ছোটো গল্পঃ নিঝুম সন্ধ্যায় - সনৎকুমার ব্যানার্জ্জী


নিঝুম সন্ধ্যায়


সনৎকুমার ব্যানার্জ্জী



মধ্যমগ্রাম রেল স্টেশন থেকে বসুনগরে মেজোপিসিমার বাড়িটা তা প্রায় এক কিলোমিটার পথ তো হবেই। যশোর রোডের দিক থেকে এলে বরং অনেকটা কাছে পড়ে। চৌমাথার মোড়েই ছিল বাস স্টপ। কলকাতার শ্যামবাজারের খাল ধারের কাছ থেকে ৭৯ নম্বর পাবলিক বাস ছিল বারাসত পর্যন্ত। কিন্তু সে তো সারা দিনমানে হাতে গোনা কয়েকটা। সে একটা ছেড়ে গেলে পরেরটা কখন ছাড়বে তার ঠিক নেই। বারাসত ফেরত বাস এলে তবে। বাসে নেহাত ঠেকায় না পড়লে যাতায়াত করতাম না। তাই শিয়ালদা থেকে লোকাল ট্রেনই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। তখনও ইলেক্ট্রিক ট্রেন চালু হয়নি। সারা মধ্যমগ্রামেই ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না। মধ্যমগ্রাম মানে গ্রামই ছিল।

আমি অবশ্য বলছি আজ থেকে প্রায় পঁয়ষট্টি বছর আগের কথা। আমাদের বাড়ি বর্ধমান শহরে। আমি তখন বর্ধমানের রাজ কলেজ থেকে বি.এস.সি পাশ করে কলকাতায় রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে কেমিস্ট্রি নিয়ে এম.এস.সি-তে ভর্তি হয়েছি। এতদিন তো স্কুল-কলেজ বাড়ির থেকেই যাতায়াত করেছি। কিন্তু বর্ধমান থেকে কলকাতা রোজ যাতায়াত করে পড়া আমার পক্ষে অসম্ভব। তাহলে ওই যাতায়াতটাই শুধু হবে, পড়াশুনাটা আর হবে না। কলকাতায় আমার থাকার মতন কোনোরকম সুবিধে নেই। সায়েন্স কলেজের কাছেই ইউনিভার্সিটির পিজি হোস্টেল।  সেখানে থাকার জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু কবে পাব জানি না। কলকাতায় আমহার্স্ট স্ট্রিটে অবশ্য আমার মামাদের বাড়ি। কলেজ থেকে হেঁটেই যাওয়া যায়। যদি এখানে থেকে পড়া যায় এই ভেবে আমার সেজকাকা আমাকে নিয়ে আমার মামার বাড়িতে এলেন। আমার দিদিমা তখন বেঁচে। উনিই বলতে গেলে সংসারের মাথা। দিদিমা আর মামাদের সঙ্গে কথা বলে এটুকু বোঝা গেল যে প্রস্তাবটাতে তাঁরা কেউ খুব একটা খুশি নন। তাদের নিজেদেরই এত লোক, বাড়িতে নাকি পা ফেলারও জায়গা নেই।

বছর তিনেক আগে বাবা গত হয়েছেন। আমার অভিভাবক আমার দাদু মানে ঠাকুর্দা ও সেজকাকা। আমাদের বলতে গেলে একান্নবর্তী পরিবার। ন’কাকা কৃষ্ণনগরে ডাক্তারি করেন, তাই বাইরে থাকেন। ছোটোকাকা আমার থেকে বছর দুয়েকের বড়ো। মেজকাকাও নেই। তাঁর পরিবার সব এ-বাড়িতেই থাকেন। আমাদের বর্ধিষ্ণু সচ্ছল পরিবার। বর্ধমান শহরের ওপর কার্জন গেট ছাড়িয়ে জিটি রোডের ধারে অনেকটা জায়গা নিয়ে বিশাল বাড়িーদাদুই তৈরি করেছিলেন। কাছেই দামোদরের পাড়ে দেশ, জমিজমা বিস্তর। খাওয়া-পরার অভাবটা ছিল না। কলকাতায় অবশ্য অনেক মেস আছে, কিন্তু তার কয়েকটা দেখে আমার সেজকাকার তাঁর আদরের ভাইপোকে ওইসব মেসে রাখার কোনোরকম ইচ্ছেই হল না। এদিকে নতুন ক্লাশ শুরু হবার সময় হয়ে আসছে। শেষপর্যন্ত কি বর্ধমান থেকেই ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করতে হবে?

এমন সময় আমার সমস্যা শুনে এগিয়ে এলেন আমার মেজো পিসেমশাই। অত্যন্ত সৎ, ধার্মিক, নিষ্ঠাবান, শান্ত, এককথার মানুষ। মধ্যমগ্রামে থাকেন ও সেখানকার এক স্কুলে মাস্টারি করেন।  আমার পিসিমাও খুব শান্ত, স্নেহপ্রবণ, ভালো মানুষ। অত্যন্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। একটিই ছেলে খুদু আমার থেকে বছর দুয়েকের ছোটোーইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বারাসত কলেজে বি.এ পড়ছে ইকনমিক্স নিয়ে। মেজো পিসেমশাই বললেন, “মধ্যমগ্রাম তো আর কলকাতা থেকে তেমন দূর নয়, শিয়ালদা থেকে ট্রেনও অনেক আছে। কত লোকই তো রোজ কলকাতা যাতায়াত করছে। তা বেণু না হয় আপাতত আমার কাছে থেকেই পড়ুক যতদিন না হোস্টেল পাচ্ছে। আর যদি হোস্টেল নেহাত না-ই পায়, আমার ওখানেই থাকবে। আমার পরিবারে যা ডাল-ভাত হয় তাই খাবে।”

আমার সেজকাকা আর দাদু শুনে নিশ্চিন্ত হলেনーএর থেকে ভালো প্রস্তাব এখন আর কী হতে পারে। আমার পিসিমাকে দাদু প্রয়োজন মতন আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকেন, তাই আমার ব্যাপারেও পিসিমাকে কোনোরকম চিন্তা করতে নিষেধ করলেন।

কলেজের ক্লাশ শুরু হবার আগে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে চলে এলাম। এর আগে অবশ্য ছুটিছাটায় মধ্যমগ্রামের বসুনগরে পিসিমার বাড়িতে অনেকবার থেকেছি। কাজেই জায়গাটা আমার মোটেই অপরিচিত নয়।

সে সময়ের আর আজকের বসুনগরে আকাশপাতাল তফাত। তখন সারা বসুনগর এলাকায় গোটা বারো বাড়ি ছিল। চারদিকে ছিল ঘন আগাছায় ভরা মাঠ আর মাঠ, গাছগাছালিতে, বাঁশঝাড়ে ভরা। মাঝে মাঝে দ্বীপের মতো কয়েকটা বাড়ি জেগে আছে। কাঁচা রাস্তা। গোটা কয়েক পুকুর ছিল। আর আজ শুধুই মাল্টিস্টোরিডে ভরে যাচ্ছে। যে সময়ের কথা বলছি, তখনও সে অঞ্চলে ইলেক্ট্রিক আসেনি, এসেছে ১৯৬০-এর পরে। যা কিছু আলো ওই স্টেশন চত্বরে। প্ল্যাটফর্ম মাত্র ফুট খানেক উঁচু। ট্রেনের পাদানিতে নেমে তার পরে নামতে হত। সন্ধে হলেই চারদিক ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, এখানে ওখানে দূরে দূরে হ্যারিকেনের টিমটিমে আলো। সন্ধের পরে নেহাত যারা ট্রেনে বা বাসে ফিরত তাদের ছাড়া রাস্তায় লোক দেখা যেত না। সে আর ক’জন? অন্ধকারে শেয়াল ঘুরে বেড়াত। এখন যে চৌমাথার মোড়টা, সেখানে একটা শুধু দড়মা দেওয়া চায়ের দোকান। পাশ দিয়ে চলে গেছে যশোর রোডーকলকাতার শ্যামবাজার থেকে শুরু হয়ে বনঁগা হয়ে বাংলাদেশের যশোর।

মধ্যমগ্রামে পিসিমার বাড়িটা তখন ছিল একতলা, তিনখানা ঘর। দুটো বড়ো, একটা ছোটো যেটাতে খুদু থাকে। সামনে বারান্দা। পেছনে আর পাশে অনেকটা খালি জায়গা।  জবা, কাঠ টগর, শিউলি, স্থলপদ্মーনানারকম ফুলের গাছ। আমি আসার পর পিসেমশাই ছোটো ঘরটা বসার ঘর করে একটা বড়ো ঘরে আমার আর খুদুর থাকার বন্দোবস্ত করলেন।

ইতিমধ্যে আমার কলেজের ক্লাশ আরম্ভ হয়ে গেল। স্টেশন যাবার রাস্তাটা মোটামুটি চিনতাম, আগেও তো কয়েকবার এসেছি। আমার থিওরেটিক্যাল ক্লাশ শুরু হয় এগারোটায়ーতিনটে পিরিয়ড, বেলা দুটো পর্যন্ত। তখনও প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাশ আরম্ভ হয়নি। কাজেই দুটোয় ছুটি হয়ে যায়।  তখনও সহপাঠীদের সঙ্গে তেমনভাবে আলাপ-পরিচয় হয়নি। কলকাতার রাস্তাঘাট একেবারেই চিনি না। তাই ক্লাশ শেষ হলেই বেলা তিনটের বনগাঁ লোকাল ধরে সন্ধের অনেক আগেই বাড়ি চলে আসি।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে যে রাস্তাটা বসুনগরের দিকে এসেছে, তার বাঁদিকে ছিল এক-একটা বিশাল এলাকা জুড়ে তিনটে পাঁচিলঘেরা বাগানবাড়ি। আর ডানদিকে ছিল শুধু ঘন বাঁশবন। বট, অশ্বত্থ, পাকুড়, বাবলা, আম-জামーনানারকম গাছ তো ছিলই।  না একটা বাড়ি, না একটা চায়ের দোকান। অবশ্য এখানকার বাসিন্দাদের এই পরিবেশ অভ্যাস হয়ে গেছে। আমাদের বর্ধমানের বাড়িতে ইলেক্ট্রিক লাইট, ফ্যান, রেডিও সবই ছিল। হ্যাঁ, ফ্রিজ-এসি অবশ্য তখন ছিল না। ফলে প্রথম প্রথম আমি বেশ ফাঁপরেই পড়লাম। যা হোক, মনে মনে ভাবলাম যেভাবেই হোক আমাকেও মানিয়ে নিতে হবে। খুদুও তো এই পরিবেশেই বড়ো হচ্ছে।

আমরা ছোটো থেকে পিসিমার বাড়ি আসতাম বর্ধমান থেকেーপ্রথমে ট্রেনে হাওড়া, তারপর হাওড়া থেকে বাসে শিয়ালদা আর সেখান থেকে ট্রেনে মধ্যমগ্রাম। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লেগে যেত এক-এক সময়ে। দিনের বেলাতেই আসতাম। ক’দিন থেকে আবার আসার দিন দুপুরে খেয়েদেয়েই বেরিয়ে আসতাম। সন্ধের পর আসা বা যাওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না। তাই সন্ধের পর নিকষ কালো অন্ধকারে মধ্যমগ্রাম রেল স্টেশন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ঠেঙিয়ে, জংলা মাঠ ভেঙে, শেয়াল, কুকুর, সাপ-খোপের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে পিসিমার বাড়ি আসার অভিজ্ঞতা তখনও আমার ছিল না। মালুম হল যেদিন মালগাড়ি ডিরেইলড হয়ে আমাদের ট্রেন প্রায় সাড়ে সাতটায় মধ্যমগ্রাম পৌঁছাল।

সারা ট্রেন মাথায় একটাই চিন্তা, এই অন্ধকারে বাড়ি যাব কী করে। যদিও মধ্যমগ্রামে অনেকেই নামে, তবে ট্রেন লেট দেখে বহু লোক শ্যামবাজার হয়ে বাসে ফিরে গেছে। আমি কোন বাস কোথা থেকে ছাড়বে কিছুই জানি না। জিজ্ঞাসা করে নিশ্চয়ই জেনে নেওয়া যেত। আসলে আমি একটু মুখচোরা, আর ততটা স্মার্ট ছিলাম না। স্টেশনে কয়েকজন ট্রেন থেকে নামল বটে, কিন্তু নেমেই হনহন করে অন্ধকারে কোথায় যে মিলিয়ে গেল যে কারোর সঙ্গ নেব সেই চান্সই পেলাম না।

প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরোনোর মুখটায় দেখি পিসেমশাই টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ওঁকে দেখে খুবই নিশ্চিন্ত হলাম আবার অবাকও হলাম ওঁকে এখানে দেখে। পিসেমশাই বললেন, “শুনলাম মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়ে ট্রেন সব তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা লেটে আসছে। তুমি তো তিনটের ট্রেনে আসো, তা তোমার আসতে আসতে সন্ধের অন্ধকার হয়ে যাবে, একা পথ চিনে আসতে পারবে কি না ভাবলাম, তাই চলে এলাম।”

প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। সত্যি এখনও ভাবি কতটা স্নেহ, ভালোবাসা, দায়িত্ব এঁদের ছিল।

প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে একটু এগোতেই স্টেশন চত্বরের টিমটিমে বালবের আলো মিলিয়ে গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিক গ্রাস করে নিল। পিসেমশাই টর্চ জ্বালিয়ে আমাকে নিয়ে এগিয়ে চললেন। শুক্লা অষ্টমীর চাঁদের আলো আর চারদিক অন্ধকার মিলে এক অদ্ভুত ছমছমে পরিবেশ। তার মধ্যে পিসেমশাইয়ের হাতের টর্চের আলো আলেয়ার মতন নাচতে নাচতে যাচ্ছে। সরু রাস্তার একপাশে গাছে গাছে ঢাকা বাগানবাড়ি সব আর অপরদিকে ঘন বাঁশবন। কেবল মনে হচ্ছে আমার পেছনে কারা আসছে, কে যেন পাশ দিয়ে চলে গেল। আমি শুধু টর্চের আলো লক্ষ্য করে পিসেমশাইয়ের গা ঘেঁষে চলছি। কখন যে বাড়ি পৌঁছে গেলাম টেরই পাইনি। একটাই কথা মাথায় ঘুরছে, পুজোর ছুটির পর প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাশ আরম্ভ হলে রোজই তো এই সময়ে ফিরতে হবে। তখন কী করব!

খুদুর এক বন্ধু ছিল বিধান। পিসিমার বাড়ি ছাড়িয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়ে আবার বাঁদিকের রাস্তার খানিকটা খালি জমি পেরিয়ে বিধানদের বাড়ি। মোটামুটি কাছাকাছি বয়স হবার সুবাদে আমরা তিন বন্ধু, কারণ সমবয়সী বলতে আর কোনো ছেলে তখন পাড়ায় ছিল না। সেই সময়ে আরেকটি ছেলে আমাদের দলে জুটে গেলーখুদুর কলেজের বন্ধু কল্যাণ, থাকত উদয়রাজপুরের দিকে। সপ্তাহের দিনগুলোতে যে যার কলেজ, পড়াশুনা এসব নিয়ে থাকতাম। সন্ধের পর বেরোনো বারণ, পিসেমশাইয়ের কড়া শাসন। কল্যাণও অন্ধকারে আসত না। একমাত্র রবিবার বা ছুটির দিন আমাদের কোনো বিধিনিষেধ ছিল নাーতবে যা কিছু আড্ডাবাজি, দাবা বা ক্যারম খেলা ওই সূর্যাস্ত পর্যন্ত।

বিধানের দুই দাদা। বীরেনদা অনেক বড়ো, বয়স প্রায় চৌত্রিশ পঁয়তিরিশ। তারপর বিনয়দা, আমার থেকে বছর চারেকের বড়ো। মাঝে দুই দিদি। তাঁদের বিয়ে হয়ে গেছে। বড়দি বসিরহাট আর ছোড়দি হাবড়ায় থাকেন। বিধানের মা ছিল না, বড়ো বৌদি সংসারের কর্ত্রী। খুব স্নেহময়ী।  বাবা পিসেমশাইয়ের বন্ধুস্থানীয়। খুদু, বিধান, কল্যাণ আমার বন্ধু হলেও আমি ঠিক ওদের সঙ্গে প্রাণ খুলে মিশতে পারতাম না, কেমন একটু বাধো বাধো লাগত। সেটা আমি বছর দুয়েকের বড়ো বলে। অবশ্য টেনিদার মতন দাদাগিরিও করতে পারতাম না। অথচ কেমন করে জানি না, বিনয়দার সঙ্গে আমার খুব জমে গেল যদিও সম্পর্কটা দাদা-ভাইয়েরই ছিল।

আসলে বিনয়দার মধ্যে অদ্ভুত একটা আকর্ষণ ছিল। চেহারা মাঝারি লম্বা, একহারা, ফর্সাই বলা চলে। অল্প অল্প পাতলা দাড়িগোঁফ, কখনো-সখনো কাটতেন। নাকমুখ বেশ চোখা চোখা। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। মোটামুটি শান্তশিষ্ট ধরনের। অনেক কিছুই জানতেন, কেবল জানতেন না একটা জিনিসーভয় কাকে বলে। সবসময়ে ধুতি-শার্ট পরতেন। তখন অবশ্য আমরাও বেশিরভাগই ধুতি-শার্টই পরতামーবিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলের ছেলেরা। বি.কম পাশ করে শিয়ালদার কাছে একটা ইন্সিওরেন্স অফিসে চাকরি করতেন। খুব পরোপকারী। বিশেষত পাড়ার কারোর বাড়িতে অসুখ-বিসুখ হলে কলকাতায় ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ওষুধ-বিষুধ কিনে আনা, দরকার হলে রাত জেগে সেবা করাーবিনয়দা অক্লান্তভাবে করতেন।

দেখতে দেখতে পুজো এসে গেল। ছুটিতে আমি বর্ধমান চলে গেলাম। খুদুও আমার সঙ্গে চলে এল। আমাদের দেশে গ্রামের বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়। সেজোকাকাই সব দেখাশুনা করেন। গ্রামের পুজো, শহরের পুজো সব মিলিয়ে বেশ ভালোই কাটল দিনগুলো। বিজয়ার পর পিসেমশাই ও পিসিমা দাদুকে প্রণাম করতে এলেন। তিন-চারদিন থেকে খুদুকে নিয়ে ফিরে গেলেন। প্রতিবছরই বিজয়ার পর বাড়িতে আত্মীয়স্বজনে বাড়ি গমগম করে। পিসি-পিসেমশাইরা, ন’কাকা সবাই আসেন। ক’দিন খুব হৈ চৈ হয়। কলেজ খোলার দিন কয়েক আগে আমিও ফিরে এলাম।

এক সপ্তাহ কলেজও হয়ে গেল। পরের সোমবার থেকে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ আরম্ভ হবে। ক্লাশ শেষ হতে হতে বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা তো হবেই। সুতরাং সন্ধে ছ’টার বনগাঁর লোকাল ট্রেনটা ছাড়া আমার কোনো গতি নেই। তখনকার দিনের কয়লার ইঞ্জিন, প্যাসেঞ্জার ট্রেন। শিয়ালদা থেকে একঘণ্টার মতন লাগত আসতে। আর তার মানে সন্ধে সাতটার আগে আমি কোনোমতেই মধ্যমগ্রাম পৌঁছাচ্ছি না। শীতকাল আসছে, তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে যাবে। এই ঘোর অন্ধকারে স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরব কী করে এই ভেবে আমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে খুবই শঙ্কিত। এবার আসার সময়ে বর্ধমান থেকে একটা ছোটো টর্চ কিনে নিয়ে এসেছি। এক-একবার মনকে সান্ত্বনা দিই, আরে কাউকে না কাউকে ঠিক পেয়ে যাব। এর মধ্যে ওখানকার কিছু লোকের সঙ্গে আলাপও হয়ে গেছে যারা কলকাতায় ট্রেনে যাতায়াত করে।

সেদিনের শনিবারটা কী কারণে যেন ছুটি ছিল সবার। সারাটা দিন বিধানদের বাড়িতেই কাটল।  মেসোমশাই, বীরেনদা আর বৌদি হাবড়ায় ছোড়দির বাড়ি গেছেন কী একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান আছে। বিনয়দা গোটা দুয়েক বড়ো সাইজের হাঁস কিনে নিয়ে এসেছেন পাশের কোন গ্রাম থেকে। বাগানে সে দু্টোকে কেটে, ইটের উনুন করে, ডালপালা জ্বালিয়ে বিনয়দাই রান্না করলেন। বড়ো এক হাঁড়ি ভাত আর মাংস। কল্যাণও এসেছে। পাঁচজনেই চেঁছেপুঁছে সব উড়িয়ে দিলাম। সত্যিই, অপূর্ব রান্নার হাত বটে বিনয়দার।

খাওয়াদাওয়ার পর বিনয়দার সঙ্গে গল্প করতে করতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা বিনয়দা, আপনি অফিস থেকে বিকেলে ক’টার ট্রেনে ফেরেন?”

বিনয়দা জানালেন, “আমার তো পাঁচটায় অফিস ছুটি হয়। তাই বেশিরভাগ দিন ওই ছ’টার গাড়িতে আসি। মাঝে মাঝে কাজ থাকলে পরেরটায়। হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

আমি বললাম, “না মানে, আমারও তো পাঁচটায় ক্লাশ শেষ হবে। ভালোই হল তাহলে একসঙ্গে ফেরা যাবে। আসলে অন্ধকারে... একা ফিরব...”

বিনয়দা হেসে বললেন, “বুঝেছি। ভেবো না, আমি কাল তোমার জন্য শিয়ালদা স্টেশনে ওয়েট করব।”

সন্ধেবেলা ফেরার সময়ে বিনয়দা আমাকে বললেন, “কাল সকাল সাতটার মধ্যে রেডি থেকো। একজায়গায় তোমাকে নিয়ে যাব।”

খুব ভোরে ওঠাটাই পিসেমশাইয়ের বাড়ির রেওয়াজ। পাঁচটার মধ্যে সবাইকেই উঠে পড়তে হয়। আমি আর খুদু হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসি। পিসিমা চা করেন। পিসেমশাই চা খেয়ে হাঁটতে বেরিয়ে যান।

ঠিক সাতটা নাগাদ বিনয়দা বাড়ির বাইরে এসে ডাকলেন। আমি রেডিই ছিলাম, বেরিয়ে দেখি পিসেমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। বিনয়দাকে পিসেমশাই খুব স্নেহ করতেন, স্কুলে প্রিয় ছাত্র ছিলেন। ওঁর গলায় দেখি একটা কালচে হয়ে যাওয়া পিতলের বাইনোকুলার। ও, বিনয়দা তাহলে আমাকে নিয়ে পাখি দেখতে যাবেন।

পাখি দেখা যে ওঁর নেশা, সেটা খুদুর কাছে আগে শুনেছিলাম। প্রায় রবিবারই নাকি উনি হয় খুব সকালে নয়তো বিকেলের দিকে বেরিয়ে যান কোনোদিন উদয়রাজপুর, বারাসত, আমডাঙা, নীলগঞ্জের দিকে, কোনোদিন বাদুর দিকে আবার কোনোদিন সাজিরহাট, নোয়াই খালের দিকে। তখন ওদিকে কিছু কিছু লোক আসত যারা ফাঁদ পেতে নানারকম পাখি ধরে বিক্রি করত, এটাই তাদের ব্যাবসা ছিল। ওদের কাছ থেকে বিনয়দা অনেক পাখির নাম জেনেছিলেন। ওঁর কাছে দুটো পাখির বই দেখেছিলামーএকটা জগদানন্দ রায়ের লেখা ‘বাঙলার পাখী’ আর একটা সত্যচরণ ল-এর লেখা ‘পেট বার্ডস অফ বেঙ্গল’।

আমাকে আজকে নিয়ে গেলেন বাদুর দিকে। ধানক্ষেত, কচুরিপানা ভরা পুকুর, বাঁশবন, অজস্র বড়ো বড়ো গাছের সমাবেশ, জংলা-বাদাーসারাটা সকাল পাখির সন্ধানে ঘোরা হল। গোটা চল্লিশ রকমের পাখি দেখলাম। বিনয়দা সবগুলোই চেনেন, নাম বলে আমাকে চেনাতে লাগলেন। তিন-চারটে ছাড়া বাকি সবই আমার গুলিয়ে গেল।

পরের দিন সোমবার। আমি প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ সেরে বন্ধুদের সঙ্গে একটু গল্প-টল্প করে ধীরেসুস্থে পৌনে ছ’টা নাগাদ শিয়ালদায় এলাম। কিন্তু কোথায় বিনয়দা? এদিক ওদিক খুঁজছি।  হঠাৎ কে একজন আস্তে করে আমার পিঠে হাত রাখল। ঘুরে দেখি বিনয়দা। দু’জনে একটা কামরায় উঠে একধার দিয়ে বসলাম। বিনয়দার হাতে একটা ঠোঙায় ছোলাভাজা। দু’জনে খেতে খেতে, গল্প করতে করতে এলাম।

প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে রাস্তায় নামতেই কেমন ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল। কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না, অন্ধকারে শুধু দুটো সাদা ধুতি-শার্ট চলেছে। আমরা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলতে লাগলাম।

বিনয়দা বললেন, “চল দেখি কে আগে যেতে পারে।”

বিনয়দা বেশ জোরেই হাঁটেন। কিন্তু আমি ওঁর থেকে খানিকটা লম্বা, পাঁচ এগারো। আমি লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলাম। হাঁটার চোটে আমাদের বাড়ির গলি ছেড়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। বিনয়দা বলাতে আবার ফিরে গলিতে ঢুকলাম।

এরপর থেকে রোজই আমি আর বিনয়দা একসঙ্গে ফিরি, আর আমাদের জোরে হাঁটার কম্পিটিশন হয়। এটা আমাদের কেমন একটা নেশার মতন হয়ে গেছে। সারাটা ট্রেন গল্প করতে করতে আসি। কিন্তু বিনয়দা কোনোদিনই আমাকে হাঁটায় হারাতে পারেন না। আমি আবার এক-একদিন ইচ্ছে করে একটু পিছিয়ে পড়ি। উনি এগিয়ে যাচ্ছেন, এগিয়ে যাচ্ছেন। যেই আমাদের বাড়ির গলির মুখ আসে, তার খানিকটা আগে আমি আবার জোরে লম্বা পা ফেলে ওঁকে টপকে এগিয়ে যাই। বিনয়দারও জেদ চেপে যাচ্ছে। আমাকে বললেন, “দেখবে একদিন আমি তোমাকে হারাবই।”

মধ্যমগ্রামের দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। সপ্তাহের পাঁচদিন কলেজ, রোজ টানা তিন ঘণ্টা ক্লাশ, তার ওপর তিন ঘণ্টা প্র্যাকটিক্যাল। যাতায়াতেই সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি। সকালে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে আসি সাড়ে ন’টার ট্রেনটা ধরে, না হলে প্রথম ক্লাশটা মিস হয়ে যায়। আমি বরাবরই একট সিরিয়াস ধরনের, ক্লাশ খুব একটা ফাঁকি দিই না। রাত্রে ফিরে এসে খুব ক্লান্ত লাগে।  এতটা যাতায়াত করে স্কুল-কলেজ যাবার অভ্যাস তো ছিল না। তাছাড়া হ্যারিকেনের আলোতে বেশিক্ষণ পড়তে পারতাম না। চোখ ব্যথা করত। ফলে পড়াটা ততটা এগোচ্ছে না। রবিবার দিনটা আমার পড়তে ইচ্ছে করে না। আগেও ছোটো থেকেই নেহাত পরীক্ষার আগে ছাড়া রবিবার পড়াশুনা করতাম না। রবিবার হলেই বিনয়দার সঙ্গে এদিক ওদিক পাখি দেখতে বেরিয়ে যেতাম। এক-একদিন আমরা সবাই মিলে আশেপাশের পুকুরে ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে যেতাম। আমি অবশ্য আগে কখনো মাছ ধরিনি। খুদু আর বিনয়দা বেশ ভালো মাছ ধরত। বেশিরভাগই ছোটো ছোটো রুই-কাতলা। সেদিন শুধু মাছ ভাজা খাওয়ার ধুম। এক-একদিন বড়ো বড়ো শোল মাছ উঠত। পিসিমা শোল মাছ খেতে খুব ভালোবাসেন বলে বিনয়দা খুদুকে বা বিধানকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। পিসিমা রান্না করে বাটি ভরে বিনয়দাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন।

দেখতে দেখতে প্রায় মাস ছ’-সাতেক কেটে গেল। প্রায় দিনই আমি আর বিনয়দা একসঙ্গে ফিরি। রোজই হাঁটার কম্পিটিশন হয় আর যথারীতি রোজই আমি জিতি। বিনয়দা হাল ছাড়েন না। আর ওই এককথা, ‘একদিন তোমাকে আমি হারাবই।’ কোনো-কোনোদিন বিনয়দার অফিসের বা অন্য কাজ থাকলে আসতে পারেন না। সেদিনটা একাই ফিরি। এখন আর কোনো ভয়ডর করে না। অন্ধকারে চোখও অভ্যস্ত হয়ে গেছে আর গ্রামের ছেলেদের মতন সাহসও বেড়ে গেছে।

এপ্রিল মাস নাগাদ আমি কলেজের হোস্টেল পেয়ে গেলাম। বলতে গেলে খুব যে একটা খুশি হলাম তা নয়। কিন্তু পড়ার কথা চিন্তা করে হোস্টেলটা ছেড়ে দিতেও পারছি না। আর এখন একবার ছেড়ে দিলে আর পাব না। পিসেমশাইয়ের খুব একটা সম্মতি ছিল না, পিসিমার তো একেবারেই নয়। তবে সবদিক বিবেচনা করে পিসেমশাই অনুমতি দিলেন। আমি চিঠি লিখে সেজোকাকা আর দাদুকে জানিয়ে দিলাম। আমার পড়ার যাবতীয় খরচাপাতি সেজোকাকা মানি অর্ডার করে পিসেমশাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিতেন।

বন্ধুদেরও সবার মন খারাপ, বিশেষত বিনয়দার। কিন্তু কী করা যাবে। ঠিক হল, শনিবার করে চলে আসব, আবার সোমবার সকালে ফিরে যাব। রবিবার যথারীতি আড্ডাবাজী ঠিকই থাকবে। তবে ওই আমাদের সন্ধেবেলা একসঙ্গে ফেরার মজাটা হবে না। শনিবার বিনয়দার অফিস থাকলেও দুটোর মধ্যে ছুটি হয়ে যায়। আমারও এখন শনিবার ক্লাশ থাকে না। ফলে কথা হল, আমি বিনয়দার অফিসে চলে আসব আর সেখান থেকে একসঙ্গে ফিরব।

মধ্যমগ্রামের ছবিটাও ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে। এতদিন যে ফাঁকা ফাঁকা ব্যাপারটা ছিল সেটা আর থাকছে না। পূর্ববঙ্গ থকে বাস্তুহারা হয়ে দলে দলে হিন্দুরা এপার বাংলায় চলে এসেছে। পশ্চিমবাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের নির্দেশে মধ্যমগ্রাম ও আশেপাশের এলাকায় উদ্বাস্তু পরিবারদের মাথাপিছু পাঁচ কাঠা করে জায়গা পুনর্বাসনের জন্য দেওয়া হচ্ছে। তারা সেখানে জঙ্গল পরিষ্কার করে, বাঁশ কেটে, দরমা দিয়ে ঘর তৈরি করে থাকতে শুরু করে। সত্যি ভাবতে খারাপ লাগে, দেশে এদের কত জমিজমা, সচ্ছল অবস্থা ছিল, আর এখন?

এখন সন্ধের পর বাড়ি আসতে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারটা আর লাগে না। মাঝে মাঝে টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোর ক্ষীণ রেখা চোখে আসে।

আমি হোস্টেলে চলে এলাম। প্রথম প্রথম আমারও খুব খারাপ লাগছিল। বাড়ি ছেড়ে থাকা বলতে গেলে এই প্রথম। বাড়ির খাবারে, পিসিমার রান্না খেয়ে অভ্যস্ত। হোস্টেলের খাবার খেতে পারতাম না। আস্তে আস্তে সবই সয়ে যায়।

শনিবার হলেই দুপুরে খাবার পর বিনয়দার অফিসে চলে আসতাম। সেখান থেকে একসঙ্গে বাড়ি ফিরতাম। স্টেশন থেকে নেমে শুরু হয়ে যেত আমাদের ওয়াকিং রেস। বলা বাহুল্য, আমিই জিততাম। বিনয়দার জেদ আমাকে হারাবেই, আমারও জেদ কিছুতেই কোনো অবস্থাতেই বিনয়দাকে জিততে দেব না।

রবিবার দিনটা সারাদিন আনন্দে কাটত। এখন হোস্টেলে অন্যান্য দিন পড়াটা রেগুলার ঠিক মতন করতে পারতাম। আমার রুম-মেট অপূর্ব খুবই ভালো আর সিরিয়াস ছেলে, কালনায় বাড়ি, প্রেসিডেন্সির ছাত্র। দু’জনে আলোচনা করে পড়া বুঝতাম। তাই রবিবারটা আমি মধ্যমগ্রাম না গিয়ে পারতাম না।

এর মধ্যে গরমের ছুটি পড়ে গেল। আমিও বর্ধমান চলে এলাম। এখানে এসে বুঝতে পারলাম যে এখন বর্ধমানের থেকে হোস্টেল আর মধ্যমগ্রামের আকর্ষণটাই বেশি। তাছাড়া গোটা দুই বইখাতা ছাড়া বাকি বই, নোটের খাতাপত্তর সবই তো যাবার আগে মধ্যমগ্রামে রেখে এসেছি। কলেজের লাইব্রেরিটাও এ সময়ে খোলা থাকবে। প্রফেসররা, রিসার্চ স্কলাররা তো রোজই আসেন। আমি শুধু শুধু বর্ধমানে বসে বসে সময় নষ্ট না করে দিন দশেক থেকে মধ্যমগ্রাম চলে এলাম। পিসেমশাই শিক্ষক মানুষ। পড়া ফাঁকি দিয়ে বর্ধমানে বাড়িতে বসে কাটাব, এটা তাঁর মোটেই পছন্দ নয়। তাই আমি চলে আসাতে খুবই খুশি হলেন।

সপ্তাহের ছ’দিন আমি আমার পড়া নিয়ে থাকতাম। ক্লাশ-নোট আর বই কনসাল্ট করে আমি পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তরের মতন করে নোট তৈরি করতাম। কলেজ ছুটি থাকাতে দিনের বেলাটাই বেশি পড়তাম। মাঝে মাঝে একটু বেলার দিকে কলেজের লাইব্রেরিতে যাই। বই নিয়ে, রেফারেন্স বই থেকে নোট টুকে আবার সন্ধেবেলা বিনয়দার সঙ্গে ফিরে আসি। আর ফেরা মানেই তো হাঁটার রেস। নাহ্‌, এবার ভাবছি একদিন ইচ্ছে করেই হারব। বিনয়দারও আমাকে হারানোর স্বপ্নটা সফল হবে। কিন্তু মজা হচ্ছে হাঁটার সময়ে সেকথাটা বেমালুম ভুলে যাই। তখন নেশার মতন বলতে গেলে ছুটতে থাকি।

রবিবারটা সারাদিন ছুটি। ব্রেনটাকে রেস্ট দিই। বিনয়দার সঙ্গে মাছ ধরা, পুকুরে সাঁতার কাটা, পাখি দেখা, বনে বাদাড়ে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ানো। এবারে বিনয়দা পাখিধরাদের কাছ থেকে একটা অদ্ভুত সুন্দর পাখি পেয়েছেন। নাম সাতসয়ালিーমাথা-মুখ-পিঠ কালো, পেছন আর পেটের দিক আলতা রঙের। খাঁচায় করে এনে পুষেছিলেন। এর আগে থেকে অবশ্য একটা চন্দনাও আছে। মাঝে মাঝেই হাঁসের মাংসের ফিস্ট হয়।

গরমের ছুটির পর কলেজ খুলে গেল। এখন জোরকদমে ক্লাশ চলছে। পুজোর আগেই জেনারেল পেপার বেশ কিছু শেষ হয়ে যাবে। পুজোর পর থেকে স্পেশাল পেপারের ক্লাশ শুরু হবে। এখন পড়ার চাপের জন্য মাঝে মাঝে শনি-রবিবার মধ্যমগ্রাম যাওয়া বাদ দিতে হচ্ছে। কোনো শনিবার বিনয়দার অফিসে না গেলেই উনি বুঝে যেতেন এ সপ্তাহে আসছি না। পিসেমশাইরাও জেনে যেতেন।

সেদিনটা ছিল ৮ই আগস্ট, ১৯৫৩, শনিবার। 

গত শনিবার মধ্যমগ্রাম যাইনি। এই শনিবারও যাব কি যাব না দোনোমনা করছিলাম। তার ওপর ক’দিন ধরেই খুব বৃষ্টি হচ্ছে। বিকেলের দিকে অপূর্ব লাইব্রেরি থেকে গ্লাসটোনের ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির বইটা নিয়ে এল। ভালোই হল, একসঙ্গে কনসাল্ট করে নোট তৈরি করা যাবে। কিন্তু বিপত্তি বাধল। আমার ক্লাশ-নোটের খাতাটা আগেরবার পিসিমার বাড়িতেই ফেলে এসেছিলাম। অন্য একটা খাতায় এ সপ্তাহে ক্লাশ-নোট নিয়েছি। কিন্তু ওই খাতাটা লাগবেই। নাহ্‌, আমাকে যেতেই হবে। তবে কাল দুপুরে খেয়েই চলে আসব। এখন আর বিনয়দার অফিসে গিয়ে লাভ নেই, বিনয়দা এতক্ষণে বাড়ি পৌঁছে গেছে। শনিবার আমরা সাধারণত তিনটের ট্রেনে ফিরে যাই।

সন্ধে ছ’টার বনগাঁ লোকালে আজ একাই ফিরলাম। আশ্চর্য, অন্যান্য দিন বেশ কয়েকজন মধ্যমগ্রাম স্টেশনে নামে, আজ আমি একদম একা! ট্রেন থেকে নেমেই আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে হনহন করে চলতে শুরু করলাম। একে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তার ওপর আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা, মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে। আর কী বাজ পড়ার শব্দ!  দু-এক ফোঁটা গায়ে পড়ল। পাশের বাঁশবনে লম্বা বাঁশের ঝাড়গুলো বাতাসে দুলছে। আর কী সড়সড় শব্দ!  মনে হয় হাতছানি দিয়ে ডাকছেーআয় আয়, চলে আয়, চলে আয়। অন্ধকারে মাথায় উপর সমানে বাদুড় উড়ছে। আজ আবার আসার সময়ে টর্চটাও আনতে খেয়াল নেই।

খানিকটা যেতে মনে হল কে যেন পেছন পেছন আসছে। আমি আর পেছনে তাকাই না। যত তাড়াতাড়ি পারি যাচ্ছি। কে একজন আমাকে টপকে যেতে যেতে বলল, “আরও জোরে পা চালাও, বৃষ্টি আসছে।”

গলা শুনেই চমকে উঠলাম, “বিনয়দা! আপনি? আজ আপনার এত দেরি হল! আপনি চলে গেছেন ভেবে আর আপনার অফিসে যাইনি। শিয়ালদা স্টেশনেও তো আপনাকে দেখলাম না। আমাদের কামরাটাতেও তো ওঠেননি।”

ইতিমধ্যে বিনয়দা আমাকে ছাড়িয়ে হাত দুয়েক এগিয়ে গেছেন। অন্ধকারে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। ধুতি-শার্ট পরা একটা অবয়ব শুধু আবছা দেখতে পাচ্ছি।

বিনয়দা বললেন, “না, আজ অফিস যাইনি। একটু অন্য কাজ ছিল। স্টেশনে দেরি হয়ে গিয়েছিল। ট্রেন প্রায় মিস করছিলাম। লাস্ট কামরায় কোনোমতে এসে উঠেছি।”

বিনয়দার কথাগুলো কীরকম হাওয়ায় ভেসে এল মনে হল। বিনয়দা কিন্তু আমার আগে আগেই যাচ্ছেন। আমি যতই স্পিড বাড়াই, কিছুতেই ওঁকে ধরতে পারছি না। আশ্চর্য! কী হল আজ বিনয়দার? আজ তাহলে আমি সত্যিই হেরে যাব? অসম্ভব। আমি প্রাণপণে আমার ম্যাক্সিমাম স্পিডে হেঁটে ওঁকে প্রায় ধরে ফেলেছি, বিনয়দা যেন পাশ থেকে বুঝতে পেরে আরও জোরে হেঁটে আমার থেকে প্রায় তিন হাত এগিয়ে গেলেন।

ইতিমধ্যে আমরা পিসিমার বাড়ির গলির মুখে পৌঁছে গেছি। অন্যদিন হলে বিনয়দা একটু দাঁড়ান, রবিবার কী করা যায় আলোচনা করেন। আজ আর দাঁড়ালেন না। ওইরকম স্পিডেই সোজা ওঁদের বাড়ির দিকে যেতে যেতে বললেন, “সুবিমল, আজ আর তুমি আমাকে হারাতে পারলে না। বলেছিলাম না একদিন না একদিন তোমাকে আমি হারাবই!”

আমি কিছু বলবার আগেই বিনয়দা কীরকম অন্ধকারে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।

আমি কীরকম হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে। কী হল আজ ব্যাপারটা? এ তো অবিশ্বাস্য!

আমি অবাক হয়ে বিনয়দার যাবার পথের দিকে তাকিয়ে আছি। এমন সময় একটা জোর বিদ্যুৎ চমকাল আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কান ফাটানো বাজ পড়ার শব্দ। সেই বিদ্যুতের আলোতেও বিনয়দাকে দেখতে পেলাম না। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আমি দৌড়ে পিসিমার বাড়ি আসতে আসতে অনেকটাই ভিজে গেলাম।

কড়া নাড়তেই পিসিমা দরজা খুললেন। আমি ঢুকতে ঢুকতেই বললাম, “জানো তো আজ একটা কাণ্ড হয়ে গেছে। দাঁড়াও, জামাকাপড়টা ভিজে গেছে, ছেড়ে এসে বলছি। তুমি খেতে দাও তো। আমার খুব খিদে পেয়েছে।”

আমি ঘরে ব্যাগ রেখে, ধুতি-জামা ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে এলাম। ইতিমধ্যে পিসিমা ভাত বেড়ে দিয়েছেন। আমি খেতে বসলাম। খানিক বাদে পিসেমশাই আহ্নিক সেরে, পুজোর কাপড় ছেড়ে এসে খেতে বসলেন। আমার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু খুদুকে দেখছি না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “খুদুকে দেখছি না কেন? খুদু কোথায়?”

পিসেমশাই খুব গম্ভীরভাবে আস্তে আস্তে বললেন, “খুদু বিধানদের বাড়িতে।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “বিধানদের বাড়িতে? এত রাতে! কেন?”

পিসেমশাই খানিক চুপ করে বললেন, “খুদু, কল্যাণ... বলতে গেলে দু’দিন ধরেই তো ওদের বাড়িতে রয়েছে। গত বুধবার রাতে অফিস থেকে ফেরার পর থেকে বিনয়ের হঠাৎ ভেদবমি শুরু হয়। বারাসত থেকে ভালো ডাক্তারও এসেছিল। কিন্তু কিছু করা গেল না। গতকাল রাতে... বিনয় চলে গেল। এই তো দুপুরে ওকে দাহ করে খুদুরা সব ফিরেছে।”


___


অঙ্কনশিল্পীঃ বিশ্বদীপ পাল


No comments:

Post a Comment