ছোটো গল্পঃ ভিকু - কস্তুরী মুখার্জি



ভিকু


কস্তুরী মুখার্জি



রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের মন্দিরকে বাঁয়ে রেখে দশ পা এগোলেই মিশনের দিঘির মাঠ। টলটলে কালো জলের বিশাল দীঘিকে ঘিরে খেলার মাঠ। বিকেল হতে না হতেই ছোটোবড়ো সব বয়সের ছেলেরা ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে চলে আসে খেলতে। আবার ক্রিকেটের কোচিং ও হয়। প্রত্যেক শনিবার বিকেল ও রবিবার সকালে ক্রিকেটের দিকপাল খেলোয়াড় নান্টু বসু জুনিয়রদের কোচ করান। দিঘির মাঠ সবসময়ই তাই বেশ জমজমাট।

অর্ঘ্য ক্রিকেটের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে চলেছে মাঠের দিকে। দূর থেকে নান্টুকাকুকে দেখে হাত নাড়াল। ডান পাশে চোখ ঘোরাতেই অর্ঘ্য ছেলেটাকে দিঘির পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। রোজকারমতো পিছনে হাত দিয়ে একাগ্র দৃষ্টিতে নান্টুকাকু কীভাবে শেখাচ্ছেন তাই দেখছে। খেলার আগে যে শরীরচর্চা করতে হয় সেগুলো অসীম মনোযোগের সঙ্গে খেয়াল করছে।

“কী রে, কী নাম তোর?” অর্ঘ্য কাছে এসে জিজ্ঞেস করল।

চমকে উঠে ছেলেটা অর্ঘ্যর দিকে তাকিয়ে একটু কুঁকড়ে গেল। চোখেমুখে ভয়ের একটা ছাপ। দৌড়ে পালাতে গেল। অর্ঘ্য ওকে ধরে ফেলল। “কোথায় পালাচ্ছিস? নাম বললি না?”

“ভিকু বাগ।” নামটা বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে গেল।

“খেলা দেখতে ভালো লাগে?”

“হ্যাঁ।”

“খেলতে ইচ্ছে করে না?”

কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ভিকু।

“কী রে, কথা বলছিস না কেন?” অর্ঘ্য হাতে একটা চাপ দিল।

করুণ দুটো চোখ তুলে অর্ঘ্যকে একবার দেখে মাথাটা নামিয়ে নিল ছেলেটা। “করে।” মাটির দিকে চোখ নামিয়েই উত্তর দিল।

“তাহলে খেলিস না কেন? আমাদের সঙ্গে খেলতে পারিস তো।” অর্ঘ্য মিষ্টি করে বলল।

“অর্ঘ্য! কী করছিস তুই? ওয়ার্ম আপ করবি না? কাকু রেগে যাবে।” ঝিল মাঠ পরিক্রমা করতে করতে জিজ্ঞেস করল।

“যাচ্ছি, যাচ্ছি।” অর্ঘ্য হাত নেড়ে উত্তর দিল। ভিকুর দিকে তাকিয়ে, “চল, কাকুর কাছে নিয়ে যাই তোকে।” বলে ওর হাতটা টেনে ধরতেই ভিকু ছাড়িয়ে ভয়ার্ত চোখে বলল, “না না। আমি যাই।”

“তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন রে? তুই খেলতে গেলে তোকে কেউ বকবে?”

“মা বকবে।” একই গলার স্বরে উত্তর দিল ভিকু।

“কেন?” অর্ঘ্য অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। খেলতে গেলে মা বকবে কেন এর কারণ কিছু খুঁজে পেল না।

“আসলে আমি ওই মন্দিরের পাশের চায়ের দোকানে কাজ করি। এখানে তোমাদের খেলা দেখতে মালিককে লুকিয়ে পালিয়ে আসি। মালিক জানতে পারলে আমার রোজ দেবে না। আর টাকা না নিয়ে বাড়ি গেলে মা প্রচুর মারবে।” একদমে কথাগুলো বলে গেল ভিকু।

“তুই চায়ের দোকানে কাজ করিস?” অর্ঘ্যর মনে হল কথাটা শুনে ও যেন আকাশ থেকে পড়ল। বুকের ভেতর একটা কষ্ট চারিয়ে গেল।

“হ্যাঁ।” ঘাড় নেড়ে উত্তর দিল ভিকু।

“পড়াশুনা করিস না?”

“কে পড়াবে আমাকে বলো? মা লোকের বাড়ি বাসন মাজে। বাবা নেই।”

“তাই বলে তুই পড়বি না! তুই পড়তে চাস?”

“চাইলেই বা! পড়া তো হবে না।”

“বাবার হাই স্কুলে চেনাজানা আছে। দাঁড়া, তোর জন্য বলব।”

“না গো, আমার পড়া হবে না। আমি কাজ না করলে চলবে না।”

অর্ঘ্য খানিকক্ষণ ভিকুর দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে করে বলল, “বিকেলে খেলতে তো আসতে পারিস।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভিকু বলল, “কী করে আসব? দোকানে সকাল আটটায় আসি আর দুপুরে ভাত খেতে একটু সময়ের জন্য বাড়ি যাই, তারপর আবার দোকানে চলে আসি। রাত দশটায় বাড়ি ফিরি।” অর্ঘ্য ব্যথাভরা চোখে ওর দিকে একবার তাকিয়ে দেখল।

“অর্ঘ্য! এই অর্ঘ্য! তুই এখানে তখন থেকে ছেলেটার সঙ্গে কী কথা বলছিস? কাকু তোকে ডাকছে।” মিঠাই হাঁপাতে হাঁপাতে অর্ঘ্যর কাছে এসে বলল। ভিকুকে দেখে একটু হেসে অর্ঘ্যকে  বলল, “ও তো রোজ এখানে দাঁড়িয়ে খেলা দেখে। তুই দেখিসনি?”

“হুঁ। দেখেছি বলেই আজ ওর সঙ্গে কথা বলছিলাম। ওর খুব খেলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু চায়ের দোকানে কাজ করে। মালিক ছুটি দেয় না, তাই আসতে পারে না। স্কুলেও পড়তে পারে না। রোজগার করতে হয়।” করুণ মুখ করে অর্ঘ্য মিঠাইকে বলল।

“অর্ঘ্য, ওই দ্যাখ কাকু আসছে। চল চল।”

“আসি রে ভিকু।”

“হ্যাঁ, আমিও যাব।”

অর্ঘ্য আর মিঠাই দৌড়ে নান্টুকাকুর দিকে এগিয়ে গেল।

“কী ব্যাপার অর্ঘ্য? মাঠে এসেও জয়েন করছিস না! তখন থেকে দেখছি ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে চলেছিস! ডেকে পাঠাচ্ছি আর তুই গুরুত্বই দিচ্ছিস না!” বোঝাই যাচ্ছে নান্টুকাকু প্রচণ্ড ক্ষেপে গেছেন।

অর্ঘ্য মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“খেলার ইচ্ছে না থাকলে বল, বাবাকে ডেকে বলছি। নাম কাটিয়ে নে।”

“আর কোনোদিন হবে না কাকু।” চোখ দিয়ে জল পড়ছে অর্ঘ্যর।

নান্টু বসুর মনটা একটু নরম হল। “কী কথা বলেছিলি ওর সঙ্গে?”

“কাকু, ওই ছেলেটার নাম ভিকু বাগ। রোজ দেখি ভিকু খুব উৎসাহ নিয়ে আমাদের খেলা দেখে। আমরা যখন বল ছোড়া প্র্যাকটিস করি, ও হাত মুঠো করে ওইভাবে অভ্যাস করে।” বলে একটু থামতেই নান্টুকাকু বললেন, “তো?”

“না, আজকেও ঢুকতে গিয়ে ওর দিকে চোখ পড়ে যায়। তাই এগিয়ে গিয়ে কথা বলছিলাম।” ভয়ে ভয়ে অর্ঘ্য কাকুর দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিলে বলল, “কাকু, ওর না, খেলার খুব শখ। কিন্তু খুব গরিব। মা লোকের বাড়ি বাসন মাজে। ও মন্দিরের পাশের ওই চায়ের দোকানটায় কাজ করে। তাই পারে না।”

“এরকম কত ছেলে আছে। তুই কতজনের দুঃখ মেটাতে পারবি? এসবে মন দিতে হবে না। চল চল।”

“কাকু, একটা কথা বলব?” অর্ঘ্য কিছুটা ভয়, কিছুটা প্রত্যাশা নিয়ে কাকুকে জিজ্ঞেস করল।

নান্টুকাকু ঘাড়টা ঘুরিয়ে অর্ঘ্যর দিকে তাকালেন।

“ভিকুর মালিককে গিয়ে একটু বলবে যাতে ওকে শনিবার বিকেলে একঘণ্টা আর রবিবার সকালে একঘণ্টার জন্য ছাড়ে? তাহলে ও খেলতে আসতে পারে। ওর যেন টাকা না কাটে।”

নান্টু বসু অবাক হয়ে অর্ঘ্যকে দেখছেন।

“দ্যাখ অর্ঘ্য, আমি বললেই ওর মালিক ওকে ছাড়বেই বা কেন আর ছাড়লেও টাকা দেবে কেন? সেটা হয় নাকি?”

“তুমি তো কোচ। তোমার কথা ঠিক শুনবে।”

“আচ্ছা, একটা কথা বুঝলাম না। ও নিজেই তো বলতে পারে। অথবা ওর মাকে বলে আসতে পারে। আমি না হয় এখানে ফ্রিতে কোচ করালাম।”

“না গো, ও টাকা না নিয়ে বাড়ি গেলে ওর মা খুব মারবে।”

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে নান্টুকাকু অর্ঘ্যর পিঠে হাত দিয়ে মোলায়েম স্বরে বললেন, “ডাক ওকে। দেখি কথা বলে।”

অর্ঘ্যর মনে হল ও এখুনি এক লাফ দিয়ে একটু নেচে নেয়। কিন্তু তা না করে চুপচাপ মিঠাই আর ও ভিকুর কাছে দৌড়ে গেল। “ভিকু, ভিকু…” দৌড়োতে দৌড়োতে ডাকতে লাগল।

ভিকু ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দেখে দাঁড়াল।

“ভিকু তোকে কাকু ডাকছে। চল।” অর্ঘ্য হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

“না, আমি যাব না।”

“কাকু ডেকেছে আর তুই বলছিস যাবি না? চল।” অর্ঘ্য আর মিঠাই দু’জনে দুইদিক থেকে ভিকুর হাত টেনে ধরে নান্টুকাকুর কাছে নিয়ে চলল।

কাকু একবার আপাদমস্তক ছেলেটাকে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোর নাম ভিকু?”

এক অজানা আতঙ্কে পাংশু হয়ে গেছে ভিকুর মুখ। কোনোরকমে উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”

“কোথায় থাকিস?”

“রুইয়া।”

“সে কি রে! তুই রুইয়া থেকে রোজ মন্দিরের সামনে চায়ের দোকানে আসিস?” বিস্ময়ে হতবাক নান্টুকাকু। “অর্ঘ্য বলছিল তোর মা লোকের বাড়ি কাজ করে। তাহলে তুই এত ছোটো মানুষ কাজ করিস কেন?” হতচকিত ভাবটা কাটিয়ে উঠে কাকু জিজ্ঞেস করলেন ফের।

ভিকু চুপ করে আছে।

“কী রে, কাকুর কথার উত্তর দে! চুপ করে আছিস কেন?” মিঠাই এক তাড়া লাগাল।

ভিকুর ভেতরটা ঝড়ো হাওয়ার মতো কাঁপছে। জলভরা চোখদুটো তুলে ভিকু কাকুর দিকে তাকিয়ে বলল, “জেঠু, আমরা বড়ো গরিব। মায়ের কোমরে খুব ব্যথা। ডাক্তারকাকু বিশ্রাম নিতে বলেছে। দু-বাড়ির বেশি কাজ করতে পারে না। আমি টাকা না নিয়ে গেলে খাব কী? আমার একটা দিদি আছে। ও না নড়তে পারে, না কথা বলতে পারে। দাওয়ায় ঘষে ঘষে এসে বসে। খিদে পেলে চিৎকার করে মুখ দিয়ে আওয়াজ করে। ডাক্তারকাকু বলেছে দিদি কোনোদিন সুস্থ হবে না। আমার খুব খেলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু খেলব কীভাবে?"

নান্টু বসু তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিয়ে ভিকুকে দেখছিলেন। দৃষ্টিটা ভিকুর দিকে নিবদ্ধ করেই মিঠাইকে বললেন, “মিঠাই, বলটা নিয়ে আয় তো। ক্রিকেটের ব্যাপারে ওর কেমন নলেজ আছে দেখি।”

মিঠাই আর অর্ঘ্য দৌড় লাগাল। ভিকু নান্টুকাকুর সামনে দাঁড়িয়ে ঘামছে। ‘কী গেরোয় পড়লাম। মালিকজেঠু আজ আমার চামড়া তুলে নেবে।' কাঁচুমাচু মুখে দূরে তাকিয়ে আছে।

“কাকু, নাও।” মিঠাই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

“ভিকু, ওই যে দূরে উইকেট দেখছিস, এই বলটা ঠিকমতো উইকেটে থ্রো কর তো।”

ভিকু একটু মিইয়ে গেল। পারবে কি? মিনিট খানেকের মধ্যে মনোযোগ স্থির করে বলটা নিয়ে উইকেট লক্ষ্য করে ছুড়লো। ওর বল ধরা আর ছোড়ার টেকনিক দেখে নান্টুকাকু মুগ্ধ।

“হবে রে ছেলেটার। পার্টস আছে। অর্ঘ্য, এক্সেলেন্ট জব।” ভিকুকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে কাকু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “কাল তোর মালিকের সঙ্গে কথা বলব। আর তোদের বাড়ি গিয়ে তোর মায়ের সঙ্গে দেখা করব। তুই যদি সত্যি খেলিস বা খেলতে পারিস, তবে তোকে চায়ের দোকানে আর কাজ করতে হবে না। আমার স্থির বিশ্বাস তুই পারবি। সংসারের ভার আমাদের একটা সংস্থা আছে, তারা নেবে।”

ভিকু সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে কাকুর দিকে তাকিয়ে। “জেঠু!” মুখে হাসি, চোখে জল।

পাশে অর্ঘ্য, মিঠাইরা হুর রে বলে মাঠ কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল।


___


অঙ্কনশিল্পীঃ অনির্বাণ সরকার


No comments:

Post a Comment