ছোটো গল্পঃ ডিফেন্সের প্রাচীর ভেঙে - সৌরভকুমার ভূঞ্যা


ডিফেন্সের প্রাচীর ভেঙে


সৌরভকুমার ভূঞ্যা



এক


ক্রমশ মেজাজ খারাপ হচ্ছিল প্রশান্তর। বারবার বলা সত্ত্বেও একই ভুল করে যাচ্ছে ভাস্কর। কোমরে দু’হাত রেখে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে ছেলের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে প্রশান্ত। চোখেমুখে তীব্র রাগ আর বিরক্তি। কঠের সুরে বলে, “কী হয়েছে বল তো?”

“আমি তো চেষ্টা করছি।” ভাস্কর মিনমিন করে বলে।

“চেষ্টা!” ক্রুদ্ধ স্বরে বলে ওঠে প্রশান্ত। “এই তো চেষ্টার নমুনা। সহজ শটও আটকাতে পারছিস না! বার বার একই ভুল করে যাচ্ছিস!”

“সরি।”

“সরি! বলি মনোযোগটা কোথায় পড়ে আছে?”

কোনেও জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ভাস্কর।

সত্যিই আজ খেলার প্রতি মনোযোগ নেই তার। গতবছর থেকে স্পোর্টিং ক্লাব ফুটল কোচিং সেন্টারে খেলা শিখছে সে। আজ বিকেলে প্র্যাকটিস বন্ধ। তাই সকালে অনেকটা সময় প্র্যাকটিস হয়েছে। শরীর এমনিতেই ক্লান্ত। কিন্তু তার থেকেও বড়ো কথা মনটা ক্লান্ত। সেটা আজ নয়, বেশ কিছুদিন ধরে।

গোল কিপিং একদম পছন্দ নয় ভাস্করের। গোল পোস্টের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভালো লাগে না। তার ইচ্ছা স্ট্রাইকার হওয়ার। পায়ের কাজ আর গতি দিয়ে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বিপক্ষের জালে বল জড়িয়ে দেওয়া, এই তার সবসময়ের স্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেছে। মনের ইচ্ছের কথা কোনোদিন বলতে পারেনি বাবাকে। বাবা ভীষণ রাগী। বাবার সামনে মুখ তুলে কথা বলতেই ভয় করে। তাই মন না চাইলেও বাবার চাপিয়ে দেওয়া ইচ্ছাকে মেনে নিয়েছে।

প্রশান্ত ফুটবল পাগল। একসময় চুটিয়ে ফুটবল খেলেছ। গোল কিপিং করত সে। স্থানীয় ক্রীড়ামহলে গোল কিপার হিসেবে বেশ নামডাক ছিল তার। ইচ্ছে ছিল বড়ো গোল কিপার হওয়ার। কলকাতার কোনও ক্লাবে খেলার। কিন্তু নানা কারণে সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা পূর্ণ করতে ছেলেকে ভালো গোল কিপার বানাতে চায় সে। গোল কিপার ভাস্কর গাঙ্গুলি তার প্রিয় খেলোয়াড়। তাঁর নামে নিজের ছেলের নাম রেখেছে, ভাস্কর। ক্লাস সেভেনে উঠতেই তাকে স্পোর্টিং ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি নিজেও নিয়মিত তালিম দেয়।

আজও সেরকম তালিম দিচ্ছিল। কিন্তু একটা জিনিস সে স্পষ্ট বুঝতে পারে ভস্করের আজ খেলায় মনোযোগ নেই। ভেবে পায় না তার হঠাৎ হলটা কী।

দিন পাঁচেক আগের ঘটনা। বিকেলে সেন্টারে গেছে ভাস্কর। কিন্তু অনুশীলন হয় না। কোচ অশোকবাবুর এক বন্ধু আসবেন। কিছু জরুরি মিটিং আছে। তাই তিনি ভাস্করদের বলেন নিজেরা প্র্যাকটিস করতে। অশোকবাবুর সেই বন্ধু একসময় ভালো ফুটবল খেলতেন। এখন একটি ছোটো ক্লাবের কোচ।

ভাস্কররা মাঠে নিজেদের মধ্যে দল ভাগ করে খেলছিল। সুযোগ পেয়ে গোল পোস্টের নিচে দাঁড়ায়নি ভাস্কর। স্ট্রাইকারে খেলছিল। পায়ের ছোটো ছোটো কাজ আর গতি দিয়ে বিপক্ষের খেলোয়াড়কে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছিল। নিজের পছন্দের জায়গায় এসে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরে সে। খেলায় মেতে ছিল তারা। বুঝতে পারেনি কখন একটা গাড়ি মাঠের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার প্রতি নজর যায় অশোকবাবুর বন্ধুর। গাড়ি থেকে নেমে তিনি তাকে ডাকেন।

“কী নাম তোমার?”

“ভাস্কর।”

“তোমার পায়ের কাজ তো দারুণ! গতিও ভালো আছে। তোমার বয়স কম। মন দিয়ে প্র্যাকটিস করলে তুমি ভালো স্ট্রাইকার হতে পারবে।”

ভাস্করের সুপ্ত ইচ্ছেটা সেই কথা শোনার পর ডানা মেলে দেয়। কথাগুলো মনের মধ্যে সবসময় ঘোরাফেরা করতে থাকে। সেদিনের পর থেকে গোল কিপিংয়ে ঠিকঠাক মনযোগ দিতে পারে না সে। অশোকবাবু এসব জানতেন না। ভাস্করের অমনোযোগের ব্যাপারটা প্রশান্তকে জানান। প্রশান্ত সহসা ছেলেকে কিছু বলেনি। কিন্তু এখন ব্যাপারটা মনে পড়ে যায় তার। মেজাজ গরম ছিল। আরও গরম হয়ে যায়। বল ছেড়ে এগিয়ে যায় ছেলের দিকে।

“তোর মন কোথায়? এতবার বলা সত্ত্বেও কেন একই ভুল বার বার করছিস?”

ভাস্কর কিছু না বলে আগের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

“অশোকবাবুও পরশু বলছিলেন এখন নাকি তোর খেলায় মনযোগ নেই। ব্যাপারটা কী?”

ভাস্করের মনের মধ্যে একটা আলোড়ন ওঠে। ইচ্ছেটাকে দমন করে রাখতে পারে না সে। কোনোরকমে মনে সাহস এনে মিনমিন করে বলে, “আমার ভালো লাগে না।”

“ভালো লাগে না! খেলতে লাগে না!”

“খেলতে ভালো লাগে।”

“তবে?”

“আমার গোল কিপিং করতে ভালো লাগে না।”

“গোল কিপিং ভালো লাগে না! তাহলে কী ভালো লাগে?”

“আমার গোল করতে ভালো লাগে। আমি স্ট্রাইকার হতে চাই।” সাহস করে মনের কথা বলেই ফেলে ভাস্কর।

প্রশান্তর যেন বিশ্বাস হতে চায় না তার কথা। সহসা কিছু বলতে পারে না সে। ভাস্কর বলে চলে, “গোল পোস্টের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে না। আমার ইচ্ছে করে বল পায়ে ছুটতে। বিপক্ষের গোলে বল ঢোকাতে।”

তখনও প্রশান্ত কিছু বলে না।

“কলকাতার এক নামী স্ট্রাইকার আমাদের সেন্টারে এসেছিলেন। তিনি আমার খেলা দেখে বলেছেন আমার পায়ের কাজ দারুণ। ঠিকঠাক অনুশীলন করলে আমি ভালো স্ট্রাইকার হতে পারব। আমিও স্ট্রাইকার হতে চাই।”

শেষ কথাটা একটু জোর দিয়েই বলে ভাস্কর। আর সেটা গিয়ে বুকে জোর ধাক্কা দেয় প্রশান্তর। তার স্বপ্নটা এভাবে হারিয়ে যাবে কিছুতে মানতে পারে না। ক্রোধ আর বিরক্তিমাখা সুরে বলে, “গোল কিপিংকে তোর খারাপ মনে হচ্ছে! জানিস, একটা দলের গোল কিপারই মূল স্তম্ভ? তার ওপর নির্ভর করে খেলার ভাগ্য? আসল দূর্গ রক্ষা করার দায়িত্ব তার। সেই শেষ প্রহরী। চাইলেই কেউ ডিফেন্ডার কিংবা স্ট্রাইকার হতে পারে। কিন্তু গোল কিপার সকলে হতে পারে না। তার জন্য অনেক দক্ষতা দরকার। তাকে তোর খারাপ মনে হচ্ছে! কলকাতা থেকে আসা কোনে এক খেলোয়াড় একটা কথা বলে দিল, আর তাতেই তোর মাথা ঘুরে গেছে!”

ভাস্কর বুঝতে পারে বাবা রেগে যাচ্ছে। তবুও নিজেকে দমন করতে পারে না সে। বলে, “তাঁর কথার জন্য নয়। আমার নিজেরই গোল কিপিং করতে ভালো লাগে না। আমার স্বপ্ন…”

স্বপ্ন আর পূরণ হয় না। তার আগেই ঠাস করে একটা চড় এসে পড়ে গালে। মারের চোটে মাথাটা সহসা ঘুরে যায়। চোখটা ছলছল করে ওঠে। আর কিছু বলার সাহস হয় না।

প্রশান্ত কড়া সুরে বলে, “মাথা থেকে উলটোপালটা চিন্তা মুছে খেলায় মন দে। আমি চাই তোকে বড়ো গোল কিপার হিসেবে দেখতে। আর সেটাই শেষকথা।”

আগের জায়গায় ফিরে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায় প্রশান্ত। কঠোর সুরে বলে, “চোখের জল ঝরিয়ে কোনও লাভ হবে না। যেভাবে বলছি সেভাবে অনুশীলন কর। এরপরও যদি দেখি সেই আগের মতো ভুল হচ্ছে, তাহলে তোর আস্ত রাখব না।”

বাবার রুদ্রমূর্তি দেখে ভাস্করের বুক কেঁপে ওঠে। মনে মনে স্থির করে, আর কোনোদিন স্ট্রাইকার হওয়ার ভাবনা মনে আনবে না। বাবার কথামতো কাজ করবে। চোখের জল মুছে বার পোস্টের নিচে এসে দাঁড়ায় সে।

কিন্তু চাইলেও কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছিল না ভাস্কর। আগের মতো ভুল হচ্ছিল বার বার। এমনকি এমনসব ভুল হচ্ছিল যা কল্পনাও করা যায় না। পা ঠিকঠাক নড়ছিলই না তার। প্রশান্ত উলটো ভাবে। তার মনে হয় ভাস্কর ইচ্ছে করে এসব করছে। তার অবাধ্যতা করছে। রাগের পারদ ক্রমশ চড়ছিল তার। আর নিজেকে সামলাতে পারে না। রাগলে সে চণ্ডাল হয়ে যায়। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পায়ের একটা বুট খুলে ছুড়ে মারে ভাস্করের পায়ের দিকে।

আচমকা এরকম অবস্থার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না ভাস্কর। ভয় পেয়ে নিজেকে বাঁচাতে বসে পড়ে সে। আর বুটটা সজোরে এসে লাগে তার বাম চোখের ঠিক ওপরে। জোর আঘাতে ভ্রূর কাছে কেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। চোখেও জোর আঘাত লাগে। যন্ত্রণায় কপাল চেপে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকে ভাস্কর।


দুই


একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে বসে ছিল প্রশান্ত। ডাঃ আদক রিপোর্টগুলো ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখে কিছুটা গম্ভীর হয়ে যান। তার অবস্থা দেখে প্রশান্তর বুকটা ধড়াস করে ওঠে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, “ডাক্তারবাবু…”

“সরি।” তাকে থামিয়ে দিয়ে ডাঃ আদক বলেন, “রিপোর্ট খুব একটা ভালো নয়।”

প্রশান্তর বুকের ওঠানামা দ্রুত হয়। ভয়ার্ত সুরে বলে, “কী হয়েছে ডাক্তারবাবু?”

“ওর বাম চোখের মণিতে জোর আঘাত লেগেছ। ওই চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টি আর ফিরে পাবে না।” একটু থেমে আরও একটু গম্ভীর সুরে বলেন, “আমার বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু কঠিন সত্যিটা না বললেই নয়। এমনও হতে পারে, ওই চোখের দৃষ্টি হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।”

বুকটা ধড়াস করে ওঠে প্রশান্তর। এই ভয়ংকর দুঃসংবাদ তাকে বিধ্বস্ত করে দেয়। বুকের মাঝে একটা কান্না জমাট বেঁধে তাকে কষ্ট দিতে থাকে। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকে প্রশান্ত। ভাবে কেন সে এমনটা করতে গেল? কেন নিজের রাগটা দমন করতে পারল না? ছেলের সুন্দর জীবন সে নষ্ট করে দিয়েছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়।

“নিন, ধরুন।”

ডাঃ আদকের কথায় চমক ভাঙে তার। প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে তাতে চোখ বুলিয়ে বেশ অবাক হয় প্রশান্ত। সেটা ডাঃ আদকের দিকে বাড়িয়ে বলে, “এখানে তো আপনি কোনও ওষুধের কথা লেখেননি! আর আমার ছেলের নাম ভাস্কর। আপনি ভুল করে…”

“ভুল করে নয়।” তাকে থামিয়ে দিয়ে ডাঃ আদক বলেন, “আমি জেনেবুঝেই আপনার নাম লিখেছি। ওটা আপনার প্রেসক্রিপশন। একটু ভালো করে দেখুন, ওখানে লেখা আছে একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে দেখানোর কথা। আমার মনে হয় আপনার মানসিক ডাক্তার দেখানো দরকার।” একটু থেমে কঠোর সুরে বলেন, “আপনি একজন বাবা! আমার তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”

ডাঃ আদকের মুখে তীব্র বিরক্তি আর রাগ। প্রশান্ত কিছু বলতে পারে না। মাথা নিচু করে বসে থাকে। সত্যিই তার নিজেকে মানসিক রোগী বলে মনে হয়। কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করে।

ডাঃ আদক ভাস্করের প্রেসক্রিপশনটা রেডি করে তার দিকে বাড়িয়ে দেন। সেটার দিকে তাকানোর সাহস হয় না প্রশান্তর। ডাঃ আদক গলার সুর নরম করে বলেন, “পনেরো দিনের ওষুধ দেওয়া আছে। সঙ্গে দুটো ড্রপ। যেমন যেমন নির্দেশ দেওয়া আছে, সেইমতো ওষুধগুলো ব্যবহার করবেন। আমার বিশ্বাস, পনেরো দিনের মধ্যেই ওর চোখ পুরোপুরি সেরে যাবে।”

চমকে ওঠে প্রশান্ত। ভাবে, ভুল শুনছে না তো! একরাশ চাপা উত্তেজনা নিয়ে আমতা আমতা করে বলে, “সেরে যাবে!”

“একদম।”

“কিন্তু আপনি যে বলছিলেন…” আনন্দে তার কথা আটকে যায়।

“ভাগ্য ভালো আপনার ছেলের চোখে সেভাবে আঘাত লাগেনি। কিন্তু আপনি যা করেছিলেন তাতে যা বলেছিলাম সেটা সত্যি হতে পারত। ছেলের কাছে আমি সব শুনেছি। জেনেশুনে মিথ্যে বলেছি শুধু আপনাকে বোঝাতে যে কত বড়ো বিপদ আপনি ডেকে আনতে যাচ্ছিলেন তার জীবনে।”

প্রশান্তর চোখটা ছলছল করে ওঠে। হাতজোড় করে অপরাধমাখা সুরে বলে, “আমার বড়ো ভুল হয়ে গেছে ডাক্তারবাবু। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, জীবনে কোনোদিন আর এমন কাজ করব না। আমার রাগকে আমি নিয়ন্ত্রণ করব।”

ডাঃ আদক তার হাত থেকে আগের প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে নেন। সেটা ছিঁড়ে ফেলতে ফেলতে বলেন, “রাগ দিয়ে কোনও কাজ সিদ্ধি হয় না। স্নেহ-ভালোবাসার থেকে বড়ো কিছু হয় না। সেভাবেই ছেলের সঙ্গে কথা বলুন, দেখবেন আপনি যা চাইছেন ছেলে হয়তো তাতে না করবে না। বাবা-মা বন্ধু হলে ছেলেমেয়েরা তাদের স্বপ্নপূরণ করতে নিজেদের জীবনও বাজি রাখতে পারে।”

প্রশান্ত নির্বাক। পুনরায় তার মাথাটা নিচু হয়ে যায়।


তিন


টানটান উত্তেজনা চলছে ম্যাচটায়। ভাস্করদের স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে ইউথ স্টারের ম্যাচ। দুটো দলই শক্তিশালী। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। কোনও পক্ষ কাউকে ছাড়ছে না। প্রথমার্ধের খেলা শেষ হয়ে দ্বিতীয়ার্ধের খেলা চলছে। এখনও কোনও পক্ষ গোল করতে পারেনি। তবে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে জমে উঠেছে খেলা।

মাঠের চারদিকে ভালোই দর্শক। তাদের মধ্যে রয়েছে প্রশান্তও। ছেলের খেলা দেখতে এসেছে সে। ভাস্কর আজ গোলে খেলছে না। স্পোর্টিং ক্লাবের প্রধান স্ট্রাইকার সে। বিভোর হয়ে ছেলের খেলা দেখছে প্রশান্ত। ভাস্কর যে এত ভালো স্ট্রাইকার সে বুঝতেই পারেনি। অসম্ভব চোরা গতি, সূক্ষ্ম পায়ের কাজ, সঙ্গে উপস্থিত বুদ্ধিটাও দারুণ। গোল না করতে পারলেও তার খেলা ইতিমধ্যে সবার নজর কেড়েছে। তার পায়ে বল পড়লে বিপক্ষের রক্ষণে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে। মুগ্ধ হয়ে ছেলের খেলা দেখছিল প্রশান্ত, আর মনে মনে প্রার্থনা করছিল ভাস্কর যেন গোল করে দলকে জেতাতে পারে।

সময় শেষ হয়ে আসছিল। দু’পক্ষের সমর্থকেরা চিৎকার করে নিজেদের দলকে উৎসাহ দিচ্ছিল। প্রশান্ত উত্তেজনায় ছটফট করতে থাকে। হাতে আর মাত্র মিনিট তিন-চারেক সময় আছে।

সহসা বিপক্ষের মিড ফিল্ডে একটা বল পায় ভাস্কর। পায়ের কাজ আর কোমরের মোচড়ে একসঙ্গে দু’জনকে ফাঁকি দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। একে একে আরও দু’জনকে ডজ করে কাটিয়ে নিয়ে বিপক্ষের গোল বক্সে পৌঁছে যায়। সামনে শুধু অসহায় গোল কিপার।

কিন্তু এ কী করছে ভস্কর! বলটা গোলে না মেরে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে কেন? তার চোখে-মুখে অদ্ভুত একটা ভয় আর অস্থিরতা ফুটে উঠেছে। অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে সে চেয়ে আছে সামনের দিকে।

গোটা মাঠ উত্তেজনায় সহসা যেন থমকে গেছে। প্রশান্তও কম অবাক হয়নি।

“সময় নষ্ট করছিস কেন? গোলে মার!” প্রশান্ত চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু তার কথা ভাস্করের কানে পৌঁছোয় কি না বোঝা যায় না। গোলে বল মারে না সে। কেমন যেন ভয়ার্তভাব ফুটে ওঠে তার মধ্যে।

“আরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? মারবি তো বলটা! গোলে মার।”

অধৈর্য হয়ে চিৎকার করে প্রশান্ত। কিন্তু সম্মিলিত দর্শকের মিশ্র চিৎকারে তার শব্দগুলো হারিয়ে যায়। প্রশান্ত কেমন বিভ্রান্ত। সহসা সে দেখে ভাস্কর উদভ্রান্ত চোখে চেয়ে আছে। চোখ দুটো অস্থির। ভয়ে মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। প্রশান্তও বেশ বিভ্রান্ত। বুঝতে পারে না, ভাস্করের মুখটা সে এত স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে কী করে? তাও আবার মুখোমুখি! সে তো মাঠের সাইড লাইনের পাশে। তাহলে? ভাবনা সবে মাথায় এসেছে কি আসেনি, চমকে ওঠে প্রশান্ত। দেখে বাইরে নয়, সে মাঠের মধ্যেই রয়েছে। বিপক্ষের গোল পোস্টের নিচে অন্য কেউ নয়, স্বয়ং সে। আর তার দিকে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপছে ভাস্কর। ভয়ে চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে তার। প্রশান্ত হাত নেড়ে তাকে কিছু বলতে যায়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখে, তার হাতদুটো অদ্ভুতভাবে বড়ো হতে হতে এগিয়ে চলেছে ভাস্করের দিকে। ভাস্কর ভয়ে কুঁকড়ে যায়। প্রশান্ত আপ্রাণভাবে চেষ্টা করে তার হাতদুটোকে টেনে গুটিয়ে নেওয়ার। কিন্তু পারে না। উলটে হাতদুটো আরও বড়ো হতে হতে ভাস্করের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার গলার ওপর যেন চেপে বসতে চায়। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে ভাস্কর। প্রশান্তও।

ধড়ফড় করে উঠে বসে প্রশান্ত। সারা শরীর ঘামে ভিজে জ্যাবজ্যাবে হয়ে গেছে। কী ভয়ংকর স্বপ্নটা! এখনও গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে আছে। বুকটা এখনও ধড়ফড় করছে। গরম নিঃশ্বাস পড়ছে। স্বপ্ন এমন জলজ্যান্ত হতে পারে! এখনও চোখের সামনে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে আছে। ঢক ঢক করে অনেকটা জল খায় প্রশান্ত।


চার


ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গেছে ভাস্করের। ব্যস্তভাবে পোশাক পরছিল সে। সহসা একটা পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে এসে লাগে। কৌতূহলী চোখে জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মারে। তখনই ভীষণ চমকে ওঠে। কোনোরকমে জামাটা গায়ে দিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে ভাস্কর। বাড়ির পেছনের দিকের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাবার দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হয় না। ভয়ে তার শরীর কাঁপতে থাকে। মনের মধ্যে ভেসে ওঠে সেদিনের বাবার রাগ।

সহসা ছেলের দিকে নজর যায় প্রশান্তর। একপলক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ভাস্কর দেখে বাবার চোখের দৃষ্টি কেমন অদ্ভুত। মুখটা থমথম করছে। ছেলের থেকে মুখ ফিরিয়ে আগুনটাকে আরও উসকে দেয় প্রশান্ত।

ভাস্কর আমতা আমতা করে বলে, “বাবা, তুমি আমার গ্লাভসগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছ কেন?”

“এসবের আর কোনও দরকার নেই।”

চমকে ওঠে ভাস্কর। অবিশ্বাসমাখা ভয়ার্ত সুরে বলে, “আমি আর খেলব না?”

“খেলবে। তবে গোল বাঁচানোর জন্য নয়, গোল করার জন্য।”

আবারও চমকে ওঠে ভাস্কর। বাবার কথাটা বোধগম্য হতে একটু সময় লাগে তার। মুহূর্তক্ষণের বিহ্বলতা কাটিয়ে সে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। প্রশান্ত ছেলেকে বুকে জাপটে ধরে তাকে আদর করতে করতে বলে, “তুই স্ট্রাইকার হবি। খুব বড়ো স্ট্রাইকার। এমন স্ট্রাইকার যার নাম শুনলেই বিপক্ষের গোল কিপার যেন কেঁপে ওঠে।”

ভাস্কর কিছু বলে না। তার চোখদুটো ছলছল করে ওঠে।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্রবন্তী চট্টোপাধ্যায়


No comments:

Post a Comment