ছোটো গল্পঃ উত্তর মেলে না - সহেলী চট্টোপাধ্যায়



উত্তর মেলে না


সহেলী চট্টোপাধ্যায়



নতুন জায়গায় এসে দীপা বুঝতে পারল এবারও সে ঠকে গেছে। যার লাক খারাপ তার সবকিছুই খারাপ হয়। জন্ম থেকেই জয়েন্ট ফ্যামিলির নানাবিধ সমস্যা দেখে সে বড়ো হয়েছে। তার একটাই শান্তির জায়গা ছিল গল্পের বই আর পড়াশোনা। অনেক পড়াশোনা করে একটা আইটি কোম্পানিতে জয়েন করেছে সবে। এখন সে স্বাধীন। নতুন শহরে, নতুন অফিসে ও খুব ভালো থাকবে। নতুন একটা জীবন শুরু হবে। আর ব্যাঙ্গালোর তো খুব ভালো জায়গা। প্রথমে কিছুদিন বাবা-মা এসে ওর সঙ্গে ছিল। বাড়ি ঠিক করে দেয় বাবার অফিসের একজন কলিগ।

মিসেস মূর্তির বাড়ি পেইং গেস্ট দীপা। সবসময় সেজেগুজে থাকার জন্য পঞ্চাশেও তাঁকে তিরিশ দেখায়। ইংরেজি উচ্চারণও বুঝতে খুব কষ্ট হয়। ওঁর বাড়িতে আর কেউ নেই। স্বামী বিদেশে থাকেন। দীপা বেশি কিছু জানার চেষ্টাও করেনি। দোতলায় একজন মেড নিয়ে মিসেস মূর্তি। জায়গাটা ওর একটুও ভালো লাগে না। তাছাড়া বেশ কস্টলিও। সেই সকালে উঠে কোনোরকমে দুটো স্যান্ডউইচ আর কফি খেয়ে অফিস বেরোয়। সারাদিন অফিসেই কেটে যায় ওর। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ন’টা। রাত্তিরে খেয়েদেয়ে একেবারে বিছানায়। রাতের রান্না মিসেস মূর্তির পরিচারিকা করে দেয়। মেয়েটি সবসময় ঘোমটা দিয়ে থাকে।

দীপার কিছুই ভালো লাগে না। নতুন চাকরিতেও কোনও আনন্দ নেই। ব্যাঙ্গালোর একসময় স্বপ্নের শহর মনে হত। এখন ওর একটুও ভালো লাগে না। মনটা খুব খারাপ লাগে। মায়ের সঙ্গে রোজ কথা হয়। বেশিরভাগই ঝামেলা এবং অন্য নানাবিধ সমস্যার কথা। মাও এখানে আসতে চায় না। কলকাতায় হাজার সমস্যা থাকলেও সেখানেই থাকতে ভালোবাসে। অফিসে বসের মুখ ঝামটা। বাড়িতে মিসেস মূর্তির হাঁড়িমুখ। এই পৃথিবীর কোথাও কি শান্তি নেই! নাকি দীপাই ডিপ্রেশনের শিকার? ও জানে না। শনি-রবি ওর ছুটি থাকে। এই দু’দিন বেশির ভগ সময় বই পড়েই কাটায় দীপা। তাছাড়া নিজের কিছু কাজ থাকে। নতুন শহরে বন্ধুও বেশি হয়নি ওর।


সেদিন অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ে দীপা। দরজায় নক করল কেউ। দীপা দরজা খুলে দেখল মিসেস মূর্তির পরিচারিকা। ওপরে মিসেস মূর্তি তলব করেছেন। এই তিনমাসে কখনও তাকে ওপরে ডাকেননি মিসেস মূর্তি। দীপা ঠিক সময়ে ভাড়ার টাকা মিসেস মূর্তিকে দিয়ে এসেছে। এই মাসেও দিয়ে এসেছে।

পরিচারিকা ওকে মিসেস মূর্তির বেডরুমে নিয়ে আসে। মিসেস মূর্তি বসে বসে হাতের নখে নেল-পলিশ লাগাচ্ছেন। এই ঘরে আগে কখনও আসেনি দীপা। পাশের ছোটো ড্রইংয়ে ও এসেছে। ঘরের সাজসজ্জা গৃহকর্ত্রীর সুস্থ রুচির পরিচয় দিলেও কিছু বীভৎস পুতুল দেখে দীপার গা ছমছম করে উঠল। মিসেস মূর্তি বোধ হয় বুঝতে পারেন ওর অস্বস্তির কারণ। বললেন, “এই পুতুলগুলোর আমি ব্যাবসা করছি। এগুলো বিদেশের পুতুল। মানুষের অনেকরকম অদ্ভুত জিনিসের শখ থাকে। আমি তোমায় ডেকেছি অন্য একটা কারণে। এই শনিবার আমার বাড়িতে পার্টি আছে। আমার কিছু বান্ধবী আসবে। তুমি সন্ধেতে চলে এসো। মানুষের সঙ্গে আলাপ হলে ভালোই লাগবে।” বলতে বলতে ওর চোখের মণি জ্বলজ্বল করে উঠল। দীপার মাথাটা কেমন ঘুরে গেল।


দু’দিন আর অফিস যেতে পারেনি দীপা। জ্বরে কাহিল দীপাকে মিসেস মূর্তি এই দু’দিন বেশ সেবাযত্ন করেছেন। তৃতীয় দিন একটু সুস্থ হতে অফিস গেছে দীপা। মিসেস মূর্তি দু’বার ফোন করে তার খবরও নিয়েছেন।

দেখতে দেখতে শনিবার এসে গেল। দীপা সেজেগুজে সন্ধেয় মিসেস মূর্তির দোতলায় চলে এল। বাইরে বারান্দা থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে। দোতলার বিশাল ড্রইংয়ে পার্টি চলছে। লাইটিং কেমন অন্ধকার অন্ধকার। মৃদু একটা আলো জ্বলছে। একদল মেয়ে মুখে মাস্ক পরে ডান্স করছে অদ্ভুত একটা মিউজিকের সঙ্গে। শুনলে কেমন গা শিউরে ওঠে। বাদুড় ঝুলছে ওপরে সিলিং থেকে। এগুলো আসল বাদুড় নয়। খেলনা দিয়ে সাজানো। হ্যালোউইনের পার্টির মতো সাজানো হয়েছে। মিসেস মূর্তিকে খুঁজছে দীপা। এত অল্প আলোয় কীভাবেই বা খুঁজে পাবে! তার ওপর যদি মাস্ক পরে থাকেন!

মিসেস মূর্তিই দীপাকে খুঁজে নিলেন। আজ আরও অল্পবয়সী দেখাচ্ছে তাঁকে। দীপাকে কোল্ড ড্রিঙ্কের গ্লাস ধরিয়ে দিলেন। গানটা এত জোরে বাজতে শুরু করল যে দীপা আর কিছু শুনতে পাচ্ছিল না। একদল মেয়ে মাস্ক পরে নাচতে নাচতে ওর দিকে এগিয়ে এল। দীপাকে একজন ফেলে দিল। ও তার মাস্ক টেনে ধরল। মাস্কটা খুলে ওর হাতে চলে এল। দীপা দেখল মাস্কের আড়ালে কোনও মুখ নেই। শুধুই শূন্যতা। একটি মেয়ের নিচের অংশ রয়েছে, গলা রয়েছে কিন্তু মাথা নেই। দীপা একটা চিৎকার করে পড়ে গেল।


চোখ মেলে তাকাতেই দীপা দেখল ও নিজের ঘরে শুয়ে আছে। মিসেস মূর্তি মাথার কাছে বসে আছেন। তাঁর পরনে আর পার্টি ড্রেস নেই। দীপা জিজ্ঞাসা করল, “আমার কী হয়েছিল?”

“তোমার আবার জ্বর এসেছিল। তোমার বারবার জ্বর আসছে, এটা ভালো নয়। আজ তোমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।”

“আমি আপনার পার্টি খারাপ করলাম। কিন্তু আমি দেখেছিলাম একটি মেয়ের মাথা নেই, শুধুই মুখোশ।” মাথা নাড়ে দীপা।

“কীসব বলছ!”

“আপনার ঘরে পার্টি ছিল না?”

“না না। জ্বরের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছ। আজ বুধবার। পার্টি সামনের শনিবার।”

দীপার মনে হয় মিসেস মূর্তি কিছু লুকোচ্ছেন। সেই ঘোমটা ঢাকা মেড হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে ঢুকল। মিসেস মূর্তি তাকে খেয়ে নিতে বলে বেরিয়ে গেলেন।

স্যুপ বানিয়ে এনেছে মেয়েটি। দীপা খাওয়ার জন্য বাটি তুলতেই দেখতে পেল একটা ছোটো চিরকুট। তাতে বাংলায় লেখা আছে, ‘এই জায়গা থেকে চলে যাও। এখানে থাকলে তোমার খুব বিপদ হবে। মিসেস মূর্তির সঙ্গে কোথাও যেও না।’

দীপা মেয়েটির দিকে তাকাল। বলল, “এসব কী!”

“তুমি তোমার বাড়িতে কেন যোগাযোগ করছ না?” বাংলাতেই বলে মেয়েটি।

“আমি যে ফোন হারিয়ে ফেলেছি। খোঁজার শক্তিও নেই।”

মেয়েটি নিজেই দীপার ফোন খুঁজে বার করে। বলল, “মিসেস মূর্তি তোমার ফোন নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।”

“কিন্তু কেন?”

“যাতে তুমি বাড়িতে যোগাযোগ করতে না পারো।”

“এতে কী লাভ ওঁর?”

“মানুষকে ভয় দেখিয়ে আনন্দ পান।”

“তুমি কে? এত হেল্প করছ কেন?”

মেয়েটা নিজের ঘোমটা খুলে দেয়। দীপার মনে হল একে আগে কোথাও দেখেছে। কিন্তু মনে করতে পারে না।

বিকেলে ওর বাবা-মা আসে। মিসেস মূর্তি খুব ক্ষিপ্ত হলেও কিছু বলার ছিল না।


***


অনেকদিন দীপা কলকাতায় আছে। দীপা খুব ভুগেছিল জ্বর এবং রক্তাল্পতায়। সেই দিনগুলো ওর এখনও মনে পড়ে। পুরনো অ্যালবাম দেখতে দেখতে তার মনে হয়েছে দিদার অল্পবয়সী ঘোমটা পরা মুখের সঙ্গে সেই মেয়েটির মুখের খুব মিল। তবে কি দিদাই এসেছিল তাকে উদ্ধার করতে? দিদা তো অনেকদিন আগেই গত হয়েছে! আবার একইরকম দেখতে অন্য কেউও হতে পারে। এটাও হতে পারে, সেদিন আধো ঘুম আধো জাগরণে ওর মনে হয়েছে দিদাকেই দেখছে। হয়তো স্বপ্ন দেখে থাকবে। উত্তর মেলে না।


অঙ্কনশিল্পীঃ সুজাতা


No comments:

Post a Comment