হয়েছিল। পরের স্টেশনে গিয়ে তোর ট্রেন ধরিয়ে দিয়েছে।”

“তোমার সঙ্গে বাদলদার দেখা হয়েছে? বাদলদা বলেছে তোমাকে? বাদলদার সঙ্গে বেশি মিশো না বাচ্চুদা। লোকটা সুবিধের নয় মোটেই।”

“সে কি রে? কেন বল তো?”

“সব কথা ফোনে বলা যায় নাকি! দেখা হলে বলব।”

“তুই এক কাজ কর তাহলে, তোর বাড়ি না গিয়ে সোজা আমাদের বাড়ি চলে আয়। রাত্রে খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি ফিরবি। আমি কাকিমাকে বলে দিচ্ছি।” বাচ্চুদা আমার মাকে কাকিমা বলে।

“কাল রাত থেকে ভালো ঘুম হয়নি, খুব টায়ার্ড বাচ্চুদা। আজকের প্রোগ্রামটা বাদ দাও।”

“আমি জানি না। মা সামনে আছেন, বলছেন, গজুকে বল, রাত্রে পরোটা আর হাঁসের ডিমের ডালনা খাওয়াব।”

একথার পর আর কিছু বলার নেই। টোটোওয়ালাকে বাচ্চুদার পাড়ার নাম বললাম। টোটোওয়ালা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল, “দশটা টাকা বেশি দেবেন ভাই।”


যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই রাত্রি হয়। টোটো থেকে নেমে বাচ্চুদার বাড়ির সদর দরজায় ঢুকেই দেখি বাদলদার রিকশটা দাঁড়িয়ে। ছ্যাঁত করে উঠল বুকটা। স্বস্তির কথা বাদলদাকে দেখলাম না। দেখতে পাওয়ার কথাও নয়। বাদলদা অশরীরী হয়েছে, তার রিকশটা তো আর হয়নি। আবছা অন্ধকারে দাঁড় করানো রিকশটাকে একটু দূর থেকে এড়িয়ে মস্ত উঠোনটা পার হয়ে গেলাম। বাচ্চুদার একতলার বৈঠকখানায় ঢুকে ডাকলাম, “বাচ্চুদা?”

বাচ্চুদা পাশের ঘর থেকে এ ঘরে এসেই কথা শুরু করে দিল, “এসে গেছিস? ভালোই হয়েছে। তোর জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। কাকিমাকে বলে দিয়েছি তুই আমাদের বাড়ি আছিস। রাত্রে একেবারে খেয়েদেয়ে যাবি। ক’দিন একটা কাজে খুব ব্যস্ত থাকার জন্যে তোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগই হয়নি। তার মধ্যে গতকাল রাত্রের ঘটনাটা হয়ে গেল, তোকে আগে থেকে বলে কয়ে করা উচিত ছিল। সেকথা পরে হবে, আগে তুই এক কাজ কর, বাথরুমে গিয়ে ভালো করে ফ্রেশ হয়ে নে। কাল রাত থেকে অনেক দৌড়োদৌড়ি করেছিস। মা খাবারদাবার আনছেন, শান্তিতে খাওয়াদাওয়া কর, তারপর কাজের কথায় আসব।”

বাচ্চুদা একবার শুরু করলে আর কাউকে কথা বলতে দেয় না, বকতেই থাকে। সত্যিই খুব ক্লান্ত লাগছিল। বাচ্চুদার বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে অনেকটা আরাম পেলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে আসতেই কাকিমা দুটো প্লেটে নোনতা সুজি নিয়ে এল। কাকিমার দারুণ রান্নার হাত, যা খাবার বানান, খাওয়ার পর মুখে লেগে থাকে। বাচ্চুদা নিজের প্লেট হাতে নিয়ে বলল, “নে, চালু কর।”

কাকিমা জিজ্ঞেস করলেন, “চা খাবি, না কফি খাবি গজু? কাল রাত্রে খুব হয়রান হয়েছিস শুনলাম। বাচ্চুটার মাথায় মাঝে মাঝে কী যে ভূত চাপে বুঝি না বাপু। আদ্যিকালের এই বাড়িটাকেও দিন দিন ভূতুড়ে বাড়ি বানিয়ে তুলছে! গজু কফি খেতে ভালোবাসিস তো! তোরা খা, আমি কফি করে আনছি।”

কাকিমা ভেতরে চলে যেতেই বাচ্চুদা একগাল সুজি নিয়ে ভরাট গলায় বলল, “বেশ কিছুদিন ধরে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম। দু-চারদিনের মধ্যেই তোকে ডেকে নিয়ে একটা ট্রায়াল দেব ভাবছিলাম। কিন্তু বাদলদার... আচ্ছা, বাদলদা সম্পর্কে তুই তখন কী যেন বলছিলি? লোকটা নাকি সুবিধের নয়! কী ব্যাপার বল তো।”

“তোমাকে বললে তুমি শক পাবে বাচ্চুদা। বাদলদা আমাদের মধ্যে আর নেই। নেই মানে, আছে, তবে ওই না থাকাই, মানে, থাকা না থাকা সমান...”

বাচ্চুদা বিরক্ত হয়ে আমায় ধমকে দিল, “ধ্যাত্তেরি, কী তখন থেকে মানে মানে করছিস? যা বলবি ঝেড়ে বল না।”

“বলছি তো! বাদলদা ইয়ে, মানে, বাদলদা অশরীরী হয়ে গেছে। কাল রাত্রে যেভাবে গাড়ি চালাল, কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।”

আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাচ্চুদা এমন হেসে উঠল হো হো করে, কাকিমা পর্যন্ত দৌড়ে এলেন কফি বানানো ছেড়ে। বাচ্চুদাকে ধমকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভূতের মতো গোটা পাড়া মাথায় করে ও আবার কী হাসি বাচ্চু? কী হয়েছে রে গজু?”

আমি কিছু বলার আগেই বাচ্চুদা বলল, “বলছি মা, বলছি। গজুর কথা শুনলে তুমি আমার থেকেও জোরে হাসবে। গজু বলছে, বাদলদা নাকি অলরেডি পটল তুলেছে! আর ভূত হয়ে ওকে গতকাল রাত্রে ঝিঙেরদা স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছে, ট্রেন পৌঁছোনোর আগেই।”

“খারাপ কী বলেছে শুনি? বলা নেই কওয়া নেই, গজুকে নিয়ে তোদের অমন বাঁদরামি করাটা মোটেই উচিত হয়নি। সেই নিয়ে তুই অমন হ্যা হ্যা করে হাসছিস? কিছু একটা হয়ে গেলে? গজু আমাদের সরল মনের ছেলে, ও কী করে বুঝবে, তোরা দুই ভূত মিলে কী ফন্দি আঁটছিস?”

কাকিমার ধমকানিতে বাচ্চুদা একটু অপ্রতিভ হল। বলল, “তা ঠিক। বাদলদা যে নিজের বুদ্ধিতে হুট করে এমন কাণ্ড করে বসবে, আমি ভাবিইনি মা! তবে আমার এক্সপেরিমেন্টটা সফল হয়েছে, সেটা তো মানবে?”

কাকিমা খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, “থাক, আর বাহাদুরি ফলাতে হবে না। টিআইআই থেকে বিটেক, এমটেক করে তোর মতো ছেলেরা বিদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর এক তুই হয়েছিস, একপেট বিদ্যে নিয়ে চোদ্দপুরুষের ভিটে আগলে এক্সপেরিমেন্ট করছিস!”

কাকিমা গজগজ করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন। আমরা দু’জনেই চুপ করে সুজির বাটি শেষ করতে মন দিলাম।

কাকিমা যা বললেন, সেটা আমাদেরও মনের কথা। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চুদা অদ্ভুত ব্রিলিয়ান্ট। এই গোবিন্দপুরে থেকে মাধ্যমিক, হায়ার সেকেন্ডারিতে যা রেজাল্ট করেছিল, জাস্ট ভাবা যায় না। জয়েন্ট দিয়ে টিআইআইতে চান্স পেয়ে চলে গেল খড়দা। সেখান থেকে পাস করে বীজপুর থেকে এমটেক করল। বাচ্চুদার দু-তিনজন বন্ধুর সঙ্গে আমার আলাপ আছে। তারা ছুটিতে বার তিনেক বাচ্চুদার বাড়ি এসেছিল, সেই সময়েই পরিচয়। তাদের কাছে শুনেছি, ক্যাম্পাসিংয়ে পাঁচখানা বাঘা কোম্পানি বাচ্চুদাকে সিলেক্ট করেছিল। তার মধ্যে দুটো ইউএসএ, একটা জার্মানি। সেসব ছেড়ে আমাদের গোবিন্দপুরেই বাচ্চুদা ফিরে এল। কাকিমাকে ফিরে এসে নাকি বলেছিল, যতই মাইনে, গাড়ি-বাড়ি দিক মা, চাকরি মানে চাকরই। ও আমার পোষাবে না। আমিও কাজ করব, কিন্তু সে নিজের আনন্দে। নিজের ব্যাবসার স্বার্থে কেউ আমার ইচ্ছের ওপর দুরমুশ চালাবে, সেটি হতে দিচ্ছি না। গোবিন্দপুরের লোকজন তারপর থেকেই বাচ্চুদাকে আড়ালে বলে খ্যাপাটে, ছিটিয়াল, আলসে।

তবে একথাও সত্যি, বাচ্চুদার পক্ষে এই ডিসিশন নেওয়া সহজ হয়েছিল বাচ্চুদার পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির সাপোর্ট ছিল বলে। বাচ্চুদা নিজেই বলে, আমাদের যা আছে, ভদ্রভাবে চললে ছ-সাত পুরুষ আরামসে চালিয়ে দেওয়া যাবে। কাজেই দুটো টাকা কামানোর জন্যে খামোখা দৌড়োদৌড়ি করার কোনও মানে হয়? এক পুকুর জলে দশ-বিশ বালতি জল ঢেলে খুব কিছু লাভ হবে কি? বাচ্চুদা যাই বলুক, কাকা-কাকিমা এবং আমরাও ফিল করি, বিদেশে চাকরি করলে বাচ্চুদার চালচলন, ঠাটবাট হয়ে একজন কেউকেটা হতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে বাচ্চুদা আমাদের একজন হয়েই রয়ে গেল।


চার


কাকিমা কফি নিয়ে ঘরে এলেন, সুজির খালি বাটি নিয়ে চলেও গেলেন। কথা বললেন না কোনও, এখনও রেগে আছেন।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে বাচ্চুদা বলল, “কালকের ব্যাপারটার জন্যে আমি খুব সরি রে। বাদলদার যে তর সইবে না, গতকাল তোর ট্রেন ধরানোর জন্যে ওরকম ঝুঁকি নিয়ে নেবে বুঝিনি।”

“আরে না না, আমার কলকাতার কাজটাও তো মিটে গেছে বাদলদা ট্রেনটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু অত স্পিডে রিকশটা ওড়াল কী করে, সেটা বোঝাও তো।”

বাইরে থেকে এই সময় কেউ একজন ডাকল, “এইটাই কোমলাক্ষবাবুর বাড়ি হল কী?”

আমরা দু’জনেই বাইরে বেরিয়ে দেখলাম নাদুসনুদুস একজন ভদ্রলোক সঙ্গে একজন টিকটিকির মতো লোককে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিকটিকির হাতে একটা ব্রিফ কেস, আর নাদুসনুদুস লোকটি আট আঙুলে দশ আংটি পরা দু’হাত তুলে নমস্কার করল।

বাচ্চুদা বলল, “নমস্কার, আমিই কমলাক্ষ বক্সী। আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।”

“আরে ছো ছো, হামাকে চিনবেন কী কোরে? আমি তো এমন কিছু ফেমুস হল না! হামার নাম সূরযরাম মিনা।”

আমরা সবাই ঘরে এসে বসার পর বাচ্চুদা বলল, “তা সূরযবাবু, হঠাৎ আমার কাছে, কী ব্যাপার বলুন তো?”

“বলবো বোলেই তো আসলাম দাদা। তার আগে হামার পোরিচোয় ভি জেনে লিন। হামাদের এখানে তিশ-পয়তিশ সাল হয়ে গেলো। হামার দাদা, মানে গ্র্যান্ডফাদার রাজস্থান সে ইখানে এসে বেওসা শুরু করল। হামার পিতাজী সেই বেওসামে বহুত তরক্কি আনল। ইখন হামাদের জিতনা কারোবার, সোব হামি সামলাই। দাদাজী বহুদিন গুজরে গেল। পিতাজী আভি ভি বিজিনেস দেখেন, কিন্তু যো কুছ ডসিশন সো হামিই লিয়ে থাকি। ইখন হামি এসেছি আপনার সঙ্গে একটা বিজিনেস ডিল ফাইন্যাল করতে।”

বাচ্চুদা আকাশ থেকে পড়ল। “কিন্তু আমি তো কোনও বিজনেস করি না সূরযবাবু। আমার দাদু, বাবাও কখনও কোনও বিজনেস করেননি।”

“সো তো হামি জানে কোমোলবাবু। বঙ্গালিরা লিখাপড়া কোরে, বঙ্গালিরা ইনটেলিজেন হোয়। টাগোর আছেন। সোত্তোজিত রে আছেন। কিন্তু বঙ্গালিরা বিজিনেস পোছোন্দ কোরলো না। হামি বিজিনেস ভি করি, গুণের কদরভি কোরি। হামি টাগোর পড়িয়েছে, রের ফিলম ভি দেখিয়েছে। আপনার মারভিলাস ইনভেনসন ভি দেখল। এ যোগেন্দর, ব্রিফকেস দেকে তু বাহার রুক।”

সূরযবাবু শেষ কথাটা বলল টিকটিকির মতো সেই লোকটাকে। বাচ্চুদার সঙ্গে যতক্ষণ কথা বলছিল, কী নরম আর মোলায়েম গলা, কিন্তু টিকটিকির মতো দেখতে যোগেন্দরকে যখন বলল, গলা কর্কশ হয়ে উঠল। যোগেন্দর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই সূরযবাবু ব্রিফকেস খুলে বাচ্চুদার দিকে ঘুরিয়ে ধরল। বলল, “ইখানে দোশ লাখ আছে কোমোলবাবু। আপনার ইনভেনসনটা হামার চাই। না বোলবেন না।”

“তার মানে? কীসের কথা বলছেন বলুন তো?”

“হামি সোব জানে কোমোলবাবু। বাদলদাদার রিকশ জানে। আপনার এই ব্রাদার লাস্ট নাইটে হামাদের স্টিশনে ট্রেন ফেল কোরে নেক্সট স্টিশনে গিয়ে সেই ট্রেনে বোর্ড কোরে নিলো। সোব জানে।”

বাচ্চুদা আরও অবাক হয়ে বলল, “গজুর ট্রেন ধরার সঙ্গে আপনার আমাকে টাকা দেওয়ার কী সম্পর্ক?”

“হামি ওই রিকশর ফেকটোরি বানাবে। আপনি হামার লোককে সোব শিখিয়ে দিবেন।”

“আচ্ছা, এবার বুঝেছি। কিন্তু আপনি এতসব কী করে জানলেন?”

“ইটা আপনি কী করে বোললেন কোমোলবাবু? আপনি টিআইআই থেকে বিলিরিয়ান্ট রেজাল্ট করলেন, অচ্ছা অচ্ছা নোকরি মিলল, ফিরভি কোরলেন না, বাড়িতে বোসে গেলেন। বাড়িতে আপনি চুপচাপ বোসে থাকবেন? কুছু কোরবেন না? আপনার বেরেনটা ‘আইডিয়াল’ হইয়ে থাকবে? আপনি বাদলদাদার রিকশ লিয়ে খুটখুট কামে লাগলো। সে কাম সকসেস ভি হোলো। ই খবোর হামি না রাখলে বিজিনেস চালাবো কী করে বোলেন তো?”

“কিন্তু, এ রিকশ কমার্শিয়ালি চালাবার আগে প্রশাসনের অনুমতি লাগবে, পারমিট বের করতে হবে।”

“ওসোব কুছু না। পেপার-উপার, পারমিট-উরমিট সূরযরামের বাঁয়া হাত কা খেল হ্যায় দাদা। উসব লেকে আপ বেফিকর রহিয়ে। মশাডিহিমে হামার একটা শেড হোলো, ওখানে একদিন আপনাকে লিয়ে যাব। আপনি যেমন বোলবেন, সোব কিছু বানিয়ে লিব। এক-দো মাহিনার অন্দর প্রাডাকশন ভি চালু কোরে দেবো।”

বাচ্চুদা কিছু বলল না, চিন্তা করতে লাগল। সূরযবাবু আবার বলল, “আপনি কুছু চিন্তা কোরবেন না দাদা। দোশ লাখ এখোন দিয়েছি। আপনি টাইম লিন, চিন্তা করে বলুন আপনার কোতো লাগবে। আমি আরো দেবে। আজ বুধবার, নেক্সট সোমবার হামি আবার আসবে। সেইদিন ডিলটা ফাইন্যাল করে লিবে। আমাদের মধ্যে লিখাপড়া যো করার সোব কোরে লিবে। হাঁ, লেকিন একবাত জরুর সোচে লিন, আপনার এহি নয়া রিকশর নাম কী হোবে? ঠিক আছে দাদা, আপনাকে আর বিরক্ত করবো না। আমি এখন চলি। সোমবার হামি আসবে।”

সূরযরাম চলে যেতে আমি লাফিয়ে উঠলাম। “বাচ্চুদা কী করেছ, বাদলদার রিকশ বানিয়ে দশ লাখ!”

“একটা গাঁট্টা খাবি খটাস করে। বাদলদার রিকশ? ওটার পেছনে কত দিমাগ আর খাটনি গেছে তুই জানিস? তুই তো ভেবেছিলি বাদলদার ভূতের পাল্লায় পড়েছিস। মাটি থেকে মোটামুটি কুড়ি মিটার ওপরে রেখে ওই স্পিডে রিকশ চালানো ছেলেখেলা নয় রে গজু।”

“সে তো নয়ই। তা না হলে সূরয টাকা ঢালতে আসে?”

“দশ লাখ ক্যাশ দিয়ে গেল, কোনও রিসিট নিল না। টাকাপয়সা ওর কাছে খোলামকুচি, সেটা কি বুঝতে পারছিস?”

“টাকাটা নিয়ে কী করবে বাচ্চুদা?”

“ভাবছি বাচ্চাদের জন্যে একটা স্কুল খুলব। ওই ‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে’ কিংবা ‘আ ফর অ্যাপল’ টাইপের নয়। আর বাচ্চারাও কোনও বড়লোকের বাচ্চা নয়, যাদের জন্ম থেকেই বাবা-মায়েরা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর জন্যে ঘোড়ার মতো দৌড় করায়।”

“সে আবার কেমন স্কুল গো বাচ্চুদা?”

“সে তুই বুঝবি না। আমার মাথায় আছে। বেশি লেখাপড়া না শিখলেও চলবে, কিন্তু হাতের কাজ শিখতে হবে। যে যেরকম কাজ করে আনন্দ পাবে, সেই কাজই শিখবে। দাঁড়া, মাকে টাকা ক’টা দিয়ে আসি, সাবধানে রেখে দিক।”


রাত্রে হাঁসের ডিমের ডালনা দিয়ে পরোটা খেতে খেতে বাচ্চুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার ওই বুলেট রিকশর টেকনোলজিটা কী গো?”

পরোটা মুখে নিয়ে বাচ্চুদা বলল, “বাহ্‌, বুলেট রিকশ নামটা বেড়ে দিয়েছিস তো! নামটা রেখে দিলাম। এর থেকে ভালো নাম মাথায় না এলে বুলেট রিকশই হয়ে যাবে। টেকনোলজির কথা জিজ্ঞেস করছিলি, সবটা তো আর খুলে বলা যাবে না। তাহলে তো সবাই বানাতে লেগে যাবে। কয়েকটা সমস্যার কথা মাথায় রেখে সেগুলোর সহজ সমাধানের চেষ্টা করেছি। যেমন ধর, মাটি থেকে রিকশর ওজন, কিছু ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে দুই যাত্রী, প্লাস যে চালাবে, অন্তত আড়াইশো-তিনশো কিলো ওজন, মিটার কুড়ি-পঁচিশ ওপরে তুলতে হবে। সেটার জন্যে জোরালো কিন্তু হালকা প্রপেলার, ইঞ্জিন এসব লাগবে। ইঞ্জিন চলবে কীসে? পাওয়ার লাগবে! হালকা ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, প্লাস রিকশর প্যডেল ঘুরিয়ে সেই পাওয়ার জেনারেট করতে হবে। এবার ওপরে উঠে গিয়ে সামনে চলবে কেন? তার জন্যেও টারবো ফ্যান, জেট ইঞ্জিন লাগবে। সেগুলো চালাতেও পাওয়ার চাই। ব্যাপারগুলো এমন কিছু কঠিন নয়, বরং বেশ সহজ। ইঞ্জিনিয়াররা সবই জানে, কিন্তু অধিকাংশই বাঁধা গতের বাইরে চিন্তাই করে না।”

কাকিমা আমাদের পাতে আরেকটা করে গরম পরোটা দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন, “বাদলের রিকশ নিয়ে কী ক’দিন খুটখুট করলি, তারই দাম হয়ে গেল দশ লাখ! আজকাল টাকাপয়সা এত সস্তা হয়ে গেল নাকি রে?”

বাচ্চুদা হেসে কাকিমাকে বলল, “ওটা এখন বাদলের রিকশ নয় মা, বুলেট রিকশ। গজু নাম দিয়েছে।”

কাকিমা খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “সে কি রে? বাদল এই বয়সে তার নাম বদলে নিল? তাও আবার বুলেট? ওর মা জানে?”

বাচ্চুদা বলল, “ওহ্‌ মা, তুমি না... বাদলদার নাম বুলেট হতে যাবে কেন? আমি যে রিকশর মডেলটা আবিষ্কার করেছি, গজু তার নাম রেখেছে বুলেট রিকশ।”

“হ্যাঁ কাকিমা, রিকশটা কাল আমাকে একদম বুলেটের মতো ঝিঙেরদহ স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল বলেই না ট্রেনটা ধরতে পারলাম!”

কাকিমা মুচকি হাসলেন। বললেন, “তুই যে কাজের ছেলে হয়ে গেলি বাচ্চু! একেবারে আবিষ্কর্তা হয়ে গেলি? শোন, কাল তোর ওই রিকশতে আমায় কালীবাড়ি নিয়ে যাবি, আমি মায়ের পুজো দেব। তোর বাবাও বলছিল আমার সঙ্গে যাবে।”

“বাবাকে বলেছ? বাবা কী বললেন?”

“তোর বাবা বলল, আমি জানতাম বাচ্চুটা এমন কিছু একটা করে সবাইকে চমকে দেবে। আমাদের খুব খারাপ লাগত রে, তোকে নিয়ে পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় পরিজন বড্ড হাসাহাসি করত। এতদিনে আমাদের মনে শান্তি হল বাবা।”

তারপর লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাকিমা আমাদের পাতে আরেকটা করে হাঁসের ডিম দিলেন। আমি খুব একটা আপত্তি করলাম না। এমন আনন্দের দিনে হাসতে হাসতে একটার বেশি হাঁসের ডিম খাওয়াই যায়।

___


অঙ্কনশিল্পীঃ সুজাতা


1 comment: