রূপকথাঃ বদ্রীনাথ এবং রাগেশ্বরী - সুস্মিতা কুণ্ডু


বদ্রীনাথ এবং রাগেশ্বরী

সুস্মিতা কুণ্ডু


অমুক রাজ্যের তমুক পাড়ার নীলপুকুরে থাকত একটা ব্যাঙ, তার নাম বদ্রীনাথ। সারাদিন সে পুকুরময় পদ্মপাতায় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। লম্বা জিভটা সুড়ুৎ করে বার করে কখনও এই ফড়িং খায় তো কখনও ওই মাছি খায়। মুখভর্তি পোকা নিয়ে কচরমচর করে চিবোতে থাকে দিনভর। তারপর মোটা দেখে একটা পদ্মপাতার ওপর চিৎপটাং হয়ে শুয়ে, পা নাচাতে নাচাতে গান ধরেー

‘থপ থপাস, ঝপ ঝপাস

আমি বদ্রীনাথ ব্যাঙ,

পোকা খাই, মাকড় খাই

ডাকি গ্যাঙর গ্যাং।’

সারা সকাল নীলপুকুরে কাদা-পাঁক ঘেঁটে, পোকামাকড় ধরে, দুপুরবেলায় বদ্রীনাথ ঘরে ফেরে। ঘরে থাকে বদ্রীনাথের ছোটো বোন রাগেশ্বরী। সে বদ্রীনাথের থেকে ছোটো হলে কী হবে, নামেই মালুম হয় যে সে বড্ড রাগী। অবশ্য বদ্রীনাথের বাবা-মা রাগেশ্বরীর অমন নাম রেখেছিল এই ভেবে যে, বৃষ্টি পড়লে মেয়ে মিষ্টি সুরে ‘গোঁয়া গোঁয়া গ্যাঁঙর গ্যাঁঙ’ করে রাগপ্রধান গান শোনাবে এই আশায়। কিন্তু মিঠে সুরে গান শোনানো তো দূর, সে মিঠে করে দুটো কথা কইতেও জানে না কারও সঙ্গে। নীলপুকুরের শোল মাছ, বোল মাছ, কই মাছ সবার সঙ্গেই রাগেশ্বরীর ঝগড়া। এমনকি নীলপুকুরের পাশে বুড়ো অশ্বত্থগাছের কোটরে বাসা বাঁধা বুড়ি অজগর কটকটিও ভয় পায় রাগেশ্বরীকে।

রাগেশ্বরী সারাদিন কোনও কাজকম্ম করে না, শুধু মুখে নীলপুকুরের পাঁক লাগিয়ে সাজুগুজু করে। সেই পাঁকও বদ্রীনাথই বয়ে এনে দেয়। দুপুরের খাবারের পোকামাকড়ও আনতেও সেই বদ্রীনাথ। তার ওপর সারাক্ষণ বদ্রীনাথকে মুখঝামটা দেয়, “এইয়ো বদ্রী! এখনও পড়ে পড়ে ঘুমুচ্চো যে বড়ো! বলি খাবারের জোগাড়টা কে করবে? মাথার ওপরের ছাতাগুলো যে বেঁকে গ্যাচে, সেগুলো সিধে কে করবে?”

এই বলে দিনরাত শুধু খাটায় বেচারাকে, ‘দাদা’ বলে সম্মানটুকুনও দেয় না। 

এই তো গতমাসে বদ্রীনাথ পদ্মপাতায় মুড়ে একটা গঙ্গাফড়িং আর দুটো ঝিঁঝিঁপোকা এনেছিল। রাগেশ্বরী দিব্যি টকাটক খেয়ে নিল, কিন্তু তারপর হল বিপদ। রাগেশ্বরী যে কথাই বলতে যায় গলা দিয়ে শুধু ‘ঝিঁইইইই ঝিঁইইইই’ করে আওয়াজ বেরোয়। রাগেশ্বরী তো বেজায় চটে গেল। আর রাগেশ্বরীর দুর্দশা দেখে বদ্রীনাথ মনে মনে ছড়া কাটতে লাগলー

‘রাগেশ্বরী রাগের রানি

পোকা খেয়ে নাকাল হল,

কইতে কথা আর পারে না

গলার ভেতর ঝিঁঝিঁ সেঁধোল।’

মানুষের গলা ঘড়ঘড় করলে পরে সবাই বলে গলায় ব্যাঙ ঢুকেছে, আর ব্যাঙের গলা ‘ঝিঁইইইই ঝিঁইইইই‘ করলে এবার সবাই বলবে গলায় ঝিঁঝিঁ ঢুকেছে।

এই না ভেবে যেই জোরে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠেছে বদ্রীনাথ, অমনি রাগেশ্বরী থপাস করে এক লাফ মেরেছে বদ্রীনাথের ঘাড়ে। রাগেশ্বরী ছোটো বোন হলে কী হবে, আকারে ওর প্রায় দ্বিগুণ। বদ্রীনাথের তো প্রায় ঢেঁকিতে চ্যাপ্টা হওয়া চিঁড়ের মতো অবস্থা।

এ তো গেল গতমাসের কথা। আর গত হপ্তায় যা হল সেটা ভাবলে পরে এখনও ভয় আর হাসি দুটোই পায় বদ্রীর। রাগেশ্বরীর মাঝে-মাঝেই নতুন নতুন খাবার খাওয়ার সাধ হয়। বদ্রীকে আদেশ দেয় ‘লে আও’, আর আনতে না পারলে বদ্রীকে সেদিন আর ব্যাঙের ছাতার তলায় ঘুমোতে দেয় না রাগেশ্বরী। বদ্রীর আবার নিজের ছাতাটির তলায় না শুলে ঘুম হয় না। পেট ভুটভাট করে, পরের দিন গা ম্যাজম্যাজ করে। কিন্তু রাগেশ্বরী সেসব শুনলে তো! অগত্যা বদ্রী নতুন নতুন পোকা খুঁজতে যায়। তো সেদিন কী হয়েছে, সারাদিন মেঘলা আকাশ দেখে জমিয়ে গান-টান গেয়ে বদ্রী ভুলেই গেছে বোনের জন্য পোকা জোগাড় করতে। এদিকে সন্ধে হয়ে এসেছে, সব পোকা গর্তে ঢুকে গেছে। অন্ধকারে ঠিকমতো ঠাহরও করতে পারে না বদ্রীনাথ। শেষমেশ দেখে আনারসের ঝোপে একটা দুটো তিনটে করে টিমটিমে আলো জ্বলে উঠছেーজোনাকি পোকা! অমনি ঝপ করে চারটে জোনাক ধরে কচুপাতায় মুড়ে সো-ও-ও-জা গেল বোনের কাছে। রাগেশ্বরীরও অপেক্ষা করে করে বেজায় খিদে পেয়ে গেছিল। তাই ভালো করে না দেখেই কচুপাতা খুলে সুড়ুৎ করে জিভে করে টেনে নিয়ে সটান পেটে চালান করে দিল।

তারপর হল আসল কাণ্ড। সারারাত ধরে রাগেশ্বরীর পেটে আলো দপ দপ করতে থাকে। হেঁচকি তুললে আরও জোরে জোরে আলো দপদপায়। সে এক জ্বালা। রাগেশ্বরী রেগেমেগে বলে, “অকম্মার ধাড়ি! কী পোকা খাওয়ালে শুনি? পেটের ভেতর এমনধারা আলো জ্বলে কেন?”

বদ্রীর কানে রাগেশ্বরীর চ্যাঁচানি মোট্টে ঢোকে না। সে তো মনে মনে ছড়া ভাঁজতে লেগেছেー

আলো জ্বলে পেটের ভেতর

টিমটিম দপ দপ,

রাগেশ্বরী জোনাক খেল

চারখানা গপ গপ।

এইসব কাণ্ডকারখানা ঘটার পর রাগেশ্বরী তো খুব ক্ষেপে আছে। আর ওদিকে বদ্রীনাথ বোনের রাগ ভাঙানোর জন্য নতুন নতুন খাবার খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু ঝিঁঝিঁ আর জোনাকি খেয়ে নাকাল হওয়ার পর রাগেশ্বরী মোট্টে বিশ্বাস করে না বদ্রীকে। খালি মুখঝামটা দেয়। শেষমেশ একদিন বদ্রী একটা বাহারি প্রজাপতি ধরে আনল বোনের জন্য। রাগেশ্বরী তাই না দেখে বলল, “প্রজাপতি না কচু! এ তো একটা কেলে কুচ্ছিত মথ! এই খেয়ে শেষে আমার দুটো ডানা গজাক আর আমি উড়তে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ি। বলি তোমার মাথায় ঘিলু আছে, নাকি ওই নীলপুকুরে পাঁক? সাধে বারণ করি ওই পুকুরে অতক্ষণ ধরে সাঁতার কাটতে? দিনরাত্রির পদ্মপাতায় বসে বসে শুধু ছড়া কাটলে এমনই বুদ্ধি হবে!”

বদ্রীকে যত খুশি মুখ করুক, মুখ্যু বলুক তাতে রাগ নেই, কিন্তু ওর ছড়া কাটা নিয়ে কেউ কিছু বললে ও ভারি রেগে যায়। চটেমটে বলে উঠল, “অত ভালোমন্দ খেতে মন চাইলে কালোপাহাড়ের কোলে, সবুজ বনের ধারে মানুষদের কুঁড়েতে গিয়ে খেয়ে এসো। আমি আর খাবার আনতে পারব না তোমার জন্য।” এই বলে ধুপধাপ করে নীলপুকুরে চলে গেল।

এদিকে এমনধারা কথা শুনে তো রাগেশ্বরীর ভারি আঁতে ঘা লাগল। কী অপমান! রাগেশ্বরী কি নিজে নিজে খাবার জোগাড় করতে পারে না? ঠিক আছে! মানুষের গ্রাম থেকেই ভালো ভালো সব খাবার জিনিস এনে বদ্রীনাথের সামনে বসে দেখিয়ে দেখিয়ে খাবে। এই ভেবে রাগেশ্বরী একটা বড়ো মানকচুর পাতায় নিজের গোটাকয় জামাকাপড় আর সাজুগুজুর জিনিস বেঁধে নিয়ে রওনা দিল সবুজ বনের পারে মানুষের আস্তানার দিকে। কিন্তু সে কি আর একটুখানি পথ! হলুদ ঝরনা পেরিয়ে, লাল ফুলের বাগিচা পেরিয়ে, কালো পাহাড়ের কোলে সবুজ বনের ধারে মানুষদের গ্রাম।

রাগেশ্বরী চলতে থাকে আর চলতে থাকে থপথপিয়ে। কাজকম্ম না করে করে আর বসে বসে বদ্রীনাথের আনা খাবার খেয়ে খেয়ে রাগেশ্বরীর হাঁটাচলার ক্ষমতা এক্কেবারে কমে গেছে। ভারি কুঁড়ে আর আলসে হয়ে গেছে সে। কিন্তু মানসম্মান বলে একটা ‘ইয়ে’ আছে তো নাকি! দাদাকে রাগ দেখিয়ে চলে এসেছে, এখন হার মানলে চলে নাকি? হোঁচট খেতে খেতে ঘেমে নেয়ে চলতে থাকে রাগেশ্বরী। অনেকক্ষণ পর অবশেষে পৌঁছায় হলুদ ঝরনার পাশে। কেমন হলদেটে জলটা। এদিকে বড্ড তেষ্টা পেয়েছে ততক্ষণে বেচারির। তাই আগুপিছু না ভেবে হলুদ ঝরনার জল চুকচুক করে খেয়ে নেয় খানিকটা।

ওমা! কী কাণ্ড! হলুদ ঝরনার গায়ে ছুঁতেই রাগেশ্বরীর অমনধারা সুন্দর শ্যাওলা-সবুজ গায়ে কেমন হলদে হলদে ছোপ ছোপ ফুটে উঠল। রাগেশ্বরী তো কেঁদে-রেঁধে একশা। কত কষ্ট করে নীলপুকুরের পাঁক আর কচুপাতার রস মেখে মেখে এমন শ্যাওলা-সবুজ চকচকে গায়ের চামড়া বানিয়েছিল। কী দশা হল!

অনেকক্ষণ দুঃখু করার পর রাগেশ্বরী মনে মনে ভাবল, যা হওয়ার হয়ে গেছে। আর বেশিক্ষণ সময় নষ্ট না করে বরং এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মানুষের গ্রামের খাবার নিয়ে ফিরতে না পারলে বদ্রীনাথের কাছে মুখরক্ষা হবে না মোট্টে।

নিজের মানকচুর পুঁটুলিটা তুলে নিয়ে রওয়ানা হল রাগেশ্বরী। তবে যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট একটা শিশিতে করে খানিকটা হলুদ ঝরনার জল ভরে নিল। বলা যায় না কখন কোন কাজে লেগে যায়!

রাগেশ্বরী ফের চলতে থাকে আর চলতে থাকে থপথপিয়ে। অনেকটা পথ উজিয়ে শেষমেশ পৌঁছায় লাল ফুলের বাগিচায়। বিশাল বড়ো এক বাগিচা জুড়ে শুধু লাল রঙের ফুল ফুটে রয়েছে। এই এই হাতের তেলোর মাপের ফুলগুলো। আঙুলের মাপের পাপড়িগুলো লাল টকটকে রঙ। রাগেশ্বরীর বড়ো সাধ গেল কয়খান লাল ফুল তুলে মালা বানিয়ে গলায় পরতে। কিন্তু একটুখানি ভয়ও পেল এই ভেবে যে, ফুলে হাত দিলে যদি হলুদ ঝরনার জলের মতো বিটকেল সব কাণ্ডকারখানা ঘটে যায়! তবুও ভয়ে ভয়ে একটা ফুল তুলল, কিচ্ছু খারাপ ঘটল না। আরেকটা তুলল সাহস করে, কিচ্ছু ঘটল না। তখন সাহস করে একগোছা ফুল তুলে রাগেশ্বরী নাকের কাছে এনে ফুলের মিষ্টি গন্ধ প্রাণভরে টেনে নিল। ব্যস! অমনি কী কাণ্ড, কী কাণ্ড! রাগেশ্বরীর শ্যাওলা-সবুজ গায়ে হলুদ ঝরনার জলের হলুদ ছোপ ছোপ দাগের ওপর পট-পটাস ফট-ফটাস করে লাল লাল বুটি ফুটে উঠল। হাউ মাউ করে এবার কাঁদতে লাগল রাগেশ্বরী। “এ আমার কী সর্বনাশ হল গো! এরকম চেহারা নিয়ে আমি কী করে নীলপুকুরে ফিরব গো! ও বদ্রীদাদা, দেখে যাও তোমার বোনের কী দশা হয়েছে!”

অনেকক্ষণ আকুলিবিকুলি করে কেঁদে তারপর রাগেশ্বরী দেখল নীলপুকুর থেকে এতদূরে কেউ তাকে সাহায্য করতে আসতে পারবে না। নিজের বুদ্ধি আর সাহসের ভরসাতেই তাকে যেতে হবে মানুষদের গাঁয়ে; সেখান থেকে খাবার নিয়ে ফিরে আসতে হবে নীলপুকুরে। প্রমাণ করতে হবে যে রাগেশ্বরীও সবকিছু করতে পারে।

চোখের জল মুছে রাগেশ্বরী ক’টা লাল ফুল পুঁটুলিতে ভরে নিয়ে এগিয়ে চলল কালো পাহাড়ের দিকে যার পাদদেশে মানুষদের বসতি। যদি কোনও কাজে আসে ফুলগুলো।

ওদিকে নীলপুকুরের পাড়ে বদ্রীনাথের মন বড্ড খারাপ। ছোট্ট বোনটা না জানি রাগ করে কতদূরে চলে গেল একা একা। সেই মানুষদের গাঁয়ে। কম পথ নাকি? তার ওপর পথে বিস্তর বিপদ। নাহ্! বড়ো দাদা হয়ে এভাবে ঝগড়া করাটা ঠিক হয়নি। নাহয় একটু রাগীই, তাই বলে নিজের দাদার কাছে আবদার করবে না তো কার কাছে করবে শুনি! মনের দুঃখে ছড়া কাটে বদ্রীー

রাগেশ্বরী বোনটি আমার

আর কোরো না মান,

ফিরে এসো দাদার কাছে

ভুলে অভিমান।

যা খেতে চাও তাই খাওয়াব

পোকা মাকড় কন্দ,

রাখব তোমার সকল খেয়াল

দাদা তো নই মন্দ।

বদ্রীনাথ এদিকে মনখারাপ করতে থাকে আর ওদিকে রাগেশ্বরী ততক্ষণে পৌঁছে গেছে মানুষদের আস্তানায়। সবুজ বনের কিনারায়, কালো পাহাড়ের কোলে। সারি দিয়ে মানুষদের কুঁড়েঘরগুলো। মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল। রাগেশ্বরী ভয়ে ভয়ে ছোট্ট ছোট্ট লাফ মেরে, থপাস থপ করে ঢুকল গাঁযে। একটা কুঁড়ের সামনে দেখল বড়ো বড়ো গামলায় হলুদ হলুদ গোল গোল একধরনের খাবার রাখা। ভুরভুর করে মিঠে মিঠে গন্ধ উঠছে তা থেকে, লম্বা জিভটায় জল এসে যাচ্ছে। সবাই জিনিসটাকে লাড্ডু বলে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এই লাড্ডু দেখেই মনটা নেচে উঠল রাগেশ্বরীর, পথের সব কষ্ট ধকল ভুলে গেল। লাড্ডুই তবে নিয়ে যাবে মানুষের গাঁ থেকে পোঁটলায় বেঁধে। দেখিয়ে দেবে বদ্রীনাথদাদাকে রাগেশ্বরীও সব পারে। কিন্তু মানুষের গাঁয়ে সবকিছুই টাকাপয়সা নামের একটা জিনিসের বদলে মেলে, এমনটাই ছোটো থেকে জেনেছে রাগেশ্বরী। আর ওই টাকাপয়সা তো নেই ওর কাছে। কী করে লাড্ডু কিনবে?

রাগেশ্বরী ইতিউতি চায় আর ভাবতে থাকে কী করা যায়। শেষে মতলব ভাঁজল, যদি মিষ্টি করে গান গেয়ে অনুরোধ করে দোকানদারকে, তাহলে কি আর খানকয় লাড্ডু দেবে না ওকে? এই ভেবে দোকানের সামনে গিয়ে একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে গান শুরু করলー

গোঁয়া গোঁয়া গ্যাঙর গ্যাঁং!

গান ধরেছে সোনাব্যাঙ,

তুম তানানা ধুম ধানানা

তাল ঠুকেছে কোলা ব্যাঙ।

ওরে ওরে আয় না সবাই

শুনে যা না ব্যাঙের গান,

নেচে গেয়ে থপথপিয়ে

শুনলে ’পরে ভরবে প্রাণ!

হঠাৎ করে এমনধারা তারস্বরে ব্যাঙের গান শুনে তো চারপাশে মানুষের ভিড় জমে গেল। আসলে হয়েছে কী, ব্যাঙের গান ব্যাঙেদের কানে মধুর লাগলে কী হবে, মানুষের কানে ব্যাঙেদের গান ভারি কর্কশ লাগে। আরেকটা মহা বিপদও ঘটল। রাগেশ্বরীর জানা ছিল না যে কিছু কিছু মানুষ ব্যাঙ ধরে রান্না করে খায়। ভিড়ের ভেতর থেকে তেমনই দুটো ব্যাঙখেকো লোক চেঁচিয়ে উঠল, “আরে আরে কত্ত বড়ো ব্যাঙ! আবার কেমন সবুজ গায়ে হলদে ছোপ, তাইতে আবার লাল লাল বুটি। এই ব্যাঙটা না জানি খেতে কত উপাদেয় হবে! নিয়ে আয় দেখি জাল, নিয়ে আয় হাঁড়ি। ধরি খপ করে।”

এই শুনে তো রাগেশ্বরী বুঝতে পারল মহা বিপদে পড়েছে। লাড্ডু খেতে দেওয়া তো দূর, উলটে এই লোকগুলো তাকেই খেতে আসছে। রাগেশ্বরী অমনি বুদ্ধি ঠাওরাল। গলা ফুলিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “এইয়ো! সাহস তো মন্দ নয় তোদের! জানিস আমি কে?”

এই শুনে যে লোকগুলো জাল নিয়ে এগিয়ে আসছিল তারা খানিকটা থমকে গিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

রাগেশ্বরী সেরকমই জোর গলায় বিকৃত সুরে বলতে লাগল, “আমায় দেখে বুঝতে পারছিস না, আমি এলেবেলে সাধারণ ব্যাঙ মোটেও নই? আর কোনও ব্যাঙের সবুজ গায়ে এমন হলদে-লাল নকশা কাটা দেখেছিস তোরা? আমি হলুম গিয়ে ব্যাঙেদের রানি। খবর্দার! যদি আমায় ধরতে আসবি, তোদের হাল কী করব দেখিস!”

রাগেশ্বরীর কথায় মানুষগুলো একটু ভয় পেলেও থামল না। ভারি তো একরত্তি ব্যাঙ, সে আবার কী করবে?

ভয় দেখানো সত্ত্বেও মানুষগুলো এগিয়ে আসছে দেখে রাগেশ্বরী করল কী, পুঁটুলি থেকে হলুদ ঝরনার জলের শিশিটা বার করে একটু জল একটা লোকের গায়ে ছুড়ে দিল। তারপর লাল ফুলের মালাটা থেকে একটা লাল ফুল নিয়ে অন্য লোকটার নাক লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। অমনি একজনের গায়ে ইয়াব্বড় বড়ো হলুদ ছোপ হল আর অন্যজনের গায়ে লাল লাল বুটি ফুটে উঠল। তারা তো জাল-হাঁড়ি সব ফেলে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে পালাল ভয়ে। রাগেশ্বরীও আনন্দের চোটে নেচে নেচে পাক খেয়ে থপথপিয়ে গান ধরলー

দুষ্টু যত মানুষের দল

খাস তোরা ব্যাঙভাজা,

হলুদ ছোপ লাল বুটিতে

দেখ কেমন হল সাজা।

বাকি মানুষগুলো সব রাগেশ্বরীর সামনে হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে প্রার্থনা করতে লাগল, “আমাদের ছেড়ে দাও ব্যাঙ রানি! দয়া করো আমাদের। তুমি যা বলবে আমরা তাই শুনব, যা চাইবে তাই দেব।”

রাগেশ্বরী তখন বলল, “ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু আজকের পর থেকে আর একটাও আমার ব্যাঙ প্রজাদের ধরে যদি খাস, তাহলে তোদের আস্ত রাখব না। আর ওই যে হলুদ হলুদ লাড্ডু, ওই হল আমার ভোগ। প্রতিমাসে ধামা ভর্তি করে সবুজ বনের ধারে রেখে আসবি, আমার লোক এসে নিয়ে যাবে। যদি এর নড়চড় হয়, তাহলে তোদের সবক’টাকে লাল হলুদ গিরগিটি ফড়িং বানিয়ে টপাং টপাং করে খেয়ে ফেলব।”

মানুষরা সবাই গড় করে বলল, “তাই হবে রানি রাগেশ্বরী, তাই হবে।”

পুঁটুলিতে লাড্ডু বেঁধে তারা ঘাড়ে করে রাগেশ্বরীকে দিয়ে গেল সবুজ বনের কিনারায়।

রাগেশ্বরী লাড্ডুর পুঁটুলি নিয়ে মহানন্দে থপথপিয়ে হেঁটে লাল ফুলের বাগিচা, হলুদ ঝরনা পেরিয়ে হাজির হল নীলপুকুরের ধারে। এবারে কিন্তু আর ঝরনার জলে হাতও দেয়নি, আর লাল ফুলের গন্ধও শোঁকেনি।

নীলপুকুরের ধারে পৌঁছতেই ছুটে এল বদ্রীনাথদাদা। ডুকরে কেঁদে উঠে বললー

“রাগেশ্বরী ছোট্ট বোনটি

কোথায় ছিলে এতকাল?

বদ্রীদাদার মনের দুঃখে

হয়েছে বড়ো করুণ হাল।”

রাগেশ্বরী একটা লাড্ডু নিয়ে বদ্রীদাদার মুখে পুরে দিয়ে বললー

“ছিলুম আমি মানুষপাড়ায়

সবুজ বনের ধারে,

সেথায় হলাম রানি তাদের

সহজে কি ছাড়ে?”

বদ্রী তো লাড্ডুটা খেয়ে আনন্দে আত্মহারা! বলে, “এ কী অপূর্ব খাবার আনলে বোন! খেয়ে জীবন ধন্য হল। কিন্তু তোমার শ্যাওলা-সবুজ গায়ে এমনি হলুদ ছোপ লাল বুটি কী করে হল?”

রাগেশ্বরী বলল, “আমি মানুষদের রানি হয়েছি না? তাই তো আমার এমন রূপ! এবার থেকে প্রতিমাসে আমার মানুষ প্রজারা সবুজ বনের কিনারায় আমার পুজো করে তার প্রসাদ এই লাড্ডু রেখে যাবে। তুমি আমায় রথে বসিয়ে টেনে টেনে নিয়ে যাবে প্রসাদ আনতে, কেমন?”

বদ্রীনাথ বোনের রথ টেনে অতটা পথ যেতে হবে ভেবে একটু মনখারাপ করলেও অমন সুন্দর লাড্ডু প্রতিমাসে খেতে পাবে ভেবে আনন্দে রাজী হয়ে গেল। আর নীলপুকুরের বাসিন্দা বাকি সব ব্যাঙেরাও প্রসাদে লাড্ডু খাওয়ার লোভে আর রাগেশ্বরীর অমন হলুদ লাল চেহারা দেখে ভয়ে শ্রদ্ধায় তাকে রানি বলে মেনে নিল।

তারপর থেকে রাগেশ্বরী আর বদ্রীনাথ মহানন্দে লাড্ডু খায় আর কখনও নীলপুকুরের পদ্মপাতায় বসে কখনও বা ব্যাঙের ছাতার তলে বসে গান ধরেー

গ্যাঙর গ্যাং, গ্যাঙর গ্যাং

তাইরে নাইরে না,

রাগেশ্বরী বদ্রীনাথ

আমরা ব্যাঙের ছা!

শ্যাওলা-সবুজ গায়ে দেখো

নকশা হলুদ লাল,

রাগেশ্বরী রানির রানি

করল যে কামাল!

বদ্রীনাথ দাদার সাথে

লাড্ডু প্রসাদ খায়,

রাগেশ্বরীর আশীর্বাদে

ব্যাঙেদের হোক জয়!


___


অঙ্কনশিল্পীঃ সুকান্ত মণ্ডল


No comments:

Post a Comment