ছোটো গল্পঃ রামধনুর রঙফেরতা - মধুমিতা ভট্টাচার্য



রামধনুর রঙফেরতা


মধুমিতা ভট্টাচার্য



তুন্নাই বেজায় খুশি। সামনেই পুজোর ছুটি। ক’দিন আর সক্কালবেলা ঘুম থেকে উঠতে হবে না। সঙ্গে পুজোর আনন্দ তো আছেই।

তুন্নাই ক্লাশ থ্রিতে পড়ে। রোজ সকালে জগদেও ভাইয়ার রিক্সায় চেপে স্কুলে যায়, আবার বিকেলে ওতেই স্কুল থেকে ফেরত আসে। রোজ আসা-যাওয়ার পথে কত গল্প শোনায় ভাইয়া। ওর দেশের গল্প, হরি-ভরি ক্ষেতের সোনালি ধানের গল্প, বেশি বৃষ্টিতে ক্ষেতখামার ভাসিয়ে বন্যা কিংবা অনাবৃষ্টিতে ফুটিফাটা সুখা-জমির গল্প, ঠাকুরদেবতা আর পরিদের গল্প, আরও কত কী! শুনতে শুনতে, চলতে চলতে রাস্তা, স্টেশন, বাজার, রেল-কলোনি, কালীমন্দির সব পার হয়ে যায়। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে প্যাডল চালায় জগদেও ভাইয়া আর ঠ্রিং-ঠ্রিং ঘণ্টি বাজায়। তুন্নাইও চারদিকের লোকজন, গাড়ি, ঘোড়া দেখতে দেখতে আর গল্প শুনতে শুনতে আসা-যাওয়া করে প্রতিদিন।

বাড়ি পৌঁছেই জগদেও ভাইয়া তুন্নাইকে বলে, “তো ঠিক হ্যায়, হামি কাল ফিন আইবে।”

তুন্নাই বলে, “টা-টা, কাল কিন্তু আরেকটা গল্প চাই।”

জগদেও বলে, “জরুর দিদিমণি।”

ক’দিন আগে বিকেলে স্কুল ছুটির ঠিক আগে দশ-মিনিটের ধুম বৃষ্টি। শরৎকাল, তাই যখন তখন একপশলা ঝুমঝুমিয়ে মেঘভাঙা জলের ফোয়ারায় চারদিক ভিজে ঝাপসা হয়ে যায়। বৃষ্টি থামলে স্কুলের বাইরে এসে রিক্সায় উঠতে গিয়েই তুন্নাইয়ের চোখে পড়েছিল বিশাল বড়ো একটা সাতরঙা রামধনু। মেঘলা আকাশের এপাশ থেকে ওপাশ অবধি অর্ধবৃত্তাকারে বুরুশ দিয়ে যেন কেউ সাতখানা রঙ মাখিয়ে রেখেছে। আর অন্যদিকে মিটিমিটি হাসছে ভিজে ভিজে নরম রোদটা!

“দেখো দেখো জগদেও ভাইয়া, কত্ত বড়ো রামধনু উঠেছে আকাশে!” খুশিতে হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছিল তুন্নাই।

“ও তো রামজী কা ধনুষ হ্যায় দিদিমণি। উসি ধনুষ সে হি তো রামজী রাক্‌ষস রাবণকো মারা থা। আভি বারিষকা পানি সে ধো-ধাকে সুখনেকে লিয়ে আকাশ পর টাঙকে রাখা। সমঝি দিদিমণি?”

“না না ভাইয়া, তুমি কিচ্ছুটি জানো না! আমি জানি এটা। আমাদের শিবানী ম্যাম সায়েন্স ক্লাসে বলেছেন আমাদেরকে। কম্পিউটারে ছবিও দেখিয়েছেন। বৃষ্টির পর ভেজা মেঘের মধ্যে যে জলকণা থাকে, তার ওপর বিকেলের তেরছা রোদ এসে পড়ে। তখন সূর্যের আলো সাতটা রঙে ভাগ হয়ে গেলেই রামধনু হয়। আবার স্ফটিকের তিনকোণা প্রিজমের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো পার হয়ে গেলেও এরকমই সাতরঙ দেখা যায়। ছোটোকাকু দেখিয়েছে আমায়। তখন একদম রামধনুর মতোই দেখায়। ছোটোকাকু বিদেশে পড়তে গেছে, তাই প্রিজমটা এখন আমার।”

“উতনা তো মুঝে মালুম নেহি দিদিমণি।” জগদেও মাথা নেড়ে বলেছিল, “লেকিন হামলোগ ইসিকো হি রামজী কা ধনুষ মানতে হ্যায়। ইসকো দেখনা আচ্ছা শগুন হোতা হ্যায়।”

কথায় কথায় সেদিন বাড়ি পৌঁছে গেছিল তুন্নাই। তারপর ভুলেও গেছিল রামধনুর গল্প।


দিনকয়েক পরের কথা। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়ার সেরে মার পাশে মটকা মেরে কিছুক্ষণ শুয়েছিল তুন্নাই। একটু পরে যেই দেখেছে মা ঘুমে, অমনি বিছানা থেকে নেমে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল তুন্নাই। রোজ স্কুল থেকে আসার পর মা জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেয় ওকে। কিন্তু এই সময় ঘুমোতে একটুও ভাল্লাগে না ওর। আসলে স্কুল থেকে ফিরে একটু না ঘুমোলে রাতে পড়তে বসেই ঘুমে ঢুলতে শুরু করে। ভাগ্যিস মা আজ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে, নইলে এক্ষুনি বলত “তুনু, ঘুমোও শীগগির, সন্ধেবেলা হোম-ওয়র্ক করতে পারবে না নইলে।”

তার ওপর আজ মওকা পেয়েছে একা ছাদে যাওয়ার। ওর একা ছাদে যাওয়াও মানা। সব্বাই ভয় পায়, আর বলে ছোটোদের একা একা ছাদে যেতে নেই। যেন একটুও বড়ো হয়নি ও! ক্লাশ থ্রিতে তে পড়া মেয়েকে কি ছোটো বলে?

জন্মদিনে দিদার কিনে দেওয়া আকাশী রঙের ফ্রকটা পরেছে আজ। খুব পছন্দের জামা এটা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পছন্দের জামাটা একটু দেখে নিয়ে টুকটুক করে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেল তুন্নাই।

আজও একটু আগে খানিক বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশজুড়ে এখন হালকা মেঘ আর অল্পস্বল্প রোদ্দুরের যুগলবন্দী। আকাশের এদিক ওদিক খুঁজে রামধনু দেখতে না পেয়ে মনটা একটু খারাপ হল তুন্নাইয়ের তারপর ভিজে ছাদের পুবদিকে লোহার স্ট্যান্ডে ঝোলানো দোলনার গায়ে লেগে থাকা জলের ফোঁটায় শেষ বিকেলের রোদে সাতরঙের খেলা দেখতে পেয়ে মন ভালো হয়ে গেল তুন্নাইয়ের।

প্লাস্টিকের ভেজা ঢাকনা সরিয়ে দোলনায় বসতেই তুন্নাইয়ের চোখ গেল ছাদের কোণে। ফটফটে সাদা জামা পরা একেবারেই অচেনা একটা মেয়ে ওখানে বসে আছে কেন? কে রে বাবা!

“এই, কে গো তুমি? এখানে কী করছ? নতুন কাজের মাসির মেয়ে নাকি তুমি?” তুন্নাই কোমরে হাত দিয়ে জেরা করে।

শুনেই মেয়েটা মাথা নেড়ে না বলে। তারপর ঠোঁট উলটে সে কী ফোঁপানি! তুন্নাই ঘাবড়ে গিয়ে বলে, “আরে আরে কাঁদো কেন? আমি কি বকেছি নাকি?”

“আমি রামধনু।” ফোঁপাতে-ফোঁপাতেই বলে মেয়েটা।

“রামধনু? তার মানে? বললেই হল? রামধনু লোকের ছাদে এসে বসে থাকে? তাছাড়া রামধনু সাদা হয়? ঠিক করে বলো তো কে তুমি? শীগগির। নইলে এক্ষুনি আমার মাকে বলে দেব!”

“সত্যিই আমি রামধনু।” চোখ মুছে বলে মেয়েটা। “আজ বৃষ্টির পর ওই যে ওরা সব রঙ নিয়ে চলে গেল। তাতেই আমি সাদা হয়ে গেছি। বিশ্বাস করো, একটুও মিছে কথা বলছি না আমি!”

“হুম, আসল কথাটা এবার ঠিকঠাক বলো তো! কী ব্যাপার, কে তোমার রঙ নিয়ে গেল?”

“শোন তাহলে বলি।” নড়েচড়ে বসে সে। “আমার গায়ে যে সাতটা রঙ থাকে সে তো জানোই।”

“হুম, জানি তো। বে-নী-আ-স-হ-ক-লা, মানে বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। তাই তো?”

“ঠিক তাই। এই সাতরঙেই আমি। তা আজ হল কী, ওই যেখানে আকাশ আর মাটি একজায়গায় বসে গল্পগুজব করে, ওরই আশেপাশে একটু বেড়াতে গেছিলাম। ওদিকের বেগুনক্ষেতের সাদা বেগুনগুলো আমার পুরোটা বেগুনি রঙ ছিনতাই করে পালাতেই বাকি আর সবাই হুড়মুড়িয়ে এসে আমার রং নিয়ে এমন কাড়াকাড়ি চেঁচামেচি শুরু করে দিল যে কী বলি!”

“আর সবাই মানে!” তুন্নাই অবাক।

“ওই যে ওই দেখো না, নীলকন্ঠ পাখিটা আমার নীল রঙটা নিয়ে কেমন নিজের পালকে মেখেছে, যেন নীল আবিরে দোল খেলছে! দুষ্টু আকাশটাও আকাশী রঙ নিয়ে চম্পট দিয়েছে, জঙ্গলের গাছগুলো তো সবুজের ভাগ ছাড়তে কিছুতেই রাজি হল না। সজনেগাছের বেনেবৌ পাখিটাকে দেখো, দিব্যি আমার হলুদ রঙ মেখে ফুড়ুত ফুড়ুত করে এ-ডালে সে-ডালে নেচে বেড়াচ্ছে! ওদিকে আমার কমলা রঙটা যেন আসলে কমলালেবুরই ছিল এমনই ঢং করছে লেবুগুলো। আর লালের কথা কী বলব, থোকা থোকা রঙ্গন ফুলগুলো সেই থেকে তাদের ঘাঘরায় আর ওড়নায় লাল রং মেখে লাল পরি সেজে বসে আছে! এদিকে আমায় দেখো! বে-রঙধনু হয়ে লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতেই পারছি না। কিন্তু কে বোঝে! দূর থেকে দেখে তোমাকেই বন্ধু বলে মনে হল আমার। তাই তোমার কাছে এলাম। মেঘরাজা দেখে ফেললে ভীষণ রেগে যাবেন। তাঁর চোখ থেকে তখন আগুন-বিজলির তলোয়ার ঝলসে উঠবে আর কান ফাটানো হুঙ্কার দেবেন! কীই কাণ্ড যে হবে তখন! সেই ভয়ে চুপিচুপি তোমার ছাদে এসে বসে আছি। তুমি আমায় তাড়িয়ে দেবে না তো?”

“না না, কেন তাড়াব? এখানে এসে খুব ভালো করেছ। দাঁড়াও, একটা কিছু উপায় করি।”

তারপর কী একটু ভেবে নিয়ে ‘আইডিয়া’ বলে লাফিয়ে উঠল তুন্নাই আর একছুট্টে নিচে গিয়ে ছোটোকাকুর ঘর থেকে স্ফটিকের প্রিজমটা হাতে নিয়ে ছাদে এল আবার।

সেটা দেখে রামধনু মেয়েটা তো অবাক। “এটা কী গো?” জিজ্ঞেস করল সে।

“দেখো না কী হয়।” বলে তুন্নাই প্রিজমটা হাতে নিয়ে চোখের সামনে ধরতেই একেবারে অবাক কাণ্ড! ঝপ করে কোত্থেকে যেন এক ঝাঁক লাল মুনিয়া পাখি এসে তাদের লালরঙা পালক বুলিয়ে দিল রামধনুর গায়ে। পাটে বসতে যাওয়া সুয্যিমামাও খানিকটা কমলা রঙ ছুড়ে দিল ওর দিকে। অমলতাস গাছটা থেকে একগাদা হলুদ রঙ ঝুরঝুরিয়ে ঝরে পড়ল পায়ের কাছে। গভীর সমুদ্দুরের মোলায়ম নীল ঢেউ এসে হাত বুলিয়ে দিল মেয়েটার গায়ে। ট্যাঁ-ট্যাঁ করে এক দঙ্গল টিয়াপাখি বুনো সবুজ রঙ ছড়িয়ে দিয়ে গেল ওর জামাটার ওপর। ফুলে ভরা জ্যাকারান্ডা গাছটা থেকে অ্যাত্ত বেগুনি রঙ আলতো হাওয়ায় ভেসে উড়ে এল, আর এতসব দেখে তুন্নাইও ওর গায়ের প্রিয় ফ্রকটা থেকে একটু আকাশী রঙ আলগোছে নিয়ে ওর মুখে মাখিয়ে দিল আদর করে। তারপর সেই প্রিজমের ভেতর দিয়ে যেই না অস্ত-সূর্যের সোনালি আলো মেয়েটার গায়ে ফেলেছে, অমনি ধীরে ধীরে সাত রঙে ভরে গেল তার শরীর। বে-রঙধনু আবার আগেরমতোই সাতরঙা রামধনু। বে-নী-আ-স-হ-ক-লায় মাখামাখি।

কী খুশি, কী খুশি! ধাঁ করে একপাক নেচে জড়িয়ে ধরল সে তুন্নাইকে। বলল, “অনেক ধন্যবাদ। তুমি খুব ভালো। কী সুন্দর আমার সব রঙ আমায় ফিরিয়ে দিলে! আমরা কিন্তু আজ থেকে বন্ধু হলাম, কেমন? আচ্ছা, তবে আসি এবার! এখনও দিনের আলো আছে। আরও কিছুক্ষণ হয়তো ভেসে থাকতে পারব আকাশে।”

তুন্নাই দেখল রঙবাহারি ডানা মেলে রামধনু-বন্ধু কেমন বোঁ করে উড়ে গিয়ে শেষ বিকেলের সোনা রোদ মাখা মেঘ-মুলুকে গিয়ে বসল। আকাশের এ-পার ও-পার ঝলমলে সাতরঙ ছড়িয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল মেয়েটা। তুন্নাইও হাসিমুখে দুলতে থাকল দোলনায়।

“তুন্নাই, ও তুন্নাই, তুনুউউ...! তুই এখানে ঘুমোচ্ছিস! দেখো মেয়ের কাণ্ড! আর আমি এতক্ষণ ধরে সারা বাড়ি খুঁজে হয়রান হয়ে গেলাম! শীগগির নিচে চল, সন্ধে হয়ে এল তো!”

মার ডাকে চোখ কচলে উঠে বসে তুন্নাই। কখন যেন দোলনাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। সন্ধে লাগা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে হালকা মেঘের আড়ালে তরমুজ-ফালি চাঁদটা ঝুলে আছে আর একটা দুটো তারা ফুটেছে এখানে ওখানে। রামধনু বোধহয় তার বাড়ি চলে গেছে।

“আরে, এটা কী!” বন্ধ মুঠো খুলে তুন্নাই দেখে ছোটোকাকুর প্রিজমটা তখনও তার হাতেই ধরা আছে।

তুন্নাই ভাবে মাকে বলবে কি না রামধনুর রঙ ফেরানোর কথা। কিন্তু মা কি বিশ্বাস করবে সেসব?

তক্ষুনি দোলনাটা যেন চোখ টিপে আর মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলে ওঠে, “আমি দেখেছি তো, সব সত্যি।” ওর সঙ্গে সঙ্গে গ্রহ-তারা-চাঁদের চিকিমিকিওলা চাদর গায়ে জড়ানো আকাশটা আর ভিজে ভিজে বাতাসটাও একসঙ্গে ফিসফিস করতে থাকে, “সব সত্যি, সব সত্যি।”

“সব সত্যি।” তুন্নাইও বলে ওঠে। তারপর দোলনা আর আকাশের দিকে হাত নেড়ে বলে, “টা-টা।”

“কী সত্যি রে? কী বলছিস? কাকেই বা টা-টা বললি?” মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।

“কিচ্ছু না মা। চলো হোম-ওয়র্ক করতে বসি গিয়ে।”

মা বলে, “পাগলি। কী যে বলিস বুঝি না বাবা। হ্যাঁ শোন, তোর ছোটোকাকু ফোন করেছিল। তোকে বলতে বলেছে যে ওদের ওখানেও নাকি একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে আর মস্ত রামধনু উঠেছে আকাশে।”

“কী মজা, রামধনু এখন ওখানে!” তুন্নাই নেচে ওঠে।

ওর মনের ভেতর তখন সত্যির মতো একটা স্বপ্ন সাত রঙে মাখামাখি হয়ে থাকে আর রং ঝলমল রামধনুটা অন্য আরেকটা দেশের আকাশ জুড়ে দোল খায়।


অঙ্কনশিল্পীঃ সুজাতা


No comments:

Post a Comment